রবিবার, ২৮ মে ২০২৩, ০৭:০৪ পূর্বাহ্ন

মজনুর রহমান এর ৫টি কবিতা

মজনুর রহমান এর ৫টি কবিতা

মজনুর রহমান এর ৫টি কবিতা

১. নদীর জল দেখে
ভোরবেলা শান্তি লিখতে চেয়েছিলাম
কখন যেন রোদ উঠে গেল, এমন কড়া রোদ,
শান্ত নদীর জল বিরক্ত হতে শুরু করেছে,
জাবর কাটতে থাকা গরুর গা চিড়বিড় করছে
বিরসমুখে মাছি তাড়াতে গিয়ে নিজেকে পেটাচ্ছে
গরুর মালিক রাগী মুখে গরুর লেজ ধরে টানছে
ছোট্ট মেয়েটি মালিককে ডেকে ডেকে ত্যক্ত করছে
মেয়েটির জামা ধরে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে তার মা
মায়ের ভেতরেও চুলা জ্বলছে, কখন হবে ভাত?
এইসব দৃশ্য দেখে নদী গা ছেড়ে দিলো ভাটিতে
যাবার সময় দুয়েকটা জানালার দিকে দৃষ্টি দিয়ে-
একটা জানালার পাশে বসে আছি একটা আমি
ক্লান্ত নদীর দিকে তাকিয়ে শান্তি লিখতে ইচ্ছে করে না।
এর বদলে কী লেখা যায় ভাবছি,
তখন দুপুর এসে উঁকি দেয় বাতাবিলেবুর গাছে
পুকুরের পাশে সুপারির ছায়ায় কিছু হাঁস শুয়ে আছে
হাঁসের দিকে তাকিয়ে মা ভাবছে কে কটা ডিম দেবে,
আব্বা এসে ডিমের টাকা আগাম চেয়ে নিয়ে গেল,
টাকা ফুরিয়ে যাবার ব্যথাসহ গরুর গায়ে হাত বোলাচ্ছে মা-
এই গরু এখন দুপুরবেলা গম্ভীর মুখে ঘাস চিবাচ্ছে
যাকে দেখে বিরক্ত হয়েছিল শান্ত নদীর জল,
নদীর জল দেখে এখন কেবল দুঃখ লিখতে ভালো লাগে।

২. উৎসাহ মরে গেছে
আমাদের উৎসাহ মরে গেছে।
গতকাল পর্যন্ত দিব্যি ছিল।
মাছ গোশত ডাল দুধ খেল,
ঢেঁকুর তুলতে তুলতে নানা পরিকল্পনা করলো।
সবকিছুতেই তার প্রবল আগ্রহ,
গরুর বাঁটের ভিতরে যে দুধ
সেটা নিয়ে সে ঘরে বসে মাখন বানায়;
গরু বিক্রি হয়, নানান হাতবদল হয়
একসময় জবাই হয়ে কসাইখানা থেকে
উৎসাহের থালায় চলে আসে গোশত,
সেই গোশত চিবুতে চিবুতে সে মাখন বানায়!
পরাক্রান্ত সেই উৎসাহ আজ নেই
রাত্রে তার জানাজা,
অথচ কেউ আসছে না পূণ্যকর্মে।
কে আর আসবে?
উৎসাহ মরে গেলে কেউ কি আসে?

৩. দৃশ্যপট
লাকড়ি তার সাধ্যমতোই জ্বলছে
তবু চুলার মন পাচ্ছে না-
এই অপ্রকাশ্য সত্যের পাশাপাশি
আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায়,
চুলার মালিক এসে লাকড়িকেই ঠেলে দেয়
অনন্ত দাহের দিকে।
*
তবু এই আত্মাহুতিকে মিলন বলার পাশাপাশি
সেদ্ধ ভাত টিপে দেখছে মানুষ।

৪. এমন একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে
এমন একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে
যেখানে বহু মানুষকে গালি দিলে অল্প কয়েকটা মানুষের কলিজা ঠাণ্ডা হবে,
যেখানে অল্প কয়েকটা মানুষের চিৎকার বহু মানুষের কলিজায় আগুন ধরিয়ে দেবে।
সেই কবিতায় রান্নাঘরে থরে থরে ভাত সাজানো থাকবে
মাঠের মধ্যে ফুটে ওঠা ফসলের দাম লেখা থাকবে
রাস্তায় রাস্তায় মানুষের নামে সম্মান বরাদ্দ থাকবে
মানুষের জন্য ন্যায্যতা সাজানো থাকবে থরে থরে,
অথচ এই বরাদ্দটুকু সেইসব বহু মানুষের কলিজায় আগুন ধরিয়ে দেবে-
আগুন দেখে অল্প মানুষেরা দলে দলে ছুটে আসবে
তাদের দয়ায় আবার ঝরে পড়বে অসংখ্য কান্নার ফোঁটা
সেই পানিতে আগুন নিভবে না, দাউদাউ করে জ্বলতে থাকবে অনর্গল।
তখন মানুষেরা আমাকে কবিতা মুছে ফেলতে বলবে,
আমি ইরেজার খুঁজে পাব না, আমি বারান্দা ছেড়ে পালিয়ে যাব
আমার কবিতার খাতা বাতাসে উড়তে থাকবে, বহু বহুদূরে ছড়াতে থাকবে-
এমন একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে।

৫. রান্নাঘর
রান্নার সামগ্রী নিয়ে একদম ভাববেন না,
আপনার দরজায় হাজির হয়েছি আমি
আমার ভেতরে খুঁজে দেখুন-
লবণ আছে দুই চোখের ভেতরে
বুকের বাম দিকে ছুরি, চাকু এইসব,
পেটের দিকটায় রাখা আছে থালা আর বাটি।
হাতের আঙুলে কাঁটাচামুচ সাজানো, দেখুন
মুখের ভেতরে আছে ফুড কালার।
আরও কিছু লাগবে?
মস্তিষ্কের ডানে আছে রান্নার রেসিপি
আপনার চুলাটি সাজানো আছে বুকের ভেতর,
শুধু আগুন হাতে এগিয়ে আসুন
আমাকে কাটুন, থরে থরে সাজানো আছি আমি
দরকারি জিনিসটি নিন,
আমাকে রেঁধে ফেলুন ঝটপট।

শেয়ার করুন ..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge