মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৫৪ পূর্বাহ্ন

মানবিক-সুজিত মণ্ডল

মানবিক-সুজিত মণ্ডল

মানবিক
সুজিত মণ্ডল

–স্যার আসবো ? হ্যাঁ, আসুন। দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকেই প্রশ্নটা করলেন বছর সাঁইত্রিশ-এর এক মহিলা।
–আপনি তো ঘরে ঢুকেই গেছেন। তাহলে নতুন করে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বলুন কি বলবেন?
–সত্যিই তো আমি ঘরে ঢুকে গেছি। আর অনুমতি নেওয়াটা বৃথা। এই বলে আইসি সাহেবের টেবিলের সামনে এগিয়ে এলেন ওই মহিলা।
–বলুন কি বলবেন ? তার আগে মুখের মাস্কটি খুলে, একটু জোরে বলুন।
ঘরে সেই সময় আইসি রাজকুমার মালাকারের সামনে বসা দুই সাংবাদিক। টেবিলের একটু কাছাকাছি এসে মুখের মাস্কটি খুলে বলা শুরু করলেন ওই মহিলা। বললেন : জুন মাসের বাইশ তারিখে কুপার্স ক্যাম্প এলাকায় তার একমাত্র ছেলে মোটরবাইক অ্যাক্সিডেন্ট করে আহত অবস্থায় প্রথমে রানাঘাট মহকুমা হাসপাতাল, তারপর চূড়ান্ত শারীরিক অবনতিতে কল্যাণী জহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল হাসপাতাল,এরপর কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে টানা বারো দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়াই শেষে শেষমেষ ৩রা জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। কথাগুলো একনাগাড়ে বলে চলছিলেন পুত্রহারা মা। ঘরে থাকা দুই সাংবাদিক এবং আইসি সেই মায়ের করুণ কাহিনী একমনে শুনছিলেন। বলতে বলতে মিনতি দাস নামের ওই অসহায় মায়ের দু- চোখ গড়িয়ে অঝরে জল পড়ছিল তখন।
–আমার স্বামী নেই। তার ওপর বছর কুড়ির ছেলেটা মারা গেল স্যার। খুব কষ্ট পেয়ে প্রাণটা দেহ থেকে বেরিয়েছে ওর।
বলতে বলতে হাতে রাখা প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে এক গোছা কাগজ বার করলেন তিনি। এরপর বললেন : বাবার মতো ছেলেও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। তবে ছেলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেতে এই যাতায়াতের অসুবিধার সময় ভীষণ কষ্ট করে, পরপর দু-দিন এন্টালি থানায় গিয়ে রিপোর্ট পাইনি স্যার। দেখুন না আপনার থানা থেকে দু-দুবার কাগজ নিয়ে লিখে দেওয়ার পরও ছেলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেলাম না।
মায়ের করুণ আর্তি একমনে শুনছিলেন রাণাঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর রাজকুমার মালাকার। সমস্ত কিছু শুনে তার হাত থেকে কাগজগুলো নিয়ে একমনে পড়ে ফেললেন তিনি। সে সময় ওই ঘরে বসা দুই সাংবাদিকদের মধ্যে একজন বলেই বসলেন : এইভাবে হয়রানি করার কোনো মানেই হয় না।
কথাটা হয়তো শুনে নিয়েছিলেন আইসি সাহেব। কিছু মুহূর্ত স্তম্ভিত থাকার পর, হঠাৎ করে টেবিলে রাখা কলিংবেলে ডান হাতের অনামিকা আঙুল দিয়ে আলতো করে টিপে দিলেন। সুইচে চাপ পড়তেই কলিংবেলের হালকা আওয়াজ শোনা গেল ঘরের মধ্যে থেকেও। মুহূর্তের মধ্যেই বাইরের মহিলা কনস্টেবল হালকা করে দরজা খুলে ঘরের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে বললেন : স্যার, বলুন।
–এসআই ঝুমুর এবং অপূর্ববাবুকে ডাকুন। তার কয়েক মিনিটের মধ্যে একে একে ঢুকলেন অপূর্ববাবু এবং ঝুমুর ম্যাডাম। ওই ঘরে তখন টিভিতে এবিপি আনন্দ চ্যানেলের শিরোনামে চলছে বর্ষীয়ান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মহিলা পুলিশকর্মী ঘরে ঢুকে আইসি-র টেবিলের ডান পাশে দাঁড়াতেই, রীতিমত উচ্চঃস্বরে তাকে আইসি বললেন : এগুলো কি ছেলেখেলা ? একটা মানুষকে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে ? পরপর দু-বার থানায় আসা ওই মহিলাকে কোন অফিসার এইভাবে ভুল লিখে দিয়েছেন যে, তার হাতে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিয়ে দেওয়া হোক বলে ? তিনি কি জানেন না, এইভাবে কাউকে দেওয়া যায় না ? দিতে গেলে সঠিক নিয়মে আবেদন করতে হয় ? উচ্চঃস্বরে আইসির কথা শুনে এক প্রকার নির্বাক হয়ে যান দুই পুলিশকর্মী। এরপর কিছু সময় থমকে থেকে আইসি অপূর্ববাবুকে বলেন : শুনুন আমি বলছি, আর আপনি সেই কথাগুলো লিখুন। তৎক্ষণাৎ ফটো কপির নিচে ফাঁকা অংশে আইসির কথামতো তার বলা ইংরেজি শব্দ সম্ভার ধীরে ধীরে লিখলেন অপূর্ববাবু। সবশেষে মহিলা পুলিশকে নির্দেশ দিলেন,এই কথাগুলো টাইপ করিয়ে আমাকে এবং মৃত ছেলেটির মা-কে দিয়ে সই করিয়ে নেবেন।
সবশেষে অসহায় মা-কে উদ্দেশ্য করে আইসি বললেন : আর আপনাকে হয়রানি হতে হবে না। আজকের দেওয়া কাগজ নিয়ে এন্টালি থানায় দেখালেই আপনাকে ছেলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিয়ে দেবে। তবে যাওয়ার সময় অবশ্যই আপনার পরিচয়পত্র মানে ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
কথাগুলো শুনে কেমন যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে অসহায় ওই মা আইসিকে বললেন : আপনার অশেষ কৃপা।
সে সময় ঘরে বসা দুই সাংবাদিকদের চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেওয়া চায়ের কাপ দুটি প্লেটে রেখে,আইসি সাহেবের টেবিলের এক কোণে বসিয়ে, আসছি বলে ঘর ছাড়লেন তারা।
সমস্তটাই কর্তব্য হলেও, মানবিকতার পরিচয় দেখানো মানুষ হাতে গোনা। হাতে গোনার মধ্যে আইসি সাহেব যে পড়েন, একথা অসহায় সদ্য সন্তান হারানো মাও অকপটে বলে ফেললেন।
জয় হোক মানবিকতার। জয় হোক মানুষের।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge