সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৫:০৬ পূর্বাহ্ন

ভালোবাসার ফুল-নূরুন্নাহার বেগম

ভালোবাসার ফুল-নূরুন্নাহার বেগম

ভালোবাসার ফুল
নূরুন্নাহার বেগম

ক্লাসরুমের কাঁচের জানালার ফোকর গলে বিকেলের হেলানো রোদ এসে পড়েছে শায়লার মুখে৷ ফ্যানের বাতাসে উড়ছে পিঠের উপর ছেড়ে দেয়া চুলের গোছা ৷ কপালের উপর কোকড়ানো একগোছা চুল দুলছে ৷ অনেকক্ষন একাকী বসে গভীর ভাবনার সমুদ্রে নিমজ্জিত শায়লা ৷ তিনতলায় ওদের ক্লাসরুম৷ তার পাশেই পাশাপাশি কয়েকজন স্যারের চেম্বার ৷ তারপর গবেষনা কক্ষ ৷ অনেকক্ষন গবেষনা কক্ষে কাটিয়ে দিয়ে মাত্র বের হয়ে ক্লাসরুমে শমিকে খুঁজছিল ৷ ও এসময়টায় এখানেই থাকে ৷ প্রায় ওরা একসঙ্গে এখানেই কাটায় অনেকটা সময় ৷
কিরে শায়লা , কি ভাবছিস? শমির কন্ঠ বুঝতে পারে শায়লা ৷ পিছনে পিছনে রফিক এসে রুমে ঢুকছে ৷ মেঘহীন দূর আকাশের দিকে আনমনে শায়লা ৷ ভাবছে রফিকের কথা ৷ রফিক ওকে যেভাবে সব কাজে সহযোগিতা করেছে ৷ জীবন চলার পথে এমন সহযোগি খুব কম জোটে ৷ মনের আকাশে ভাবনার বিশালতা ডালপালা মেলে ধরে ৷ অনেক দূরে ওর দৃষ্টি ৷ ভাবছে দেখতে দেখতেই রোকেয়া হলের নির্মাণ কাজ এখন শেষের পথে ৷ কিছুদিন পর হলচত্ত্বর কোলাহলে মুখর হয়ে উঠবে ৷ শেষ বর্ষের থিওরী, গবেষনা কাজে ব্যস্ত থাকায় এত কাছাকাছি থাকার পরেও রোকেয়া হলটা ঘুরে দেখার সময় হয়নি ৷ পাশেই পুকুর ৷ জিমনেসিয়াম ৷ কতদিন পুকুরপাড়ে পা এলিয়ে বসে গল্প করেছে শায়লা ৷ ছুটির বিকেল রফিকের সাথে কাটিয়েছে গল্পে গল্পে বাদাম— বুট চিবোতে চিবোতে কত টক— ঝাল— মিষ্টি কথা চলতো ওদের ৷ এর মধ্যে মন্নুজান হলে গেটের ঘন্টা বেজে উঠেছে ৷ রফিক মজা করেই বলেছে, “চল শায়লা তোমায় জেলখানায় ঢুকিয়ে দিয়ে আমার বাড়ি যাই ৷ নাকি আমার বাড়ি যাবে ? ” দুষ্টমি করেই বলতো রফিক ৷ মাঝে শমি, রুবি, কলি ওরাও হাঁটতে হাঁটতে গল্পে শামিল হত ৷ কলি যা গপ্পিস ! মুখের কথা কেড়ে নিয়ে একবার বলা শুরু হলে হয় ৷ বন্ধুরা ওর নাম দিয়েছে রেলগাড়ি ৷ পহেলা বৈশাখে দেয়া নাম ৷ এই নিয়ে কত্ত হাসাহাসি ৷ ১ লা বৈশাখে সবার নতুন নাম দিয়ে বড় বড় অক্ষরে হাতে লিখে দেয়ালে গোপনে সেঁটে দেয়াই রুবি, কলির কাজ ৷ যাদের নাম পছন্দ হতো না তারা গালাগাল দিত ৷ আড়ালে গালমন্দ রুবি— কলি শুনত আর মুখ টিপে টিপে হাসত ৷
ক ‘দিন পর হল ছাড়তে হবে— এই পথ ধরে আর হাঁটা হবে না ৷ অর্জুন গাছগুলো পাতা দুলিয়ে বিদায় সম্ভাষন জানাবে ৷ হলের ঘাসগুলো অপরিচিত হবে— এও কি ভাবা যায় ! এই শায়লা কি এত ভাবছিস বলতো ৷ আমি কখন থেকে তোর পাশ দাঁড়িয়ে তোকেই দেখছিলাম ৷ চল ক্যাফেটেরিয়ায় নয়তো লাইব্রেরিতে ৷ না, একটু হাঁটব ৷ অনেকদিন বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়া হয়না ৷ চল ফুলের সুবাস নেব, চড়ুই পাখির ওড়াওড়ি দেখব, ফড়িং ধরব ৷ মনে আছে ভেলায় চড়ে তুই— আমি এপাড় থেকে ওপাড়ে গিয়েছিলাম ৷ তুই ভয়ে আমাকে জাপটে ধরেছিলাম ৷ মোটেও— না তোকে আমি ধরতে যাব কেন ৷ মনে আছে ঠিকই, মুখে স্বীকার করছেনা শায়লা ৷ কেন শাপলা তুলতে যেয়েই তো ভেলার একদিকটা কাত হয়ে যাচ্ছিল আর অমনি—— ৷ যাক যা মনে নেই তা আর মনে করিয়ে দেবার দরকার নেই আমার ৷ বললাম— ব্যস ৷
অদূরে একটা শিশু ঘাস কেটে বস্তায় পুরছিল ৷ বাড়িতে নিশ্চয়ই পোষা গরু— ছাগল আছে ৷ ওদের খেতে দেবে নয়তো বাজারে বিক্রয় করবে ৷ ছেলেটি কি মনে করে দৌড়ে এসে বলছে ৷ মুখে ভয়ের ছাপ ৷ ঠিক গুছিয়ে বলতেও পারছেনা ৷ অভয় দিলে ও বললো স্যার ঐ ঝোঁপে এক ভাইয়া আপুর সাথে ভীষন কথা কাটাকাটি করছে ৷ আপুটা অনেকক্ষন ধরে খুব কাঁদছে ৷ আপনারা একটু যান, আপুটাকে থামান ৷ বুঝতে বাকী রইলো না রফিকের ৷ একটু এগুতেই কান্নার শব্দ আরো স্পষ্ট হলো ৷
অনেকদিন ওদের মধ্যে মন দেয়া— নেয়ার সম্পর্ক ৷ একটা পর্যায়ে মেয়েটি তার সরল বিশ্বাসে ছেলেটির প্রস্তাবে রাজী হয়ে তার আত্নীয় বাড়ি যায় ৷ গভীর মেলামেশার ফলশ্রুতিতে মেয়েটি তার গর্ভে থাকা সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের দাবিতে প্রেমের সম্পর্ক পাকা করতে চায় ৷ তুমি তো জান রুপা আমি আমার বাবা মায়ের অমতে তোমাকে ঘরে তুলতে পারব না ৷ তাহলে আমাদের ভালবাসার ফুল, আমাদের সন্তান ওর কি হবে ? আর কিছু বলতে পাচ্ছেনা রুপা ৷ ও কথা হারিয়ে ফেলেছে— বাকরুদ্ধ ৷ উপায় নেই তুমি এবরশন করে ফেল ৷
শায়লা রুপার কাছ অব্দি পৌঁছে ওর শেষ কথাটা কানে এল ৷ আমি সাহায্যের হাত বাড়াতে চাই ৷ তুমি যদি আমার উপর আস্থা রাখ ৷ তুমি কোথায় থাক, তোমার বিস্তারিত তথ্য আমাকে দাও, আমি—ই তোমার সাথে দেখা করে তোমাকে আমার সাথে নেব ৷ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো রুপা ৷ পাশে দাঁড়িয়ে শিহাব সব শুনলো ৷ মুহূর্তেই চোখ তুলে তাকালো রুপা ৷ কিছু একটা বলবে সে ৷ শায়লা বুঝতে পেরে আস্বস্ত করে রুপাকে ৷ কি মায়াবী চাহনী ৷ আগে কি কখনো দেখেছে রুপাকে ? কথায় কথায় জানা হলো একই ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী হলেও ভিন্ন ইয়ারে পড়ে দু ‘জনে ৷ শায়লা বয়সে এবং ক্লাসের দিক থেকে সিনিয়র— বড় আপা ৷ ডিপার্টমেন্টাল পিকনিকেই ওকে দেখেছে ৷ রুপা ভালো সিঙ্গার ৷ পিকনিকে ও পারফর্ম করেছিল ৷ যারা ভালো পারফর্মার তাদের পুরষ্কার দেয়া হয়েছিল ৷ রুপা পুরষ্কার পেয়েছিল ৷
রুপার মুখখানিতে কি মায়া জড়ানো শায়লা বার বার মনে করে ৷ ওকে কথায় আস্বস্ত করে ৷ আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই রুপা ৷ সময়ে সময়ে আমিই তোমার সাথে যোগাযোগ করব ৷ রুপা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালো ৷
মাঝে রুপার সাথে ফোনালাপে শায়লা অনেক তথ্য জেনে নেয় ৷ শিহাব কি করে কোথায় থাকে, ওর সাথে রুপার পরিচয়ের আদ্যপান্ত জেনে নেয় ৷ এখনকার সমস্যা শিহাব পাশ করার পর একটা কোচিং সেন্টারের সাথে যুক্ত হবার পর কিছু টাকা পকেটে আসছে ৷ নিজের খরচটা চালাতে পারছে ৷ চাকুরির প্রস্তুতি নিচ্ছে ৷ কয়েকটি দপ্তরে পরীক্ষা দিয়েছে ৷ রেজাল্ট হবে— হচ্ছে করে এই অবস্থা ৷ রুপার সাথে শিহাবের প্রথম সাক্ষাৎ রুপার এক বান্ধবী নেহার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ৷ নেহা শিহাবের কাজিন ৷ ওখানেই রুপা নেহার জন্মদিন উপলক্ষে গান গেয়েছিল ৷ অনুষ্ঠান শেষে নেহা পরিচয় করে দিল, রুপা ইনি আমার কাজিন শিহাব ভাই ৷ এবারই মাস্টার্স করল ৷ ইতিহাসে ৷ খুব ভালো পড়াশুনায় ৷ আমার আন্টি আঙ্কেল দু ‘জনাই জব করেন ৷ ছোট একটা বোন হোম ইকনোমিক্স এ পড়ে ৷ খুব ভালো ছবি আঁকে৷ দিনরাত আঁকাআঁকিতে বুঁদ হয়ে থাকে ও ৷ ওদের ওখানে গেলে বোঝা যায় শৈল্পিক পারিপাট্যে জেল্লাদার ওদের বাড়ি ৷
নেহার এতসব কথায় রুপার পুরো অবয়ব জুড়ে অব্যাখ্যাত এক তৃপ্তি ঝলমল করছে ৷ এর মাঝে শিহাবের সরল প্রকাশভঙ্গীতে রুপা আর একটু আন্তরিক হয়ে যায় শিহাবের প্রতি ৷ তুমি তো বেশ ভালো গাইতে পার রুপা ৷ তোমার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা আছে ৷ তুমি চালিয়ে যাও ৷
রুপার দেহভর্ত্তি সৌন্দর্যের মোহনীয়তায় ক্ষনিকেই মুগ্ধ হয়ে গেল শিহাব ৷ তুমি যাবে কোথায় ? আমি পৌঁছে দিলে তোমার কি অসুবিধা আছে ? শিহাব ওর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চাচ্ছিল ৷ রুপাও ভাবছিল ছেলে মানুষ একসঙ্গে একদিনের পরিচয়ে যাওয়াটা ঠিক ভালো দেখায় না ৷ আমি একাই পারব যেতে ৷ আপনি বরং যান ৷ অনেক কষ্টে এড়িয়ে গেলেও শিহাব রুপার বুকের কোথাও কাঁচ হয়ে গেঁথে যায় ৷ যাবার সময় ফোন নং টা নিতে ভুল করেনি শিহাব ৷ কথা হয় অনেকবার ৷ কথায় কথায় অনেক কাছাকাছি চলে আসে দুজনে ৷ শুকিয়ে যাওযা় ডালে নতুন বোধের সৃষ্টি হয় ৷ স্বপ্নের রঙে ঘর সাজায় দু ‘জন ৷
দু ‘জনাই প্রজাপতি রং গায়ে মেখে ঘুরেছে এডালে ওডালে ৷ ভেলায় চড়ে পানিতে পা ডুবিয়েছে ৷ কল্পনার ফানুস উড়িয়েছে শূন্যে ৷ শিহাব ওর মাকে সব কথা খুলে বলে ৷ শায়লা শিহাবের মায়ের সেল ফোনে কয়েকদিন কথা বলার চেষ্টা করে পারেনি বলতে ৷ আননোন নাম্বার তাই উনি ধরেননি ৷ পরে শিহাবের সাথে কথা বলে মায়ের সাথে কথা বলার সুযোগ করে নেয় ৷ বলার এক ফাঁকে শায়লা ওদের বাসায় যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করে ৷ মিসেস ফয়সাল শিহাবের আম্মা অনেক বিচক্ষন ৷ ছেলের কাছ থেকে সবিস্তারে জেনে উনি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছেন ৷এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য শায়লা প্রস্তাব ,” আন্টি, বলুন আমরা এ সঙ্কট কিভাবে নিষ্পত্তি করতে পারি ? ” কথা বেশি বললে অনেক হবে, অনেক মানুষ, মিডিয়া জানাজানি হবে ৷ মানবাধিকার সংস্থায় যেতেও হতে পারে ৷ আমরা যাতে সহজে রুপা— শিহাবের সমস্যাটা মিটাতে পারি এ বিষয়ে আপনার সাহায্য কামনা করছি ৷ মিসেস ফয়সাল তাৎক্ষনিক উত্তর না দিয়ে কয়েকটা দিন সময় নিলেন ৷
ভাবলেন আদ্যপান্ত ৷ নেগেটিভ ভাবনাগুলোই সামনে এসে দাঁড়ায় আগে ৷ বাড়িতে সবাই মিলে এপিঠ ওপিঠ ভাবছেন ৷ শিহাবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ৷ ওকে বেশ নার্ভাস লাগছে ৷ বুকটাও ধুকপুক করছে৷ এ অবস্থায় ও ঘরের আলো নিভিয়ে সোফার উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন ৷ এমন সময দরোজায় খটখট আওয়াজ ওর বুকের শব্দটা আরো বাড়িয়ে তুললো ৷
ভাবছে কিসের শব্দ ৷ বিদ্যুৎ নেই ৷ চার্জার জ্বালিয়ে মিসেস ফয়সাল এগিয়ে যেয়ে দরজা খুলে দিতেই পুলিশ দেখে হকচকিয়ে যান ৷ মুখ থেকে একটি কথাই বেড়িয়ে এলো, ” আপনারা ? ” আর জানেন না কিছুই ৷ চোখের কোল বেয়ে গরম জল গড়িয়ে পড়ল দু ‘ ফোঁটা ৷

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge