বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১০:০৫ অপরাহ্ন

ভ্রমণ: দিল্লি থেকে কাশ্মীরের পাহাড়ে পাহাড়ে-স.ম. শামসুল আলম

ভ্রমণ: দিল্লি থেকে কাশ্মীরের পাহাড়ে পাহাড়ে-স.ম. শামসুল আলম

পরিবারের সবাইকে নিয়ে কাশ্মীর যাবার পরিকল্পনা হলো। সবাই বলতে স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রসহ আমরা চারজন। কাশ্মীরে কোথায় কীভাবে যাওয়া হবে না হবে সে দায়িত্ব দেয়া হলো আমার ছেলে আননকে। তাহলে শুরু থেকেই শুরু করি।

অগ্রিম টিকিট করা হলো দিল্লির। ঢাকা থেকে যেদিন রওনা হলাম, তারিখটি ছিল ১৪.০৫.২০১৭। ভোরে উঠে আমরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গেলাম। ফ্লাইটে দিল্লি পৌঁছালাম সকাল সাড়ে ১১টায়। ইন্দিরাগান্ধী এয়ারপোর্টে নেমে বেশ খানিকটা সময় দেরি করতে হলো টাকা পরিবর্তন, ট্যাক্সি ও হোটেল বুকিং নিয়ে। ট্যাক্সিতে গিয়ে উঠলাম হোটেল লি রোই (Hotel Le Roi)-তে। সেখানে একজন বাংলাদেশী কেয়ার টেকার তাবরেজ আলম আমাদেরকে টেককেয়ার করল। সিম নেয়ার ব্যবস্থা করে দিল সে, কিন্তু চালু হলো না। দুপুরে এখানেই খেয়ে নিলাম। বিকালে চাঁদনি চক গেলাম। শাড়ির মার্কেট ও অন্যান্য স্থানে ঘোরাঘুরি করলাম। রুমে ফিরে আবার রাতে বের হলাম। ট্যাক্সি নিয়ে সবাই গেলাম আমাদের হোটেল থেকে বেশ দূরে করিম হোটেলে রাতের খাবার খেতে। গিয়ে দেখি সেখানে প্রচুর ভিড়। অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন, ফলে লাইন ধরে সিরিয়াল পাওয়া গেল চেয়ার-টেবিলে বসার। তবে খুব ভালো খাবার খেয়ে সিরিয়ালে থাকার কষ্টটা ভুলে গেলাম। রুমে ফিরলাম রাত সাড়ে ১০টার পর।

পরদিন সকালে দিল্লি থেকে রওনা হব বলে ৩ দিনের জন্য প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করা হলো। গাড়িতে সকাল ১১টার পর আগ্রা পৌঁছালাম। পথে Highway Restaurant-এ নাস্তাটা ভালো হলো না। পোড়া-পোড়া আলু-পরাটার স্বাদ তেতো-তেতো লাগল। আগ্রা গিয়ে হোটেল তাজ প্লাজা (Hotel Taj Plaza)-তে উঠলাম। ড্রাইভার দুপুরে Indiana Kitchen-এ নিয়ে গেলে সেখানে খঁহপয ভালো হলো। হোটেলে ফিরে ঘণ্টা দুই ঘুমালাম। হোটেল থেকে জানালা দিয়ে তাজমহলের চ‚ড়া দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু প্রচণ্ড রোদ আর উচ্চ তাপমাত্রা থাকার কারণে বেরোলাম না। বিকালে বের হয়ে পাশেই অবস্থিত ঐতিহাসিক তাজমহল দেখতে গেলাম। বিদেশী বলে টিকিটের দাম অনেক বেশি নিল। ভেতরে যেতে টমটম গাড়িতে চড়তে হলো। কেননা অন্য সব গাড়ির ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। আমাদের ভাড়া-গাড়ি বাইরে থাকল। তবে ঐতিহাসিক তাজমহল ঘুরে ঘুরে দেখতে ভীষণ ভালো লাগল। অনেকদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় সবাই খুশি হলাম। পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্যের একটি এত কাছে থেকে দেখতে পেয়ে আনন্দে মন নেচে উঠল। ছবি তোলা হলো। একবার ঘাসের মাঠে বসে, একবার ফোয়ারার পাশে দেয়ালে বসে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা হলো। তাজমহলের পেছন দিকে গিয়ে নদী দেখলাম ও সামনের দিকে বেশ খানিকটা দূরে হেঁটে গিয়ে পুরানো ইমারতগুলো দেখলাম যেখানে হয়ত সম্রাট শাহজাহানের লোক-লস্কর বসবাস করত। চারদিক ঘুরেফিরে দেখে Domino’s থেকে Pizza খেয়ে হোটেলে ফিরলাম রাতে। গতকাল নেয়া SIM অনেক ঝামেলা পোহায়ে রাত ১০টায় চালু হলো। অনেকটা স্বস্তি পেলাম। পর্যটকদের জন্য সিমের এমন ঝামেলা যে কাশ্মীরকে নিয়ে, সেই কাশ্মীরে যাওয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।

পরদিন ১৬ই মে ছিল আমার আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী। ভোরে উঠলাম ঘুম থেকে। কিন্তু ছেলেমেয়েরা দেরিতে উঠল, ফলে ৫টার পরিবর্তে সাড়ে ৬টায় বের হলাম। আজমীর শরীফ যাবার পথে ফতেহপুর সিক্রি দেখতে গেলাম। এটা আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না। কিন্তু ব্যাংক থেকে ডলার নেবার সময় পরিচিত একজন অফিসার ফতেহপুর সিক্রির কথা বলেছিলেন। ভদ্রমহিলা নাকি বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছেন। তিনি আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন বিধায় সেখানে গেলাম। তাঁর কথা অমূলক নয়। বাদশাহ আকবরের স্মৃতিময় এই জায়গা এখনো অনেক সুন্দর। ভীষণ ভালো লাগল। সম্রাট আকবরের রাজপ্রাসাদ, রাণীদের মহল, নর্তকীদের নাচের স্থান, ফোয়ারা, নায়েব-গোমস্তাদের বাসস্থান, কবরস্থান, ইবাদতখানা, নহবতখানা, বীরবল মহল প্রভৃতি দেখে মুগ্ধ হলাম।

ফতেহপুর সিক্রি থেকে জয়পুর হয়ে সোজা চলে গেলাম আজমীর শরীফ। Lunch করতে বিকাল ৪টা বাজল। আজমীর শরীফের ভেতরে আমি স্ত্রীকে নিয়ে ঢুকলাম। কন্যা উফা ও পুত্র আনন বাইরে থাকল। কারণ জুতা ও ব্যাগের ঝামেলা, এগুলো নিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয় না। সেখান থেকে বের হয়ে কিষানগড়ের দিকে একটু ঘোরাঘুরি করে জয়পুর ফিরতে রাত ১০টা বাজল। হোটেল কিং প্যালেস (Hotel King Place)-এ উঠে রাত যাপন করলাম।

সকালে ঘুরতে বের হলাম। রাজা মান সিং-এর বাড়ি গেলাম পাহাড়ের উপরে। সাথে গাইড। সে আমাদের সাথে গেল মোটর সাইকেলে। উফা হাতিতে চড়ে যেতে চাইলে না করলাম দুর্ঘটনার ভয়ে। কিন্তু হাতির পিঠে চড়ায় দুর্ঘটনার কোনো কারণ নেই। তবুও গাড়ি নিয়েই পাহাড়ে উঠলাম, যদিও বেশ খানিকটা ঘুরে যেতে হয়। রাজপ্রাসাদের সিংহদরজা অনেক চওড়া আর উঁচু। হাতি-ঘোড়া প্রবেশ করতে পারে অনায়াসে। ভেতরে প্রবেশ করে কক্ষগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। হাতির সাথে ছবি তুললাম বিল্ডিংসহ। বেশ মজার জায়গা। গাইডের কাছ থেকে জানতে পারলাম, শত্রæরা যাতে আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য এত উঁচুতে রাজপ্রাসাদ তৈরি করা হয়েছে। আর প্রাসাদের সীমানা প্রাচীর পাহাড়ের ঢালু বেয়ে অনেকগুলো, যাতে শত্রæদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ফেরার পথে দেখলাম জলাধারের মধ্যে একটি চমৎকার প্রাসাদ। প্রাসাদের চারদিকে পানি আর পানি। প্রাসাদের নাম জলমহল। এটাও হয়তো শত্রæর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। দূর থেকে, অর্থাৎ রাস্তা থেকে এই জলমহল দেখতে মন্দ লাগছিল না।

জয়পুরের উত্তরাধিকার রাজার বাড়িতে গেলাম। সিটি প্যালেস। সেখানে জাদুঘর দেখে ভালো লাগল। গাইডের সাথে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখলাম। এরপর কেনাকাটা করতে Shopping Mall-এ গেলাম। বেশ কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনলাম। রওনা হতে ৪টা পার হলো। দিল্লি পৌঁছাতে রাত ১১টা। এই তিন দিনে ড্রাইভারটার আচরণ মোটেই ভালো লাগেনি, তবু তাকে ১০০০ রুপি বকশিস দিলাম। Hotel Le Roi-তে তাবরেজ আলম রুম ঠিক করে রেখেছিল। তাকে ফোনে আগেই বলে রাখা হয়েছিল। সে দৌড়াদৌড়ি করায় তাকেও ১০০০ রুপি বকশিস দিলাম। অনেক রাত পর্যন্ত ৪ জন গোছগাছ করলাম। ভোরের ফ্লাইটে শ্রীনগর যেতে হবে।

গতরাতে মাত্র ঘণ্টা দেড়েক ঘুম হলো। ভোরে উঠে তৈরি হয়ে ৫টায় রওনা হলাম ট্যাক্সিতে। ইন্দিরাগান্ধী এয়ারপোর্ট থেকে জম্মু হয়ে শ্রীনগর পৌঁছালাম সকাল সাড়ে ১০টায়। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একটি জিপ গাড়ি ভাড়া নিলাম। Hotel Duke-এ উঠলাম। এই হোটেলটির সামনে একটি বড়সড় লেক। লেকের মধ্যেও সুন্দর সুন্দর ভাসমান হোটেল। ভাসমান হোটেলগুলো অবশ্য একেকটা বড় বড় লঞ্চের মতো করে তৈরি। সেখানে নৌকায় করে গিয়ে উঠতে হয়। তবে আমাদের হোটেলটি ভালো লাগল একারণে যে, সামনেই পাকা সড়ক এবং সড়ক-ঘেঁষেই লেকটি অবস্থিত। হোটেল থেকে লেকের সৌন্দর্য অবলোকন করা যায়।
একটু বিশ্রাম নিয়ে বের হয়ে Lunch করলাম Ahdoo’s-এ। এরপর বেশ কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করলাম, বিশেষ করে শীতের পোশাক। আমি অবশ্য আগে জানতাম না যে এত ভারী পোশাক কেন প্রয়োজন। আননকে প্রশ্ন করে জানলাম, আরও কঠিন শীতের মধ্যে যেতে হবে। রুমে ফিরলাম বিকাল ৫ টায়। ঘুমালাম রাত ৮টা পর্যন্ত। তারপর বের হয়ে দরবার মুঘল-এ গিয়ে ডিনার করলাম। ফিরে এসে নৌকা ভাড়া নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ঘুরলাম লেকের এ-মাথা ও-মাথা। নৌকায় ঘুরতে বেশ মজা লাগল। নৌকায় বসেই একটি দোকান থেকে চিপস ও চকোলেট কিনলাম। এভাবেই দোকানগুলো তৈরি করা হয়েছে ভ্রমণপিপাসু লোকের জন্য। রাত সাড়ে ১১টায় রুমে ফিরলাম।

পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় বের হয়ে পাহালগাম গেলাম, দুদিনের জন্য ভাড়া করা গাড়িতে (অবশ্য গতকালের জিপ গাড়িটাই ঠিক করা হয়েছিল)। পথে ঝরনার গড়ানো জল আর পাহাড় দেখে মুগ্ধ। নয়নাভিরাম দৃশ্য। পাহালগামের পাহাড়-চ‚ড়ায় উঠলাম আমরা ৪জন ৪টি ঘোড়ায় চড়ে। দুজন সহিস ও একজন ফটোগ্রাফার ছিল সাথে। অত উঁচুতে উঠতে পেরে আনন্দের সীমা নেই, যদিও ঘোড়ায় দীর্ঘক্ষণ চড়ে থাকতে অস্বস্তি লাগছিল। পাহাড়ের চ‚ড়ায় সবুজ একটি চত্বরে ঘোরার সময় রাজকীয় আদিবাসী পোশাক ভাড়া নিয়ে ছবি তোলা হলো। আকাশ, পাহাড় আর সবুজ গাছের মিলনমেলা দেখতে অপূর্ব লাগল। সেখান থেকে নামার সময় ঘোড়ার তেমন কষ্ট হলো না। ৮ হাজার ৪ শ রুপি দিলাম ঘোড়া ভাড়া। সহিসকে বকশিস দিলাম ৫ শ রুপি। বিকালে বেশ খানিকটা বৃষ্টি হলো ঘোড়ার সফর শেষ হলে। সেখানে কিছু দোকানপাট ঘুরে ঘুরে দেখলাম। শ্রীনগর ফেরার পথে Ahdoo’s থেকে Dinner করে হোটেলে ফিরলাম রাত ১১টায়। গতরাতে ভালো ঘুম হওয়ায় খুব স্বস্তি পেয়েছিলাম। আজ আবার ক্লান্ত লাগল। বিশেষ করে ঘোড়ায় চড়ার ধকল সইতে কষ্ট হচ্ছিল। সেটা শারীরিক, কিন্তু মানসিক প্রশান্তি ছিল অত উঁচু আর সুন্দর সুন্দর পাহাড় ও গাছগাছালি দেখে।

গতরাতে অবসাদগ্রস্ত থাকায় ভালো ঘুম হলো বলে সকালে বের হতে সাড়ে ৮টা বাজল। Ahdoo’s থেকে নাস্তা করে গুলমার্গের উদ্দেশে রওনা হলাম। অনেক আঁকাবাঁকা রাস্তা এবং পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে চলতে বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম, শিহরিত হচ্ছিলাম। কোথাও কোথাও থামতে হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে। গুলমার্গ গিয়ে বিশেষ ধরনের জুতা অর্থাত গামবুট ভাড়া নিলাম। শীতবস্ত্র আগেই কেনা হয়েছিল। সেগুলো পরেও স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রচন্ড শীত অনুভব করলাম। গাড়িতে করে ৯ হাজার ফুট উপরে পাহাড়ে উঠা গেল। বাকি পথ Rope Way-তে উঠে সাড়ে ১৪ হাজার ফুট উপরে উঠলাম। বরফ বেয়ে আরো উপরে। তবে এই বরফ বেয়ে উপরে উঠানোর পদ্ধতি আমার পছন্দ হয়নি। মানুষ আমাদেরকে টেনে তুলল বলে ভীষণ খারাপ লাগল। আমরা ছোটবেলায় যেভাবে সুপারি গাছের সুপারি-খোলায় করে একে অপরকে টেনে নেয়ার খেলা খেলতাম, ঠিক সেভাবেই লোকগুলো টেনে তুলল বরফের ওপর দিয়ে। সুপারির খোলার স্থলে তারা বানিয়ে নিয়েছে কাঠের তৈরি এক ধরনের ডোঙা। সেই ডোঙাতে উঠিয়ে একজনকে টেনে তুলছে আরেকজন লোক। তারা আল্লাহ-আল্লাহ বলে চিতকার করতে করতে টান দিচ্ছে দেখে ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। এবং জানলাম তারা মুসলমান। এটা মেনে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই, কেননা সেখানে অন্য ব্যবস্থা নেই।
বরফের সাথে আর পাহাড়-পাথরের সাথে দু ঘণ্টার অধিক সময় কাটালাম সেখানে। চারদিকে শুধু বরফ আর বরফ- বরফের পাহাড়। সাদা-কালো-সবুজ-খয়েরি রংবেরঙের পাহাড় দেখে মনটা গলে গেল বরফের মতোই। নামার সময়ও ঐ লোকদের সাহায্য নিতে হলো। তখন অবশ্য পিচ্ছিল বরফকে আরও পিচ্ছিল মনে হলো, তার মানে দ্রæত নেমে পড়া গেল। তাদের তেমন কষ্ট হলো না। এই লোকদেরকে প্রাপ্য মজুরি অর্থাত সম্মানী দিলাম। মনে হলো খুব গরিব ও অভাবী তারা, সম্মানী পেয়ে তাদের চোখে-মুখে বিস্ময় আর আনন্দ প্রকাশ পেল।
অপরদিকে, Rope Way-তে উঠতে জনপ্রতি ১৬০০ রুপি টিকিটের মূল্য অনেক বেশি মনে হলো। তবু শান্তি পেলাম প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখে। বিস্মিত হলাম। Rope Way-তে ফেরার সময় মাঝের Station-এ নেমে দুপুরের খাবার খেলাম। ঘোড়া ভাড়া জনপ্রতি ৮০০ টাকা দিলাম বৃথা। কেননা ঘোড়ায় অত ঘোরা হলো না। নয়নাভিরাম দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসাতে ভাসাতে শ্রীনগর ফিরতে রাত ৮টা বাজল। কাশ্মীর এলাম আর শাল নিব না তা কি হয়? মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটা করলাম, কাশ্মীরি শাল ও অন্যান্য। দ্রæত হোটেলে ফিরলাম Dollar পরিবর্তন করে রুপি নেয়ার জন্য। ডলার ভাঙিয়ে দুদিনের ভাড়া দিয়ে গাড়ি বিদায় দিলাম। নতুন একটি জিপ গাড়ি ঠিক করা হলো কার্গিল যাবার জন্য। কার্গিল যেতে নির্ধারিত গাড়ি নিতে হয় এটাও আগে জানা ছিল না। রাতে রুমে ফিরে লাগেজ গোছালাম।

শ্রীনগর থেকে সাড়ে ৫টায় রওনা হয়ে কার্গিল গিয়ে পৌঁছালাম বিকাল সাড়ে ৩টায়। পথে কয়েকবার যাত্রা বিরতি দিলাম। পাহাড় ও ঝরনার খেলা দেখতে ভালো লাগল। বরফ একটু একটু গলছে, সেই বরফের ওপর দিয়ে হাঁটতে ভালো লাগল। নাস্তায় আজ দেশীয় ধরন ছিল বলে মজা করে নাস্তা করলাম। কার্গিল যুদ্ধের স্মৃতি জাদুঘরে গেলাম বাথরুমের উসিলায়। কিন্তু সেখানে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগল এবং সেখানকার সিঙারা-জুসও খেতে ভালো লাগল। মূল সড়কের পাশে এমন একটি স্মৃতিস্থান দেখে আনন্দ পেলাম।
পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে রাস্তা চলতে বেশ ভয় করছিল। একদিকে কয়েক হাজার ফুট নিচু, অপরদিকে বরফের চাঁই বা পাথর গড়িয়ে পড়ার ভয়। তবু অনেক আনন্দ পেলাম এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন হলো। চারজনই খুব খুশি। কার্গিল এসে Hotel Royal Gasho-তে উঠলাম। নতুন গাড়ির চালকও অনেক ভালো। বিকালে দুপুরের খাবার হিসেবে ঝধহফরিঃপয খেয়ে বের হয়ে কার্গিল বসতি এলাকা ঘুরে দেখলাম। সন্ধ্যায় ঘুমানোর চেষ্টা। রাতে হোটেলের সাথে সংযুক্ত রাতের খাবার খেলাম। আগামীকাল লাদাক যাবার পরিকল্পনা।

সকালে কার্গিল থেকে রওনা হয়ে লাদাকের লেহ্ (Leh) শহরে গেলাম। পথে তুষারপাতের দৃশ্য দেখে গাড়ি থামান হলো। বৃষ্টির মতো তুষার পড়ছিল, তার মধ্যে আমরা ছবি তুললাম অনেক মজা করে। মোটা জ্যাকেট থাকায় অসুবিধা হলো না। পাহাড়ের উঁচুনিচু ও আঁকাবাঁকা পথে আসতে তেমন ভয় করেনি আজ। রাস্তা বেশ ভালো ছিল। এখানে ভ্রমণের জন্য পাশ নিতে হয় ডিসি অফিস থেকে। সেখানে বেশ হ্যাপা। দালালকে দায়িত্ব দেয়া হলো। হোটেল হিমালয় ভিলাতে উঠলাম Diner ও Breakfastসহ, দুদিনের জন্য। শ্রীনগর থেকে আনা গাড়ি ছেড়ে দেয়া হলো ভাড়া মিটিয়ে। আগামীকালের জন্য নতুন গাড়ি ঠিক করা হলো, কেননা শ্রীনগরের গাড়ি খারদুংলা যাবে না। তার মানে যে-পথে যে চালকের অভিজ্ঞতা আছে সে সেই পথে চলবে এটাই নিয়ম। দুপুরের খাবার বিকাল ৫টায় হিমালয় ভিলাতে খেলাম। বিকালে মার্কেটে গেলাম হেঁটে হেঁটে। বিমানের টিকিটের জন্য অগ্রিম বুকিং দিলাম পরশুদিন দিল্লি যাব বলে।

সকালে নাস্তা করে বের হলাম ভাড়া করা জিপ গাড়িতে। রাস্তার একস্থানে বেশ লম্বা জ্যাম। আমাদের Driver বেশ কৌশলে একজন পুলিশ সাথে নিয়ে Wrong Side দিয়ে জ্যামটি অতিক্রম করল। আমরা যেন ভিআইপি মর্যাদা পেলাম। সবার আগে পৌঁছে গেলাম খারদুংলা টপ। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘুরে ফিরে ১৮ হাজার ফিট উপরে গিয়ে সবারই বেশ অস্থির লাগল। শুধু বরফ আর বরফ। শ্বাস-প্রশ্বাসে বাধা-বাধা লাগল। সেখানে সেনাবাহিনীর পরিচালনায় একটি দোকান আছে, সেই দোকান থেকে নুডুলস ও চা খেতে ভীষণ ভালো লাগল। এই অমৃত খেয়ে বেশ স্বস্তি অনুভব করলাম আমরা। মনে হলো নুডুলসের ভেতর অক্সিজেন দেয়া।
দুপুর ১টার মধ্যে ফিরে এলাম লেহ্ শহরে। দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুরলাম সারা শহর। বৌদ্ধ মন্দিরেও গেলাম শান্তি স্তূপে। বিমানের টিকিট করা নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হলো। গতকাল যে-লোক অগ্রিম টাকা নিয়েছিল সে টিকিট দিতে পারল না। রুমে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে টিকিটের খোঁজে গেলাম। অবশেষে অনেক বেশি দামে দিল্লির টিকিট কিনতে হলো। হোটেলে ফিরে খোলা জায়গায় বসে ৪ জন ঘণ্টা দেড়েক গল্পগুজব করলাম। ভ্রমণের আনন্দে সবাই আত্মহারা।

লেহ্ থেকে পরদিন অর্থাত ২৪শে মে সকালে বিমানে উঠে দিল্লি এসে পৌঁছালাম সকাল সাড়ে ১১টায়। হোটেল The Class-এ উঠলাম। বের হয়ে ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে Shopping Mall গেলাম। সেখান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করলাম। দিল্লি হাটও গেলাম। অনেক ঘুরে শেষে হোটেলের লোকের মাধ্যমে ঢাকা যাবার জন্য বিমানের টিকিট করা গেল। আগামী পরশু ২৬শে মে ভোরে দিল্লি থেকে কলকাতা, তারপর বিকালে কলকাতা থেকে ঢাকা।

আজকের দিনটি (২৫শে মে) বিশ্রামের। সকালে নাস্তা করে সারাদিনের জন্য ভাড়া করা ট্যাক্সিতে Shopping Mall গেলাম এবং সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে রাতে রুমে ফিরে সব মালামাল গুছিয়ে লাগেজে ভরলাম। ভোরে উঠে রওনা হতে হবে ঢাকার উদ্দেশে।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge