শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন

মানুষের অভাব কী?-জাহিদ হোসেন

মানুষের অভাব কী?-জাহিদ হোসেন

মানবজাতির কিসের অভাব? পৃথিবীর বুকে মানুষের সমকক্ষ এমন কারা আছে, যারা তাদের কবল থেকে সমস্ত সম্পদ কেড়ে নেবে? তাইলে কিসের উন্মাদনায় তারা নিজস্ব একমাত্র আবাসস্থল অবাসযোগ্য করে তুলছে? কিসের নেশায় তাদের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহের তাপমাত্রা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাড়িয়ে চলছে? সহস্রাধিক বছরব্যাপী তারা জ্বালানি ব্যবহার করে পৃথিবীর পরিবেশ ক্রমাগত উত্তপ্ত করছে। এর ওপর বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা আসলে কারে ধ্বংস করছে? কোন অমূল্য সম্পদ আহরণের লোভে তারা সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতায় অঢেল অর্থ ব্যয় করছে? যুদ্ধই কি সবকিছুর একমাত্র সমাধান?
মারণাস্ত্র শুধু পৃথিবীর পরিবেশ ধ্বংস করে, সেটা নিশ্চয়ই অজানা নয়। তাইলে এমন কী বাকি আছে, যা পেলে মানবজাতি এগ্রহের পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলবে? তবে কি তারা কোনও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে স্বজাতির সাথে শত্রু শত্রু খেলা খেলছে? নৈতিকতার নামে তারা প্রতিনিয়ত নিজেরাই নিজেদের অজ্ঞেয়, অজানা ও অপ্রমাণিত কতিপয় আদর্শের গুহায় অবরুদ্ধ করছে! তারা যে যার বিশ্বাসের গুহার বাইরে কিছু নেই বলে ভাবছে।
ন্যায়-অন্যায়ের পারলৌকিক বিধানের অমোঘনীতি স্বতঃসিদ্ধ করার জন্য কল্পলোকের মহাশক্তির নামে, নিজেদের মধ্যে মরণঘাতী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছে। দরকার হলে ভাইয়ের রক্তে ভাই হাত রাঙাচ্ছে! কিন্তু মানুষ ভেবে দেখে না যে, তাদের বিশ্বাসের আদর্শের গুহাই শেষ কথা নয়। গুহার বাইরে বিশৃঙ্খলার শৃঙ্খলের আয়তন অসীম, অগণ্য ও অপরিসীম। সেই অসীমের সীমা যিনি নির্ধারণ করেছেন, তিনি ক্ষুদ্রের জন্য নৈতিকতার নামে গুহায় বন্দিদশার জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন, আর তা মানবজাতির মাঝে স্থায়ী শত্রুতার দেয়াল করে রাখবে; এমন হতে পারে না। নিজের সৃষ্টিকুলের জন্য নিজেই শাস্তি বা পুরস্কার দিবেন, তাইলে কাজের স্বাধীনতার জন্য দায়ী কে? এসব কথাবার্তা সৃষ্টিকুলের জন্য সত্য হলেও স্রষ্টার জন্য নয়। তেমন হলে সৌরালোক, বায়ু কিংবা পানির মতো জীবনরক্ষার প্রাকৃতিক বস্তুগুলো তার কথিত বিধান মেনে চলা লোকরা শুধু ব্যবহার করতে পারতো এবং অন্যরা ধ্বংস হয়ে যেতো।
কার্যত তার দেওয়া এমন কোনও আদর্শ থাকতে পারে না, যা অগ্রাহ্য করে কেউ তার প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। অথবা মানুষ তার নাম ভাঙিয়ে নিজেদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করবে। কেননা সর্বজনীন এমনকোনও নৈতিক আদর্শ আজও কেউ দেখাতে পারেনি, যা দেশ, কাল, পাত্রভেদে সমতা বিধান করতে পারে। বস্তুত মহাপ্রভুর যেকোনও ব্যবস্থা নির্দিষ্ট একটি জাতি বা গোষ্ঠীর মাঝে সীমাবদ্ধ হওয়া অযৌক্তিক।
যেহেতু কোনও ধারণকৃত আদর্শ সামান্যীকরণ সম্ভব নয়, সেহেতু প্রচলিত নৈতিক আদর্শগুলো মানব তৈরি, মহাজাগতিক নয়। কারণ মহাজগতের নিয়মগুলো ত্রিমাত্রিক নয়, এমনকি চতুর্মাত্রিকও নয়— পঞ্চমাত্রিক কিংবা হলোগ্রাফিক হলেও সে সম্মন্ধে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। এসবের মহাপ্রভুর প্রত্যয় হ্যাঁ-বা-না, এরূপ যেকোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠিগত বিশ্বাস সামান্যীকরণ সম্ভব নয়! স্রষ্টার ক্রোধের স্বরূপ মানবীয় ভাবনাতুল্য হলে নাস্তিকরা একমুহূর্তও বেঁচে থাকতো না। কেননা স্রষ্টা অবশ্যই নির্দিষ্ট কোনও মাত্রায় সীমিত না।
সুতরাং তার নামে মানবজাতি পারস্পরিক শত্রুতামূলক মনোভাব গড়ার আদর্শ কখনও মহাজাগতিক নিয়মের সাথে একীভূত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। অথচ এজাতীয় কাজ দ্বারা ক্রমশ নিজেদের ধ্বংসের পথ তারা নিজেরা রচনা করছে। দৈনিক গৃহস্থলী কাজের আগুন, কলকারখানা, যান-বাহনের ধোঁয়া এবং অন্যান্য অগণিত জ্বালানি থেকে নির্গত বিষবাষ্প পৃথিবীর পরিবেশ প্রতিমুহূর্তেই গরম করছে। অতঃপর সুযোগ পেলেই এক দেশ অন্যদেশের ওপর বোমা হামলা করছে। ফলে পৃথিবীর আবহাওয়া জ্যামিতিকহারে বাড়ছে। প্রতিবছর গরমকালের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেরুঅঞ্চলের গ্রীষ্মকাল প্রতিবছর দীর্ঘা‌য়ত হচ্ছে!
তাই মেরুঅঞ্চলের বড় বড় বরফের চাই গলে যাচ্ছে। সাথে সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এভাবে একাদিক্রমে মেরুঅঞ্চলের বরফ গলতে থাকলে একপর্যায় পৃথিবীগ্রহে স্থলভাগের পরিমান দশশতাংশ এমনকি দশমিক একের নিচে নেমে যাবে। পৃথিবী তখন একটি অখণ্ড মহাসমুদ্রে পরিণত হবে। বস্তুত কোনও অভিজ্ঞতার আগে মানুষ কিছুই অনুধাবন করতে পারে না।
মানবকুলের আবাসভূমি যখন নোনা জলে ভরে যাবে, তখন তারা বুঝবে যে, পিছনে কতো ভুল হয়ে গেছে! মানুষের অভাব বুঝি এমন একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার!

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge