সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:০২ অপরাহ্ন

মোঃ মোশফিকুর রহমান এর ছোটগল্প-বিশ্বাস

মোঃ মোশফিকুর রহমান এর ছোটগল্প-বিশ্বাস

মোঃ মোশফিকুর রহমান এর ছোটগল্প
বিশ্বাস

আজ সকাল হতেই বেলার মনটা খারাপ! কি এমন হলো যে রৌদ্র সাজ-সকালে এমন রিএ্যাক্ট করলো। গতকাল হতেই কত স্বপ্ন সাজিয়ে রেখেছিল,আর রৌদ্র এক মুহূর্তেই সব নষ্ট করে দিল! সেই কাক ডাকা ভোরে সেজেগুজে রেডি হয়ে আছে। রৌদ্রের প্রিয় সেই নীল রঙা শাড়িটা পরে রেডি হয়ে আছে,মাথার খোঁপায় শোভা পাচ্ছে বেলি ফুল। আর কপালের মাঝখানে ছোট্ট একটা কালো টিপ,পায়ে পরেছে আলতা ও নূপুর। হাতে শোভা পাচ্ছে গতবছর জন্মদিনে রৌদ্রের কিনে দেয়া সেই কাঁচের চুড়িগুলো। আজ সত্যি বেলাকে কোন অপ্সরীর মতো লাগছে,যেন স্বর্গ হতে এ ধরাধামে কোন অপ্সরী নেমে এসেছে। অথচ আজ রৌদ্রের কোন খোঁজ নেই। গত কয়েক মাস হতেই কেমন জানি বদলে গেছে রৌদ্র! বেলার তেমন খোঁজ-খবর নেয় না,কিছুদিন আগেও সে বেলাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতো না। ইদানিং কেমন জানি মনমরা হয়ে থাকে, ক্যাম্পাসেও ঠিকমতো আসে না। তবে কী রৌদ্র অন্য কোন মেয়ের প্রেমে পরেনি তো? বেলার মনে সারাদিন এই ভয় ভর করে তবুও মনে এটুকু সাহস রাখে,এ জগতে রৌদ্র শুধু আমাকেই ভালবাসে অন্যকোন মেয়েকে সে ভালবাসতে পারে না। কিন্তু আজ সকাল সকাল তাকে নিয়ে তার গোটা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ানোর কথাছিল! কেননা আজ যে ৮ই অক্টোবর,এই দিনটিও কী রৌদ্রের মনে নেই! গত চারটি বছর কত আনন্দই না করেছে এই দিনটিতে! এই দিনটা রৌদ্রের কাছে সবচেয়ে প্রিয় দিনগুলের একটি,কেননা এই দিনেই যে বেলার জন্মদিন! তবে কি রৌদ্র এই দিনটার কথাও ভুলে গেল?
অনেক সময় অপেক্ষা করার পর বেলা রৌদ্রকে ফোন করল!
-কি খবর রৌদ্র তোমার কি আজকের দিনটার কথাও মনে নেই!
কেন কী হয়েছে,আজ কি বিশেষ কোনো দিন?
-কি বলছো তুমি!
না সত্যি আমার কিছু মনে পরছে না! একটু বলো না।
-রৌদ্র আজ আমার জন্মদিন! তোমার সাথে আজ সকাল হতে সন্ধ‍্যা পর্যন্ত গোটা ঢাকা শহর ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিলো। সন্ধ্যায় স্টার সিনেপ্লেক্সে একসঙ্গে সিনেমা দেখার কথা ছিলো।
ও সরি বেলা!
-বা কত সহজেই তুমি সরি বলে দিলে! অথচ তুমি জানো কতদিন ধরে এই দিনটা নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি আমি! অথচ তোমার কোনো রেসপন্স নেই আমাকে নিয়ে।
প্লিজ রাগ করো না,বিকেলে ঠিকই বেড়াতে যাব। গতকাল অনেক রাত করে হলে ফিরেছি,এখন একটু ঘুমাবো।
-ঘড়িতে দেখেছো কয়টা বাজে? এখন বারোটা বাজে!
বললাম না,বিকেলে ঘুরতে যাব! ফোনটা এখন কাটো আমি একটু ঘুমাবো।
বেলা রাগের সুরে ফোনটা কেটে দিয়ে হু হু করে কাঁদতে লাগলো আর বালিশে মুখ গুজে ফোঁস ফোঁস করতে থাকলো। কখন যে বেলাও ঘুমিয়ে পরেছে ঠিক মনে নেই! আসরের আযানের আওয়াজে বেলার ঘুম ভাঙলো। বাথ রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসে বাইরে ঘুরতে যেতে রেড়ি হলো। এখনো রৌদ্রের কোনো খোঁজ নেই,বাধ্য হয়ে ফোন করলো। কিন্তু রৌদ্রের ফোনটা বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। বেলা অনবরত চেষ্টা করছে ফোনে, বার-বারই বন্ধ দেখাচ্ছে। কিন্তু রৌদ্রের কি এমন হলো যে ফোন বন্ধ করে রাখার প্রয়োজন হলো? তবে কি তার কাছে আমার চাহিদা ফুরিয়ে গেছে? আজকের দিনটাই তো তার কাছে চেয়েছিলাম,কিন্তু সে এই দিনটাতেই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট উপহার দিলো।
বেলা গ্রাম্য সহজ সরল মেয়ে আর প্রচন্ড মেধাবী! উত্তরাঞ্চলের একটা মফস্বল গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চান্স পেয়েছে। তার ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য ছাত্র ছাত্রীদের কাছে সে অনেক আলোচিত। কেননা সে যেমন মেধাবী তেমনি সৌন্দর্য্যেও অনন্যা। তবে গ্রামের সারল্য তার বেশ ভূষণে স্পষ্ট লক্ষণীয়। রৌদ্রের চেহারাও অসাধারণ,যেকোনো মেয়ের ক্রাস সে। বেলাও এর ব্যতিক্রম নয়, তাই তাদের মিলিত হতে ততোটা বেগ পেতে হয়নি। রৌদ্র বেলাকে প্রতিদিনই নিত্য নতুন চমক উপহার দেয়,তেমনি ছিলো বেলার জীবনের প্রথম জন্মদিন পালন। বেলা গ্রামের সরল মেয়ে,সে কখনোই জন্মদিন পালন করেনি। রৌদ্রের সাহায্যেই তার জীবনে প্রথম জন্মদিন পালন করা হলো,তাও একটা ফাইভ স্টার হোটেলে! কত বর্ণিল ছিল সে আয়োজন,সে দিনটি আজও বেলা ভুলতে পারেনি। এরপর হতে প্রতিবছর এভাবেই তারা দিনটি পালন করে। সকাল-সকাল দুজনই হল হতে বের হয়ে রিক্সা নিয়ে সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ফিরে সন্ধ্যায় সিনেমা দেখে রাতে কোনো ফাইভ স্টার হোটেলে জন্মদিন পালন করে। কিন্তু চার বছর পর আজই ব্যতিক্রম হলো। এখন আবার রৌদ্রের ফোনটাও বন্ধ, কি করা যায়।
দেখতে দেখতে রাত আটটা বেজে গেলো,এখনো রৌদ্রের ফোন বন্ধ। এমন সময় চৈতির ফোন,শুনেছিস রৌদ্র আর মেঘাকে নাকি পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে গেছে!
-কেন? আমি জানিনা, প্রান্ত ফোন করেছিল যেন তোকে জানাই। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু কিছু বললো না,শুধু বললো থানায় গেলে বুঝতে পারবি।
বেলা কিছু না ভেবে,অজানা একটা আশংকা নিয়ে থানায় ছুটে গেলো। গিয়ে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে পারল রৌদ্র ও মেঘা নেশাগ্রস্ত হয়ে অনৈতিক কাজ করার সময় একটা আবাসিক হোটেলে ধরা পরেছে! এর আগেও এদের দুজন কে সতর্ক করা হয়েছিল,কেননা দুজনই স্বনামধন্য পরিবারের ছেলেমেয়ে। কিন্তু এবার আর তাদের থানায় না এনে উপায় ছিলো না,আমাদের উপর হতে চাপ আছে। কথাগুলো শুনে বেলা নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, রৌদ্র এতো নিচে নামতে পারে? সে স্তব্ধ হ
গেল,সে কি করবে বুঝতে পারছে না।
বেলা অফিসারের অনুমতি নিয়ে রৌদ্রের সাথে দেখা করতে গেল। রৌদ্র বেলাকে দেখতে পেয়ে মুখ লুকাতে গেল,তার আগেই বেলা চিৎকার করে বলতে লাগল-
“তুমি এভাবে আমার সাথে প্রতারণা করতে পারলে রৌদ্র? আমি শুনেছিলাম শহরের বড় লোকের দুলালরা আমার মতো মেয়েদের ভালবাসার ফাঁদে ফেলে সব কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দেয়! তুমি যখন আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছিলে,আমি বুঝতে পারিনি। আমি মনে করেছিলাম সেটা তোমার আমার ক্ষণিকের ভুলে হয়তো হয়েছিল। কিন্তু আজ বুঝলাম,তুমি জেনে বুঝেই আমার দেহ ভোগ করেছিলে। তোমার যদি নারী দেহ এতো বেশি প্রয়োজন ছিলো আমাকে তোমার যৌন দাসী বানালে না কেন? আমি তোমার যৌন চাহিদা পূরন করতাম দিন-রাত। আমি তো আমার সবকিছু তোমাকেই উজাড় করে দিয়েছিলাম,এ দেহটাও তো তোমার সম্পত্তি ছিল;প্রয়োজনে এ দেহটা চিরে চিরে খেতে। মেঘলার দেহে কি এমন ছিল,যা এই বেলার দেহে ছিলনা?”
“বেলা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও! আমি তোমার বিশ্বাস রক্ষা করতে পারলাম না। কিন্তু তুমি বিশ্বাস কর আমি তোমাকে ঠকাতে চাইনি,আমি তোমাকে সত্যিই ভালবাসে ছিলাম।”
-এই তোমার ভালবাসা’র নমুনা!
-আমি জানি তোমার সাথে অন্যায় করেছি,তবে আমি জেনে বুঝে সেদিন অমন করিনি! সেদিন আমি প্রচন্ড নেশার ঘোরে ছিলাম। নেশা আমার জীবনটা একদম নিঃশেষ করে দিচ্ছিল! আমি এ জন্যই তোমার থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি,আমি চাইনি আমার এ কলুষিত জীবনের সাথে তোমাকে জড়িয়ে তোমার জীবনটাও নষ্ট করি। এজন্য রোজই বিভিন্ন অজুহাতে তোমার কাছ হতে গত ছয়টি মাস দূরে থেকেছি! নিজের শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে আমার পাপগুলো মোচন করতে চেয়েছি। কিন্তু এটা অনেক দেরি হয়েছিল। গত এক বছর ধরেই আমি নেশায় আসক্ত। এমন কোনো নেশা নেই যা আমি গ্রহণ করিনি,খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পরে আমার জীবনটা ধ্বংস হয়ে গেল। আমি যতবারই চেষ্টা করেছি,ফিরে আসবো! কিন্তু ধূসর এ জগৎ হতে আর ফেরা হয়নি,বরং আরও বেশি করে অন্ধকারে ডুবে গেছি। সেদিন যখন তুমি আমার হলে আসলে,তখনও আমি নেশাগ্রস্ত ছিলাম। হলে বিকেল বেলা সবাই মাঠে খেলাধুলায় ব্যস্ত ছিলো,কেউ পার্কে গিয়েছিল প্রেয়সীর হাত ধরে। আমি নেশার চোটে হলেই পরে ছিলাম একাকী। তুমি এমন সময় এভাবে আসবে আমি কল্পনাও করিনি! আমি সেদিন ভেবে চিন্তে তোমার সর্বনাশ করিনি,আমি সেদিন আমার মধ্যে ছিলাম না।
-তুমি তো আমাকে তোমার সমস্যার কথাগুলো বলতে পারতে,কখনো বলেছ? আমি তো তোমাকে প্রচন্ড বিশ্বাস করেছিলাম,আর তুমি আমার বিশ্বাসটাই এভাবে ভেঙে দিলে?
-সেটার সুযোগ ছিলনা,আমি খুব দ্রুতই অন্ধকারে ধাবিত হয়ে পরেছিলাম। আমি নিজেও তোমার বিশ্বাস ভাঙার জন্য লজ্জিত। আমি প্রথমে তোমাকে সবকিছু বলতে চেয়েছিলাম,কিন্তু পরে ভাবলাম তুমি যদি দূরে সরে যাও;এ ভয়েই কিছু বলিনি।
-আর মেঘেলার সাথে তোমার কিসব শুনছি? -আসলে মেঘলাও ড্রাগ এডিক্টেড! ও বিভিন্ন সময়ে আমাকে বিভিন্ন নেশার দ্রব্যগুলো সরবরাহ করত। বড় লোক বাবার মেয়ে,প্রচুর টাকার মালিক! কখন যে তার জালে জড়িয়ে পরেছি নিজেও বুঝিনি। আমার পক্ষে রোজ নেশার টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিলনা,মেঘলাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। বিনিময়ে বিভিন্ন সময়ে তার দেহ চাহিদা মেটাতে হয়। আজও সে আমাকে জোর করেই নেশা করিয়ে,একটা আবাসিক হোটেলে নিয়ে গেল। একটু পরেই পুলিশের রেড হলো,আমাদের দুজনকে ধরে এনে জেলে দিলো।
-রৌদ্র তুমি কি সেই রৌদ্র,যে সিগারেটের ধোঁয়াটাও সহ্য করতে পারতে না। আর আজ সেই তুমি কিনা….! ছি..!
-বেলা জানি আমার ভুলের শেষ নেই! আর এ ভুলের ক্ষমাও হয়না, তবুও পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি আবারও ভাল হতে চাই,আমি তোমার সেই রৌদ্র হয়েই ফিরে আসতে চাই তোমার বুকে।
বেলা হঠাৎ করেই থানা হতে দৌড় দিয়ে বের হয়ে গেল। রৌদ্রের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা ও একরাশ হতাশা এবং বুক ভরা হাহাকার নিয়ে,চোখের পানি মুছতে মুছতে একটা সিএনজি নিয়ে সোজা দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর উপরে নামল! যখনি বেলার মন খারাপ হয়,তখনি সে এ জায়গায় চলে আসে। মাঝে মধ্যে রৌদ্রকেও নিয়ে আসত! আর বুড়িগঙ্গার বুকে বয়ে চলা নদীর কলতান শুনে মন ভাল করতো। আজ অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকেও কেন জানি কিছুই ভাল লাগছে না। পৃথিবীর সমস্ত অবিশ্বাস আজ তাকে খোঁচা দিচ্ছে,পৃথিবীতে বিশ্বাস বলে কিছু নেই। যাকে জীবনের থেকে বেশি বিশ্বাস করবে,সেই তোমার বিশ্বাস ভেঙে দিবে। পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস করাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল,নিয়ন বাতির ঢাকা শহর টাও বড় অচেনা লাগছে,হঠাৎ নদীতে প্রচন্ড একটা শব্দ হলো আর কিছু জানা গেল না। চারপাশে সুনসান নিরবতা…

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge