মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন

বাংলা বানান # যে কারণে বাংলা বানান জানতে হবে-মজনুর রহমান

বাংলা বানান # যে কারণে বাংলা বানান জানতে হবে-মজনুর রহমান

কেন জানতে হবে বাংলা বানান? উল্টো দিক থেকেও এই প্রশ্ন করা যায়, কেন জানতে হবে না বাংলা বানান? বাংলা আমার মাতৃভাষা, আমার পূর্বপুরুষেরা এই ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, জীবনের প্রতি পদক্ষেপে বাংলা ভাষার প্রয়োজন হচ্ছে- সেই ভাষা লেখার এবং বলার নিয়ম আমাকে কেন জানতে হবে না?
দেখা যায়, ইংরেজি ভাষায় আমি যদি কথা বলতে যাই তাহলে একটি শব্দ এদিক-ওদিক হলে অনেকেই ভুল ধরছে, হাসাহাসিও করছে। আমিও সেই ভয়ে ইংরেজি বলতে চাইছি না। অথচ সেটা একটা বিদেশি ভাষা, ভুল হতেই পারে। সেই বিদেশি ভাষা নিয়ে আমাদের হীনম্মন্যতার শেষ নেই, কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে? বাংলায় কথা বলার সময়ে বা লেখার সময়ে কিন্তু আমাদের এমন চিন্তা হয় না, তেমন কেউ ভুলও ধরে না। অথচ অধিকাংশ সময়েই আমরা ভুল লিখছি, বানানের ভুলটাই সবচেয়ে বেশি।
মূল কথা হলো, আমাদের সচেতন হতে হবে। নিজেকেই চাইতে হবে যে, আমি বানানটা শিখতে চাই, চর্চা করতে চাই, ভুল বাংলা বললে বা লিখলে যেন আমি লজ্জা পাই।
এছাড়া অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেও দেখা যায় শিক্ষার্থীরা বাংলা বিষয়টিকে বেশি ভয় পায়। কেন ভয় পায়? কারণ প্রথমে এটাকে তারা সহজ বিষয় ভেবে ফেলে রাখে, তারপর পড়া জমে জমে কঠিন হয়ে ওঠে। এই অবস্থা থেকেও পরিত্রাণের উপায় হলো শিক্ষার্থীদের ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে তোলা।
মূলত উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত বাংলা বানানের নিয়ম বলতেই তেমন কিছু ছিল না। তখন বাংলা গদ্যের সূচনা ও বিকাশ হতে চলেছে। অনেকটা যার যেভাবে খুশি সেভাবেই বাংলা বানান লিখতেন। উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন সাহিত্যিক বাংলা গদ্যের উন্মেষ হতে শুরু করল তখন ধীরে ধীরে কিছু নিয়ম-কানুন তৈরি হতে শুরু করে। প্রথমত বাংলা বানানের নিয়ম সফল ও গ্রহণযোগ্যভাবে প্রবর্তন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকদিন পর্যন্ত সেই নিয়মই অনুসরণ করা হচ্ছিল বাংলা বানানের ক্ষেত্রে। তবে সেই নিয়মে বিকল্প ছিল বেশি। ফলে সময়ের প্রয়োজনেই, বিশেষত অতৎসম শব্দের বানানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এই নিয়মগুলোর আরও সমতা বিধান করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ কারণেই ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবার ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ নামক পুস্তিকার মাধ্যমে বানানরীতি প্রবর্তন করে বাংলা একাডেমি। এরপর বিভিন্ন সময়ে একাডেমির পক্ষ থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত বাংলা বানানের নিয়মাবলি পর্যালোচনা করে সর্বাধিক সমতাবিধান করা সম্ভব- পরিমার্জিত আকারে এমন একটি বানানরীতি প্রকাশ করে আসছে।
যেভাবে বাংলা বানানে দক্ষ হওয়া সম্ভব:
১. প্রথমত নিজের ইচ্ছা থাকতে হবে যে, আমি বাংলা বানানে দক্ষতা অর্জন করতে চাই।
২. বানানের নিয়মগুলো বারবার পড়তে হবে। না পড়ে কোনোকিছু কীভাবে শেখা সম্ভব?
৩. কোনো শব্দের উচ্চারণ যেমন, বানানটাও তেমনই হবে এই চিন্তা মাথায় রাখা যাবে না। যেমন: ‘বন’ শব্দের উচ্চারণ হলো- ‘বোন্’। কাজেই উচ্চারণের মাপে বানান নাও হতে পারে, একইভাবে বানান এক রকম হলে তার উচ্চারণ পৃথকও হতে পারে।
৪. কোন কোন বানান বেশি ভুল হয় সেগুলোর তালিকা তৈরি করতে হবে। যতবার খটকা বাধবে ততবার অভিধান দেখতে হবে। এভাবে দেখা যাবে শব্দগুলো আয়ত্তে এসে গেছে।
৫. বানানকে সন্দেহ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ যে কোনো শব্দ সামান্য খটকা তৈরি করলেই সেটা অভিধানে কীভাবে আছে তা দেখে নিতে হবে।
৬. নতুন কোনো শব্দ শিখলে সেটা বারবার লিখে আয়ত্ত করে ফেলতে হবে।
৭. যেসব পত্র-পত্রিকা, অনলাইন গ্রæপ বা পাঠ্যপুস্তক শুদ্ধ বানান নিয়ে চর্চা করে সেগুলোর সাথে যুক্ত থাকতে হবে। সমমনা ব্যক্তি, যারা বানান বিষয়ে আগ্রহী, তাদের সাথে বানান নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
৮. কিছু শব্দের বানান নিজস্ব কৌশল তৈরি করে মনে রাখা যায়। যেমন: ‘মুমূর্ষু’ বানানে দুই দিকের হ্রস্ব উ-কার মাঝের দীর্ঘ উ-কারকে চেপে ধরে থাকে।
৯. লিখেই ফেলেছি যখন, আপাতত এটাই থাক-পরে ঠিক করে নেব-ভুল বানানের ক্ষেত্রে এ ধরনের মানসিকতা পরিহার করতে হবে। ভুল বুঝতে পারা মাত্র সেটা কেটে ঠিক করে ফেলতে হবে।
১০. সর্বোপরি নিজেকে শুদ্ধ বানান চর্চার একজন ছাত্রের মতো সবসময় আগ্রহী করে রাখতে হবে। অনেক শিখে ফেলেছি, এখন জ্ঞান দান করা যাক-এ ধরনের চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে।
[‘ছোটোদের বাংলা বানান’ পুস্তক থেকে সংকলিত, সামান্য পরিমার্জিত]
মজনুর রহমান: শিক্ষক, লেখক: ‘ছোটোদের বাংলা বানান’।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge