মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৫২ পূর্বাহ্ন

স্মৃতিকথা # অংপুরের স্মৃতি-মুকুল রায়

স্মৃতিকথা # অংপুরের স্মৃতি-মুকুল রায়

ছোটবেলাত্ কত গল্প শুনচি অংপুর শহরের! ছড়া বা ছিলকাও কিন্তু কম শুনং নাই।
এর মদ্দে একটা আছিলো-
‘জায় যায় অম্পুর
তায় যায় যমপুর’!
মানে কোনা হৈল্- ‘কালাজ্বর’ বা ম্যালেরিয়া!
অংপুর শহর আছিলো নাকি মশা আর ম্যালেরিয়ার ডিপু! আর এই কালাজ্বরের বাহক সেই মশা নিয়া ‘কলের গানত্’ শুনা এই গানকোনাও কম তো মজাদার আছিলো না – ‘মরার মশা
প্যাটকোনা তোর ডুমডুমা ডুম করে…
ওরে আজার-বাড়ির মশা আসিল্ গরীবের ঘরে…
প্যাটকোনা তোর ডুমডুমা ডুম করে…’!
তবে কিন্তুক এই যমপুর ভীতির সাতে অংপুরের ভূমিপুত্র আদি-জনগোষ্ঠী ক্ষত্রিয়দের জাগরণের অগ্রদূত পঞ্চানন বর্মার বীরত্বের কাহিনীও উপকথার মতন ছড়ানো আছিলো গ্রামের ঘরে ঘরে!
সেই ‘অম্পুর’ বা ‘অংপুরের’ এক কলেজ, উপমহাদেশ জুড়িয়া যার নাম, সেই ‘কারমাইকেল কলেজ’ তখন আলোর মতন যেন এক উজ্জ্বলতার হাতছানি আছিলো ছাত্রদের মন আর মননে- সবার ইচ্ছা আর অন্তরের বাসনা সেই কলেজে ভর্তি হয়া নিজেদেরকে আলোকিত করার, মানুষ হবার! আর মোর মনত্ সেই আশা শতভাগ হয় সেই কারমাইকেল কলেজেরই ছাত্র বড়দা কৃষ্ণগোপাল রায় তখন পাশ করিয়া সেই কারমাইকেল কলেজেরই মাস্টার, মানে শিক্ষক হয়া চাকুরীজীবন শুরু করে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে! এগুলা হরেক রকমের কারণে মোর মন জুড়িয়া সেই কারমাইকেল কলেজত্ পড়াশুনা করিবার এক ঘোর বাসনা বাসা বাঁধে।
তো সেই কারমাইকেল কলেজত্ এডমিশন হৈলাম অনার্সে। বাড়িত্ গানবাজনাসহ বই-পত্রিকা পড়িবার চল্ বা সুবিদা আছিলো। সেই সূত্রে সাহিত্যের দিকে একনা ঝোঁক আছিলো ছেলেবেলা থাকিয়াই। বড়দার বাংলা বিভাগের শিক্ষক হবার সুবাদে তার বাসাত আইসা-যাওয়া করে তার বাংলা বিভাগের কিছু সিনিয়ার জুনিয়ার সাহিত্যমনা ছাত্রের-ঘর। আর সেই সুবাদে ইমার মদ্দে কয়জনের সাতে আমার বেশ খাতির জমি গেলো। বন্ধুত্ব হয়া গেলো অনেকের সাতে। আর শুরু হৈল্ মোর যেন্ আর এক নতুন জীবন; কবিজীবন! পাঠ্যসূচির বাইরে কবিতা আর সাহিত্য নিয়া আলোচনা, আড্ডাখানা, কবিতাচচ্চা, কবিতার আসর করি বেড়া ইত্যাদি কাজে আনন্দিত সমায় কোনপাকে পার হয়া যায়- টের পাই না। অন্য আলতুফালতু চিন্তার, কাজের আর ধান্দার সমায় নাই, অবসরও নাই। অন্য বন্ধুরা যখন এই বয়সের নিয়ম অনুযায়ী নারী, সেক্স, মেয়ে পটানো, কলেজের মেয়েদের এক একজনের উপ-যৈবন, চেহারা, হাঁটাচলা আর তাদের শরিলের বিভিন্ন অংশ নিয়া উত্তেজক আলোচনায় এবং তাসখেলা নিয়া সমায় কাটায়, তখন আমার সমায় কাটে এইসব নবীন চ্যাংড়াগুলার সাতে সাহিত্য-আড্ডাত্। আর এমন করিয়া কবিতায় নিবেদিতপ্রাণ কয়জন সমবয়সী-সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়া একদল উচ্ছল সমমনা চ্যাংড়া গ্রæপের সাতে বন্ধুত্ব হয়া মোর মানসিক-জীবনত্ ঘটি যায় এক গোপন পরিবত্তন- ‘জীবন মানে আর্থিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠা নোয়ায়, ভাল্ বা প্রথম-শ্রেণীর চাকরি-প্রাপ্তি নোয়ায়, বিসিএস পরীক্ষা দিয়া প্রশাসক-ম্যাজিস্ট্রেট হবার মতন ‘আপন-স্বার্থ বা লক্ষ্য উদ্ধারের মতন স্বার্থপরতা নোয়ায়, জীবনের মানে অন্য; জীবন এক মহত্ত্ব, কাব্য-সাহিত্যে উদ্ভাসিত করিয়া পৃথিবীর প্রাণের সাতে প্রাণ মিলিয়া ‘অমৃতের সন্তানের মতন বাঁচা’!
স্কুলজীবনত্ প্রায় বন্দীদশা আর বাড়ি থাকি ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সমায় কিছুটা হৈলেও যে নিয়মনীতি ছিল- দুরের এই কারমাইকেল কলেজত্ আসিয়া ছাত্রজীবনের সেইসব ধরাবাঁধা নিয়মনীতির ছিটাফোঁটাও নাই। সন্ধ্যা নামিলে পাঠ্যবই নিয়া বসিবার তাগাদা দিবার বাপ-মাও-ভাই কাও নাই! এ যেনো এক নয়া স্বাধীনতা মিলি গেলো! ইত্যাকার বিবিধ পরিস্থিতি আর পরিবেশত্ কারমাইকেল কলেজের জীবনটাকে বদলি গেলো। এটে আসিয়া সেই বৈকাল থাকি শুরু করিয়া রাইত পর্যন্ত সময়টা বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা আর খালি আড্ডাত কাটি যাওয়া শুরু হয়া গেলো। আড্ডা, হৈচৈ, সাহিত্যচর্চা- এগিলা মিলিয়া এক নতুন জীবনের এক আনন্দে ভাসিয়া কোনটে দিয়া সময়, দিন, মাস বছরের পর বছর পার হয়া গেলো- টেরই পাইলাম না।
শহরত এটে ওটে, এ সাহিত্য সংগঠনত্, ও সাহিত্য সংগঠনত্ আড্ডা মারিয়া হোস্টেলত্ ফিরি আসতাম অনেক আইতোত্। প্রায় সমায় ফিরি আসতাম দল বাঁধি। এই টাউন যাওয়া আইসার ইকসা-ভাড়া বাচেবার জন্যে অনেকের বাড়ি থাকি আনা অথবা কিনা সাইকেল ছিল। সেই সাইকেলের সামনের ডান্ডাত্ আর পাছপাকের ক্যারিয়ারত্ বসিয়া আছিলো এই যাওয়া আইসা। তবে আরো কয়জন কবি ছিল এই কলেজ ক্যাম্পাসত্- যার মইদ্দে শাহিদা মিলকি, গৌরাঙ্গ মোহন্ত এই দুইজন ছিলেন নিভৃতে।
এই ফিরার পথত্ জ্যোছনা রাইতগুলাত্ হৈ হৈ করি সগায় মিলিয়া সারা আস্তাত্ কোরাস গানের ধুয়া তুলিয়া চাইরপাকে তোলপাড় তুলিয়া আইসতাম। এই গুরুপে তরুণ কবি কালীরঞ্জন বর্মণ, অকালপ্রয়াত কবি সুব্রত চৌধুরী, কবি-সাংবাদিক মাহবুবুল ইসলাম, কবি-সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্র কবি ডা. অমল কুমার বর্মণ, কবি শাশ্বত ভট্টাচার্য, কবি বাবুল আনোয়ার সহ আরো অনেকেই ছিল। সবাই মিলিয়া দলবাঁধিয়া শহরের আড্ডা শেষত্ কলেজ-ক্যাম্পাসে ফিরিয়া আইসার সমায় জ্যোছনার উজ্জ্বল উচ্ছলতাত্ সুরে-বেসুরে কোরাস-কন্ঠে প্রিয় গানগুলা গায়া ফিরি আইসার সেই সোনালী আইতগুলার স্মৃতি অথবা সেই জোছনার কিছু আইতোত্ হারমোনিয়াম যোগে কারমাইকেল কলেজেরেই খোলা উদাম মাঠোত্ ঘন্টার পর ঘন্টা ধরিয়া গায়ক-বন্ধু মেজবাহর গান মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনার স্মৃতিগুলা মনে পড়ি গেইলে আইজও এই শ্যাষজীবনের শ্যাষ-প্রান্তত আইসা সময়ত্ এক নতুন মাত্রা যোগ করিয়া জীবনকে অকারণে শোকাতুর করিয়া তোলে।
সেই কারমাইকেল কলেজের পরিচয় হওয়া কবি-অকবি বন্ধুবান্ধবগুলার কাঁয় কাঁয় আইজ বাঁচি আচে, কোটে আচে, কাঁয় কাঁয় পরকালে চলি গেইচে- খবর নাই, যোগাযোগ নাই। আর কি সগার সাতে দেখা হৈবে, কারো সাতে দেখা হৈবে মরণের আগোত্- এগুলা ভাবিলে কেনে জানি চৌখ্ থাকি আপনে আপনে জল পড়ে! ইয়ার মইদ্দে চলি গেইচে প্রিয় কিচু মুখ- নাট্যকার ডা আশুতোষ দা, কবি রোমেনা আপা, বড়দা কৃষ্ণগোপাল রায়, কবি শহীদুর রহমান বিশুদা, লাভলু ভাই, রাকিবুল হাসান বুলবুল ভাইসহ আরো অনেকজন।
আহা রে জীবন! আহা রে জীবনের ময়া!

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge