মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:২৭ পূর্বাহ্ন

ভ্রমণ# তিস্তা ভ্রমণে জলজ সাহিত্য আসর-সোহানুর রহমান শাহীন

ভ্রমণ# তিস্তা ভ্রমণে জলজ সাহিত্য আসর-সোহানুর রহমান শাহীন

এবার কোথায় যাওয়া যায়, তা নিয়ে ঈদের আগে থেকেই খোঁচা মারছিল কবি মজনুর রহমান। বেশ ক’বছর থেকে বিভিন্ন সময়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি সকাল-সন্ধ্যার ভ্রমণে।
বাংলায় বৈশাখ হলেও ঝড়-বৃষ্টি, বাতাস তুফান কিচ্ছু নেই। নেই কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় পানিটুকুও।
নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে এবারের যাত্রাপথ নির্ধারণ হয়, গঙ্গাচড়া উপজেলায় মহিপুর এলাকার তিস্তার বুকে।


বাসা থেকে বের হবার সময়ে বাইক পরীক্ষা নীরিক্ষা করে। নিয়মমাফিক পরীক্ষায় ধরা পরে বাইকে পেট্রোল নেই মোটেও। রিজার্ভ তেলে বাসা থেকে পৌনে এক কিলোমিটার দূরত্বের পেট্রোলপাম্প পর্যন্ত যেতে পারলে হয়।
মাঝপথে অপেক্ষমাণ বন্ধু মেহেদী হাসান শাপলাকে পিছনে তুলে নিয়ে পেট্রোল পাম্পের কাছে গিয়ে দেখি, পূর্ব ঘোষিত লোডশেডিং এর জন্য পাম্প বন্ধ। টাউন হল গেটের কাছে খোলা পেট্রোল পাওয়া যায়। সেই ভরসায় বুকে বল নিয়ে এগিয়ে যাই। আমদের একত্রিত হবার স্থানও সেখানেই। কোনোরকম বাধবিঘ্ন ছাড়া চত্বরে গিয়ে দেখি পেট্রোলের দোকান বন্ধ! এবার যেতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়। আমাদের যাত্রাও সেইপথে।
আগে থেকেই কবি মজনুর রহমান, ছড়াকার শরিফুল আলম অপু, কবি- গল্পকার ফেরদৌস রহমান পলাশ, শামসুজ্জামান সোহাগ উপস্তিত। বেঞ্চে বসে চা পান করছেন। কবি আদিল ফকির মুখদর্শন দিয়ে সিটি বাজারের দিকে পা বাড়ায়- অল্প সময়ে ফেরার আশ্বাসে। ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে ছবি দিয়ে অবগত করেছেন কবি ও সংগঠক জাকির আহমদ, কবি মুস্তাফিজ রহমান। দুই কবি ও শিক্ষক মাজহারুল মোর্শেদ এবং মোহাম্মদ আব্দুল জলিল সড়কপথে বাইক নিয়ে আসছেন। এখন অপেক্ষা করছি কবি মিনার বসুনিয়ার জন্য।
মহান মে দিবসের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সকাল সকাল টাউন হল চত্বর টইটম্বুর। শ্রমিকের নায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে খণ্ড খণ্ড মিছিল করছে শ্রমিক দিবসে।
আমাদের ১৪ জনের টিমে বাইক প্রস্তুত। গ্রুপ ছবি তুলে দিলেন সদা হাস্যজ্বল পুলিশ সদস্য আবু ওবায়দা ভাই। প্রিয় ছড়াকার রেজাউল করিম জীবন গ্রুপ ছবিতে অংশ নেবার পর আমাদের বিদায় জানালেন।
যাত্রা শুরু। আমি ভুলেই গিয়েছি পেট্রোল সঙ্কটে আমার বাইক। ততক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়ে পেট্রোল নিয়ে গঙ্গাচড়া রোড দিয়ে পিঁপড়ের মতো সারিবদ্ধভাবে সবার বাইক চলছে। ছোট্ট করে ‘ছুটিছাটা’ লেখা সাদা টিশার্ট পরিহিত সবাই। রাস্তার ভীড় আর গতিরোধক পেরিয়ে যেতে যেতে দলছুট হয়ে যায় মুস্তাফিজ সোহাগ, মজনুর রহমান আর বিভাগীয় ডিএনএ ল্যাবের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফজলুল হক। পিছনে আছে, তবে লুকিং গ্লাসের আড়ালে।
ফজলুল হক এবং আইনজীবী সিরাজ ভাই আমাদের বিশেষ সারথি।
চারটি বাইক নিয়ে মহিপুর ব্রিজের মাথায় অবস্থান করি। কবি মাজহারুল মোর্শেদ এবং অধ্যাপক জলিল ভাই লালমনিরহাট থেকে আমাদের আগে এসে বসে আছেন। নদীতে মাছ ধরার জন্য সাথে করে কাটিজাল নিয়ে এসেছেন।
মহিপুর ব্রিজের পাশে অসংখ্য চালা দোকান। বিকেল হলে এখানে অনেক মানুষ আসে শীতল বাতাসে জুড়িয়ে নিতে। তাদের সেবার জন্য চালাঘরে রেখেছে চটপটি ফুচকা, চা পান, শিশুদের খেলনাসহ প্রভৃতি জিনিসপত্র।
আমারা তেমন এক চালাঘরে প্রবেশ করি- কিছু খাবার জন্য। স্কুলের জোড়া দেয়া বেঞ্চের মতো কিছু বেঞ্চ সাজানো চারিদিকে রং চটা বড়ো বড়ো কাপড় দিয়ে ঘিরেছে টংঘর। রাস্তার অন্তত ত্রিশফুট নিচ থেকে খুঁটি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে হোটেলের পাটাতন। উপরে অর্ধেক ফাঁকা রেখে টিন দিয়ে সূর্যের তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। ভিতরে প্রবেশ করেই মিনার ভাই ডালপুড়ি অর্ডার করলেন। রংপুর সিটি বাজারে ক্রীড়া সম্পাদক বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী শরিফুল আলম অপু বানিজ্যিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য মোবাইলে কথা বলছে অনর্গল, পলাশ রোদে বসেই ছাদহীন মস্তক থেকে ঘর্ম অপসারণের কর্মে মনোযোগী, সরকারি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শামসুজ্জামান সোহাগ নিখোঁজ, জাকির আহমদ টুথপিক নিয়ে কিছু বলছে। এসব শ্রবণ করতে করতে দেখি-
ডালপুরি এসেছে, মাথাপিছু তিনটা করে। সঙ্গে চটপটির কাবলি ডাল! ডালপুরির সঙ্গে চটপটি দেখে কিছুটা অবাক হয়ে, জানতে চাইলাম রহস্য, হোটেল বয় দাঁত কেলিয়ে বলে-‘ পুরির ভেতর ডাইল নাই, আলাদা করি ডাইল নেওয়া নাগবে। তোমার গুলার কাছোত ডাইল দশটাকা করি ধরমো। ভাইজান, এই ডাইল দিয়া চটপটি বানাই, ডাইলোত একনা আন্ডা আর পাঁপড় ছাড়ি দিয়া চল্লিশ টাকা পাই।’
বয়ের কথা শুনে হাসি পেলো। আজ শ্রমিক দিবস। কথা বেশি বলা ঠিক হবে না।

রাস্তায় মুস্তাফিজের বাইকের ছিঁড়ে গেছে। মেকার দিয়ে চেইন মেরামত করে পিছে পরা সবাই এসে বসে পড়ে পুরি খেতে। খেতে খেতেই আরও একচোট গাল-গল্প হয়ে যায়।
আমাদের জন্য নৌকা আগে থেকেই রেডি করা ছিল।
স্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সারি সারি চেয়ার বিছানো, মাথার উপরে রাজকীয় সামিয়ানা। সামিয়ানার চতুর্দিকে ঝুলছে রঙবেরঙের ঝারল। নদীরপাড় থেকে সাজানো নৌকা দেখে বেশ খুশি খুশি লাগছে। রাজকীয় নৌকায় অভ্যর্থনা জানাতে মধ্যবয়সী মাঝি খাইরুল প্রস্তুত।
আমাদের সারথি হবার কথা ছিল প্রিয় ছড়াকার মোকাদ্দেস এ রাব্বি’র, কিন্তু পারেনি- অফিসিয়াল সফরের জন্য। অফিসের পুরো টিমও এসেছে মহিপুর ব্রিজে। সেই সুযোগে আমাদের সাথে দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময়টাও সেরে নিয়েছে রাব্বি।
নদীপাড়ের মাঝি খাইরুল ভাইয়ের বাসার সামনে বাইকগুলো রেখে একের পর এক নৌকায় আসন নিই।
জাকির আহমদ আর শামসুজ্জামান সোহাগ নৌকায় উঠেই সুযোগ বুঝে দুটিমাত্র লাইফ জ্যাকেট ছিল চর দখলের মতো দখলে নিয়ে মুস্তাফিজ রহমানের পাশে বসে।
আমার আসন হয়েছিল নৌকার মাঝখানে। সামনের সারিতে ডা. ফেরদৌস রহমান পলাশ, মাজহারুল মোর্শেদ, আব্দুল জলিল। সম্বোধনহীন তিনজনই আমার ব্যাচমেট- ৯১ এসএসসি।
আমার ডানে ফজলুল হক, বামে শরিফুল আলম অপু’ মেহেদী হাসান শাপলা। পিছনের সারিতে আদিল ফকির, সিরাজ ভাই, মিনার বসুনিয়া ভাই।
নৌকা চলছে স্যালো ইঞ্জিনের সু-মধুর ভটভট শব্দের তালে। এ সময় নদীতে পানি কম থাকে। চতুর্দিকে ছোট ছোট চর মাথা উঁচু করে উঁকি দিয়ে স্রোতের সাথে মিতালি করছে।
সর্বোচ্চ পনেরো ফুট গভীর তিস্তা নদীর বুক চিরে জল কেটে কেটে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন খাইরুল মাঝি।
তেজহীন সূর্যের অলস আলো। নিরবধি বয়ে চলা সুখময় বাতাস গায়ে মেখে গল্পে মশগুল সৃষ্টিশীল কবিদল। গান গল্প এবং কথায় থমথমে পরিবেশ। নৌকার গলুইয়ের সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে চমৎকার উপস্থাপনায় ফেসবুক লাইভ করছেন কবি মজনুর রহমান। জাকির আহমদ স্থির থাকতে পারেন না। লাইভে মুখদর্শনে নেমে পড়েন তার পাশে।
ইতোমধ্যে উদয় হয়েছে ললিপপ, অর্থাৎ শিশুদের পছন্দের লাঠিযুক্ত গোলাকার চকলেট। সবাই মিলে বিভিন্ন ভঙ্গিতে চুষে চুষে খাচ্ছি।
ফেসবুক লাইভ চলছে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমাদের সঙ্গে লাইভে যুক্ত হয়েছেন শতাধিক কবি সাহিত্যিক, বন্ধু-বান্ধব। নিয়মিত ভ্রমণসঙ্গী কবি আসহাদুজ্জামান মিলন নিজস্ব নতুন রেস্টুরেন্টে বিশেষ ব্যাস্ততায় আসতে না পারলেও ফেসবুক লাইভে দীর্ঘ সময় যুক্ত থেকে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছেন। কবি ফিরোজ কাওসার মামুনও ছিলেন ব্যস্ততার বন্ধনে।
নৌকার গলুইয় থেকে মজনুর রহমান প্রাথমিকভাবে ফেসবুকে লাইভ প্রচার শিথিলের পাঁয়তারা চালাচ্ছিল।
অন্যপ্রান্ত থেকে চরের পাশ ঘেঁষে নাও ভিরাতে প্রস্তুত মাঝি ভাই। অমনি জাকির আহমদ এর আপত্তি উঠলো- এই চরের থেকেও সুন্দর চরে যাবার। মাঝি ভাই এবার হাল ঘুরিয়ে পানি কাটেন বামের দিকে। অল্প কিছুদূর গিয়ে সুন্দর পরিবেশে বিনবিনার চর নামে পরিপাটি ও জনমানবহীন সদ্য জেগে ওঠা এক চরের কাছে নোঙর করেন নাও।
নগ্নপায়ে তিস্তার জল স্পর্শ করে নতুন গজিয়ে ওঠা কচি ঘাসের শরীরে ভর করে করে নৌকা থেকে নেমে আসি সবাই।
আমাদের সাথে নেমে আসে- চাল, ডাল, সবজি, লবণ, পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ, মরিচের গুড়া, আদা রসুন, গরম মশলা, টিস্যু, চাপাতা, চিনি, দেশলাই, রান্না করা গোস্তো, আলুভর্তা, গোস্তোভর্তা, রান্নার জন্য জ্বালানী কাঠ, সিমেন্টের চুলা, সামিয়ানার কাপড়, বাঁশের খুঁটি, কলাপাতা, বোতলভর্তি পানি, গ্লাস, হাঁড়ি-পাতিল আর ঘাটপাড়ের বাবুর্চি।
ইট-পাথরের দালান-কোঠার শহর ছেড়ে মলয় বাতাস গায়ে মাখতে সবাই প্রস্তুত। লুঙ্গি, গামছা, ফুলপ্যান্ট, মাঝারি প্যান্ট, হাফপ্যান্ট, স্যান্ডো গেঞ্জি যে যার মত পরে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ স্কুল প্রতিযোগিতা অংশগ্রহণের আবহ তৈরি করে ফেলেছি মুহূর্তেই।
অপু জাল নিয়ে ছুটছে হাঁটু পানি পেরিয়ে, পিছে ছুটছে মাজহারুল মোর্শেদ, আব্দুল জলিল, মুস্তাফিজ রহমান। কার আগে কে জাল ফিকবে এই প্রতিযোগিতায়। প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই মাজহারুল মোর্শেদের হাত ফসকে মোবাইল ফোন পড়ে যায় পানিতে। মুহূর্তেই ফোনটি পেলেও নিভে যায় তার শেষ প্রদীপ।
মজনুর রহমান আবারও ফেসবুক লাইভে আমদের স্বল্প-বসনে কীর্তিকলাপের ভিডিও সরাসরি প্রকাশ করতে এসেছে। একে একে সবাই হচ্ছেন মোবাইলের ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি।
জাকির আহমদ, মিনার ভাই, পলাশ, জালাল, মাঝি ভাইকে সহযোগিতা করছেন তাঁবু খাঁটাতে।
মজনুর রহমান সবাইকে তাগাদা দিচ্ছেন নদীতে নামতে। মোটামুটি সবাইকে নিয়ে নেমে পড়ি জলে।
ঘাটের নৌকা পিছে ফেলে নির্বিঘ্নে হেঁটে যাচ্ছি হাঁটু জলভেঙে।
মিনার ভাইকে ফেসবুক লাইভের দায়িত্ব দিয়ে মজনুর রহমান নেমে আসেন পানিতে। পিছে পিছে আসেন আরও কয়েকজন। সবাইকে একত্রিত হতে তাড়া দেয় জাকির আহমদ। জাল নিয়ে নিষ্ফল ফিরে আসে মাছ ধরার দল।
আমাদের মাঝে আছেন দুজন তুমুল পাঠক, বাকি সব কবি। কবিতা নিয়ে অনেক ভাবনা তাদের। কবিতাকে ভেঙ্গেচুরে একাকার করতে এতটুকু দ্বিধা নেই কারোরই।
কবিতার মানুষ একসাথে হলে কবিতা পাঠ হবে না, ভাবা যায়! জাকির প্রস্তাব করে- কবিতার আসর এখানেই হবে, সবাই মুখস্থ কবিতা পাঠের জন্য প্রস্তুতি নিন। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এটিই হবে প্রথম জলজ সাহিত্য আড্ডা। সবাই গোল হয়ে জলে বসলে সাহিত্য আড্ডার আবহ তৈরি হয়ে যায় মুহূর্তেই। দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আনা হলো নৌকা থেকে। ফেরদৌস রহমান পলাশ সাথে করে নিয়ে এসেছেন চানাচুর, কাজুবাদাম, খেজুর। সাহিত্য আসর শুরু হবার আগে শুরু হয় খাওয়া। খাবারগুলো সাবার করতে করতে খবার জলের অভাব অনুভব করি। খাবার জল যে বালুচরে নামিয়ে রাখা হয়েছে! আহা- চারিদিকে জল আর জল অথচ বুকে জলের তৃষ্ণা।
নদী দূষণের শত্রু পলিথিন, পলিথিনকে কোনভাবে নদীতে না ফেলেই খাবার পর্ব শেষ হয়।
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম জলজ সাহিত্য আড্ডা শুরু করেন কবি মজনুর রহমান। ভ্রমণের বয়োজ্যেষ্ঠ ‘ঈশ্বর হোক সবার’ বিখ্যাত কবিতার লেখক কবি মিনার বসুনিয়া। তাকে সভাপতিত্ব করার দায়িত্বভার দিলে তিনি সাদরে গ্রহণ করেন। বাধ সাধেন ফেরদৌস রহমান পলাশ, তিনি কিছুতেই উপস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না। সেটাই বহাল রেখে বাংলাবাড়ি পরিচালক কবি মজনুর রহমান কাঁধে তুলে নিলেন উপস্থাপনার মহান কর্মযজ্ঞ।
এবার আঁচর পত্রিকা সম্পাদক কবি ও গল্পকার মুস্তাফিজ রহমান ফেসবুক লাইভ করার জন্য মনোনীত হয়েছেন। শুরু হয় সমকালীন ছড়াকার শরিফুল আলম অপু’র ছড়াপাঠ দিয়ে। দুলাইনের কবিতা পড়েন সূত্রপাত সম্পাদক কবি শামসুজ্জামান সোহাগ। সুন্দর কবিতা উপস্থাপন করেন বহুমাত্রিক লেখক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ফেরদৌস রহমান পলাশ। তিনি দুহাতে লিখতে না পারলেও এক হাতে কবিতা গল্প উপন্যাস স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখা লিখে থাকেন। সবুজ বাংলা সম্পাদক, সচেতন কবি আদিল ফকির। সরলতার কবি মাজহারুল মোর্শেদ পড়েন ছোট ছোট কবিতা। পানির চুক্তির অধিকার নিয়ে কবিতা শোনান- পাতা প্রকাশের কর্ণধার, কবি জাকির আহমদ।
কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ও গল্পকার মুস্তাফিজ রহমান।
সদ্যপ্রসূত কবিতার চারটি লাইন পাঠ করতে গিয়ে মুখস্থ নেই বলে- দুলাইনেই থেমে যাই আমি।
রংপুর বিভাগীয় ডি এন এ স্ক্রিনিং ল্যাবের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফজলুল হক, শীতাতপ বিশেষজ্ঞ মেহেদী হাসান শাপলা ও আইনজীবী সিরাজ ভাই- তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায্য পানি অধিকার ফিরে পাবার দাবি করেন আসর থেকে।
জলজ সাহিত্য আসরের প্রথম উপস্থাপক মজনুর রহমান নিজের কবিতা পাঠ করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। এরপর কবি মিনার বসুনিয়া কবিতা পাঠ ও সভাপতির বক্তৃতার মাধ্যমে মুলতবি করেন জলজ সাহিত্য আসর।
আলস্যে কিরণ বিলানো সূর্য পশ্চিমের ইশারায় মনোযোগী। দুপুরে খাবার জন্য খিচুড়ি রান্না চলছে। জলে ভেজা কাপড় পরিবর্তন করে নগ্ন পায়ে ফিটফাট সবাই। ভেজা কাপড়গুলো শুকাতে দেবার মহড়াও চোখে পড়ার মতো।
চকচকে বালুচর, ক্ষেপা আকাশ আর স্বচ্ছ জলে যে যার মতো ছবি তুলছেন। কোথাও দুজন, কোথাও তিনজন, কোথাও অধিক কবি আবদ্ধ হচ্ছেন স্মৃতি ধরে রাখতে। অনেকটা দূরত্বে অবস্থান নিলেও চরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দেখা যায় সবাইকে। স্বভাবগতভাবে হেলেদুলে, চিৎপটাং হয়ে শুয়ে সেলফি তুলতে দেখা যায় সোহাগকে। আদিল ফকির জাকির মুস্তাফিজ, অপু, ফজলুল হক রান্নার চুলায় বাতাসের বারাবাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যস্ত।
আমি এবং শাপলা ছবি তুলছি ভাগাভাগি করে। মিনার ভাই মাথার হ্যাট খুলে আলোকিত করছেন অর্ধকেশী মস্তক। একটু দূরে চোখ আটকে যায় মাজহারুল মোর্শেদ ও সিরাজ ভাইকে দেখে, তারা দুহাতে ছোট ছোট লাউ নিয়ে আমাদের দিকে আসছেন, জানালেন- ধু-ধু বালুচরে অলৌকিকভাবে গজিয়ে ওঠা গাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন পুষ্টিহীন দুটি কচি লাউ।
ফেসবুকে মনোযোগী ফেরদৌস রহমান পলাশ।
একে একে সবাইকে এগিয়ে আসতে দেখছি খিচুড়ির হাঁড়ির দিকে। বেলা তিনটে ছুঁই ছুঁই। পেট আর মন একই কথা বলছে। রান্না শেষ করে খিচুড়ির হাঁড়ি নামিয়ে রেখেছেন বাবুর্চি। বাতাসের সাথে উড়ছে ধোঁয়া, ধোঁয়ার সাথে সুঘ্রাণ! খাবার আগেই এমন ঘ্রাণ, আহ্ অপুর্ব! অপূর্ব।
তিস্তার চাকচিক্যময় বালুর উপরে বিছানো হলো কার্পেট। সারিবদ্ধভাবে বসার আগে শাপলা’র পক্ষ থেকে বার্তা এলো- আমরা দুপুরের খাবারটা কলাপাতায় নিয়ে খাবো, অতএব সামনে কলাপাতা রেডি আছে, নিজনিজ দায়িত্বে নদীর জলে ধুয়ে নিয়ে বসবেন।
আমরা সবাই নগ্ন পা’য়ে নদীর কিনারায় কলাপাতা ধুতে গিয়ে ফিরেছি ভেজা পা’য়ে, সেই সুযোগ বুঝে লেপ্টে বসেছে বালু। পা ভর্তি বালু নিয়ে খাদ্য গ্রহণে বসে পড়ি। হয়রে বালু! একদিকে খাবার পরিবেশন হচ্ছে, অন্যদিকে পা ভরা বালু চিকচিক করে জ্বলছে। বালুর সাথে আজ সন্ধি করেছি। কার পায়ে কত বালু সে খবর ভুলে- দেখি চরের রুপোলি দানা বাতাসে উড়ে আসছে কলাপাতায়। পিওর এই দানা দুয়েকটা পেটে গেলে কিচ্ছু হয় না বলেই পাতায় পাতায় চালান হলো ডাল-সবজির খিচুড়ি।
মজনুর রহমানের সৌজন্যে এল গোস্তো ভর্তা আর আলু ভর্তা।
মজনুর সহধর্মিণী সুমি, আমাদের অত্যন্ত প্রিয় এবং ভালোলাগা ছোট বোন, সে রান্না করে পাঠিয়েছে ভর্তাগুলো। সুমি’র সব রান্নাই চমৎকার স্বাদের হয়। এর আগেও বার কয়েক খেয়েছি ওদের বাসায়। অনেকদিন পর আবার পাতে পরেছে।
ভুনা গোস্তোর বাটি নিয়ে ঘুরছে জাকির আহমদ কিন্তু চামচ আনতে ভুলে গিয়েছে। বাবুর্চিও দিতে পারছেন না গোস্তো পরিবেশনের জন্য চামচ।
গোস্তো রান্না হয়ে এসেছে জাকির আহমদ এর বাসা থেকে। অসাধারণ রান্না করতে পারেন জাকিরগিন্নি- বাঁধন। পাতা প্রকাশ চেয়ারম্যান বাঁধন শেখ, নিজ হাতে রান্না করে থরে থরে সাজিয়ে দিয়েছে টিফিনবাটিতে। সেও আমাদের অত্যন্ত প্রিয় বোন। খিচুড়ির সাথে কোন ক্যাটাগরিতে গরুর গোস্তো রান্না করলে হাতের কবজি ডুবিয়ে খাওয়া যায়- সেই রান্না বাঁধন করতে পেরেছে। এর আগে সম্ভবত একবার খেয়েছিলাম তার হাতের রান্না।
রংপুর সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় মাস্টার্স পাস করা সুমি ও বাঁধনকে পুরো ভ্রমণ টিমের পক্ষ থেকে অশেষ ধন্যবাদ।
শেষ পর্যন্ত চামচ খুঁজে না পেয়ে অগত্যে দুজনের জন্য একবাটি করে গোস্তো দিলেন। তবে নিজ দায়িত্বে ঢেলে নিয়ে খেতে হবে।
সুন্দর পরিবেশ, ধোঁয়া ওঠা গরম খাবারের অতুলনীয় স্বাদ, বালু মিশ্রিত বাতাসের বন্ধন, নদীতে স্বল্প জলের নীরব স্রোত অন্যরকম আনন্দ নিয়ে খাচ্ছি সবাই। এই আনন্দ স্মরণীয় করে রাখতে খাইরুল মাঝি আমাদের ছবি তুলে দিচ্ছেন ঘুরে ঘুরে।
আকাশ কিছুটা মেঘলা, আজ বৃষ্টি হতে পারে- আবহাওয়া অধিদপ্তর আগেই জানিয়েছেন- ঘোষণা দিয়ে।
খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে শরীর এলিয়ে দিয়েছি শুকাতে দেয়া লুঙ্গি ও গামছার উপর। মাঝি ভাই বিশাল বহরের একটি কাপড় এনে বিছিয়ে দিলেন আয়েস করে বিশ্রামের জন্য।
বৃষ্টির পানি দুয়েক ফোঁটা করে গায়ে পড়ছে। সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পানির জন্য ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। আমরা বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও তেমন ক্ষতি নেই, ফসলগুলোর অন্তত তৃষ্ণা নিবারন হোক, বৃষ্টির পানিতে।
জমে উঠেছে তুমুল আড্ডা। এবার আর কবিতা কিংবা সাহিত্য আড্ডা নয়। নয় টাউনহল চত্বরের বকুলতলা কিংবা প্রিয় বইবাড়ির কফি’র মগ। নেই বয়সের তারতম্য। একদম খাস খবরের গোড়া ধরে টেনে বের করে আনছে একে-অন্যের মজাদার সব টিপস্। তিস্তার জল, চরের বালু আর মেঘলা আকাশ শুধু জেনেছে- রঙবেরঙের কথোপকথন! পাঠকের পুষ্টিকর মন্তব্য থেকে রেহাই পেতে না হয় অপ্রকাশিত থাক কথাগুলো!
চা এসে গেছে। বাবুর্চি রান্না করেছে লাল চা। বাবুর্চি ছেলেটা বড় ভালো। একসাথে সবাইকে চা খাওবে। কাপ তো নেইই এতগুলো গ্লাসও সংগ্রহে নেই। উপায়! উপায় নিশ্চয়ই বের করেছেন। গ্লাসের শেষ করে বাকি ক’জনকে চা দিলো টিফিনবাটিতে। পরিমানেও অনেক। এটাও দেখার অপেক্ষায় ছিলাম রে বাবুর্চি ভাই। আমার ভাগেও এসেছে সেই বাটির একটি। হালকা লিকারের স্বচ্ছ চা ভেদ করে চরের চিনি দেখা যাচ্ছে, যে চিনির গলন ক্ষমতা নেই!
বিকেল গড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যার কোলে। বিদায় নিতে হবে। দিনভর তুমুল আড্ডার যবনিকা টেনে যে যার মতো গুছিয়ে নিচ্ছি নিজেকে। বাবুর্চি গোছাচ্ছেন হাঁড়ি-পাতিল, চুলা, কাঠ-বাঁশ। মাঝিও থেমে নেই নৌকা প্রস্তুত করতে।
সবার আসনগ্রহণ নিশ্চিত করে- খাইরুল মাঝি স্যালো ইঞ্জিনের রশি টেনে সচল করেন- নৌকার শরীর। বিনবিনার চর বামে রেখে হাল ঘুরিয়ে নেন ডানের দিকে। জল-সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। আদিল ফকির পিছন দিক থেকে হাত বাড়িয়ে তার পক্ষ থেকে বিলি করছেন আঙ্গুর ফল। চমৎকার আবহাওয়া। নিজ মনে নদীর অঙ্গে অঙ্গ জড়িয়ে ছবি তুলছি সবাই। পোস্ট হচ্ছে ফেসবুকের ওয়ালে।
ততক্ষণে মহিপুর ব্রিজ মাথাচাড়া দিয়ে ইশারা করছে- নৌকা ঘাটপাড়ে ভিরাতে। মঝি ভাইও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করেছেন। ব্রিজকে স্বাগত জানান, আমাদের বিদায়ের মধ্যে।
ফিরতি যাত্রার আগে:
মহিপুর ব্রিজের স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলে উঠতে দেরি নেই। গোধুলীর কুসুমিত সূর্যের সৌন্দর্য মেঘের পেটে। কফি খেতে যাচ্ছি ব্রিজ দিয়ে উত্তর দিকে। ব্রিজের দুই ধারে শীতল বাতাসে গা জিরিয়ে নিতে অসংখ্য মানুষের ভীড়। আমরা সমতল থেকে অনেকটা নিচে নেমেছি বাইক নিয়ে। ধুলিমাখা পথের পাশে অবস্থান কাঠের দোতলা ঘর। কফি খেতে এসে- নিজেদের উল্লাস ছাড়া গল্প করার মতো তেমন কিছু নেই কফির দোকানে। নেই পছন্দসই কফি। অগত্যা লাল চা পান করি অধিক মূল্যে।
ফিরতি যাত্রা:
সারি সারি বাইকে হেডলাইটের আলো ফেলে নিরীহ ব্রিজের ওপর পাথার, বালুভর্তি অসংখ্য ভারী যানবাহন পেরিয়ে শহর অভিমুখে শুরু হয় আমাদের ফিরতি যাত্রা।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge