মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

বাবা দিবস সংখ্যা ২০২০

বাবা দিবস সংখ্যা ২০২০

রক্ত পানি করা অবদানকে। কখনো কখনো উপার্জনক্ষমতাহীন বৃদ্ধ বাবাকে বোঝা বলতেও আমাদের হৃদয় এতটুকু কাঁপে না যে বাবা আমাদের জন্য এতকিছু করেছে। নিজে কষ্ট করে আমাদের জন্য ধন সম্পদ করেছে। সেই বাবা যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তার খোঁজ খবর আমরা রাখিনা। অনেকে তো বৃদ্ধ বাবাকে ঘরে রাখতে চায় না। পাঠিয়ে দেয় বৃদ্ধাশ্রমে। যে বাবা এত কষ্ট করে আপনাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে তার পর অনেক টাকা খরচ করে চাকরীর ব্যবস্থা করছে। এখন আপনি অনেক টাকা রোজগার করতে পারছেন। বাবা আপনাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ করে সুন্দর একটি বউ এনে দিয়েছেন। এখন আপনি নিজের পায়ে দাড়িয়েছেন। যে বাবা আপনার জন্য এত কিছু করেছে। আর আপনি আপনার বউয়ের কথা শুনে বৃদ্ধ বাবাকে অনেক দুরে ঠেলে দিয়েছেন। মনে রাখবেন এতে কিন্তু আপনি নিজেই ভুল করছেন। আপনার এমন আচরণে হয়তো বা আপনার বৃদ্ধ বাবা কষ্ট পেলে ও ক্ষুদ্ধ হননি। তার পরও তিনি আপনার জন্যই দোয়া করেন। কিন্তু প্রকৃতি এসবের শোধ নেয়। আজকে আপনি বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়েছেন। আগামীতে আপনার সন্তান যে আপনাকে রাস্তায় বের করে দেবে না তার কী কোন নিশ্চয়তা আছে! তাবে এ কথা আপনাকে বিশ্বাস করতেই হবে যে, আজ আপনি আপনার বৃদ্ধ বাবা-মার প্রতি যেমন আচরণ করবেন আপনার সন্তান আপনার প্রতি সে রকম আচরণ করবে। আপনি কি চান আপনার সন্তান আপনার প্রতি খারাপ আচরণ করুন?
আমরা পাঁচ ভাই ও চার বোন। আমি ভাই বোনদের মধ্যে পাঁচ নাম্বার। আমি যখন ক্লাস থ্রীতে পড়ি
তখন আমাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকতো। আমার তখন একটু রাগ ছিল বেশি। এখন অবশ্য রাগ নেই বললেই চলে। তখন বাবার কাছে অনেক কিছু আবদার করতাম। অভাব অনটন থাকায় বাবা সব আবদার পুরণ করতে পারতো না। তার জন্য আব্বার সঙ্গে রাগ করে বাড়ী থেকে চলে যেতাম। বাসায় ফিরে এলে বাবা খুবই শাসন করতেন এবং মারধর করতেন। তখন বাবার প্রতি ভীষণ মন খারাপ হয়ে থাকতাম। আজ আমরা পাঁচ ভাই বড় হয়েছি। আমরা সকলেই আমাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। বাবা আগে থেকেই দিনের কাজে দাওয়াতে তাবলীগের কাজে সময় ব্যয় করতেন। এখন আমরা বড় হওয়ার কারণে দাওয়াতের কাজে বেশি করে সময় ব্যয় করছেন আর আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। বাবা প্রায় একটি কথা বলে থাকেন আমাদেরকে। দেখ বাবা আমি তোমাদেরকে আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি ভাল মানুষ হবার জন্য কিন্তু অভাব অনটন থাকায় অর্থনৈতিকভাবে হয়তো পারিনি তবে দাওয়াতের কাজে সময় ব্যয় করার কারণে গভীর রাতে উঠে নামাজ পড়ে তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি। তিনি যেন তোমাদেরকে মানুষের মত মানুষ করে। বাবার সেই দোয়ার কারণে আজ আমরা অনেক মানুষের কাছে সম্মান পাচ্ছি। কিন্তু আমরা বিষয়টি বুঝতে না পেরে বাবার সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। তাই আজকের এই দিনে বাবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি বাবা তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তোমার সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করার কারণে তুমি আমার প্রতি অনেক মন খারাপ করেছে। মনে কষ্ট পেয়েছে। প্লিজ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি ২০০৬ সালে বিশ্ব ইজতেমায় বিয়ে করেছি। এখন আমার দেড় বছরের দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে। মেয়েটি যখন আমাকে বাবা বলে ডাকে তখন আমার মনে যে কি আনন্দ পায় তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এখন আমি আমার মেয়েকে অনেক অনেক আদর করি। ঠিক আমার বাবাও আমাকে এ রকম আদর করতেন। কিন্তু তখন তো আর এখনকার মত বুঝতে পারিনি। তাই মনের অজান্তে বাবাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। এখন বিষয়টি বুঝতে পারছি বাবা। তাই তুমি আমাকে ক্ষমা কর।
আজ সারা বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশে বাবা দিবস পালন করা হবে। যে বাবা সন্তানের কল্যাণের জন্য অনেক কষ্ট করে আমাদেরকে মানুষ করছে। সেই সন্তান যদি বৃদ্ধ বাবার প্রতি খারাপ আচরণ করে অথবা কোন খোঁজখবর না নেয় তাহলে এর মত দুঃখজনক আর কি হতে পারে? তবে আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে যে আজ আমরা যদি আমাদের বাবার প্রতি খারাপ আচরণ করি। তাহলে ক্ষমা চেয়ে নেই। বাবা তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর। আজকের এই দিন থেকে আসুন আমরা সকলেই মিলে বাবার প্রতি ভাল ব্যবহার করি এবং শপথ করি বাবার প্রতি আর কোনদিন খারাপ আচরণ করবো না। আজকের দিনে সকলের প্রতি এই প্রত্যাশা রইল।

রাতাছড়া ছিলো আমেরিকা। আমাদের শেকড় বসলো। একটি জেতাগাছ শেকড় উপড়ে দীর্ঘ জার্নি তারপর আবার মাটিতে বসালে তার একটা ঝলসে যাওয়া থাকেই।দাদু,বাবা,কাকার জীবনে এটা এরকমই ছিলো।
বাবার মুখে শুনতাম তারপরও বারকয়েক বাবা চাতলাপুর চেকপোষ্ট ডিঙ্গিয়ে জন্মগ্রামে গেছেন।তখন গাড়ি ছিলো না।পায়ে হেঁটেই বাবা এ পথ পাড়ি দিতেন।আজকের সময় আমাদের কত মর্নিং ইভেনিং ওয়ার্ক।তবু রোগ অসুখের হাত থেকে আমাদের আর রক্ষা নেই।কিন্ত আমার বাবা কোন অসুখের কুকানি অর্থাৎ উঃ আঃ করতে দেখিনি।সন্যাস কেড়ে নিলো বাবাকে তৃতীয়বারের প্ররোচনায়।সেই রাত ১৯৯০ সাল।৩০ মে।রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে প্রতি রাতে গরমের সময় আমাদের বাড়ির রেয়াজ সবাই বাইরে বেঞ্চে বসে,কেউ কেউ চাটাই নিয়ে গল্প করতেন।সেই অভিশপ্ত রাতেও বাবা গল্পটল্প করে বিছানায় উঠেন রাত ১২টায়।রাত ১:৩০মিনিট।আমার চোখের সামনে কোন কথা বলতে না পেরেই স্ট্রোক করেন বাবা।বাইরে থেকে ঘরে এলেন।মাকে বললেন কি করছে শরীর।শুধু এই শুনলাম।তারপর বাবা নেই। আমরা হাসপাতাল নেওয়ার ব্যবস্থা করছি।রাতে পাড়ার ফার্মেসীর একজন কানে কানে বড়দাকে বললেন নেই।বাবা নেই। মা কিছুতেই রাজি নয়।বাবার নেই মানতে রাজি নয়।আঙ্গুলগুলো টানলে গিঁটগুলো শব্দ করছিলো।শরীর গরম তখনো।মা কিছুতেই মানতে রাজী নয়।বাবা নেই। আমরা ভাই বোনরা কেউ মানতে রাজি নয়।ধীরে ধীরে সকাল হলো।ছুটে এলেন চার গ্রামের মানুষজন।উঠোনে বাবা।সবার চোখে জল। সেদিন প্রথম বুঝলাম বাবা মানুষের মনে কি রকম ছিলেন।

কোথায় উঠেছেন আপনারা। এই রোগীর সুস্থতার জন্য বেশ কদিন ঢাকায় থাকতে হবে। আমি বললাম অবশ্যই থাকবো।
ডাক্তার বললেন আজ তাহলে না, কাল সকাল সাতটার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে কাল হতে রোগীর ট্রিটমেন্ট শুরু করবো।
আবার আব্বুকে নিয়ে ফিরলাম দুর সম্পর্কের এক বোনের বাসা সাভারে।সেখান হতে প্রায় পনেরো দিন যাতায়াত করে একটু সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসি।
কিছুদিন যেতে না যেতে আবার আব্বুর অসুস্থতা বেড়ে যায়। আবার ঢাকা নিয়ে গেলাম এবং কদিন থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়ে আবার আসলাম।
বেশকিছু দিন ভালোই চলাফেরা করলো আব্বু। সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করে চলছে।মনে বেশ শান্তি অনুভব করি পরিবারের সবাই।এবং রাব্বুল আলামীনের কাছে শুকরিয়া করি।এর মাঝে ঢাকার ডাক্তার মাঝে মাঝে খবর নেন ফোনে আব্বু কেমন আছেন কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা। বেশ অবাক হই ডাক্তার সাহেবের এই আচরণ দেখে কৃতজ্ঞতা ডাঃ আখতারুজ্জামান এর প্রতি।
প্রায় ষোল মাস সুস্থ থাকার পর আব্বু আবার অসুস্থ হয়ে পরে। এবং তার স্মৃতি শক্তি নষ্ট হতে থাকে।আমাদেরকে চিনতে পারেননা এমনকি পায়খানা প্রসাবের কথাো বলতে পারেন না। বিছিনামুখি হয়ে যায়।
বাসার সবাই তার সেবা যতœ করতে থাকি।
বিশেষ করে মায়ের খুব কষ্ট হয়ে যার তার সাথে সব সময় সেবা করার জন্য।
আমি অফিস হতে আসার পর আব্বুর সাথেই থাকতাম তাকে কোলে করে বাথরুমে নিয়ে যাওয়া আসা করতাম।আব্বুর সাথে বন্ধুর তো করে আগলে রাখতাম।তাকে হাসিখুশি রাখতে যা দরকার তাই করতাম।তার যা যা চাহিদা তা পূরণ করার চেষ্টা করতাম।আব্বু যখন হাসতো তখন আমার চোখ দিয়ে পানি আসতো।তাকে যখন কোলে নিয়ে বের হতাম তখন মজা করে বলতাম আব্বু আপনি খুব ছুচা ছেলের কোলায় চরতে চান। আমার কোলে চরতে খুব মজা তাইনা? আব্বু লজ্জা পেয়ে বলতো ছিঃ ছিঃ আমি তখন ইনজয় করতাম। তার সেবা করতে আমি বিন্দু মাত্র অলসতা করতাম না। বা কষ্ট অনুভব করতাম না বরং রাব্বুল আলামীনের নিকট শুকরিয়া আদায় করতাম যে আমার আব্বুর সেবা করতে পারার জন্য।
আব্বুর সাথে অনেক বিষয়ে কথা হতো অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এবং একটা কথা সব সময় বলতেন কারও কখনও ক্ষতি করবেনা তোমার সাধ্য মতো অন্যের উপকার করবে।তোমার ছোট ভাই বোনদের এবং তোমার মাকে দেখে রাখবে। তুমি বড় সন্তান তোমার এখন অনেক দায়িত্ব।
কিন্তু কিছু দিন পর আব্বু অসুস্থতা দিন দিন বেরে চলছে আব্বু স্মৃতিশক্তি আরও নষ্ট হয়ে পরে। নরম ভাত দুই তিন চামচ করে খেয়ে তার শরীর আরও দূর্বল হয়ে আসে।আমরাও মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরি।তারপরও সাধ্য মতো তার সেবা করতে থাকি। গত রমজান মাসের ১৬ তারিখ আমার সাথে মায়ের সথে অনেক গল্প করলো একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো অবাক তার কথা শুনে।সাথে কিছু আবদার করেছিলাম মজা করার জন্য। আব্বু তা শুনে এক বাক্যে রাজি হলেন এবং বললেন তোমাকে একটা স্পেশাল গিফট দিব সেটা তুমি কাউকে বলতে পারবেনা।তোমার মাকে ছোট ভাইকেও না।আমি খুব খুশি হলাম কিন্তু দুঃখের বিষয় শেষ পর্যন্ত তা আর শোনা হয়নি আর বলেও নি।ঠিক সেইরাতে আব্বু আবার মাইন্ড স্ট্রোক করে।
সকালে তার কোনো সেন্স নেই।ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে একটা স্যালাইন ও একটা ইনজেকশন দিতে বলেন।আমরা দ্রæত সেটা দেয়ার ব্যবস্থা করি।কিছুক্ষণ পর তার সেন্স কিছুটা ফিরে আসে।রাতে দোয়ার আয়োজনও করি।তারপর দিন একটু ভালো মনে হলো ২১ তারিখ সেহরির সময় বাবা কেমন আছেন বলে আমাকে ডাক দেন। আমি পাশে যাই আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকেন আমি কেঁদে ফেলি।আর জিজ্ঞেস করি আপনি কেমন আছেন আব্বু সেও বলে আলহামদুলিল্লাহ। আমি আবার বলি আব্বু কাল আপনার দাড়ি সেভ করে দিব আব্বু বলে না সেটা আর করা যাবেনা।
সেসময় আমার মনটা ডেকে উঠে। আব্বু হয়তো আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। ঠিক তাই হলো।পরদিন ২২ তারিখ শুক্রবার ২৮ রমজান সকালে ঘুমে বিভোর অনেক ডাকাডাকি করেও কাজ হচ্ছে না সে ঘুমিয়েই আছে দুপুর হয়ে যাচ্ছে তার ঘুম ভাঙতে পারছিনা।একসময় অর্থাৎ তিনটার দিকে চোখ খুলে মার সাথে একটু কথা বলার চেষ্টা করে মা বলে আপনার ক্ষিদা লাগেনি ভাত খাবান না?
আব্বু সারাও দেয় হুম খাবো।মা ভাত রেডি করে এসে দেখে আব্বু শ্বাস কষ্ট জোরে নিতে থাকে একপর্যায়ে হাত পা সোজা করে। মা দ্রæত একটু পানি চামচে করে দিতে থাকে।
আব্বুর মুখটা ঘেমে আসে আর মার দিক একবার দেখে চলে যায় পৃথিবী হতে আমাদের ছেড়ে। দুর্ভাগ্য বসতো আমি এবং ছোট ভাই কেউ ছিলাম না সেসময় বাসায়।
আরও অনেক কথা ছিল আব্বুর সাথে।শেষ বাড়ের মতো ক্ষমাটা চাইতে পারলাম না। তবে আব্বু আমাদের মন ভড়ে দোয়া করেছেন। জীবনের প্রথম ঈদ করলাম আব্বুকে ছাড়া। ঈদের দিন আমার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো।নিজেকে রক্ষা করতে কষ্ট হচ্ছিল। এদিক মা ছোট বোন ছোট ভাই তাদের সামাল দিতে আমি ভুলেই গেছিলাম আব্বু নেই।
আজও বিশ্বাস করতে পারিনা আব্বু আর নেই।
মাঝে মাঝে কল্পনা করি, বাবার মৃত্যু একটা দুঃস্বপ্ন মাত্র, যেকোনো সময় বাবা ফিরে আসবে। এখনো মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখি, আমি আর বাবা হাঁটছি পাশাপাশি তার সেবা করছি প্রতিটি মুহূর্তে বাবাকে মিস করি। আমি সবসময় মনে করি বাবা ছাড়া আমি একজন অসম্পূর্ণ মানুষ। সেই বটবৃক্ষকে যাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ,অনুভবে স্পর্শ করতে পারি তার অস্তিত্ব।
অনেক সন্তানরা আজ বাবা দিবসে তার বাবাদের জন্য হয়ত অনেক গিফট কিনবে বাবাদের সময় দেবে আর আমার মত যাদের আব্বু নেই তারা আমার মত চোখে পানি নিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে নিয়ে বলবে ভালবাসি আব্বু তোমাকে অনেক ভালবাসি।
জীবনের দিনগুলোর প্রতিটা সময় প্রতিটা পদে পদে তোমাকে মিস করেছি, বড্ড মিস করি তোমাকে।
আব্বু ক্ষমা করিয়েন আমাদের।আর ভালো থাকবেন ওপারে। রাব্বুল আলামিন যেন আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
পৃথিবীর সকল বাবাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

(ছবিতে আমার বামে সাদা পাঞ্জাবীতে আমার জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে সংগ্রামী নায়ক আমার আব্বা)

আব্বা যখন বাড়ির সামনের দোলার ঘাটে শ্যাম্পু ব্যবহার করতেন মাথায় গ্রামের লোকেরা তখন অবাক হয়ে দেখতো, কি এমন তেলের মত জিনিস মাথায় মাখলে কী সুন্দর গন্ধ আর ফেনা হয়!
এখনো আব্বার শার্টের গন্ধ শুঁকে ফিরে যাই ছেলেবেলায়।
অথচ আব্বা এত কঠোরভাবে আমাদের শাষন করতেন যে, তাঁর হুকুম অমান্য করলে মাইর ছিল নিশ্চিত। এত ভয় তাঁকে পেতাম যে শাষন করার পর এমন ভাবে বলতেন চোওওপ…
আমরা কান্না গিলে নিয়ে চুপ মেরে যেতাম।
কারো সাথে লেগেছে খেলতে গিয়ে, আমাদের ভাইবোনদের কোন অপরাধ না থাকলেও আব্বার কাছে আমরাই ছিলাম দোষী। আমরা কেন গেলাম ঝগড়ার জায়গায়। শাস্তি আমাদের।
এর কারণ ছিলো, যাই ঘটুক আমরা যেন বিবাদে না জড়াই কারো সাথে।
আব্বা এসেছেন রংপুরে।
স্কুল শেষে বাসায় ফিরছিলাম।
দূর থেকে দেখি ‘ক্যাটস্ প’ থেকে রিসেন্ট কেনা কালোর ওপর সাদা র্স্ট্রাইপ শার্টের মত একটা শার্ট কেউ একজন পড়ে যাচ্ছেন আমার সামনে দিয়ে। চেয়ে দেখি আব্বা আমার শার্ট পড়ে বের হয়েছিলেন। আমরা বাবা ছেলে একই শার্ট পড়ি এখনো।
যাবার দিন আব্বাকে এতো করে বললাম শার্টটা নিয়ে যেতে।
না, নেবেন না।
এরপর বাড়ি গিয়ে জোর করে শার্টটি রেখে এসেছি।
একদিন শার্টটি পড়ে বাড়ির পাশের স্কুল মাঠ সংলগ্ন দোকানে গিয়েছেন তিনি। তাঁর বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলেছেন, ছেলেকে পড়ালেখা করিয়েছেন বলেই না দামী শার্ট গায়ে চাপাতে পাচ্ছেন তিনি।
গত মার্চে আব্বা এসেছিলেন।
জোড় করে নিয়ে যেয়ে, সুন্দর একটা ঘড়ি কিনে দিয়েছি সুপার মার্কেট থেকে।
জাহাজ কোম্পানি শপিং কমপ্লেক্স থেকে শার্ট কিনে দিয়েছি। চোখের ডাক্তার দেখিয়ে প্লাস পাওয়ারের চমৎকার ফ্রেমের একটা চশমা গড়িয়ে দিয়েছি।
এ্যাপেক্স থেকে একজোড়া স্যান্ডেল কিনে দিয়েছি।
প্রতিটি জিনিস কিনতে দোকানে ঢোকার আগে ঝগড়া করতে হয়েছে, রীতিমত জবরদস্তি করে তারপর কিনে দিতে হয়েছে।
রোজার মাসে সেহরির সময় মাকে ফোন দিয়ে জিগ্যেস করি, বিদ্যুৎ আছে, মা!
মা বলেন, আছে।
কয় বছর আগের কথা।
আশেপাশের বাড়িগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ গেলেও আমাদের বাড়িতে এতদিন ছিলনা।
গত শুক্রবার কুড়িগ্রাম থেকে তিনশ বিশ হাত ক্যাবল ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি কিনে, রংপুর থেকে সিলিং ফ্যান নিয়ে যেয়ে সারাদিন বাড়িতে বিদ্যুতের ওয়্যারিং করিয়ে সব সেট করে দিয়ে এসেছি।
দুপুরের প্রচন্ড রোদে, গরমে, ফ্যানের নীচে বসে যখন শরীর জুড়ায় তাঁর, পরম প্রশান্তিতে তিনি মাকে বলেন, আমার বাবা রংপুর থেকে ফ্যান এনে সেট করে দিয়ে গ্যাছে- আমার বাবা।
মার কথা শুনে, গলা রুদ্ধ হয়ে আসে আবেগে। কান্না দলা পাকিয়ে উঠে আসে বুক বেয়ে।
মনেপড়ে, একের পর এক হালের জমি বন্ধক রেখে, জমি, গরু, বাড়ির পুরাতন গাছ সব বিক্রি করে কিভাবে আব্বা আমাদের ভাইবোনদের পড়ালেখার খরচের টাকা পাঠাতেন।
মনে পড়ে, মা অসহ্য গরমের রাতগুলোতে সারারাত তালপাখা ঘুড়িয়ে ঘুম পাড়াতেন আমাদের চার ভাই-বোনকে।
মনে মনে বারবার ভাবি, আমরা অধম সন্তান, আব্বা।
আমরা অধম সন্তান, মা। আমরা গায়ের চামড়া দিয়ে আপনাদের পাপোশ বানাই না তো!
আমরা ভাবি না তো- স্রষ্টার পরে পৃথিবীতে আর কেউ নেই এই জীবনে, যারা আপনাদের মত সকল কিছু দিয়ে আগলে রেখে বড় করেন – প্রিয় আব্বা-মা।
তিন.
ছেলে আমার ডাইনোসর কিনবে কারুপণ্যের শোরুম থেকে। বেশ কয়েকটা। বাসায় অনেক আছে ভেবে বললাম, একটা নাও। ছেলে একটাই নিলো অনেকগুলো থেকে বেছে। ক্যাশ কাউন্টারের কাছাকাছি এসে আবার ফিরে গিয়ে যেখানকার ডাইনোসর সেখানেই রেখে এলো আমার প্রথম ছেলে। তখন ওর বয়স ছিলো সোয়া তিন বছরের মত।
আমি নিচু হয়ে জিগ্যেস করলাম- কি নেবেনা, বাবা? রেখে এলে যে ডাইনোসর?
সে বলল, একটা নেবো না বাবা। ওকে একা নিয়ে গেলে ওর মা কান্না করবে যে!
আমি কিছুক্ষণের জন্য কি থেমে গেলাম!
গাঙচিল নিয়ে আমার আবছা একটা স্মৃতি প্রায়ই মনে পড়ে।
তখন বর্ষা শেষ। বাড়ির পেছনে অনেক জমি আউশধান রোপনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। চরাক্ষেত জুড়ে কেবল স্কয়ার দাড়ি টানার মত আইল জেগে থাকা চার কোণাকার সমান জমি। আধহাত খানেক স্বচ্ছ পানি সব জমিতে। হাওড় অঞ্চলের মত।
হঠাৎ শুনি অনেক পাখির ডাক। বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখি অসংখ্য গাঙচিল ক্রমাগত উড়ছে নীচে জলোজমিতে একটা কিছুকে কেন্দ্র করে।
গিয়ে দেখি একটা গাঙচিলের ছানা পানিতে পাখা ঝাঁপটাচ্ছে উড়বার জন্য। কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছে ছানাটি। যদি উড়তে না পারে তবে ছানাটি এখানে এলো কিভাবে? তার মায়ের বুকে বা পিঠে? নাকি কাছে পিঠে কোন বাসা থেকে ডিম ফুটে বের হওয়ার পর প্রথম উড়াল দিয়ে এখানে এসে কচি ডানা তার ক্লান্ত হয়ে গেছে? অথবা ডানায় তার লেগেছে আঘাত?
গাঙচিলের ছানাটিকে বাড়িতে নিয়ে এলাম।
আব্বা কিছুক্ষণ পর আবার নিয়ে গেলেন ছানাটিকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন আমাকে এই বুঝিয়ে যে এর মা নিশ্চয়ই অনেক কান্না করছে আর খুঁজছে তার ছানাকে।
বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখি সত্যিই একটা গাঙচিল উড়ে উড়ে ডেকে যাচ্ছে অবিরাম।
আব্বা ছানাটিকে নিয়ে জমির যেখানটাতে পাওয়া গিয়েছিল সেখানে দাঁড়িয়ে দুই হাতে মাথার ওপরে ছানাটিকে তুলে ধরার পর মা গাঙচিলটি খুব কাছে এসে ছোঁ দিয়ে যাচ্ছিল বারবার।
এরপর আরো কিছু পাখি, এরপর আরো একঝাঁক। এরপর আরো, আরো…..
ছানাটিকে আব্বা মাথার ওপর তুলে ধরে আছেন আর শতশত গাঙচিল চারপাশে মাথার ওপর চক্কর দিয়ে উড়ছে আর চেঁচিয়ে যাচ্ছে একটানা।
আব্বা ছানাটিকে জমির আইলে রেখে এসে আমাকে হাত ধরে নিয়ে বাড়ি চলে এসেছিলেন- বলেছিলেন, মা পাখিটি এসে নিয়ে যাবে তার ছানাকে ঠিকঠিক।
শতশত গাঙচিল আব্বার মাথার ওপর উড়ছে। অনতিদূরে দাঁড়িয়ে আমি দেখছি এই অপূর্ব দৃশ্য।
গাঙচিল নিয়ে আমার আবছা এই স্মৃতি প্রায়ই মনে আসে।
কিন্তু ছানাটিকে মা পাখিটি পিঠে বা বুকে করে নিয়ে যেতে পেরেছিল কিনা মনে পড়েনা।
চার.
আমার আব্বা ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরে এসে কেঁদেছিলেন।
আমার আব্বার কুরবানী দেয়ার সামর্থ্য ছিলো না।
আমার আব্বা জমির দলিল জমা রেখে ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ নিয়েছিলেন।
আমাদের কিনে নেয়া জমি।
অথচ পূর্বপুরুষেরা বিক্রি করলেও জমির ওয়ারিশেরা মামলা করে আমাদের বিরুদ্ধে।
একদিন মামলার জবাব দিতে আব্বা জেলা আদালতে আসার পথে পলিথিনের ব্যাগে রাখা দলিল ও কাগজাদি চুরি হয়ে যায়- বাসের ভেতর ঠাসাঠাসি ভীড়ে।
কি দারুণ ব্যাপার, আব্বার সাথে থাকা আমাদেরই পক্ষের সাক্ষী দলিলের খোঁজ দেন- সাক্ষীর আতœীয় পেয়েছে সে দলিল।
আব্বা তাঁর কাদামাটিতে লেপে মুখবন্ধ গোলার সব ধান বিক্রি করে উদ্ধার করেন দলিলগুলো।
একদিন ব্যাংক থেকে উকিলের লাল নোটিশ আসে-ব্যাংক লোন শোধ না করলে পুলিশ কেস।
পড়াশোনা শেষে আমি তখন সদ্য ইশকুল মাস্টার।
একদিন ব্যাংকের লোকেরা উকিল নোটিশ পাঠায়।
বাড়ির সামনের সড়ক দিয়ে মাইকিং হয়- ঋণ খেলাপীগণ, ঋণ পরিশোধ করুন।
অন্যথায় ব্যাংক আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য থাকবে।…
আমার আব্বা আমাকে জানান সে খবর- বড় বেশি উদ্বিগ্ন তিনি।
আমি তাঁকে অভয় দিই। তাঁকে বলি, ঠিক আছে।
ম্যানেজার সাহেব কে বলুন, সব হিসেব করে রাখতে।
এই আমি রওনা হচ্ছি ঋণ শোধ করতে।
আমি জিজ্ঞেস করি, সেই ম্যানেজার সাহেব কি আছেন যিনি তেরো হাজার টাকা ঋণ বরাদ্দ করে আপনার হাতে দশ হাজার টাকা দিতেন পূর্ব চুক্তিমত?
আমি সেই সুপারভাইজারের কথা জানতে চাই আব্বার কাছে, যার জন্য অনেক বড় সাইজের দুইটি কার্পূ মাছ জিইয়ে রেখেছিলেন তিনি আমাদের উঠোনে বড় ডেগচিতে।
সুপারভাইজার আপনার কাঙ্খিত ঋণ পাইয়ে দেন যেন। নইলে চাষ হবে কী করে!
আমি আব্বাকে বলি,
ম্যানেজার সাহেব কে বলুন, সব হিসেব করে রাখতে। এই আমি রওনা হচ্ছি ঋণ শোধ করতে।
সেদিন এমনি তুমুল বৃষ্টির দিন ছিলো।
আমার পকেটে একতোড়া নোট পলিথিনে মোড়া।
আব্বা অপেক্ষা করছিলেন ব্যাংকের বারান্দায়।
তাঁকে সত্যিই সেদিন অনেক বড় মানুষ মনে হয়েছে।
বড় মানে তাঁর মাথা আমার মনে হচ্ছিলো, ছাদে গিয়ে ঠেকছে।
ঈদের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরে আব্বা কেঁদে ছিলেন।
আমার কৃষক আব্বার দুটি সত্যিকার দূর্দান্ত হালের ষাঁড় একরাতে চুরি হয়ে যায়।
আব্বার কষ্ট বোঝার মত অতটা বয়স আমার তখন ছিল কি?আমি তখন হাই ইশকুলে পড়ি।
কিন্ত আমি আব্বার খাঁ খাঁ বুকের শূন্যতা ঠিকই দেখেছিলাম আমার অল্পবয়সী চোখে।
আব্বা, এখন কুরবানী দেন চাচাদের সাথে ভাগে।
এখন আব্বার কোন ব্যাংক ঋণ নেই।
আব্বাকে সুন্দর একটা চশমা গড়িয়ে দিয়েছি
দলিল ও খবরের কাগজ পড়ার জন্যে।
একটা সোনালী চেইনের হাতঘড়ি কিনে দিয়েছি জবরদস্তি করে, সময় জানার জন্যে।
আব্বা কুরবানীর ঈদে এখন ব্যস্ত থাকেন কাজে।
আমি কুরবানী দেয়ার মাঠে যাই।
তাঁর ব্যস্ততা দেখি কাছে যেয়ে মিনিটকয়।
তারপর দোকান পাড়ে যাই।
এখন আব্বার কোন ব্যাংক ঋণ নেই-
আমার ভাবতে ভালো লাগে।
আব্বা ঈদের দিন বাড়ি ফিরে কাঁদেন না আর।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge