সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৫:০০ পূর্বাহ্ন

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল : বহুযুগের ওপার থেকে-অশোক কুমার ভদ্র

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল : বহুযুগের ওপার থেকে-অশোক কুমার ভদ্র

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল : বহুযুগের ওপার থেকে
অশোক কুমার ভদ্র

১৯৬৬ সালে বৃহত্তর রংপুর জেলার জলঢাকা থানার তৎকালীন রাজনীতিবিদ মরহুম কাজী কাদের ও রংপুরের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের চেষ্টার ফসল আজকের রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। তাঁদের অনমনীয় ও সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণের ফলে তৎকালীন সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইউব খানের আমলে রংপুরের জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে রংপুর মেডিকেল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান কর্তৃক রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির জন্য খ্যাত রংপুরের ধাপ এলাকার চিকলিতে পর্যায়ক্রমে গড়ে ওঠে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস।
১৯৭০ সাল। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। এ সময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মেজর (অব.) ডা. আহমেদ আলী চৌধুরীকে রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল কাম প্রজেক্ট ডিরেক্টরের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। এ কথা আজ অনস্বীকার্য যে, এই মহান শিক্ষানুরাগী ও দূরদর্শী ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমে তখনকার প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু না হলে নিঃসন্দেহে দীর্ঘসময় পিছিয়ে যেত কর্মকাণ্ড। ১৯৭০-৭১ শিক্ষাবছরে রংপুর মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু। প্রথমে ৫৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান হয়ে কলেজে যোগদান করেন ডা. একেএম আব্দুস সালাম (ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধান থাকাবস্থায় অবসর গ্রহণ এবং পরে বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকাল কলেজে কর্মরত ছিলেন) বর্তমানে প্রয়াত। ড. এম এ হাই ফিজিওলজি ও বায়োক্যামিস্ট্রি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। সর্বমোট ১২ জন শিক্ষকের একটি ছোট্ট দল নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রথম ক্লাস শুরু হয়। তবে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী মুক্তিযুদ্ধের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে ক্লাস শুরু থেকে বিরত থাকে।
দেশ শত্রুমুক্ত এবং স্বাধীন হবার পর পুনরায় নতুন করে ক্লাস শুরু হয় ১৯৭২ এর ১৮ মার্চ। পাকিস্তান আমলেই কলেজ ও হাসপাতাল ভবনগুলোর মূল নির্মাণ কাজ সমাপ্ত প্রায় ছিল। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়। ১৯৭২-এ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় ভবনগুলো ব্যবহার উপযোগী করে কার্যক্রম এগিয়ে চলে। প্রশাসনিক বিভাগ, অ্যানাটমি বিভাগ, ফিজিওলজি বিভাগের আংশিক ব্যবহার উপযোগী হয়। বর্তমান মেডিকেল কলেজ পোস্ট অফিস সংলগ্ন গ্রাউন্ড ফ্লোরের লেকচার হলটিতে ক্লাস নেয়া হতো।
ডিসেকশন হলটিও তড়িঘড়ি করে ব্যবহার উপযোগী করা হয়। ডিসেকশনের জন্য শবদেহ ব্যবহার উপযোগী করার ব্যবস্থা তখনও হয়নি। একাত্তরের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয় লাভের পর কলেজ ভবনে (৭২-এর মার্চের প্রথম পর্যন্ত) মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণকারী হানাদার বাহিনীর কিছু সংখ্যক অফিসার মেডিকেল কলেজ ভবনে অবস্থান করেছে। ৭২-এর মার্চে নতুন করে ক্লাস শুরুর পূর্বেই তারা কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। ছাত্রদের পিন্নু ও মুক্তা হোস্টেলের কক্ষগুলোতে বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল দল স্বাধীনতার পর ৭২-এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অবস্থান করেছেন। সেজন্য ছাত্রদের প্রথমে তৃতীয় শ্রেণি কর্মচারীদের বাসস্থান ১০ নাম্বার বিল্ডিং-এ অবস্থান করতে হয় মাসখানেক সময়। তারপর কলেজ বিল্ডিং এর অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলীদের চেম্বারগুলোতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
বর্তমানে অ্যানাটমি বিভাগীয় প্রধানের চেম্বারটি ছিল ছাত্রদের হোস্টেলের ডাইনিং এবং কিচেন রুম। ছাত্রীরা প্রথমে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের কোয়ার্টার ১১ নাম্বার বিল্ডিং-এ পরে প্রিন্সিপালের কোয়ার্টারে থাকতেন। তখনও ছাত্রী হোস্টেলের কাজ শেষ হয়নি। ১৯৭৪ সালে কলেজের ৪র্থ ব্যাচ আসার পর বর্তমান ছাত্রী হোস্টেল চালু হয়। হাসপাতাল ভবনের কাজ স্বাধীনতার পর দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে। ক্যাম্পাসের পথঘাট তখনও তৈরি হয়নি। ১৯৭২-এর শেষার্ধে ছাত্ররা হোস্টেলে ওঠেন। আজও মনে পড়ে গ্রামের মেঠোপথের মতো ধুলায় ধূসর পথ ধরে আমরা হোস্টেল থেকে কলেজে যাতায়াত করেছি। আজকের সুসজ্জিত ক্যাম্পাসে অসংখ্য অট্টালিকার ভিড়ে নিজেদের স্মৃতিময় অতীতকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তন আর পরিবর্ধনের ছোঁয়া লেগেছে চারিদিকে। শান্ত ছায়া সুনিবিড় সেদিনের ক্যাম্পাস আজ কোলাহল আর কলকাকলীতে ভরে গেছে। ক্যাম্পাসের সব গাছগুলোই বিশেষ করে নারকেল গাছগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের ও তৎকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের হাতে রোপিত।
কলেজ বিল্ডিং-এ অবস্থানকালীন প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের দীর্ঘ কয়েকমাস মেঝেতে থাকতে হয়েছে। ধীরে ধীরে আসবাবপত্র পাওয়ার পর বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ অস্ত্র সমর্পণ করে নিজগৃহে ফিরে গেলে ছাত্ররা হোস্টেলে উঠে আসেন। সর্বপ্রথম গোলাম মোস্তফা ও নজরুল ইসলাম পিন্নু হোস্টেলের ২৪ নাম্বার কক্ষে ওঠেন। কলেজে অবস্থানকালে ছাত্রদের গোসলের কাজটি সারতে হয়েছে উন্মুক্ত অঙ্গনে টিউবওয়েলের পানিতে। অ্যানাটমি বিভাগের পূর্বের মাঠে দুই-তিনটি খেজুর গাছ ছিল, তার নিচে লাইন ধরে গোসল সারতেন প্রথম ব্যাচের ছাত্ররা। প্রথম দিকে ছাত্রাবাস দুটি পূর্ব এবং পশ্চিম ছাত্রাবাস হিসেবে পরিচিতি ছিল। ১৯৮০ এবং ১৯৮২ দুটো দুঃখজনক ঘটনায় দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ডা. কামরুল ইসলাম পিন্নু ও ডা. আবু সউদ-বিন মুক্তা (পার্বতীপুর নিবাসী) ছাত্রাবস্থায় পূর্ব হোস্টেলে বসবাস করেছেন। বর্তমানে কেল্লাবন্দ এলাকায় অবস্থিত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হোস্টেলটি আশির দশকে স্থাপিত হয়। ওই স্থানে একটি হ্যালিপ্যাড ছিল। তাই হোস্টেলটি হ্যালিপ্যাড হোস্টেল নামেও পরিচিত। ইন্টার্নদের জন্য নির্মিত হোস্টেলটি (আশির দশকে) নব্বই-এর গণঅভ্যুত্থানে নিহত ডা. শামসুল আলম মিলনের স্মৃতিরক্ষার্থে ‘শহীদ ডা. মিলন হোস্টেল’ নামে রাখা হয়। ইন্টার্ন ডাক্তারদের সংখ্যার অনুপাতে এটির সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
১৯৭৬ সালের ১৯ মার্চ জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্র্রাহীম (তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবনটি উদ্বোধন করেন। অবশ্য এই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত প্রথম সেবামূলক সংগঠন ‘সেবা সংস্থা’, ‘বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি’ ও রংপুর জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে হাসপাতাল ভবনে চক্ষু চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা হয়। এই শিবির উপলক্ষে বসানো বেডগুলোতেই পরবর্তীতে ইনডোর চালু করা হয়। মূলত তখন থেকেই হাসপাতালে নিজস্ব বেডে চিকিৎসার কাজ শুরু হয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রথম সুপার (পরবর্তীতে পরিচালকের পদ সৃষ্টি হয়) ছিলেন কর্নেল ডা. মো. হামিদুর রহমান। প্রথম দুই ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের ক্লিনিকাল ক্লাস হতো রংপুর সদর হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে। রংপুর মেডিকেল কলেজের একমাত্র কলেজ বাসটি (প্রগতির তৈরি) শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুবেলা যাতায়াত করতো।
সদর হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের কাজে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও সারা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের মাঝ দিয়ে নতুন হাসপাতালের কর্মকাণ্ড শুরু করে যে ইতিহাস সেদিন সৃষ্টি করেছিলেন তা চিরস্মরণীয় করে রাখার ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে একটি ছবিও রাখা হয়নি। ১৯৭৪ সালে মূল হাসপাতাল ভবনের পেছনে একটি মহিলা হাসপাতাল (মেটারনিটি) ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী মরহুম সোহরাব হোসেন। ভারতের অনুদানে হাসপাতালটি নির্মিত হচ্ছিল। হাসপাতাল ভবনের দ্বিতল পর্যন্ত কাজ হয়ে অর্থাভাবে অর্ধসমাপ্ত হয়ে আজও কালের সাক্ষ্য বহন করছে। বর্তমানে সেই ভবনটি অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। রংপুরের মাটিতে আলাদা একটি মেটারনিটি হাসপাতাল স্থানীয়দের কল্যাণ বয়ে আনতো। নতুন করে হাসপাতালটির বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করলে ৪৮ বছর পর নবজীবন পেলেও পেতে পারে।
সীমাহীন কষ্ট, দুর্ভোগ, ত্যাগ-তিতিক্ষার জন্য প্রথম দিকের অন্তত দশটি ব্যাচের শিক্ষার্থীগণ ইতিহাসে তাদের স্থান করে নিয়েছেন। প্রথম তিন চার ব্যাচের পদচারণায় ক্যাম্পাসে ধীরে ধীরে প্রাণচাঞ্চল্য আসে। ১৯৭০-৭১ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত পরিবেশেই মূল কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব। নানা প্রতিকূলতার মাঝে অটুট দৃঢ়তা নিয়ে কলেজ ও হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়ার শপথ নেন শিক্ষার্থীরা। সকল রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলে উন্নয়নের ধারা। শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ কলেজের কর্মচারীবৃন্দ। শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হন রংপুরবাসী। প্রায় প্রতি মাসেই এখানকার শিক্ষার্থীদের ঢাকায় ছুটতে হতো শিক্ষক, বইপত্র, যন্ত্রপাতি, শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহের জন্য। নতুন মেডিকেল কলেজে অনেকে পোস্টিং পেয়ে আসতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতেন। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে ভিন্ন দৃশ্যপট। এখান থেকে বদলি হয়ে অন্যত্র যেতেই চাননি। দেখা গেছে রংপুরের মাটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। মরহুম অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান এমন একজন শিক্ষক ছিলেন। সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান রংপুরের মাটিকে ভালোবেসে আর পৈতৃক ভিটায় ফিরে যান নি কোনোদিন। আমরা যারা তাঁর ছাত্র ছিলাম তারাসহ রংপুরবাসী কোনোদিন বিস্মৃত হবেন না এই মহান ব্যক্তিত্বকে।
প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে শবদেহ ব্যবহার উপযোগী করে এনে ডিসেকশন করতে হয়েছেÑএমন কথা আজ অবিশ্বাস্য মনে হবে অনেকের কাছে।
প্রথম দুই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী। রাজনৈতিক ভিন্ন মতাদর্শী হয়েও একসাথে কলেজের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। ১৯৭৪ সালে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তৎকালীন চারজন ছাত্র ডা. ইউনুছ আলী সরকার, ডা. নাজমুল ইসলাম বাবলা, ডা. আলতাফ হোসেন সরকার ও ডা. অমল কুমার বর্মন আমরণ অনশন শুরু করেন। বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ছিল আমরণ অনশন। কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিল দাবি পূরণে। তখনকার ছাত্র নেতৃবৃন্দের নিঃস্বার্থ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব কলেজটিকে পূর্ণাঙ্গতা দিতে বিশেষ অবদান রাখে। সেসব নেতৃবৃন্দের ভূমিকা আজ অবিস্মরণীয়। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আজও স্মরণ করি ত্যাগী নেতৃবৃন্দকে। ১৯৭৩ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়ার আদর্শে দীক্ষিত হয়ে গঠিত হয়েছিল সম্মিলিত সংগ্রামী পরিষদ। ছাত্র-শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী, অভিভাবকদের সমন্বয়ে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের ১২৫ জনের প্রতিনিধি দল খোলা ট্রাকে করে ঢাকা গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাত করে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেই সময় বেশকিছু সমস্যার সমাধান করা হয়। এর আগে ১৯৭২ এর ১২ মে বঙ্গবন্ধু দিনাজপুরে আসেন। বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই তাঁর প্রথম জনসমাবেশ ছিল।
প্রথম ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা তিনটি মাইক্রোবাস যোগে দিনাজপুরে ছুটে যান। তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী পীরগঞ্জের কৃতি সন্তান মরহুম মতিউর রহমান, শিক্ষামন্ত্রী দিনাজপুরের মরহুম অধ্যাপক ইউসুফ আলী, রংপুরের এম.এল.এ মরহুম সিদ্দিক হোসেন, মুজিববাহিনীর ডিস্ট্রিক্ট লিডার সাংবাদিক মুকুল মোস্তাফিজ প্রমুখ ছাত্রছাত্রীদের বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার সুযোগ করে দেন। দিনাজপুর সার্কিট হাউসে তাঁর কাছে রংপুর মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন সমস্যাবলি সমাধানের দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপিসহ সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরহুম আব্দুল মালেক উকিলকে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের নির্দেশ প্রদান করেন। কদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের জন্য ত্রাণসামগ্রী নিয়ে রংপুরে আসেন। ফলশ্রুতিতে শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণসহ বেশকিছু সমস্যার সমাধান হয়। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরাও এসে গেছেন। বঙ্গবন্ধু রংপুরে এলেন রাষ্ট্রীয় সফরে। শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল রংপুর সার্কিট হাউজে দেখা করলে বঙ্গবন্ধু ছাত্রছাত্রীদের দৃঢ় মনোবল দেখে অভিভূত হন। সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমাধানের নির্দেশ প্রদান করেন। সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষার্থীদের যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে তার জন্য সাময়িকভাবে অন্যান্য মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার ব্যবস্থা করার বিকল্প প্রস্তাবও ওঠে এ সময়ে। ছাত্রপ্রতিনিধি দল সবিনয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকেই চিকিৎসক হবার আকাক্সক্ষা জানালে বঙ্গবন্ধু মুগ্ধ হন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা, মমত্ববোধ, ভালোবাসা, সর্বোপরি ত্যাগ স্বীকারের অনন্য দৃঢ়বিশ্বাস দেখে উপস্থিত সবাই আবেগে উদ্বেলিত হয়েছিলেন।
শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য কলেজ বাসটি তখন মঞ্জুরী। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়েছিল। পরে আরেকটি পরিবহন বাস রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য সংযুক্ত হয়েছে। এতে পরীক্ষার্থীদের টিবি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (সদর হাসপাতাল), নীলফামারী কুষ্ঠ হাসপাতাল, ডেনিশ বাংলাদেশ লেপ্রসি মিশনে হাতে কলমে শিক্ষালাভ অব্যাহত আছে। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে শুরু থেকেই এখানকার শিক্ষার্থীদের ছিল ইতিহাস সৃষ্টির আপ্রাণ চেষ্টা।
প্রথম ব্যাচের ছাত্র ডা. মমতাজ হোসেন প্রতিটি প্রফেশনাল এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন) শিক্ষাঙ্গনের ছাত্রছাত্রীদের সম্মানজনক পদচারণার সূত্রপাত করেন। আজও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭৪-এ ঢাকায় প্রথম আন্তঃ মেডিকেল কলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে রংপুর মেডিকেল কলেজ দলগত রানার্সআপ হয়। দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ডা. মো. মোজাম্মেল হোসেন (লালমনিরহাট) ব্যক্তিগতভাবে চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেন। প্রথম ব্যাচের ডা. রোকেয়া সুলতানা মেয়েদের মধ্যে রানার্স আপ হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক।
রংপুর মেডিকেল কলেজে চৌকশ ক্রিকেট ও ফুটবল দল ছিল। ১৯৭৩ সালে ফুটবল দলটি প্রথম রংপুরের বাইরে নীলফামারী জেলা দলের সাথে প্রীতি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেয়। নীলফামারী মাঠে সেদিন খেলাটি ১-১ গোলে অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়। নীলফামারী দলে জাতীয় খেলোয়াড় টুটুল অংশ নিয়েছিলেন। খেলার মাঠ জনসমুদ্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। এছাড়া ফুটবল দলটি রংপুর স্টেডিয়াম থেকে অনেক খেলাতেই অংশগ্রহণ করেছে। কলেজের মাঠে আন্তঃ ক্লাস ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হতো। প্রথম ব্যাচের ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে রংপুর মেডিকেল কলেজের একমাত্র শহীদ রফিকুল ইসলাম স্মরণে ‘রফিক স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্ট’ আয়োজিত হতো নিয়মিতভাবে। বর্তমানে এই টুর্নামেন্ট আর আয়োজন হয় না বলে শুনেছি।
রংপুর মেডিকেল কলেজের চৌকশ ক্রিকেট দলটি প্রথম এক যুগে রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন মাঠে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে নৌপুণ্যের প্রমাণ রাখে। ১৯৮০-৮২ পর্যন্ত সময়ে আন্তঃ জেলা ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে শিরোপা অর্জন করে। গোলাম মোস্তফা, গোপাল চন্দ্র সরকার, তারেক আল নাসির, আখতার আহমেদ, জাবেদ আখতার, আব্দুর রশিদ আলমগীর, কবিরুল ইসলাম লাবু, আবু মুনীম চৌধুরী, পরিমল ভট্টাচার্য, সিদ্দিকুর রহমান ক্রিকেট দলের উল্লেখযোগ্য নাম। এদের মধ্যে মোস্তফা, গোপাল, আলমগীর, সিদ্দিকুর ও জাবেদ রংপুর জেলা ক্রিকেট দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজে আন্তঃ মেডিকেল কলেজ টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতার আসর বসে। এর আগে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এই আসরের আয়োজন করা হয়েছিল। টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় (চট্টগ্রামে) এখানকার শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে রানার্স আপ গৌরব অর্জন করে। টেবিল টেনিসে দশম ব্যাচের রায়হান শরীফ এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ আজো আমাদের গর্বিত ইতিহাস।
১৯৭২ সালে রেডিও বাংলাদেশ (বাংলাদেশে বেতার)-এ ‘তরুণ কণ্ঠ’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেলে ছাত্রছাত্রীদের মাঝ থেকে একটি সাংস্কৃতিক দল গড়ে ওঠে। বেতার অনুষ্ঠানটি সকলের কাছে প্রশংসিত হয়। ডা. গোলাম রব্বানী (মেডিসিন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কনসালটেন্ট। অবসরের পর রংপুর সেনপাড়ায় বসবাস করছিলেন। বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন) একজন নাট্যব্যক্তিত্ব। তাঁর একক উৎসাহে গড়ে ওঠে একটি সৌখিন নাট্যদল। তাঁর পরিচালনায় মেডিকেল কলেজ সর্বপ্রথম নাটক কিরণ মৈত্রের ‘বারোঘণ্টা’ নাটকখানি মঞ্চস্থ হয় প্রথম ছাত্র সংসদের প্রযোজনায় (১৯৭৩)। এরপর ‘গোর্কির মা’, ‘মালাবদল’, ‘এক পেয়ালা কফি’, ‘কাঞ্চনরঙ্গ’, ‘সত্য মারা গেছে’, ‘এরাও মানুষ’, ‘ছন্দপতন’, ‘নীলদর্পণ’, ‘ফাঁস’, ‘উল্কা’, ‘সাগর সেচা মানিক’ (কর্মচারীদের দ্বারা মঞ্চস্থ), ‘বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিন’ ইত্যাদি নাটকগুলো মঞ্চস্থ হয়। ডা. মাহফুজুল হক (প্রাক্তন অধ্যক্ষ রংপুর ও বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ) ছিলেন আর এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর নির্দেশনায় ‘উল্কা’ নাটকটি দর্শকনন্দিত হয়েছিল। মেডিকেল কলেজগুলোর নাটকগুলো ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চার উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
নাটকের পাশাপাশি কলেজে সাংস্কৃতিক চর্চা হতো নিয়মিত। কলেজে সাংস্কৃতিক সপ্তাহ আয়োজিত হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নানামুখী প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। সংগীত, আবৃত্তি, অভিনয়, মুকাভিনয়, কৌতুক, উপস্থিত বক্তৃতা, অংকন ইত্যাদি মাধ্যমে প্রতিভার বিকাশ ঘটতো।
মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডা. শহীদুল ইসলাম খান (দিনাজপুর) এবং ডা. শামসুন্নাহার রেণু ছিলেন বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের নিয়মিত নজরুল সংগীত শিল্পী। কর্নেল ডা. রুকসানা হামিদ, ডা. মখদুম আজম আশরাফী, ডা. ইমদাদুল হক টুটুল রংপুর বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত সংবাদ পাঠক। ডা. এজাজুল ইসলাম রংপুর বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত সংবাদ পাঠ করতেন। পরবর্তী সময়ে টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বাংলাদেশে দর্শকনন্দিত শিল্পী হবার গৌরব অর্জন করেন এবং শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু, ডা. অমল কুমার বর্মন, ডা. মখদুম আজম মাশরাফী, কর্নেল ডা. নাজমা বেগম নাজু (যতদূর জানি ১৬টির অধিক কাব্যগ্রন্থ ও শিশুতোষ বইয়ের রচয়িতা) এবং রওনক আফরোজ পিয়ার কাব্যগ্রন্থ আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের গৌরব গাঁথা।
বহমান স্রোতের অনেকটা পথ আমরা এগিয়ে গেছি। দীর্ঘ ৪৮ বছর পর রংপুর মেডিকেল কলেজের অতীত ও বর্তমান নিয়ে লিখতে বসে অনেকাংশে স্মৃতিনির্ভর হতে হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে আমার অধিকাংশ সময় রংপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে কেটেছে। শিক্ষাজীবন শেষ করে একই প্রতিষ্ঠানে পেশাগত কর্মজীবনও কেটেছে।
বিভিন্ন সময়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নানাদিক ও বিষয় নিয়ে লিখেছি। উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত এই জ্ঞানপীঠ বর্তমানে ঈর্ষণীয় অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ১৯৯৫-৯৬ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল কাউন্সিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান বিচার বিশ্লেষণের পর সাময়িক স্বীকৃতি প্রদান ও নিবন্ধীকৃত করেছে। বর্তমানে এখানে পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স চালু করা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা শাখা এই প্রতিষ্ঠানে চালু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন উত্তরবঙ্গের জনগণ।
শুরু থেকেই রংপুর মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। সর্বপ্রথমে একজন মালয়েশিয়া ছাত্র এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন ১৯৭৩-৭৪ শিক্ষাবর্ষে। এ সময়ে দুজন মরিশাসের ছাত্র আসেন। বিগত বছরগুলোতে নেপালের শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটে বেশি সংখ্যায়। নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, সুদান, প্যালেস্টাইন, মালয়েশিয়া, মরিশাস ও বাহরাইন এর শিক্ষার্থীগণ এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে গেছেন এবং নিজ নিজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ভূমিকা রাখছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজে প্রতি বছরে ১৭৫ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকেন। বর্তমানে আসন সংখ্যা আরো বেড়েছে। বিদেশিদের জন্য মোট ৮টি আসন সংরক্ষিত আছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মতো বেতন পরিশোধ করতে হয়। অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতি বছর ২০০০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় টিউশনি ফিস প্রদান কারর বিধান প্রচলিত রয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিস্তারিত দিক নির্দেশনা রয়েছে। দেশের অন্যান্য মেডিকেল কলেজের তুলনায় রংপুর মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নির্বিঘ্নে চলে। এখানকার শিক্ষার পরিবেশ ও ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশিদের কাছে পছন্দনীয়। তারা এখানে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকেন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশিদের বন্ধুত্ব ও সহাবস্থান আমাদের গর্বিত করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম রংপুরবাসীর গর্বিত অহংকার।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাক রংপুর মেডিকেল কলেজের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পরিসেবার অনন্য ইতিহাস।
বর্তমানে বাংলাদেশি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীগণ বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন। প্রাক্তন শিক্ষকমণ্ডলীর অনেকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে সক্ষম হয়েছেন। অধ্যাপক ডা. ওয়ালীউল্লাহ, অধ্যাপক ডা. এবিএম আহসান উল্লাহ তাদের অন্যতম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও পিজি হাসপাতালে প্রাক্তন শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এখনও করছেন। প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক এম.এ তাহির ও অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহ্বুব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাক্রমে উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্যের আসন অলংকৃত করেন। অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহ্বুব পরে ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশনের (ইউজিসি) অনারারি প্রফেসর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
বাংলাদেশে টেস্টটিউব বেবির স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. ফাতেমা পারভীন রংপুর মেডিকেল কলেজের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশই নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত। দেশে-বিদেশে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। বিপুল সংখ্যক চিকিৎসকবৃন্দের বর্তমান পদ ও অবস্থান সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ দুরুহ বিষয়। অনেক মেধা ও দক্ষতার সংবাদ আমাদের অজানা। কলেজ কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে একটি সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান করা সম্ভব। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অসময়ে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরলোকে। তাঁদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।
রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র রফিকুল ইসলাম স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন সৈয়দপুরে। বড়োভাই ও ভাগ্নেসহ পাকহানাদার বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। বড়োভাই প্রকৌশলী শহীদ ফজলুর রহমানের নামে সৈয়দপুর সেনানিবাসের একটি সড়ক নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০১০ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজের একমাত্র শহীদ রফিকুল ইসলামের স্মৃতিরক্ষায় কলেজ অডিটরিয়ামের নামকরণ তাঁর নামে করা হয়েছে। এতে শহীদ রফিকের রক্তঋণ হয়ত আংশিক শোধ করতে পেরেছি আমরা।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge