বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

পাতাপ্রকাশ ঈদ আয়োজন ২০২২

পাতাপ্রকাশ ঈদ আয়োজন ২০২২

ঈদ নিয়ে আবারও জটিলতা দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় নেতাদের একাংশের মতামতের ভিত্তিতে সৌদিআরবের সাথে মিল রেখে চাঁদপুরসহ বাংলদেশের বিভিন্ন স্থানে ঈদের নামাজ আদায় হচ্ছে। এতে সামাজিকভাবে একটা অসস্তিকর পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যার। কোথাও কোথাও ঈদের আনন্দটাই ম্লান হয়ে যায়। ইসলামের বিধানে চাঁদ দেখার ওপর ঈদের দিন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু যুক্তিবাদী ওলামাগণের সোজা কথা মুমিন মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ চাঁদ দেখলেই তার প্রতি বিশ্বাস রেখে ঈদ উৎসব পালন করা উচিৎ। যাইহোক এই জটিলতা মাথায় নিয়ে নতুন করে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। তা হলো ঈদের বাংলা বানান। এখন বাংলা বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ ❝ই❞কার দিয়ে ঈদ বনান লিখছেন। ফেসবুক পোস্টে ঈদ ইদ দু’টি বানানই লেখা হচ্ছে। কিছুদিন পূর্বে শহীদ বানান নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বাংলা ভাষার মুরুব্বী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি তাদের বানান রীতি অনুযয়ী শহিদ, ইদ বানান প্রচলন করে। কিছু আমাদের বাঙালী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় যে কোনো পরিবর্তন গণমানুষের মেজাজ-মর্জির ওপর নির্ভর করে।
শহিদ বানান দিয়ে যেমন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি হবে না, তেমনি ইদ বানান লিখেও ঈদ সামগ্রীর মূল্য কমানো যাবেনা। ট্রেনের টিকিট বা বাসের টিকিট পাওয়ার দুর্ভোগও কমবে না।
আসলে বানান নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করাও কাম্য নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রজ্ঞাপন দিয়ে ইংরেজিতে ঢাকা বানানটি সহজীকরণ করেছিলেন।এরফলে ঢাকার ঠিকানায় প্রেরিত ডাক ডাকারে যাওয়া থেকে রেহাই পওয়া গেছে। বৃটিশ আমলে পাটনায় হওয়ার কথা ছিল মানসিক হাসপাতাল। কিন্তু ভুলক্রমে টি-এর মাথা না কাটায় এটি পাবনায় স্থাপিত হয়। প্রজ্ঞাপন দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি বানানটি সংশোধন করা হলেও অধিকাংশ রাজনৈতিক সংগঠন এখনো ❝ঈ❞ কার দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলী বানান লিখছেন। আমাদের মনে রাখা উচিৎ মহান মাতৃভাষা আন্দোলন বাংলাদেশেই হয়েছে এবং এজন্য সালাম, বরকত, রফিক, সফিকসহ অনেক জীবন দিতে হয়েছে। এজন্য মহান একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। কাজেই বাংলাদেশে বাংলা বানান নিয়ে জটিলতা কোনোভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। খুশির ঈদ উৎসব যেন মান না হয়।

আমার মধ্যে ছড়াচেতনা এবং ছন্দ দ্যোতনা সৃষ্টিতে বিশিষ্ট এক মাতালের ভূমিকাকে আমি স্মরণ না করে পারি না। আমি তখন খুব ছোট। প্রাইমারী স্কুলে আসা যাওয়া শুরু করেছি সবে। থাকি হেয়ার স্ট্রিট, ওয়ারিতে। আমাদের বাড়িটা এমন এক জায়গায় যার ডানে এবং বাঁয়ে মুচিদের (রবিদাস সম্প্রদায়) টানা বস্তি। মাঝখানে আমাদের বাড়িটাই শুধু ইটের দালান। সেই বস্তিতে থাকা মুচিদের প্রধান জীবিকা ছিলো জুতো সেলাই। রবিদাস সম্প্রদায়ের লোকেরা মদ্যপান করবে, মাতলামি করবে এটাই যেনো সতঃসিদ্ধ ছিলো। মদ্যপান ওদের করতেই হবে, তা নইলে ওরা জুতোর কাজ করতে পারে না এই রকম একটা ধারণার প্রতি এলাকার মানুষদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিলো। চোলাই এবং বাংলামদ খেয়ে ওদের মাতলামি আর হৈচৈ চিৎকার চ্যাঁচামেচি করাটা ছিলো নিয়মিত ব্যাপার। সেই চিৎকারের একটা প্রধান অনুষঙ্গ ছিলো অশ্লীল খিস্তি আর গালাগাল। জীবনের যতো কুৎসিত গালাগাল আমি শৈশবেই শুনেছি। চ-বর্গীয় গালাগালগুলোর ডিপো ছিলো এই মুচিপাড়া। এই গালাগালসমূহ আমাদের গা সওয়া নয়, কান সওয়া হয়ে গিয়েছিলো। মুচিদের ভাষাটাও আমার জানা হয়ে গিয়েছিলো। মহিলারা শিশু-কিশোর কিংবা বয়স্ক কারো ওপর বিরক্ত হলে একটা কমন গালি দিতোই দিতো—নাতিয়াকা বেটা তেরি মাটি লাগোল্‌।
ভাই ভাইকে গাল দিতো—তেরি মাকা…।
তো এইরকম ভয়ংকর একটা পরিবেশের মধ্যেই আমি বড় হচ্ছিলাম। প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হবার পর আমার চারপাশে সুন্দর বলতে ছিলো সিলভারডেল কিণ্ডারগার্টেন স্কুল কম্পাউন্ডের কচি-কাঁচার মেলার ছবি আঁকার ইশকুল শিল্পবিতান আর গানের ইশকুল সুরবিতান।
আমার মধ্যে ছড়াচেতনা এবং ছন্দ দ্যোতনা সৃষ্টিতে ‘ডিজেল’ নামের এক বিশিষ্ট মাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিশাল ভূমিকাটা এখানে বলে রাখি। রোগা-পটকা মাঝারি উচ্চতার এই লোকটা অন্য এলাকা থেকে মুচিপাড়ায় আসতো মদ্যপান করতে। বেশির ভাগ সময়েই তার পরনে থাকতো ল্যান্ডি মার্কেট থেকে কেনা জিন্স অথবা গ্যাভার্ডিন প্যান্ট এবং শরীর আঁকড়ে থাকা সাইজের ছোট টিশার্ট কিংবা চকড়াবকড়া জামা। লোকটার পলকা শরীর দেখেই বোঝা যেতো একরত্তি শক্তি নেই ওর গায়ে। ফুঁ দিলেই উড়ে যাবে এমনই পলকা তার শরীর-স্বাস্থ্য।
তো লোকটার নাম ডিজেল ক্যানো?
শোনা কথা—একবার পান করবার মতো এক ফোঁটা মদও যোগাড় করতে পারেনি বলে লোকটা নাকি গাড়ি থেকে ডিজেল চুরি করে সেটা পান করেছিলো। সেই থেকেই লোকটার অরিজিনাল নামটা ভ্যানিস হয়ে গিয়ে ডিজেল নামটাই স্থায়ী হয়ে গিয়েছিলো।
ডিজেল আমাদের মহল্লায় এলেই ওর পিছু নিতো মুচিপাড়ার দুষ্টু ছেলেরা। ওরা ডিজেলের পেছন পেছন ধাওয়া দিয়ে দিয়ে স্লোগানে স্লোগানে ব্যতিব্যাস্ত করে তুলতো তাকে। ডিজেল দৌড় এবং দ্রুত গতিতে হাঁটার মাঝামাঝি পর্যায়ের স্পিডে ছুটে পালাতে চাইতো। মাঝে মাঝে অতিষ্ট হয়ে রাস্তা থেকে ইটের টুকরো তুলে নিয়ে রুখে দাঁড়িয়ে ওটা ছুঁড়ে মারতো ছেলেগুলোর দিকে। মাতালের নিশানা ঠিক থাকে না বলে ওটা কারো গায়ে আঘাত করতে সমর্থ হতো না। উল্টো—ঢিল ছোঁড়ার অপরাধে ধাওয়াটা আরো প্রবল হয়ে উঠতো।
এই ধাওয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকতো স্লোগান। নেতৃত্বে থাকা একটা ছেলে সুর করে উচ্চ কণ্ঠে বলতো—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছেলেগুলো বলতো—ল্যাওড়াকা বাল হ্যায়। সম্মিলিত কচিকণ্ঠের বিস্ময়কর স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠতো এলাকাটা—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়—ল্যাওড়াকা বাল হ্যায়।
এইটুকুন ছোট্ট বালক আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডিজেল নামের মাতালটাকে আমারই বয়েসী একদল বালকের কাছে হেনস্তা হতে দেখে খুশি হয়ে উঠি একবার। আবার একটু পরেই বিষণ্ণ হয়ে উঠি ডিজেল নামের আপাত বিপদগ্রস্ত মাতালটার জন্যে। এবং খানিক পরেই মহাবিস্ময়ে আবিস্কার করি পাজির হদ্দ সেই বালকদের অপূর্ব স্লোগানের অপরূপ ছন্দমাধুর্যে সম্মোহিত আমি অজান্তেই শামিল হচ্ছি ওদের সঙ্গে। নেতৃত্বে থাকা ছেলেটা বলছে—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছেলেদের সঙ্গে অনুচ্চ কণ্ঠে আমিও বলছি—ল্যাওড়াকা বাল হ্যায়। কী মুশকিল! নিজের কাছে নিজেই ধরা পড়ে লজ্জিত হই। দ্রুত সরে আসি বারান্দা থেকে। আমাদের বাড়ি অতিক্রম করে ছোটখাটো মিছিলটা চলে যেতে থাকে। দূর থেকে ভেসে আসে স্লোগান—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়…।
সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসে আবিস্কার করি ভয়াবহ বিপদটা।
ক্লাশের পড়া তৈরি করতে গিয়ে টের পাই—ফ্লোরের ওপর পায়ে তাল ঠুকে খুব নিচু স্বরে আমি গুণগুণ করছি—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়…।
সব্বোনাশ!
স্নানের সময় গান গাওয়াটা আমার চিরকালের অভ্যেস। স্নান করতে গিয়ে ফের সেই একই বিপদ—শরীরে সাবান ঘষতে ঘষতে ছন্দে ছন্দে মাথা দুলিয়ে আমি অবিরাম আউড়ে যাচ্ছি—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়…।
পরিপাটি ফিটফাট বাবুটি সেজে স্কুলে যাচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে টের পাই—অবচেতনে ছন্দোময় পদক্ষেপে আমি আউড়ে চলেছি—ওয়ান টু থ্রি ফোর—ডিজেল মেরা লাল হ্যায়…।
আজ পরিণত বয়েসে এসে অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমার মধ্যে ছড়াচেতনা আর ছন্দ-দ্যোতনা তৈরি করে দিয়েছিলো ডিজেল এবং তার প্রতি নির্দয় সেই বালকেরা। জল পড়ে পাতা নড়ে টাইপের কোনো সুশীল ভদ্রোচিত শব্দ-দৃশ্য আমাকে ছন্দে এতোটা উদ্ভুদ্ধ করেনি যতোটা করেছিলো মাতাল ডিজেল এবং তার খুদে দুশমনরা!
রচনাকাল/ অটোয়া ১৭ মে ২০১৩

দ্রুত নামডাক কামানো মানুষগুলো দ্রুতই বিলীন হয়। ভিতরে কিছুই নাই বাইরে টাকা অথবা প্রচার প্রচারণার সুযোগে কেউকেটা হলে তা কখনো স্থায়িত্ব পায় না। অকালেই ঝরে যায়। ওজন আর মাপের চেয়ে বেশি হলে তা ধারণ বা পরিধান করা যায় না। সাহিত্য সংস্কৃতি সামাজিক কাজে কখনো গভীরতা আর আন্তরিকতা ছাড়া সফল হওয়া অসম্ভব। তৃতীয় নয়ন ছাড়া সৃষ্টিশীল কাজ সম্ভব নয়। সৃষ্টির মাঠে মেধার গভীরতা ভীষণ প্রয়োজন। প্রচার সর্বস্ব মানুষগুলো প্রথমে চমক সৃষ্টি করে কিন্তু সেই চমকানো অন্ধকারে ডুবে যায় অল্পদিনেই।
প্রতিভাকে কখনো বেশিদিন দাবায় রাখা যায় না। প্রতিভার শক্তি প্রচন্ড, প্রখরতা তীব্র। ক্ষমতার দাপটে কিছু অযোগ্য অথর্ব মানুষ নিজেকে বিধাতা ভাবে। জনমতকে উপেক্ষা করে সর্বক্ষেত্রে তারা শিক্ষক ও প্রশিক্ষক ভাব নিয়ে জ্ঞান দেওয়ার বেয়াদবিতে মত্ত। এরা আসলে সবাইকে মূর্খ্য ভেবে নিজেকে অতি চালাক ভাবে। এরা সমাজে অগ্রহণীয় ক্লাউন হিসেবে হাস্যকর চরিত্রে পরিচয় লাভ করে।
ইদানিং তেলবাজিতে প্রতিযোগিতা বেশি। ক্ষমতাবানদের তেল দিতে দিতে সয়লাব অবস্থা। আমলারা কেউ কোনো স্ট্যাটাস দিলেই শুরু হয় তেলবাজি আর সহমত পোষণের নির্লজ্জ কমেন্টস। দোয়া আশীর্বাদের হিড়িক। আমলারাও যেকোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেলে আর প্রধান অতিথি করলেই যেতে উদগ্রীব। মঞ্চের মাপ কি চেয়ার শক্ত না নরম তা নিয়েও গবেষণা তাদের। বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট হোক আর না হোক তাঁরা মাইকে জ্ঞান দেওয়া শুরু করে। তাদের মধ্যে এই ভাব প্রতিনিয়ত যে, তারা সর্বজ্ঞানী বিরাট কিছু। বঙ্গবন্ধু বন্দনা করার প্রতিযোগিতায় এমন পরিস্থিতি দাঁড়ায় যে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে লজ্জায় মুখ লুকাতেন। বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, উচ্চাঙ্গসংগীতের আলোচনা, নৃত্য, তাফসীর সব তাঁদের নখদর্পনে। কোরান গীতা বেদ বাইবেল সবকিছুর পিএইচডি হোল্ডার তাঁরা।
শিল্প সাহিত্য শৃঙ্খলিত হয়ে বিকশিত করা সম্ভব না। শিল্পী সাহিত্যিক কখনো কারও অধীনস্হ নয়। ইদানিং শিল্প সাহিত্যের জায়গাগুলো রাজনৈতিক নেতা আর আমলা নির্ভর শতভাগ। তথাকথিত শিল্পীরা আমলা আর নেতাদের পিছনে ছুটে স্যার স্যার বলতে মুখের ফ্যানা তুলে ফেলছে। অনৈতিক কাজ করে এরা শিল্প সাহিত্যের বারোটা বাজাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ নজরুল কোনো আমলা বা রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তাঁরা কারও পদলেহন করেননি। আমলা নেতাদের কস্মিনকালে পাত্তাও দেননি। আমলাতান্ত্রের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব পৃথিবীর কোথাও নেই। শরৎচন্দ্র, লতা মুঙ্গেস্কর, রুনা লায়লা সাবিনা ইয়াসমিন কখনো বেতার টেলিভিশনের কর্মকর্তাদের স্যার স্যার বলে পিছেপিছে ঘুরঘুর করেননি। এদেশে আমলা নেতা হওয়া সহজ কিন্তু প্রকৃত কবি সাহিত্যিক শিল্পী হওয়া সহজ না। এরা দেশ জাতির সম্পদ। আলুপটল ব্যবসায়ী, আমলা আর মাফিয়াদের হাতে এখন শিল্প সাহিত্যের রিমুটকন্ট্রোল।
নির্লজ্জ বেহায়ারা এই অতিভক্তি আর তেলবাজিতে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে ফেলেছি। আমলাদের প্রধান অতিথি আর বিশেষ অতিথি, সেমিনার সিম্পোজিয়াম করতে নিজেদের দাপ্তরিক কাজ বেমালুম ভুলে যান। অর্পিত দ্বায়িত্ব পালন না করে এই সব করলে দেশ জাতি কতটা উদ্ধার হবে আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ।
আমরা অযোগ্যদের পদলেহন যতদিন বন্ধ করবো না ততদিন সত্য সুন্দর নির্মল নিরাপদ দেশ গঠন করতে পারবো না। রাজনৈতিক নেতাদের জনবান্ধব হওয়া বাঞ্চনীয়। জনগণের সাথে মিশে যাওয়াই তাদের প্রধান কাজ। আমলারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা কর্মচারী। এদের নিয়ে মাতামাতি কম করাই মঙ্গল। বরং তাঁদের কাজে আমাদের সহযোগিতা করা উচিৎ। রবীন্দ্রনাথ নজরুল গবেষণা, ধর্মের ব্যখ্যা, সমাজ পরিবর্তনের কথা সংশ্লিষ্টদের বললেই ভালো। আমলাদের সবক্ষেত্রে দৌরাত্ম্য আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। জটিলতা বাড়িয়ে সহজ সমীকরণ কঠিন হচ্ছে। যার যা কাজ তাই করলেই সবকিছু সহজ হয়।

মেঘ সরিয়ে অন্য দেশে
রং ছড়াতে আসি,
হৃদয় জুড়ে কানায় কানায়
সবুজ রাশি রাশি।
.
প্রতিটি পাহাড় যেন চা বাগিচার সবুজের গালিচা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে।এমনই সৌন্দর্যের পোশাক পড়ে নীল আকাশের নীচে মিঠে রোদ্দুর গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু চোখ জুড়ানো রং মহল।আহা!দুচোখ যেখানে জুড়িয়ে যায়।
এমনই অনুভব পেতে মোটর বাইকে করে বিন্দাস ঘুরে আসা যায় বিদেশে।খুব কাছে পিঠে এমনই এক আনকোরা মন কেমন করা এক অনন্য সৌন্দর্যের ঠিকানা কন্যাম।উত্তর বঙ্গের গাঁ ঘেষে সে দেশ নেপাল।শিলিগুড়ি থেকে যার দূরত্ব প্রায় সত্তর কিলোমিটার।তবে বাইকে করে মেঘ সরিয়ে আসতে আসতে অজস্র জায়গার সৌন্দর্য বার বার থামিয়ে দেবে সবাইকে।যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই অপরূপা প্রকৃতি ভুলিয়ে দেবে সব বিষাদ।সাতসকালে হাজারও পাখির কলকাকলি ভাঙিয়ে দেবে ঘুম।দুটো দিন বেশ স্বাচ্ছন্দে কাটিয়ে দেওয়া যায়।শিলিগুড়ি থেকে পানিট্যাঙ্কি ভারত নেপাল সীমান্তের কাকরভিটা এসে চেক পোস্টে ভোটার কার্ড দেখিয়ে সে দেশে ঢোকার ছাড়পত্র পাওয়া যায়।এরপর নেপাল ইমিগ্রেশনে গিয়ে যেকদিন থাকবেন তার ভিসা নিতে হয় সামান্য খরচের বিনিময়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে ঝাঁপা জেলার চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে সেখান থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে কন্যাম।ধুলাবালি পেরিয়ে চারয়ালি মোড় এলেই ডান হাতে বাঁক নেবে কন্যামের রাস্তা।ঝা চকচকে সে রাস্তায় কতবার যে থেমে যেতে হবে আর কতবার যে ক্যামেরার লেন্সে হাত চলে যাবে সে হিসেব মেলানো বড় কঠিন।জোড় কলস এলে একটু চায়ের উষ্ণতায় বিরতি নিয়ে ফের চরৈবতি।এরপর এসে যাবে সেই গন্তব্য।কন্যাম এর নাম ফলক স্বাগত জানাবে আপনাকে।সেখান থেকে দূর পাহাড়ের গ্রাম গুলো যেন ক্যানভাসে সাজানো ছবি।সে দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই সমস্ত ক্লান্তি আর বিষাদ যে কোথায় হারিয়ে যাবে তা বোঝাই যাবেনা।কন্যামে থাকার জন্য সাধারণ মানের থেকে শুরু করে বিলাস বহুল হোটেলও আছে।পায়ে পায়ে বেশ কিছু জায়গা দেখে নেওয়া যেতে পারে।পরেরদিন খুব ভোরে সূর্যোদয় দেখতে ১৪ কিমি দূরে চলে যেতে পারেন অন্তূ ও শ্রী অন্তু।নজর মিনারে দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন শুধুই হারিয়ে ফেলা। রয়েছে বোটিং এর ব্যবস্থাও।সে আরেক সৌন্দর্য মহল।হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা।কন্যাম থেকে যার দূরত্ব চৌদ্দ কিলোমিটার।সেখান থেকে হোটেলে ফিরে পরের গন্তব্য ইলম।নেপালের একটি জেলা।এই জেলাতেই কন্যামের অবস্থান।সেও যেন ক্রমশ সৌন্দর্য ছড়িয়েই চলছে। কন্যাম থেকে ইলমের দূরত্ব ৪৩ কিমি।পরের রাত্রিবাস সেখানেই।এভাবেই দুদিনের বিদেশ সফর সেরে বাড়ি ফেরার পথে বার বার যেন হারিয়ে যাওয়া সেই নিসর্গে।

বাঙালিকে বলা হয় আবেগপ্রবণ জাতি। বাংলার। মাটি, নদী, বাতাস, প্রকৃতি, জলবায়ু বাঙালির আচরণগত বৈশিষ্ট্যের উপর প্রভাব ফেলেছে। আবার বাঙালি হলো সংকর জাতি। আদিতে যদিও এখানে অস্ত্রালরা বসবাস করতো পরে দ্রাবিড় ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠী মিশে যায় তাদের সঙ্গে।তারও পরে আসে আল্পীয়রা। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র নৃতাত্ত্বিক সত্বা যাদের পরবর্তীতে বাঙালি বলা হয়। আদিতে। তারা বাস করতো পুন্ড্র, কৈবর্ত, বাগদি, হাঁড়ি, ডোম, বাউড়ি প্রভৃতি কৌমভিত্তিক সমাজে। কালের বিবর্তন, যুগের পরিবর্তন, নানাবিধ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং সে সঙ্গে বিভিন্ন মতাদর্শ বিশেষ করে ধর্মীয় মতাদর্শের উদ্ভবের সাথে সাথে বাঙালি সমাজ জীবনে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সমাজে পারলৌকিক চিন্তাচেতনার মানুষের সাথে সাথে ভোগবাদী মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনায় যেমন জাতীয়তাবাদ আছে তেমন আছে লোকজ সংস্কৃতির প্রভাব, আছে সনাতন, বৌদ্ধ, ইসলাম ধর্মসহ পাশ্চাত্যের চিন্তার প্রভাব। তবে বর্তমান নিবন্ধের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে পঞ্চাশ বছর। আগে। বাংলাদেশ একটি ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু মানুষ ব্যতীত বাংলাদেশের আপামর জনগোষ্ঠীর প্রায় সকলেই বাঙালি। তাদের মাতৃভাষা বাংলা। সাবেক পাকিস্তানের অংশ ছিল। আজকের এ বাংলাদেশ এবং তৎকালীন পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৫৬ জন বাঙালি হয়েও যখন বাংলাকে বাদ দিয়ে একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পায়তারা করা হয়েছিল তখন পূর্ববাংলার মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল। সে। আন্দোলন রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে রুপ নেয় ১৯৫২ সালে। রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি আদায় করা হয়েছিল। মূলতঃ ‘৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতিসত্বা চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল- এসব আমরা সকলেই কমবেশি জানি। আজও আমরা গর্বভরে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ভাষা দিবস হিসাবে উদযাপন করি। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও আমাদের ভাষা দিবসের মাহাত্ম্য ছড়িয়ে গেছে। ইউনেস্কো ২০০০সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলিতে পালনের জন্য ঘোষণা দিয়াছে।। বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজ জীবনে বাংলা ভাষা ব্যবহারের অবস্থা কেমন- বিশেষ করে নাগরিক জীবনে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৯৪৮ সালে যখন প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দানের জন্য আন্দোলন শুরু হয় এবং ঐ আন্দোলনে যারা। গ্রেফতার হয়েছিলেন তাদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের একটা চুক্তি হয়েছিল। সে চুক্তিতে অন্যতম প্রধান দাবি ছিল পূর্ব বাংলায় বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করতে হবে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো | একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই মাধ্যম হিসাবে বাংলা ছাড়াও ইংরেজি এবং আরবি ভাষা চালু রয়েছে। অনেক অভিভাবকই অতি উৎসাহে ইংরেজি কিম্বা আররি ভাষা মাধ্যম হিসাবে বেছে নিচ্ছেন তাদের সন্তানদের শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে। শিক্ষা ব্যবহার এ হাল ছাড়াও আমাদের নগর কেন্দ্রিক জীবনে এখন একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে ইংরেজি। বেসরকারি হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্টান, ব্যাক, বীমা ইত্যাদি প্রতিষ্টানগুলি তাদের দৈনন্দিন কার্যধারার বেশিরভাগ ইংরেজিতে সম্পন্ন করে থাকে। বিভিন্ন অফিস, দোকানপাটসহ অধিকাংশ প্রতিষ্টানের সাইনবোর্ড পর্যন্ত ইংরেজিতে লিখা হয়। এরুপ ইংরেজি প্রীতির তেমন কোন গ্রহনযোগ্য কারণ আছে বলে মনে হয় না। ইউরোপের উন্নত দেশ যেমন- ফ্রান্স, জার্মানী, সুইডেন প্রভৃতি দেশসহ এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এমনকি থাইল্যান্ডে পর্যন্ত (যেখানে প্রচুর বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটে) এধরনের অহেতুক ইংরেজি প্রীতি দেখা যায় না। দুঃখজনক আর একটি বিষয় হচ্ছে যে নগর জীবনে বিয়ের দাওয়াত পত্র এখন অধিকাংশই ইংরেজিতে মুদ্রণ করা হয়। এখানে একটা মনস্কৃতিক ব্যাপার আছে বলে মনে হয়। কেউ কেউ মনে করেন ইংরেজিতে দাওয়াত পত্র ছাপানো হলে তাদের সামাজিক মর্যাদা অটুট থাকে কিম্বা বৃদ্ধি পায়। এটিতে এক ধরণের মানসিক দৈন্যতা ছাড়া অন্য কোন যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। যাদের জন্য এ দাওয়াত পত্র ছাপানো হয় তাদের শতকরা নিরানব্বই জনেরও বেশি ব্যক্তি বাঙালি। মুষ্টিমেয় ক’জন বিদেশি অতিথির জন্য (যদি থাকে) এধরণের দাওয়াতপত্র হওয়া সমীচীন হতে পারে না।
ভাষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারকারি জাতি হিসাবে আমরা গর্ববোধ করি। ফেব্রুয়ারি মাসকে ভাষার মাস বলে আমরা অহংকার করে থাকি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার কথা বলা হয় অথচ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হলেও উচ্চ আদালতে এখনও বাংলা ভাষা ব্যবহার পুরোপুরিভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ মানুষ যারা উচ্চ আদালতে বিচারপ্রার্থী হয় তাদেরকে বিচারের বাণী শুনতে হয় ইংরেজিতে যা তাদের অধিকাংশেরই বোধগম্য হয় না। দশ বছর আগেও চিকিৎসকদেরকে রোগীর ব্যবস্থাপত্র বাংলায় করতে দেখা যেতো কিন্তু এখন অন্তত বড় বড় শহরগুলিতে বাংলায় খুব কম। চিকিৎসাপত্র পাওয়া যায়।
পাকিস্তান আমলে একসময় বাংলা ভাষার ইসলামীকরণ করার অপচেষ্টা ছিল। তখন রোমান হরফে বাংলা ভাষা লেখারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে ক্রমে সরিয়ে নেয়া। কিন্তু| এদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের প্রতিবাদের মুখে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন যারা মুঠোফোন ব্যবহার করে তাদের
অনেকেই ক্ষুদে বার্তা আদান-প্রদান করে ইংরেজি। হরফে বাংলা লিখে। ঐসব বার্তায় এমনভাবে বানান লিখা হয় যা উচ্চারণ করতে গলদঘর্ম হতে হয়। কী বোর্ডে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সফটওয়্যার থাকার পরেও কেন ঐভাবে ইংরেজি হরফে বাংলা লিখতে হবে, সেটি কোন্ মানসিকতার পরিচায়ক তা বুঝতে পারা দায় হয়ে যায়।
আর একটি বিষয় বেশ প্রচলন ঘটেছে, বিশেষ করে শহর এলাকায়, সেটি হলো আন্টি এবং আংকেল শব্দ দু’টির ব্যবহার। এক সময় আমরা অচেনা দু’একজন বিশেষ করে বিদেশি মুরব্বি স্হানীয় হলে আন্টি, আংকেল বলে সম্বোধন করতাম। নিজের আত্মীয়, পাড়া প্রতিবেশী কিম্বা বন্ধুবান্ধবদের মা বাবাকে খালাম্মা, খালুজান, চাচা, চাচি বলে সম্বোধনে অভ্যস্ত ছিলাম। কাউকে কাউকে মামা বলেও ডাকতাম। এ শতকের গোড়ার দিক থেকে শুরু হয়েছে| নিকট-পর,আত্মীয়-অনাত্মীয় সবাইকে ঢালাওভাবে আংকেল, আন্টি বলার রেওয়াজ। মামা, খালা, চাচা | এসব চলে গেছে নিম্ন পেশার মানুষকে সম্বোধনের। জন্য। যেমন রিক্সাচালক, চায়ের দোকানদার, ফুটপাতের হকার, ফেরিওয়ালা, কাজের বুয়া, দারোয়ান এদেরকে ডাকার জন্য। যে ভাষাকে রক্ষা করার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি বলে ফেব্রুয়ারি মাসে গর্ববোধ করি সে ভাষা ব্যবহারে আমরা | শ্রেণিবিভেদ তৈরি করে ফেলেছি।
আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি নিয়েও আমরা গর্ববোধ করি। আমাদের সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠানের একটা ভীষণ আবেদন আছে। বিয়ের গীতসহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান বিয়ের সামগ্রিক অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে। বাঙালি নারীর কাছে বিয়ের শাড়িতে আলাদা একটা আবেগ জড়িয়ে থাকে। লাল বেনারসি বা কাতান বিয়ের শাড়ি হিসাবে বাঙালি সমাজে। ঐতিহ্যের স্মারক। কিন্তু হাল সময়ে নগর জীবনে বিয়ের গীতের জায়গায় স্থান পেয়েছে হিন্দি গান | আর বিয়ের শাড়ির পরিবর্তে হিন্দুস্থানি ‘লেহেঙ্গা ‘,ছেলেদের হিন্দি আর আরবীয় মিলে এক অদ্ভুত পোশাক – যেগুলি বাঙালি সংস্কৃতির সংগে একেবারে বেমানান।
এবারে শিক্ষা প্রসংগে যাই। শিক্ষার একটি মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবতার গুণাবলি অর্জন করা।
সকলেই সেরকম উদ্দেশ্য নিয়ে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি দেয়। কিন্তু বাঙালি মাত্রই কি লেখাপড়া শেষে মানবিক মানুষ হিসাবে তৈরি হয়? আমাদের কিম্বা আমাদের কাছাকাছি প্রজন্ম পর্যন্ত শিখতো পড়ালেখা করলে বিত্তবান হওয়া যায়। কারণ বাল্যশিক্ষাতেই তাদের পড়ানো হতো ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে।’ সেসংগে পরিচিত হতো যাদবের পাটিগণিত শাস্ত্রের সঙ্গে। যাদবের পাটিগণিত না শিখে মাধ্যমিকের চৌকাঠ ডিঙানো সম্ভব ছিল না। যাদব বাবু পাটিগণিত শিখনের জন্য যেসব অনুশীলনী ব্যবহার করেছেন তা’তে দেখা যায়। যে দুধের সংগে পানি মিশিয়ে কিম্বা ওজনে কম দিয়ে লাভ-ক্ষতির হিসাব শিখানোর প্রয়াস আছে। গণিতজ্ঞ যাদব বাবু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে।
অনুশীলনের জন্য পাটিগণিতের প্রশ্নমালা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন কিনা সে প্রশ্ন তো শিক্ষার্থীদের মনে। আসতেই পারে কিম্বা বিষয়টা তাদের মনে রেখাপাত করতে পারে। শিক্ষিত হবার সাথে সাথে অনৈতিক বিষয়টাও তারা শিখে ফেলে পাটিগণিতের অনুশীলনী চর্চা করে।। সমাজে আমরা অনেক শিক্ষিত মানুষ পাই তাদের সবাই কি সুশিক্ষিত? যাদব মহাশয়দের কারণে, নাকি সমাজ বাস্তবতায় অনেক বাঙালি অনৈতিক বিষয়ে। পারদর্শী হয় তা হয়তো গবেষণার বিষয়। তবে খাদ্যে ভেজাল, ওজনে কম এসব আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের ঘটনা। এতো গেল ব্যবসার ক্ষেত্রে। চাকরি কিম্বা অন্য কোন পেশার ক্ষেত্রে সবাই কি সৎ থাকে। অনেকেই ‘সততা’র নিজস্ব সংজ্ঞা তৈরি করে নেন। দু’টো ঘটনা বলি একজন সরকারি কর্মকর্তা কোন বিষয়ে এক দাপ্তরিক সভায় অংশগ্রহণ করেন। সভাশেষে সম্মানীর টাকা নগদে পাবেন কীনা তা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন। কারণ তার হালাল টাকা দরকার। সভার সম্মানীর টাকা হালাল রুজি। | তিনি হজ্জ করতে যাবেন। টাকা জমা দিতে হবে। তাই হালাল রুজির টাকা সংগ্রহ করে তিনি জমা দিচ্ছেন। তাহলে বিষয়টা এমন দাঁড়ালো যে হজ্জ ছাড়া অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য সেই ব্যক্তির হালাল রুজি না হলেও চলবে। এই যে একজন মানুষের মানসিক বৈপরীত্য – এটি কোন সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে। আর একজন কর্মকর্তা তিনি একটি কাজের জন্য অন্য একটি অফিসে ঘুষ দাবি করেছিলেন(সাধারণত ঘুষ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। খুশি করা বা অন্য তেমন কিছু)। অফিসের বৃহত্তর স্বার্থে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যখন বিষয়টি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছান তখন ঘুষ দাবিদার কর্মকর্তাটি নামাজ পড়ে এসে টাকাটা গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কারণ তিনি মনে করেছেন যে পকেটে ঘুষের টাকা থাকলে নামাজ কবুল হবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কি অন্য সময় ঘুষ গ্রহণ করা জায়েজ হবে? এ ধরনের মানসিকতা সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সমাজে কম নয়। আর কম নয় বলে সমাজে ঘুষ, দূর্নীতির প্রকোপ কমছে না বরং বেড়ে চলেছে। রমজান মাস আসার আগেই শুরু হয়ে যায় সিয়াম সাধনার মাস আসছে বলে প্রচারনা। সিয়াম সাধনা অর্থাৎ সংযম এবং আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে মানুষ আচরণে- ব্যবহারে, খরচে, ভোগে সংযমী হবেন। ব্যবসায়িরাও তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনে হবেন সংযত, সহনশীল। কিন্তু বাস্তবে কি ঘটে আমাদের সবার অভিজ্ঞতা আছে। রমজান মাসে খাবারের যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। গত শতকের শেষদিকে এদেশে ইফতার মাহফিলের নামে অপচয়ের যাত্রা। শুরু হয়। এখন শুরু হয়ে গেছে সেহরি পার্টি। এ যেন সংযম নয় মিতবয়িতা নয় বরং অপচয় করার মাস। ইসলাম ধর্মের কোথায় এধরনের বিষয় নেই। আবার রমজান মাস যেন অনেক ব্যবসায়িদের কাছে নানা ফন্দিফিকির, ধান্ধাবাজি করে পকেট ভারী করার মােক্ষম সময়।
অনেককেই দেখেছি শেয়ার মার্কেটের টাকা হাতিয়ে, ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়ে, ঘুষের টাকায় সম্পদের পাহাড় বানিয়ে, জাল জালিয়াতির মাধম্যে টাকার মালিক হয়ে কিম্বা নানা চল-চাতুরী করে। বিত্তবান হয়ে সাধু সাজবার চেষ্টা করে, ধর্ম পালন শুরু করে এমনকি মসজিদ মাদ্রাসা তৈরি করে কিম্বা| সেগুলিতে সাহায্য সহযোগিতা করে। এমন ভণ্ডামির জন্য তাদের অনুশোচনা তো থাকে না বরং একধরনের আত্মতুষ্টি দেখা যায়। হলুদের সঙ্গে ইটের গুঁড়াে মিশানো ব্যবসায়ীও নামাজের আযান দিলে। হাতের আস্তিন গুটিয়ে জুম্মার নামাজ পড়তে চলে যান মসজিদে। সঙ্গে কর্মচারীকে ভৎর্সনা করেন নামাজে শামিল না হবার কারণে।
এরকমভাবে ধর্ম পালনের বিষয়ে অনেকে আবার ধর্মকে ধর্মের জায়গায় এবং কর্মকে কর্মের জায়গায় রাখার পরামর্শ দেন। প্রতারণার ফাঁদ পাতার কাজে পারঙ্গম এসব ব্যক্তি পাপ-পূণ্যের দাঁড়িপাল্লায় এক ধরনের সমন্বয় করার প্রচেষ্টা চালান। তাদের দেখে দূর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি, ঘুষখোর, অসাধু ব্যবসায়ী যারা, তারা উৎসাহিতবোধ করেন। তারা অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে সমানতালে সমাজসেবা| ধর্মসেবা, নিজ সেবা করেন এবং সমাজে কেউকেটা। হয়ে জীবন যাপন করেন। তাদেরকে দেখে অনেকেই হয়তো উৎসাহিত বোধ করেন। আর একশ্রেণির ব্যক্তি আছেন তারা মুখে দেশপ্রেম, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সততা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসাবে নিজেকে জাহির করেন। কিন্তু গোপনে তারাই আবার বিপরীত| ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তারা মুখোশধারী নিপাট ভদ্রলোক হয়ে সমাজে বিচরন করে।তাদেরকে সাধারণত সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্টানিক কিম্বা রাজনৈতিক সংগঠনে সমবেত হতে দেখা যায়।
আবার কেউ কেউ আছেন, নিজের অন্যায়টাকে কিছু মনে করেন না কিন্তু অন্যেরটা নিয়ে সমালোচনায় মুখর থাকেন। যেমন ধরুন, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে কেনা গাড়িতে চড়ে একজন ব্যক্তি রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ খাওয়া নিয়ে বেশ মুখর। আবার অবৈধ টাকায় আভিজাত্য রক্ষা করা কিম্বা ‘উপরি’। টাকাওয়ালা মেয়ে জামাই খুঁজে পাওয়া বেশ গর্বের অনেকের কাছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবি, ঠিকাদার সব পেশার মানুষের অনেকের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির এ। ধরনের বৈপরীত্য বেশ প্রকট হয়ে উঠছে আমাদের সমাজে। ইদানিং আর একটি বিষয় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা’ হলো ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন একটি গোষ্ঠীর উত্থানের চেষ্টা। ধর্মের নামে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে সমাজে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে অসহরিতা তৈরি করা, মানুষের মানবিক সত্তার বিকাশ রোধে বাঁধার সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে মৌলবাদী কিছু গোষ্ঠী তাদের মতাদর্শে পরিচালিত কিছু মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ মাহফিলসহ তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজে বিস্তার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের উদ্ভবের অন্যতম মৌলিক নীতি আদর্শ হলো – সামাজিক বৈষম্যহীন, অসম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত মানবিক সংবেদনশীল সমাজ গঠন। আমাদের সমাজ কিম্বা রাষ্ট্রীয় জীবনে রীতিনীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাসে যেসমস্ত বৈসাদৃশ্য রয়েছে সেগুলি সংশোধনের জন্য সমাজের সচেতন অংশকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

সালেহা ভাবী প্রতি বছর এই একটা সময়ের অপেক্ষায় থাকে । একান্ত নিজের মতো করে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারে । নিজের অর্জিত পয়সায় । নিজের মতো করে কিছু ভালো কাজ করে তৃপ্ত হয় । এই সময়টার কথা ভাবতেই একটা মোলায়েম স্নিগ্ধ ভালো লাগা মনকে ছুঁয়ে যায় । কাছের মানুষেদের মুখে হাসি আর আনন্দ দেখে বুকটা ভরে যায়।
সেই কোন ছেটবেলায় নিজের অজান্তে যেন একটা সুন্দর গোছানো জীবনের, সংসারের স্বপ্ন দেখেছে সালেহা ভাবী । কার্যত তা যে তার কপালে জুটেনি তা তার জীবন যাপন দেখলেই বোঝা যায় । একটা পরিপাটি পরিবেশে নিজের ভেতরে আলাদা একটা ভালোবাসায়পূর্ণ, পরিচ্ছন্ন মানুষেরছবি লালন করে এসেছে সালেহা ভাবী। অল্পতেই তুষ্ট, অল্পতেই মুখে হাসি, যেকোন অবস্থানের মানুষ হোক না কেন চট করে সবাইকে আপন করে নেবার দক্ষতা তার আছে । কি শশুর বাড়ি কি বাপের বাড়ি কিংবা কর্মস্থল বা বন্ধু মহলে সব জায়গায় সালেহা ভাবী যেন সবার চোখের মনি । না কোনদিন সে কারুর সাথে কোন বৈষয়িক বিষয়ে কোন রকম প্রতিযোগিতা সে করেনি । স্ত্রী জন্য যে আলাদা কোন পয়সা খরচ করতে হয় না বা কোন চাপে থাকে না এব্যাপারে কর্তা শওকত সাহেব বেশ গর্ব করে আত্মিয় পরিজনের সাথে কথা বলে । সঙ্গপ্রিয় মানুষ সালেহা ভাবীর সঙ্গটাই যেন সবাই সবসময় অনুভব করে তৃপ্ত হয় । কিন্তু তার ভেতরে আর এক ক্রন্দসী নারীর বয়ে চলার খোঁজ কেউ রাখে না। এমন কি যার জন্য এই ভিন্ন পরিশেবে যাপন আলোয় পথ চলা সেই লোকটিও না ।
রমজান মাসের ক‘টাদিন তাকে বেশ প্রফুল্ল দেখা যায় । গরীব আত্মীয় স্বজনসহ, কাজের সহকারীদের সবরকমের খোঁজ খবর প্রতিদিনের ইফতার সাহ্রী চিনি সেমাই কাপড় নানানরকম সহযোগিতার চোখ যেন তার থাকতেই হবে। এর ব্যাতয় হলেই মনটা খারাপ হয় । কাউকে কিছু বলতে পারে না একা একা চোখের জল ফেলে । আর বলবেই বা কাকে । ঘরের মানুষটির সাথেই তো তার কোনদিন কোন বিষয়ে মতের মিলে থিতু হতে পারল না। সালেহা ভাবী যদি থাকে পুবে মানুষটি থাকবে পশ্চিমে । এরকম একটি মানুষের সাথে কোনদিন কারুর টু কথাটি হয়নি , শুধু একজনের সাথে মতের মিল করতে পারলো না কোনদিন । এই আফসোস রাতের আধাঁরে সালেহা ভাবীকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় । একই মশারীর নিচে দীর্ঘ ত্রিশ বছর বসবাস করের যেন দু‘জন দুই মেরুর বাসিন্দা ।
সেই ভোর সকাল থেকে রাত বারোটা কর্মস্থলসহ নিত্তনৈমেত্তিক কাজকর্ম সেড়ে তারপর অবসর । একদম একা সবাই যে যার মতো ঘুমিয়ে । সে খেলো কি না । তার শরীর মনের কোন প্রয়োজনে দেখ ভাল করবার মতো কেউ নেই । র্নিঘুম র্নিজন একা একা সালেহা ভাবীর দিনরাত্রির যাপন কথা ,ভালোবাসাহীন সময়ের কল্পকথা মনের অজান্তে মনের অলিন্দে থরে থরে বাসা বাঁধে ।
এমনি এক সালেহাকে কি না আজ এভাবে অপমানের, অসম্মানের তীক্ষ্ণ শব্দশরের আঘাতে জজরিত হতে হলো । সেরকম কিছু না । কিন্তু তারপরেও যেন আজ প্রচন্ড অভিমান হচ্ছে পাশে শুয়ে থাকা লোকটির উপর । সে তো। ইচ্ছা করলে তার সম মর্যাদায় তাকে সংসারে রাখতে পারতো । সংসারে স্বাধীনভাবে চলার অধিকার দিতে পারতো। কিন্তু এই লোকটা কোনদিন চেষ্টাও করেনি এই অভিমানের ডালিতে ভালোবাসার সৌরভ ছড়াতে । যেন শরীর আর শ্রম দেবার জন্য মেয়ে মানুষকে সংসারে আসতে হয় বা আনা হয়।
সন্তান লালন পালন থেকে শুরু করে তাদের মানুষের মতো মানুষ করা , বিয়েশাদি সবটাতেই সালেহা ভাবীর বিচক্ষণতাকে অস্বীকার করলে নিজেকে অকৃতজ্ঞ প্রমান করা হবে। এসবের কি কোন মূল্যায়ন নেই । আর আজ ছোট্ট একটা মেয়ে তাকে অপমান করলো ,যে কিনা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাপড় বিক্রী করে ।
“পড়ে আছেন তো কমদামী কাপড়, আপনি কাপড়ের দাম বুঝবেন কি ।”
মর্জিনার জন্য ঈদের পোষাক কেনার সময় মিথিলার মায়ের এই কথাটা যেন হজম করতে পারছে না সালেহা ভাবী । যেন সারাজীবনে শওকতের দেয়া অবহেলার রশি তাকে আরো টাইট করে বাঁধছে । মধ্যরাতে পাশের মানুষটার নাকের শব্দ আর না পাওয়ার মেঘরোদের ফিসফিসানীর শব্দ একাকার হয় সালেহা ভাবীর মোচড়ানো ভালোবাসার বালিয়াড়ী । আর কতোদিন এমন নিস্তেজ ,নিষ্ঠুর মানুষটার পাশে একা একা বয়ে নিবে রাত্রিদিনের এই জোয়াল । স্নিগ্ধ আকাশের তারার হিসেব মিললেও, এই জোয়ালের কোন হিসেব মেলাতে পারে না সালেহা ভাবী।


একেবারে জেনে শুনে আমি কারো ক্ষতি করিনি। নিজের ক্ষতি মেনে নিয়েছি কিন্তু অন্যের ক্ষতির চিন্তা করিনি কখনও। তবে আমার আচরন যে সবসময় সঠিক হয় তা না। আমার আচরনে অন্যে যে ব্যাথিত হয়েছে এটা আমি নিশ্চিত বলতে পারি। অনেক সময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি। রূষ্ট হয়েছি। কথায় আছে রেগে গেলেনতো হেরে গেলেন। আমার ক্ষেত্রে এমন অনেকই হয়েছে। প্রতিবার হার হয় আমার। তবে আমি এমনি এমনি কখনও রাগিনা। আমার সমস্যা হচ্ছে, বিরাট বড় সমস্যা সেটা হচ্ছে আমার সাথে হোক বা অন্যের সাথে, অন্যায় আর অনিয়ম দেখলেই আমি প্রতিবাদ করি। ক্ষুব্দ হই। প্রতিবাদ করে যে প্রতিকার করতে পারি তা না বরং নিজে ক্ষতিগ্রস্থ হই। প্রতিবাদ বৃথা যায়। পৃথিবীটাই যে একটা অন্যায়ের জায়গা, ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা সেই কথা ভুলে যাই। কিন্তু নিজেকে বদলাতে পারি না। বদলাতে পারলে ভাল হতো। অনেক ক্ষতি আর মনোবেদনার হাত থেকে রক্ষা পেতাম। এ্যাংগার প্রবলেম সম্ভবতঃ মানুষের জীনের মধ্যে থাকে। এই ভুত তাড়ানো কঠিন। কিছু মানুষ আছে খুবই কুল থাকতে পারে। সহজে রাগে না। রাগ হজম করে ফেলে।

আমি রাগলেও পরক্ষনে ভুলে যাই। রাগ পুষে রাখিনা। নিজের ভুল স্বীকার করি এবং সরি বলতেও দ্বিধা করি না। আমি আমার ছেলে মেয়েদের কাছেও অনেকবার সরি বলেছি। সরি সবসময় যে ওয়ার্ক করে এমন না। ভুলের খেসারত দিতে হয়। অনেক সময় কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি সেজন্য কেউ কেউ কষ্ট পেয়েছে। আবার কথা দিয়ে মন পরিবর্তন হয়েছে এমনও ঘটে জীবনে। সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। সব ভালবাসা টিকে থাকেনি। সব সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। এমনই হবে। এমনই হওয়ার কথা। ছোট ছোট স্বার্থ জড়িত থাকে বলেই সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট কেউ ভুল বুঝে দূরে সরে গেলে। কেউ দূরে সরে গেলে তাঁকে ফেরানো যায় না। যে কোনো সম্পর্ক রেসিপ্রোকাল। গিভ এন্ড টেক। একতরফা সম্পর্ক কখনও টিকে থাকে না। শুধু পাওয়ার আশা করা ঠিক না। দেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হবে। চাওয়া পাওয়ার এই পৃথিবী বোধহয় এমনই। আমি মানুষের কাছে খুব বেশি কিছু চাইনি। যতটুকু পেরেছি দিয়েছি, সবসময় সেই চেষ্টা করি। বিনিময় চাইনি কখনও। তবে কেউ ভালবেসে কিছু দিলে নিতে দ্বিধা করিনি। যেখানে কোনো স্বার্থ নাই। দেনা পাওনা নাই। এমন বিরল কিছু মানুষ আছে বলেই পৃথিবীটা সুন্দর।

বেঁচে থাকা তখনই আনন্দের যখন সুস্থ্য একটি জীবন থাকে। যখন সবার সাথে চমৎকার সম্পর্ক রচনা করা যায় তখনই জীবন মধুময়। কিন্তু প্রতিকুল এই পৃথিবীতে, স্বার্থের পৃথিবীতে সেটা সম্ভব হয় না। সুস্থ্যতা জীবনের বড় আর্শীবাদ। সুস্থ্য দেহ এবং সুস্থ্য মন পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু জীবনকে নিজের মতো গড়া যায় না। অপ্রত্যাশিত নানা জটিলতা জীবনকে অসুখী করে দেয়, ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়। কোথায় যে সুখ তা বোঝা যায় না সহজে। কার কাছে সুখ লুকানো আছে জানা কঠিন। জানতে পারলে ভাল হতো। এই যে এতো সুন্দর আর সুশৃংঙ্খল একটা দেশে থাকি তারপরও মনে হয় এখানে আমি মানানসই নই। বিদেশের উপযোগী নই আমি। নিজের জন্মস্থানই আসল জায়গা। যেখানে মা বাবার কবর সেখানেই প্রকৃত সুখ। মানুষ সোনার হরিণের পিছনে ছুটে বেড়ায়। সুখ আর স্বাচ্ছন্দ খোঁজে। আমিও তাই। কিন্তু সুখ সহজে ধরা দেয় না। এদেশে সব আছে, স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, নাগরিক উপভোগ কিন্তু তারপরও মনে হয় কি যেনো নেই, কি যেনো থাকার কথা ছিল। নিজের জন্মভূমি ছেড়ে আসার একটা শোধ আছে। প্রকৃতির শোধ। সবার কাছে সেটা বোধগম্য না হলেও আমি ঠিক টের পাই। মনে হয় আমি যেনো কেউ না। অতিথি মাত্র। মনে হয় কোথাও কেউ নেই।

স্বর বিকাশের শর নিয়ে ভিন্নমাত্রার লেখায় এই “তারুণ্যের পদাবলী” প্রকাশিত হয়েছে মার্চ ২০২২ খ্রিস্টাব্দে।
রংপুর শহরে গোষ্ঠীভিত্তিক এমন সাহিত্য প্রকাশনায় কেউ কেউ নতুনভাবে আবির্ভূত হন।এর প্রথম কয়েকটি সংখ্যায় অনলাইন ভিত্তিক লেখাগুলো আশা জাগানিয়া।
বাংলাসাহিত্যের গতিপথে শতবছরের পরিচর্যা লালনপালন সবই চলেছে নানা স্বাদে। তা থেকে গত কয়েক শতকে মহিমান্বিত হয়েছে বাংলা সাহিত্য।বিশ্ব-সাহিত্যের দরবারে মাইকেল মধুসূদন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ , কাজী নজরুল, প্রমুখ’সহ বেশ ক’জন যেভাবে পরিচিতি পেয়েছেন নানা কারনে তাঁদের সেই তালিকা খুব দীর্ঘ নয়।
তবুও বাংলাসাহিত্য ভান্ডারে গুণী লেখকের অবস্থানে আজ পর্যন্ত যারা পরিগনিত তাদের তালিকা অনেক দীর্ঘ এবং নিশ্চই বাংলাভাষী বাঙালির কাছে তা অহংকারের,গর্বের।
রংপুর শহরের সাহিত্যকর্ম চর্চ্চায় কেউ কেউ সারাদেশে সমাদৃত হয়েছেন,নানা কারনে সে তালিকা বেশ ছোট।
“তারুন্যের পদাবলী” নিয়ে একজন পাঠকের অভিমত, ও এই আলোচনায় ওপরের প্রসঙ্গ এখানে প্রযোজ্য কিনা তা নিয়ে দ্বিধা থাকতেও পারে কারও কারও!
“তারুন্যের পদাবলী” নিশ্চই একটি চমৎকার প্রকাশনা, বাংলাসাহিত্য চর্চায় অনবদ্য সংযোজন।
সুন্দর প্রচ্ছদ, নানামাত্রিক লেখায় পরিপাটি করে সাজানো ৮০ পৃষ্ঠার এই লিটল ম্যাগ কালের পরিক্রমায় শুভবার্তা বয়ে আনতে পেরেছে,মনে হয় ভবিষ্যতেও পারবে।যদিও সে পথ খুব সহজ নয় আবার কুসুমাস্তীর্ণও নয়।
এই সংখ্যায় নানাবয়সী লেখকের কলমে উৎসারিত “তারুন্যের পদাবলী”তে স্থান নিয়েছে
•ইতিহাস(স্থাপত্য)ঐতিহ্য আশ্রয়ী প্রবন্ধ ৫ টি,
•কবিতা(দুটি অধ্যায়ে)-প্রথম ও দ্বিতীয়গুচ্ছ-৯+৯ টি
•স্মৃতি গদ্য ৪ টি,
•মুক্তিযুদ্ধ, সাক্ষাৎকার, মুক্তগদ্য ১ টি করে।
•আলোকচিত্র ১৬ টি।
সম্পাদকীয় পাতার পর, নানামাত্রিক লেখায় শহরের সাংস্কৃতিক এলাকা- ঐতিহাসিক ” রংপুর টাউন হল চত্বর” কে উপজীব্য করা হয়েছে এই বিশেষ সংখ্যায় ।তা নিয়ে লেখকেগণ তাঁদের বিষয়ের প্রতি বেশ মনোযোগী ছিলেন।
কবিতা,গল্প, প্রবন্ধ,স্মৃতিকথায় – মহান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, এই এলাকার বধ্যভূমি, শহীদ মিনার,প্রাচীন প্রতিষ্ঠান পাবলিক লাইব্রেরি (১৮৫৪),রংপুর টাউন হল(বর্তমান ভবন ১৮৯১),রংপুর সাহিত্য পরিষৎ (১৯০৫),রংপুর জাদুঘর, গণগ্রন্থাগার, সাহিত্যমঞ্চ নিয়ে তথ্যবহুল বর্ননা সবগুলোই অনেক মুল্যবান সংযোজন। কোন কোন প্রসঙ্গ দু’য়েকটি লেখায় প্রয়োজনতায় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে,তাকে পরিহার করা যায় নি।
দুই গুচ্ছে কবিতার প্রথমগুচ্ছের কবিগণ সমসাময়িক উত্তর আধুনিক প্রথা বা ধারায় লিখেছেন।
বিংশ শতকের শেষ দশক থেকে হাল আমলেও কবিতায় জীবনানন্দ দাশের পরে ভিন্ন ভংগিমায় উত্তর আধুনিক ধারায় (বাংলা কবিতায়) নতুন বাঁক নেয়ার প্রচেষ্টা চলছে। তবে এই ধারার কবিতা সাধারণ মানুষের কাছে কতটুকু গ্রহনীয় বা জনপ্রিয়তা পেয়েছে তা এখনও বলার সময় হয়নি বলে মনে হয়।
দ্বিতীয় গুচ্ছের কয়েকটি কবিতা বেশ ভালোমানের বলে মনে হয়াছে।
১৯৭১ এর বিজয় অর্জনের দু’একদিন পরে স্বচোক্ষে দেখা স্মৃতিকথা – বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন’এর লেখাটি রংপুর শহরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মৃতি ও মুল্যবান ইতিহাস,যা ইতোপূর্বে আর কেউ এভাবে বর্ননা করেন নাই(এই লেখাটি আগেও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, হতেই পারে,এর আরও বিস্তৃত প্রকাশ দরকার)।
ইতিহাস ভিত্তিক অন্যান্য লেখাগুলো বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হলেও,” তারুন্যের পদাবলী’তে ” প্রকাশ প্রাসঙ্গিক এবং মুল্যবান সংযোজন, যা একি মলাটের ভেতর সন্নিবেশিত হতে পারায় এই লিটল ম্যগ’টিকে চিরস্থায়ীত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবে। সম্পাদনা পরিষদকে ধন্যবাদ সাধুবাদ জানাই। দু’এক জায়গায় মুদ্রণ প্রবাদ,বানানভ্রম এড়ানো যায় নাই। পত্রিকায় কোন লেখকের কোন কোন বাক্য – প্রযোজ্য বা প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় প্রকাশযোগ্য কিনা সে বিষয়ে সম্পাদনা পরিষদ কে আরও সতর্ক হতে হবে।
বই পড়ুন, বই কিনুন, প্রিয়জনকে বই উপহার দিন।

(১ম অংশ)
জেলা গভর্নরগণ,
দেখুন– আমি হঠাৎ করে কোনোকিছু বলছি না;
বারবার আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি।
আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে,
এবং আমার দেশবাসীর অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে,
ইংরেজরা যে-শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল,
তা তারা শোষণ করবার জন্যেই কায়েম করেছিল।
পাকিস্তানে চলেছে সেই ট্রেইনিং,
সেই একই সিস্টেম–
বাঙালি জাতিকে শোষণ করার সিস্টেম।
আজ আমরা স্বাধীনতা এনেছি।
আপনারা স্বাধীনতা এনেছেন।
আজ বাংলাদেশ স্বাধীন।
এখন আমরা স্বাধীন সার্বভৌম সরকার পরিচালনা করছি।
আজ আমরা ইংরেজদের মতো শাসক হয়ে থাকবো না।
আমরা পাকিস্তানিদের মতো শাসক হয়ে থাকবো না।
আমরা এদেশের মানুষের সেবক হয়ে থাকবো;
জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করে থাকবো।
আপনারা যারা প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন,
তারা অনেকেই ১৯৭১ সালে,
জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন।
আপনারা ইংরেজ আমল বা পাকিস্তানি আমলের
মানসিকতার মহাবৃত্তান্ত ভেঙে ফেলেছেন।
নবজীবনের উদ্বোধন করতে চেয়েছেন;
নতুন চেতনার রূপায়ণ করতে চেয়েছেন।
সেই প্রেক্ষাপটে আমার আজকের চিন্তাধারা;
সেই প্রেক্ষাপটে আজকে আপনাদের চিন্তাধারা।
আমি চাই আমূল পরিবর্তন;
আপনারাও চান আমূল পরিবর্তন।
আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন:
এমন কেউ কি আছেন যিনি জনগণের মালিক হবেন;
আর তার গ্রাম থেকে আসা ছোট ভাইটি অথবা
লুঙ্গি-পরা চাচাটি গোলাম হবে?
দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে–
মালিক-গোলাম সম্পর্ক চিরকাল চলতেই থাকবে?
এজন্যই কি আমার বাঙালি জাতি
ত্রিশ লক্ষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে?
এমন কেউ কি আছেন যিনি জনগণের মুক্তি চান না,
যিনি চান যে বাংলার কৃষক-শ্রমিক ভাইয়েরা
চিরকাল শুধু খেটেই মরবে– সুবিধা পাবে না?
এমন কেউ কি আছেন যিনি গ্রাম-বাংলার
দুখিনী মায়ের মুক্তিযোদ্ধা সন্তানটির
বেদনাদায়ক নির্মম আত্মত্যাগের
কোনো মূল্য দেবেন না?
এজন্যই কি আমার বাঙালি ত্রিশ লক্ষ প্রাণ
বিসর্জন দিয়েছে?
ভাইসব,
আমি বিশ্বাস করি যে আপনারা প্রত্যেকেই
স্বাধীনতার অর্থ উপলব্ধি করেন;
আমি বিশ্বাস করি যে আপনারা প্রত্যেকেই
সার্বভৌম দেশের মানসিকতা পোষণ করেন।
আজ একষট্টি জেলার একষট্টি জন জেলা গভর্নর
মনোনীত হচ্ছেন, এর মানে এই যে,
বাংলাদেশের একষট্টি জেলার মানুষ আজ
জেলা গভর্নরদের হাত ধরে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হচ্ছেন।
আমি একটি নতুন পদ্ধতিতে যাচ্ছি;
প্রশাসনে নতুন মাত্রা যোগ করতে চাচ্ছি।
আপনারা দায়িত্ব নিলে সবই বুঝতে পারবেন।
বাংলাদেশে এককভাবে ক্ষমতাধর আর কেউ থাকবে না।
কোনো মানুষ আর কোনো মানুষকে ‘প্রভু’ বলবে না।
Sir বলবেন না।
এই দেশে আর শোষণ বঞ্চনা থাকবে না;
এই দেশে আর কখনো কর্তাগিরি থাকবে না।
আপনাদের সঙ্গে থাকবেন ম্যাজিস্ট্রেট;
থাকবেন জয়েন্ট এসপি;
থাকবেন রাজনৈতিক কর্মী।
আপনাদের কাউন্সিল হবে,
কাউন্সিলকে কনফিডেন্সে নিতে হবে;
আলোচনার মাধ্যমে একসাথে কাজ করতে হবে।
(২য় অংশ)
আপনারা পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আমার সঙ্গে কাজ করেছেন;
বিট্রে করেন নাই;বেঈমানী করেন নাই।
আপনারা বাড়িঘর সংসার ছেড়ে দিয়েছিলেন,
সবধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
কেন করেছিলেন?
এদেশের গরিব-দুখিদের জন্য করেছিলেন।
যাতে একটা শোষণমুক্ত সমাজ করতে পারেন,
যাতে বাংলার মানুষ সুখী হয়–
বাংলার মানুষ অত্যাচার-অবিচার থেকে বাঁচতে পারে।
গভর্নরগণ,
আপনারা এইমুহূর্তে অস্বস্তিবোধ করছেন কি?
এই সমাবেশে আপনারা কি অস্বস্তিবোধ করছেন?
আপনারা আমার কথাগুলিকে কি অভিনব ভাবছেন?
ভাবলে ভাবুন, তবে সামলে নিতে শিখুন;
মিলিয়ে নিতে শিখুন।
বাঙালির ত্যাগ তিতিক্ষার কথাটাও একবার
চিন্তা করে দেখবেন।
বিদেশিদের শাসন-রীতি এদেশের জন্য নয়;
শোষণ করার শাসনযন্ত্র কখখনও নয়;
আমার বাংলা এখন স্বাধীন দেশ; মুক্ত ভূমি।
(৩য় অংশ)
গভর্নরগণ শুনে রাখুন–
আপনার জায়গার মানুষ আপনাকে ভালোবাসে কি না,
আমি দেখবো সেটাই।
নিজ জেলার মানুষের জন্য আপনি ভালো কাজ
করেছেন কি না, আমি দেখবো সেটাই।
আপনি ভালো কাজ করেছেন, না কি
নেপোটিজম করেছেন;
আপনি ভালো কাজ করেছেন না কি
করাপশন করেছেন– আমি দেখবো সেটাই।
আপনি মানুষের পাশে গিয়ে
মানুষের সমান হয়েছেন কি না, আমি দেখবো সেটাই।
আজকের গভর্নরগণ কোনো একটি মানদণ্ডে
আগে সিনিয়র ছিলেন না কি জুনিয়র ছিলেন,
এটা বড় কথা নয়।
আমি দেখেশুনে গভর্নর করেছি;
আপনারা পূর্ণ রেসপন্সিবিলিটি নিচ্ছেন।
যে জেলায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্য থেকে
গভর্নর হয়েছেন,
তারা সেখানে মিটিং প্রিসাইডও করবেন।
পার্লামেন্ট মেম্বার সেখানে মিটিং-এ বসে থাকবেন।
তাহলে দেখুন, আপনাদের পজিশন কোথায় উঠে গেল!
একবার ভেবে দেখুন, দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন।
আর্মি থেকেও গভর্নর করেছি আমি।
তিনি খুলনার জেলা গভর্নর।
এখন থেকে কেউ আর সরকারি কর্মচারী নন;
কেউ আর সরাসরি কর্মকর্তা নন;
আপনারা প্রত্যেকেই দলীয় কর্মী;
দেশের মানুষ দেশের কর্মী;
শেখ মুজিবের দলের সদস্য।
(৪ র্থ অংশ)
আমি বাংলার মাটি থেকে শত বছরের জঞ্জাল
উপড়ে ফেলতে চাই;
শত বছরের কলংক মুছে ফেলতে চাই;
শত বছরের বদ্ধমূল ধারণা ধুয়ে ফেলতে চাই।
প্রত্যেক বাঙালিই এখন মুক্ত স্বাধীন মানুষ;
প্রত্যেক বাঙালিই এখন থেকে যোগ্যতাবলে
নিজ নিজ জেলার গভর্নর।
কে প্রশাসক হবেন? কে গভর্নর হবেন?
যিনি ভালো কাজ করবেন তিনিই
আগামী দিনের গভর্নর হবেন।
আর কোনো কথা নাই। কোনো পিছুহটা নাই।
এটাই মুক্তির পথ।
এটা একটা নতুন সিস্টেম, এর মানে,
এটা অতীতের কোনো পুরনো সিস্টেম নয়।
আমি জানি, নতুন সিস্টেমে ভয়ের সঞ্চার হয়!
কিন্তু, যে বাঙালি জাতি স্বাধীন, তার কিসের ভয়?
বন্ধুরা আমার,
আজ আপনাদের ভয় কিসের?
আজ আপনাদের দোদুল্যমানতা কিসের?
আমরা রক্ত দিয়েছি। রক্ত দিয়ে দেশকে
শত্রুমুক্ত করেছি।
আমরা আমাদের জাতিকে
শোষণমুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ।
কেউ আমাদের থামিয়ে রাখতে পারবে না।
কেউ আমাদের পথের বাধা হবে না!
( ৫ ম অংশ)
নতুনের পথে আজ নব আবাহন।
প্রত্যেক বাঙালি আজ প্রত্যেক বাঙালিকে
উদ্বুদ্ধ করুন, মোবিলাইজ করুন, খাপ খাইয়ে নিন।
এগিয়ে চলুন। আর কোনো পিছুটান নয়;
কোনো পিছুহটা নয়;
এখন শুধু এগিয়ে চলা। এখন,
প্রত্যেক বাঙালির বুক ফুলিয়ে হেঁটে চলা।
এখন,
প্রত্যেক বাঙালির সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার পালা।
আমরা এ দেশকে বিশ্বের বুকে
মুক্তির মডেল হিসেবে গড়ে তুলবো;
আমরা বাঙালি জাতি শির উঁচু করে চলবো।
( ৬ষ্ঠ অংশ)
বিচার ব্যবস্থা বদলে ফেলা দরকার।
বিচারের নামে সময়ক্ষেপণ করা চলবে না!
বিচারের নামে অবিচার আর চলবে না!
সোজাসুজি বিচার হয়ে যাবে;
সোজাসুজি বিচার হয়ে যাক্।
বুঝতে পারছেন?
আইনের ফাঁকফোকড় গলিয়ে নয়, সোজাসুজি,
এবং তাড়াতাড়ি।
উকিল সাহেব নিজে মামলা শেষ করতে পারেন নাই;
তার পুরনো কেইস– ব্রিফকেইসটা
জামাইয়ের হাতে দিয়ে চলে গেছেন!
বাংলার দুখি মানুষ কোনদিন বিচার পায় নাই।
আমি জীবনভর জেল খেটেছি,
কয়েদিদের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছি।
আমি জানি, তাদের কী দুঃখ কী কষ্ট।
আমি বিচার ব্যবস্থাকে থানা লেভেলে নিয়ে যেতে চাই;
দ্রুতবিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাই।
আমি আপনাদেরকে জেলার বাদশা করে দিচ্ছি।
অফ কোরস্, ইউ আর নট বাদশা!
আপনারা খাদেম। জনগণের খাদেম।
যোগ্যতাবলে যিনি নিজেকে অধিকতর
চৌকস প্রমাণ করবেন,
আগামীতে তিনিই হবেন এই খাদেম।
আপনারা সবাই মিলেমিশে কাজ করবেন।
(৭ ম অংশ)
একটা কথা আমি আজ আপনাদের বলে দেবার চাই:
থানায় এসে মানুষ যেন বসতে পারে।
আমি বাংলার মানুষকে ভালোবাসি;
বাংলার মানুষ যেন আপনাদের ভালোবাসা পায়।
থানার লোককে যেন পয়সা দিতে না-হয়!
সিও অফিসে যেন পয়সা দিতে না হয়!
জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করে যান;
ঘুরে বেড়ান।
আপনারা নৌকায় ঘুরুন, গাড়ি নিয়ে ঘুরুন,
মানুষ যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারে।
চুরি-ডাকাতি-ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে;
অন্ধকার কুসংস্কার দূর করতে হবে;
সকল কাজে স্বচ্ছতা সৃষ্টি করতে হবে।
( ৮ম অংশ)
জনগণকে মোবিলাইজ করুন।
পাম্প পাইনি, পানি কোথায় পাবো–
এসব কথা বলবেন না।
এটা পেলাম না সেটা পেলাম না — বললে চলবে না।
পাম্প পাওয়া গেলে ভালো; না পাওয়া গেলে
স্বনির্ভর হউন।
বাঁধ বেঁধে পানি আটকান;
সেই পানি দিয়ে ফসল ফলান।
দরকার হলে কুয়া কাটুন, পানি আনুন।
আমার সোনার বাংলায় পানির অভাব নাই।
পাঁচ-সাত হাত কুয়া কাটলেই পানি উঠে আসে;
সেখানে কী অসুবিধা আছে?
সেখানে ফসল ফলাতে ভাবনার কী আছে?
আমি প্রত্যেক গ্রামে কোঅপারেটিভ করতে চাই।
এটা সোজাসুজি বাংলা কোঅপারেটিভ;
স্পেশ্যাল কোঅপারেটিভ।
সাফ কথা বলে দিলাম: আপনারা সবাই এক।
সবাই আপন। কেউ কারো পর নন।
আমরা সবাই আপন।
বাংলার দুখি মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্যে
আমার যে আকাঙ্ক্ষা,
এটা সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।
আমার সেই আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে
বাঙালি জাতি বেঁচে থাকবে।
জয় বাংলা।

মানুষ জীবনে যা ভালোবাসবে মনেপ্রাণে সেটিই বোধকরি সৃষ্টিকর্তা অকাতরে ঢেলে দেবেন তার জন্য। পথের পাঁচালীর অপু-দুর্গার মতো ট্রেন দেখার সাধ এই জীবনের মধ্যবেলায় এসেও মেটেনি। আর তাইতো প্রতিমাসেই ট্রেনে চড়তে হচ্ছে জীবনের প্রয়োজনেই। দেখা হচ্ছে প্রতিনিয়তই রেলপথ, রেলগাড়ি এবং রেলযাত্রা।
ট্রেনযাত্রা নিয়ে লিখেছি অনেক। তবে একটি ঘটনার কথা অনেকদিন পর আবার মনে পড়লো।
বছর পাঁচেক আগের কথা। খোলাহাটি থেকে সপরিবারে রংপুর আসছি ট্রেনে। ওই রাতেই রংপুর এক্সপ্রেসে ঢাকা ফিরে যাব। লোকাল ট্রেন ছিল। ট্রেনটি যাবে রংপুরের পর কাউনিয়া হয়ে সম্ভবত সান্তাহার। দুপুরের পর পর বেরিয়ে পড়লাম ট্রেন ধরতে। লাল ব্যাগটি রাখলাম বাংকারের ওপর। গল্প করতে করতে যাচ্ছি। সাধারণত এমন হয় না। সেদিন কী কারণে যেন লাল ব্যাগটি ট্রেনে রেখেই নেমে গেলাম। একটি বারের জন্য মনে পড়েনি ব্যাগটার কথা। শাপলা হলের কাছের একটা হোটেলে চা পান করছিলাম জাকিরের (জাকির আহমদ) সাথে। পরিবারের অন্যান্য সবাই আছেন। হঠাৎ কার যেন লাল ব্যাগ দেখে মনে হলো আরে আমার ব্যাগ! সাথে সাথে জাকিরের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে রংপুর রেলওয়ে স্টেশনে দে ছুট। খবর নিয়ে জানলাম ট্রেন তখন সবেমাত্র মীরবাগ অতিক্রম করেছে। জাকিরকে বললাম কী করা যায়! কিছু পর কাউনিয়া স্টেশন। কাউনিয়ায় চাকরি করেন সাথী আপা (এসএস সাথী বেগম)। তিনি সাহায্য করতে পারবেন। জানালেন, আমি ব্যবস্থা করছি দেখি কাউকে পাওয়া যায় কিনা। এসব যখন ভাবছি ততক্ষণে ঝড়ের বেগে মোটরসাইকেলে পৌঁছে গেছি কাউনিয়াতে। ট্রেনটি মিনিট পাঁচেক আগে চলে গেছে কাউনিয়া স্টেশন ছেড়ে। সাথী আপার সাথে যোগাযোগ চলছে। ট্রেন যাচ্ছে আমার ব্যাগ নিয়ে। বামনডাঙ্গা স্টেশন পেরিয়ে পীরগাছা। সেখানকার এক স্থানীয় সাংবাদিকের সাথে সাথী আপার মাধ্যমে যোগাযোগের পর উদ্ধার করা হলো আমার ব্যাগ। এখন কি ব্যাগ নিতে ফিরে যাব পীরগাছা নাকি রংপুর। আর অল্প কিছুক্ষণ পর রংপুর এক্সপ্রেস আসবে। সিদ্ধান্ত নিলাম রংপুর ফিরে যাবার। সেই সাংবাদিকের বাবার ফটোকপির একটা দোকান আছে। আমাকে জানালেন ব্যাগ উদ্ধার হয়েছে। আপনি অমুক বগির অমুক দরজায় থাকবেন। ট্রেন ঠিক আমার দোকান বরাবর এসে থামবে। ঠিক তাই হলো। ব্যাগ পেলাম পীরগাছাতেই। ব্যাগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না থাকলেও ওই সময়ের জন্য গুরুত্ব ছিল আমার কাছে। আজ এ লেখার মাধ্যমে ধন্যবাদ দিতে চাই সাথী আপাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে। জীবনে কত কিছু ঘটে যায় আমাদের, তবে মাঝে মাঝে কিছু ভালো মানুষের সহযোগিতায় আমরা কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হই,আমরা হয়ে পড়ি তাদের কাছে চরম ঋণী।

মোর হাতকোনা ছাড়েন বাহে, ধুনুকের মত একটু দেহ বাঁকা করে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে মেয়েটি । কিন্তু কোন কাজ হয় না।
বাঘের থাবার মত ধরেছে বটে একখানি নরম হাত।
নেও ঠেলা। দুইদিন- দুই আইত ক্ষ্যাপ মারি আলছো। এলা এই ক্ষ্যাপ কোনা মোর নাগবে। ট্রাক চালক এই বলে মেয়েটির সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে । মেয়েটি নিজেকে মুক্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
ওমন তাও দেখাইস কেনে ?
ট্রাক চালক আবারো মেয়েটিকে নিবিড় বেষ্টনির মধ্যে রাখতে চেষ্টা করে। মেয়েটি ক্রমাগত যুদ্ধ করছে।
ট্রাক চালক দর কষে, হইছে আর অং করিস না। কয় ট্যাকা দেয়া নাগবে কও ?
মেয়েটি শুকনো গলায় প্রতিবাদ করে –
কি কওছেন তোমরা ? তোমরা মোক ছাড়ি দেও ।
মধ্য আকাশে তখন একখন্ড মেঘ চাঁদের আলো গ্রাসে ব্যাস্ত।
মেয়েটি মহীপুর ব্রিজের ধার ঘেঁসে দাঁড়িয়েছে মাত্র। সমস্ত গ্লানি পংকিলতা মুছে দিতে নদি ওকে ডাকছে।
একটা নতুন স্বপ্নের হাতছানিতে , নতুন স্ব্বপ্নজাল বুনতে বুনতে বিভোর হয়ে প্রেমিক চিলের হাত ধরে বাড়ি ছেড়েছিল সে। তারপর সঙ্গীর সাথে নদির ধার ধরে বেড়িয়েছিল ।
কতক্ষণ বেড়িয়েছে মনে নেই। মেয়েটির যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন ব্রিজের পাশে একটা
ঝোপের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করলো। তখনও আলো ছিল, পৃথিবীর সে আলোয় কষ্ট হচ্ছিল খুব। কষ্টে, ক্ষোভে আলোর দিকে তাকাতে পারছিল না। নিজেকে আড়াল করে রাখলো রাত গভীর হওয়া অবধি তারপর ক্লান্ত শরীর টেনে টেনে উঠে আসে, আন্দাজ করতে পারে না,
ঠিক কটা বাজে। অবিশ্বাস আর ঘৃণা, সপ্তদশীর বুকের ভিতর আগুনের কুণ্ডলি পাকিয়েছে, কুরে কুরে খাচ্ছে ওকে । নদির ডাক শুনতে পাচ্ছে । নদি ডাকছে –
ওর বিপরীতে একটা লোমশ হাত ওকে টানছে নিজস্ব খোঁয়াড়ে ।


বঙ্গভবনে বেলা ১ টার সময় ভীড় একটু কমই থাকে। ১৯৮২ সাল জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায়। ক্ষমতা দখলের মাত্র সাতদিন। এই সাত দিনের মাথায় ডাক পেয়ে একটু হতভম্ব ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গেটে গাড়ি চেক করে যখন ভিতরে ঢুকলো তখন মোটামুটি শুনশান চারিদিক। যারা আছে তারা নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জেনারেল এরশাদ বসে আছেন গদিমোড়া কালো রিভলভিং চেয়ারে। চোখে সানগ্লাস, হালকা খয়েরি রংয়ের প্রিন্সকোট।
বসুন ডাক্তার সাহেব বলে স্মিত হাসি দিলেন এরশাদ।
জাফরুল্লাহ বসলেন টেবিলের ওপারে। জেনারেলের চোখ দেখা যাচ্ছে না। অস্বস্তি লাগছে। ঘর হীমশীতল,এসির তাপমাত্রা মনে হয় আঠারোর নীচে। মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহর অস্বস্তি বোধটা বাড়লো। সময়টা ভালো না। দেশে সামরিক শাসন। একটা গুমোট পরিবেশ।
সরাসরি কাজের কথা বলি ডাক্তার সাহেব, আপনি আমাকে একটা ঔষধনীতি করে দেন,বলে টেবিলে দুহাত রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন এরশাদ।
বিষয়টা এখন পরিষ্কার হলো। ঔষধনীতি করার জন্যই তবে ডেকেছে জেনারেল।
আমি কেন করবো বলে সরাসরি এরশাদের কালো চশমার দিকে তাকালো জাফরুল্লাহ।
এরশাদ হাসিমুখে বললেন,কারণ আপনি কমিউনিস্ট আর কমিউনিস্টরা দেশ ও দশের সেবা করে নিঃস্বার্থ ভাবে। তারচেয়েও বড় কথা দেশে আপনি ছাড়া এ কাজ করার মতো কোন লোক নাই।

জাফরুল্লাহ হেলান দিয়ে বললেন,একসময় তা ছিলাম বটে এখন তা নই কারণ আমি আরাম আয়েশ করতে ভালবাসি আপনি বরং আমাকে সোসালিষ্ট বলতে পারেন। আমি একাজ করতে পারবো না।
জেনারেল এরশাদ হতাশ কন্ঠে বললেন আপনারা শুধু মুখেই দেশদেশ করেন। দেশের জন্য কিছু করতে চান না। আপনি কি দুপুরের খাবার খেয়ে এসেছেন? না খেয়ে আসলে আমার সাথে খেতে পারেন। আজকের মেনু ভাত, ডাল,করলাভাজি আর ছোটমাছ।
না আমি আমার বাসায় গিয়ে খাবো বলে উঠে দাঁড়ালো জাফরুল্লাহ।
Ok doctor. Thanks for coming and i wish you change your mind. ঔষধনীতিটা করে দেন ডক্টর, ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে।
এর কিছুদিন পর—
৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে কাজ শুরু হয়। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক প্রফেসর নুরুল ইসলাম। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল শামসুল হক,ডা.আজিজুর রহমান,চোখের চিকিৎসক প্রফেসর মোবারক আলী প্রমুখ।


২৬ এপ্রিল ১৯৮২। বাংলাদেশ ঔষধনীতি কমিটির প্রথম মিটিং। সভা শুরু হলো প্রফেসর নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। উপস্থিত অন্য সাতজন মাননীয় সদস্য। শুরুতেই প্রফেসর এম কিউ কে তালুকদার কে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলেন সভাপতি মহোদয়। তালুকদার সাহেব তার মতো করেই বলা শুরু করলেন,এই কমিটিতে আমরা বহুজাতিক ওষুধ কম্পানির কাউকে রাখিনি এতে সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে কিন্তু আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই,তারা ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে কিছু চায় না। তারা শোষণ করছে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের। এদের কারণেই দেশে কোন ওষুধ কম্পানী দাঁড়াতে পারছে না। আপনারা জানেন অনেকেই সমালোচনা করতেছেন যে আমরা বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের কাউকেই এ কমিটিতে রাখি নাই বলে। এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই বিএমএ এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ফিরোজা বেগম বহুজাতিক কম্পানী ফাইজারের ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের একজন ডাইরেক্টর এবং জেনারেল সেক্রেটারি ডা.সারোয়ার আলী সেই কম্পানীরই সহকারী মেডিকেল ডাইরেক্টর। কমেটির অন্য ছয়জন সদস্যই বিএমএর সাধারণ সদস্য। এনাদের আমরা শ্রদ্ধা করি তবে দেশের স্বার্থে কমিটিতে ওনাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা গেল না। একে একে সবাই তাদের মতামত প্রকাশ করেন। সভাপতি প্রফেসর নুরুল ইসলাম শেষ বক্তব্যে বলেন,আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিব এবং সিদ্ধান্ত যুক্তি নির্ভর হতে হবে। খসড়া তৈরীতে গোপনীয়তা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বসে আছেন ফার্মাকোলজিস্ট ও পরিচালক ওষুধ প্রশাসন ডা.নুরুল আনোয়ারের রুমে। এ রুমটা একদম বদ্ধ। মেরুণ কালারের ভারী পর্দা দিয়ে জানলা দরজা বন্ধ। বিড়বিড় শব্দ করে এসি চলছে। দুজনের মুখ গম্ভীর। বাজারে নিবন্ধিত প্রচলিত ৪১৭০ টি ওষুধের পরীক্ষার রিপোর্ট ডা.জাফরুল্লাহের হাতে। উনি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলেন,এতোগুলো ওষুধ মাত্র ১৫০টি উপাদানে তৈরী এবং ১৭০৭ টিই অপ্রয়োজনীয়!
ডা. নুরুল আনোয়ার চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বললো,এবং একটা জিনিস খেয়াল করেছেন,বেশীরভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং উন্নত বিশ্বে ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ।
আপনার কি মনে হয় না এসব নিষিদ্ধ ঘোষণা করা দরকার? বলে সরাসরি নুরুল আনোয়ারের মুখের দিকে তাকালেন ডা.জাফরুল্লাহ।
বিষয়টা এতো সহজ না। আমরা ভীমরুলের চাকে হাত দিয়েছি এবং চিকিৎসক সমাজের অনেকেই আমাদের সাথে নাই বলে টেবিলের উপর রাখা ফুলদানির দিকে তাকাল নুরুল আনোয়ার।
হু,কিন্তু যেহেতু এরশাদ সাহেবের সম্মতি আছে আমি আশাবাদী বলে উঠে দাঁড়ালেন জাফরুল্লাহ।


নির্জন জলের রং
৬৩,সেন্ট্রাল রোডের গুলমেহের নামক বাড়ির সামনে সবসময়ই কয়েকটা রিকশাওয়ালা রিকশা নিয়ে বসে থাকে। তাদের কোথাও যাবার চেয়ে বসে থাকাতেই আনন্দ। সকালে ঘুম থেকে উঠে দোতলার বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটা প্রফেসর নুরুল ইসলামের অনেকদিনের অভ্যাস। নুরুল ইসলাম এ সময় মজা নিয়ে তাদের অলসতা উপভোগ করেন। স্ত্রী আনোয়ারা রান্না ঘরে। চা নাস্তার তদারকিতে ব্যস্ত।
বড়মেয়ে দীনা বারান্দায় এসে বললো,বাবা আজকের পত্রিকাটা দেখেছ? তোমাকে তো ধুয়ে দিছে।
হু, দেখেছি মা, বলে রেলিং এ ঝোলানো মানি প্লান্টের দিকে চেয়ে থাকেন নুরুল ইসলাম।
তুমি প্রতিবাদ করবা না?
নাহ্,করবো না বলে একটা মরা পাতা তুলে ফেললেন নুরুল ইসলাম।
কেন বাবা? তোমার কি দূর্বলতা আছে?
শোন মা,১৯৭৩ সালে প্রথম বঙ্গবন্ধু কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং আট হাজার রেজিস্ট্রিকৃত ওষুধের মধ্যে চার হাজারই অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় বাতিল করা হয়েছিল।
তারপর, বলে দীনা বাবার কাছ ঘেষে আসে।
যাদের ওষুধ বাতিল হলো তারা ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো,চেষ্টা তদবির করেও যখন কোন লাভ হলো না তখন তারা বাধ্য হলো মেনে নিতে। দেশ থেকে নিষিদ্ধ ওষুধ কমতে থাকলো।
তাহলে আবার কেন তোমাদের এনিয়ে নতুন করে কাজ করতে হচ্ছে বলে ভ্রুকুটি করলো দীনা।
মা রে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই স্বার্থান্বেষী মহল তৎপর হয়ে ওঠে এবং সেই বিশেষজ্ঞ কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। আমরা তো আমাদের ভালো বুঝি না আবারও বাজারে প্রবেশ করে অপ্রয়োজনীয় নিষিদ্ধ ওষুধ।
তো সে সময় চিকিৎসকরা কোন প্রতিবাদ করে নি?
করেছিল বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এবং বিভিন্ন সেমিনারে। সরকারের কোন গরজ না থাকায় কোন লাভ হয়নি।
আমার এসব জানা ছিল না বাবা বলে বাবার হাত জড়ায় ধরলো দীনা।
মাথায় হাত বুলাতে-বুলাতে বললো এসব জানতে হবে মা,জানাতে হবে।


মঈন বসে আছে জাতীয় জাদুঘরের সামনের ফুটপাতে। ঠিক সামনেই কয়েকটা ফুলের দোকান। তেমন বিক্রি নেই। রঙবেরঙের ফুলগুলো দেখতে ভালো লাগে। সে অপেক্ষা করছে শিরিনের জন্য। শিরিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে থাকে। পড়ছে বাংলা নিয়ে ।
এই,কি ভাবছো? বলে পাশে বসে শিরিন।
শিরিনের কপালের টিপটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে মঈন।
কৈ কিছু না তো,এই তোমার আশার সময় হলো?
বাবা,আমার কাজিন এসেছিল হলে,ওর সাথে কথা বলে তারপর আসলাম। তারপর তোমার কি খবর?
এই চলছে। আজ নাইট ডিউটি আছে হাসপাতালে। মঈন ট্রেনিং করছে পিজি হাসপাতালে। শিরিনের সাথে তার পরিচয় তিন বছর। ট্রেনিং শেষ হলেই তাদের বিয়ে করার কথা।
চলো ফুসকা খাই বলে শিরিনের হাত ধরে উঠায় মঈন তারপর দুজনে টিএসসির দিকে রওনা হয়। শিরিনের সাথে হাঁটলে মঈনের চারপাশে কি ঘটছে তা আর চোখে পড়ে না। শিরিন কথা বলে সারা শরীর জুড়ে। হাত নেড়ে,চোখ নাচিয়ে,ভ্রু নাচিয়ে,ঠোঁটে নতুন সম্পাদ্য এঁকে।
স্যার,আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম বলে লোকটির দিকে তাকায়,মটরসাইকেল থামিয়ে হেলমেট পরে সালাম দিলো যে তাকে ঠিক চিনতে না পারলেও বুঝলো ওষুধ কম্পানীর রিপ্রিজেন্টিভ হবে।
স্যার আমি রিপন, ফাইজারে আছি।
ও আচ্ছা,শিরিন পাশে তাই একটু অস্বস্তি বোধ করছে মঈন। যদিও অস্বস্তির কিছু নাই, শিরিন খুবই আধুনিক মেয়ে।
স্যার উনি ভাবী নাকি? বলে শিরিনের দিকে তাকালো রিপন।
উত্তরে হাসি দিল মঈন,যার অনেক অর্থই হতে পারে।
স্যার আমরা কম্পানি থেকে এ পত্রিকাটা সবাই কে দিচ্ছি তো আপনাকে দেখে রাস্তায় দিলাম কিছু মনে করিয়েন না বলে হাসলো রিপন।
পত্রিকাটা নিতে-নিতে না ঠিক আছে বললো মঈন
স্যার তাহলে আসি, আসি ম্যাডাম।আসসালামু আলাইকুম।
কি ব্যপার? রাস্তায় থামিয়ে পত্রিকা দিচ্ছে! ঘটনা কি জানতে চায় শিরিন।
ওরা জানে আমি প্রফেসর নুরুল ইসলাম স্যারের সাথে ওষুধনীতি নিয়ে কাজ করছি,এজন্য আমাকে ফলো করছে। শিরিনের নাকে জমা বিন্দু বিন্দু ঘামের দিকে তাকিয়ে মঈন মৃদু হেসে বললো, স্বার্থ ছাড়া দুনিয়া অচল ম্যাডাম।
বিতরণকৃত ইংরেজি সাপ্তাহিক দি পালস এর আজকের প্রতিপাদ্য, বাতিলকৃত বেশীরভাগ ওষুধ ক্ষতিকারক না। ওষুধ নীতি ব্যর্থ হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ১০০০০ কপি বহুজাতিক কম্পানিগুলো বিলি করে তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে।
দি পালসের সাথে সুর মিলিয়ে স্বাস্থ্যনীতির বিপক্ষে লেখা শুরু করলো নিউ নেশন, ইত্তেফাক, দি বাংলাদেশ অবজারভার।
টিএসসিতে এসে দুই বাটি ফুসকার অর্ডার দিয়ে মঈন, শিরিনের চোখে ডুব দিলো।


লাগলো পালে হাওয়া
চট্টগ্রাম শহরে আজ চরম উত্তেজনা। তদানীন্তন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেঃ জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদ কতৃক আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তব্য দিবেন। শহর মুড়ে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তার জালে। কলেজের প্রিন্সিপালের রুমে বসে আছেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম, মেডিকেল এডুকেশন ও হাসপাতালের পরিচালক ডা.হুমায়ুন কে.এম.এ.হাই,ওষুধ প্রশাসনের পরিচালক ডা.নুরুল আনোয়ার,স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনাব শামসুল হক।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ প্রশাসন বেশ গুছিয়ে আয়োজন করেছে তারপরও চাপা উত্তেজনা অনুভব করছেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম কারণ ওষুধ নীতি নিয়ে এটাই বাংলাদেশের প্রথম সেমিনার। সবাই কিভাবে নেয় সেটা দেখার বিষয়।
এরশাদ সাহেব সঠিক সময়ে এসে উপস্থিত গোল পাহাড়ের মোড়ে শাহ্ আলম বীর উত্তম মিলনায়তনে । অধ্যক্ষ সিদ্দিকুল্লাহ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান শুরু হলো। কানায় কানায় পূর্ণ চিকিৎসক, নার্স, ছাত্র-ছাত্রীতে।
জেনারেল এরশাদ আবেগপূর্ণ বক্তব্যে বলেন,বাংলাদেশের ওষুধনীতি একটা যুগান্তকারী ঘটনা। আসলে এটা একটা বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এ বিপ্লব দরিদ্র জনসাধারণের জন্য। বিপ্লব সুখের এবং শান্তির।বিত্তবান কয়েকটি পরিবারের জন্য এ বিপ্লব নয়,দেশের দরিদ্র জনগনের হিতার্থে এই ওষুধনীতি। অল্প খরচে উপযোগী ওষুধ দেশের অগণিত জনগণের কাছে পৌঁছুক – সে উদ্দেশ্য এই ওষুধনীতির প্রণয়ন।
প্রচুর করতালির মধ্য দিয়ে শেষ হয় বৈজ্ঞানিক সেমিনার।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিজের রুমে বসে আছেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম। আজ তাঁকে অনেকটাই হালকা লাগছে। অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথাটা তার ভালো লেগেছে,ওষুধনীতি বাস্তবায়নের এবং অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর ওষুধ থেকে রেহাই পাবার অন্যতম প্রধান উপায় হচ্ছে উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন। আপনারা সকল মেডিকেল কলেজে এমন সেমিনার করেন।
সকালে ঢাকা যেতে হবে কতো কাজ পড়ে আছে। পালে যে হাওয়া লাগলো তাকে কাজে লাগিয়ে নিয়ে যেতে হবে যতদূর যাওয়া যায়।


পৃথিবীর রাঙা রোদ চড়িতেছে আকাঙ্খায় চিনিচাঁপা গাছে
বঙ্গভবনে নিজস্ব সভা কক্ষে বসে আছেন সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ। একটু চিন্তিত মনে হচ্ছে তাকে। তাঁর হাতে ১ লা জুন, ১৯৮২ তারিখের ইংরেজি পত্রিকা, ‘বাংলাদেশ টাইমস’যারা শিরোনাম করেছে,বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রেসক্রিপশন – মাত্র ২৪৮ টি ওষুধই যথেষ্ট, ১৭৪২টি অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাতিল “। পাশে বসে আছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল শামসুল হক।
স্যার, আমেরিকার রাষ্ট্রদূত জেন আবিল কুন(Jane Abell Coon) এ বিষয় নিয়েই কথা বলার জন্য আসছেন বলে, কথা শুরু করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
আমিও তাই ভাবছি। আসলে আমরা অনেক বড় একটা কাজ করে ফেলেছি এটা বোঝাই যাচ্ছে।
সকাল এগারোটা দশ মিনিটে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত এরশাদের রুমে প্রবেশ করে।
কোন রকম ভদ্রতার ধার না ধরেই রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে আপনারও আমাদের সাপোর্ট দরকার। আমেরিকা এ ওষুধনীতিতে সম্মত না তাই আপনি এটা বাতিল ঘোষণা করবেন।
নিজের রাগ দমনে পারদর্শী জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট দৃঢ়তার সাথে বললেন, একটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত চট করে বাতিল ঘোষণা করা যায় না।
রাষ্ট্রদূত একই রকম কন্ঠস্বরে বলেন,সেটা আমরা বুঝি না। আমেরিকা থেকে চারজন বিশেষজ্ঞ আসবেন ২০ জুলাই,আপনাদের প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতে।
তাদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিবেন বলে প্রথম কথা শুরু করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
রাষ্ট্রদূত রাগান্বিত হয়ে বলেন আমার দেশ থেকে পাঠান বিজ্ঞানী দলকে আপনারা অবিশ্বাস করছেন?
এটা অবিশ্বাসের প্রশ্ন না, বিষয়টা প্রটোকলের, আপনি হয়তো ভুলে গেছেন শান্ত কন্ঠে বললেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী।
পরদিন আমেরিকান এ্যাম্বেসী থেকে জীবনবৃত্তান্ত পাঠানো হলো স্বাস্থ্যমন্ত্রী বরাবর।
দৃশ্যপট দুই
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের সামনে গাড়ী থেকে নামলেন প্রফেসর মোবারক আলী,পরিচালক অপথালমোলজি ইন্সটিটিউট। তারপর সামনে পিওন কে জিজ্ঞেস করে প্রবেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর এম এ মান্নানের রুমে। দোতলার এ রুমের জানলা খোলা রোদ আলোর খেলা, জানলার পাশে শিরিষ গাছ। ওনাদের জীবনবৃত্তান্তগুলো দেখলাম। একজনও খ্যাতিম্যান বিজ্ঞানী না, উনাদের একজন চাকরি করে ওষুধ কম্পানীতে একজন মান নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপক আর দুজন মার্কেটিং ম্যানেজার,বুঝলেন প্রফেসর মোবারক আলী?
আর রাষ্ট্রদূত এদের নিয়ে বড়াই করছিল। আমি তো আশা করেছিলাম আমেরিকার এফডিএ (ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)থেকে কেউ আসবে বলে চায়ে চুমুক দিলেন মোবারক আলী।
তারপরও এদের আসতে দিতে হবে,উপরের চাপ আছে বলে চেয়ারে হেলান দিলেন প্রফেসর মান্নান।
টেবিলের উপর পড়া আলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন মোবারক আলী। ঠিক সময়েই এলেন সেই বিশেষজ্ঞ দল। আমেরিকার সেই চারজনের কমিটি বিএমএ,বিএসএস এর প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করলেন কিন্তু ওষুধ নীতি কমিটির কারো সাথে দেখা না করেই প্রতিবেদন দিয়ে দেশে চলে যান। অজানা কারণে সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।


মিতভাষণ
পিজি হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে বসে আছেন ওষুধনীতি বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যবৃন্দ। জুনিয়র কয়েকজন চিকিৎসকের মধ্যে মঈনও বসে আছেন। শুরু হবে জরুরি মিটিং। মঈন এবং আরও কয়েকজন জুনিয়র চিকিৎসকের কাজ হলো মিটিংএর সব তথ্য লিপিবদ্ধ করা।
সভাপতি নুরুল ইসলাম ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে কিছু বলতে বলায়, তিনি প্রথমেই উল্লেখ করলেন বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ প্রয়োজনের সময় ওষুধ পান না। অথচ আমরাই বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ওষুধ আমদানি করি। এই অর্থ ১৯৭৯-৮০ সালের বাজেটের মোট স্বাস্থ্য খাতের ১.৭ গুণ, ডা.মঙ্গন আপনাকে কিছু তথ্য জোগাড় করতে বলেছিলাম। সেগুলা কি বলবেন?
ধন্যবাদ স্যার, আমি তথ্যগুলো পড়তে চাই বলে মঈন শুরু করলো, স্যার আমাদের মোট উৎপাদিত ওষুধের শতকরা ৩৩ ভাগই ভিটামিন, আয়রন টনিক,কাশির ওষুধ,মোটা হবার ওষুধ, হজমকারক ওষুধ। অথচ এন্টিবায়োটিক, কৃমি ও পরজীবী-বিধ্বংসী ওষুধ মাত্র শতকরা ২৩ ভাগ,অথচ এগুলোই আমাদের জন্য বেশী প্রয়োজন।
মিটিং এ সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হলো একের অধিক উপাদানের সংমিশ্রণে (কতগুলো ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া) কোন ওষুধ বাজারে রাখা হবে না।
কফ মিকশ্চার,থ্রোট লজেন্স, গ্রাইপ ওয়াটার জাতীয় রোগের কোন রোগ ভালো করার ক্ষমতা নাই তাই এসব উৎপাদন ও আমদানি বন্ধ করা প্রয়োজন। টনিক বা বলবৃদ্ধিকারক,হজমের ওষুধ বৈজ্ঞানিক ভাবে কার্যকর না তাই এসব উৎপাদন করা যাবে না।শিশুদের জন্য কোন ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক তরল আকারে প্রস্তুত করা যাবে না। যেসব ওষুধ প্রস্তুত করা সহজ যেমন,ভিটামিন, এন্টাসিড এগুলো দেশী কোম্পানিগুলোই তৈরি করবে।
-গম্ভীরমুখে বললেন এসব কতটুকু কার্যকর হবে জানি না?
আমরা যেহেতু সঠিক এবং দেশের স্বার্থে কাজ করছি তাই আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নাই। ডা.মুঈনসহ অন্য চিকিৎসকদের আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে
নিষিদ্ধ সব ওষুধের তালিকা তৈরি করে জমা দিতে বলে সভার মুলতবি ঘোষণা করেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম।
চট্টগ্রামের রাউজান থানায় জন্ম হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। অভিজাত পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদার ছাত্র ফলে পারিবারিক ভাবেই বিপ্লবী আদর্শে লালিত পালিত। দশ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পড়াশুনা বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা মেডিকেল থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ। ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক।
বনেদী পরিবারে জন্ম হওয়ায়, প্রথম জীবনে ছিলেন বিলাসী। ছাত্র জীবনে চড়তেন দামি গাড়িতে। পড়ালেখার জন্য যখন লন্ডনে যান তখন রাজকীয় দর্জি বাসায় এসে স্যুটের মাপ নিয়ে যেতেন। এরজন্য গুনতে হতো অতিরিক্ত ২০ পাউন্ড। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের ওষুধ নীতির প্রবর্তনের মূল পুরুষ ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতা এতো বেড়ে গেল যে তার ঢেউ এসে লাগলো লন্ডনেও। লন্ডনে যেসব বাঙালি থাকতেন তারা ফুঁসে উঠলো আক্রোশে। তখন লন্ডনে এফআরসিএস ডিগ্রি করছিলেন দুই বন্ধু। একজন জাফরুল্লাহ আর একজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রথম জিএস ডা.এম এ মবিন। দুই বন্ধু সহ আরও কিছু বাঙালি হানাদার পাকিস্তানিদের নির্মমতার প্রতিবাদে লন্ডনের হাইড পার্কে পাকিস্তানি পার্সপোর্ট ছিঁড়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। হয়ে যান রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক। বৃটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকের প্রত্যায়নপত্র নিয়ে ভারতীয় ভিসা সংগ্রহ করেন। দুই বন্ধুর এফআরসিএস পড়া শেষ, পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হয়ে গেছে। পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে দুই বন্ধু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য চেপে বসলো দিল্লিগামী প্লেনে। উদ্দেশ্য দিল্লি থেকে কোলকাতা তারপর রণাঙ্গন। সিরিয়ান এয়ার লাইন্সের বিমান দামাস্কাসে পৌছার পর পাঁচ ঘন্টা লেট। সবাই বিমান থেকে নেমে গেলেও তারা আর নামে না। অবচেতন মন তাদের সাবধান করেছিল। এয়ারপোর্টে আগে থেকেই উপস্থিত পাকিস্তানি কর্ণেল। দুইজন পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেফতার করার জন্য। তারা নামলেই গ্রেফতার করবে। এয়ারপোর্ট যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল জোন এখানে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না। সে যাত্রায় বেঁচে যান দুবন্ধু। অনেক ঝক্কি-ঝামেলার পর তারা যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধের দুই নম্বর সেক্টরে।
দৃশ্যপট
মুক্তিযুদ্ধের দুই নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ডেকে পাঠিয়েছেন দুই বিপ্লবী চিকিৎসক বন্ধুকে।
দুজনে মেজর খালেদ মোশাররফের রুমে এসে দেখেন আরও একজন লোক বসে আছে তাঁর পাশে।
এই যে ডাক্তার সাহেবেরা আসেন বলে সহাস্যে সম্বোধন করলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। পরিচিত হন, ইনি ইন্ডিয়ান জিবি হাসপাতালের প্রধান সার্জন ডা.রথিন দত্ত।
ডা.রথিন দত্ত কোন রকম ভনিতা না করেই বললেন একটা ফিল্ড হাসপাতাল করতে চাই। আপনাদের সাহায্য লাগবে। এমন সুযোগই খুঁজছি বলে রাজী হয়ে যান জাফরুল্লাহ।
হাসপাতাল গড়ে উঠলো আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘরে। হাবুল ব্যানার্জির আনারস বাগানেই গড়ে উঠলো বাংলাদেশের প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল। পরবর্তীতে তাদের সাথে যোগ দেন কমান্ডিং অফিসার হিসেবে ডা.সিতারা বেগম,বীরপ্রতীক। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেন সুলতানা কামাল ও তাঁর বোন সাঈদা কামাল। যুদ্ধের নয়টা মাস যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়ে গেছে এ হাসপাতাল। প্রাণ বাঁচিয়েছে হাজারো মুক্তিযোদ্ধার।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গ্রামে ফিরে গিয়ে স্বাস্থ্যযুদ্ধ শুরু করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালটি গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র নামে গড়ে তুলেন কুমিল্লায়। পরে সেটা স্থানান্তর করেন ঢাকার অদূরে সাভারে। এ ‘গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র’ নামটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিলেন প্রায় ৩১ একর জমি সরকারিভাবে। বিভিন্ন সময সরকার প্রধানদের মন্ত্রী হবার আহ্বান এড়িয়ে গেছেন সযতনে।(১২ নভেম্বর ২০১৮,মানবজমিন)
সকালবেলা পিজি হাসপাতাল থেকে টিএসসির দিকে হেঁটে যেতে মঈনের খুব ভালো লাগে। গতরাতে নাইট ডিউটি ছিল। নাইট ডিউটি বেশ খারাপ গিয়েছে। কয়েকটা রোগী খুব খারাপ ছিল। সেগুলা ম্যানেজ করতে করতে ফজরের নামাজের সময় হয়ে যায়। নামাজ পড়ে মর্নিং সেশন এ্যাটেন্ড করে শিরিনের সাথে দেখা করার জন্য টিএসসির দিকে হন্টন। শরীরের ক্লান্তি দুর হয়ে গেল শিরিনকে দেখে। আজ শাড়ি পড়েছে শিরিন,রয়্যাল ব্লু কালার। কপালে রক্তলাল বড় টিপ,চুল খোলা।
এই যে ডাক্তার বাবু, মুখ শুকায় গেছে কেন? বলে পাশে বসলো শিরিন।
রাতে ঘুম হয় নাই। রোগী খারাপ ছিল।
হুম। কাল পেপারে দেখলাম গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে রাইট লাইভলিহুড পুরস্কার দেয়া হয়েছে বললো শিরিন।
বলো কি? আমি গতকাল পেপার পড়ার সময় পাই নাই। খুব ভালো খবর। জাফরুল্লাহ স্যার এটার যোগ্য। দেশের স্বাস্থ্যসেবার একটা নতুন চেহারা দিয়েছে স্যার।
হু। তা তো বুঝলাম মশাই কিন্তু আরও তো ঘটনা আছে বলে শরীর জুড়ে হাসি দিল শিরিন।
কি ঘটনা? আরে তুমি দেখে সব জানো।
জানতে হয় মশাই,জানতে হয়। যার হবু স্বামী চিকিৎসক তার তো এ পেশার খোঁজ খবর নেয়া অস্বাভাবিক না।
খুলে বলো তো, অধৈর্য কন্ঠ মঈনের।
শোন, স্যারের এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে প্রতিবাদ লিপি পাঠিয়েছে তোমাদের বিএমএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তারা বলেছে ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন জনস্বার্থ বিরোধী। অবিলম্বে এ পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়া হোক।
কি বলো! মঈনের চোখ বড়বড় হয়ে গেল। এ ও সম্ভব!
জ্বী জনাব,বলে শিরিন মঈনের নাকের ঘাম মুছে দিল আঙুল দিয়ে।
নাক ঘামা পুরুষদের বৌ ভাগ্য ভালো হয়। জানো তো? হাসতে হাসতে বললো শিরিন।
রাখো তোমার বৌ ভাগ্য। এখন কি হবে? পুরস্কার কি ফেরত নিয়ে নিবে ওরা বলে মঈন চেয়ারে গা ছেড়ে দিল।
শোন মিয়া। বিদেশিরা খারাপ হলেও কিছু জিনিস ওদের ভালো। ওরা নিজ দেশকে ভালবাসে।
ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফিরতি চিঠিতে লিখেন,আপনারা আপনাদের চিঠিতে কিছু গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন কিন্তু এই অভিযোগের সমর্থনে কোন প্রমান আপনারা দেননি। একটি বিশেষজ্ঞ সংস্থার পক্ষে এ ছিল এক অসাধারণ আচরণ। উনি চিঠিতে জাফরুল্লাহর অবদান এবং তার প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে কেন পুরস্কৃত করা হয় তা বর্ণনা করেন। চিঠির শেষটা বেশ মজার বুঝলে মঈন,বলে হাসলো শিরিন।
কি সেটা? বলো তো শুনি বলে মঈন সামনে ঝুঁকে আসে।
শেষে উনি লিখেছেন, আমরা এই ধরণের সংস্থা (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র) এবং তাঁর লোকজনের সাথে সম্পৃক্ত হতে পেরে গর্বিত বোধ করছি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কাজকর্ম এমনই যার জন্য সব বাংলাদেশিই গর্ববোধ করতে পারে।
চিঠি শেষ তো মশাই। চলো আজ বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাব বলে শিরিন মঈনের হাত ধরে টান দেয়।
মঈন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শিরিনের সাথে রিকশায় চেপে বসে। তখন বাতাসে ছাতিমফুলের গন্ধ।
ইন্টারভিউ


২৭ জুলাই ১৯৮২।প্রফেসর নুরুল ইসলামের রুমে বসে আছেন প্রফেসর আবদুল মান্নান,ডা.আজিজুর রহমান,ডা. এম.কিউ.কে তালুকদার ও ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী। রুমে উপস্থিত বাংলার বাণী পত্রিকার সাংবাদিক। এসেছেন ওষুধনীতি নিয়ে ইন্টারভিউ নিতে। স্বাভাবিকভাবেই শুরু হলো কথা।
বাংলার বাণীঃ জাতীয় ওষুধনীতিকে সফল করতে কি কি করতে হবে বলে মনে করেন আপনি?
প্রফেসর নুরুল ইসলামঃ ওষুধনীতিকে সফল করতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম চিকিৎসক সমাজকে সচেতন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ যে দেশ ও জাতির ক্ষতির কারণ তা উপলব্ধি করতে হবে। কারণ প্রেসক্রিপশন তাঁরাই লেখেন।
বাংলার বাণীঃ মেডিকেল স্টুডেন্টদের কোন ভাবে এই আন্দোলনে আনা যায় কি?
প্র.ইঃ অবশ্যই কারণ তাদের ফার্মাকোলজি নামক একটি সাবজেক্ট আছে এবং সেখানে ওষুধ নিয়ে পড়ানো হয়। আমরা যদি স্টুডেন্টদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ, যেসব ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে সেসব ওষুধ নিয়ে বলতে পারি তাহলে অবশ্যই ভালো হবে কেননা ওরাই তো হাল ধরবে আগামীর।
বা.ণীঃ এক্ষেত্রে মিডিয়ার কি কিছু করার আছে?
প্র.ইঃ আছে তো বটেই সেমিনার, তারা আলোচনাসভা অনুষ্ঠান, পত্রপত্রিকা টেলিভিশন ও রেডিওসহ সকল তথ্যমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে জনগনকে অবহিত ও সচেতন করতে পারে। আর প্রত্যেক ফার্মেসীতে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকারক বলে ঘোষিত ওষুধের তালিকা টাঙান বাধ্যতামূলক করতে বলতে হবে।
বা.ণীঃ মাত্র তের দিনে এই ওষুধনীতি করা হয়েছে বলে একটা কথা উঠেছে?
প্র.ইঃ এবার কিছুটা উত্তেজিত হয়ে নুরুল ইসলাম বললেন কথাটা সঠিক না। এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৯৪০ সালে যে ওষুধনীতি প্রণিত হয়েছিল তা পরিবর্তনের দাবী ছিল অনেক আগে থেকেই।
বা.ণীঃ নতুন নীতিতে নাকি ১৭০০ ওষুধ বাদ গেছে? কথাটা কতটুকু সঠিক?
প্র.ইঃ এটা ভুল কথা। বাংলাদেশে মূল ওষুধ ছিল মাত্র ১৫০ টি। তাকে বিভিন্ন কোম্পানি ৪০০০ বিভিন্ন নাম দিয়ে চালায়। সেই মূল ১৫০ টি থেকে মাত্র ৩০টি ওষুধ বাদ গেছে। আর এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকেই।
বা.ণীঃ এই নীতির ফলে কোন সংকট সৃষ্টি হবে কি?
প্র.ইঃ কোন সংকট তো হবেই না বরংচো অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ওষুধ সেবনের ফলে মানুষের যে শারীরিক ক্ষতি হতো এবং নতুন রোগের সৃষ্টি হতো তা থেকে মানুষ বেঁচে যাবে। আসলে দরকারী ওষুধের কোন সংকট হবে না,”রাদার দেয়ার শ্যাল বি এ ক্রাইসিস অফ লস ফর সাম”। যারা এসব ক্ষতিকর ওষুধ তৈরি করে জনগনকে ঠকাচ্ছিল তাদের বরংচো ক্ষতি হবে। যে দেশে শতকরা ২০ ভাগ ওষুধ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুসারে কেনা হয় বাকি শতকরা ৮০ ভাগ লোক হাটবাজার, ফার্মেসী থেকে কিনে সেখানে ক্ষতিকর কোন ওষুধ থাকাই উচিত না। বিভিন্ন কাশির সিরাপে আফিম জাতীয় পদার্থ থাকে এবং এসব তৈরীতে তেমন অর্থের প্রয়োজন হয় না কিন্তু বিক্রি বেশী হওয়ায় লাভ বেশী। ফলে ব্যবসায়ীরা এগুলোই বেশী করে তৈরী করে। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও আমাদের বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ওষুধ আমদানি করতে হয়।
বা.ণীঃ চিকিৎসক সমাজও তো এটাকে ভালভাবে নেয়নি?
প্র.ইঃ বিষয়টা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটি হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমি আশাবাদী খুব দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।
বা.ণীঃ আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।
প্র.ইঃ আপনাকে এবং বাংলার বাণীকেও জানাই ধন্যবাদ।
২ মে ১৯৯১ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বসেছেন জরুরি মিটিং এ। উপস্থিত আছেন বিদেশি রাষ্ট্রদূত, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা কিছু এনজিও পরিচালক, মন্ত্রী ও ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ আরও অনেক গণ্যমাণ্য ব্যক্তি। জরুরী মিটিং এর কারণ ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল বাংলাদেশে দক্ষিণপূর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৫০কিমি/ঘণ্টা বেগে আঘাত করে ঘূর্ণিঝড় । এই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত করে এবং এর ফলে প্রায় ১,৩৮,০০০ মানুষ নিহত হয় এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারায়। যারা বেঁচে আছে তাদের সাহায্য সহযোগিতা কিভাবে করা যায় সে বিষয়ে কথা বলা। একজন রাষ্ট্রদূত বললেন বাংলাদেশের ওষুধনীতির কারণে আমরা বিদেশ থেকে বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করতে পারছি না ফলে দূর্গত এলাকায় আমরা কোন ওষুধ দিতে পারছি না। এ ব্যপারে কিছু কি করা যায়। প্রধানমন্ত্রী তাকালেন জাফরুল্লাহ চৌধুরীর দিকে। তিনি নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল ইবনে ইউসুফ,প্রফেসর বদরুদ্দোজা সবাই চুপচাপ। এ প্রসঙ্গে বলা ভালো বদরুদ্দোজা বরাবরই ওষুধনীতিকে তেমন একটা সমর্থন দেন নাই।
সবার নীরাবতা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী বললেন আমরা আমাদের ওষুধনীতি মানবো। যে ওষুধনীতি আছে তার আলোকেই আমরা ওষুধ আমদানি করবো। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেন। বিষয়টা ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আনন্দিত করে বটে। বিরোধিতা করা আমাদের রক্তে। আমরা বিরোধিতা করি বুঝে না বুঝে। পাশে বসা ডেনিস অ্যামবেসির কর্মকর্তা অবাক হয়ে জাফরুল্লাহর কানে- কানে বলেন,ঘটনা কি? ম্যাডাম ওষুধনীতির পক্ষে কথা বলছেন। বাজারে একটা কথা প্রচলিত ছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদ ওষুধনীতি করার জন্য এতো সুনাম হয়েছিল যে আন্দোলন করেও তাকে ক্ষমতা থেকে নামানো যাচ্ছিল না।
১৯৯২। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামাল ইবনে ইউসুফ। জেনেভার এক স্বাস্থ্য সম্মেলনে ভারত, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের মন্ত্রীরা আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রী কে অভিবাদন জানান,জানতে চান কিভাবে আমরা ওষুধনীতি প্রণয়ন করতে পারলাম। অবাক বিস্ময়ে মন্ত্রী তাকান ডা.জাফরুল্লাহর দিকে, যে ওষুধনীতিকে তিনি এতোদিন খারাপ ভেবে এসেছেন সেটা যে খারাপ না তা বুঝতে পারেন। বাতিল হতে গিয়েও টিকে যায় ওষুধনীতি।


প্রজাপতির দিন
গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের সবুজঘেরা মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সকাল শুরুর এ সময় রঙবেরঙের পাখি কিচিরমিচির কাকলিতে মুখরিত করে চারপাশ। নার্সরা নাইট ডিউটি শেষ করে ঘুমঘুম চোখ নিয়ে রুমে ফিরে আর মর্নিং শিফটের নার্সরা ডিউটিতে যায়। পথে দেখা হয় পিঁপড়ার মতো। কথা বলে,কুশল বিনিময় হয়। মেডিকেল স্টুডেন্টরা ক্লাস করার জন্য রওনা দেয়। পরিশ্রমী অল্পতে সন্তষ্ট এদের দেখে আগামী বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী করে তোলে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে। শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। ডায়ালাইসিস করতে হয়। বয়স চেপে বসে কাঁধে। তবুও করে যেতে হয় সামাজিক কর্মকান্ড।আজ ডা.মঈন আর শিরিনের বিয়ের দাওয়াত আছে। ওরা দুজনেই এসেছিল বিয়ের কার্ড
দিতে। ডা.মঈন বারবার অনুরোধ করেছে বিয়েতে উপস্থিত থাকার জন্য। ডা.মঈনদের দেখে মনে সাহস আসে, এই তরুণরাই একদিন এগিয়ে নিয়ে যাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে,বাংলাদেশকে। সন্ধ্যা নামেই তো ভোর আসবে বলে।
(আত্মপক্ষ সমর্থন – স্বল্পবিদ্যা নিয়ে লিখতে বসা যে কি কঠিন তা হাড়েহাড়ে টের পেলাম। তারপরও নিজেরও জানা হলো অনেক কিছু। আগামী প্রজন্মেরও জানা উচিত। কত কষ্ট করে আমাদের অভিবাবক চিকিৎসকরা স্বাস্থ্যখাতের একটা শক্ত ভিত তৈরী করেছে! আমি সহজ কথা পছন্দ করি,সহজ ভাষায় লিখি। এ লেখা হতো না যদি Rayhan Kabirআর লিপি দেবগুপ্ত উৎসাহ না দিতো। ধন্যবাদ আপনাদের। আপনাদের সাথে দীর্ঘ পথ হাঁটার ইচ্ছে। নিজেকে এই নিয়মকরে লেখা থেকে মুক্তি দিলাম আর আপনাদের দিলাম অসীম আকাশ। আপনাদের বিচরণ শুভ হোক।)
সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে
১৯৮২ সালের ওষুধনীতিতে ওষুধ ও স্বাস্থ্য বিষয়াবলির বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের দ্বারা মানুষ যাতে বিভ্রান্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে নিবন্ধন কতৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা না থাকলেও ওষুধ কোম্পানিগুলো বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে বিপনন ও প্রচার খাতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে ডাক্তারদের পেছনে। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২২/৪/২২)।ওষুধনীতি আর হলো না, যাও বা ছিলো তাও যাওয়ার পথে।

রাত ১২টা ৩০ মিনিট। অন্ধকার ঘরে জানালার পাশে বসে কফির কাপ হাতে জ্যানি শুনছে লরেন ড্যাগল এর ‘ইউ সে’ গানটি। জ্যানির খুব পছন্দের সেরা একটি গান। প্রায় রোজই গানটা শুনে সে। মোটিভেশনাল এই গানটি জ্যানিকে খুব প্রভাবিত করে। আহা! লরেন কি এই সময় সুস্থ্ আছেন? থাকলে নিশ্চয়ই মহামারীর এই সময়ে মৃত্যুর স্তুপে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কবাসীদের জীবিতকরতে আরো একটি গান লিখে ফেলতেন। শিরোনাম হতো, ‘আই এ্যাম স্টিল এলাইভ এ্যান্ড আই উইল বি!’
এ মুহূর্তে ঠান্ডা আবহাওয়ায় বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে। কিন্তু আজকের দিনটায় নিউইয়র্কের আবহাওয়া খুব সুন্দর ছিল। রোদের সাথে হালকা বাতাস। যদিও বুক ভরে বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়া হয়নি জ্যানির, তবু দিনটি কেটেছে ভিন্ন রকমের এক অনুভূতিতে। কারণ, আজকের দিনটি ছিল কোভিড-১৯ কালে স্মরণীয় এক লকডাওন ঈদুল ফিতরের দিন।
সবার কাছে মহামারী সময়কার এই ঈদটির বর্ণনা ভিন্ন রকমের হলেও, জ্যানির কাছে ঈদটি ছিল বরাবরের মতই সহজ, গুছানো। কোন যোগ-বিয়োগ ছিলনা।
ঘুম থেকে উঠে নিয়মমাফিক যা রান্না হয় ঈদের দিন, তাই রান্না হলো। পুলাও, রোষ্ট, মা মেয়ের জন্য দুই টুকরো ইলিশ মাছ, মায়েরপ্রিয় হালিম, সেমাই, টক দই…! ব্যাস!
মা আনোয়ারা বেগম কাটাকুটিতে বিশাল এক্সপার্ট। রান্নার সময় সব কিছু তিনিই তৈরি করে দিলেন। রান্না শেষে তিনি প্রতিবেশী বাঙ্গালি বন্ধুদের দরজায় কিছু রান্না করা খাবার প্যাক করে রেখে আসলেন। কোভিড-১৯ খাদ্য সংকটে নয়, এই খাদ্য আদান প্রদানের কাজটি তিনি সব ঈদেই করেন। প্রতিবেশী বন্ধুদের না দিয়ে তিনি খেতে পারেননা। তারাও অনেক সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসেন। সাথে পান জর্দা অবশ্যয়ই। এতেই আনোয়ারা বেগম বিরাট খুশী। সুখ পেতে যে দামী বাড়ীটি গাড়ী নয়, শুধু পান-জর্দাই যথেষ্ট, তার প্রমান আনোয়ারা বেগম।
লকডাওনকালে বাসায় যেহেতু কারো আগমন সম্ভব নয়, তাই টেক্স ম্যাসেজে আত্বীয়, বন্ধু, কলিগদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছে জ্যানি। কেউ কেউ ফোন কলে ছিল। কিছু বন্ধুরা ভিডিও কলে তাদের ঈদ পরিবেশনা দেখালো। বাংলাদেশে পরিবারের সদস্যদের সাথেও ভিডিও কলে কিছু সময় ব্যায় করতে হল জ্যানিকে। সেই সাথে শেয়ার করা হলো বর্তমান পরিস্থিতির কথা। কাউকে আতঙ্কিত মনে হল। কাউকে হতাশ। কেউ বললেন, ‘আমেরিকার তোমরা তো আমাদের থেকে বেশী বিপদে আছো গো।’ কেউ জানালেন করোনায় নতুন মৃত্যুর সংখ্যা। এরই মাঝে কথার ফাকে বহুবার শোনা গেল এ্যামবিউলেন্সের আওয়াজ। সে সময় কলেথাকা আত্বীয়-স্বজনদের আতঙ্কিত মনে হলো।
আনোয়ারা বেগমের বয়স ৭২। ডাইবেটিস রোগী। করোনা ভয়ে মা’কে ঘর থেকে বের হতে দেয়না জ্যানি। আজ দিল। ঈদের দিন খুশীর দিন। ঈদের দিন স্বাধীনতার দিন। আড়াই মাস পর স্বাধীনতা ভোগ করতে আনোয়ারা বেগম গেলেন তার বাড়ির সামনের সবজি বাগানে। আনোয়ারা বেগমের নির্মল হাসি মুখ দেখে মনে হলো যেন তিনি এক যুগ পর জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়েছেন।মায়ের মুখের এটুকু হাসি যে দেখেছে, সেই সার্থক। আহা! গৃহবন্দি থাকা মা গুলো কবে যে এমন করে প্রাণভরে আবারো হাসতে পারবে, তাই ভাবে জ্যানি।
দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে সেই একই নিয়মে খাও দাও, ঘুমাও, বার বার হাত ধুযা, ঘর পরিস্কার করা, চাকরিহীন বেকার ভাতায় গৃহবন্দি করোনাকালীন জীবন যাপন করা-বিরক্তিকর। এরই মাঝে ঈদুল ফিতর তেমন কোন পরিবর্তন আনেনি। শুধু এক মাস রোজা পালনে জ্যানির কিছু ওজন লস হয়েছে, রাহেলা বেগমের অনিয়মিত অসুধ গ্রহণে ডায়বেটিস ও থাইরয়েড বেড়েছে। এই যা!
জ্যানি ভাবছে, সবার ঈদ তো এক রকম হবার কথা নয়। অনেককেই এবার দেখা গেছে এবারের ঈদে তেমন কিছু ব্যয় করেননি।কারণ করোনা সংক্রমনে পুরো পৃথিবী যখন অনাহারে, অনিরাপত্তায় কাঁদছে, তখন মানবতার খাতিরে তাদের বিবেকবোধ নাড়া দিয়েছে। দেবারই কথা। জ্যানির অবশ্য তেমন কিছু অনুভব হয়নি। প্রতি সেকেন্ডে নন-স্টপ যার বেহায়া বিবেকবোধ নড়াচড়ার মাঝেই থাকে, তাকে আজ নতুন করে নড়ানোর কোন দরকার পড়েনা।
আজ নতুন নয়। পৃথিবীর ভূমন্ডলের মানুষ এবং প্রকৃতি নিয়ে এই পৃথিবী কখনোই শান্ত ছিলনা। অতীতে আমরা মানুষগুলো ভয়ংকর, উচ্ছৃঙ্খল ছিলাম। আজ প্রকৃতি ভয়ংকর, উচ্ছৃঙ্খল। শ্যামল এই পৃথিবী আজ দূষিত, বিষাক্তকরণ, রোগ, শোক, অন্যায়ে মানুষের শেষ রক্তবিন্দু টুকু চুষে খাচ্ছে। আর তারই মাঝে লাশের স্তুপ ডিঙ্গিয়ে মানুষ লড়াই করছে বেঁচে থাকার। কোভিড-১৯! কত কি শিখিয়ে গেলে জেগে থাকা ঘুমন্ত মানুষগুলোকে।
কফি শেষ হয়নি। লরেনের অপূর্ব কণ্ঠে বেজেই চলেছে ‘I keep fighting voices in my mind that say I’m not enough’! জ্যানির আরো একটিবার কফির কাপে চুমুক দিল।কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
জানালার বাহিরে তাকিয়ে দেখছে জ্যানি। বৃষ্টি নেই। কখন যে বৃষ্টি থেমে গেল টেরই পেলনা জ্যানি। পুরো আকাশ ছায়া ঘন অন্ধকারে ঢেকে আছে। বৃষ্টি নামার আগের আকাশ আর বৃষ্টি নামার পরের আকাশের মাঝে ব্যাপক একটা পার্থক্য আছে। মেঘ ও বৃষ্টি সৃষ্টির রহস্য।
‘জ্যানি! মা! খাবারগুলো কি ফ্রিজে ঢেকে রাখবো? এবার শুয়ে পর! আমি দেখছি।

আজ একটি বিশেষ দিন। বিশেষত্বহীন এ জীবনে যে একমাত্র বিশষত্ব ছিল, যে ছিল আমার প্রেরণার প্রতিক; সেই ইতির আজ জন্মদিন। দু’বছর আগেই স্বার্থপরের মতো ওপারে পাড়ি দিয়েছে। তার জন্মদিন আজ একাই সেলিব্রেট করবো। রাত বাজে প্রায় একটা। রাস্তার ফুটপাতের ধারে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় একান্তই ওকে নিয়েই এই খোলা চিঠি-
.
প্রিয় ইতি,
জন্মদিনে একগুচ্ছ অপরাজিতার শুভেচ্ছা রইলো। আশা নয়, বিশ্বাস ওপারের তুলতুলে জান্নাতে ভালোই আছো। তাঁরাপুঞ্জেভরা আকাশের ঐ জ্বলজ্বলে তাঁরাটি তুমি তাই না? আমি? ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিক মানুষগুলোর ভীড়ে কোনো রকম বেঁচে আছি। তোমার দেয়া ডায়েরীটায় দু’বছর ধরে কোনো শব্দেরই আঁচড় দেইনি। প্রচন্ড অভিমান বলতে পারো। তুমি ছাড়া অনুভাবিত! পৃথিবীতে বড্ড একা আমি। আমার বাক্শক্তি মাঝরাতে ডুক্রে ডুক্রে কাঁদে তা কেউ দেখে না! আজ তুমি পাশে নেই, তাই নিজের প্রতি কিছুটা অবহেলা নিচ্ছি বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তোমার মতো করে এখন আর কেউ বলে না , তুমি এখনই সেভ করো? শার্টের বোতমটা লাগাও? মুখে সিগারেটের গন্ধ কেন? কী এভাবে বসে থাকলে চলবে?…… কতই না শাসন-বারণ করতে। জানো ইতি, কথাগুলো স্মরণ পড়লেই নিজের অজান্তেই পাগলের মতো হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলি। আমার আত্মাকে সাথে না নিলেও তো পারতে! আমার জন্য এভাবে বেঁচে থাকাটা খুব কষ্টের। স্বপ্নের রঙটা কি হবে তা কিন্তু অমিমাংসীতই থেকে গেলো। মনে পড়ে! তোমার সাথে দেখা করতে যখনই দেরি হতো, খুব অভিমানে থাকতে! আমি শাস্তি স্বরূপ তখন মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ক্ষমা চাইতাম আর তুমি আল্তো করে আমার গালে থাপ্পর বসিয়ে দিতে!
যান্ত্রিক শহরে তোমার আমি ভীষণ একা! কলমটারও যে আজ কি হলো! ধ্যাৎ সম্ভবত কালি…

“এসব এখন কি করবেন?” চোখ গোল গোল করে প্রশ্ন করল একটা কন্ঠ।
“লুকিয়ে ফেলতে হবে।” সাবলীল উত্তর এলো দলপতির কাছ থেকে। তার হাত চলে গেল সম্পদ গুলোর ওপর। সব যাচাই করে দেখছেন তিনি।
দলপতির কথা শুনে খানিকটা গুঞ্জন উঠল। দলপতির সাথে সকলে একমত নয় বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ বলতে পারছে না। থরেথরে সাজানো সম্পদ গুলো থেকে মুখ তুলে তাকালেন দলপতি। সাথে সাথে গুঞ্জন যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই মিলিয়ে গেল। দলপতির চোখ একে একে সকলকে পর্যবেক্ষন করল। যেন এতক্ষন ভেসে থাকা প্রশ্নটা আঁচ করার চেষ্টা করছেন।
“কিন্তু সম্পদ গুলো আমাদের উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজন হতে পারে।” একজন সাহস করে বলে ফেলল কথাটা।
“হুম। বেঁচে থাকলে সম্পদ কাজে আসে বটে।” সামান্য হাসলো দলপতি। “কিন্তু তোমার উত্তরাধিকারীরা কোথায়?”
কারো কন্ঠে কথা নেই। সকলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। শুধু যে কথাটা বলেছে তার চোখে অপরাধ বোধ। মনে হচ্ছে সে এই মাত্র অন্যায় কোন কথা বলে ফেলেছে।
“আমার জানা মতে তোমাদের উত্তরাধিকারীরা জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে পালাচ্ছে।” দলপতি টিটকারি করল।
দলপতির কথা শুনে সকলে দৃষ্টি নামিয়ে নিল। গোরস্থানের নিরবতা নেমে এলো।
“তোমাদের সম্পদ যাতে হারিয়ে না যায় আমি সে ব্যবস্থা করব।” দলপতির কথায় সকলের চোখ চকচক করে উঠল।
“কিভাবে?” সমস্বরে কয়েকজনের কন্ঠে ধ্বনিত হলো প্রশ্নটা।
“উপায় তো নিশ্চয়ই আছে। শুধু একজনের অপেক্ষা!”
*
বারান্দায় বসে আছে আবিদ। তার ছোট ভাইকে কোলে বসিয়ে দুধভাত খাওয়ানো হচ্ছে। আবিদ তাকাতে চাইছে না। কিন্তু বারবার চোখ চলে যাচ্ছে। দুধভাতের সাথে কলা মিশিয়ে কলামাক্ত ভাত বানানো হয়েছে। জিনিসটা দেখলে যেকারো রুচি চলে যাবার কথা। কিন্তু আবিদের ছোট ভাই বেশ আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। তার মুখ ভর্তি করে কলামাক্ত ভাত ভরে দেয়া হচ্ছে। ঢোলের মত গাল ফুলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার ধারনক্ষমতা অতিক্রম করে সেই ভাত গাল বেয়ে পড়ে যাচ্ছে। ছোট মা সেই ভাত আবার মুখে ফেরত পাঠাচ্ছে।
আবিদের এমন কোন স্মৃতি আছে কি না মনে করার চেষ্টা করল। তার মা কি তাকে কখনো এভাবে কলামাক্ত ভাত খাইছে? কোলে বসিয়ে?
নাহ, মনে পড়ছে না। এমন কোন স্মৃতি নেই আবিদের। বেখেয়ালে আবার চোখ চলে গেল ঘরে। ছোট মা আবার ভাত নিয়েছে। এইমাত্র যে পরিমানে খাবার শেষ করা হয়েছে তা আবিদের দুবেলার আহার্য। সেখানে আবার এই ভাত গুলো কোন পেটে দেয়া হবে? ছোট ভাইয়ের পাকস্থলীর ধারনক্ষমতা আন্দাজ করে আবিদের আক্কেল গুডুম হবার জোগাড়।
“আবিদ…”
ছোট মা ডাকছে। আবিদ তাকিয়েই ছিল। হঠাৎ ডাকে চমকে উঠল সে। দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর বৃথা চেষ্টা করল। মনে মৃদু ভয়। তার ছেলের আহারে নজর দেয়ার জন্য এই বুঝি ভৎসনা শুনতে হয়। কিন্তু আবিদের মনে তেমন কিছু ছিল না। আহারের প্রতি তার আকর্ষন নেই। তার আকর্ষনের কেন্দ্রে স্নেহ। আবিদের বিশ্বাস স্নেহের বলেই কলামাক্ত ভাতও তার ছোট ভাই কোৎ কোৎ করে গিয়ে ফেলতে পারে।
“কি হলো এই দিকে আয়…” কন্ঠে প্রতিদিনকার কাঠিন্য নেই।
আবিদ ঘরে ঢুকল। বাবা ঘরেই ছিল। আবিদকে দেখে তার মুখে হাসি ফুটল। এই হাসি আবিদ চেনে। এই হাসি সমস্যা সমাধানের হাসি। তার মাথায় কোন সমস্যার সমাধান চলে আসলে তিনি এই হাসি ঝুলিয়ে চলা ফেরা করেন। সবার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসেন। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু বলেন না। না বললেও আবিদ জানে বিষয়টা। এই মুহূর্তে কোন সমস্যার সমাধান করেছেন তিনি? আবিদ চাইলে জিজ্ঞেস করতে পারে। জিজ্ঞেস করলেই বাবা ভড়কে যাবেন। তার হাসি মিলিয়ে যাবে। আবিদ তা চাচ্ছে না।
“এই দিকে আয়…দুধভাত খা…” ছোট মায়ের মুখেও হাসি। তার হাসির অর্থ কি? চিন্তা করতে করতে এগোল আবিদ। এই মহিলার কোন কথাই আবিদ ফেলতে পারে না। ছোট মা কিছু বললে আবিদের একটা কথাই মাথায় আসে মা যদি এই কথা বলত, এই কাজ করতে বলত তাহলে সেকি না করত? মা কে না করা যায়। কিন্তু ছোট মাকে না করা যায় না। তাকে না করা মানে সৎ মা নামের বোঝাটাকে বাড়িয়ে তোলা। এজন্য শীতের রাতে গলা অবধি পানিতে দাড়িয়ে থাকতে বললেও আবিদ হয়ত না করবে না।
ছোট মা হাত বাড়িয়ে আবিদকে কোলে নিল। হাত পা অবশ হয়ে এলো আবিদের। সাথে সাথে মাথায় চলে এলো প্রশ্নটা, “মা কোলে নিলে কি এমন অনুভূতি হয়?”
আবিদের মত দশ না পেরোনো বালকের জন্য মায়ের কোলে বসে দুধভাত খাওয়া খুব সাধারন দৃশ্য। কিন্তু আবিদের জন্য নয়। এই দৃশ্য তার জন্য নতুন। এই স্নেহ,এই ভালোবাসা তার জন্য নতুন। আরাধ্য স্নেহ হঠাৎ ধরা দিয়ে আবিদকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।
*
আজ সপ্তম দিন। স্নেহের সপ্তম দিবস। সাত দিন আগে ছোট মায়ের মনে যে স্নেহের সঞ্চার হয়েছিল তা আজ পর্যন্ত চলছে। আজও আবিদকে কোলে তুলে দুধ কলা মাখানো ভাত খাওয়ানো হয়েছে। আবিদও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই ক’দিনে সে বুঝতে পেরেছে কলামাক্ত ভাত খেতে অতটাও খারাপ না।
ছোট মাকে দেখে বেশ খুশি মনে হচ্ছে। আবিদকে দেখলে তার মুখে যে বিরক্তির পরত চলে আসত এই ক’দিন দেখা যায়নি। তিনি উৎফুল্ল মনে আবিদের সৎ মা থেকে হঠাৎ মা হয়ে উঠেছে। আর এজন্যই হয়ত বাবাও বেশ স্বস্তিতে আছেন। ঝাড়া হাত পা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার মুখে সেই হাসি এখনো ঝুলে আছে।
একটাই ঘর, দুই পাশে দুটো বিছানা। খাওয়া শেষ করে বিছানায় চলে গেল আবিদ। তার সাথে ছোট ভাইকে থাকতে দেয়া হয়েছে। এই ঘটনাও ঘটছে গত সাত দিন থেকে। তার আগে আবিদের ছায়া মাড়ানো নিষেধ ছিল। সাত দিন আগে কোন যাদু বলে যেন সব পরিবর্তন হয়ে গেছে।
আবিদের ঘুম আসছে না। ঘুমের ভান করে পড়ে আছে। ঘুমালে হয়ত সে নড়াচড়া করে। কিন্তু ঘুমের ভান করে আছে বলে নড়াচড়া করতেও ইতস্তত করছে।এভাবে কতক্ষন পড়ে আছে কে জানে। নিশ্চয়ই মধ্যরাত পেরিয়েছে। হঠাৎ সড়সড় শব্দে আবিদের গা শিউরে উঠল। বিছানার নিচ থেকেই আসছে শব্দটা। মাথা তুলে দেখতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছে না। আবার হলো শব্দটা। ধাতব বস্তু টেনে নিয়ে যাবার শব্দ।
আবিদের দম আটকে আছে। হাত পা যেন বিছানায় আটকে আছে। বাবাকে ডাকতে ইচ্ছা হলো। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না। এক মুহূর্ত আবিদের মনে হলো সে বুঝি স্বপ্ন দেখছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আবার হলো শব্দটা। ধাতব শব্দ। মাটি ঘষে ভারি কিছু টানা হচ্ছে। শব্দটা থামার আগে ঝনঝন সব্দ তুলে থেমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছে।
এখন নিয়মিত বিরতিতে হচ্ছে শব্দটা। প্রতিবার একই রকম শব্দ। ভয় হলেও সয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আবিদ ক্রমেই ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে। শব্দটা থেমে গেছে সে খেয়ালই করেনি। গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে সে দুজনের কন্ঠ শুনতে পেল। ফিসফস করে কি যেন বলছে।
*
“এতদিনে তোমার আসার সময় হলো?” দলপতি গমগম করে উঠলেন।
“এগুলো বের করতেই সময় লেগে গেল।” মাথা নিচু করে বলল লোকটা।
“তুমি একা এসব এনেছো? আর বাকিরা শুধু খোমাটা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে?”
“দোষ হলে মার্জনা করেন।”
“তোমার জন্য আমরা সাত দিন ধরে বসে আছি। এই গুপ্ত ঘরে রোজ রোজ যাওয়া আসা তো মুখের কথা নয়। এটা নিশ্চয়ই তোমার জানা আছে?” দলপতি বেজায় খেপেছেন ।
“জ্বি।” নতস্বরে বলল লোকটা।
“কিন্তু জানার পরেও তুমি দেরি করে এসেছো। একদিন দুইদিন নয় সাত দিন পরে। তবুও আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি। কেন অপেক্ষা করেছি সেটা নিশ্চয়ই জানো? নাকি সেটাও ভুলে বসে আছো?”
“ভুলি নি। সব মনে আছে। কথা যখন দিয়েছি কথা আমি রাখবই।” হঠাৎ লোকটার চোখজোড়া চকচক করে উঠল।
“বেশ! প্রস্তুতি কতদুর?” দলপতির মন যেন হঠাৎ নরম হয়ে এসেছে।
“শেষ পর্যায়ে। যাতে কেউ সন্দেহ না করে সেজন্য সামান্য সময় নিচ্ছি। কবে কাজটা করতে চাচ্ছেন?”
“ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। শুভশ্রী শীঘ্রম!”
*
আবিদ বসে আছে। তার সামনে থরে থরে ধন-সম্পদ সাজানো। বড় ছোট কাসার পাত্রে স্বর্ণ মুদ্রা, রৌপ্য মুদ্রা শোভা পাচ্ছে। মুদ্রা গুলো যেন উপচে পড়ছে। কিছু পাত্রে স্বর্ণালংকার দেখা যাচ্ছে। অলংকার গুলো পাত্রের তলানিতেই পড়ে আছে। পাত্র গুলো ঘিরে সারি সারি ঘি এর প্রদীপ আলো দিয়ে যাচ্ছে।
মাথা ভেজা ভেজা লাগছে। নিজের মাথায় হাত দিল সে। তেলে চপচপ করছে পুরো মাথাটা। চুলগুলো সুশৃঙ্খলভাবে আঁচড়ানো। নিজের চোখে হাত দিল আবিদ। হাতে কালো সুরমা উঠে এলো। কে তাকে সাজিয়ে এখানে পাঠিয়েছে? প্রশ্নের উত্তর পেল না আবিদ।
আবিদ চোখ তুলে তাকালো। তাকে ঘিরে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে। এরাই বুঝি এই সম্পদ গুলোর মালিক। সকলে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে আছে। মানুষের ভিড়ে সে কোথায় আছে কিছুই বোঝা গেল না। ঘরটা যেন চির নৈশব্দের কোন জগত। কারো মুখে কোন কথা নেই। শুধু একজন গম গম শব্দ তুলে রেখেছেন পুরো ঘরটাতে। আবিদের সামনেই বসে আছেন তিনি। হালকা গড়নের লোকটা সাদা ধুতি পরেছেন। তার চোখ বন্ধ। বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াচ্ছেন। দ্রুত গতিতে চলছে মন্ত্র পাঠ।
আবিদ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে উঠে দাড়াতে চাইলো। পারলো না। কেউ যেন শেকল দিয়ে মাটির সাথে বেধে রেখেছে তাকে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘরটা দেখার চেষ্টা করল সে। বোঝার চেষ্টা করল সে কোথায় আছে। কিন্তু মাটির ছাদটা ছাড়া কিছুই দেখা গেল না। মাটির ছাদ? মাটির ছাদ থাকবে কেন? প্রশ্নের উত্তর পেল না আবিদ। চোখ চলে গেল ঘি এর প্রদীপ গুলো দিকে। সেখান থেকে সামনে বসা লোকটার দিকে। তার মন্ত্র পাঠ শেষ হয়ছে। চোখ খুলেছেন।
“হে যখ তোমার হাতে এই রত্ন রাজি তুলে দিলাম। তুমি এর রক্ষণাবেক্ষণকারী।” একটা কাসার পাত্র এগিয়ে দিল লোকটা। আবিদ সম্মোহিতের মত তার হাত থেকে পাত্রটা নিয়ে পাশে রেখে দিল।
ভিড় থেকে অন্যজন এগিয়ে আসলো।
“হে যখ, তোমার হাতে এই রত্ন রাজি তুলে দিলাম। উপযুক্ত উত্তরাধিকার ছাড়া এই রত্ন হস্তান্তর করো না।”
“হে যখ, তোমার হাতে এই রত্ন রাজি তুলে দিলাম। তুমি তো মানুষ চেন। লোভী কারো হাতে এই রত্ন হস্তান্তর করো না। ”
একে একে সকলে আবিদের হাতে সম্পদ তুলে দিল। এবার প্রস্থানের পালা। সুশৃঙ্খল লাইনে সকলে প্রস্থানের পথে এগিয়ে গেল। তখনই চোখে পড়ল সিড়িটা। মাটির সিড়ি। ধাপে ধাপে উপরে চলে গেছে। এই ঘরটা কি তাহলে পাতালপুরীতে? আবিদ প্রশ্নের উত্তর পেল না। সে খেয়াল করল তার ভয় লাগছে না। সকলে তাকে পাতালের ঘরে রেখে চলে যাচ্ছে। অথচ তার ভয় করছে না। সে উঠে যাচ্ছে না। তার যেন ফিরবার তাড়া নেই। সে আগ্রহ নিয়ে সকলের প্রস্থান দেখছে। মহাশূন্যের সকল ঘুম যেন তার চোখে ভর করেছে। উঠে যাবার শক্তিটুকু যেন তার শরীরে অবশিষ্ট নেই।
“আমাকে চিনতে পারিস আবিদ?” সাদা ধুতি পরা লোকটার কথায় ঘুরে তাকালো আবিদ। মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করল। এই লোককে কি তার চেনার কথা? ঘুমে আবিদের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।
“আমাকে চিনতে পারিস না? তোকে মানুষ চিনতে হবে… তোকে মানুষ চিনতে হবে…”
.
“আবিদ, আবিদ” আবিদ হুড়মুড় করে উঠে বসল।
“এই ভর সন্ধ্যায় ঘুমাইছিস কেন? শরীর খারাপ?” বাবা জিজ্ঞেস করল।
আবিদ না সূচক মাথা নাড়ালো।
“না খেয়ে শুইছিস আয়। দুধভাত খা।” ছোট মা অন্য বিছানায় ভাত নিয়ে বসে আছেন।
আবিদ উচ্চবাচ্য না করে ছোট মায়ের কাছে চলে গেল। ঘুমে টলতে টলতে কোলে উঠে বসল। আজ দুধভাত খাবার দশম দিন। খাওয়া শেষে বাবা বললেন, “আবিদ চল হাট থেকে ঘুরে আসি।”
আবিদ কোন কথা বলল না। তার ঘুমের ঘোর যেন কাটেনি। বাবা বললেন, “মরিয়ম, আবিদকে একটু সাজায়া দেও। মাথায় তেল দিয়া চুল আঁচড়ে দেও। চোখে একটু সুরমা লাগায় দেও।”
ছোট মা হাসি মুখে আবিদের মাথায় তেল দিয়ে দিল। থুতনি ধরে চুল আঁচড়ে দিল। কাজটা তিনি করলেন প্রথমবারের মত। এরপর চোখে সুরমা দেয়া হলো।
আয়না এগিয়ে দিয়ে ছোট মা বলল, “দেখ কেমন রাজপুত্রের মত লাগছে।”
ছোট মায়ের চোখে মুখে আনন্দের ঝলকানি। এমন আনন্দ দেখলে যে কেউ আনন্দিত হবে। কিন্তু আবিদ কেন যেন আনন্দিত হতে পারছে না। বাবার মুখেও হাসি। সেই সমস্যা সমাধানের মেকি হাসি।
বাবার হাত ধরে আবিদ রাস্তায় নামল। রাস্তায় নেমেই সে তার প্রশ্নের উত্তর গুলো একে একে পেয়ে গেল। কে তাকে সাজিয়ে পাঠিয়েছে! বাবা কি সমস্যার সমাধান করেছেন! সবকিছুর উত্তর পাওয়া গেল একনিমিষে।
আবিদ জানে বাবা মোটেও হাটে যাচ্ছেন না। মধ্যরাতে কেউ হাটে যায় না। অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন তিনি। তিনি বেরিয়েছেন গোপন সেই ঘরে যাবার জন্য। যেখানে সকলে তাদের ধন-সম্পদ জড়ো করেছে। এখন শুধু যক্ষের অপেক্ষা!

বর্ষার মাঝামাঝি। তীব্র রোদ। ঝলসে যাচ্ছে চারদিক। দোলার জমিগুলোতে চারাগাছ তুলে কৃষক বোরোধান লাগিয়ে দেয় এখন।
সেই ধান বর্ষা আসার সময় ডুবে যেতে থাকলে আধাপাকা অবস্হায়ও কেটে ফেলে কৃষক। কখনো ধানের শীষের কাছে কেটে নেয়। পানিতে ডুবতে ডুবতে ধানগাছের যতটা পানির ওপরে থাকে সেখান থেকেই কৃষক ফ্যাসাতে থাকে ধান।
বৈশাখের শুরুতে বেশ বৃষ্টি হলেও এখন তেমন বৃষ্টি নেই। পানিতে টান পড়লে দোলার পাড়ের কেটে নেয়া ধানের নাড়ার কিছুটা অংশ জেগে উঠেছে।
পঁচার বাপ জয়নাল। এই ভরা আগুন ঝরা দুপুরে মাথাল মাথায় দিয়ে বরশি নিয়ে মাছ ধরতে বসে আছে দোলার পাড়ের রাস্তায়- যে রাস্তা চলে গেছে খাতরাপাড়া বরাবর।
দোলার এই নাড়াক্ষেতে পানি কোন জমিতে হাঁটু পরিমাণ, কোন জমিতে উড়ু পরিমাণ। নিচু জমিতে কোমড় ডোবে, কোথাও তো বুক পরিমাণ পানি।
হাঁটু পরিমাণ নাড়া ডোবা ক্ষেতে পঁচার বাপ লুঙ্গিতে মালকোচা মেরে নেমে গিয়ে বরশি ফেলার জায়গায় হাত দুই জায়গার নাড়া, শাপলা গাছ, আগাছা গোড়াসমেত উগলায়ে গোলাকার খলান বানায়। তিনটি বরশির জন্য তিনচার হাত দূরে দূরে তিনটি খলান। জয়নাল এগুলোকে বলে ফুট। ফুট বানানোর পর পাড়ে এসে ধানের কুড়া আর বাসী ভাত মিশিয়ে দলা পাকিয়ে ঢিল দিয়ে দিয়ে ফুটের মাঝখানে ফেলে। টেংরা, টাকি, মাগুর এসব মাছ ফুটের খাবারের লোভে এসে বরশির টোপটাও গিলে নেয়।
জাদুমন্ত্রের মত ভেলকী দিয়ে পঁচার বাপ টপাটপ টাকি, মাগুর বরশির ছিপ চটকা দিয়ে তুলে আনে পানির ওপরে ডাঙ্গায় আর রাস্তার কাছাড় ঘেঁষে পানিতে তলা ডোবানো খলাই ভরতে থাকে সে মাছ জমিয়ে জমিয়ে।
বরশির টোপ গিলে মাছ যখন বরশির ফাতনা ডুবিয়ে নিয়ে দিগবিদিগ ভোঁ দৌঁড় দেয় পানির ভেতর, পঁচার বাপ ছিপ ধরে কিছুটা হেলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে চটকা মেরে মাছের গতিপথ একশো আশি ডিগ্রী বিপরীতে নিজের দিকে নিয়ে আসে।
ছিপের সু্ঁতোর প্রান্তে বরশি গেলা হাঁ করা গোলশা টেংরা, টাকি মাছ ঝ্যাঙ্টাতে থাকে আর কেমন সুঁতার পাক খুলতে ঘুরতে থাকে।
পঁচার বাপের এই এক গুণ এলাকায় সবার জানা। মাছ যেখানে নাই সেখান থেকেও সে মাছ ধরতে পটু।
আমরা ছেলেরা তারপাশে লোভে লোভে বরশি নিয়ে বসে যেতাম। আমাদেরকে তখন সে নড়াচড়া করতে নিষেধ করতো।
পাছে মাছ টের পেয়ে ভয়ে পালিয়ে যায় তাই চনচনা রোদে এমন চুপচাপ ধ্যান ধরে বসে থাকতো সে। দূর থেকে মনে হতো কাকতাড়ুয়া পানির ওপর হেলে বসে আছে যেন।
চুপচাপ রোদে বসে বা বৃষ্টির ভেতর দোলায় নদীতে পঁচার বাপ কী অদ্ভূতভাবে মাছ ধরতে কামিয়াব হতো আমরা বড়বড় চোখ করে দেখতাম।
আমাদেরকে সে বলতো, আমি বরশিত্ সুপারগুলু লাগাইয়্যা দেই। হেই জুন্নে মাছ আইয়া কোনমতে ল্যাজের ছুয়াও যুদি দেয় আমার বশ্শিত্ তালি অর বাপের ক্ষমুতাও নাই পলাইয়া যায়। আইটক্যা যাবোই।
আমাদের তখন করুণ দশা। ইশ, এরকম আমাদেরও যদি থাকতো বরশি। বুঝতে পেয়ে পঁচারবাপ বলতো, আরে, আমার বশ্শি অইলো জাদুর বশ্শি। তিরিশ টেহা দাম একেকটার। কিনবি নাহি। আচে আমার কাচে আরো কয়ডা।
তখন বরশির দাম চারআনা আটআনা বড়জোর একটাকা ছিলো। বরশি মানে লোহার কলটুকু। আমরা কল কিনে, ঘুড়ি ওড়ানো পাঁচ-সাত হাত সুঁতার একপ্রান্তে কল বেঁধে অন্যপ্রান্ত বাঁশের লম্বা মোটা কঞ্চির বাঁকানো মাথায় বেঁধে বরশি বানাতাম।
অতটাকা আমাদের থাকতোও না তখন। আমাদের বড় আফসোস হতো। আর লোভাতুর চোখে আমরা পঁচার বাপের মাছ শিকারের ভেলকিবাজি দেখতাম।
বর্ষায় উঁচু জমি থেকে নালা দিয়ে দোলায় পানি নামতো যেখানটাতে সেখানে পঁচার বাপ চটকা জাল ফেলতো। আমরাও ফেলতাম। কী যে জাদুমন্ত্র বলে পঁচারবাপের জালে সব দারকিনা, পু্ঁটি- খলশে মাছের ঝাঁক গিয়ে মুড়িমুড়কির মত উঠতো আমরা ভেবে পেতাম না।
একবার ওলাওঠা রোগ এলো গ্রামে। আরে বাপরে। মানুষ সব যা খায় অবিকল তাই হাগে। পথে-ঘাটে পাটক্ষেত, গমক্ষেতের আইলে মানুষ হাগতো তখন।
ওলাওঠা মানে কলেরায় সয়লাব হয়ে গেলো গ্রাম।
লোকমুখে আমরা শুনি, রাতের অন্ধকারে ওলাওঠা বুড়ি বাড়িবাড়ি নাকি ঘোরে আর রোগ ছড়িয়ে বেড়ায়। রাতে গ্রামের সব মানুষ দরজা জানালা খিল দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকে।
এমন নিস্তব্ধ নিষুত রাতে দোলার পানিতে ঝপঝপ করে জাল পড়ে- ঝাঁকি জাল।
আমরা কাঁথার ভেতর থেকে কান খাড়া করে শুনি সে জাল পড়ার শব্দ।
পরের দিন পঁচারবাপ গল্প মারে আমাদের সামনে, তরা তো হইলি ডরপাদুরা সব। জানোস, আমি রাইতে মাচ মারতাচি, উপুর অইয়া জালের ফাঁস থিকা মাচ খুইলা খালোইয়ে থুইতাচি। সোজা অইয়া আচমকা দেহি আমার সামনে ওলাওঠা বুড়ি খাড়া। শুনে আমাদের ভেতর সে কী উত্তেজনা। -তারপর?
পঁচার বাপ আরো নাটকীয় বর্ণনার অবতারণা করে, -তরা মনে করতাছস ডরাইচি! না আমি ডরাইন্যা বান্দা না। বুড়িরে এমন ধমক দিয়া কইলাম, বুড়ি বাঁচপার চাস তো আমার খালই ধর। মাচ ধরতি অসুবিদা অইতাচে। নইলি এই জাল দিয়া আটকাইয়া তরে ওই পাগারের পানিত্ ডুবাইয়া থুমু। বুড়ি তো তরাশের চোটে কয়, দে দে, খালই দে ধরি। আমারে পাগারে ডুবাইশ না।
আমরা পঁচার বাপের গল্প গিলি হাঁ করে।
কী ঘোর বৃষ্টিতে অথবা বানের পানি নেমে যাওয়া চাষের জমির অল্প অল্প পানিতে মাঝরাতে বাড়ির পেছনে আমরা দেখতাম পাটকাঠির আগুন আর কোচা নিয়ে থপথপ করে মাছের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে পঁচার বাপ।
অল্প পানিতে সদ্য রোপা ধানক্ষেতে কাস্তে- বেকি দিয়ে কুপিয়ে রাতের আঁধারে শিং-টাকি মাছ মারতো পঁচার বাপ। গ্রামে একে বলতো শোলক কোপানো।
গত সপ্তাহে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। দোলা ভরে উঠেছে উঁচু জমির পানি নেমে। এই পানি কচুরিপানা সমেত স্রোত বয়ে নিয়ে পড়ছে গিয়ে মাদারকুড়ায়। মাদারকুড়া হলো ফুলকুমার নদীর শাখানদী। এই শাখা গিয়ে ধরকা নদী নাম নিয়ে এগিয়ে গিয়ে যুক্ত হয়েছে ধরলায়।
ঊজানের সীমান্ত এলাকা থেকে একরাতে বানের পানির স্রোতের পাকে গভীর খালের সৃষ্টি হয়েছে নদীর উত্তরদিকের পাড় ঘেঁষে। সেখানে যেতে হয় কুড়ার পানিতে নুয়ে পড়া বাঁশবনের ভেতর দিয়ে। বাঁশ বনের দু’পাশে ফার্ন, জংলি ঢেঁকিশাকগাছের চিরল চিরল পাতা। পাতার গায়ে চিনাজোঁক লকলকে জিহ্বা নিয়ে যেন বুনোঝোঁপ-ঝাড়ের পাতার ওপর দিয়ে সাঁতরে আসতে চায় কোন প্রাণী, বিশেষ করে মানুষের ভাঁজ পেলে।
আমরা পারতপক্ষে কুড়ার ওই এলাকায় যেতাম না। আমরা বড়দের কাছ থেকে কেমন করে জেনে যাই, কুড়ার গভীর পানির নিচে আছে কালা মাশান, তার জটাধরা চুল। সে সুযোগ পেলে নদীতে সাঁতরে নদীর মাঝে চলে যাওয়া ছোটদের পা টেনে কুড়ার গভীর তলদেশে নিয়ে ঘাড় মটকায়।
কুড়ার ওপাড়ে রবি ফসলের ক্ষেত। গম আর মশুর কলাইয়ের আবাদ বিস্তর। কুড়ার কাছাড়ের ওপর দীর্ঘদেহী বেলগাছ। গোড়ায় বেত আর হেলেঞ্চার ঝাড়। বেল গাছের তলায় শুনশান শ্মশান ঘাট।
শ্মশান ঘাটের কাছে কুড়া পড়ায় বাঁশবনের ওই পাড়ে মানুষের আনাগোনা তেমন সচরাচর থাকে না। ফলে মাছের অঘোষিত অভয়ারণ্য যেন কালোজলের টলটলে গভীর এ কুড়া।
সন্ধ্যা থেকেই জমাট মেঘে গুমোট ধারণ করে আছে আকাশ। একটা-দুইটা তারা এই দেখা যায়- এই ঢাকা পড়ে মেঘের আড়ালে।
রাত কিছুটা ভারী হলে ঝমঝম বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই একটানা।
মাঝরাত অব্দি বৃষ্টির তুমুল মাতম। মনে হয় দুনিয়া ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আমরাও ঘুমিয়ে পড়ি কখন জানি না।
রাতের শেষ প্রহরে কুড়ার ওপারে কার একটানা ভয়ার্তনাদ পানিতে ভেসে এপাড়ে বসতি এলাকায় আছড়ে পড়ে মানুষের ঘরবাড়ির বেড়ায়-চালে।
-ওরে আসমত রেএএএএএএএএ, ওরে রমজাআআআআন, আমারে নিয়া যা রেএএএএএএএ…..
গ্রামের মানুষ সব জেগে ওঠে এমন বিপদাপন্ন মানুষের আর্তনাদে। সবাই আগুন ও টর্স লাইট নিয়ে ছুটে বের হয়ে কান খাড়া করে আন্দাজ করে বিপদাপন্নের অবস্থান।
হৈহৈ রবে সবে ধুপধাপ ছুটে যায় মাদার কুড়ার পাড়ে।
এপাড় থেকে আসকর আলী মুখে দুই হাত বিশেষ কায়দায় মাইকের হর্নের মত বানিয়ে ডাক ছাড়ে, ক্যারা গোওওওওও।
কুড়ার ওপাড়ে শ্মশান ঘাটের পাশ থেকে জবাব আসে, আমি গোওওওওও, আমি জয়নাল, পঁচার বাআআআআপ। আমারে নিয়া যাইন গোওওও।
বড় অসহায় আর ভয়ার্ত সে অনুনয় ভেসে আসে মাদারকুড়ার পানি ছুঁয়েছুঁয়ে।
কয়েকজন ডাকাবুকো লোক জোট বেঁধে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে লাঠি সোটা হাতে ডানে-বামে ঝাড়-জঙ্গলে, বাঁশের গায়ে ঠংটং পিটন দিয়ে শশব্দে এগিয়ে গিয়ে শ্মশান ঘাটের চাতালে উপস্থিত হয়।
আলো ফেলে নিচে তাকিয়ে দেখে বুকসমান পোঁতা বাঁশের গোঁজ ধরে ভেসে আছে জয়নাল।
কয়েকজন যারা বেলতলায় কোন পুঁজো শেষে সবাই চলে গেলে নারকোল আর বেল ও অন্যান্য সামগ্রী চুরি করে খায় নানা সময়, যাদের কাছে ভুতুরে এ মাদার কুড়ার শ্মশান ঘাট নস্যি ব্যাপার, তারা রারা করে নেমে গিয়ে তুলে আনে পঁচার বাপ জয়নালকে।
দেখা যায় জয়নালের হাতের কবজিতে বাঁধা ঝাঁকি জালের রশি। আর জাল পড়েছে গিয়ে পানিতে পোঁতা বাঁশের গোঁজের ওপর।
জাল ছাড়িয়ে জয়নালকে নিয়ে সবে এপাড়ে ফিরে এলে উদ্ভ্রান্ত, সন্ত্রস্ত জয়নালের কাছে জানতে চায় এই তুমুল বৃষ্টির মাঝরাতে সে কেন মরতে গেছে বাঁশবন পেরিয়ে শ্মশান ঘাটের ওখানে।
জয়নাল ভুতে পাওয়ার মত বলে, আমি তো জাগনা জাগনা ভাব। কহন চোক্কের ওপর ঘুম নাইমা আইছে। বিষ্টি খানেক কইমা আইলে হুনি, ঘরের বাইরে বেড়ার ফাঁকে বছর আলি ডাহে, অ জয়নাল, বিস্টি নাইকা, বাইরইয়া আয় জাল নিয়া। মাদার কুড়ায় মাচ গাবাইচে। দেরি করিস না। চুপচাপ বাইরইয়া আয়।
আমি জালডা ঘাড়ে ফালাইয়া বছর আলির পাছে পাছে কিবা দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া যাইতে থাকলাম। আমি যত কই, বছর বাই, একটু থাম, তোমার কাচাকাচি হইবার পারতাচি না। ততই বছর বাই মুনে অয় পানি আর জমিনের ওপর দিয়া ভাইসা ভাইসা যায়।
আমিও কিবা কইরা জানি হের পাচেপাচে কুড়ার ওইপারে চইলা গেলাম।
যাইয়া যেই খারাইচি কুড়ার ওপর দেহি পানির ওপর বছর ভাই। কয় জাল ফালা জাল ফালা জয়নাল। দেহস না কত বড় বড় মাচ। আমি চাইয়া দেহি, হ, কত বড়বড় মাচের মাতা, বড় বড় হা কইরা পানিত ভাইসা ফাকাত ফাকাত শব্দ করতাচে। এরপর বড় মাচের ঝাকের ওপর যেই না জাল ফালাইছি, বছর ভাই কিবা জানি বিটকইল হাসি হাসতি হাসতি মিলাইয়া গেল আইন্দারের ভিতর। হের পর চাইয়া দেহি, জালের টানে আমি চিতা ঘাটের কাছাড় থিকা নিচের দিকে ছেলচেলাইয়্যা পড়তে আছি।
পচার বাপ জয়নালের এইসব কথা গ্রামের লোকজন ঘিরে ধরে শুনতে থাকে। শুনতে শুনতে কখন পূব আকাশে লাল আভা দেখা যায়।
আর দেওয়ানীবাড়ি থেকে মোরগের কুক্কুরু কুউউউউ ডাকে সবাই সম্বিত ফিরে পায়।
ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে।

আজ কাল অকারণে আলোচনার পাহাড় গড়ি।।
অকারনে কলম ধরি।।যতবারই লিখি,ততবারই সারাংশ আসে নিজের মতো বাঁচি।।নিজেকে ভালোবাসি।।যেনো এ পৃথিবী আমার একার।।আমি একাই রাজত্ব করি।।।আমি রাজা হতে চাইনা।রাজত্বে মনোনিবেশ আমার সম্ভব নয়।।।আমি স্বাধীনচেতা।। আমি পাখি।পাতায় নাচি।আমি সূর্য।।কখনও আকাশ।।সমুদ্র, ঝর্ণা ও নদী।।আমার বিচরণে তোমার চিহ্ন মাখা স্পর্শে ফিরে পায় প্রাণ যেনো উজ্জ্বল দীপ্তলোকে।।কলতানে।। ছন্দে ও সবুজে।।
ভালোবাসায় স্বার্থ থাকেনা আমি বিশ্বাস করতে আজও পারিনি।।কাওকে দান করার সময়ও মনে মনে কিছু চেয়ে বসি।।
আমার মতো শ্যামাও নিজেকে ভালো রাখতে ভালোবেসে ছিলো দোয়েল কে।।খুব কাছে গিয়েছিলো সুখ অনুভব করতে।।মধুর আলিঙ্গন শ্যামা কে করেছিলো সুখি।।ঈশ্বর ভেবে সুখ গুলো ভাগাভাগি করেছিলো দোয়েলের মাঝে।।সঁপেছিলো একাকী থাকার মুহূর্ত গুলি।।দুটি ঠোঁট এক হয়ে গান বাঁধে।।
দুটি হৃদয় এক হয়ে সবুজ পৃথিবীতে সাজে।।
কি করছো কি!!
নিজেকে সামলিয়ে দোয়েল বলে উঠে তোমাকে স্পর্শ করছি।।
শ্যামার শুষ্ক ঠোঁটে এক সমুদ্র জলের উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয় কতটা কাঙাল হয়ে মুহূর্ত পাড়ি দিয়েছে দিনের পর দিন।।
কি করছো কি!
তোমার শাড়ির ভাঁজ ঠিক করে দিচ্ছি,ক্ষতি কি!!
কি হচ্ছে কি!!
নীল টিপে তোমাকে বেশ মানায়।।
শ্যামা নিজের অজান্তেই দোয়েলের বুকে মাথা গুঁজে আর একাকী আনমনে ভাবে
তোমাকে কাছে পাওয়ার মুহূর্তে জেগে থাকি নিশিদিন.. শ্যামা ইনিয়ে বিনিয়ে কতভাবে দোয়েলকে অনুভব করে তার বিন্দু মাত্র বুঝতে দিতে চায়নি শ্যামা।।দোয়েল -শ্যামার অনুভব কত না কত ভাবে তাদের কাছে টেনেছে।।
উড়তে শিখে শ্যামা সুর বাঁধে দোয়েলের সুরে।।সুন্দর মুহূর্ত গুলো ভাগাভাগি করে কাল্পনিক পাতার অবসান ঘটিয়ে খুব কাছে আসার মুহূর্ত স্মরণীয় করতে চিবুকের সুখোকর লাল চিহ্ন ক্ষয়ে না যাক.. সে স্বপ্নে গভীরতায় অতলে ডুবে যায় শ্যামা।।গন্তব্যের শেষ নেই জেনেও সাঁতারের আগ্রহ কমেনা শ্যামার।।লাজ – লজ্জা দমনের সামর্থ্যের অযোগ্য শ্যামা তীরদেশে যাবার সন্ধিক্ষণে..
দোয়েলের কোমল হৃদয়ে ক্ষরতার উপস্থিতি জানান দেয়..
শ্যামা.. কি হচ্ছে কি!!
তোমাকে আদর করে মন ভরছে না।।আরও কাছে যেতে চাই।।
কি হচ্ছে কি!!
শাড়ির এলোমেলো আঁচল।।লেপটে যাওয়া নীল টিপ।।বুকের মধ্যে তোমাকে আকঁড়ে ধরার মুহূর্ত?তুমি যেভাবে চেয়েছো আমি সেভাবেই তোমার সামনে।।
ইচ্ছেরা সীমাহীন লুটোপুটি তে মশগুল।।তোমার স্পর্শে দাও প্রাণ দোয়েল..
শ্যামা অস্থির সময় পার করে নিজেকে সামলিয়ে আপন মনে লিখে যায় দোয়েলের ফিরে যাবার গল্প।।
নিজেকে প্রশ্ন করেও উত্তর পায়নি শ্যামা।।বর্ণে,ছন্দে সুগন্ধিতে রাঙিয়ে শ্যামা পারেনি দোয়েলের আকাশে ঠিকানা গাড়তে।। শ্যামার লিখিনিতে নীল কালিতে স্পষ্ট লেখা ছিলো..”কখনই প্রেমিক হতে পারোনি তুমি।।তোমার ডানা কাটা।।তুমি অন্যের ডানায় ভর করে উড়তে চেয়ে নিজের পথ ভুলে কাপুরুষত্ব কে বরণ করেছো।।আমি তোমায় আমার একটি ডানা দিতে চেয়েছিলাম।।কিন্তু..তোমার উথাল পাতাল সিদ্ধান্ত তোমাকে করেছে বিবেকহীন।। আমি তোমায় উড়ার সুখ দিতে চেয়েছি।।কিন্তু শিকলে বাঁধা পা তোমায় করেছে সংকীর্ণ।। পারবেনা যখন ভালোবাসতে,তাহলে কাছে এসেছিলে কেনো!!আমার কাছে আসার গল্পে তোমার উপস্থিতি আমাকে জাগিয়ে রেখেছিলো।তুমি কাছে না আসলে কোথায় পেতাম এমন মধুর স্মৃতি।। কোথায় পেতাম এমন অতলে তলিয়ে যাবার সুখ।।।সুখে থাকো দোয়েল।। সুখে থাকুক তোমার শ্যামা হীন জীবন”
ইতি
শ্যামা।

লাল সূর্যটা গোধুলির আবীরে গা ঢাকা দিয়েছে ৷ চারপাশ কোলাহল মুক্ত ৷ ইফতারীর এই সময়টা সারাদিনের ব্যস্ততা যেন থমকে দাঁড়ায় ৷ সবার মধ্যে ঘরে ফেরার তাড়া ৷ প্রকৃতি থমথমে , খানিক আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে ৷ রাস্তায় কোথাও কোথাও পানি জমে আছে ৷ ক’ য়েকমাস আগে করা রাস্তা খানিকটা জলবন্দি হয়ে থাকে ৷ পাড়ায় বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মিত হচ্ছে ৷ বালি, ইট, কাঠ, লোহা বহনকারী ট্রাক ঢুকছে ৷ রাস্তা নির্মান প্রকল্পে ভারী যানবাহন চলাচল উপযোগী এ রাস্তা নির্মান পূর্বে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে কিনা ৷ অথবা করা হয়েছে সেভাবে নির্মিত হয়নি ৷ একটা কিছু ঝামেলাতো হয়েছে ৷
রাস্তার পাশ দিয়ে ড্রেন ৷ জলাবদ্ধতায় রাস্তার সাথে ড্রেনের ছিদ্র করে পাবলিক পানি গড়িয়ে দেয় ঐপথে ৷ বৃষ্টি তো আর জানান দিয়ে আসে না ৷ আবীর আজ ছাতাটাও সাথে নিয়ে যায়নি ৷ ফলে বাড়ি ফেরার পথে কোথাও দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ঠেকাতে হয়েছে ৷ তিনি রোজ এপথেই অফিসে যান ৷ দুই কিলো পথ হাঁটেন ৷ আসার সময় ছেলে মেয়ে অপেক্ষায় থাকে বাবা তাদের জন্য কিছু না কিছু তো আনবেনই ৷ মা আনিছা ইফতারীর জন্য যাই করেন বাচ্চাদের পছন্দ বাইরেরটা — বাবার আনা ইফতার ৷
আবীর অফিসের কাজে নিবেদিত প্রাণ ৷ ঝর, বৃষ্টি তার ইচ্ছের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না ৷ আনিছা নানা ছল ছুতো দেখিয়ে বলবে আজ আকাশটা খারাপ যাবার দরকার নেই ৷ বাসায় ছেলেমেয়ের সাথেই কাটাও ৷ ওর মনের কথা গোপন রেখে ছেলেমেয়ের কথা বলেই স্বামীকে ঘরে ধরে রাখতে চায় ৷ বিফল চেষ্টা ৷ এখন বলাই বাদ দিয়েছে ৷ অফিস তার জগত ৷ মাঝেমধ্যে আবীর নিজেকে ক্লান্ত মনে করলে অফিস চত্বর থেকে খানিক দূরে বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে জলরাশির উপরে রক্তিম উদার আকাশ,গোধূলি লগ্নে উন্মুক্ত নদীতীর ওর দারুন লাগে ৷ এখানে দাঁড়িয়ে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করেন তিনি৷ আকাশের রক্তিম রঙে নদীর জল রঙিন হয়ে ওঠে। এ সময় দিগন্তে দ্রুত রং বদলাতে থাকে। আবীরের মনের রং একসময় পাল্টে দূর অতীতে হারিয়ে যায় ৷ বলাকার কথা খুব মনে পড়ছে ওর ৷
কেমন আছে সে ? সেতো এখন অন্যের গৃহিনী ৷ একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন একতরফা ভালোবেসে গিয়েছে সে ৷ সাহস করে যেদিন বলবে বলে ভেবেছে তখন জেনেছে অন্যত্র ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে ৷ নিজের গালে নিজেই চপেটাঘাত খেলো সেদিন৷ বলাকার কপালে লাল টিপ ওর ভীষন পছন্দ ছিল ৷ পয়লা বৈশাখে লাল সাদা শাড়ি, লাল টিপে নিজেকে সাজালে মনে হোতো অস্তগামী সূর্যের লাল টিপ কপালে পরে গোটা পৃথিবীটাই যেন নববধূর সাজে সেজেছে । ঝিলিমিলি ঢেউখেলানো সোনারঙের জলে বলাকার মুখটাই যেন ভাসতে দেখে আবীর ৷ নদীর তীর ঘেঁষে উড়ে চলে সাদা বক,গাঙচিলের ঝাঁক। রক্তিম সূর্য তার উষ্ণতা বিলিয়ে লাল হতে হতে নিচে নামতে থাকে ৷ কি মায়াকাড়া দৃশ্য!
-কি ব্যাপার আবীর ভাই , এখানে কতক্ষন?
আবীর সাহেবের কলিগ ইয়াকুব এপথেই যাচ্ছিলেন ৷ অফিসের কাছেই ভাড়া বাসায় থাকেন ৷ ভাবছিলেন আবীর সাহেব হয়তো তাকে ডেকে বসাবেন পাশে ৷ বলবেন কিছু একটা হয়তো ৷ আবীর বরঞ্চ এড়িয়েই গেলেন ৷ সংক্ষিপ্ত উত্তরেই নিজের মাঝে ডুবে গেলেন আবার ৷
-এইতো আধাঘন্টা হবে ৷ ভীষন ভালো লাগছে দেখতে ৷
অফিসে আসার সময় ছেলেটা আনিছার গলা জড়িয়ে বলছিল বাবা আমাদের কবে মার্কেটে নিয়ে যাবে , মা ? ঈদের কেনাকাটা করব না আমরা?
যাব তো, কেবল রোজার কয়েকটা দিন গেল মাত্র ৷ ঈদের বোনাস পেলেই আমরা যাব ৷
বোনাস শব্দটাই আবীরের কানে এসে ধাক্কা খেলো ৷
তাইতো আজ মোবাইলে বোনাসের মেসেসটায় একবার চোখ বুলিয়েছে ৷ হিসাব নং – এ টাকা ক্রেডিট হয়েছে ৷ আজ বাসায় গিয়ে আনিছা আর সোনামনিদের জানান দিতে হবে মার্কেট যাবে ৷ সবার জন্য যা লাগে কেনাকাটা করবে ৷ হঠাতই বুকের ভিতরটা খচ্ করে উঠলো ছোটো বোনটার জন্য ৷ না বলেই চিরদিনের জন্য এভাবে চলে গেল বোনটা ৷ প্রতিবার ওর জন্য একটা ঈদ গিফ্ট থাকে ৷ আর এবার?
মনে বিষাদের গোপন সুর আবীরের ৷ আঁধারে কালো চাদর আচ্ছন্ন করল চারদিক। চরাচরে ঝিঁঝির শব্দ,জোনাকির টিপটিপ আলো,ঝিরিঝিরি বাতাসে সৃষ্টি হয় নতুন এক আবেশ। অস্তায়মান সন্ধ্যায় আবছা আঁধারে নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ের ওপর বিচূর্ণ আলোর কারুকাজ সত্যিই বিস্ময় জাগিয়ে দেয় ওর মনে । ইচ্ছে হয়, সেই ঢেউয়ের কারুকাজে হাত রেখে ছুঁয়ে দেখবে আলোছায়ার বিচিত্র লুকোচুরি। ঘনায়মান সন্ধ্যার অপরূপ রূপের মাধুর্য ধরে রাখবে হৃদয়ে। কিন্তু বাস্তবে তা যে হবার নয়।

ঈদ মুবারাক। প্রতিবারের মত এবারও রংপুর ফুল বাজার থেকে ফুল কিনলাম। চারদিকে কি আনন্দ ! কি উল্লাস ! বাজারে আসার পথে দেখলাম শিশুদের হাতে বেলুন আর ফটকা। মনে হচ্ছে আজ শিশুরা সারারাত ফটকা ফুটাবে। তাদের আনন্দিত মুখ আমাদের সব দু:খ ভুলিয়ে দেয়। ফুলের বাজারে দেখলাম প্রেমিকরা গোলাপ ফুল কিনে প্রেমিকাকে বলছে – আস, তোমার খোপায় ফুলটা গুজে দেই। মেয়েদের মুখভর্তি হাসি। সেজেগুজে তারা বাইরে বের হয়েছে। দেখতে ভাল লাগছে। একটা মেয়েকে দেখলাম হাতে মেহেদি দিয়ে প্রেমিকের সাথে রিকসায় করে যাচ্ছে। মেয়েটির হাতের মেহেদি এখনও শুকায় নি। দুইহাত বন্ধ। প্রেমিক ছেলেটি তাকে কি সুন্দর করে বেবি বেবি বলে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে। বেশীরভাগ ছেলেকে দেখলাম আমার মত বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে সিগারেট টানছে। আমার মনে হল আজ রাতে বাংলাদেশের কোথাও কোন দু:খ নেই। আজ কোন প্রেমিক-প্রেমিকা ঝগড়া করবে না। স্ত্রীরা বেছে বেছে তাদের স্বামীদের পছন্দের খাবারগুলো রান্না করবে। চাকরি সূত্রে যারা বাড়ির বাইরে দেশে অথবা বিদেশে থাকেন তারা ইতিমধ্যে নিজেদের বাড়িতে চলে এসেছেন। বাড়িভর্তি মানুষ। চলছে জম্পেশ আড্ডা। মায়েরা যেন ঈদের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। বাবারা ছেলে / মেয়ের কাছ থেকে গিফট পেয়ে বেজায় খুশি। সেই খুশি মনের মধ্যে চেপে রেখে যথাসম্ভব গাম্ভীর্য ধরে রেখে মুখে বলছেন- কি দরকার ছিল। তোরা এতদূর থেকে কষ্ট করে এসেছিস। আমি তাতেই খুশি। চারদিকে মাইকিং শুরু হয়েছে। ঈদের জামাত কোথায় কয়টায় শুরু হবে সেটা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। কোথায় সবচেয়ে দেরিতে নামাজ শুরু হবে সেদিকে মনোযোগ দিলাম। কারণ গত কয়েকদিন ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছি। অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। ঈদ উদযাপনের এসব প্রস্তুতি দেখে হঠাৎ কেন জানি আমার মনটা খুব ভাল হয়ে গেল। একটা বিশেষ সমস্যাকে ঘিরে মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে ছিল। এখন মনে হচ্ছে সবকিছুই ভাল, সব সমস্যার সমাধান আছে এবং বেঁচে থাকার একটা বিষ্ময় আছে যার সঙ্গে পৃথিবীর কোন বিষ্ময়ের তুলনা হয় না।
ঈদ নিয়ে একটি গল্প বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আবারও আপনাদের জানাই ঈদ মুবারাক।
গরিব পুত্র তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করল- বাজান ঈদ জিনিসটা কি?
বাবা উত্তর দিল-বড়লোকের আনন্দ-ফুর্তির দিন।
ছেলে বলল-আমাদের তাইলে কি?
আমাদের জন্যও দিনটা ভাল রে ব্যাটা। এই দিনে ধনীর সাথে কোলাকুলি করণ জায়েজ আছে।

সিটি পার্কের চারদিকটা সবুজ গালিচায় সাজানো আর পলাশ ও শিমুল – কৃষ্ণচূড়ার সঙ্গে আরো কতো না ফুলের সুবাসে আকাশ-বাতাসে মাতাল হাওয়া। বসন্তকালটা ওদের দুজনের খুব প্রিয়। কোনো এক বসন্ত বরণ উৎসবে এসেই পরিচয়, শেষে চেনা থেকে জানা, জানা থেকে মনে মনে মালা গাঁথা। প্রায় তিন বছর ওদের বসন্তের পুষ্পপত্রের সুশোভিত আলিঙ্গনের মতোই সম্পর্কটা। স্বচ্ছতার আবেশে মিষ্টি একটা বাঁধন, দুজনের পড়ালিখা শেষ হলেই প্রণয়।
সাগর এতোটা অপেক্ষা করতে চায় না কিন্তু পরিবারের বারণ। কি আর করা, বিরবির করে বলে – ও প্রভু রক্ষে করো, তাড়াতাড়ি সময় পার করো। অপেক্ষা… অপেক্ষা… তাই সুমিকে কাছে পেলেই গেয়ে ওঠে – ” মিলন হবে কতো দিনে…আমার মনে রো মানুষের সনে..।”
সুমি খিলখিল করে হেসে ছুট দেয়, সাগরও ছোটে। পাশের মাঠেই বসন্ত মেলা। ওখানেই গান- কবিতা পাঠের আয়োজন। সুমির কবিতাপাঠ আছে, দু’জনে এগুচ্ছে। হঠাৎ কিছুই বুঝতে না দিয়ে বৃষ্টি। ওরা ভিজছে…সাগর তাকিয়ে আছে সুমির দিকে – ইস্ কি সুন্দর লাগছে, ভালোবাসা কাছে টানে তবু থাকে দূরে…নিজেরে যতন করে…বলতে বলতেই বিদ্যুৎটাও চলে গেলো। আশেপাশে কেউ নেই, সুমি ওর হাতটা চেপে ধরে ভয়ে। সাগর তাড়াতাড়ি বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ওকে নিয়ে একটা ছাউনির তলে আশ্রয় নেয়। সুমীর ফোঁটা ফোঁটা জলছোঁয়া মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওকে কাছে টেনে নিয়ে কপোলে আলতো একটা আদরের ছোঁয়া দিতে খুব ইচ্ছে করছিল কিন্তু বৃষ্টিতে ঠাঁই নেওয়া উৎসুক চোখেরা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে…

ক্যাপ্টেন হ্যারিস জাহাজ(সি ড্রাগন) এগোচ্ছেন ব্ল্যাক ট্রি আইল্যান্ডের দিকে ।রাতের আঁধার এখনও ভালোভাবে কাটেনি। নিষেধ করার পরও অনেকে নেশা করে প্যাঁচার মতো অন্ধ হয়ে আছে। আচমকা ক্যাপ্টেন জলদস্যুর জাহাজ দেখতে পেয়ে সবাইকে প্রস্তুত হতে বললেন। অতি দ্রুত জাহাজের সব পাল তুলে দিয়ে যতজনকে সম্ভব হলো তাদের নিয়েই প্রস্তুত হলাম যুদ্ধের জন্য। ক্যাপ্টেন আমাকে ডেকে ট্রেজার বক্স থেকে বের করে একটি লকেট দিয়ে বললেন,”যেভাবেই হোক তোমাকে বাঁচতেই হবে,এটা যত্ন করে রেখো,আমি জানি তুমি পারবে”। ইতিমধ্যেই জলদস্যুর আক্রমণ শুরু হলো,এক পর্যায়ে কামানের গোলার আঘাতে আমাদের জাহাজ(সি ড্রাগন) বিধ্বস্ত হলো। জীবিতদের তাদের জাহাজে তুলে বেঁধে ফেললো ।পরদিন প্রায় সকালে বুঝতে পারলাম দ্বীপের কাছাকাছি এসে গেছি, ক্যাপ্টেন বাদে দলের সবাইকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে পানিতে।আমাকেও পাথরের সাথে হাত বেঁধে ফেলা হলো পানিতে। সমুদ্র তলে যেতে যেতে আপ্রাণ চেষ্টায় এক হাত বাঁধন মুক্ত করে ধারালো অস্ত্র দ্বারা হাতে তীব্র আঘাত করে নিজেকে মুক্ত করে সাঁতরে উঠে পা রাখলাম ব্ল্যাক ট্রি আইল্যান্ডে। হাতের অসহনীয় যন্ত্রণায় যেন আমার শরীর বিবশ হয়ে আসে। ভেতরে যাত্রা করতেই এক গাছের নিচে ক্যাপ্টেনকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে ছুটে গেলাম,হাতে গুলি করা হয়েছে। ক্ষত স্থানে ছুরি দিয়ে কেটে বুলেট বের করে আমার গায়ে থাকা শার্ট ছিড়ে ব্যান্ডেজ করে দিলাম। প্রায় দ্বিতীয় প্রহর পর ক্যাপ্টেন এর জ্ঞান ফিরলো।
আমাকে দেখে ক্যাপ্টেন রহস্যের হাসি হেসে ধীর গলায় বললেন,আমি জানতাম তুমি ফিরে আসবে।
পরদিন সকালে ম্যাপ অনুযায়ী যাত্রা করলাম এক গুহার ভেতর দিয়ে। মশালের আলোয় গুহার দেয়ালে বিভিন্ন চিত্রকর্ম দেখতে পেলাম। কিছুদূর যেতেই এক দানবীয় চিৎকার শুনে থমকে দাঁড়ালাম৷ দুজনের প্রাণেই এক অজানা ভীতি। সামনে যেতেই সেই জলদস্যু দলের বিচ্ছিন্ন মৃতদেহ দেখে শরীর শিউরে উঠলো।ধীরে ধীরে গুহা অতিক্রম করে পৌছালাম ব্ল্যাক ট্রি উদ্যানে। আচমকা দুটি দানব আমাদের দিকে ছুটে আসতে লাগলো, আমরাও ভয়ে ছুটতে লাগলাম ব্ল্যাক ট্রির দিকে। ব্ল্যাক ট্রির কাছে যেতেই আমার গলায় থাকা লকেট থেকে নির্গত এক ঐশ্বরিক আলোয় রাক্ষস গুলো বিলীন হয়ে গেলো,ব্ল্যাক ট্রি- স্বর্ণের গাছে পরিনত হতে লাগলো এবং গাছ থেকে হিরা-স্বর্ণ পতিত হয়ে গুপ্তধনের স্তুপে পরিণত হলো ।আমরা অবাক চিত্তে তাকিয়ে রইলাম। দুজনের মনে হয়তো শুধু একটি প্রশ্নই আসলো,আসলে এটা অবাস্তব নয় তো!
উদ্যানের ঠিক মাঝ থেকে শুরু হয়েছে এক বিরাট সাম্রাজ্য তবে কোথাও কোন জনমানুষের চিহ্ন নেই। আমাদের বুঝতে ত্রুটি হলো না যে এইসেই ফ্রেমিংজিয়া সম্প্রদায়ের সাম্রাজ্য৷ এক দূর্ভিক্ষে এ সম্প্রদায়ের সকল মানুষ মারা যায় কিন্তু তাদের এই সাম্রাজ্য তাঁর অবস্থান আজও ধরে রেখেছে। আর এই ব্ল্যাক ট্রি তাহলে কী?
সে কথা পরে বলবো বললেন ক্যাপটেন, উদ্যানের ফলমূল খেয়ে দীর্ঘ ২৪ প্রহর ধরে এই গুপ্তধন নিতে থাকলাম জলদস্যুদের রেখে যাওয়া জাহাজে। শুধু ক্যপ্টেন আর আমি দুজনে। পরদিন যাত্রা শুরু করলাম আমাদের গন্তব্য ‘এল সেন্দ্রাদো’ বন্দরের দিকে৷ যেতে যেতে জানতে পারলাম ক্যাপ্টেন এক সমুদ্র যাত্রায় ভেসে আসা এক ব্র‍্যান্ডির বোতল থেকে একটি চিঠি, ম্যাপ আর এই ঐশ্বরিক লকেট “দ্য ডায়মন্ড মিরর” পেয়েছিলেন। এখানে আসার চেষ্টা আগেও বহুবার করেছেন তবে প্রতিবার চেষ্টায় বিফল হয়েছেন। ফ্রেমিংজিয়া সাম্রাজ্যের রাজা দ্য রেজারিও, তিনিই এই গুপ্তধন সংরক্ষণ করেছিলেন যা দীর্ঘ হাজার বছর ধরে এই দ্বীপে সরক্ষিত ছিলো। তবে শুধু সেই এই গুপ্তধন নিতে পারবে যার কাছে এই লকেট থাকবে। সেখানে আজও রয়ে গেছে সে সাম্রাজ্য এবং আরও গুপ্তধন !!
আমি ক্যাপ্টেনের হাতে তুলে দিলাম সেই লকেট, সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে লকেটটি ছুড়ে মারলেন এই উত্তাল সমুদ্রে। ফ্রেমিংজিয়া সাম্রাজ্য এক রুপকথার মতো তাঁর অবস্থান ধরে রাখুক এভাবেই। ব্ল্যাক ট্রির এই গুপ্তধনের অভিজান আমার জীবনের এক নতুন অভিজ্ঞতা।
এটাই হয়তো ক্যাপ্টেন আর আমার শেষ যাত্রা নয়। এই যাত্রা চলবে বহুদূর আবারও হয়তো নতুন কোন ট্রেজার আইল্যান্ডের খোঁজে!

মনিকা হাসান।বিখ্যাত শিল্পপতি কবীর হাসানের স্ত্রী মনিকা হাসান।
মনিকা হাসানের মন ভাল নেই।মন কি একটা যন্ত্র!খারাপ হয়ে যায় যখন তখন!না, যখন তখন মন খারাপ মনিকার হয়না।যখন প্রীতম এর কথা মনে পড়ে যায়,তখনি মন খারাপ হয়ে যায় মনিকার।সাজানো গুছানো পরিপাটি সংসার কিছুই ভাল লাগেনা।
বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রীতমের মুখ।সেই প্রীতমের সঙ্গে দেখা হলো কুড়ি বছর পর।
কেন দেখা হলো?দেখা না হলেই তো
ভাল ছিল!আবারো জেগে উঠলো পুরনো প্রেম।
আমার ইচ্ছে করছে সারাক্ষণ তোমাকে চোখের সামনে বসিয়ে রাখি।শুধু দেখি আর দেখি।কি বিশ্বাস হচ্ছেনা?এই তোমাকে ছুঁয়ে বলছি।
প্রীতমের হাত মনিকার হাত স্পর্শ করে।মনিকা অবাক তাকিয়ে থাকে।
যেন কুড়ি বছর আগের প্রীতম।
তুমি এখনো আমাকে ভালবাসো?
কি করলে বিশ্বাস হবে?পরীক্ষা নিতে চাও?
না,তোমার চোখ বলছে, তুমি সত্য বলছো।কিন্তু,এতোদিন পর আর এ কথা বলে কি লাভ!জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার—
প্রীতম হাসে,তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার/হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে/সরু সরু কালো কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার—
সুন্দর আবৃত্তির কন্ঠ প্রীতমের।
মনিকার কষ্ট হয়।কেমন এক কষ্ট।মনিকা চুপচাপ বসে থাকে।দুচোখে জলের ধারা নেমে যায়।
মনিকার সুখের সংসার।তারপরেও মনিকার বুকের ভেতর কষ্টের পায়রা ডানা ঝাপটায়।শ্রাবণের রাতের বিদ্যুৎ চমকের মতো হঠাৎ এক চমকে গোটা অতীতটাকে আলোকিত করে দিয়ে চলে যায় প্রীতমের স্মৃতি।
যুবক প্রীতম আর কাঁচাপাকা চুলের প্রৌড় প্রীতমের চোখের ভাষা এক।
মনিকার কানের পাশের রুপালি চুল তার চোখের কোণায় বয়সের ছাপ,কই এসবতো মনিকার মনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারছেনা!
মনিকাও যেন সেই মনিকা,কুড়ি বছর আগের মনিকা।
কেন প্রীতমের সাথে ঘর বাঁধা হয়নি সে কারণটি আজ আর কোনো গুরুত্বই বহন করছেনা।
মোবাইল বেজে ওঠে।প্রীতমের ফোন।মনিকার ভেতরে কাঁপন।মনিকার হাত পা অসাড় হয়ে আসে।মাথা ঝিম ঝিম করে।দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে।
যখন চেতনা ফিরে আসে।দেখে শিয়রে উৎকন্ঠিত কবীর হাসান।
কেমন বোধ করছো এখন?
ভাল।মনিকা বসবার চেষ্টা করে।
আরে আরে উঠছো কেন?শুয়ে থাকো,একদম উঠবেনা।
কবীর হাসান মনিকার কপালে হাত রাখে।সস্নেহে সরিয়ে দেয় এলোমেলো চুল।মনিকা তাকিয়ে থাকে।কবীরের চোখে হারিয়ে যায় প্রীতমের চোখ।
মনিকা পরম নির্ভরতায় হাত রাখে কবীরের হাতে।

বড়সড় বিয়েবাড়ি!
প্রচুর লোক সমাগম!
হৈহৈরৈরৈ চলছে।
ব্যাঙ্কার বন্ধুর আশিকের বিয়ে। অনার্স করেই সে বন্ধু ব্যাঙ্কে জয়েন করেছেন। সেখানেই তার কলিগের সাথে পরিচয় এবং আজকে তাদের বিয়ে।
কে কার ডাক শোনে? বরযাত্রীদের একজন, যেনতেন নয়, দেশের নামকরা শিল্পপতির ছেলে, যিনি বরের ঘনিষ্ট বন্ধু, আবীর, ভার্সিটিতে পড়েন। এবছরই ভার্সিটি লাইফ শেষ হবে। একজন মেধাবী স্টুডেন্ট। খুবই বন্ধুবাৎসল। সাধারণভাবে চলাফেরা করেন। তার আচরণে কখনও স্পষ্ট নয় তিনি পয়সাঅলা পরিবার থেকে এসেছেন। ইচ্ছে করলে বিয়েবাড়িতে পারিবারিক প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজ, রোভার গাড়িতে আসতে পারতেন। না, তিনি অন্য বন্ধুদের সাথে মাইক্রোতে হৈ হুল্লোড় করে এসেছেন। প্রচণ্ড গরমে তার পানির তেষ্টা পেয়েছে। গাড়িতে কারও কাছে বোতল পাচ্ছিলেন না। ভাবলেন, এখানে বিয়েবাড়িতে কারও কাছে চেয়ে নিবেন।
বিয়ে একদম গ্রামে। কনের পরিবার একসময় জমিদার ছিল বোঝা যায়। শানশওকত স্পষ্ট এখনও।
বিয়েমঞ্চ বাড়ির বাইরে। বড়সড় প্যান্ডেল অদূরে, পুকুরপাড়ে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আবীর বাড়ির ভেতর ঢুকলেন একা। অনেক মহিলা। কাকে বলবেন, একগ্লাস পানি চাই? হঠাৎ চোখে পড়ে অপূর্ব, অনিন্দ্য সুন্দরীতমা একজন মেয়ে। দেখে আবীরের চক্ষু চড়কগাছ। মনে মনে বললেন, শান্তি, শান্তি, পরম শান্তি! তাকে উদ্দেশ্য করে ডাকলেন আবীর।
এই যে শুনছেন? মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা সফল হয়েছে। ব্যাটেবলে মিলেছে। এখন ছক্কা পিটাতে পারলেই হয়।
-জি, বলুন? কিছু বলবেন? সুন্দরীতমা বললেন।
এরকম চেহারার মেয়েকে দেখলে চোখ মন জুড়িয়ে যায়। মানুষ এতো সুন্দর কী করে হয়? নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করলেন আবীর। বিধাতা যেন অনেক সময় নিয়ে এমন মেয়েকে গড়েছেন। খুব বড়সড় কালোঘন সিল্কি চুল পিছনে বহুদূর নেমেছে। রঙিন লিনেন কাপড়ের চিপাচাপা জামা আর সালোয়ার গায়ে এমনভাবে সেঁটেছে-মনে হবে এইবুঝি বৃষ্টিতে ভিজেছেন তিনি।
ভাই, কিছু বলবেন বোধহয়? বলুন? মেয়েটি বললেন।
আবীর বললেন, তৃষ্ণা পেয়েছে খুব। কিন্তু পানি চাই না। আপনাকে দেখে মন ভরেছে। জীবনানন্দের সেই পাখির বাসার মতো চোখ আপনার! চুলও একদম তেমন। যদি দু’মিনিট কথা বলতেন তাতেই পানির তৃষ্ণা মিটে যেত। অনুনয়ের সুরে বললেন সায়হাম।
-মামা বাড়ির আবদার? আপনি আমাকে চিনেন, না আমি আপনাকে চিনি? পাগলামো করার যায়গা পান না, না?
এক নি:শ্বাসে বলে গটগট করে চলে যাচ্ছিলেন সুন্দরীতমা।
-ম্যাডাম, নামটা তো বলুন প্লিজ!
-আমার নাম ম্যাডাম। হলো?
-না, আপনি বনলতা সেন। সায়হাম আস্তে চিৎকার করে বলল।
সুন্দরীতমার কানে পৌঁছেছে সে কথা। তিনি মুখ ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বোঝালেন তা।
তার নাম জানাটা জরুরী আবীরের। এমন মেয়ের সাথে দু’দণ্ড কথা না বললে বিরাট অস্বস্তি নিয়ে থাকতে হবে- এটা মানা যায় না। জীবনানন্দের মতো শান্তি নিতে হবে।
কিন্তু কিভাবে কথা বলবে সে ভাবতে পারছে না। বিয়ে বাড়িতে প্রচুর লোকজন। বাচ্চাকাচ্চাও প্রচুর। ভাবলেন, এদিকে কি জন্ম নিয়ন্ত্রন নেই? মনে মনে হাসলেন তিনি।
বিয়েমঞ্চে বরের পাশে বসলেন তিনি। মৌলভী সাহেব , কাজী সাহেব রেডি। কনের মুরুব্বীদের হুকুম পেলেই বিয়ের কাজ শুরু হবে। কিন্তু আবীরের তর সইছে না। ইচ্ছে করছিল বাড়ির ভেতর ঢুকতে। আশেপাশেও চোখ বুলাচ্ছেন। না, সুন্দরীতমা নেই। মনটা ছটফট করছে। পিচ্চি একটা মেয়ে আবীরকে বলল, আঙ্কেল, পানি খেতে চাইছিলেন। ঐ যে ডাকছেন। অদূরে সাদা পর্দার কাছে দাঁড়ানো অস্পষ্ট দেখা যায় একজন মেয়ে, তার দিকে পিচ্চি মেয়েটি আঙ্গুল নির্দেশ করল। আবীরের বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠল। নিশ্চয় সেই সুন্দরীতমা। বরকে কানে কানে কিছু বলে দ্রুত নেমে সেদিকে গেলেন তিনি। বুকটা ঢিপঢিপ করছিল। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে তার কাছে গেলেন। দেখেন সুন্দরীতমা পানির গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বুকের ভেতর শব্দটা বাড়ছে। জোরে একটা দম টেনে নিজেকে আশ্বস্ত করলেন, অল ইজ ওয়েল।
-নিন, ধরুন, লেবু শরবত। পানি চাইছিলেন। সুন্দরীতমা বলছিলেন।
আবীর গ্লাস হাতে নিয়ে বললেন, মরে যাচ্ছিলাম। প্রাণ ফিরে পেলাম। আপনি আসলেই সবদিক দিয়ে ভাল। দেখতে হুবহু বনলতা সেনের মতো। ঘনকালো চুল, সেই চোখ..
-থামুন, থামুন। শরবত খান। গ্লাস দিন।
-আমি আবীর, বরযাত্রী, বরের ঘনিষ্ট বন্ধু। – আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে।
-আপনি জীবনানন্দের বনলতা সেন পড়েছেন নিশ্চয়?
-এই কথা বলার জন্য আগ বাড়িয়ে পরিচয় দিচ্ছেন?-একদম খসখসে কন্ঠে সুন্দরীতমা বললেন।
আবীর থতমত খেয়ে একটু সামলে নিয়ে বললেন, জি, বনলতা সেন আমার প্রিয় একটি কবিতা আর আপনি হুবহু জীবনানন্দের সেই বনলতার সেনের মতো।সেই ‘চুল তার কবেকার অন্ধকারের বিদিশার দিশা,’ সেই ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ,’ এমন জলজ্যান্ত একজন বনলতা সেনের সাথে পরিচিত হতে চাওয়া বা হওয়া নিশ্চয় দোষের হবে না! আবীর তখনও হাতে গ্লাস নিয়ে আছেন।
-বেশ, বেশ! এর আগে অনেকেই এভাবে এমন করে বলেছেন। জেনে আশ্চর্য হবেন আমার বাবা আমাকে বনলতা-ই ডাকেন। সুতরাং আমি ইমপ্রেস হলাম না। তো ঠিক আছে। গ্লাস আপনার কাছেই রাখুন। ভাল থাকুন।
খটমট, গজগজ করে সুন্দরীতমা শরবতের গ্লাস না নিয়েই চলে গেলেন।
বেলুন চুপসে গেলে যেমন হয় তেমনটা হল আবীরের মুখ। তার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করছে। পরিচয় জানাটা জরুরি।নাম্বার পেলে বেশ হতো।
বরের বামে নববধু। ডানে কনের বান্ধবী আর শালীর দল। নববধুর পাশে আবীর ও অন্যবন্ধুরা আছেন। না, সেখানে আবীরের বনলতা সেন নেই। আবীরের বুকের ভেতর হু হু করছে। তার কথা কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। ছবি তুলছেন অনেকেই। তার অন্য বন্ধুরাও। একটু পাশ হেলে বরকে কিছু একটা বলে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন আবীর। সুন্দরীতমা খুঁজছেন। বাড়ির ভেতর বাইরে কোথাও নাই সেই সুন্দরীতমা।

আল রাহমান নামে একটি কুরিয়ার সার্ভিসে নাসিম ডেলিভারি ম্যান, মাস দুয়েক আগে সারিকাকে বিয়ে করে কামরাঙ্গীর চরে বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার পেতেছে। অনেক বছর পর সারিকার আবারও ঢাকা আসা এখানে আসার পর বেশ ভোগান্তি বেড়ে চলছে আর জটিলতার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে পানি থাকে তো বিদ্যুৎ নেই রাস্তায় বের হলে যানজট সুযোগ পেলে ছিনতাইকারী টান মেরে পগার পার, বাসে উঠলে আরও বিপদ এপাশ থেকে হাত ঢুকিয়ে দেয় রমজান মাস তাও ভুলে গেছে আল্লাহর গজব পড়বে তা যেন ভুলে গেছে। নাসিম বলেছে কি করবে এভাবে হিসেব করে চলতে হবে শহর আর গ্রামের এখানে পার্থক্য, সময়টার যেন কেমন বাহার, সে জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবেএকটু গুছিয়ে নেই তারপর অন্য কোথাও নিরিবিলি জায়গায় বাসা নিয়ে আরাম করে থাকবো এই বলে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে।
তার অফিস নিউমার্কেট এলাকায় এখানে এসে পার্শ্বেল নিয়ে আশপাশ এলাকায় বিতরণ করে থাকে কদিন ধরে এলাকায় জট লেগে আছে প্রায় সময় গোলমাল উত্তেজনা, নিমেষে হট্রোগোল জ্বালাও পোড়াও কোথাও হৈচৈ তারপর ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ ঢিলপাটকেল ছোঁড়াছুড়ি একটু যেন অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি।
কারণ এলাকাটি খুব ঘন বসতি নিউমার্কেট দোকানপাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজ স্কুল পিলখানা আবার গাউছিয়া মার্কেট লাগোয়া বলাকা সিনেমা হল কি নেই এখানে বিশ্বের তাবত কারখানা । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েরা সিনেমা দেখতে কিংবা সস্তা জিনিস পত্র কিনতে এখানে ভিড় করে তাছাড়া সস্তা খাবারের হোটেল দেখতে পাওয়া যায় হলে পড়াশোনার ফাঁকে অনেককে আড্ডা মারতে দেখা যায় আবার কেনা কাটা নিয়ে দোকান মালিক সমিতির লোকজনের সংগে ছাত্রদের একটু ঝামেলা হয় ঝামেলা থেকে তর্কবির্তক শেষে কিনা বাড়াবাড়ি তারপর হাতাহাতি লাঠালাঠি বেসামাল হয়ে অগ্নি সংযোগ ঢিল পাথর ছোড়াছুড়ি শেষে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ বড় রকমের যুদ্ধ বাজি। এরকম ঘটনা এই এলাকায় প্রায় সময় হয়ে থাকে অনেক লেখালেখি, অনেক বলে থাকে বিশ্ব বিদ্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায় না আবার কেউ বলছি নিউমার্কেট অন্য কোথাও সরানো যায় না উত্তেজনা কিছুটা সময় তারপর সেই বালু সেই কাদা হাটবাজার বিশ্বকারখানা বেয়ে যায় যমুনায় অশ্রু সব যেন লেজে গবরে। এনিয়ে নিষ্কৃতির পথ আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না,অনেকে এপথে চলাচল করতে সংকোচ করে, সামনে ইদ কাজের চাপ বেড়ে গেছে কাগজ পত্রিকা পার্শ্বেল নিয়ে ডেলিভারি দিয়ে আসে সারিকাকে বলছিলো এবার ইদে কি নিবে?সে হেসে বললো, “কিছু লাগবে না শুধু তোমাকে পেতে চাই সারা জীবন তুমি আমার ভূষন হয়ে থাকো উত্তরে সে বললো, ” সোনামণি ঠিক বলছো ইদ মানে আনন্দ একটা কিছু নিতে হবে যে না নিলে আত্মাটা তৃপ্তি পাবে না কাজের চাপটা একটু হালকা করে নেই তারপর তোমাকে নিয়ে কেনাকাটা করা যাবে এই বলে সে অফিসের দিকে পা বাড়ায় কিছু বুঝে উঠার আগে আবারও গোলমাল শুরু ধাওয়া পালটা হাওয়া ূধরধর মা-র হঠাৎ একটা ঢিল তার মাথায় লাগে তারপর কিছু বলতে পারে না অনেক পর চোখ খুলে দেখে সারিকা তার পাশে তাকে দেখে সে বললো আমি হাসপাতালে কেন তুমি কি করে আসলে সে বললো অনেক ঘটনা -তুমি অফিসের দিকে রওনা হলে আমিও কি যেন মনে করে তোমাকে অনুসরণ করতে থাকলাম, তোমাকে অবশ্য বলা হয়নি একসময় আমি ইডেনে পড়াশোনা করেছিলাম বলবো করে বলে বলা হয়নি, সব সময় তুমি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকো, তাই বলছি আসলে কি জানো ঢাকা আগের মত নেই যানযট হট্রগোলে ছেয়ে গেছে কার উপর কে দাপট খাটাবে তা দিয়ে ভরে গেছে অশান্তির হাটবাজার একটু নীল আকাশ দেখা পাওয়া কষ্ট কর বেশ কদিনে হাফিয়ে উঠেছি তোমার জন্য পড়ে আছি, তার চেয়ে এক কাজ করে চলো গ্রামে ফিরে যা-ই খোলা আকাশের নিচে ফল কিংবা ফুল চাষ করলে অনেক ভালো চলবে দেশটি ফলে ফুলে ভরে যাক, সে তার হাত ধরে বললো তবে তাই হোক আমি তোমার ফুলের বাগানে মালি হয়ে থাকতে চাই।

বহু বছর পর আজকে আমি আমার জন্মস্থান, প্রিয় শহর রংপুরে এলাম৷ নিজের শহর৷ নিজেই চিনতে পারছি না৷ চারিদিকে বহুতল বাড়ি, শপিং মল, প্রশস্ত রাস্তা, আলোর ঝলকানি চোখে ধন্ধে ধরায়৷ প্রিয় স্কুল, খেলার মাঠ, গাছ-গাছালি কিছুই নেই আগের মতো৷ যে পুকুরগুলোতে সারাদিন মহিষের মত ডুবে থাকতাম৷ সেগুলোতে এখন দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন৷ সহপাঠি-বন্ধু এখন তারা যে কোথায় কিংবা কেমন আছে৷ জানিনা৷ নিজের শহরেই নিজেকে আগন্তক মনে হচ্ছে৷
আমি ঢাকায় থাকি৷ বিয়ে-শাদী করেছি৷ পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকি৷ একটা বস্তিতে৷ সিএনজি চালাই৷ স্ত্রী গার্মেন্টসে চাকুরি করে৷ করোনার কারণে সারাদেশে লক ডাউন চলছে৷ ঢাকায় খুবই কড়াকড়ি৷ ভ্রাম্যমান আদালত, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট গাড়ি আটকায়৷ জরিমানা করে৷ লাঠিপেটা করে৷ চাঁদা আদায় করে৷ এতকিছুর পরেও লজ্জাহীনভাবে আমাদের রাস্তায় নামতে হয়৷ কেননা লজ্জা আর ভয় দিয়েতো পেট ভরবে না৷ আর আমাদের জীবণ-জীবিকা নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই৷ তাদেরকে অনেক বড় বড় বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়৷ কীভাবে রিজার্ভ বাড়াতে হবে৷ দেশীয় অর্থে কীভাবে পদ্মা সেতু হবে৷ কেন রাতারাতি একটা হাসপাতাল গায়েব হয়ে গেল ইত্যাদি৷
রোজার মাস৷ সামনে ঈদ৷ বাচ্চাদের আবদার৷ কীভাবে সংসার চলবে? তাই ঝুকি নিয়েই রংপুরে এসেছি৷ এখানে যাহোক একটা কাজ জোটাতে হবে৷ আমার ইচ্ছা অটো চালানো৷
আমাদের বাড়িটা সাতগাড়া মিস্ত্রিপাড়ায়৷ আগের বাড়ি আর নেই৷ ভেঙ্গে নতুন করে বানানো হয়েছে৷ ভাড়া দেয়া হয়েছে৷ ওটা এখন বোনের দখলে৷ আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে কারমাইকেল কলেজে বাংলায় অনার্স ১ম বর্ষ পর্যন্ত পড়াশুনা করেছি৷ ছাত্র হিসেবে ভালই ছিলাম৷ কিন্ত বাবার হঠাৎ মৃত্যু, দারিদ্র্য আর পরিবারের প্রতি কর্তব্যের কারণে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে ফেলতে হয়৷ মনে পড়ে বহুদিন আগে এক কাক ডাকা ভোরে সবার অগোচরে এ শহর ছেড়ে পাড়ি জমাই ঢাকায়৷ যে কোন উপায়েই রোজগার করতে হবে৷ বাড়িতে মা-বোনের জন্য টাকা পাঠাতে হবে৷ নাহলে ওরা না খেয়ে মরবে৷ ঢাকায় গিয়ে প্রথমের দিকে রিক্সা চালালাম৷ শহরটা কিছুটা পরিচিত হলে অটো চালানো শুরু করি৷ যা রংপুরে করা সম্ভব ছিলনা৷ আমার লজ্জার কারণে নয় বরং পরিবারের মর্যাদার কারণে৷ বিশেষ করে ছোট বোনের জন্য৷ আমি রিক্সাচালক জানলে ও যত ভাল স্টুডেন্টই হোক না কেন সুপাত্রস্থ করতে অসুবিধা হবে৷ মাসে মাসে নিয়মিত টাকা পাঠাই৷ সবাই জানে আমি চাকরি করি৷ কিন্ত সম্ভবত মা কিছুটা আঁচ করেছিল৷ হাজারো হোক মায়ের মন৷ আমি এড়িয়ে গেছি৷ বুঝতে দেইনি৷
দিনে দিনে অনেক বছর পেড়িয়ে গেছে৷ বোনের বিয়ে হয়েছে৷ স্বামী-সংসার নিয়ে ভাল আছে৷ মা এখন শুধুই স্মৃতি৷ মুনসিপাড়া কবরস্থানে স্বামীর কবরের পাশেই শুয়ে আছে৷
কী আশ্চর্য! একদিন লজ্জার ভয়ে শুধুমাত্র রোজগারের কারণে যে আমি নিজের শহর থেকে ঢাকায় পালিয়ে গিয়েছিলাম৷ বহু বছর পর সেই আমি আবার নিজের শহরে ছুটে এসেছি রোজগারের আশায়৷ পার্থক্য শুধু প্রথমবার ছিল মা-বোনের জন্য৷ আর এবার এসেছি স্ত্রী-সন্তানদের জন্য৷ তবে একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত যে এখন কেউ আমাকে চিনবে না৷
গাবতলী থেকে অনেক সময় আর অনেক কষ্টে অবশেষে রংপুরে পৌঁছালাম৷ টার্মিনালে নেমে রিক্সা করে মিস্ত্রিপাড়ায় ঢুকলাম৷ রিক্সাটাকে দাঁড় করালাম৷ নিজের জন্মস্থান, বাড়িটাকে দেখলাম৷ আশে পাশের বরই, পেয়ারা, আম, জাম আর আতা ফলের গাছগুলোর চিহ্নই খুঁজে পেলাম না৷ কত স্মৃতি, কত আনন্দ বেদনার সাক্ষি এ জায়গা৷ চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো৷ অনুভব করলাম দু’চোখে নোনা জলের অস্তিত্ব৷ বুকের ভেতর বাতাসের ঘাটতি অনুভব করছি৷ বড্ড বেশী ব্যাথা করছে৷ নাহ্! সরে পড়তে হবে৷ রিক্সায় আবারো চেপে বসলাম৷ কবরস্থানে গিয়ে মা-বাবার চিহ্নহীন কবর জিয়ারত করলাম৷
রাত জাগা৷ দীর্ঘ সময় ধরে জার্ণি৷ নাস্তা না খাওয়া শরীরটাকে মাতালের মত টেনে নিয়ে চলছি৷ আমি হেঁটে চলছি৷ গন্তব্য কাচারী বাজার৷ সেখানে অনেক হোটেল৷ নাস্তাটা সেখানেই সারবো৷ সেখানে ছিল আর এক বিশ্ময়! যেন এক যাদুবলে এখানকার ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য হোটেল উধাও হয়ে গেছে৷ কিছুই নেই৷ শুধু ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে এখনো রয়ে গেছে শিশু নিকেতন স্কুলটি৷ এখানেই আমি প্রাইমারী শিক্ষা নিয়েছি৷ যদিও স্কুলটা থাকলেও পুরাতন আঙ্গিকে নয় বরং নতুন ভবন শোভা পাচ্ছে৷ স্কুলটার ঠিক বিপরীত দিকে কোর্ট ভবন৷ রেজিস্ট্রি অফিস৷ তখনো নতুন জেলাগুলো হয়নি৷ সকল মহকুমার মানুষকে এখানে আসতে হতো৷ মামলা-মোকাদ্দমা৷ জমি রেজিস্ট্রি৷ আরো কত কি৷ কাচারী থাকতো মানুষের সমুদ্রের মতো৷ কোর্টের চারিদিকে কোন প্রাচীর ছিল না৷ বরং অসংখ্য দোকান দিয়ে পরিবেষ্ঠিত ছিল৷ খাবার হোটেল৷ থাকার হোটেল৷ স্ট্যাম্প ভেন্ডার৷ সাইকেল গ্যারেজ৷ লন্ড্রি৷ দর্জ্জি৷ আরো কত যে দোকান৷ ল্যাম্প পোস্টের নীচে ছিল একটা লন্ড্রি৷ নাম উকিলের লন্ড্রি৷ উকিলের লন্ড্রি নাম শুনে অনেকে মনে করতো এটা বোধ হয় কোন উকিলের দোকান৷ আসলে তা নয়৷ এখানকার বেশীরভাগ কাস্টমার ছিল উকিল৷ তাই এর নাম হয়ে যায় উকিলের লন্ড্রি৷ তার পাশে ছিল একটা সাইকেল মেকানিকের দোকান৷ আর ঠিক তার পাশের দোকানটা ছিল একটা দর্জ্জির৷ খলিফার৷ নাম আজমত খলিফা৷ নাম করা খলিফা৷ বয়স্ক, ধার্মিক আর বিশ্বস্থ ব্যক্তি৷ উনি কাপড়ের টুকরো অংশগুলো একটা কার্টুনে রেখে দিতেন৷ নামাজি লোকেরা মুঠো মুঠো করে ওগুলো নিয়ে যেতেন৷ কুলুক হিসেবে ব্যবহার করতেন৷ তখনো টিস্যু পেপারের ব্যবহার শুরু হয়নি৷ সে সময় তৈরি পোষাকের প্রচলন ছিল না৷ তাই খলিফাদের আয় রোজগার দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চালানো যেত৷ আজমত খলিফার দু’টি সন্তান৷ বড়টি ছেলে ও ছোটটি মেয়ে৷ দু’জনেই পড়াশুনায় খুব ভাল৷ শুধুমাত্র এ পেশা দিয়েই সংসারের খরচসহ আজমত খলিফা সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার খরচ চালাতে থাকেন৷
সেসময় লোকে ঈদ পরবেই পোষাক-আষাক বানাতেন৷ এত বাহুল্য পোষাক মানুষের ছিল না৷ আজমত খলিফা জানতেন৷ এই সামান্য আয়ে তিনি বাচ্চাদের নতুন পোষাক বানিয়ে দিতে পারবেন না৷ তাই তিনি পূর্ব থেকেই প্রস্ততি রাখতেন৷ অন্যের জামা বানানোর পর তুলনামূলক যে বড় ছাটগুলো বেচে যেত৷
সেগুলো তিনি জমা করে রেখে দিতেন৷ একটা সময় যখন অনেক টুকরো কাপড় জমে যেত৷ তখন তিনি সেগুলো জোড়া দিয়ে নিজের করা ডিজাইনে সন্তানদের ঈদের পোষাক বানিয়ে দিতেন৷ সেই নতুন জামা নিয়ে বাচ্চারা যে কতবার দেখে৷ আবার গুছিয়ে লুকিয়ে রাখে৷ যেন বন্ধুরা ঈদের আগে দেখতে না পারে৷ আগে দেখলেতো ঈদ মাটি হয়ে যাবে৷ আজমত খলিফা আর তার স্ত্রী দেখেন৷ ওদের হাসিমুখ দেখে আনন্দের অশ্রু মোছেন৷ এ প্রতারণা কেউ বুঝতেই পেত না৷ শুধু তিনি আর তার স্ত্রী ছাড়া৷ এছাড়া কী-ইবা করার আছে?
এরপর দেশে নতুন নতুন জেলা হলো৷ শহরে মানুষের আগমন কমতে লাগলো৷ তৈরি পোষাকের ব্যবহার বাড়তে লাগলো৷ কমতে থাকলো খলিফাদের আয়৷ নিদারুন অর্থ কষ্ট, সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের ভবিষ্যৎ এসব চিন্তায় এক রাতে নিজের দোকানের সেলাই মেশিনের উপরেই মরে গেলেন তিনি৷
কাচারীতে একটি হোটেলে নাস্তা খেতে খেতে অনেককে আজমত খলিফার কথা জিজ্ঞেস করলাম৷ কেউ বলতে পারে না৷ শেষে বয়স্ক দেখে একজনকে প্রশ্ন করলাম চাচা এ বিষয়ে কিছু জানেন কী-না! তিনি বললেন৷ আর বলো না বাবা৷ খুব ভাল মানুষ ছিলেন৷ আর ভাল মানুষ ছিলেন বলেই দু’টি সন্তানকে মানুষের মত মানুষ বানাতে পেরেছেন৷ একটু থেমে তিনি আবার বলতে লাগলেন তুমি শুনে আশ্চর্য হবে যে এ ব্যবসা করেই সে তার মেয়েকে ডাক্তার বানিয়েছেন৷ আর ছেলেটি ঢাকায় মস্ত বড় চাকুরি করে৷ কী কপাল! তাই না?
চাচার কথাগুলো শুনে বুকটা কেঁপে উঠলো৷ বুক চাপা কান্না নিজেকে পরাভূত করে বেড়িয়ে আসতে চাচ্ছে৷ শক্ত হতে হবে৷ অন্যদিকে মুখটা ঘুরিয়ে নেই৷ গালে গরম কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করি৷ হাত দিয়ে গোপনে অশ্রুজল মুছে ফেলি৷ হয়তো আমার আচরণে অস্বাভাবিকতা ছিল৷ তাই চাচা বললেন তুমি কি অসুস্থ বোধ করছো? আমি বললাম না চাচা৷ সারারাত জার্ণি করেছিতো তাই খারাপ লাগছে! কিন্ত একথা বলার সাহস হলো না যে আমিই আজমত খলিফার সেই ছেলে!

লুনা, -মেয়েকে ঘুম থেকে উঠাও, আমাকে ডিউটিতে যেতে হবে। যানোই তো ওকে আদর না করে বের হলে আমার দিনটা এলোমেলো হয়ে যায়, চুপসে যায় কাজের গতি। কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছো যে?
কোনো উত্তর দেয় না লুনা মেয়েকে ঘুম থেকে টেনে তুলে হাসিবের কোলে দেয়, হাসিব মেয়ে শ্যামার সারা শরীরে চুমু খেতে থাকে, স্ত্রী লুনা কে বলে, -আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো, তোমার যা রাগ কারনে অকারনে আমার মেয়েটাকে বকা দাও, আমি কিন্তু ফিরে এসে সব নালিশ শুনবো মেয়ের কাছে। লুনা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কারন গত রাতে হাসিব বিশ্ব ব্যাপি দূর্যোগের কথা জানিয়েছে স্ত্রী লুনাকে। ডাক্তার হিসেবে এসময় তার অনেক দায়বদ্ধতা আছে। এদিকে দেশে করোনা রোগী বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। রোগটা ছোঁয়াছে তাই মেডিকেলেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, হাসিব জানে না কবে বাড়ি ফিরতে পারবে আদৌ ফিরবে কিনা সেটাও নিয়তির উপর অনেকটা নির্ভর। হাসিব লুনাকে টেনে নেয় বুকের মাঝে কপালে চুমু খেয়ে বলে,এই যে দেখো আমাদের বেলকনিতে দাঁড়ালেই মেডিকেল দেখা যাচ্ছে তুমি মেয়ে এখানে দাঁড়াবে শেষ বিকেলের আলোয়, আমাদের দেখা হবে আলো ছায়ার খেলায়। লুনা ছল ছল চোখে তাকায় বলে,-আমি মেয়ে দিন গুনবো তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায়।
হাসিব চলে যায় মেডিকেলে, করোনা আক্রান্ত দের চিকিৎসার দায়িত্ব তার, ফোনে কথা হয় স্ত্রী সাথে। মেয়ে শ্যামার আধো আধো কথা শুনে অস্থির হয়ে ছুটে আসতে ইচ্ছে করে মেয়ের কাছে কিন্তু উপায় নেই।
বেশ ক’দিন কেটে যায়, শরীরটা বেশ খারাপ লাগছে হাসিবের, খারাপ আশংকা হচ্ছে নিজের প্রতি,টেষ্ট রিপোর্ট করোনা পজেটিভ। স্ত্রীকে কিছু বুঝতে না দিয়ে ফোন করে, লুনা খুব বিপদে রেখে ক্যামন স্বার্থপরের মতো চলে এলাম আমি তাই না, আমি জানি হাজারটা অভিযোগ জামিয়ে রেখেছো আমার জন্য, দেখে নিও পৃথিবীর এই মরন ব্যাধি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, আমি বাড়ি ফিরবো তুমি সব অভিযোগ ভুলে যাবে আমি বাড়ি ফেরার আনন্দে,আমার শ্যামাকে বলবে বাবা খুব ভালোবাসে তাকে,খুব মিস করে, তোমরা সাবধানে থেকো ভালো থেকো, লুনা উত্তর দেয় তুমিও ভালো থেকো।
হাসিবের অবস্থা অবনতি হতে থাকে, খবরটা হাসিবের সহকারি লুনাকে ফোনে জানায়, হিসেব মেলাতে পারে না লুনা। পৃথিবীটা খাঁ খাঁ লাগে তার কাছে।
পরদিন সব প্রচেষ্টা ব্যার্থ করে পরলোকিক যাত্রায় পা বাড়ায় হাসিব।
সারাদেশ লক ডাউন, এ রোগে মৃত মানুষের কাছে কাউকে যেতে দেয়া হয় না। শেষ দেখার ইচ্ছেটাও যেনো কোনো ভাবেই পুরন হলো না লুনা ও মেয়ে শ্যামার, পরদিন শেষ বিকেল, ফোনটা বেজে উঠে মেয়ে শ্যামা মোবাইলটা হাতে নিয়ে পাপা পাপা করে ছুটতে থাকে মায়ের কাছে, লুনা ফোন রিসিভ করে, অপর প্রান্ত থেকে বলতে থাকে, – ম্যাডাম আমি স্যারের সহকারী সাইফ বলছি, স্যারের লাশটা এখন নিয়ে যাওয়া হবে গাড়িতে করে দাফনের উদ্দেশ্যে। লুনার হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়, মেয়ে শ্যামা মাকে জড়িয়ে ধরে মুখের দিকে তাকায়, মায়ের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের অর্থ বোঝেনা। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে দৌড়ে এসে বেলকনিতে দাঁড়ায়। লাশবাহী গাড়িটা ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে মেডিকেলের রাস্তা ধরে। লুনা হাত টা বাড়িয়ে দেয় গ্রীলের ফাঁক দিয়ে…

অনেক ভাবনা চিন্তার পর সাড়ে নয় মাসের অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রীকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল মনোয়ার। বুকটা ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠল বটে কিন্তু এই রঙিন মায়াজালের বিস্তৃত দিগন্তের সামনে দাঁড়িয়ে এর বাইরে আর কিছুই ভাবতে পারল না। দিনভর ঝড়ে যাওয়া আষাঢ়ের অবিরাম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রিতুর বাড়িতে যাবার জন্য তৈরি হলো। স্বামীকে বাইরে যেতে দেখে শিউলি বলল, পেটে প্রচÐ ব্যথা করছে, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, মনে হচ্ছে এখুনি দম বন্ধ হয়ে মরে যাব, এ সময় দূরে কোথাও যেয়ো না। যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। উহু কী ব্যথা, বলে যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে পাশ ফিরল শিউলি।
বউয়ের কথায় কান দিলো না মনোয়ার। ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ এই বিস্তৃত শহরের বড় বড় দালানকোঠার গায়ে আঁছড়ে পড়তে লাগল।
কাকভেজা হয়ে যখন রিতুর বাসায় পৌঁছল তখন উত্তেজনায় ক্রমাগত কলিংবেল চাপতে লাগল মনোয়ার। ভেতর থেকে দরজা খোলার অপেক্ষা সহ্য হচ্ছে না যেন। রিতু ফোনে কথা বলছিল। ফোনটা কানে রেখেই একপাশে মাথা হেলিয়ে দরজা খুলল। মানোয়ারকে দেখে ভ‚ত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, মনোয়ার আপনি?
একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল, হ্যাঁ আমি। চমকে গেলে?
না চমকে উপায় আছে। তারপর চোখ, মুখ, সমস্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে বলল, বেশ ভিজে গেছেন, দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে বসুন আমি তোয়ালা আনছি।
সোফায় গা হেলিয়ে বসল রিতু। এমন ঝড় বৃষ্টির দিনে, এমন মন উদাস করা সন্ধ্যার নিভু নিভু আলোয় এক অজানা পাপবোধে আচ্ছন্ন হয়ে বলল, এই প্রচÐ ঝরের রাতে ভিজে ভিজে আমার কাছে কেন আসলেন?
তোয়ালায় মাথা মুছতে মুছতে মনোয়ার বলল, অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে বেঁধে রাখতে পারলাম না। তোমার সমস্ত কিছু আমায় টানছিল। অফিসে যে সময়টুকু পাশে থাকো এক অদ্ভুত ভালোলাগায় বুদঁ হয়ে থাকি। বাসায় ফিরলে অস্থিরতায় ডুবে যাই। এখন বলো, এসে বিপদে ফেললাম কী?
রিতু বলল, বিপদে ফেলবেন কেন? আমি কী চাই, কতটুকু চাই তার সবটাই আপনি জানেন। নতুন করে কী জানাব। তবে এত ডেকেও যখন আনতে পারলাম না তখন এই হুট করে আসার কারণ নিশ্চয়ই আছে।
কোনো কারণ নেই।
সত্যিই কোনো কারণ নেই?
উত্তর না দিয়ে পাশে বসে রিতুর নরম উষ্ণ শরীরে হাত রেখে মনোয়ার বলল, অনেক ভেবে দেখলাম রিতু, তোমার এই চোখের ভাষা, খোলা চুলে হেসে কথা বলা, আমাকে এক অদ্ভুত আকর্ষণে জড়িয়ে ফেলছে। তুমি যে কী প্রবল আকর্ষণে আমাকে কাছে টানছো সে শুধু আমিই জানি।
আর আপনি? যেদিন আপনাকে কাছে পাই, সে সামান্য সময় হলেও, ঐ দিনটিই কেবল আমার সুন্দর কাটে। কিন্তু দিনশেষে আমি বড় একা।
সে আমিও রিতু। তোমাকে নিয়ে কাটানো মুহূর্তগুলো আমাকে আরো গভীরে যেতে উদ্বুদ্ধ করে। মনে হয় তুমি যা চাও সেটা বোধহয় আমিও চাই।
সত্যিই?
হ্যাঁ, সত্যিই।
কিন্তু আমি যে আপনার সমস্তটুকু জুড়ে থাকতে চাই। এই হঠাৎ কাছে আসা, গোপন প্রেম, গোপন স্পর্শে আমার চলে না। পুরোটা, সমস্তটা দিয়ে আমাকে নিতে পারবেন?
একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে মনোয়ার বলল, পারব।
সত্যি পারবেন? কিন্তু আপনার স্ত্রী যদি এতে রাজি না থাকে?
খানিক নিশ্চুপ হয়ে ধরা গলায় মনোয়ার বলল, আর কটা দিন মাত্র ও বেঁচে আছে। তাই ওকে নিয়ে তোমার ভাবার কিছু নেই।
রিতু চমকে উঠে বলল, আমার জন্য শিউলিকে মেরে ফেলবেন? ওর পেটে সন্তান। ওকে মারলে থানা পুলিশ হবে, জেল হবে। এত বড় সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?
তোমার মতো আমিও আমার সমস্তটুকু দিয়ে তোমাকে চাই। তোমাকে পাওয়ার জন্য যে কোনো কাজ করতে রাজি আছি। বলে দুহাত দিয়ে রিতুকে জড়িয়ে ধরল।
একটানা ঝরে যাওয়া বৃষ্টির জল জানালা টপকে ঘরে ঢুকছে। তাতে মেঝের অনেকটা জায়গা ভিজে গেল। সেই ভেজা মেঝের দিকে তাকিয়ে অজানা কামভাবে বুঁদ হয়ে মনোয়ারের আধোভেজা গায়ে জড়িয়ে গেল রিতু। তার অনেকদিনের অপূর্ণতা আজকের এই বৃষ্টিভেজা রাতে পূর্ণ হয়ে উঠল।
গভীর রাতে রিতুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডা. শর্মিলার বাড়িতে গেল মনোয়ার। ডা. শর্মিলা রাজি হলেন। তবে সতর্ক করে বললেন, মেরে ফেলার বিষয়টা যত সহজ ভাবছেন তত সহজ নয়। অনেক ঝুঁকি আছে। এত অল্প টাকায় হবে না। ডা. ফিরোজ আছেন আইসিইউর দায়িত্বে। তাকে ম্যানেজ করা না গেলে পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে।
মনোয়ার বলল, টাকা যা লাগে দিতে রাজি আছি। ডা. ফিরোজকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আপনার।
ফিরোজ সাহেবকে ফোনে পাচ্ছি না। খুব ঝামেলায় আছেন তিনি। কথা হলেই আপনাকে জানিয়ে দিব।
ওকে।
কিন্তু একটা কাকপক্ষীও যেন না জানে।
আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন। সবাই জানবে শিউলি ডেলিভারির সময় মারা গেছে। বাচ্চাটা পেটেই মরে ছিল। সকাল হতেই পাওনার অর্ধেক বুঝিয়ে দিব, বাকিটা কাজ শেষে।
না, অপারেশন করার আগেই পুরো টাকা চাই। নইলে হবে না। এবার ভেবে দেখতে পারেন।
ঠিক আছে তাই দিব। তবে কাজ হওয়া চাই। বলে বেরিয়ে এল মনোয়ার।
শুয়ে শুয়ে অনেক কিছু ভাবছিল শিউলি। ভাবতে ভাবতে চোখ ভিজে গেল। আধারে ডুবে গেলে মানুষ যেমন আলো হাতড়িয়ে বেড়ায়, শিউলি তেমনি সন্তানের মুখের ছবিটা আঁকতে চেষ্টা করল, পারল না। শুধু দুঃস্মৃতির মতো ভেসে উঠল স্বামীর অবহেলা। মনে পড়ল বাবার কথা। অনেক নিষেধ করেছিল মনোয়ারকে বিয়ে না করতে, শোনেনি। বাবার কথা মনে হতেই ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দ বাইরের বৃষ্টির সাথে মিশে গেল, কেউ জানল না। কাঁদতে কাঁদতে একসময় শান্ত হলো সে। তবুও তার চোখ বেয়ে অবিরত জল ঝরতে থাকল।
গভীর রাতে বাসায় ফিরল মনোয়ার। শিউলির পাশে বসল। গায়ে হাত রেখে অভয় দিয়ে বলল, এত ভেঙ্গে পড়েছ কেন? কেঁদো না। কিচ্ছু হবে না।
চমকে উঠল শিউলি। অভিমানের সুরে বলল, আমার জন্য ভাবতে হবে না, বেশ আছি। বলে হু হু করে কেঁদে উঠল। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, কেন এমনটা করেছিলে? কেন কষ্ট দিয়েছিলে?
মনোয়ার উত্তর দিলো না। শিউলি আবার বলল, বিয়ের পর থেকে যত দুঃখ যন্ত্রণা আমি পেলাম সব কিছু ভুলে তোমার উপরই ভরসা রাখছি। আগামীকাল কী হবে কেউ জানি না। যদি মরে যাই ক্ষমা করে দিও। আমাকে দোষী করে রেখো না। বলে জানালা দিয়ে বাইরের ঝড়ো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল।
পরদিন শিউলিকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হলো। রাত নটার পর অপারেশন হবে। ডা. শর্মিলা এখনো আসেন নি। টাকাসহ মনোয়ার এসেছে তার বাসায়। ডা. শর্মিলা টাকা নিলেন। কিন্তু টাকা দেয়ার পরপরই পুলিশ মনোয়ারকে অ্যারেষ্ট করল।
কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই প্রিজন ভ্যানে উঠাল।
রাত্রি সাড়ে নয়টায় শিউলির অপারেশন হলো। ডা. শর্মিলা অপারেশন করলেন। পৃথিবীর আলোয় আলোকিত হলো সদ্যভ‚মিষ্ঠ শিশু। বিবেক বর্জিত নিষ্ঠুর পৃথিবীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সে জোরে কেঁদে উঠল। তার কান্নায়, তার নিষ্পাপ মুখচ্ছবিতে, মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে জন্মানোর সাহসিকতায় আঁকা হলো এক বীরত্বগাথা।

আমাদের দেশে শিশুদের লেখালেখি বা সৃজনশীলতা চর্চা করার মতো যায়গা খুব কমই রয়েছে। তবে শিশু-কিশোর পত্রিকা বা ম্যাগাজিন দেশে অনেক আছে। তার মধ্যে কিছু আবার দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
শিশু-কিশোর পত্রিকা বলতে বুঝায় মূলত শিশু-কিশোর উপযোগি লেখার সমন্বয়ে গঠিত পত্রিকা বা ম্যাগাজিন। এর মধ্যে থাকতে পারে গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, শিশুতোষ সংবাদ ইত্যাদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব লেখার লেখক হলো বড়রা। এসব পত্রিকা বা ম্যাগাজিন সম্পাদনার দায়ীত্বেও থাকে বড়রা। ম্যাগাজিনগুলোতে বড়দের তুলনায় শিশু-কিশোরদের লেখার সুযোগ নেই বললেই চলে বা থাকলেও খুবই সীমিত। কিন্তু হওয়া উচিৎ ছিল উল্টোটা।
কোনো কিছু চর্চা করতে করতে এক সময় সেটি পরিপূর্ণতা লাভ করে। ধরুন আপনি যদি একজন ভাল ফুটবলার হতে চান তাহলে আপনাকে নিয়মিত চর্চা কর‍তে হবে। মাঠে নেমে খেলতে হবে। শুধু খেলা দেখলেই ভাল খেলোয়াড় হওয়া সম্ভব নয়। একই ভাবে ভালো সাহিত্যিক বা লেখক হতে হলেও চর্চার প্রয়োজন আছে। আমাদের মধ্যে প্রায় সকলই ছোটবেলায় খাতার শেষ পাতায় কিংবা ডায়েরীতে কিছু না কিছু লিখতাম। হতে পারে সেটা আজগুবি কোনো গল্প বা ছড়া-কবিতা। যেটা হয়তো আদৌত কোনো কবিতাই হয় নি। কিন্তু আমরা লিখেছিলাম। কিন্তু কজনই বা এই লেখালেখির চর্চা ধরে রাখতে পেরেছি?
এর কারণ হিসেবে প্রথমেই আসে লেখা লেখির প্লাটফর্মের অভাব। একটি শিশু নিয়মিত যখন গল্পের বই বা অন্যান্য বই পড়ে, তখন তার কল্পনার নিজস্ব একটা জগত তৈরী হয়। সে ওই গল্পের বইয়ের ওই রূপকথার গল্পগুলোকে বিস্তৃত রূপ দেয়। বইয়ের কাহিনী শেষ হলেও তার শয়নে স্বপনে ওই কাহিনী বা গল্পের রেশ থেকে যায়। এই রেশ থেকেই অনেকে লেখালেখিতে আগ্রহী হয়। কিন্তু এক সময় হারিয়ে যায় ওই প্লাটফর্মের অভাবেই।
একজন লেখক একদিনেই মানসম্পন্ন লেখক হয়ে ওঠে না। একের পর এক লিখতে লিখতে গড়ে ওঠে পাকা লেখক হিসেবে। কিন্তু যদি তার কাছে শুরুতেই মানসম্পন্ন লেখা আশা করা হয় তাহলে সে তার আগ্রহই হারিয়ে ফেলবে লেখালেখির প্রতি।
বর্তমানে ম্যাগাজিনগুলো তে গড়ে ১০ টি লেখার মধ্যে ১টি বা দুটি লেখা থাকে শিশু-কিশোরদের। যার ফলে অনেক শিশু কিশোর লেখক তাদের লেখা প্রকাশ করার যায়গা পেয়ে ওঠে না। যদি আমরা ভবিষ্যতে মান সম্পন্ন লেখক বা বুদ্ধিদীপ্ত প্রজন্ম চাই তাহলে তাদের চিন্তা প্রকাশের যায়গা দিতে হবে। যদি তা না দিতে পারি তাদের চিন্তা শক্তি অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে।
আমি বলছি না ম্যাগাজিনে বড় লেখকদের লেখা থাকবে না। অবশ্যই থাকবে। কেননা না পড়লে কেউ লিখতে পারবে না। আমাদের দরকার ছোটদের পড়ার প্লাটফর্ম এর পাশাপাশি লেখার প্লাটফর্মের। যেখানে শিশু-কিশোররা তাদের অব্যক্ত, অসম্পূর্ণ, কাঁচা লেখা
গুলো প্রকাশ করতে পারবে। যার মাধ্যমে তাদের লেখালেখির আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে দক্ষ সম্পাদনা পর্ষদের মাধ্যমে তাদের লেখাগুলো সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হলে তারা বুঝতে পারবে তাদের লেখাগুলোর মধ্যে থাকা ভুল-ক্রুটিগুলো। যা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা ধীরে ধীরে তাদের লেখায় উন্নতি করবে।
এ কারণে আমাদের দেশে প্রচলিত শিশু-কিশোর ম্যাগাজিনগুলোতে শিশু-কিশোরদের লেখার সুযোগ বাড়াতে হবে। সেই সাথে সরকারি বা বেসরকারি ভাবে ছোটদের জন্য লেখালেখির প্লাটফর্ম করে দিতে হবে। যেখানে ছোটরা তাদের মনের অভিব্যাক্তিগুলো প্রকাশ কর‍তে পারবে। এছাড়া অভিজ্ঞ লেখক সাহিত্যিকদের সমন্বয়ে ছোটদের জন্য লেখালেখির কর্মশালা বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। এতে করে অনেকেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। এবং ভবিষ্যতে আমরা পাবো কালজয়ী অনেক লেখক বা সাহিত্যিককে।

এক.
সকালটা ছিল স্বাভাবিক অন্যান্য দিনগুলির মতোই। প্রকৃতিটা স্বচ্ছ আলোর ঝলকানিতে ঝলমল করছিল। এককাপ চা হাতে নিয়ে বারান্দায় দাড়াতেই মনটাও ঝলমল করে উঠেছিল বাইরের রোদ্দুরের সাথে পাল্লা দিয়ে । তেমন কোন কাজ ছিলনা হাতে তারপরও খুব বেশি ইচ্ছা করছিল কাজের ভেতর ডুবে যেতে । কি করা যায় প্রশ্নটা উঁকি দেয়ার আগেই কলেজের ছবিটা ভেসে উঠেছিল মস্তিস্কের পর্দায় । বেরুনোর দু’মিনিট আগে পান্নু এসে বলেছিল, ‘ আফা আইজ কাগুজ পড়লেন না ?’ পান্নুর হাতের দিকে তাকাতেই খবরের কাগজের পাশাপাশি ওর কব্জিতে গলানো হাতঘড়িটার দিকে চোখ পড়েছিল।
দুই.
সেদিন বিকেল গড়ানো পর্যন্ত কলেজেই ছিলাম । ব্যস্ততা ও ছিল আবার বন্ধুদের সাথে আড্ডাও চলছিল, তবুও সবকিছু ছাপিয়ে, বহু দূর পেরিয়ে স্মৃতির কোণে একটা হাতঘড়ির ছবি অস্পষ্ট হয়ে ভেসেছিল । পান্নুর হাতঘড়িটা অন্য কোথাও দেখেছিলাম আমি অন্য কোনও হাতে, কিন্তু কোথায়? প্রশ্নটা ঝুলছিল ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। ডানদিক থেকে বামদিকে, বামদিক থেকে ডানদিকে। বাসায় ফেরার পরও একই অবস্থা, গলায় বিঁধে থাকা মাছের কাটাঁর মতো প্রশ্নটাও মনের ভেতর একটু পর পর বিঁধে উঠছিল । একটু অন্যমনস্ক হলামতো পরক্ষনেই জানান দিচ্ছিল ওটা আছে, এবং উত্তরটা দিতেই হবে। যেন একটা ধাঁধাঁ দেয়া হয়েছিল আমাকে যেভাবেই হোক সেটার সমাধান দিতেই হবে । পান্নুর সামনে যতোবার পড়েছিলাম ওর মুখের দিকে তাকিয়েই কথা বলেছিলাম, ওর হাতের দিকে যাতে দৃষ্টি না যায় প্রানপণ চেষ্টা ছিল সেদিন। ভাবখানা এমন যে পান্নুর হাতের ভেতর একটা অশরিরী বসে আছে তাকালেই কথা বলে উঠবে আমার সাথে। মনে করিয়ে দেবে এমন একটা বিষয়, একটা ভয়ংকর কিছু যা ভুল করেও মনে করতে চাইনা আমি । কিন্তু প্রশ্নটাও ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো একটানা স্বরে উত্তর চাইছে । চোখের পাতা বন্ধ করে ইজিচেয়ারে শুয়ে ছিলাম, একসময় ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। কিছু একটার আচমকা শব্দে হঠাৎ জেগে উঠেছিলাম। সামনে ঝোলানো দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাতেই বুঝেছিলাম গত আড়াই ঘন্টা ঘুমের দেশে ছিলাম আমি। সেখানে একটা অস্পষ্ট স্বপ্নও ছিল। যেখানে একটা মুঠো ধরা হাত দেখেছিলাম যার কব্জিতে বাধা ছিল রুপালী রং এর গোল কাঁচের ফ্রেমওয়লা ১টা ঘড়ি। ব্যস ঐটুকুই! -কিছুক্ষণ পর পান্নুকে ডেকেছিলাম, সামনে আসতেই ওর হাতের দিকে তাকিয়েছিলাম সরাসরি। কিন্তু কব্জিটা খালি দেখতে পেয়েছিলাম। ধরা গলায় জিঙ্গেস করেছিলাম, ‘ আজ সকালে তোর হাতে যে হাতঘড়িটা ছিল ওটা, — কোথায় পেয়েছিস?’ পান্নুর ভীত উত্তর শুনতে পেয়েছিলাম ‘চোরাই বাজার থাইক্যা ২০০/- টাকায় কিনছিলাম গো আফা।’-
তিন.
সকালের সেই সে মনের ভেতর গেঁথে যাওয়া প্রশ্নের উত্তরটা পেয়ে গেছিলাম আগেই, স্বপ্নে! বছর তিনেক আগের ঘটে যাওয়া র্দূঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বারংবার। সেই প্রথম কোন র্দূঘটনা দেখেছিলাম এতটা কাছ থেকে। বাইশ-তেইশ বছরের একটা ছেলে সম্ভবত কোন ভার্সিটির ছাত্র ছিল, রাস্তা পার হবার চেষ্টা করছিল পথের অন্য প্রান্ত থেকে । হঠাৎ দ্রুতগামী এক বাসের ধাক্কায় ছিটকে পড়েছিল রাজপথে, কালো পিচ ভিজে উঠেছিল লাল রক্তে, হাত দুয়েক দূরে দাড়ানো ফুটপাতে আমি, কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল মুখ থেকে। জ্ঞান হারিয়েছিলাম তারপরপরই, তবে তার পূর্বমূহুর্তে আমার দৃষ্টি ঠেকেছিল ছেলেটির রক্তমাখানো হাতের উপর যেখানে ঐ ঘড়িটা বাধাঁ ছিল আর হাতের মুঠোটা কিছু একটা ধরতে চাচ্ছিল । সেদিন জ্ঞান ফিরে পেয়েছিলাম কয়েকঘন্টা পরেই । তবে দূর্ঘটনাটা তাড়িয়ে বেরিয়েছিল সারাটা বছর। অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল সব, নির্ঘুম কেটেছিল অগুণিত রাত্রি। অনেক সাধ্য সাধনা করে র্দূঘটনাটা প্রায় ভুলে গেছিলাম। হাতঘড়িটা সব স্পষ্ট করে দিল আবার ।
-আর সেদিনের রাতটা ছিল অস্বাভাবিক অন্যান্য রাতের থেকে।

-কয়, তুই কই-থাকি আইচছ? বলে মিজোরামের কবিরাজ গল্লার লাঠি দিয়ে বাড়ি মারে ঠাকুরচানের টংয়ের তরজায়। শব্দ শুনে ধড়ফড় করে উঠে গাইত্তি। রায়বাবু বড় উৎকোচ নিয়ে বসে আছেন। পাহাড়ি ভুত ছলানো দেখবেন আজ। কিন্তু, ভূত রূপি ঠাকুরচানের বউ! কিছুই বলছে না। উল্টো খিকখিক হাসে। উঠানে জ্বালানো আগুনের ধুনি থেকে লাল টকটকে লোহার শিকটা তুলে আনেন কবিরাজ,
-বল তাড়াতাড়ি কোত্থেকে এসেছি? না হলে গরম শিকের শেকা দেব শরীরে।
বরাবরের মতো আবার উন্মাদ হয়ে টং থেকে নেমে আসে ঠাকুরচানের বউ। সিঁড়ির নীচের শেষ পাদানিতে পা ফেলতেই কবিরাজ চুল মুঠিতে ধরে ফেলে দেন উঠানে। অমনি জোরে জোরে কেঁদে গড়াগড়ি করতে লাগল গাইত্তি মাটিতে। পাঁচ সাতজন পুরুষ মিলে সামলাতে পারছে না। যেন দানবী-র বল হয়েছে গতরে। কবিরাজ গরম শিকটি দিয়ে আঘাত করলেন পাছাতে। অমনি স্পর্শকাতর সুরে বলছে,
-বঁলছি বঁলছি সুঁনানু। মনে হল, গাইত্তির গলা দিয়ে ভূতের অদ্ভুত আওয়াজ বেরিয়ে আসছে।
-বল? উত্তর না দিয়ে প্রথমে ভুতরূপি ঠাকুরচানের বৌ উঠে বসে। ছেড়ে দেওয়া বেণীর চুলগুলো উস্ক-খুস্ক। অনেক দিন ধরে না আঁচরে নেওয়ায়, বিশ্রী একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। মাথা ঝাকানি দিয়ে পেছনের চুলগুলো সামনের দিকে এনে মুখ ঢেকে নিল। অনবরত দু-হাতে চুলগুলি চুলকাচ্ছে। মনে হচ্ছে উকুনের আখড়া হয়ে আছে সারা মাথা। বোটকা গন্ধটাও যেন অধিকতর হচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে।
-বল-বল তাড়াতাড়ি?
-তোঁমার হাঁতের শিঁকটা আঁগে রেঁখে দাঁও।
-না, ওটা রাখা যাবে না। তুই সব ঠিকঠাক বললে, শরীরে আর লাগাব না। এবার একটু অভিমানে ঠাকুরচানের বউ বলল,
-মঁরে (আমাকে) এঁকা পেঁয়ে যাঁ খুঁশি তাঁই কঁরছিস! কাঁল টেঁর পাঁবি!
-কাল কি হবে?
-দেঁওয়ান বঁলে গেঁছে তোঁ মাঁছমারা যেঁতে?
-হে।
-যাঁবি তোঁ তুঁই!
-যাব।
-তঁখন বুঁঝবি কঁত ধাঁনে কঁত চাঁল’
-সে না হয় বুঝলাম। বলে, মুচকি হাসে কবিরাজ। তারপর কিছু চিন্তা করে। একটু পরে উত্তেজিত স্বরে বলে, -ওখানে তোর কে আছে?
-আঁমার ভাঁই, মাঁ-বাঁবা সঁব আঁছে। ভুতের কৌতুহলী কথা শুনে কবিরাজ ভাবেন আরো কিছু কৌতূহল সৃষ্টি করবেন সবার সামনে।
-কোথায় থাকে তারা?
-মাঁছমারা বাঁজারের পেঁছনের তেঁতুল গাঁছে, এঁটা আঁমাদের আঁদি পুঁরুষের ভিঁটা।
-আদি পুরুষের ভিটা ছেড়ে তুই এখানে এসেছিস্ কেন?
-মেঁয়েদের বিঁয়ে হঁলে কিঁ বাঁবার বাঁড়ি থাঁকে! মুচকি হাসে ভুতরূপি ঠাকুরচানের বউ।
-তোর জামাই কই?
-আমার দাঁদার বিঁয়ের পাঁকা কঁথায় গেঁছে।
-কোথায় বিয়ে হচ্ছে?
-মাঁছমারার এঁক মাঁনুষের ঝিঁ-র সঁঙ্গে।
-মানুষের সঙ্গে ভূতের বিয়ে হয় নাকি?
-হঁবে নাঁ কেঁন! ওঁটা আঁমার দাঁদার প্রেঁমের সঁম্পর্ক।
-পাত্রী কি জাঁতের?
-নঁমোশূদ্রঃ ব্রাঁহ্মণ কঁন্যা।
-শূদ্রঃ আবার কোন কালের ব্রাহ্মণ রে?
-আঁমার পূঁর্বপুরুষও তোঁ নঁমো ব্রাঁহ্মণ ছিঁল।
-কোথায় ছিল বাসস্থান?
-বঁল্লাল সেঁনের রাঁজ্যে।
-মিথ্যে বলার জেগা পাওনা।
-নাঁ সুঁনানু, দেঁওপলির পাঁরে দাঁড়িয়ে কেঁউ মিঁথ্যে বঁলে রঁক্ষা পাঁয় নাঁ।
-ভুতের আবার পাপপুণ্য!
-শূঁদ্রদের নঁমস্য ব্যঁক্তিরা-ই তোঁ নঁমোশূদ্রঃ।
-আজেবাজে কওয়ার জেগা পাছ-না? সত্যি করে বল! কর্কশে বলে কবিরাজ, আবার গরম শিক নিয়ে এগোয়। অপনি বাধা দেন রায়বাবু।
-দাঁড়ান কবিরাজ মহাশয়! ও সত্য বলছে।
থতমত খেয়ে উঠে সবাই। -কী বলছেন! বিস্মিত হয়ে জিগ্যেস করলেন কবিরাজ।
-হ্যাঁ মহাশয়। আমি ‘বল্লাল চরিত্র’ পড়েছি। সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে। -একদা কৌন্যকুব্জের রাজার কাছে ব্রাহ্মণ চেয়েছিলেন’ বল্লাল সেন। ব্রাহ্মণ স্বল্পতার কারণে, কান্যকুব্জের রাজা কিছু ক্ষত্রিয়কে ব্রাহ্মণ সাজিয়ে পাঠিয়েছিল গৌড়ে। পরবর্তীকালে বল্লাল সেন টের পেয়ে যান রাজার এই কূট-কৌশল। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেন কৌন্যকুব্জের বিরুদ্ধে। কিন্তু শক্তিতে কৌন্যকুব্জ ছিল উর্ধ্বে।
বিচক্ষণ বল্লাল সেন ছিলেন জয় পাওয়ার বদ্ধমূল পরিকল্পনায়। কৌশলে পাঁচশো অনার্যকে ব্রাহ্মণ সাজিয়ে বলদ এর পিঠে চড়িয়ে যুদ্ধের প্রথম সারিতে উপস্থিত করান। গো হত্যা ও ব্রহ্ম হত্যার ভয়ে অস্ত্র ত্যাগ করে সন্ধি স্থাপনের ভেরি বাজান কৌন্যকুব্জের রাজা। যুদ্ধ থেমে যায়। পরবর্তী সময়ে এই অনার্যদের যুদ্ধ বিজয়ের পারিতোষিক দিতে আগ্রহ দেখান বল্লাল সেন। অনার্যরা জানায়, বিপ্র সাজে থাকতে চায় আজীবন। সম্মতি হয় মহারাজের। তখনই কিছু ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় প্রতিবাদ জানাতে উদ্যোগ নেয়। রাজ-আজ্ঞা অবমাননা করায়, ব্রাহ্মণদের গারদে ভরে প্রাণদণ্ড নেবেন এমন এক সিদ্ধান্ত নেন বল্লাল সেন। কিছু নিয়েও ছিলেন। ভয়ে ব্রাহ্মণরা পালিয়ে যায় গৌড়ের বিভিন্ন অধ্যুষিত অঞ্চলে। আত্মগোপন করতে গিয়ে পৈতা বিসর্জন দেয় তারা। বৃত্তি ও স্থান পরিবর্তনের কারণে, অভাবের করাল অন্ধকার নেমে আসে স্বমূলে। জীবন রক্ষার্থে বাধ্য হয় মৎস্য-বৃত্তি শুরু করতে। সমাজে পরিচয় দিতে থাকে শূদ্র তার। কিন্তু তাদের শাররীক গঠন দেখে, শূদ্র বলে মানতে নারাজ সমাজ। তখন এই ছদ্মবেশী ব্রহ্মণরা পরিচয় দেয়, তারা শূদ্রের নমস্য ব্যক্তি। অর্থাৎ পদবী নমঃশূদ্র। এদেরই বংশধরের কোনো অপমৃত্যু পাওয়া; আত্মারা-ই হবে এই ভুত সম্প্রদায়। পরিপাক্ষিক বিষয়ে জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে কবিরাজ পূনরায় প্রশ্ন করলেন, -তোমরা এই দেওপারে এলে কি করে।
-আঁমার বাঁবার বংঁশধরেরা কঁবে এঁসেছিল জাঁনিনা। তঁবে স্বাঁমী বেঁশিদিন হঁয়নি এঁসেছে।
-তার বাড়ি কোথায় ছিল?
-সাঁজেক পাঁরে
-তার জাত কি?
-উঁপজাতি বাঁমন।
-এখানে এল কি করে?
-দেঁওপথে আঁসা একঁ রিয়াংঁ পঁরিবারের সঁঙ্গে। বলে ভুতরূপি ঠাকুরচানের বউ মুখ ফিরিয়ে নেয়।
-মুখ ফিরাইচ্ না, ভাইয়ের বিয়েতে গেলি না…?
-স্বাঁমীর আঁদেশ নাঁই।
-কেন?
-বঁলা যাঁবে নাঁ। রাগে উত্তর দিল।
-শিক গরম করে আনব আবার!
-পাঁহারা দিঁতে রেঁখে গেঁছে আঁমারে।
-মানুষের বাড়িতে তোর আবার কীসের পাহারা?
-কঁলা ছঁড়ির।
-কোথায় ছড়ি?
-ঠাঁকুর চাঁনের বঁউয়ের পেঁটে থুঁর আঁকারে আঁছে।
-তাতে তোর কি?
-কঁলা পাঁকলে স্বাঁমী-স্ত্রীঁ মিঁলে একসঁঙ্গে খাঁবো।
-খাওয়াচ্ছি তোকে কলার থুর! কে আছিস!! শিকটা আবার….? খিকখিক হাসে গাইত্তি। চেয়ে দেখে কবিরাজ ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে আছে শিক। -আগুন বুঝি নিভে গেছে?
-পাঁচটা তাঁজা মোঁরগ লাঁগবে।
-কিচ্ছু দেওয়া যাবে না। যাবি কি-না বল? না আবার…..। এবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল ঠাকুরচানের বউ।
-কাদছিস্ কেনো?
-মোঁরগ ছাঁড়া গেঁলে স্বাঁমীর হাঁতে বেঁদমপ্রঁহার খেঁতে হঁবে।
-এক জোড়া কবুতর দেবো। যাবার হলে, বল। নাহলে আবার শিক আগুনে দেবো।
মুহূর্তে বাড়ির ঈশান কোণে শিমুল গাছটি নড়েচড়ে উঠল। তৎক্ষণাৎ ভেঙে পড়ল একটি বড় ডাল। পাঁচ মাসের গর্ভবতী ঠাকুরচানের বউ মাটিতে ধপাস করে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ থরথর করে কাঁপলো শরীর। তারপর মূর্ছিত হয়ে পড়ে রইল অনেকক্ষণ মাটিতে। বাঁশের চোঙে আনা দেওনদীর জল অনবরত নাকেমুখে ছিটালো কবিরাজ। সম্বিত এল গাইত্তির। ধীরে ধীরে শুকনো গলায় বলল,
-এক গ্লাস পাণি দে মোরে।
-অয় দে।
-মোর হি অইয়ে।
-তোর.দে…..। বলে; স্ত্রীর গলায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল ঠাকুরচান

কারো জন্য অপেক্ষা করাটা আমার ডায়রীর পাতায় লেখা নেই! ঘন্টা খানেক ধরেই চাড়ালকাটা নদীর উপর সদ্য তৈরি করা নতুন ব্রীজের উপরে বসে আছি। আগে এখানে একটা চমৎকার ব্রেইলি ব্রীজ ছিলো! এখন সেটা ভেঙে নতুন করে কংক্রিট নির্মিত ব্রীজ করা হয়েছে! যদিও আর ব্রীজটার সৌন্দর্য আগের মতো নেই,তবুও এখানে বিনোদন প্রেমীরা প্রায়শই ভিড় করে। আজ এখানকার আকাশে প্রচন্ড রোদের ঝলকানি নদীর পানিতে প্রতিবিম্ব করে চোখের ওপরে এসে পরছে আর বিশ্রী রকমের জ্বালা দিচ্ছে। তবুও মনোযোগ সহকারে অচেনা একজনের আসার অপেক্ষায় পথচেয়ে বসে আছি! এভাবে এর আগে কখনো কারও পথচেয়ে অপেক্ষা করেছি কিনা,ঠিক মনে পড়ছেনা। আমি পুরোই অস্থির প্রকৃতির মানুষ,আমার ব্যকুল চিত্ত কোনো কিছুতে এতটা ধৈর্যের পরিচয় কিভাবে দিচ্ছে,আমার নিজেকেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
আমি রঙিন ব্রীজের রেলিঙে বসে নদীর স্রোতের খেলা দেখছি! আর মাঝে মধ্যে আজগুবি সব কল্পনা করে,মুখে বিরবির করে হাজারো কথা বলে ছোট ছোট ইটের টুকরো আর পাথর দূরে ছুড়ে মারছি। আমার থেকে একটু দূরেই নদীতে চার পাঁচটা হাঁস ছোটাছুটি করে নদীতে দাপিয়ে বেরাচ্ছে,দেখে মনে হয় তাদের মধ্যে হৃদয় দেয়া নেয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছে;আর আমি কিনা মনে মনে অচেনা অজানা সেই রমনীর কল্পিত মুখচ্ছবিটা অঙ্কন করছি। আমার নিজেরই হাসি পাচ্ছে! যাকে কখনও এক পলকের জন্যেও দেখিনি,এক মূহুর্তেও কথা বলিনি! অথচ আজ অচেনা কিসের একটা অমোঘ আকর্ষণে হৃদয় তনুমনে সপ্ত সুরের মূর্ছনায় ভরে উঠছে। মনে হচ্ছে সে যেন আমার পূর্ব জনমের পরিচিত,তার সাথে আমার অনন্তকালের হৃদয়ের জানাশোনা!
আচ্ছা যার জন্য এতটা সময় ধরে অপেক্ষমান আছি,সেই মেয়েটা কী সত্যিই আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার মতোই! তার মুখটা গোলগাল নাকি চ্যাপ্টা! তার চোখ জোড়া কী আমার কল্পিত নারীর চোখ জোড়ার চেয়েও মায়াবী,নাকি তার চোখের মাঝে কোনো মায়া নেই! আচ্ছা তার চুলে কী কৃষ্ণচূড়ার গন্ধ পাওয়া যায়? রোজ সকাল বেলা যত্ন করে বেনি করে খোঁপায় গোলাপ ফুল গুঁজে রাখে! সে কি সত্যি সত্যিই নীল শাড়ী পরে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে! যার জমিন থাকবে আকাশি নীল আর পাড়গুলো হবে হলুদ রাঙা! আমার স্বপ্নের মেয়ের মতোই কি তার হাত দুটোতে মেহেদী রাঙানো থাকবে আর ঠোঁট জোড়ায় পিঙ্ক কালারের লিপস্টিক লাগানো থাকবে! আর বাজ পাখির নখের মতো নখে লাগানো থাকবে কালো রঙের নেইল পলিস! আর পায়ের পাতায় শোভা পাবে সদ্য দেয়া আলতা! তার পা দু খানাতে শোভা পাবে স্বর্ণ খচিত নূপুর,আর সে যখন আমার কাছে হেটে আসবে তার নূপুরের ধ্বনি আমার হৃদয় মনকে বিমহিত করে ফেলবে। আচ্ছা যদি মেয়েটা আমার স্বপ্নের মতো না হয়,তবে কী তাকে নিয়ে সংসার করতে পারবো!
গত কিছুদিন হতে বাসায় বিয়ের জন্য অনবরত চাপ দিচ্ছে! এবার বিয়েটা না করলেই যে আর নয়। তাই বাধ্য ছেলে হয়েই মেয়ে দেখতে আসা। ঘটক আমাকে এখানে একলা ফেলে রেখে ছুটে গেছেন মেয়েটাকে তার বাড়ি হতে নিয়ে আসার জন্য। দেড়ঘন্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলো কিন্তু মেয়েটার আসার তো কোনো নাম গন্ধও নেই। অথচ বাসা হতে আসার সময় ঘটকের তাড়া মেয়ে এক ঘন্টা আগে হতেই নাকি এসে রেডি হয়ে আছে,কিন্তু এখানে এসে দেখি সম্পূর্ণ উল্টোটা। একজন মানুষের যদি সময় জ্ঞানটুকুও না থাকে তবে তাকে নিয়ে কিভাবে সংসার করবো,আল্লাহ্ই জানে। এদিকে রাস্তা দিয়ে কতো প্রেমিক জুটি হোন্ডায় ধোঁয়া ছুটায়ে একটু পর পর ছুটে যাচ্ছে,আর আমার দিকে তাকাচ্ছে। জীবনে এই প্রথমবার একাকী থাকায় নিজেকে অনেক অসহায় মনে হচ্ছে,সাথে যদি কোনো বন্ধুকে নিয়ে আসতাম মন্দ হতোনা।
এদিকে দিনের আলো কমে আসায় অনেক প্রেমিক জুটিও ব্রীজের আস পাশে এসে ভির জমাচ্ছে! তাদের মধ্যে অনেকেই আমাকে এখানে একাকী দেখে আড়ালে আড়চোখে তাকাচ্ছে আর মৃদু হাসছে। দূর হতে আমার পানে দেখে তাদের মধ্যে অনেকেই তার সঙ্গীকে কি জানি বলছে! এখানে আর একদমই ভালো লাগছেনা,নিজেকে বন্যপ্রাণী বলেই মনে হচ্ছে! মনে হচ্ছে সব কটার গালে কষে কষে কয়েকটি ঘা বসিয়ে দিয়ে আসি! কিন্তু খুব সহজেই আমি শান্ত হলাম,যদিও খুব সহজাই আমি শান্ত হইনা। এদের জ্ঞানের বিরাট অভাব আছে,নয়তো কীভাবে বুঝবে একাকী থাকাটা কতটা সুখের! যতদিন একাকী থাকা যায় ততোদিনই জীবন মানেই চিল আর মাস্তি! এরা কি বোঝে একাকী থাকা কোনো দূর্বলতা নয়,এটা একটা আর্ট! একাকী থাকার মতো ক্ষমতা সকলের থাকেনা,এটা অনেক সাধনায় সম্ভব।
আচ্ছা অনেক দিনই তো একাকী কাটালাম,কিন্তু জীবনের আর বাকী কটাদিন এভাবেই কাটালে ক্ষতি কী! রোজ ঘটা করে চার থেকে পাঁচটা ঘটক আসছে বিয়ের সমন্ধ নিয়ে। তবে এই প্রথম কোনো মেয়েকে দেখার জন্য ভীরু ভীরু বুক নিয়ে এখানে এসেছি! যদিও আমার এখানে আসার কোনোই ইচ্ছে ছিলনা,কিন্তু অসুস্থ মায়ের শেষ ইচ্ছা ছোট ছেলের বউকে দেখে যেতে চান! কি আর করার বাধ্য ছেলে হয়ে ঘটককে হোন্ডার পেছনে তুলে রওনা হলাম! কিন্তু কেন জানি বুকের ভিতরে দুরুদুরু করছে,জানিনা মেয়েটা কেমন হবে! মেয়েটা কী আমাকে পছন্দ করবে। কিছু দিন আগেই বন্ধু সেজানের বিয়ে হয়েছে ওরে ফোন দিয়ে বিস্তারিত বললাম। সে অভয় দিয়ে বললো বন্ধু একটুও ভয় পাবিনা,তুই পুরুষ মানুষ বুক উঁচু করে মেয়ের সামনে দাঁড়াবি! একটা মেয়ে পছন্দ না করুক দেশে হাজার হাজার সুন্দরী রমণী দেখবি তোর জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও ভাবি সত্যিই তো,এতোটা নার্ভাসের কি আছে। আমিও মনে মনে কিছুটা সাহস পেলাম,সত্যিই তো দেশে কি মেয়ে মানুষের আকাল পরছে নাকি!
সময় গড়িয়ে কখন যে সন্ধ্যা নেমে আসলো টেরই পাইনি! আর মিনিট বিশেক পরেই হয়তো মাগরিবের আযান হবে। ধিরে ধিরে আশপাশের গাছে গাছে পাখিরা ফিরে আসছে,তাদের কলকাকলি জানিয়ে দিচ্ছে এখন ঘরে ফেরার সময় হয়েছে! কিন্তু মেয়েটি এখনো আসছেনা,আমার মনে হয় সে আসবেনা! হয়তো মেয়েটাও আমার মতোই এ বিয়েতে রাজি নয়! তাকে হয়তো বাসা থেকে জোর জবরদস্তি করেই বিয়ে দিচ্ছে। আমার সহসাই মনটা ফ্রেশ হলো,যদি মেয়েটা বিয়েতে রাজি না থাকে তাহলে তো আমার আবারও নতুন কোনো পাত্রীর খোঁজ করতে হবে,আবারও নতুন করে আলাপ আলোচনা করতে হবে! অভিভাবকরা ভালো মন্দ খোঁজ খবর করবে তাতে অন্তত হাতে এক মাস সময় পাওয়া যাবে! জীবনের শেষ সময়ে এসে এই একটি মাস স্বাধীনভাবে কাটালেও তো মন্দ হয়না!
আমি ঘটকের ফোনে অনবরত ফোন করেই যাচ্ছি,কিন্তু তার ফোনটাও বন্ধ দেখাচ্ছে! আচ্ছা আমি কি ফিরে যাবো? নাকি আরও কিছুক্ষণ সেই অচেনা রমণীর জন্য অপেক্ষা করবো! ধীরে ধীরে আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে কারও জন্য অপেক্ষা করা যায়! আর ঘটক ব্যটারই কি কান্ডজ্ঞান শুনি,আমি যে এখানে কয় ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি তারও কোনো হদিশ নেই!
মেজাজটা এবার পুরোই বিগরে গেল,হোন্ডাটা স্টার্ট করে ফিরে আসবো এমন সময় পিছন থেকে শুনতে পেলাম কোনো রমণীর খুব চেনা একটি কণ্ঠস্বর “আমার জন্য একটুও অপেক্ষা করা যায়না,আর আমি যে তোমার জন্য বছরের পর বছর পথ চেয়ে অপেক্ষা করে বসে আছি! আমাকে কি তোমার সঙ্গী করা যায়না?”

ফুলির মা রহিমা সেই কাক ডাকা ভোরে চলে যায় মানুষের বাড়ি কাজ করার জন্য, আর ফিরে আসে রাতে। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় তার ভাগের খাবারটা শাড়ির আঁচলে পোটলা বেঁধে ক্ষেতের সরু আইল কাঁদা পানি পার হয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়িতে আসে। তারপর ছেলে মেয়েদের নিয়ে ভাগ করে খায়।
আজ বড়লোক মালিকের বাড়িতে ছিল ইফতার মাহফিল, কাজের চাঁপে তার আর বাড়ি ফেরা হলো না। ছেলে মেয়ের কথা ভেবে তার মনটা ব্যাকুল হয়ে পড়ে, কোন ভাবেই ইফতারের খাবার গলা দিয়ে ভেতরে যেতে চায় না। মালিকের চোখের আড়ালে এসে ইফতারের উপকরণ গুলোকে পোটলা বেঁধে লুকিয়ে রাখে বাড়ি নিয়ে আসার জন্য।
ফুলির ছোটভাই ভুলু মনে মনে ভাবে রোজার দিন বড়লোকের বাড়িতে কতো রকমের ইফতার তৈরী হয়, মা সেগুলো নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসবে। ইফতারের সময় তারা সবাই মিলে একসাথে বসে মজা করে খাবে । কিন্ত দিনের আলো ক্রমশ নিভে গিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পাখিরা দিনের আহার শেষে নীড়ে ফিরে চলছে, অথচ মায়ের ঘরে ফেরার কোন নাম নেই। তাহলে মা এখনো আসছেনা কেন? তাহলে কি এখনো মায়ের ছুটি হয়নি ? মা কি আজ আসতে পারবে না? ভাবতেই তার ছোখে অশ্রু এসে যায়। আশে পাশের বাড়ি থেকে ইফতারের উপকরণ তৈরির গন্ধ তার নাকে ভেতর সুড়সুড়ি দিচ্ছে। তার মন আরও খারাপ হয়ে যায়।
ফুলি সমস্ত ঘর তন্ন-তন্ন করে খুঁজে অবশেষে শিকার উপর তুলে রাখা মাঝারি আকারের একটি টিনের কৌটোর ভেতর দু’ মুঠো শুকনো মুড়ি ছাড়া আর কিছুই পেলো না। ফুলির বুকের ভিতরটা ধকধক করে উঠল।
ছোট ভাই ভুলু, দু’পা মেলে দিয়ে তার মধ্যখানে একটা থালা নিয়ে বসে আছে ইফতারের জন্য। ফুলি কান্না ভেজা চোখে একটা থালায় দ” মুঠো শুকনো মুড়ি আর এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে ভুলুর পাশে বসল। থালায় শুধু শুকনা মুড়ি দেখে ভুলু রেগে মুড়ির থালা পা দিয়ে ঠেলে ফেলে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“এইলা কি এবতার ? মানসি এবতারোত শানকি বোঝাই করি কতো কি খায়, হামার খালি মুড়ি? মুই খালি মুড়ি দিয়া এবতার না খাও। ভুলু মাটিতে শুয়ে কাঁদতে থাকে।
সারাদিন রোজা থেকে শরীর তো আর চলে না একটা কিছুতো মুখে দিতে হবে। তাই মাটিতে পড়ে যাওয়া মুড়িগুলো যতোটা পাড়া যায় আলতো করে উপরে উপরে কুড়িয়ে দু”হাতে ফু”দিয়ে মুখে দেয় ফুলি। তারপর ঢোক ঢোক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়।
ভুলুকে বোঝানোর কোন ভাষা ফুলির জানা নেই। শুধু চোখের পানি মুছে সন্ধ্যা তারার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে- হে আল্লাহ রোজাদারদের জন্য সবচেয়ে বেশী আনন্দের মুহুর্ত নাকি ইফতারের সময় । আর আমার জন্য এটা কেমন আনন্দ তুমি বরাদ্দ রেখেছ?

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge