শুক্রবার, ০৯ Jun ২০২৩, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

করোনায় ঈদ: দায়বদ্ধতা-প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

করোনায় ঈদ: দায়বদ্ধতা-প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

করোনায় ঈদ: দায়বদ্ধতা
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

মানুষেরর বিরুদ্ধে মানুষের এন্তার অভিযোগ। সভ্যতা ধ্বংসে দায়ী আর কেউ নয়, দায়ী মানুষই। প্রকৃতি দিয়েছে অপার। ফুল, ফল, ফলস, সবুজাভ রূপ, নদী বয়ে গেছে সামর্থের সবটুকু শক্তি দিয়ে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ। মানুষ মেতেছে পারমাণবিক ধ্বংসের হোলি খেলায়। নতুন নুতন আবিষ্কারে প্রকৃতি যে হারাচ্ছে রূপ-সৌন্দর্য মানুষ বেমালূম বিস্মৃত হয়েছে তা। যে জন্য নানা প্রতিযোগিতা, প্রতিপত্তি, শক্তি, ক্ষমতা প্রদর্শনের ধারাবাহিকতায় প্রকৃতি আপন সৌন্দর্যে বিকশিত হতে পারছিল না। সে কারণে প্রকৃতি নেমেছে প্রতিশোধের ময়দানে। এমন কথা এখন বহুল আলোচিত, কবিতা-গানেও শোনা যাচ্ছে এমনতর কথা। শেষে সিদ্ধান্ত মানুষের নিজের কারণেই বিশ্বময় ‘করোনার আঘাত’। পরিণামে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু। করোনা আক্রান্ত হয়ে দুর্বিসহ কষ্ট ভোগী মানুষের সংখ্যাও অগণিত।
দীর্ঘশ্বাস ও স্বজন হারানোর কতরতার মধ্যেই এসেছে ঈদুল আজহা। ত্যাগী মনে অপার শান্তির বার্তাবাহক হয়েই আসে ঈদুল আজহা। ঈদ মানেই তো স্বপ্নমাখা অপূর্ব আনন্দছোঁয়া দিন। ঈদুল আজহা ত্যাগের আনন্দে ভরা । ঈদে মিলনের সুর বাজে জীবনে জীবনে । হিংসা-বিভেদ মুছে ফেলে ঐক্যের সুতোয় বাঁধা পড়ে ছোট-বড় সবাই। ঈদ দুঃখী, অসহায়ের কষ্ট উপলব্ধির দিন, জীর্ণ জীবনের ব্যথা ঘোচাবার অনন্য সময়। অনবদ্য এ সময়ে মহান স্রষ্টার কাছে মুমিনের চাওয়াÑ হে মহান আল্লাহ পাপ মুক্ত কর , তুমি কোনা বেদনা দিও না। জীবন যেনো আনন্দে ভরে ওঠে আর ভাসাতে পারি সুখের ভেলাÑ
‘ঈদের খুশীর বইছে জোয়ার
এই দুনিয়া জাহানে
সুখের ভেলা ভরাবো সবাই
খোদার পূণ্য দানে\’
ঈদুল আজহার মূল প্রত্যয় ত্যাগ স্বীকার। নবী ইবরাহীমকে পরীক্ষার জন্য মহান স্রষ্টা ফরমান দিয়েছিলেন প্রিয় বস্তু কোরবানী দেবার । অগাধ ভক্তিতে তিনিও স্রষ্টার জন্য নিবেদন করেন অনেক দুম্বা। তাতে খোদার সন্তুষ্টি লাভে ব্যর্থ হলে তার চৈতন্যে উদ্ভাসিত হয় প্রিয়তম পুত্র ইসমাইলকে কোরবানী দেবার প্রত্যয়। স্রষ্টার অভিপ্রায় পূরণে দ্বিধাহীন চিত্তে সায় দেন মাতা হাজেরা এবং পুত্র ইসমাইল। আল্লাহর অভিপ্রায় বাস্তবায়নে শানিত ছুরির তলে নির্বিবাদে মাথা রাখেন পুত্র ইসমাইল, পিতাও চালান ছুরিÑ। ত্যাগের এমন দৃষ্টান্তে গভীর প্রীত হয়ে দুম্বা কোরবানীর মাধ্যমে নবী ইবরাহীমের কোরবানী কবুল করেন মহান স্রষ্টা। মহাত্যাগের পথ ধরে জিলহজ্জের চাঁদ এর দশম দিনে বিশ্বমুসলিম ঈদ আনন্দে মেতে ওঠে। দিকে দিকে ধ্বনিত হয় প্রিয়কে কোরবানী দেবার আহŸান। জিলহজ্জের চাঁদের আলোয় হেসে ওঠে সারা জাহান আর খোদার রাহে বিলিয়ে দেবার উৎসবে বয়ে যায় খুশির বন্যা।
গত বছর পর্যন্ত তেমনটিই ছিল। আনন্দ ¯্রােতে ভেসেছেন কোটি কোটি মুসলিম । কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে গেছে এবার। কারণ করোনার থাবা। এবার কোরবানী নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›েদ্ব মানুষ। মাঠে ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করারও অসম্ভব। এমন পরিবেশে ঈদুল আজহার আনন্দ কতটা ব্যাপ্ত হবে তা নিয়ে শঙ্কা কম নয়। যুক্তিও আছে করোনা থেকে মুক্তির জন্য এড়িয়ে চলতে হবে জনসমাগম। সে কারণে অনেকেই পশুর হাটে না যাবার পক্ষে। সরকারও হাট সীমিত করেছে যাতে করোনার বিস্তার না ঘটে। খামারী, সাধারণ মানুষ কোরবানীর পশু নিয়ে দূর-দূরান্তের বাজারে যাবার মনোবল পাচ্ছেন না। আবার ঈদের দিনে গ্রামে-গঞ্জে সবাই জোটবদ্ধ হয়ে মাংস কাটে। করেনায় এমনটা সম্ভব হবে না। তাতে নিয়ম ভঙ্গ হবে। পশু জবাই ও মাংস কাটার বিড়ম্বনার বিষয়টি নিয়েও মানুষের বিপুল দুশ্চিন্তা। পশু কিনে তাদের খাওয়ানোর দিকটিও মাথায় রাখতে হয়েছে। যে কারণে এবার কোরবানীর সংখ্যা কমতে পারে- এমন ধারণা অনেকের। আর্থিক দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। গার্মেন্টসসহ অনেক শিল্প-কারখানা, প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ছাটাই করেছে। এদের অনেকেই এবার কোরবানী দিতে পারবেন না। কোনো প্রতিষ্ঠান বেতন কমিয়েছে অর্ধেকেরও বেশি, ঈদ উৎসব ভাতাও দেয়নি। গ্রামে শহর থেকে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় চাপ পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। করোনার পাশাপাশি এখন বন্যার করাল গ্রাসেও সম্বলহারা হচ্ছেন অনেক মানুষ। ডুবেছে বাড়ি, খাবার নেই, সম্বল হারিয়ে অনেকেই দিতে পারবে না কোরবানী। গবাদি পশু লালন-পালন শেষে ঈদে বিক্রির আশাও পূরণ হবে না অনেকের। যে জন্য কোরবানীর সংখ্যা আগের মতো থাকবে এমনটা অনেকেই মনে করেন না।
করোনা গভীর সঙ্কটে ফেলেছে বিশ্বকে। আমাদের দেশেও করোনার দাপট কম নয়। সাথে বন্যার ছোবল। নদী ভাঙনে অনেকেই ভিটে ছাড়া। করোনা ও বন্যার বিরূপ প্রভাব ঈদুল আজহাতে পড়তে বাধ্য। তাই বলে ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যাবে এমন ভাবা ঠিক নয়। কোরবানী কম হলেও অন্তরে ঈদের মূল প্রত্যয় ধারণ করতে হবে আমাদের। সত্য হলো পাপের পঙ্কিল আবর্তে অনেক সময় হারিয়ে যায় সমস্ত শুভবোধ, পূণ্যের দুয়ার হয় রুদ্ধ। দুর্নীতির সাথে, লোভ-লালসা, মানুষের অকল্যাণে যারা যুক্ত তাদের মনের পরিবর্তন দরকার। ঈদ পাপমুক্তির বার্তা বয়ে আনে এবং সন্ধান দেয় সত্য ও কল্যাণী পথের। এ দিন ¯্রষ্টার কাছে নিজ মন্দ কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ। এ দিন মহান স্রষ্টার কাছে চাওয়া Ñ ভোগ-বাসনায় ক্লিষ্ট মনের কালিমা যেনো ঘুচে যায, নবী ইবরাহীমের সাহস ও ত্যাগের শক্তি যেনো সঞ্চারিত হয় সবার মধ্যে। বিশ্বজগতের মালিক খোদা, আর কোরবানীর ফরমানতো তারই। ঈদে সমস্ত গোনাহ তিনিই মাফ করেন। সমবেত প্রার্থনা থাকবেÑ ¯্রষ্টা যেনো কবুল করে নেন কোরবানী। দুনিয়ার সাময়িক মায়া থেকে মুক্ত করেন, রাসুলের সুপারিশে জান্নাত দেন, নাজাত তথা মুক্তি দেন। অন্তরে কোরবানী দেবার প্রবল বাসনা থাকলেও করোনা ও বন্যার মহাবিপদকালে আর্থিক ও অন্যান্য কারণে যারা এবার কোরবানী দিতে পারলেন না আল্লাহ যেনো তাদের মাফ করে দেন। সবাইকে সওয়াব নসিব করেন।
করোনা ও বন্যার সঙ্কট আর বাধা ডিঙিয়ে যারা কোরবানী দিচ্ছেন তাদেরকে এবার আরও সচেতন, উদার ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ইচ্ছে থাকা সত্বেও যারা কোরবানী দিতে পারেননি মাংস পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হবে তাদের বাড়িতে। যাতে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদের দিনে মনোকষ্টে পীড়িত না হন। অনুশোচনা না করেনÑ ‘ইস্ আমি ব্যর্থ হলাম। আমি ভাগ্যহত।’ বরং সামর্থবানগণের দায়িত্ব হলো কোরবানীর সংখ্যা বাড়িয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় কোরবানী দিতে অপারগগণের বাড়িতে মাংস পাঠিয়ে দেয়া। ঈদুল আজহার ত্যাগের আলো নিয়ে বঞ্চিত, সামর্থহীন মানুষের পাশে বল হয়ে দাঁড়াতে হবে। কোরবানীর রক্তধারায় পশুত্ব বিসর্জন দিয়ে মানব ভালোবাসার পরিধির বিস্তার ঘটাতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকেও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। করোনা ও বন্যা মোকাবেলায় সরকার আন্তরিক। সরকার থেকে অনুদান, প্রণোদনা, উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা দেবার প্রক্রিয়া ঈদের আগেই শেষ করতে হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোরবানীর ব্যবস্থা করে মাংস দরিদ্র ও সামর্থহীনদের বাড়িতে পাঠানো যেতে পারে। অনেক বেসরকারি সংস্থা আছে প্রতি ঈদে কোরবনীর ব্যবস্থা করে দুঃস্থ মানুষের মাঝে মাংস প্রদান করতো। এবার তাদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। আগের চেয়ে বেশি কোরবানী দিয়ে সামর্থহীন এবং বৈরি পরিস্থিতির কারণে এবার যারা কোরবানী দিতে পারেননি তাদেরকে মাংস দেবার পদক্ষেপ নেয়া একান্ত আবশ্যক। এভাবে সামর্থবান ব্যক্তি, সরকার, বেসরকারি সংস্থা যদি সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আসে তা হলে ঈদের আনন্দে ভাটা পড়বে না মোটেও। বরং মানবিক ভালোবাসার বিস্তারে মানুষের মধ্যে বয়ে যাবে খুশির জোয়ার। তেমনটাই হোক আমাদের চাওয়া Ñ
‘কোরবানীরই রক্ত ধারায়
পাপ-পশুত্ব যাবে সরে
মানবতার মায়ার আলোয়
জগৎটা যে যাবেই ভরে\’
ধ্বংসের প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই মহামারী থেকে মিলবে মুক্তি। বিঘœ থাকবে না ঈদসহ অন্যান্য উৎসব পালনে ও আনন্দ উপভোগে।
[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, ভূতপূর্ব অধ্যাপক বাংলা, কারমাইকেল কলেজ,রংপুর]

শেয়ার করুন ..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge