বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১১:০৪ অপরাহ্ন

মুখোশ-রামিম ইসলাম নূর

মুখোশ-রামিম ইসলাম নূর

মুখোশ
রামিম ইসলাম নূর

১.
ঘর অন্ধকার করে কাঁদছে মেয়েটি। কাঁদতে কাঁদতে বালিশ ভিজিয়ে ফেলেছে।
আজ ছয় দিন হলো সে ক্লাসে যায়নি। খাওয়া দাওয়াও ঠিকমতো করছে না। অথচ ক’দিন আগেও কতই না আনন্দে ছিল সে।
মেয়েটির নাম কনিকা। মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখেছে যে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। তার বাবা-মা’রও সেটাই স্বপ্ন ছিল। তারা সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়ে এসেছে। তাদের অভাবের সংসার, চাল আনতে নুন ফুরায় এমন। নিজেরা দিনের পর দিন কষ্ট করেছে। কিন্তু ওর পড়াশুনায় এতটুকু অসুবিধা হতে দেয়নি কখনো। কনিকাও ওর বাবা-মায়ের কষ্ট বুঝতো। তাই মেডিকেলে ভর্তির জন্য জান-প্রাণ লাগিয়ে দিয়েছিল সে। তারপর কনিকা যেদিন সরকারী মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়ে গেল ওদের বাসার কেউই কান্না সামলাতে পারেনি। অবশ্য সেই কান্নায় কোন কষ্ট ছিলনা। ওর মা তো সাথেসাথে দৌঁড়ে গিয়ে নফল নামাজ পড়তে জায়নামাযে বসে পড়েছিল।
আজকাল নাকি টাকা থাকলেই প্রাইভেট মেডিকেল থেকে ডাক্তার হওয়া যায়। কিন্তু ওদের তো সেই সামর্থ্য নেই। তাই আল্লাহ তাআলার কাছে কনিকা অশেষ কৃতজ্ঞ ওর আর ওর বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য।
মাত্র তিন মাস হয়েছে ওর ক্লাস শুরু হবার। বাবা-মাকে ছেড়ে হোস্টেলে থাকতে প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু হোস্টেল লাইফ, নতুন বন্ধু-বান্ধব, পড়াশুনার অন্যরকম চাপ সব মিলিয়ে সময়গুলো ঝড়ের বেগে কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। একটা ফোন ওর জীবনটাকে উলট-পালট করে দিয়েছে।
দিন সাতেক আগে কনিকা ওর পড়ার টেবিলে এনাটমির বিশালাকৃতির বই গ্রে’স এনাটমিতে ডুবে ছিল। বইটার অনেক দাম। সে নিজে কিনতে পারেনি। কলেজ লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসেছে। পরের দিন তার দুটো আইটেম পরীক্ষা ছিল। এই এনাটমি সাবজেক্টটা ওর এত কঠিন লাগে যে মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে পড়ে।প্রায়ই ভাবে পাস করতে পারবো তো! মেডিকেল কলেজে ওরা যারা আছে তারা সবাই স্কুল-কলেজে ভাল রেজাল্ট করে আসা ছাত্রছাত্রী। ভাল না বলে খুব ভাল বললে বোধহয় সঠিক হবে। অথচ এখানে এত পড়াশুনা করেও ওদেরকে প্রতিনিয়ত পাশ-ফেল নিয়ে চিন্তা করতে হয়।
তো গ্রে’স এনাটমি বই থেকে কিছু চিত্র দেখে পড়াগুলো বুঝার চেষ্টা করছিল সে। এমন সময় ওর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল সেদিন। কনিকার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিশ্চয়ই মা’র ফোন হবে। কিন্তু হতাশ হলো সে। স্ক্রিনে অপরিচিত একটি নাম্বার ভেসে আছে। ফোনটা সে রিসিভ করলো। তারপর মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে আসা কথাগুলো শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। কোন কথাই বলতে পারলো না। শুধু ফোনটা রেখে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। টেবিলের উপর টেবিল ল্যাম্পের উজ্জ্বল আলোর নিচে চূড়ান্ত অবহেলায় পড়ে রইল বিখ্যাত গ্রে’স এনাটমি।
পরের দিন আইটেম পরীক্ষায় কোন প্রশ্নের জবাব দিতে পারলো না কনিকা। ব্যাচ টিচার বকা দিতে গিয়েও কেন জানি নিজেকে সামলে নিলেন। আসলে কনিকা বরাবরই পড়াশুনার ব্যাপারে খুব মনোযোগী। আর কনিকার চেহারায় এক ধরণের আতঙ্কের ছায়া ছিল যেটা তার চোখ এড়ায়নি।
তারপর আর কোন ক্লাস না করেই রুমে ফিরে কাঁথার নিচে ঢুকে পড়ল সে। প্রচন্ড ক্ষিধে পেলেও তার কিছু খেতে ইচ্ছা করছিল না। বরং ভীষণ বমি পাচ্ছিল।
কনিকার রুমমেট ওর চার বছরের সিনিয়র শারমিন আপু। তাকে খুব স্নেহ করে। একেবারে ছোট বোনের মত আদর করে সবসময়। শারমিন ক্লাস শেষ করে রুমে ফিরে দেখে অসময়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কনিকা। শারমিন আর কনিকা সাধারণত ডায়নিং এ একসাথেই খেতে যায়। তাই খেতে যাবার জন্য সে কনিকাকে ডাক দিল। এই কনি, উঠ। খেতে যাবো। খুব ক্ষিধা পেয়েছে।
কনিকার কোন সাড়া না পেয়ে ওর কাছে গেল শারমিন।

কিরে তোর শরীর খারাপ নাকি রে?
কনিকার কপালে হাত দিয়ে দেখে মেয়েটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
শারমিন তড়িঘড়ি করে ওষুধ এনে খাওয়ালো ওকে। কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে মেয়েটা।
কনিকার মোবাইল ফোনটা সাইলেন্ট করা ছিল। কিন্তু তাতে অনবরত কল আসতেই থাকল। আর স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠল সেই নাম্বার।
পরের দিন জ্বর কিছুটা কমলো। কিন্তু কনিকা যেন কেমন হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। ঠিকমতন খাওয়া দাওয়া করেনা। কারও সাথে কোন কথা বলেনা। যে মেয়ের চোখেমুখে সবসময় হাসি লেগে থাকতো সে যেন হাসতেই ভুলে গেছে।
এভাবে পাঁচ দিন কেটে গেল। প্রতিদিন নিয়ম করে সেই অপরিচিত নাম্বার থেকে কয়েকবার ফোন আসতে থাকলো। রিংটোন বাজলেই কেঁপে কেঁপে উঠে কনিকা। ব্যাপারটা খেয়াল করেছে শারমিন। শারমিনের কোন বোন নাই। কনিকাকে নিজের বোন হিসেবে দেখে। বিধ্বস্ত কনিকাকে দেখে খুব মায়া, খুব কষ্ট হচ্ছে ওর।

কনি, তোর কি হয়েছে রে? আমাকে বলবি না? আমি না তোর বড় বোন।
কনিকা কিছু না বলে শারমিনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলো। অনেকক্ষণ পর বলে উঠল

আপু আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে।

ধুর পাগলি। এসব কি বলিস। আমাকে বলনা আপু কি হয়েছে তোর?

আপু আমার খুব ভয় করছে। আমি বাড়ি চলে যাব।

আরে কি হয়েছে বলবি তো।

আপু, তোমাদের ব্যাচের একটা ভাইয়া আমাকে কয়েকদিন থেকে ফোন দিচ্ছে। আমাকে ফ্রেন্ডশিপ করতে বলছে উনার সাথে। আরও কি কি সব বলে। উনি আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি ভয়ে হোস্টেল থেকে বের হইনা আপু। আমার এসব ভাল লাগেনা।
কথাগুলো বলতে বলতেই আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল কনিকা। শারমিন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলো।

এই পাগলি ভয় কিসের? আমরা আছিনা? ছেলেটা আমাদের ব্যাচমেট? নাম জানিস?

হুম। সোহান ভাই।

সোহান?
নামটা শুনে শারমিন একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সোহান যে শুধু ওর ইয়ারমেট তা না। ওরা ওয়ার্ড গ্রুপেও একসাথে ক্লাস করে আসছে মেডিকেলের প্রথম থেকে। সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে সে সোহানকে চেনে। ভাল ছেলের পারফেক্ট উদাহরণ হলো সোহান। শারমিন সবসময় মেয়েদের রেসপেক্ট করতেই দেখেছে তাকে। অথচ সেই সোহান আজ একটা মেয়ের সাথে এমন করছে! হিসাব মেলাতে পারছে না শারমিন।

কনি, শান্ত হ। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে নাম্বারটা দেতো।
২.
সন্ধ্যায় ইএনটি’র ওয়ার্ড ক্লাস চলছে। স্যার রোগী দেখিয়ে দেখিয়ে পড়াচ্ছেন। এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা কাছাকাছি এসে গেছে। কিন্তু শারমিন ক্লাসে মন দিতে পারছে না। বারবার কনিকার কথা মনে পড়ছে তার। একটু পরপর সোহানের দিকে দেখছে সে। কেন সোহান এমন করছে? আসলেই কি সে এমন করতে পারে? এতদিন ধরে দেখে আসা ওর ভদ্রতা কি তাহলে শুধুই মুখোশ?
ক্লাস শেষে শারমিন সোহানের মুখোমুখি হল।

সোহান, একটা সত্যি কথা বলবা?

কি কথা?
শারমিনের কথা বলার ধরণ দেখে সোহান কিছুটা অবাক হলো।
শারমিন সোহানকে মোবাইল নাম্বারটা দেখিয়ে বলল

এই নাম্বারটা কি তোমার?

ক্যান, আমার নাম্বার তোমার কাছে আছেনা? আমার ওই একটাই নাম্বার। কেন কি হয়েছে বলতো?
শারমিন পুরো ঘটনাটা বললো সোহানকে। সব শুনে সোহান বলল

শারমিন। নাম্বারটা আমার না, আর আমি তাকে ফোন করিনি। এমনকি মেয়েটাকে আমি চিনিও না।
সোহানের চোখে মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা ছিল। একজন অপরাধী বা মেয়েদের উত্তক্ত করে এমন কাপুরুষের মাঝে এমন দৃঢ়তা থাকেনা। এতে শারমিন স্বস্তি পেল। কনিকার জন্যও ভাল লাগলো ওর। পুরো ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার। কেউ একজন সবার কাছে সোহানকে খারাপ দেখাতে চাইছে। কনিকা এখানে টার্গেট না। কাজে ওর কোন ভয় নেই আর।
শারমিন কনিকাকে ফোন করল আশ্বস্ত করার জন্য। কিন্তু কয়েকবার রিং হবার পরও কনিকা ফোন ধরলো না। এবার ভয় পেল সে। উল্টাপাল্টা কিছু বসেনি তো আবার! মানসিক দিক থেকে যেভাবে ভেঙে পড়েছে তাতে কোনকিছুই অস্বাভাবিক না। শারমিন দেরি না করে হোস্টেলের দিকে ছুটলো।
৩.
রুমে ফিরে শারমিন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কনিকা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে কুচকুচে অন্ধকার। সেদিকে তাকিয়ে আছে সে। কি খুঁজছে আঁধারে সেই জানে!

কনি, ভাল খবর আছে। সোহান তোকে ফোনে ডিস্টার্ব করেনা। অন্য কেউ ওর নাম নিয়ে তোকে ফোন করছে। কনফার্ম থাক।

কিন্তু আপু, একটু আগেও ফোন এসেছিল।

তাহলে তো পুরাই কনফার্ম। সোহান ক্লাসেই ছিল সন্ধ্যা থেকে। আর তারপর আমার সাথে কথা হল তোর ব্যাপারটা নিয়ে।

কিন্তু আপু একটা সমস্যা হয়ে গেছে। আমার ভাইয়ার কথা তো জানোই। অনেক মাথা গরম মানুষ। আজ আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। সব শুনে রেগে বলেছে সোহান ভাইয়াকে ঠ্যাঙাবে। ওর বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে হোস্টেলে যাবে বলেছে। আপু আমি বারবার নিষেধ করেছি। কিন্তু শুনেনি। ফোন দিচ্ছি, ফোনও ধরছে না। এখন কি হবে আপু!
৪.
একঘন্টা হয়ে গেল শারমিন সোহানকে ফোন দিচ্ছে। কিন্তু সে ফোন ধরছেই না। কিছু হয়নি তো আবার। শারমিনের হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসছে। কনিকা আবার কান্নাকাটি শুরু করেছে। এরমাঝে ঐ নাম্বারটা থেকে আবার ফোন এসেছিল। কনিকা নিজেই আচ্ছামতো ঝেড়েছে বদটাকে।
এমন সময় শারমিনের ফোন বেজে উঠল। ওর আরেক ব্যাচমেট রাজন ফোন দিয়েছে।

কিরে শারমিন, কার সাথে কথা বলছিলি! কতক্ষণ থেকে ট্রাই করছি।

কেন কি হয়েছে?

ডিটেইলস জানিনা। সোহানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমরা যাচ্ছি দেখতে। তুইও চলে আয়।

কীইইই!
চিৎকার দিয়ে উঠল শারমিন।
শারমিনের চিৎকার শুনে কনিকা ভয় পেয়ে গেল।

কি হয়েছে আপু?

সোহানকে হাসপাতালে নিয়েছে। আমি দেখতে যাচ্ছি।
শারমিনের পিছে পিছে কনিকাও বের হলো। হোস্টেল থেকে হাসপাতালে হেঁটেই যেতে হয়। মিনিট পাঁচেক সময় লাগে। এই পাঁচ মিনিটই যেন ফুরাতে চাচ্ছে না। ওদের কাছে মনে হচ্ছে ওরা যেন অনন্তকাল ধরে হেঁটেই চলেছে।
কনিকার আবার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। ওর জন্য একজন নিরীহ মানুষ মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে। ও কিছুতেই কান্না থামাতে পারছে না।
হাসপাতালের স্টুডেন্ট কেবিনে শুয়ে আছে সোহান। পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছে। হাতে আর কপালে ব্যান্ডেজ। শারমিন আর কনিকা দুজনেই কেঁদে ফেলল সবার সামনে। বাকিরা ওদের কান্না দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। বিব্রত হয়ে সোহান মুখ খুললো

শারমিন তোমরা কান্না থামাও তো। ছোট একটা রোড এক্সিডেন্টই তো হয়েছে। আমি ঠিক আছি।

এক্সিডেন্ট!!!
শারমিন আর কনিকা দুজনের মুখে একসাথে উচ্চারিত হলো শব্দটা।
কান্নার কারণটা আপাতত চেপে গেল শারমিন।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge