রবিবার, ২৮ মে ২০২৩, ১২:১৬ অপরাহ্ন

দু’ধরনের বুদ্ধিমত্তা-মৌলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মদ রুমির কবিতা অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

দু’ধরনের বুদ্ধিমত্তা-মৌলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মদ রুমির কবিতা অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

দু’ধরনের বুদ্ধিমত্তা
মৌলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মদ রুমির কবিতা
অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

১. দু’ধরনের বুদ্ধিমত্তা

সাধারণত দু’ধরনের বুদ্ধিমত্তা লক্ষিত হয়,
স্কুলের পাঠ্যবই থেকে বিষয়বস্তু ও ধারণাসমূহ মুখস্থ করবার মাধ্যমে,
এবং শিক্ষকবৃন্দ শ্রেণীকক্ষে যা বলেন তা শুনবার মাধ্যমে।
একই সাথে প্রথাগত আর আধুনিক বিজ্ঞানের পাঠ্য থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমেও।

এ ধরনের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে
তুমি বেড়ে উঠো পৃথিবীতে।
তোমার অবস্থান উচ্চে কিংবা নিম্নে হয়
সে তথ্যসমূহ ধরে রাখবার পরিপূর্ণতার মধ্য দিয়ে।
এই বুদ্ধিমত্তার ওপর ভিত্তি করেই
তুমি পদচারণ করো জ্ঞানের অন্তর্দেশ এবং বহির্দেশে।
তোমার রক্ষিত গ্রন্থের মধ্য দিয়েই
পেয়ে যাও তুমি তোমার কাঙ্খিত নম্বর।

অবশ্য আরো এক ধরনের জ্ঞান রয়েছে,
এক ধরনের জ্ঞান ইতোমধ্যেই
তোমার দ্বারা সম্পন্ন এবং রক্ষিত হয়েছে।
একটি বক্রে স্প্রিংয়ের প্রাচুর্য থাকলে তা লাফাতে থাকে।
সজীবতা কিংবা নির্মলতা কোনো বক্ষস্থলের কেন্দ্রেই থাকে।
এই যে অন্য ধরনের বুদ্ধিমত্তা,
তা কখনোই গতি বদলিয়ে হলদে অথবা স্রোতহীন হয় না।
এই জ্ঞান সত্যিকার অর্থেই তরল
যা কখনোই বাহির থেকে ভেতরে আসে না,
যেমন করে জলের নালার মধ্য দিয়ে
চৌবাচ্চা স্থাপন করে পানির ব্যবস্থা করা হয়।

এই যে দ্বিতীয় ধরনের জ্ঞান,
এটি মূলত তোমার মধ্য থেকে আসা
একটি ঝরনার অবারিত ধারা।
এবং এই জ্ঞানের শৌর্যের সাথে সহজেই
মানিয়ে নেয়া যায়,
এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানের প্রতিকূলতাকে।

Two Kinds of Intelligence, Poems by Mewlana Jalaluddin Rumi-Poem Hunter

২. তবে চল, তোমার দুঃখের কাছে যাই

চল তোমার দুঃখের দেশে যাত্রা করি,
এবং হৃদয়ে নিয়ে আসি
এক অনিঃশেষ শুদ্ধতা,
আরশির মুখের শোভা যেমন
ঠিক তেমনি,
যাতে কোনো চিত্র ধারণ করা যায় না।
তোমার প্রত্যাশা যদি হয় একটি ঝকঝকে আয়না,
তবে স্ব-প্রতিমূর্তির দিকে আপন চোখের দৃষ্টি প্রক্ষিপ্ত করো
এবং দেখতে চেষ্টা করো লজ্জাশূন্য সত্যের প্রতিচ্ছবিকে,
যা সেই চকচকে আরশির মুখাবয়বে প্রতিফলিত হয়।
একটি ধাতব বস্তু যদি
ঝকঝকে আয়নার মতো প্রতিলিপি ধারণ করতে পারে,
তবে সেই সমরূপের বিশিষ্টতা হৃদয়ে নিয়ে আসতে
ঠিক কি কি গুণের প্রয়োজন হয়?
প্রকৃত অর্থে হৃদয় এবং আরশির মাঝে
রয়েছে পৃথক মাপের একটি পার্থক্য,
আর সেটি হলো;
হৃদয় গোপনীয়তা গোপন করে রাখে,
যেখানে, আয়না তা করতে পারে না।

Let Go of Your Worries (www.rumi.org.uk)

৩. আমি এক ভাস্কর

আমি এক ভাস্কর,
ধীর ধীরে ক্ষয় হতে থাকা একটি প্রতিমূর্তি।
প্রতি মুহূর্তে আমি দান করি,
এক একটি প্রতিমার প্রতিরূপ।

কিন্তু এরপর,
যখন তোমার সম্মুখে দাঁড়াই,
তখন নিচের দিকে গলাতে থাকি তাদেরকে।

একশতটি আকারকে
আমি জাগিয়ে তুলি এবং পরিপূর্ণ করি প্রবল শৌর্যে।
কিন্তু তোমার মুখের দিকে তাকালেই
আমার মনে হয় তাদের ছুঁড়ে ফেলি অগ্নিকুন্ডে।
আমার আত্মা উছলে গিয়ে
লীন হয়ে যায় তোমার আত্মায়।
কেননা আমি সবসময়ই মনে করি,
তোমার সমস্ত সুগন্ধ শুষে নিয়েছে
আমার আত্মা।

আমার দেহ থেকে এক ফোঁটা রক্তও উদগীরিত হলে
যেমন আমি সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দিই,
ঠিক একইভাবে আমি আমার প্রিয়তমার সাথে মিশে যাই
যখন অংশগ্রহণ করি ভালোবাসায়।

এই জল ও কাঁদার প্রতিবেশে
আমার হৃদয় পতিত হয়েছে ধ্বংসের দিকে।

হে, আমার ভালোবাসা, প্রবেশ করো এই বৃত্তে
আর করতে না পারলে ত্যাগ করো আমাকে।

I am a sculptor a Molder of Form (www.rumi.org.uk

৪. বিনিদ্র যামিনীতে যাপিত জীবন

সারারাত…
সুরের বাঁশি বাজিয়ে চলি বলে,
ঘুমোতে পারি না আমি।
যে মানুষটির মুখের পথ-প্রান্তর জুড়ে
দীপিত হতে থাকে ফুলের বর্ণিল রঙের প্রপাত,
শুধু তার কথা মনে করেই
বিষাদের অন্ধ গহবরে লুটিয়ে পড়ি আমি।
আমার নিদ্রা, আমার ধৈর্য,
সবই হারিয়ে গেছে আজ।
আমি আজ অপমানিতও হই না, যশও লাভ করি না।
হাজারো প্রজ্ঞার পরিচ্ছেদ বিলীন হয়ে যায়।
আমার দৃষ্টির দুয়ার থেকে হাজারো মাইল দূরে চলে যায়
আমার মাঝে স্থিত সকল গুণাবলী।
হৃদয় ও মন উভয়ই উভয়ের কাছে ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে
ছিন্ন করে তাদের মাঝে নিহিত অমোঘ সম্পর্কের সূত্রকে।
আর এমন ক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশের কারণেই দিনে দিনে
পৃথিবী হয়ে উঠে কঠিন থেকে কঠিনতর।
‘‘সূর্যের স্থিতি ব্যতিরেকে
কতদিন আমি পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে পারবো?” চাঁদ বলে।
ভালোবাসায় স্নাত রক্ত শোভিত অলংকার
যদি আমার পাশে না থাকে,
তবে আমার প্রাণবান অস্তিত্বকে পাথরের পর পাথর দ্বারা আঘাত করে
চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলো।
হে ভালোবাসা,
তুমিই তো দীর্ঘ সময় অবধি হাজারো নামে ভূষিত।
একমাত্র তুমিই,
যে জানো,
কীভাবে কোমল পানীয় বৃষ্টির মতো বর্ষণ করে
শরীরের পাত্রে গলগল করে ঢেলে দেয়া যায়।
তুমিই, যে কিনা একটি সংস্কৃতির মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছো হাজারো সংস্কৃতি।
তুমিই, যে কিনা মুখশ্রীহীন, কিন্তু আদৃত হাজারো মুখশ্রী দ্বারা।
ও ভালোবাসা, তুমিই, যে আকৃতি দিয়েছো,
তৃর্কি, ইউরোপিয়ান এবং জাঞ্জিবারিসদের।
তোমার বোতল থেকে আমাকে একটি গ্লাস দাও,
অথবা গুণভান্ডার থেকে অল্প হলেও
কিছু বিশিষ্টতা দান করো।
দয়া করে আর একটিবার
তোমার বোতলের ছিপিটি খোলো।
তাহলে আমরা দেখতে পাবো
ভূতলে শায়িত হাজারো ভূ-স্বামীকে,
এবং দেখতে পাবো উল্লাস ধ্বনির মগ্নতায় আপ্লুত
একদল আনন্দিত কবি এবং গায়ককে।
অতঃপর আসক্তমগ্ন মানুষ শক্তিশালী উচ্চাকাঙ্খা থেকে
মুক্ত হয়ে শুরু করবে নতুন জীবন,
যে জীবনে থাকবে না কোনো আলস্য,
যে জীবন শেষ বিচারের ক্ষণ পর্যন্ত
দাঁড়িয়ে থাকবে ত্রাস ও শ্রদ্ধামিশ্রিত সম্মানবোধ নিয়ে।

Because I Can’t Sleep (www.rumi.org.uk)

[মৌলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মদ রুমির জন্ম ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ সেপ্টেম্বর (হিজরী ৬০৪ খ্রিষ্টাব্দে) পারস্যের অন্তঃপাতী (বর্তমান আফগানিস্তানের) বলখ নগরে। রুমির প্রকৃত নাম জালালুদ্দিন মুহাম্মদ বলখী। পিতা বাহাউদ্দীন ওয়ালিখ বলখে রাজপুরুষগণের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পশ্চিম এশিয়ার রুম প্রদেশের অন্তর্গত কুনিয়াতে বসবাস করেছিলেন দীর্ঘ সময়। সেই প্রদেশের নামানুসারে জালালুদ্দিনের নামের সাথে যুক্ত হয়েছিল রুমি প্রত্যয়টি। যদিও রুমি নামে তার জীবদ্দশায় কখনই তাকে ডাকা হয় নি (গুচ, ব্র্যা. ২০১৭)। তবে তাঁর প্রদীপ্ত প্রজ্ঞার স্বীকৃতস্বরূপ সেই সময়ে তিনি মৌলানা উপাধিটিও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শৈশবে তাঁর প্রতিভার প্রাখর্য প্রত্যক্ষ করে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ধর্মগুরু যথাক্রমে মৌলানা বোরহানউদ্দীন, শেখ ফরিদউদ্দীন আত্তার এবং হাকিম আবদুল মাজিদ। এবং তাঁরা সকলেই তাঁর প্রতিভাটিকে বিকশিত করবার নিমিত্তে অকুণ্ঠ অবদান রেখেছিলেন। পরবর্তীতে রুমী দামেস্কে এবং আলেপ্পের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে অর্জন করেছিল নানামুখী জ্ঞান। তবে ৩৭ বৎসর বয়সে এসে রুমীর জীবনে যে মহামহিম মানুষটি আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তাঁর চিন্তার দিগন্তে সর্বোচ্চ ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন তিনি হলেন দরবেশ হিসেবে পরিচিত অতি সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত শামস তাব্রিজি। দুজনের সম্পর্কের ব্যাপ্তি স্বল্প সময়ের হলেও গভীরতা বিবেচনায় তা ছিল অভ্রভেদী। রুমি তাঁর গুরু শামস তাব্রিজির প্রতিভায় এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে সাংসারিক সকল দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে শুধু তার সান্নিধ্য লাভেই ব্যাপৃত থাকবার চেষ্টা করতেন সতত। কথিত আছে যে, তাদের এমন নিবিড় সম্পর্কে হিংসাপ্রবণ হয়ে এক শিষ্য সাদা গোলাপের মতো শুভ্র শামস তাব্রিজিকে হত্যা করেছিলেন, যদিও এর কোনো প্রকৃততা উদঘাটন করা সম্ভব হয় নি। দিওয়ান এবং মসনবী রুমির অন্যতম প্রধান আলোচিত গ্রন্থ। দিওয়ানে অন্তর্ভুক্ত মোট শ্লোকের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার যার সবগুলিই গজল। পাশাপাশি মসনবীর প্রতিটি লেখাই কবিতা। গ্রন্থদুটি তুরস্ক আজারবাইজান, আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর অসংখ্য দেশে বিপুল পঠিত এবং জনপ্রিয়। আমেরিকায় সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের লেখক হিসেবে রুমির পরিচিতি প্রকারান্তরে আধুনিক সময়ে তার উপযোগীতাকে প্রমাণ করে (ই.ই.ঈ ঈঁষঃঁৎব)। আধাত্মিকতা, মানবাকাক্সক্ষা, প্রকৃতি এবং প্রেম তাঁর প্রতিটি সৃজনের মূল উপজীব্য। এবং উপযুক্ত বিষয়ে ওপর ভিত্তি করে যে দর্শন তিনি নিমার্ণ করেছেন তার প্রাসঙ্গিকতা আজও মানবজীবনে স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য অতীব জরুরী। সাহিত্যের বিস্তীর্ণ অঙ্গণে শুকতারা হিসেবে রুমির যে উত্থান ঘটেছিল তার প্রবহমানতা আজও জলপ্রপাতের স্বচ্ছ ধারার মতো সচলমান। সঙ্গত কারণেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার সাত শতাব্দীকাল পরেও (১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর, হিজরী ৬৭২) তিনি বেঁচে আছেন আজও বিশে^র অগণিত পাঠকের হৃদয়বৃত্তে।]

শেয়ার করুন ..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge