মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন

সুব্রত ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যা

সুব্রত ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যা

একজন সুব্রত ভট্টাচার্য

সুব্রত ভট্টাচার্য জন্মগ্রহন করেন ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ সেপ্টেম্বর (১৩৫০ বঙ্গাব্দের ৮ আশ্বিন) কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী অঞ্চলের পায়ড়াডাঙ্গার বিখ্যাত চৌবাড়ীতে। বাবা চপল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম সংস্পর্শধন্য বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী এবং শিক্ষানুরাগী একজন মানুষ। মাতা অত্যন্ত সেবানুরাগী- সুশোভা ভট্টাচার্য ছিলেন গৃহিনী।
সুব্রত ভট্টাচার্যের শৈশব কাটে কোলকাতায়। প্রাথমিক শিক্ষাটাও কোলকাতাতে মায়ের কাছে সম্পন্ন হয়। ১৯৫৫ সালে দেশে ফেরেন তিনি। নাগেশ্বরীর ডি. এম. একাডেমিতে ১৯৫৭-তে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৬০-এ ভিতরবন্দ জে. ডি. একাডেমি হতে মাধ্যমিক পাশ করেন। তারপর রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি ছাত্রাবস্থাতেই একজন কণ্ঠশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক হিসেবে সমান জনপ্রিয় ছিলেন।
কর্মজীবনের প্রারম্ভে তিনি জে. ডি. একাডেমিতে কিছুদিনের জন্য শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি দেশে এবং বিদেশে অনেক লোভনীয় চাকুরির জন্য মনোনিত হয়েও মা, মাটি ও মানুষের টানে এরকম প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯৬৫ সালে স্থায়ীভাবে নাগেশ্বরী ডি. এম. একাডেমিতে বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে মহান শিক্ষকতা পেশাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম পরিষদের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরে ডা. ওয়াসেক আলী আহমদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ২৭ মে পর্যন্ত নাগেশ্বরী থানার কন্ট্রোলরুম ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ভারতের কুচবিহার জেলার অন্তর্গত চৌধুরীহাট ইয়ুথ ট্রানজিট ক্যাম্পে ফ্রিডম ফাইটার রিক্রুটার হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। তাছাড়াও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্যের যোগান এবং সংগঠিত করার কাজে নিবেদিত ছিলেন।
তিনি ২০০৭ সালে পেশাগত জীবন থেকে অবসর গ্রহন করেন। পুরো জীবন জুড়েই তিনি সামজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তরুণদের সাথে নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মানবতাবাদী এই মানুষটি একাধারে একজন নজরুল প্রেমিক এবং বাংলাদেশ বেতারের “স্পেশাল গ্রেড” কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিয়মিত নজরুল সংগীত পরিবেশন করছেন।

সৃষ্টিশীল সাহিত্যের মাঝেই কেয়ামত পর্যন্ত সুব্রত স্যার বেঁচে থাকুক প্রকৃতির মধ্যে: রেজাউল করিম রেজা

“অনেকের ধারণা আমি ধর্ম মানি না। ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। মন্দির, শ্মশান উপাসনালয় আমার জন্য না। তাহলে আমি কে? আমি কি মানুষ না? মানুষের জন্যইতো ধর্ম। আমি ষোলআনা ধর্মে বিশ্বাস করি কিন্তু আচারিক ধর্ম মানি না। আমি পরিপূর্ণ ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আর করি বলেই নিয়মিত আধ্যাত্ম সাধনা আমার একমাত্র নেশা। যে সাধনা আমায় মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় এবং সৎ ও মহৎ থাকবার অঙ্গীকারে অঙ্গীকারাবদ্ধ করে তোলে। আমি মানুষের মাঝেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাই। মন্দিরে আমি ১০০ বার যাবো কিন্তু যে মন্দিরে প্রকৃত ধর্মচর্চা বাদ দিয়ে পুরোহিত মশাইগণ আচারধর্ম প্রচার করেন সে মন্দিরে আমি যাবো না। আমি শ্মশানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণে অবশ্যই যাবো কিন্তু যে শ্মশানে আমার স্ত্রী, বাবা, মা কিংবা পরিচিতজনদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষে স্নান করে মহাপবিত্র না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি-ঘরে প্রবেশ করাতো দূরের কথা ভাত-খাবার পর্যন্ত স্পর্শ করা যাবে না, সে শ্মশানে আমি যাবো না। তবে সমাজ এবং ধর্মকে আমি শ্রদ্ধা করি বলেই শ্মশানে যাবো কিন্তু অহেতুক লোকসৃষ্ট আচার ধর্ম (যা পবিত্র বেদে নেই) আমার পক্ষে মেনে চলা অসম্ভব। যে ধর্ম বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কি শীত, কি বসন্ত, কি গ্রীষ্ম-কি বর্ষায় মাথা ন্যাড়া করে, গলায় একটা পৈতা ঝুলিয়ে পরনে শুধু ধুতি রেখে খালি গায় ও খালি পায়ে বারোদিন, পনের দিন কিংবা এক মাস (জাত ভেদে) থাকতে বলে, তাও আবার এক কাপড়ে, সে আচার নামক পৌরাণিক কুসংষ্কারাচ্ছন্ন ধর্ম আমি মানি না। এ আচার নামক ধর্ম মেনে খাঁচায় বন্দি থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, পবিত্র বেদের কোথাও উল্লেখ নেই যে, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ঐভাবে মলিন বেশে আর উষ্ক-খুষ্কো রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে অহেতুক এতটা দিন থাকতে হবে। আমার এ বক্তব্য শোনার পর সবাই যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায় আপত্তি নেই কিন্তু আমি মানুষকে ছাড়তে পারবো না। সব ধর্মের মানুষ আমার কাছে অক্সিজেন স্বরূপ। অক্সিজেন ছাড়া কেউ বাঁচে কি? তাই মানুষ ধর্মই আমার কাছে একমাত্র ধর্ম।” — সুব্রত ভট্টাচার্য তাঁর ভক্তদের মাঝে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এবং উদাত্ত কণ্ঠে এসব প্রতিবাদী উচ্চারণ দৃঢ়তার সাথে বলেন আর সেই সাথে তরুণ প্রজন্মকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ারও আহ্বান করেন। সুব্রত ভট্টাচার্যের পক্ষেই এ আহ্বান মানায় বলে তিনি মৃত্যু অবধি এ কথা বলে যাবেন। বলবেন না কেন? তিনি যে স্বাধীন। স্বাধীন কথার অর্থ জানা আছে পাঠক? স্ব+অধীন=স্বাধীন। স্ব মানে বিবেক, আল্লাহ, ভগবান, সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর। আর অধীন মানে হচ্ছে হয়ে, দাস, চাকর কর্মচারি ইত্যাদি। অর্থাৎ যে মানুষ বিবেকের বা ঈশ্বরের বা সৃষ্টিকর্তার হয়ে চলবে সেই সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাই সুব্রত ভট্টাচার্যের আর কোন কিছুতেই কোনো ভয় নেই।
ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর একটি বিশেষ গুণ তিনি পবিত্র কোরআন, বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান অর্জন করেছেন। এসব পবিত্র গ্রন্থ সম্পর্কে তিনি সবসময়ই বলেন যারা যে ধর্মই পালন করুক না কেন নিজ নিজ ধর্মের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান থাকা খুবই জরুরী। ধর্ম গ্রন্থ না পড়ে, না জেনে ধর্মের বড়াই করা ঠিক না। আবার ধর্মগ্রন্থের নির্দেশানুযায়ি আমল কিংবা ইবাদত কিংবা আধ্যাত্ম সাধনা প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি অবশ্যম্ভাবী রুটিন মাফিক কাজ। সুব্রত ভট্টাচার্য অত্যন্ত দাপটের সাথে যে বিষয়টি সবার উদ্দেশ্যে বলেন তা হচ্ছে, “যারা পবিত্র কোরআন, বেদ, বাইবেল, ত্র্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার পর মিথ্যাচার, ভণ্ডামি, ঘুষ, সুদ, দুর্নীতি ও মানুষ খুনের মতো ইত্যাদি জঘন্য কাজ করেন তারা ধর্মের নামে করেন ছ্যাবলামো। আর যারা পবিত্র কোরান বেদ, বাইবেল, ত্র্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ না করে কিংবা না জেনে বড় বড় জ্ঞানের কথা বলেন, তারা করেন পাগলামো এবং যারা কিতাবও পড়েন না, আমল কিংবা আধ্যাত্ম সাধনাও করেন না তারা করেন আতলামো।” — এ ব্যাপারে সুব্রত ভট্টাচার্য দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমি ছ্যাবলামোদের দলেও নেই, পাগলামোদের দলেও নেই, আর আতলামোদের দলে? প্রশ্নই আসেনা আমি শুধু সত্য আর সুন্দরের দলে। যে দলের নির্দেশক আমার অনাদিকালের অনন্ত ঈশ্বর, আমার সৃষ্টিকর্তা।”
একেই বলে পাণ্ডিত্য আর জ্ঞানগর্ভ মুক্ত কথন। একেই বলে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক পথে চলার বলিষ্ঠ শপথ। যে শপথ হাজারো ঝড়, ঝঞ্ঝা, টর্ণেডো আর শিলাবৃষ্টিতে ভাঙবেও না, মচকাবেও না। যে শপথ চিনের প্রাচীরকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে অনায়াসেই।
সুব্রত ভট্টাচর্যের অনেকগুলো গুণের মধ্যে আরও অসাধারণ গুণ হচ্ছে, বাংলা ভাষা ছাড়াও ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি ও হিন্দী ভাষায় তাঁর প্রচুর দখল। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য থেকে সাহিত্যরস তাঁকে করে তুলেছে মহৎ থেকে মহীয়ান। সাধনা থেকে সাধক। জ্ঞান থেকে জ্ঞানী, সাধারণ থেকে অসাধারণ। সেই অসাধারণ ব্যক্তিটির অসাধ্য সাধনের আবিষ্কারের নাম, “সুন্দর হয়ে এসো, করি সুন্দর” প্রবন্ধ গ্রন্থ। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, যে মহৎ পাঠকগণ সুব্রত ভট্টাচার্য অর্থাৎ আমার প্রিয় স্যারের এই প্রবন্ধ গুলো পড়বেন তারা এ থেকে অনেক অজানাকে সহজেই জানতে পারবেন এবং জীবনটাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারবেন।
এ সৃষ্টিশীল সাহিত্যের মাঝেই কেয়ামত পর্যন্ত সুব্রত স্যার বেঁচে থাকুক প্রকৃতির মধ্যে। এই প্রত্যাশা করি আমৃত্যু।

সত্য ও সুন্দরের প্রতিভূ- একজন সুব্রত
মো. মনজুরুল ইসলাম

২৭ মার্চ, ১৯৭১। পাক বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ। চারিদিকে নিষ্ঠুরতার রুদ্র রূপ। প্রকৃতির প্রকৃত রূপ অপ্রকৃত প্রায়। দুর্দম গতিতে ছুটছে লাখো মানুষ। কোথায় যাবে, কিইবা করবে, ভাববার এতটুকু সময়ও নেই। আপাত গন্তব্য; পূর্ব পাকিস্তানের প্রাচীর পেরিয়ে নিরুপদ্রব কোনো আশ্রয়ে গমন। এদিকে অদম্য স্পৃর্হা এবং দেশপ্রেমের মূলমন্ত্রে বলীয়ান হয়ে প্রস্তুত এক ঝাঁপ উদ্দীপিত তরুণ। লক্ষ্য- কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লাল সবুজের পতাকা নীল আকাশের সীমায় চিরকালের জন্য স্থাপন।
প্রশিক্ষণের পথে প্রতীক্ষারত সবাই। যুবক সুব্রতেরও সত্তা জুড়ে স্বাধীনতা শব্দটির ক্রমাগত প্রতিধ্বনি। মুক্তির পায়রা উড়াতে চায় সে, হতে চায় স্বাধীনতার সারথী। কিন্তু, পারিবারিক চাপে মৃতপ্রায় হতে চলেছে তার স্বপ্ন। কী করবে ও? অস্থির চিত্তে কেবলই আবৃত্তি- ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ অতঃপর মুক্তির নেশায় বিবেক যুদ্ধে জয়ী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে। সোদা মাটির শেষ প্রকোষ্ঠ থেকে প্রাপ্ত আবেগ এবং অনুপ্রেরণাকে সঙ্গী করে লড়াই করেছিল দীর্ঘ ন’মাস।
সেই যে দুরন্ত শুরু, তারপর থেকে আজ অবধি আর বিশ্রাম নেবার ফুরসতটি পান নি, বালক সুব্রত থেকে শুরু হয়ে আজকের পরিণত সুব্রত ভট্টাচার্য। বিরতিহীন কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখবার মাধ্যমে আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন নিজেকে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ শরতের এক স্নিগ্ধ বিকেলে প্রকৃতির কোল জুড়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর আগমনী বার্তায় যেন নতুন করে জেগে উঠতে শুরু করেছিল পায়রাডাঙ্গার প্রতিটি পত্র-পল্লব। তারুণ্যের প্রভায় প্রজ্জ্বলিত সেই তরুণ আজও যেন তরুণরূপে সতত প্রতীয়মান। সত্তরের সীমানা পেরিয়েছেন অনেক আগেই। কিন্তু, আজ অবধি নিরন্তর প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বালিয়ে আসছেন নাগেশ্বরীসহ উত্তরের বিভিন্ন উপজেলায়।
পিতা চপল ভট্টাচার্য পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক। দেশ বিভাগের সময় পরিবারসহ পাড়ি জমিয়েছিলেন কলকাতায়। অবস্থান করেছিলেন সেখানে ন’বছর। সেই সুবাদে কিশোর সুব্রত বরাহ নগরের সিথী, কর্নওয়াল স্ট্রীট, হাওড়ার আন্দুল এবং ভবানীপুরে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলে বিচরণ করতে পেরেছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষার পর্বটি সম্পন্ন করেছিলেন মাতা সুশোভা ভট্টাচার্যের নিবিড় তত্ত্বাবধানে কলকাতাতেই। পরবর্তীতে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে ঠিকানা পরিবর্তন করে আবার ফিরে আসেন সবুজ শ্যামলিমাঘেরা বাংলাদেশে। স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন তৎকালীন কুড়িগ্রাম মহকুমার আওতাধীন নাগেশ্বরীর পায়রাডাঙ্গায়।
পায়রাডাঙ্গার প্রকৃতি আর শিক্ষকদের নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ভিতরবন্দের যোগেন্দ্র ধীরেন্দ্র স্কুল থেকে সম্পন্ন করেন ম্যাট্রিকুলেশন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে উপলব্ধি করতে শুরু করেন বাস্তব প্রেক্ষিতের নির্মমতা। কলেজে ভর্তি হওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে তার পক্ষে। দুঃসময়ে এগিয়ে আসেন প্রাণপ্রিয় শিক্ষক আবুল হাসান খন্দকার। স্যারের অকুণ্ঠ সহযোগিতা এবং অনিঃশেষ অনুপ্রেরণায় ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজ, রংপুর থেকে এইচ. এস. সি এবং ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে বি.এস.সি সম্পন্ন করেন। ছাত্রাবস্থায় প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে রংপুরের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এম.এস.সি সম্পন্ন করবার ইচ্ছে পোষণ করলেও আর্থিক দীনতার কারণে শিক্ষার যাত্রাটি আর স্ফীত করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি তার পক্ষে।
তাই বলে কি পড়াশুনার গতি রুদ্ধ ছিল? সেই বয়সেই পবিত্র কোরআন, বাইবেল, গীতা, রামায়নসহ সাহিত্যের সায়রে অবগাহনের সুযোগ পেয়েছিলেন। বি.এস.সি পাশের পর পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে উচ্চতর পদে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু, যার শরীরের কোষে কোষে পাঠদানের আপ্রাণ আকুলতা প্রবলভাবে অন্তরিত ছিল তার পক্ষে কি সম্ভব- অন্য কোনো পেশাকে গ্রহণ করা? আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা না করে সামাজিক দায়বদ্ধতাকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃত শিক্ষার চাদরে কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিরন্ন জনগোষ্ঠীকে মুড়িয়ে নিতে প্রতিশ্রুত হয়েছিলেন শিক্ষকতার মতো মহান ব্রতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবার মাধ্যমে। তাছাড়া সেই সময়ে গ্রামের পাঠশালাগুলিতে বি.এস.সি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করবার মতো উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়াও ছিল রীতিমতো অচিন্তনীয় ব্যাপার।
যাহোক, এভাবেই সুব্রত ভট্টাচাযের্র নামটির পাশে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল শিক্ষক শব্দটির। শিক্ষকতা জীবনের শুরুর দিকে একদিন স্কুলের বারান্দায় পায়চারি করছিলেন তিনি। হঠাৎ এক বৃদ্ধের অস্পষ্ট ইশারায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। বৃদ্ধের শারীরিক অবয়বে প্রশ্ন করবার আকুল আকুতি লক্ষ করে ছুটি গিয়েছিলেন তার কাছে। শরীরের উর্ধ্বাংশ খানিকটা নিচু করে অতি সন্তর্পণে বৃদ্ধের দিকে মাথা ঝুঁকে উদ্যত হয়েছিলেন, প্রশ্নটি শুনবার। ‘মাস্টারি করিস ভালো কথা কিন্তু, ছোয়াগুলাক ব্যান (যেন) ডাঙ্গাইস (প্রহার করা), ডাঙ্গাইস ন্যা, মহব্বত করিস।’ বৃদ্ধের সেই অমিয় বাণীগুলি শুনবার পর আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন তরুণ শিক্ষক সুব্রত। অবচেতনাতেই যেন কথাগুলি তার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য প্রোথিত হয়েছিল। তারপর থেকেই চেষ্টিত হয়েছিলেন নিজেকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলবার। হাতে বেত নেই, নেই রুদ্রমূর্তির উপস্থিতি। তবুও ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভীড়। যেন প্রকৃত শিক্ষা প্রদানের এক অন্যন্য উদাহরণ তিনি।
জীর্ণ দশার একটি দ্বি-চক্রযান এবং শিক্ষার্থীদের অফুরান ভালোবাসা- দুটোকেই সঙ্গী করে দীর্ঘ বিয়াল্লিশটি বসন্ত বিরতিহীনভাবে প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে আসছেন তিনি। তবুও যেন অতৃপ্ত, অস্থির এবং চঞ্চল শিক্ষক সুব্রত। কারণটি স্পষ্ট- মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জ্ঞান দানের কাজটি চালিয়ে যাবার অকৃত্রিম তাড়না। তাই ডি.এম. অ্যাকাডেমি, নাগেশ্বরীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঠশালাগুলিতে আজও তাঁর সরস উপস্থিতি নিয়তই লক্ষ করা যায়। পিতৃস্নেহের পরশ বুলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা প্রদানে আজও যেন অপরাজেয় তিনি।
সন্তানেরা খারাপ নয়, আমাদের কালো রঙ্গে রঞ্জিত হয়ে তারা কালো হয়। তারা শ্রদ্ধা করতে চায় কিন্তু পাত্র পায় না। মূল্যবোধ শিখতে চায় কিন্তু শিক্ষক পায় না। যিনি শিখাবেন তার ভেতরে যদি প্রকৃত শিক্ষার আলো না থাকে তাহলে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা পাবে কীভাবে? আমরা যদি প্রতিনিয়ত সুন্দরকে অসুন্দর আর অসুন্দরকে সুন্দর বলে উপস্থাপন করবার চেষ্টা করি তাহলে অসুন্দরই প্রতিষ্ঠিত হবে। আর এজন্য সন্তানরা দায়ী নয়, দায়ী শিক্ষকরা। আদর্শবান শিক্ষক আর আদর্শভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা না হলে সমাজে নীতি প্রতিষ্ঠা পাবে না, প্রতিষ্ঠা পাবে দুর্নীতি। শিক্ষক সুব্রতের অবয়বজুড়ে উপর্যুক্ত সমস্যগুলি যেন অবিরল ঝরনা ধারার মতো প্রবাহিত হয়। সৃজনশীল শিক্ষার্থী সৃষ্টির পূর্বশর্ত হিসেবে সৃজনশীল শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি প্রতিটি মুহূর্তে।
তিনি উপলব্ধি করেন- বর্তমান শিক্ষকদের নিজ^ বিষয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ের ওপর পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় শিক্ষাঙ্গণে লক্ষিত হচ্ছে দৃশ্যমান অস্থিরতা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তরুণ শিক্ষকদের তিনি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মনোবিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র এবং ধর্মীয় গ্রন্থসহ মৌলিক চিকিৎসা বিষয়ের ওপর পড়াশুনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। বি.সি.এস শিক্ষা ক্যাডারসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শাখায় যারা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকতাকে চাকরি মনে না করে মহান ব্রত হিসেবে মেনে নেয় শুধু তারাই যেন এই মহান পেশায় কাজ করবার সুযোগ পান কিংবা পাওয়া উচিত বলে তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবেন- এটি তার পরম প্রত্যাশা।
যথার্থ জীবনান্বেষণ এবং আত্মার শুদ্ধিতে সংগীতের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য- এই চিরন্তন সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই ছোটবেলা থেকে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন সঙ্গীতের অমিয় ভুবনে। সংগীতের টানে আজও ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। শিক্ষকতার ন্যায় সঙ্গীতও যেন তার ধর্ম-কর্ম-সাধনা। তাইতো তরুণ প্রজন্মকে শুদ্ধ সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করতে ৬৫ বছর বয়সেও নাগেশ্বরী থেকে দীর্ঘ ৩০ কিঃ মিঃ সাইকেল চালিয়ে আসতেন নিয়মিতভাবে কুড়িগ্রামে অবস্থিত শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে।
১৯৭১ এর ২৫ মার্চ নাগেশ্বরীতে যখন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল তখন তার সাহসী কণ্ঠে বেজে উঠেছিল- ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে, লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।’ নজরুলের এক একটি গান তার কাছে এক একটি দর্শন। নজরুল সংগীতকে তিনি মনে করেন জীবন পরিবর্তনের বাহন। সেই চেতনাগত দায়বদ্ধতা থেকেই ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে আজ অবধি কাজী নজরুল ইসলামের আমৃত্য বাণী ধ্বনিত হয়ে আসছে তার কণ্ঠে। শুদ্ধ সংগীতের প্রচার এবং প্রসারে ক্লান্তিবিহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন রংপুর বেতার, রংপুর, জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি, কুড়িগ্রাম এবং বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া অ্যাকাডেমি, উলিপুর এ। সঙ্গত কারণেই নাগেশ্বরীতে অবস্থিত সংগঠন প্রতীক এবং প্রবাহ এ অবদান রেখে চলেছেন নিষ্ঠার সাথে। সামাজিক কল্যাণের অভিপ্রায়ে গড়ে ওঠা এই সংগঠনগুলোতে প্রতিনিয়ত মূল্যবান পরামর্শ এবং স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে মূল লক্ষ্য সম্পাদনে গতির সঞ্চার করে চলেছেন জীবনের পড়ন্ত বেলাতেও। এবং অত্র উপজেলার নিভূত পল্লী সাপখাওয়া থেকে তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হাফিজুর রহমান হৃদয় কর্তৃক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘উচ্ছ্বাস’ এর উপদেষ্টা হিসেবে মূল্যবান পরামর্শ এবং সময় প্রদান করে পত্রিকাটির কলেবর এবং গুণগত মান বৃদ্ধিতে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে আসছেন। ঘোর অমানিশায় আলোর স্ফুরণের যে লক্ষ্য নিয়ে পত্রিকাটির যাত্রা শুরু -তা নিশ্চিত হবে বলে তার প্রাণিত বিশ্বাস।
মানুষের সাথে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? এক ছাত্রের প্রশ্নে মানবপ্রেমে বিশ্বাসী সুব্রত ভট্টচার্যের সরল স্বীকারোক্তি- ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস জল নিবি আর মনে মনে ভাববি; এ জলের মধ্যে সব ধর্ম- জাত পাত মেশানো আছে, ঢক ঢক করে জল গ্লাস পান করবি আর মনে মনে বলবি আমি কেবলই মানুষ, নিজে সুন্দর হওয়া আর সুন্দর করাই আমার জীবনের লক্ষ্য। এতে কষ্ট হবে, সমাজের মানুষ উপহাস করবে তাতে থেমে গেলে চলবে না, (উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্ত বরান নিবোধিত, চরৈবেতি) চলাই তোর ধর্ম হবে। আর সব সময়ই প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করবি, প্রকৃত মানুষই পারে জীবনের যথার্থ প্রকাশ ঘটাতে। হিন্দু হিসেবে গড়ে তুললে তুই একশ কোটি মানুষের হবি, মানুষ হিসেবে গড়ে তুললে দেখবি সব মানুষের হয়ে গেছিস। মনে রাখবি, মানুষের ধর্ম এক ও অদ্বিতীয়। আর সেটি হচ্ছে মনুষ্যত্ব। কাজেই নিজেকে গড়ে তুলবি মানুষ হিসেবে, কোনো সম্প্রদায় হিসেবে নয়।’

সত্যিকারের মানব প্রেমিকের জীবনাচরণে উপর্যুক্ত কথার সত্যতা সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। সকল শ্রেণির মানুষকে সমদৃষ্টিতে দেখে আসবার প্রবৃত্তি যেন তার অতি পরিচিত অভ্যেস। হাড়ভাঙ্গা শীতে উত্তরের দরিদ্র মানুষগুলি যখন সীমাহীন কষ্টে ভোগেন, ব্রহ্মপুত্র, ফুলকুমর, দুধকুমর নদীর পাড়ে বসবাসরত মানুষগুলি যখন বন্যার সময় জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকবার চেষ্টা করেন তখন শান্তির দূত হিসেবে এগিয়ে আসেন সুব্রত ভট্টাচার্য। সাথে থাকেন তাঁর শিক্ষার্থী এবং অগণিত শুভাকাক্সক্ষী। দরিদ্র কৃষক কিংবা দিন মজুরের সন্তান যখন অর্থাভাবে লেখাপড়া ছাড়তে উদ্যত হয় তখন তাদের বুকে টেনে নিয়ে সহায়তার হাত প্রসারিত করা যেন তার স্বাভাবিক অভ্যাস।
লেখালেখির থেকে বই পাঠেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধকারী এই গুণী শিক্ষক মনে করেন- একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্র পড়াতে প্রচুর পড়াশুনা করবার দরকার। লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার থেকে হয়ত মানুষের আত্মিক উন্নয়নে কাজ করবার নিমিত্তেই এই জগৎ থেকে নিজেকে আড়ালে রেখেছেন। তবুও যখন আমরা তার ‘চাই চেতনাশ্রয়ী আত্মসমালোচনা’, ‘মানুষের কবি নজরুল’ এবং ‘নজরুলের স্বপ্ন-অভেদ, সুন্দর, সাম্যবাদ’ – এর মতো প্রবন্ধগুলো পাঠ করি তখন আমাদের অন্তর্জগতজুড়ে লেখক সুব্রতের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একমাত্র মেয়ে বিপাশা ভট্টাচার্যের বিরতিহীন প্রচেষ্টা, শিক্ষার্থী এবং শুভাকাক্সক্ষীদের অনুপ্রেরণা এবং ছাত্র অনিল সেন, ড. অনু হোসেন ও তাঁর ছোট ভাই ড. শ্বাশত ভট্টাচার্যের সহযোগিতায় পরিবেশ, সমাজ, দেশ এবং বিশ্ববোধকে সামনে রেখে প্রবন্ধ গ্রন্থ “সনাতন সংস্কৃতি” রচনা করেন। গ্রন্থটি অগ্নিমলে পুরোহিতম, সর্বেশ্বরবাদী সনাতন এবং ষড় দর্শন ও গীতা এ তিন ভাগে বিভক্ত যা সনাতন ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহীদের খোরাক যোগাতে গূরুত্বপূর্ণ পালন করবে বলে লেখকের বিশ্বাস। বইটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক ও নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা মন্তব্য করেন এভাবে- “ আজকাল বইয়ের দোকানে বেদ ও উপনিষদের অনুবাদ দেখি, আকারে প্রকাণ্ড, পড়ার সাহস পাই না কিন্তু সুব্রত ভট্টাচার্যের বইটি প্রাচ্যের আদিজ্ঞানের সার সংক্ষেপ।”
সুব্রত ভট্টাচার্যের স্নেহাস্পদ শিক্ষার্থী সাংবাদিক অনিল সেন স্যারের সম্পর্কে বলেন-‘সুব্রত ভট্টাচার্য একজন ধ্যানমগ্ন মানুষ। পৃথিবীতে মহামানবের মত তাঁর আগমন। বস্তুবাদ এবং ভাববাদের সফল রূপকার তিনি। সৃষ্টি রহস্যের জটিল সমীকরণ থেকে তুলে এনেছেন সরলতা; যা দু’হাতে বিলি করেন ব্যাক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশের কল্যাণে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর প্রসাদসম সরলতার একটু গ্রহণ করবার।’
খাতা-কলমে স্কুল থেকে অবসর নেবার আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও বাড়ীর উঠোনে নারকেল তলায় শিক্ষার্থী পড়াতে স্বর্গীয় শান্তি অনুভব করেন সুব্রত ভট্টাচার্য। এবং প্রতিনিয়ত তা করেই চলেছেন। বিকেল বেলা যখন বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়েন ঠিক তখনই উন্মুখ হয়ে থাকা স্কুল, কলেজ শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গী হন। পুরোনো বাইসাইকেলটি এখনও তাকে নির্মল আনন্দ প্রদানের কাজটি করে চলেছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং ধর্ম সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান- যেখানেই যান না কেন বন্ধুর মতো করে বাইসাইকেলটি সঙ্গে করে চলেন পথ থেকে অনন্ত পথের উদ্দেশ্যে। সত্য, সুন্দর এবং সৃষ্টির নেশায় মত্ত এই মহান কারিগর মৃত্যুর পরও সমাজের কল্যাণে অবদান রাখবার আগ্রহ ব্যক্ত করতেন পূর্ব থেকেই। এবং ২০০১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে তাঁর দুটি চোখ দান করেন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সংগঠন ‘সন্ধানী’ কে। ঠিক পরের বছরই মরনোত্তর দেহ উইল করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বেছে নেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে। মৃত্যুর পরেও তাঁর শরীরের অঙ্গগুলি যদি একজন অথবা কতিপয় শিক্ষার্থীর উপকারে আসে- এই ভেবে পুলকিত বোধ করেন তিনি। তিনি সবসময়ই এই বিশ্বাসে স্থির- বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড হচ্ছে একটি পরিবার এবং তিনি এই পরিবারের একজন সদস্য। তাই, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব পরিবারের সদস্য হিসেবে বিশ্ববাসীর নিকট এই বিশ্বপ্রেমিকের চিরন্তন আবেদন-
‘জন্ম নিয়েছি মোরা হতে সুন্দর,
সুন্দর হয়ে এসো করি সুন্দর।
আলোকিত জন চাই শুধু চাই আলো,
মুক্ত উদার আত্মদ্বীপ হয়ে জ্বালো।
আঁধার পারে না দিতে বিদায় আঁধারে,
তা শুধু পারে আলো।
ঘৃণাও পারে না দিতে বিদায় ঘৃণারে,
তাই প্রেমাগ্নি জ্বালো।
অস্ত্র কখনো নয় ক্ষমতার উৎস,
প্রেমেরই অধীন জেনো আপামর বিশ্ব।
বিশ্ববাসী অমৃতের সন্তানেরা বলো,
আনবিক নয়, মানবিক বোমা গড়ি চলো।’

জন্মদিন, স্যার
মারুফ হোসেন মাহবুব

আজ সুব্রত ভট্টাচার্য স্যারের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, স্যার!
তখন সদ্য স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়েছি- নাগেশ্বরী কলেজে।
এক ছুটির দিনে আমার একজন বন্ধু জানালো সদ্য প্রতিষ্ঠিত রায়গঞ্জ কলেজে আজ গানের অনুষ্ঠান হবে- নাগেশ্বরী থেকে সুব্রত স্যার আসবেন। স্যারের একক সঙ্গীত অনুষ্ঠান।
তখন সকাল দশটা বাজে বোধকরি। আমরা বন্ধুরা গেলাম রায়গঞ্জ কলেজে।
সেই সুব্রত ভট্টাচার্য স্যারের গান আমার প্রথম শোনা।
কতকত গান গেয়েছিলেন, সুব্রত স্যার!
কী যে শুদ্ধতা আর সুন্দরের প্রতি মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি সেদিন তাঁর বিবিধ গানে। আমরা সবাই তন্ময় হয়ে, বুঁদ হয়ে শুনছিলাম স্যারের গান।
স্যার সেদিন নজরুলের গানের প্রেক্ষাপট বর্ননা করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছিলেন গানগুলো।
আব্বাস উদ্দীনের “নদীর নাম সই কাচুয়া মাছ মারে মাছুয়া”- গানের সুরে কবি নজরুল গান বাঁধেন “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা পাখী নয় সে নাচে কালো আঁখি…”
আপনার সেই দরাজ কন্ঠ, আপনার সেই মধুর গান গাওয়া আজো আমার মনে পরিস্কার সেলুলয়েডের ছবি হয়ে আছে।
এরপর যতই বেড়ে উঠেছি বয়সের সাথে সাথে, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যত সম্পৃক্ততা বেড়েছে আমার- ততই স্যারের জ্ঞান ও গুণের কথা শুনেছি কত বিদগ্ধজনের কাছ থেকে।
বছর তিনেক আগে বিভাগীয় লেখক পরিষদ, রংপুর আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাজহাট জমিদার বাড়ির হলরুমে। সেখানে আপনার সাথে দেখা হলে আপনার স্নেহ প্রবণ উদার হৃদয়ের উষ্ণতা পাবার সুযোগ ঘটে আরেকটা দিন।
শাশ্বতবাংলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী, পক্ষকালব্যাপী, সপ্তাহব্যাপী মহান বিজয় দিবস ও মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠান আয়োজন করে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট। এই অনুষ্ঠানের সমন্বয়কের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হলে স্যারের সাথে দেখা হয় এই অনুষ্ঠানে। বেতার শিল্পী সংস্থার শিল্পী হিসেবে কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় সুরারোপ করে স্যার পরিবেশন করেন এক অসাধারণ গান। গান শুনে অভিভূত ও মুগ্ধ হন সকলে।
স্যার, আমি আপনার ক্লাসের ছাত্র নই। তবু আপনি আমার শিক্ষক। সরাসরি ক্লাসের শিক্ষক না হয়েও মানুষের মনের ভেতর শিক্ষক হিসেবে আসন পাওয়া তো সহজ নয়! আপনার কাছাকাছি যৎসামান্য সময় অতিবাহিত হয়েছে আমার হয়তো, তবু আপনার মানবিক আচরণ, আপনার ঔদার্য, আপনার সংযম আর প্রজ্ঞা আমায় জীবন সংক্রান্ত যে শিক্ষা দিয়েছে তার মূল্য পার্থিব নয়- অপার্থিব।
স্যার, আপনি ছিলেন গণিতের শিক্ষক। অথচ কী এক শক্তিমান আর গভীর মানবিক দখল আপনার শিল্প- সাহিত্য- আর সঙ্গীতের ওপর।
নিজ এলাকায় কখনো পরিবেশ আন্দোলন, কখনো বৃক্ষ রোপন করে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করছেন আপনি- নীরবে, নিভৃতে। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার অল্প দুএকটি ছবি দেখে জানতে পারি। কিন্তু- আমাদের জানা হয়না- আপনার হৃদয়ের আরো গভীর অনুভবের কথা।
প্রায় পঁচিশদিন নাগেশ্বরী ও কু্ড়িগ্রামে থেকে গতকালই ফিরলাম রংপুরে। আপনার কাছে যাবো যাবো করে কত ভেবেছি।
যাওয়া হয় নি স্যার। আমরা বড় ব্যস্ত। প্রবীণ বটবৃক্ষের মত ছায়ার কাছে আমাদের জীবনের ব্যস্ততা বসতে দেয় না। কেবল পাগলা ঘোড়ার মত আমাদের জীবন আমাদের পাগলপারা দৌড়ে নিয়ে বেড়ায় জীবনের পথে পথে।
আপনার কাছে যাওয়ার ব্যর্থতা আমায় রবীন্দ্রনাথের গানটি মনে পড়িয়ে দিচ্ছে।
“আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে, চাও কি
হায় বুঝি তার খবর পেলে না
পারিজাতের মধুর গন্ধ পাও কি
হায় বুঝি তার নাগাল মেলে না…”
আপনার জন্মদিন আজ। আপনি ভালো থাকুন, স্যার। দেশের এক কোণের একটি উপজেলা নাগেশ্বরীতে আপনি তরুণদের সাথে নীরবে যে কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের জন্য, মানুষের জন্য তা আলো হয়ে আরো আরো আলোকিত করুক আমাদের সমাজে- দূর হোক যত অন্ধকার। শুভ জন্মদিন, স্যার!

অঙ্গীকার
সুমন সেন

সুন্দর হওয়ার ব্রত যার সে-ই সুব্রত। সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলকে জীবনের সার করে মনুষ্যত্বকে সর্বাগ্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে মানুষটি তিনি স্যার সুব্রত কুমার ভট্টাচার্য। আমি জানি স্যারকে নিয়ে লেখার যোগ্যতা আমার নেই, তবে সাহস ঠিকই আছে।
নবম-দশম শ্রেণীতে প্রাইভেট পড়ার সুবাদে স্যারের সান্নিধ্যে আসার প্রথম সুযোগ হয়েছিল। স্যার পাঠ্যবই পড়ানোর পাশাপাশি বিশেষ কিছু বলতেন- অন্য এক ধারার কথা। আমি মূলত সেই ধারারই প্রেমে পড়ে যাই। যার ফলশ্রুতিতে প্রাইভেট পড়া শেষে আমি স্যারের বিকেলের হাঁটার সঙ্গী হতাম। …যে কথাগুলো তিনি বলতেন, তা যেকোন তরুণের মাঝেই উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। কেননা প্রায় সব শিক্ষকই যেখানে শুধু পরীক্ষায় ভালো করে ভালো ফলাফলের ওপর জোর দেন, সুব্রত স্যার সেখানে যোগ করেন সুন্দর মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার মন্ত্রও।
“পরীক্ষায় ভালো ফল অবশ্যই কাম্য তবে তার চেয়ে বেশি জরুরি ভালো মানুষ হওয়া। আর এর চর্চাটা তরুণ বয়স থেকেই শুরু করতে হবে, তা না হলে এটা সম্ভব নয়। Don’t get jhalum-jhulum (unsmart), be smart, get smart.. ব্যায়াম কর, শরীরকে শক্ত-পোক্ত কর, কখনও দুর্বল হবে না, সাহসী হও। সুন্দরভাবে গড়ে উঠতে তিন ধরণের ব্যায়াম দরকার- শারীরিক (Physical), মানসিক (Mental) ও আধ্যাত্মিক (Spiritual) । এই তিনটি ধারাবাহিকভাবে কর, একটির সাথে আরেকটির গভীর সম্পর্ক। তিনটিরই সমন্বয় দরকার। এই তিনটির সমন্বয়ে পরমকে অনুভব করা যায়।”
এ কথাগুলি শোনার পর থেকে নিজের মধ্যে এক ধরণের তাড়না সৃষ্টি হয়- যা পরিবর্তনের নেশা জাগায়। এই পরিবর্তনের নেশা জীর্ণতা-দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ওঠার আহ্বান জানায়। স্যারের সমন্বয়বাদে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। জীবনের একটা পর্যায়ে অনেককেই এই উপদেশ দিতেন- প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস জল নেবে আর মনে মনে ভাববে- এ জলের মধ্যে সব ধর্ম-জাত-পাত মেশানো আছে। ঢকঢক করে জল গ্লাস পান করবে আর মনে মনে বলবে- আমি কেবলই মানুষ। নিজে সুন্দর হওয়া আর অন্যকে সুন্দর করাই আমার জীবনের লক্ষ্য। প্রথমদিকে স্যার ভাবতেন এটা কী আদৌ সম্ভব? কিন্তু এখন দৃঢ়তার সাথে বলেন অন্তরে প্রকৃত ভালবাসা নিয়ে অবিরত সাধনা করলে সব মানুষকে আপন করে নেয়া যায়।
নিজের জীবনকে সাজাতে স্যার অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, ধৈর্য্য ধরেছেন আর অনেক মহাপুরুষের জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠিত করেছেন আপনার মাঝে। যে কথাগুলি স্যার বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাছে বলেন- যা লিখলে অনেক লিখতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দের- “The gist of all worship is to be pure and to do good to others” বাণীটিকে তিনি মন্ত্র ও তন্ত্র উভয় রূপেই সাধন করেছেন বলেই সবাইকে বলতে পারেন- ‘Be the best and do the best.’ স্যারের অন্যতম একটি গুণ হলো নিজেকে হাস্যোজ্জ্বল উপস্থাপন করা এবং নিজের কষ্ট কাউকে বুঝতে না দেয়া। এই গুণটির পেছনেও স্বামীজির একটি বাণী জড়িয়ে আছে- ’When you are gloomy don’t go outside. You confine yourself within your room, you have no right to carry the disease outside.’
আসলে অনেক রঙে রঞ্জিত হয়ে স্যার একজন ‘সুব্রত’ হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন। তাই মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্যার একটি বোমা তৈরি করেছেন- ‘মানবিক বোমা’-
জন্ম নিয়েছি মোরা হতে সুন্দর
সুন্দর হয়ে এসো করি সুন্দর।
আলোকিত জন চাই শুধু চাই আলো
মুক্ত উদার আত্মদীপ হয়ে জ্বলো।

আঁধার পারেনা দিতে বিদায় আঁধারে
তা শুধু পারে আলো,
ঘৃণাও পারেনা দিতে বিদায় ঘৃণারে
তাই প্রেমাগ্নি জ্বালো।

অস্ত্র কখনও নয় ক্ষমতার উৎস
প্রেমেরই অধীন জেনো আপামর বিশ্ব।
বিশ্ববাসী অমৃতের সন্তানেরা বলো
আণবিক নয়, মানবিক বোমা গড়ি চলো।

আমি মনে করি, এই কবিতাটিকে স্যারের জীবন-দর্শনই বলা যায়- যা তিনি বিশ্বব্যাপী সবার কাছে পৌঁছে দিতে চান। আর তা চান বলেই ‘মানবিক বোমা’র অসাধারণ ইংরেজি অনুবাদ স্যার স্বয়ং করেছেন-

ÔPhilanthropic bomb’-

The motto of life is to be the best.

So, being the best let us do the best.

I deserve in everyone let there be light.

Being broad and self conscious emit light.

Dark can never drive dark,

Which only light can do.

Hate can never drive hate,

Which only love can do.

Power never sustain through gun,

Only love can bring together all men.

So, all of you the son of Lord proclaim,

No atomic, philanthropic bomb we claim.

অভেদ-সুন্দর-সাম্যবাদের কবি কাজী নজরুল ইসলামের গুণী ভক্ত ও গবেষক সুব্রত স্যার দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন-
“আমি সেই দিন হব শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল
আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপান
ভীম রণ-ভূমে রণিবে না…।”
তাইতো স্যার সারা জীবন ধর্মীয়-সামজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন আন্দোলনে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রাখছেন। নানান কুসংস্কার, অশৌচ-শ্রাদ্ধ, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন প্রভৃতি অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে নানা প্রান্তে তরুণদের সাথে নিয়ে কাজ করে চলেছেন। বাংলাদেশ বেতারের ‘স্পেশাল গ্রেড’ কণ্ঠশিল্পী সুব্রত স্যার সমাজকে সুন্দর করতে ও জাতীয় কবির চেতনা সবার মাঝে জাগাতে নজরুলগীতি নিয়মিত পরিবেশন করেন। তাছাড়াও প্রায় সব ধরণের গানে মুন্সিয়ানার ফলে সকল আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানে অনন্য এক গুণী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
স্যারের প্রথম প্রকাশিত ‘সনাতন সংস্কৃতি’ বইটি গবেষণাধর্মী অত্যন্ত মূল্যবান ও সমাদৃত একটি গ্রন্থ। সেটি থেকে ভিন্ন প্রকৃতির এই বই- আটটি চমৎকার প্রবন্ধের সংকলন, যেখানে স্যার সবাইকে সুন্দর হওয়ার আর সুন্দর করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রত্যেক মানুষের জীবনে নানান বাধা-বিপত্তি, চড়াই-উৎড়াই ও সীমাবদ্ধতা যেমন আছে তেমনি রয়েছে সুযোগ ও সম্ভাবনাও। প্রকৃতিতে আমরা যেমনটি দেখি সমুদ্রের ঢেউয়ের উত্থান-পতন, জোয়ার-ভাটা। সুন্দর হওয়ার পথেও আমরা এরকম বাধার মুখোমুখি হতে পারি, তবে এতে থেমে গেলে চলবে না। মনুষ্যত্বের শিক্ষা অর্জন ও এর প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিনও হতে পারে, তাই বলে ধৈর্য্য হারানো যাবে না। মহান দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন- শিক্ষার শিকড়ের স্বাদ তেতো হলেও এর ফল মিষ্টি। সুব্রত স্যার সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে, অবিরত সাধনা করে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। যার জন্য তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়-সমাদৃত ও সবার ভালোবাসায় সিক্ত। তাই প্রিয় পাঠক আসুন, স্যারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক- সুন্দর হব, সুন্দর করব।


চেতনার আলোয় আলোকিত হোক বিশ্ব
সঞ্জয় চৌধুরী


১.
২০১৩ সালের লক্ষ্মী পূণিমার সন্ধে বেলা। আমি আর সুব্রত ভট্টাচার্য স্যার বসে আছি স্যারের বাড়ির সেই পুরাতন ভবনটির সামনে। স্যারের মুখেই শুনেছি ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো বৃটিশ আমলে। সেই ভবনটির সামনে একটি শিউলি গাছ রয়েছে। যেহেতু পূর্ণিমা ছিলো সেদিন, তাই সেই শিউলি তলায় আমি আর স্যার বসে আছি কাঠের বেঞ্চিতে। আমাদের সম্মুখে পূর্ব আকাশে চাঁদ উঠেছে। সেই পূর্ণিমার জোছনা এসে পড়ছে শিউলি গাছে। তখন গায়ে জোসনা মেখে কিছু শিউলি ফুল আয়োজন করছিলো ফুটবার জন্য। পাশেই হরিতকি বাগানের বড় হরিতকি গাছটি থেকে ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে গেলো একটি রাতচোরা পাখি। যেতে যেতে পাখিটি কক্-কক্ করে ডাকছিলো। পাখিটি উড়ে উড়ে যত দূরে যাচ্ছিলো তার ডাক আস্তে আস্তে মিলে যাচ্ছিলো বাতাসে। যে ভাবে একটি বিকেল আস্তে আস্তে মিলেযায় একটি সন্ধায়, সে ভাবে।
সে সময় হরিতকি গাছটিতে হরিতকি গুলো ছোট ছোট। কেবল বড় হবে হবে ভাবছিলো। দু-একটা ছোট হরিতকি, বাগানের চেপ্টা সবুজ ঘাসে পড়েছিলো কিনা সে খবর রাখিনি। মাঝে মাঝেই হরিতকি বনের ফাঁক দিয়ে উকি দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অশ্বত্থের গাছটির দিকে, সেই গাছে জোছনা ফুটেছে কিনা দেখার জন্য। কিন্তু দেখতে না পেয়ে ভেবে নিয়েছিলাম নিশ্চই ফুটেছে। পুরাতন বৃদ্ধ গাছ আর পুরাতন নোনা ধরা দেয়াল আমার ভালোলাগে। তারা তো কালের সাক্ষী, আমি তো নবীন।
২.
সে যা হোক, এসব দেখতে দেখতে আর স্যারের সাথে গল্প করতে করতে সন্ধাটা রাতের দিকে গড়াতে থাকলো। সোনার থালার মত জ্বলজ্বল করে উঠলো চাঁদ। পাশের নারিকেল গাছটার শিশির পড়া পাতায় চক্-চক্ করে খেলতে লাগলো জোসনা। আমি আর স্যার বসে আছি কাঠের বেঞ্চিতে। পাশেই স্যারের হৃষ্ট-পুষ্ট কুকুরটা মাটিতে শুয়ে আছে লম্বা হয়ে। কুকুরটার মাথার দিকের অর্ধেকে জোসনা পড়েছে আর পেছনের দিকের অর্ধেকে পড়েছে শিউলি গাছের ছায়া।
তখন কবিতা ঠাসা খাতা আমার হাতে। হ্যাঁ, আমার লেখা কবিতা গুলো স্যারকে শোনাব বলে গিয়েছিলাম স্যারের কাছে। আমি একটার পর একটা কবিতা শোনাতে থাকলাম। চাঁদের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমান হারে আমার কবিতা পড়ার আবেগও বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। একের পর এক কবিতা গুলো পড়ছিলাম আমি। স্যার খুব মনযোগ দিয়ে শুনছিলেন কবিতাগুলো। এক পর্যায়ে আমার একটি কবিতা পড়লাম-
“আমি ব্যাকরণ জানিনা,
আমি অকারণেই ভালবাসি।”
স্যার খুব করে প্রসংশা করলেন কবিতাটির। বললেন-
“সঞ্জয়, পৃথিবীতে ভালবাসা খুবই জরুরি। স্বার্থকে বাইরে রেখে ভালবাসা এখন পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার। সবাই যদি তোমার কবিতার মত কোন স্বার্থ ছাড়াই এই পৃথিবীকে ভালবাসতে পারে, তবে পৃথিবী থেকে দুর্নীতি, অপসংস্কৃতি সহ সকল অসুন্দর দূর হতো। তবেই প্রতিষ্ঠিত হতো সুন্দর, বিশ্বপ্রেম। তবেই প্রতিষ্ঠা পেতো মানবতা।” সেদিন কবিতা পড়া শেষে তিনি যে কথাটি বলেছিলেন, সে কথাটি বলবার জন্যই আসলে এই লেখা, এতো সব বলা। কবিতা পড়া শেষ হলে সুব্রত ভট্টাচার্য স্যার বললেন-
“শুধু কবিতা লিখলেই হবেনা,
কবিতা করতেও হবে।”
স্যার কথাটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন-
“সঞ্জয়, তোমরা যারা কবি তারা কবিতা লেখ,
আর আমরা কিন্তু কবিতা করি।”
খুব সহজেই বুঝে গেলাম কবিতা লেখা আর কবিতা করার মধ্যে পার্থক্য। সেই লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাতে আমি পেলাম আমার জীবনের বড় দিক নির্দেশনা। সে দিক নির্দেশনা দিলেন আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় স্যার সুব্রত ভট্টাচার্য। যে কথাটি আমার জীবন চলার পথে আলো হয়ে থাকে সব সময়, সেই কথাটি আবারো বলতে চাই-
“শুধু কবিতা লিখলেই হবে না,
কবিতা করতেও হবে।”
স্যার বলেন- একটি সুন্দর কবিতা মানে, সুন্দর সুন্দর ভাবনা গুলো সুন্দর সুন্দর কথা মালায় সাজিয়ে ফেলা। আর কবিতা করা হলো- সুন্দর সুন্দর ভাবনাগুলোকে কাজে রুপদান করা, বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ সুন্দর সুন্দর কাজ করাই হলো কবিতা করা। স্যার আরো বললেন- আজকের এই পৃথিবীতে কবিতা লেখা যতটা জরুরি, তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো সুন্দর কবিতা করা, মানে ভালো কাজ করা।
৩.
আমি যেহেতু গান গাই, গান লেখি, সুর করি সে কারনে সুব্রত স্যারের কাছে মাঝে মাঝেই বসি। স্যার বলেন সংগীতে সুর, আবেগ এবং প্রেমের মিশ্রণ ঘটাতে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে উদাহরণ দিয়ে স্যার বোঝান। স্যার বলেন- “যার ভিতরে প্রেম নেই, সে কখনো শিল্পী হতে পারে না।” আমি চুপ করে শুনি সেসব কথা।
স্যার বলেছেন “কবিতা লিখলেই হবেনা, কবিতা করতেও হবে।” সে কারণে গান লিখতে বসলেই মাথায় ঘুরতে থাকে কিভাবে একটি গান লিখলে সেই গানটি দেশ, সমাজ এবং মানুষের কল্যাণে আসবে। আমি ভাবতে থাকি, লেখার চেষ্টা করি, সুর করার চেষ্টা করি।
অপর দিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে শুদ্ধ সংস্কৃতি নিয়ে, নদী নিয়ে, সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয় শ্রদ্ধেয় ড. তুহিন ওয়াদুদ স্যারের সাথে।
সে সময় নদী বিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’- এ কাজ করতে গিয়ে মনে হলো নদীর দুর্দশা নিয়ে গান লেখা যায় কিনা। সে গান শুনে যদি একজন মানুষেরও হৃদয়ে নদীর জন্য ভালবাসা তৈরি হয়, তবে সেটি হবে আমার গানের সার্থকতা। কারণ নদী মানুষের জন্য এবং দেশের জন্য কতটা জরুরি তা আমাদের সকলেই জানা।
২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর কুটিবাড়িতে বসে আমি লিখে ফেললাম নদী নিয়ে ‘রক্ত শূন্য দেশ’ শিরনামের গানটি-
আজ রক্তনালী শুকিয়ে গেছে রক্ত শূন্য দেশ,
কেউবা কাঁদে সেই জ্বালায় কেউবা আছে বেশ।।
সবুজ প্রাণ ম্লান হয় আস্তে আস্তে তাই,
এই নদী মোদের প্রাণ তাই নদী ফিরে চাই।।
কবিতায় আর পাল তোলা ঐ নৌকা ভাসে না
শ্রাবণেও ঐ নদীর বুকে জোয়ার আসে না,
স্বপ্ন গুলো আটকা পড়েছে ঐ বালু চরে
তাইতো আজ বাংলাদেশের হৃদয় পুড়ে মরে।।
সবুজ ছায়া দেশ যে আজ মরুর পথ যাত্রী
রক্ত শূন্য বাংলা মেয়ের ভাগ্যে কালো রাত্রি,
তাইতো আজ বাংলাদেশের রক্ত ফিরে চাই
রক্তে আগুন জ্বালিয়ে আজ প্রতিবাদী গান গাই।।
গানটি সুর করলাম, নিজের কন্ঠে রেকোর্ডের কাজ শেষ হওয়ার পরে তিস্তা নদীর চরে দৃশ্য ধারণের কাজ শেষ হলো এবং ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট ‘নদী অধিকার দিবস’- এ সেই তিস্তা নদীর পাড়েই ড. তুহিন ওয়াদুদ স্যারের উপস্থিতিতে গানটি প্রকাশ করা হলো।
প্রকাশের সাথে সাথে খুব দ্রুত গানটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো। এমন কি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও গানটি সমাদৃত হলো। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নদী নিয়ে অলিম্পিয়াড- “জাতীয় নদী অলিম্পিয়াড ২০১৬” (সম্ভবত এটি পৃথিবীর প্রথম নদী অলিম্পিয়াড) এর জন্য ”রক্ত শূন্য দেশ” গানটি থিম সং হিসেবে নির্বাচিত হয়। এখন নদী বিষয়ক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে গানটি বাজতে শোনা যায়। নদী রক্ষার্থে বিভিন্ন পর্যায়ে যারা কাজ করেন, এই গানটি তাদেরকে প্রতিনিয়ত নদীর জন্য কাজ করার শক্তি যুগিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই সে কথা অকপটে স্বীকার করেন।
এরকম সময় আমার মনে হয় একটি সঠিক পথ নির্দেশনা কতটা জরুরি আমার জন্য, আমাদের জন্য।
সুব্রত স্যারের সেই ‘কবিতা লেখা এবং কবিতা করা’ কথাটি কতটা মূল্যবান তা এখন আমি অনুভব করতে পারি।
৪.
৬ মার্চ ২০১৭।
কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং আমি মাইক্রোবাসে করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাচ্ছি সৈয়দপুর বিমান বন্দরে। আমার হাতে মোবাইল ফোন, যাকে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন- মুঠোফোন। সেই মুঠোফোনে সুব্রত স্যারের অনেক গুলো ছবির মধ্যে একটি ছবি রয়েছে যে- স্যার হারমনিয়াম নিয়ে চোখ বন্ধ করে গান গাচ্ছেন। সেই ছবিটি দেখা মাত্রই কবি নির্মলেন্দু গুণ বললেন- ”সুব্রত ভট্টাচার্য একজন প্রকৃত শিল্পী, তা না হলে গানে এতটা ডুব দিতে পারতেন না।”
সেই ২০১৭ সালের ৬ মার্চ এর একটু বর্ণনায় আসি। দিনটি ছিলো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ।
সেখানে অতিথি হিসেবে এসেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। উল্লেখ্য, তার ৪ দিন আগে অর্থাৎ ২ মার্চ পতাকা উত্তোলন দিবসে কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখা, আমার সুর ও কণ্ঠে গাওয়া ‘পতাকার গান’ শিরনামের গানটি প্রকাশ পায়।
তাই প্রাসঙ্গিক ভাবেই নবীনবরণ অনুষ্ঠানে গানটি বাজিয়ে শোনান হয় সবার উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত সেই অনুষ্ঠানে শহীদ মিনার মঞ্চ থেকে। দিনটি আমার কাছে একটি স্বপ্নময় দিন ছিলো। এক সময় আমার সুযোগ এলো নবীনদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলবার জন্য। আমি মাইক্রোফোনে নবীনদের উদ্দেশ্যে অনেক কথার ভিড়ে আরো একটি কথা বললাম-
‘শুধু স্বপ্ন দেখলেই হবে না,
স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখতে হবে।’
কথাটি শেষ হতে না হতেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. এ কে এম নূর-উন-নবী স্যার, শ্রদ্ধেয় কবি নির্মলেন্দু গুণ স্যার সহ সকলেই করতালির মাধ্যমে কথাটাকে স্বাগত জানালেন।
৬ মার্চের সেরকম একটি দিনের স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি, যা সেদিন সত্যি হয়েছিলো। অর্থাৎ সেদিন আমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছিলো। কথাটি খুব দ্রুত মানুষের মুখে মুখে, পত্রিকা-ম্যাগাজিন ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। পরবর্তিকালে ‘স্বপ্ন ছুঁতে হবে’ এই কথাটিকে কেন্দ্র করে অনেককেই দেখেছি অনুপ্রাণিত হতে।
যখন শুনি নাগেশ্বরীর বুকে সেই কথাটিকে কেন্দ্র করে এক দল তরুণ সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলে এবং ভালো ভালো কাজ করে সমাজের জন্য, মানুষের জন্য। যখন শুনি সেই সংগঠনের নাম দেয় ‘এসো স্বপ্ন ছুঁই’, তখন মনে হয়, আমি সেদিন সঠিক সময়ে, সঠিক মানুষের সামনে, সঠিক কাজটি করেছিলাম।
হ্যাঁ, ২০১৭ সালের ৬ মার্চ সেই মঞ্চে আমি সেদিন কবিতা লিখিনি, কবিতা করেছিলাম। তাই সে কবিতার প্রতিফলন ইতিবাচক ভাবে আমি সমাজে দেখতে পাই এখন।
তাই আমার কানে বাজতে থাকে শ্রদ্ধেয় সুব্রত ভট্টাচার্য স্যারের সেই কথা-
‘শুধু কবিতা লেখলেই হবে না,
কবিতা করতেও হবে।’
আমি আশা করি এই একটি কথাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে বিশ্ব তারুণ্য গোটা বিশ্বকে সুন্দর করতে পারবে।
৫.
প্রিয় পাঠক, সুব্রত ভট্টাচার্যের লেখায় একটিই আহ্বান করা হয়েছে।
যে কথাটি স্যার সব সময় বলেন, যে কথাটির প্রতিফলন স্যারের পুরোজীবন জুড়েই দেখা যায় স্যারের চিন্তায়, চেতনায় এবং কর্মে। সেটি হলো-
”সুন্দর হও,
সুন্দর করো।”
আমি খুব সাধারন এবং ক্ষুদ্র। সে কারনে স্যারের লেখা গ্রন্থে লেখার দুঃসাহস এবং যোগ্যতার কোনটাই আমার নেই।
তাই এই লেখায় আমার প্রতি স্যারের দেয়া দিক নির্দেশনা গুলি আমাকে কিভাবে সুন্দরের পথে হাঁটতে অনুপ্রাণিত করে সেই বিষয়টি তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি পুরো লেখা জুড়ে।
আমি মনে করি যে কেউ ”সুন্দর হয়ে এসো করি সুন্দর” এই প্রবন্ধ গ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে নিজেকে সুন্দরের পথযাত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।


বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন এবং সুব্রত ভট্টাচার্য স্যারের সাথে আমাদের সখ্যতা
কৈলাশ রিপন

‘নতুন ভারত বেরুক। বেরুক লাঙ্গল ধরে,চাষার কুটির ভেদ করে, জেলে মালা মুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হইতে। বেরুক মুদিওয়ালার দোকান থেকে,ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে।….. এরা সনাতন দুঃখ ভোগ করেছে তাতে পেয়েছে অটল জীবনীশক্তি। এরা এক মুঠো ছাতু খেয়ে দুনিয়া উলটে দিতে পারবে; আধ খানা রুটি পেলে তৈলক্যে এদের তেজ ধরবে না; এরা রক্ত বীজের প্রাণসম্পন্ন। আর পেয়েছে অদ্ভুদ সদাচারবল, যা তৈলক্যে নাই। এত শান্তি, এত প্রীতি, এত ভালবাসা, এত মুখটি চুপ করে দিন রাত খাটা এবং কার্যকালে সিংহের বিক্রম।’
সত্যিকারের প্রগতি ও দেশপ্রেমের এই কথাগুলো স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘পরিব্রাজক’ গ্রন্থের ৬ ষ্ঠ খণ্ডে বলেছিলেন।
যাঁর কাছে প্রথম এই বাণীগুলো শুনি তিনি হলেন, সুব্রত ভট্টাচার্য স্যার। এমন একটা নাম যার প্রতি শ্রদ্ধা এক্কেবারে ভেতর থেকে আসে। যিনি অবহেলিত মানুষদের জন্য নিবেদিত প্রাণ। যার কাজে, আচরণে, কথায় প্রকাশিত হয় ধর্মের আসল বাণী। সবার উপরে জীব আর জীবের মধ্যে সবার উপরে মানুষ। যার কথা শুনলে হাজারো মানুষ শ্রদ্ধায় অবনত হয়। যিনি সকল জাতের ঊর্ধে, মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক, শিল্পী, সমাজ সংস্কারক, গবেষক, সাহিত্যিক, কবি আরও হাজার বিশেষণে বিশেষায়িত।
আজকের লেখাটা মধ্যখান থেকেই শুরু।
দিনটা এই বছরের শুরুর দিকের, ২৫ জানুয়ারি। ২৪ তারিখে হাসনাবাদে মানিক কাকার বাড়িতে অনুষ্ঠান শেষ করে আমার বাড়িতে সকালে এসেছিলাম বোন আদুরী রবিদাস , নিরব রবিদাস দাদা , লিটন রবিদাস দাদা, পরেশ রবিদাস কাকু, আদুরীর কাকা নয়ন রবিদাস।
আমার বাড়িতে পৌঁছেই ফোন করলাম সুব্রত স্যারকে। স্যারও তার পরিবেশ বান্ধব সাইকেল নিয়ে হাজির।
বাড়ির আঙ্গিনায় অনেকক্ষণ আড্ডা হল।
যদিও আগের রাতে সবাই সারারাত জেগেছিলাম কিন্তু স্যারের কথার মোহনীয় জাদুতে, অমৃতের স্বাদে কারো চোখেমুখে কোন ক্লান্তির ছাপ নেই। সেই আলোচনায় সব চেয়ে বেশি কৌতুহলী ছিলেন নিরব দা। তিনি যেন জীবনের প্রথম এই রকম কথা শুনতেছেন।লিটন দাদার অনেক অনেক প্রশ্ন ছিল। নিরব হয়ে শুনছিল আদুরীসহ বাকিরা। এরা সবাই সমাজ উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সবাই বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত। এক সাথে হতে পেরে, স্যারকে কাছে পেয়ে, সবাই অনেক খুশি। সব চেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছিল আমার মা-বাবা।
আমার বাড়ির আড্ডা শেষে সবাই মিলে চললাম স্যারের বাসার উদ্দেশ্যে। স্যারের বাসায় গিয়ে নিরব দাদার প্রকাশ ভঙ্গি অন্য রকম হয়ে যায়। তার কথাগুলো ছিল, ‘এটা একটা জাদুর ঘর, জাদুঘর। আমি অনেক জায়গায় ঘুরেছি কিন্তু দুনিয়াতে এমনও মানুষ আছে এখানে না আসলে জানতে পারতাম না।’ তিনি আবেগে অনেকটা কেঁদেই দিয়েছেন।
সবার কথা স্যার শুনলেন। সব চেয়ে ভাগ্যবান ছিল আদুরী। স্যার আদুরীকে অনেক আগে থেকেই মা ডাকেন। স্যারের মা নেই বলে আদুরী স্যারের মা আর আদুরীর বাবা গত হওয়ার পরে স্যারই তার বাবা। বাবা-মেয়ের সে কি স্বর্গীয় রসায়ন। আমাদের একটু হিংসেও হচ্ছিল।
স্যার যেমন সুন্দর বলেন, তার চেয়ে সুন্দর লেখেন। আদুরীকে নিয়েও স্যার একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতার নাম ‘আমাদের আর কষ্ট নেই’। স্যার আমাকে আগেই কবিতাটা দিয়েছিলেন কিন্তু আমি ইচ্ছা করেই আদুরীকে দেই নাই, ভাবছিলাম স্যার নিজে দিলে আদুরী বেশি খুশি হবে। স্যার আদুরীকে নিয়ে লেখা কবিতা নিজে আবৃত্তি করে শোনালেন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে কি অসাধারণ কবিতা! যে কবিতা কোলকাতার কবি দেবব্রত সিংহসহ অনেকের কাছেই সমাদৃত হয়েছে।
স্যারের বাসা থেকে সবাই আবার বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে, বিদায়ের আগে ফোন করলাম আরেক প্রিয় স্যার, যিনি জাতীয় পযার্য়ের আবৃত্তি শিল্পী, তার নিজেরও কবিতা আবৃতির একটি সংগঠন আছে ‘কথক’। আমাদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করেন, আমাদের বিপদে-আপদে পাশে থাকেন, নাগেশ্বরী সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রফেসর রেজাউল করিম রেজা স্যারকে। গত রাতে অনুষ্ঠানে ছিলেন বলে আগে জানাইনি,কিন্তু তিনি সব জেনে খুব বকলেন, আর খাওয়াটা জমা রাখলেন।
আসলে এই লেখা লিখতে গিয়ে অনেক নাম সামনে আসতেছে, কার কথা বলি ভেবে পাচ্ছি না। তবে ধীরে ধীরে সবার কথাই বলতে চাই। আজ এক দিকেই যাই।
আদুরী রবিদাস, জামলাল রবিদাস, মিলন রবিদাস, সুজন রবিদাসদের সাথে দেখা হয় প্রথম রংপুরের কাউনিয়ায় এক বিয়েতে। সেই বিয়ের খরচ বহন করেছিল আদুরী,মিলন দাদারা। আমি, রংপুরের এ্যাড. মনিলাল রবিদাসসহ কিছু টাকা ম্যানেজ করেছিলাম আর বাকীটা আদুরী,মিলন দাদারা। মধ্য রাতে আমরা বুঝতে পারি আরো প্রায় দশ হাজার মত টাকা লাগবে। সেই টাকা জোগারের সুত্র ধরেই আদুরী, মিলন দাদাদের সাথে কথা হয়। টাকা ম্যানেজও হয়ে যায়। ঘুমানোর জায়গা না থাকায় আদুরী, জামলাল কাকা, মিলন দাদা, সুজন রবিদাসদের সাথে সারারাত গল্প করি।
তাদের সাথে গল্পের প্রসঙ্গেই আমি স্যারের কথা বলি। সেই শুরু। এই কাজ থেকেই জন্ম হয় আমরা রবিদাস সন্তান(এআরএস) হোয়াটস অ্যাপ ভিত্তিক একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন ( এই সংগঠন নিয়ে আরেক দিন লিখবো)। এরপর একসাথে অনেক ছোট ছোট কাজ করার সুযোগ হয়েছে,হচ্ছে।

২.
আসলে আমাদের লক্ষ্য একটাই,বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, সম্মৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করা। এর জন্য অনেকেই কাজ করে যাচ্ছে, অনেক সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে, সেটা ধীরে ধীরে বলার সময় এসেছে। এখন আমাদের বলার সময় এসেছে, আমরা বলতে চাই; আমাদের দুঃখের কথা, কষ্টের কথা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা। তথা কথিত উচ্চ বর্ণের মানুষ,যারা আমাদের সাথে বৈষম্য করেছে,করছে; তার প্রতিবাদের কথা, আমরা জোড় গলায় বলতে চাই। তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-
‘বিশ্ব-সাথে যোগে যেথায় বিহারো,
সেই খানে যোগ তোমার সাথে আমারও।’
অবহেলিত রবিদাস, হরিজন, দলিত, আদিবাসি, পিঁছিয়েপড়া মানুষের কথা আমরা বলতে চাই। তাদের কথা বলার শক্তি আমরা দিতে চাই। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলতে চাই,
‘এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা;
এই-সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা।’

আলোকচিত্রে সুব্রত ভট্টাচার্য

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge