মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:১৮ পূর্বাহ্ন

সাক্ষাৎকার # একুশে পদকের সনদপত্র লেখা আমার জীবনের একটা বিশেষ পাওয়া-আবিদ করিম মুন্না

সাক্ষাৎকার # একুশে পদকের সনদপত্র লেখা আমার জীবনের একটা বিশেষ পাওয়া-আবিদ করিম মুন্না

# কেমন আছেন?
আবিদ করিম মুন্না: আলহামদুলিল্লাহ। রোজা চলছে। যদিও ছোটবেলায় মনে হতো যে রোজা নাকি ধরে, তো প্রথম কয়েকদিন মাথায় একটু চিনচিন করতো এখন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আসলে জীবনে নিয়মই এরকম যে মানুষ অভ্যাসের দাস। অভ্যাসের দাস বলেই এই যে কবি সাহিত্যিকদের যতই তাদের পরিবার বা প্রিয়জন থেকে চাপ দেওয়া হোক না কেন যে এই কবিতা লেখার কী দরকার কিন্তু এটা তার রক্তের মধ্যে মিশে গেছে আর কি। এটা সহজাতপ্রবৃত্তি যে এটা তাকে লিখতেই হবে। এরকম রোজা, আমাদের মাইন্ড বা ব্রেনে কমান্ড দিয়ে দিয়েছি যে ৩০টা রোজা বা ২৯টা রোজা আমাদের রাখতেই হবে। হ্যাঁ, ফরজ। যার কারণে যত কষ্টই হোক আমরা অতিক্রম করে যাই।

# এবার কর্মজীবনে আসি। কেমন চলছে? কী অবস্থা?
আবিদ করিম মুন্না: বাংলা একাডেমিতে আছি সহকারী সম্পাদক হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি উপবিভাগে।

# অমর একুশে বইমেলার তথ্যকেন্দ্র ও আবিদ করিম মুন্নার ভরাট কণ্ঠ এ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। আমরা জানি যে মেলায় ঢুকলেই অন্য অনেকের মাঝে যে ভরাট কণ্ঠটা কানে আসে, আমাদের উজ্জীবিত করে সেই কণ্ঠের মানুষের নাম অনেকেই না জানলেও যারা জানি তারা জানে যে তা আবিদ করিম মুন্নার। এ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। দীর্ঘদিন থেকে আছেন। এ সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছি যে আপনি কতটা উপভোগ করেন বা এ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা।
আবিদ করিম মুন্না: আসলে বইমেলা যখন চলে আমার কাছে মনে হয় যে সারাটা জীবন, প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেকটা মুহূর্তই যদি মেলা চলতো তাহলে খুব ভালো লাগতো। আসলে সেটা তো সম্ভব না। তারপরও গত ১৭ বছর বা ১৬ বছর যাই বলি না কেন, ১৭ বছরই হবে, আমি বইমেলায় প্রত্যেকটা দিনই ছিলাম। জরুরি কাজে হয়তো অফিসের বাইরে ছিলাম কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্য হলেও বইমেলায় উপস্থিত ছিলাম। এটা আমি গর্ব করেই বলতে পারি এবং তথ্যকেন্দ্রে ভয়েস দেবার যে কাজটি সেটা প্রত্যেক বছরই দায়িত্ব পালনেরসুযোগ হয়েছে। এজন্য আমি বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানাই যে তারা আমাকে এ সুযোগটি দিয়েছেন।

# তথ্যকেন্দ্রের উপস্থাপকদের কণ্ঠ বইমেলায় প্রাণচাঞ্চল্য ধরে রাখতে কোনো প্রভাব বিস্তার করে? আপনার অভিমত কী?
আবিদ করিম মুন্না: হ্যাঁ, বইমেলা যে চলছে, চলমান আছে এটা কিন্তু তথ্যকেন্দ্র থেকে যে কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ে তা বইমেলাকে ধরে রাখে। কিন্তু তথ্যকেন্দ্র থেকে যদি কিছুই প্রচার না হয়, একদম নীরব-নিস্তব্ধ তাহলে মনে হয় যেন মেলাটা মরে গেছে। তবে হ্যাঁ, যেদিন শত শত লোক, লাখো লোক মেলা প্রাঙ্গণে আসে বা বেরিয়ে যেতে থাকে সেদিন আমার মনে হয়, আমাদের কণ্ঠের চেয়ে তারা মেলাটা উপভোগ করতে ভালোবাসেন। কিন্তু সেদিনই তথ্যকেন্দ্র থেকে আমাদের গুরুদায়িত্বটা পালন করতে হয়। কেননা ঐদিনই কারো মোবাইল চুরি হয়ে যায়, কেউ বইয়ের প্যাকেট ফেলে যায়, কেউ বাচ্চা হারিয়ে ফেলেন, কেউ প্রিয়জনকে খুঁজে পান না। আর আশপাশে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল থাকায় মুমুর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্তের ব্যাপক চাহিদাও থাকে। ঐদিনই নতুন নতুন বই প্রকাশকরা বেশি জমা দেন। তারা বেশি বেশি, লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে তার বইটি প্রচারের জন্য বই জমা দিয়ে থাকেন তথ্যকেন্দ্রে। প্রকাশকেরা চান যে লক্ষ মানুষের কাছে বইটির বহুল প্রচার। বই বিক্রি হোক বা না হোক ঘোষণাটি কিন্তু তাদের কানে পৌঁছে যায়। কাজেই ওই সময়টা আমার মনে হয়ভয়েস প্রদান অতীব জরুরি।

# তথ্যকেন্দ্রে কাজের মজার বা স্মরণীয় কোনো ঘটনা বা অভিজ্ঞতা?
আবিদ করিম মুন্না: তথ্যকেন্দ্রে কাজের মজার অভিজ্ঞতা অনেক আছে। এই মুহূর্তে আমার নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো স্মৃতি তেমনভাবে মনে না পড়লেও বইমেলা ২০২৩-এর সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম (লাবীন), তিনি একবার তথ্যকেন্দ্রের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ঐ সময় বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ও ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তিনি উপস্থিত ছিলেন। তো হন্তদন্ত করে এক বিদেশি লোক এলেন। মুজাহিদ স্যারকে সামনে পেয়ে বিদেশি ভদ্রলোক বললেন যে, ‘Do You Know Where is Anku Puchkahani?’ অনেক চিন্তা করেও যখন মুজাহিদ স্যার কোনোসঠিক উত্তর দিতে পারলেন না কিন্তু সৈয়দ আনোয়ার হোসেন স্যার ধরতে পেরেছেন যে তিনি আসলে কী শুনতে চাচ্ছেন? আসলে ‘Do You Know Where is Anku Puchkahani?’ মানে ‘Do you know Where is Angkur Prokashoni (অঙ্কুর প্রকাশনী)?’ আসলে আনোয়ার হোসেন স্যারই কিন্তু ওই বিদেশি ভদ্রলোককে জবাব দিয়েছিলেন যে আপনি আসলে এই প্রকাশনী খুঁজছেন। আসলে সেটি সঠিক ছিল। তো এই ঘটনাটি যখন মুজাহিদ স্যার আমাদের একদিন তথ্যকেন্দ্রে বললেন তখন সবার মাঝে হাসির রোল ছড়িয়ে পড়লো। আরেকটি ঘটনা তথ্যকেন্দ্র থেকে শোনা। একবার এক মেয়ে এসে বললো, ‘আমি কী কারণে বাঁচবো’। আসলে এরকম নামে একটা বই সে খুঁজতে এসেছিল। এরকম আরো অনেক হাসির ঘটনা ঘটে যায় যা চোখের অন্তরালে রয়ে যায়।

# আমরা অনেকেই জানি আপনি একজন বইমেলা বুলেটিন সংগ্রাহক। কতদিন থেকে সংগ্রহ করছেন?
আবিদ করিম মুন্না:২০০৭ সাল থেকে সংগ্রহ করছি। ‘আনন্দ আলো বইমেলা বুলেটিন’ তারা প্রতিদিনই বুলেটিন প্রকাশ করেছে। মাঝে বইমেলা বন্ধ হয়ে যাবে এরকম একটা শঙ্কায় তারা প্রকাশ করেনি একদিন। আমার মনে আছে এবং হঠাৎ করে মেলা আবার চলমান থাকার কারণে তারা শেষ পর্যন্ত আর দুটি সংখ্যা করেনি। কিন্তু আমার জানামতে ‘আনন্দ আলো বইমেলা বুলেটিন’ যেটি ‘চ্যানেল আই’ এর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয় ইমপ্রেস টেলিফিল্ম থেকে ফরিদুর রেজা সাগরের নির্দেশনায় আমার এটির সব সংখ্যাই সংগ্রহে আছে। এবার সম্ভবত তাদের ১৬ বছরের সংখ্যা বের হলো। ১৭তম বর্ষে তারা পা দিলো। ১৭তম বর্ষের কাজ তারা শেষ করলো। তো আমার মোটামুটি গত ১৭-১৮ বছরের যতগুলো বুলেটিন হাতে এসেছে তা সবই সংগ্রহে আছে। আমি যদি উল্লেখ করার মতো কিছু বলি পাতাপ্রকাশ, ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে একটা করতো সেটাও আমার সংগ্রহে আছে। ডাকপিয়ন নামে একটা বুলেটিন ছিল, বাবুই বইমেলা বুলেটিন করেছে, আরো অনেকে করেছে যা এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না। তারপরে এবার বেরিয়েছে‘সাড়ে তিনদিনের পত্রিকা’। তারা সাড়ে তিনদিন পর পর বের করেছে। আপনারা জানেন যে, ২৮ দিনে সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাস। মাঝে মাঝে চার বছর পরপর লিপ ইয়ার থাকলে ২৯ দিন। দেখা যাচ্ছে যে, ২৮ দিনে সাড়ে তিনদিন পরপর মানে আটটা পত্রিকা বের করা সম্ভব। এবার প্রথমবারের মতো তারা বের করেছে এবং আমার কাছে মনে হয়েছে যে, পত্রিকার জগতে এবং বুলেটিনের জগতে নতুনত্ব কাকে বলে তা ওরা দেখিয়ে দিয়েছে। তবে ‘আনন্দ আলো প্রতিদিন’ যে ফরমেটে বের হচ্ছে সেটা খুব ভালো। কারণ একটা পত্রিকা চালাতে গেলে বিজ্ঞাপন দরকার, অনেক কিছু দরকার। একটা বুলেটিনে কিন্তু ১৬ বছরের সব স্মৃতি আমরা খুঁজে পেয়েছি এবং ধরে রাখতে পেরেছি। কবি আল মাহমুদের কথা মনে পড়ে। একবার তিনি মেলায় ঢুকলেন মারা যাবার দুই-তিন বছর আগে। সবাই তাকে মালা দিতে দিতে এমন একটা পর্যায়ে উপনীত হলো যে শুধু তার চশমা আর মুখাবয়ব দেখা যাচ্ছিল। হুমায়ূন আহমেদের কিছু এক্সক্লুসিভ ছবি তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন সেগুলো ছাপা হয়েছে সংগ্রহে আছে। আরো অনেক লেখকের কথা মনে আছে সমুদ্র গুপ্ত,আনিসুজ্জামান, শামসুজ্জামান খান, সৈয়দ শামসুল হক এঁদের কথা আমার মনে আছে। তবে শামসুর রাহমানকে পাইনি। কিন্তু ‘আনন্দ আলে বইমেলা বুলেটিন’ যে কাজটি করেছে তারা ১৬ বছরে তাদের পত্রিকার মাস্ট হেড এর বাম পাশে মারা যাওয়া বিখ্যাত ব্যক্তিদের স্মরণ করেছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, জয়নুল আবেদিন, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমন কালজয়ী ব্যক্তিদের স্মরণ করেছে।

# আপনি বললেন যে একবার বইমেলা বন্ধের শঙ্কায় ‘আনন্দমেলা বইমেলা বুলেটিন’ একদিন প্রকাশ করেনি। বইমেলা বন্ধের শঙ্কাটা কেন দেখা দিয়েছিল?
আবিদ করিম মুন্না: সাধারণত প্রতিবছর বইমেলায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। খুব সম্ভবত মেলা লণ্ডভণ্ডহয়ে যাবার কারণে তারা ভেবে নিয়েছিল যে মেলা বোধ হয় আর হবে না। তখন মেলার দুইদিন বাকি ছিল মনে হয়। আর মেলার দুঃখ যদি বলি, মেলায় একবার আগুন লেগে স্টল পুড়ে গিয়েছিল। প্রকাশকদের কান্না দেখেছি আমি নিজ চোখে। ঝড়েলণ্ডভণ্ড হয়ে গেলে বই নষ্ট হয়ে যায় সেটা দেখেছি। প্রত্যেক বছর তথ্যকেন্দ্রে, শেষ ৪-৫ বছরে আমি নিজ থেকেই একদম প্রথম দিন থেকেই বলি, আপনারা সতর্ক থাকুন। যে কোনো মুহূর্তে বিরূপ আবহাওয়ার মুখোমুখি আমরা হতে পারি। আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা ভালো।অপপরফবহঃকথাটি যদিও ডিকশনারিতে আছে তবুও মনে করি এর জন্য আমরা দায়ী। তো ভাগ্যকেও আমাদের বিশ্বাস করতে হবে।

# বইমেলা বুলেটিন সংগ্রহের চিন্তাটা কোথা থেকে এসেছিল? কেন এসেছিল?
আবিদ করিম মুন্না: নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ-এর কথা বলবো। কেননা আমি এবং কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ, আমরাই বোধহয় রংপুরে একমাত্র জুটি ছিলাম যারা আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে বা তারও আগে আমি যখন লেখাপড়া শেষ করে চাকরি খুঁজছি সে সময়টায় আমার অভ্যাস ছিল রংপুর প্রেসক্লাবে গিয়ে নতুন পত্রিকাটি মানে যেটা ঢাকা থেকে আসতো তার আমি প্রথম পাঠক হতাম বা নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ। আমাদের পত্রিকা পড়া শেষ হলেও দেখা যেত যে রংপুরের স্থানীয় দৈনিক যেমন দাবানল, বিজলী,আখিরা, যুগের আলো (যুগের আলো অবশ্য তার সময় মতোই বেরিয়ে যেতো) স্থানীয় পত্রিকাগুলো প্রেসক্লাবে আসতো না। তখন আমি আর কাব্যবিনোদ নানা হেঁটে হেঁটে দাবানলে যেতাম। দেখতাম যে কেবল পেস্টিং, প্লেট হচ্ছে। তারপরে ছাপা হতো। ২০০ কপি ছাপা হতো হয়তো কিংবা ৫০০ কপি। আমরা নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে ছাপা দেখতাম। ছাপিয়ে সেটা নিয়ে আসতাম। ঐ সময় দেখা যেত, আমার লেখা ছাপা হতো সেই পেপার বা নানা আমাকে কোনো পত্রিকা উপহার দিতেন সেগুলো জমিয়ে রাখতাম। পত্রিকাটা জমিয়ে রাখার নেশা কিংবা আমাদের লেখা ছাপা হলে কখনো কখনো ১০ কপি কিনতাম বা পাঁচ কপি কিনতাম। দুই কপি তো কিনতামই। এই যে জমিয়ে রাখার একটা অভ্যাস এগুলোই আসলে উদ্বুদ্ধ করেছিল আমাকে পত্রিকা জমাতে। এখনো আমার অনেক বইপত্র, পত্রিকা, বইমেলা বুলেটিন সংগ্রহে আছে।

# আপনার মতে বইমেলার সাথে বইমেলা বুলেটিনের সম্পর্ক কীরূপ?
আবিদ করিম মুন্না: আসলে ‘বইমেলা এবং বইমেলা বুলেটিন পরিপূরক’ এজন্য বলব যে, আমি যদি আজকে ২০১৩ সালের বইমেলার কথা মনে করতে চাই তাহলে আমার মেমোরিতে কিছুই আসবে না। কিছুই মনে করতে পারবো না হয়তো। বিশেষ করে যারা করোনাতে আক্রান্ত হয়েছে কিছুই মনে করতে পারবে না। আমি যেমন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম কিছুই মনে করতে পারবো না। একটা বয়স আছে। তো ২০১৩ সালের ঘটনা আমি দেখতে চাইলে হয়তো ফেসবুকে যেতে হবে বা ওয়েবসাইটে যেতে হবে। কিন্তু আমার যদি ঐ বুলেটিন সংগ্রহে থাকে, আমি সুন্দরভাবে চলে গিয়ে ঐদিন অমুক তারিখের ধরুন ২০১৩ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি কোন উল্লেখযোগ্য বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছিল, উল্লেখযোগ্য কোন বইগুলো বের হয়েছিল, কোন বিখ্যাত লেখক ঐদিন মেলায় এসেছিলেন এমন কোনো না কোনো রেকর্ড, কিছু না কিছু তথ্যআমি পাবো কিংবা ঐদিন বাংলা একাডেমিতে কী অনুষ্ঠান হয়েছিল, কোন বিষয়ে অনুষ্ঠান ছিল, কারা সেখানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন এই তথ্যগুলো আমি নিমিষেই বের করতে পারবো। কাজেই বইমেলা এবং বইমেলা বুলেটিন একে অপরের পরিপূরক মনে করি।

# ভাইয়া, একটা কবিতার যেমন ছন্দ থাকে, উপমা থাকে, অলঙ্কার, মাত্রা থাকে তেমন বইমেলা বুলেটিনকে আপনি বইমেলার কি বলবেন?
আবিদ করিম মুন্না: আমি বলব যে বুলেটিন বইমেলার প্রাণ।এটাও একটা প্রাণ। বিকাল চারটা বা পাঁচটার দিকে যখন বুলেটিন আসে অনেকেই তা সংগ্রহের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তো। যদিও এটা নির্জীব বস্তু তবুও একটা প্রাণ। আমার কাছে একটা প্রাণের মতোই মনে হয়?

# আপনার বিশাল সংগ্রহের মধ্যে থেকে এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ দু-একটা সংখ্যা সম্পর্কে জানতে চাই?
আবিদ করিম মুন্না: আমার বইমেলা বুলেটিনটার নাম মনে নেই। রাকিব হাসান গোয়েন্দা কাহিনির লেখক, প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন (লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবার অনেক বছর পরে) সেটা। সম্ভবত রণক ইকরাম নামের এক লেখক তার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। সংখ্যাটার কথা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। এটা আর ‘আনন্দ আলো বইমেলা বুলেটিন’-এর একটা সংখ্যার কথা মনে পড়ে। অবশ্যই এক্সক্লুসিভ এজন্য যে ফজল শাহাবুদ্দীন নামে আমাদের একজন কালজয়ী কবি ছিলেন। হয়তো অনেকেই জানেন যে যারা ডায়েরি লিখতাম বা যারা লিখি, হারুন ডায়েরি তার প্ল্যানিংয়ে বের হতো। মতিঝিলের দিকে তার একটি স্টেশনারির দোকান ছিলো। সেই ফজল শাহাবুদ্দীন মারা যাওয়ার পর ‘আনন্দ আলো বইমেলা বুলেটিন’ এক পাতায় সাদাকালো ছাপায়, পেছন দিকে সাদা তাঁর স্মরণে একটি স্পেশাল বুলেটিন বের করেছিল মেলা চলাকালীন। এটা আমার এখনো মনে পড়ে। আমি বাইন্ডিং করে রেখেছি।

# আপনি কি মনে করেন এগুলো একসময় দুষ্প্রাপ্য দলিল হিসেবে গণ্য হতে পারে?
আবিদ করিম মুন্না: দুষ্প্রাপ্য দলিল হিসেবে অবশ্যই বিবেচিত হবে এবং এগুলো নিয়ে একটা বই করার পরিকল্পনা করছি। হয়তো বাংলা একাডেমি বা চ্যানেল আই কিংবা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম বা আনন্দ আলো তারা হয়তো এগিয়ে আসবে। পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ চলছে। আমি এবং আর একজন বিখ্যাত ছড়াকার এই দুইজন মিলে। তাঁর নাম আপাতত বলছি না এই মুহূর্তে। পরবর্তীকালে সম্পাদনা পর্ষদে আরও অনেকেই যুক্ত হতে পারেন। আমার সব সংগ্রহ সেই ছড়াকারের কাছে আছে। সেই ছড়াকারের নামটি বলছি না বিশেষ কারণে। তো আমি এ কথাটি আপনাদের জানাচ্ছি যে আমার সব সংগ্রহ আমার কাছে আছে কিন্তু এই মুহূর্তে আমার সব সম্পদ সেই ছড়াকারের কাছে। হয়তো কেউ কেউ নামটি জেনে থাকবেন কিন্তু আমি এখনই মিডিয়াতে বলতে চাচ্ছি না। মহামারি করোনার শুরু থেকেই তিনি তাঁর বাসায় পাণ্ডুলিপি তৈরি করছেন।

# আপনার সংগ্রহশালা নিয়ে ইতোমধ্যে কি কোনো কাজ হয়েছে মানে কোনো নিউজ হয়েছে কি প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়?
আবিদকরিম মুন্না: হ্যাঁ, অমর একুশে বইমেলা ২০২৩-এ ‘সাড়ে তিনদিনের পত্রিকা’ শেষ সংখ্যায় যেটি ২৭ ফেব্রুয়ারি বের হয়েছিল মানে মেলায় এসেছিল সেখানে আমাকে নিয়ে ছবিসহ একটা ফিচার করেছে। যেটার নাম হচ্ছে ‘১৭ বছর ধরে সংগ্রহ করছেন বইমেলা বুলেটিন’। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ তারাই প্রথমবারের মতো আমাকে নিয়ে একটা ফিচার করলো। এছাড়া আমার খুব ইচ্ছে আছে বুলেটিনগুলো নিয়ে একটা প্রদর্শনী করার। হয়তো বইমেলাতে কিংবা যেখানে সুযোগ পাবো করার সেখানেই। আর ফেসবুক তো আছেই, সেখানে প্রতিবছর বইমেলা চলাকালীন নানা ধরনের স্ট্যাটাস সোশ্যাল মিডিয়ায়প্রচার করে থাকি।

# বইমেলা বুলেটিনে আপনার লেখালেখি?
আবিদ করিম মুন্না: আমি মোটামুটি বুলেটিনে ২০১০ সালের পর থেকেই লিখছি বিশেষ করে ‘আনন্দ আলো বইমেলা বুলেটিন’। তারা প্রত্যেক সংখ্যায় আমার লেখা ছেপেছেই।আর ‘পাতা প্রকাশ’তো আমার লেখা লিড করেছে বেশ ক’বছর ধরেই। এ কারণে তাদের কথা বিশেষ করে বলতে চাই। আমাকে সুযোগ দিয়েছে মনের মতো লেখার জন্য। যথেষ্ট স্পেস দিয়েছে যার কারণে মনের মতো করে লিখতে পেরেছি। মেলার সব বুলেটিনে আমি কমবেশি লেখার চেষ্টা করেছি।মোটামুটি বইমেলার স্মৃতি নিয়ে লেখবার চেষ্টা করেছি। আমি প্রত্যেক বইমেলায় যে কাজটি করেছি তা হলো আগের বইমেলায় বিখ্যাত কাদের হারিয়েছি তাঁদের নিয়ে লেখার। সমাপনী দিনে ‘আজ পর্দা নামছে বইমেলার’ বা ‘আগামীকাল থেকে প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হবে না বইমেলা’ এরকম টাইটেলেও লিখেছি প্রায় প্রতিমেলাতে।

# এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আমরা আপনাকে সাদা মনের মানুষ হিসেবে চিনি এবং জানি। উত্তরাঞ্চলের সাহিত্যিক তথা সবার কাছে বইমেলায় এলে আপনার বন্ধুবৎসলের রূপটা আরো বেশি করে ধরা দেয়। আপনার চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্যটা কি পারিবারিকভাবেই পাওয়া?
আবিদ করিম মুন্না: এটা অবশ্যই পারিবারিকভাবে পাওয়া। তবে এটিএন বাংলার রংপুর প্রতিনিধি বিশিষ্ট সাংবাদিক, দৈনিক দাবানলের একসময়ের তুখোড় বার্তা সম্পাদক কবি ও সাংবাদিক মাহবুবুল ইসলাম তিনি আমাকেঅনেক কিছু শিখিয়েছেন। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘চাচা, আমি বাংলা একাডেমিতে চাকুরির সুযোগ পেয়েছি। কর্মজীবনে যোগ দিতে যাচ্ছি। আপনার কিছু বলার আছে কিনা?’ তিনি আমাকে শুধু একটি কথাই বলেছিলেন,‘তোমার কাছে যে অতিথিই যাক না কেন বিশেষ করে রংপুরের যদি কেউ যায় তাহলে তাকে পারলে বিরিয়ানি খাইয়ে দিও আর না পারলে অন্তত এক কাপ চায়ের অফার করো। কতই আর লাগবে! ৫ টাকা।’ এখন হয়তো দশ টাকা লাগে চা খেতে (প্রকৃতপক্ষে পান হা হা হা…)। আমি চেষ্টা করি কোনো অতিথি এলে সমাদর করার। ব্যস্ততার কারণে সেটাও যদি না পারি তাহলে হাসিমুখে কথা বলে বিদায় জানাই।

# ধন্যবাদ এক্ষেত্রে আমিও ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাই মাহবুবুল ইসলাম ভাইকে। তিনি আমারও শিক্ষক। তাঁর কাছে আমি সাংবাদিকতা শিখেছি। এখন আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে আপনি কি বলবেন? সংক্ষেপে জানতে চাই?
আবিদ করিম মুন্না: পরিবার বলতে (তাঁর বাবার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়াতে) আমার বাবা অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম।কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ২০০৩ সালে অবসরগ্রহণ করেন। রংপুর সরকারি কলেজেও দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর যাত্রাই শুরু হয়েছিলো রংপুর কলেজ দিয়ে যখন সেটি বেসরকারি কলেজ ছিল। তিনি ২০১৬ সালে ২০শে আগস্ট ইন্তেকাল করেন। আমার মা এখনও আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছেন। আমার সহধর্মিণী রাবেয়া সরকার রত্না। তিনি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, খোলাহাটি, পার্বতীপুর, দিনাজপুরের বাংলারসহকারী অধ্যাপক। আমাদের এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলে রাইয়ান রাফাত করিম পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে খোলাহাটি ক্যান্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজেএবং মেয়ে রাইসা আবিদ রীতি রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

# শুভকামনা আপনার পরিবারের জন্য, আপনার জন্য। আবারও সাহিত্যের দিকে আসা যাক। আপনি একজন লেখক ও সম্পাদক। আপনার সম্পাদনায় প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে ‘তিস্তাপারের গল্প’ ও দেশের ৮০ জন চিকিৎসকের অডাক্তারি বিষয়ক লেখা নিয়ে ভিন্নধর্মী বই‘স্টেথোস্কোপ রেখে কিবোর্ডে’ বেশ সাড়া ফেলেছিল। পাতা প্রকাশের বেস্ট সেলার বই এ দুটো। লেখালেখি বিষয়ে আপনার পরবর্তী পরিকল্পনা কী? জানতে চাচ্ছি লেখক ও সম্পাদক আবিদ করিম মুন্নার পরবর্তী পরিকল্পনা কী?
আবিদ করিম মুন্না: আসলে খুব পড়াশোনা করছি (একটি বিশেষ বিষয় নিয়ে)। আমার কিছু পরিকল্পনা আছে। কিছু ভালো বই লিখতে চাই। সেটার জন্য ব্যাপক পড়াশোনা করেই লিখবো। আপাতত বলতে চাচ্ছি না কোন বিষয় নিয়ে কাজ করছি সে সম্পর্কে।

# আপনি ইদানীং বইয়ের নামলিপিও করে থাকেন। শুধু করে থাকেন বলবো না, বেশ ভালোভাবেই করেন। এ কাজে কিভাবে আসা?
আবিদ করিম মুন্না: আমাদের কাগজের দোকান মানে স্টেশনারির দোকান আছে। যেহেতু কাগজ ও কলমের দোকান (প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাওয়াতে) ‘হক প্রিন্টিং ওয়ার্কস’ আমাদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আমার বাবার হাত দিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল। একসময় সাইকেলের দোকান ছিল সেটি। ‘জেমস সাইকেল মার্টস’ নামে রংপুর শহরের পায়রা চত্বরের শহিদ মোবারক সরণিতে যেটি সেন্ট্রাল রোড নামে পরিচিত। যখনই ক্যাশ-এ গিয়ে বসতাম বা দোকানে থাকতাম আমার অভ্যাস ছিল যে কাগজ সামনে থাকলেই আমি লিখতেই থাকতাম, লিখতেই থাকতাম। বিশেষ করে প্রয়াত সাংবাদিক মানিক সরকার মানিক, তাঁর হাতের লেখা এতো সুন্দর ছিল যে কী বলবো। তিনি আমাদের পাশের দোকানে আসতেন। তিনি লিখতেন আর আমি দেখতাম। তাঁর মতো লেখার চেষ্টা করতাম। আমি চার-পাঁচজনের নাম বলছি যাঁদের হাতের লেখা আমার পছন্দ। চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন, বর্ণসজ্জার মুকুল মোস্তাফিজুর রহমান, এটিএন বাংলার সাংবাদিক মাহবুবুল ইসলাম, ছড়াকার আশাফা সেলিম প্রমুখ। এই কয়জনের হাতের লেখা আমাকে খুব আকৃষ্ট করতো। আমি তাঁদের মতো লিখতে চাইতাম। অবশ্য সেলিম ভাইয়ের সাথে অনেক পরে পরিচয় কিন্তু মুকুল মোস্তাফিজ বা মোনাজাতউদ্দিন তাঁদের হাতের লেখার সাথে অনেক আগে থেকেই আমার পরিচয় ছিল। লিখতে লিখতেই আমার এই অভ্যাস হয়ে গেছে আর কি। তখন থেকেই এই কাজ করা আর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার একুশে পদকের সনদপত্র তিনবছর ধরে লিখছি এটা আমার জীবনে একটা বিশেষ পাওয়া।

# আমি শুনেছি জাদুঘরে আপনার লেখা সনদপত্রটি…

আবিদ করিম মুন্না : হ্যাঁ ঠিকই শুনেছো, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের দোতলার ২২১ নম্বর রুমের ২১ নম্বর গ্যালারিতে আমার হাতে লেখা সনদটি প্রদর্শিত হচ্ছে।

# এ পর্যন্ত আপনার নামলিপি করা বইয়ের মধ্যে জনপ্রিয় বা স্মরণীয় দু-একটা বইয়ের নাম বলুন?
আবিদ করিম মুন্না : সঠিকভাবে মনে পড়ছে না। তারপরেও তোমার বইটা (নৌকার পাটাতনে ঘুমায় প্রহর), তারপর আইডিয়া প্রকাশনার একগুচ্ছ নামহীন কবিতা, নবান্ন প্রকাশনীর কবিতার বরপুত্র শহীদ কাদরী, বিদ্যাপ্রকাশের ধুতুরা জোছনার দিন, পাতাপ্রকাশের প্রেমের ১০০ কবিতা উল্লেখযোগ্য।

# যাহোক, আমরা শেষের দিকে চলে এসেছি। আপনাকে যদি বলি বাংলা একাডেমির একজন কর্মকর্তা আবিদ করিম মুন্না নাকি লেখক ও সম্পাদক আবিদ করিম মুন্না কিংবা পরিবারের কাছে যে আবিদ করিম মুন্না কোনটাকে আপনি প্রথমে রাখবেন?
আবিদ করিম মুন্না : আসলে মানুষ যখন আমাকে আবিদ করিম মুন্না বলে ডাকে, আমি তখন মনে করি যে আমার নামটা সার্থক হয়েছে আর কি। (হাসি)

# আপনার সুস্থ ও সুখী জীবন কামনা করছি। পাতাপ্রকাশকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আবিদ করিম মুন্না: ধন্যবাদ। আবারো নিশ্চয়ই কথা হবে আমাদের। আপনি এবং আপনারাও ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
************************************************************************************************
পাদটীকা: আমি (সোমের কৌমুদী) শ্রদ্ধা জানাই প্রয়াত সাংবাদিক মানিক সরকার মানিককে। তাঁর কাছেই আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। তাঁর কাছে পাওয়া স্নেহ-ভালোবাসার কাছে ঋণী। ওপারে ভালো থাকুন স্যার।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সোমের কৌমুদী

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge