মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ন

রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ড-রেজাউল করিম মুকুল

রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ড-রেজাউল করিম মুকুল

রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ড
রেজাউল করিম মুকুল

উপমহাদেশে প্রথম জেল হত্যাকাণ্ডটি ঘটে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে। রাজবন্দীদের ওপর চালানো গুলিতে সেদিন সাতজন রাজবন্দী শহীদ হন। অন্য রাজবন্দীদের প্রায় সবাই কমবেশি আহত হন। নির্মম এ ঘটনাটি প্রথম জনসমক্ষে আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় দিবসটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে সাধারণ মানুষ।
১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলের খাপড়া ওয়ার্ড থেকে আটজন রাজবন্দীকে কনডেমড সেল বা ফাঁসির আসামীর নির্জন সেলে স্থানান্তরিত করার সময় রাজনৈতিক বন্দিরা প্রতিবাদ করেন। এছাড়াও ভালো খাবার ও কারাবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুযোগ না দেওয়া এবং খাপড়া ওয়ার্ডে ১১ জন রাজবন্দীকে জোরপূর্বক আটকে রাখার প্রতিবাদ করেন জেলবন্দীরা। এসময় ইনস্পেক্টর জেনারেল অব প্রিজন্স রাজশাহী জেলখানা ভিজিটে আসলে জেলবন্দীদের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্হা করা হয়। রাজবন্দীদের পক্ষে আলোচনায় প্রতিনিধি থাকেন কমরেড আবদুল হকের নেতৃত্বে ১২ জন প্রতিনিধি। তাদেরকে জেলগেটে দাঁড় করিয়েই আলোচনা শুরু করার চেষ্টা চালায় আইজি প্রিজন্স। কিন্তু জেলবন্দী প্রতিনিধিরা বসার ব্যবস্থা না হলে আলোচনা করবেন না বলে জানান। ফলে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের বসার ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। প্রতিনিধিগণ জেলখানার ভিতর কারাবন্দীদের ওপর বিভিন্ন মানবিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এতে রাজশাহী কারা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপে যান। আইজিপি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিনিধিদের বলেন যে, তারা কয়েদির সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে কেন? প্রতিনিধিরা বলেন, গণতান্ত্রিক কর্মী হিসাবে এটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই কথায় আইজি প্রিজন আরও চটে যায়। তিনি জেলখানা ত্যাগ করার সময় এই প্রতিনিধিসহ ১৪ জনকে কনডেম সেলে স্থানান্তরিত করার আদেশ দেন। কারা কর্তৃপক্ষের এই অন্যায় হুকুম কারাবন্দীরা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ১৯৫০ সালের এই ২৪ এপ্রিল কারাবন্দীরা এই সমস্যা নিয়ে নিজেরাই আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। আলোচনায় সভাপতিত্ব করেছিলেন কমরেড হানিফ শেখ। এ সময় জেল সুপার মিঃ বিলের নেতৃত্বে ২ জন ডেপুটি জেলারসহ পঁচিশ/ত্রিশ জনের একটি দল খাপড়া ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ে। জেল সুপার বিল সরাসরি কমরেড আবদুল হক’র সামনে যেয়ে বলে, “হক, প্রস্তুত হন। আপনাদের কাউকে কাউকে পৃথক করা হবে, বন্দীরা প্রতিবাদ জানালে মিঃ বিল চিৎকার করে ওয়ার্ডের বাইরে বের হয়ে বাঁশিতে হুইসেল দেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৪০ জন সেপাই বাঁশের লাঠি নিয়ে কারাবন্দীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিরস্ত্র বন্দীদের ওপর চলতে থাকে এক বিভৎস তান্ডব। কিছুক্ষণ পরেই সেপাইরা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় এবং জানালা দিয়ে শুরু করে নির্মম গুলিবর্ষণ।
সেদিনের ঘটণায় নিহত আনোয়ার হোসেন, (১৯৩০ – ২৪ এপ্রিল, ১৯৫০) ছাত্রনেতা, কমরেড আবদুল হককে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তাকে বাঁচানোর জন্য কমরেড আনোয়ার আবদুল হককে ঠেলে সরিয়ে দিলে সেই গুলিতেই কমরেড আনোয়ার শহীদ হন। বিজন সেন, (১৯০৫- ২৪ এপ্রিল, ১৯৫০) শ্রমিক নেতা, কম্পরাম সিং, (১৮৮৭-২৪ এপ্রিল ১৯৫০) তেভাগা আন্দোলনের প্রবীন নেতা বালিয়াডাঙ্গি ঠাকুরগাঁও এর এক তরুন বিপ্লবী। সুধীন ধর, (১৯১৮- ২৪ এপ্রিল ১৯৫০) পাবনার মোহিনী কটন মিলের সংগঠক, হানিফ সেখ, (১৯২৪-২৪ এপ্রিল ১৯৫০) মোহিনী মিলের শ্রমিক, দিলওয়ার হোসেন, (১৯২৬-২৪ এপ্রিল ১৯৫০) কুষ্টিয়ার রেলশ্রমিক। সুখেন ভট্টাচার্য, (১৯২৮-২৪ এপ্রিল ১৯৫০) ময়মনসিংহের ছাত্র সংগঠক। খাপড়া ওয়ার্ডের সেদিনের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন আবদুল হক, বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম, মনসুর হাবিব, ভুপেন পালিত, অমূল্য লাহিড়ী এবং নুরুন্নবী চৌধুরী। সেদিন জেল পুলিশের গুলিতে আবদুল হকের বাম হাতটি দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় এবং মনসুর হাবিবের জানু ও বাহুতে গুলি লাগে। নুরুন্নবী চৌধুরীর পা কেটে ফেলে দিতে হয়। বাকী চারজনও গুরুতর আহত হন।
বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলছেন, ” এই বিল সাহেবই ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে রাজবন্দীদের গুলি করে কয়েকজন দেশপ্রেমিককে হত্যা করেছিলেন।” এই খাপড়া ওয়ার্ডে ছিলেন কমরেড হক। তাঁকে বাঁচাতে জীবন দেন আনোয়ার সহ কয়েকজন। বঙ্গবন্ধু লিখছেন, “১৯৫০ সালে রাজশাহী কারাগারে খাপড়া ওয়ার্ডের কামরায় বন্ধ করে রাজনৈতিক বন্দিদের উপর গুলি করে সাতজনকে হত্যা করা হয়। যে কয়েকজন বেঁচেছিল, তাদের এমনভাবে মারপিট করা হয়েছিল যে, জীবনের তরে তাদের স্বাস্থ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল।” ভারত বিভক্তের পর ১৯৪৮ সালে ৬ মার্চ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। এই পার্টির মূল দায়িত্ব পান আব্দুল হক। সেইসময় তিনি বার বার গ্রেফতার হন। দীর্ঘ সময় কারাগারে অন্তরীণ করে রাখা হয় তাকে। ১৯৫৬ সালে জেল থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন।
জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৭ সালের মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৭ মাস রাজবন্দি হিসেবে রাজশাহীর এই কারাগারে ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা বর্তমান রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদ। তিনি ছিলেন পদ্মা ওয়ার্ডে। ছবিতে নৌকায় বঙ্গবন্ধু ও সোহরাওয়ার্দ্দির সাথে সেই কমরেড আব্দুল হক, এই খাপড়া জেলহত্যাকান্ড নিয়ে তানভির মোকাম্মেল এর সিনেমা রুপসা নদীর বাঁকে এর পোস্টার।

২৪ এপ্রিল, ২০২১খ্রিঃ।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge