মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন

প্রেমের মজা চিঠিতেই-প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

প্রেমের মজা চিঠিতেই-প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

প্রেমের মজা চিঠিতেই-
(রংপুরের ভাষায় রম্য বিতর্কের পান্ডুলিপি রচনার প্রয়াস)
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম

চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও…। কী কমো রে ভাই- আইজও কানত বাজে, কী যে মদুর সুর। কইলজাখান ছন্নাৎ করি ওটে। একটা চিটির জন্তে মোর জরিনার কী কাউলা কাউলী? আর এলকার ছাওয়া পোয়ার এক্কেবারে বেহুঁশ করা হুক্কাহুয়া- হ্যালো, হ্যালো, এই হ্যালো-। কিসের প্রেম কিসের কী! পাড়ার নিন্দের মানুষ জাগি ওটে, ধমক দেয়। ধমক খায়া ভয়তে শোরপট্টা নাগি ফিসফিস করি কয়Ñ‘ জান এখন না, পরে কথা হবে। আ-র পরে?
বাহে দেওয়ানির বেটা, তোমরায় কনতো বাহে, চিটি বিনে প্রেমের আসল মজা হয়? হয় না, হয় না জন্তে হামরা চিটির নেকার পককে কতা কই। কিসের বাহে মোবাইল, প্যাড, কিসের ফ্যাসবুক?
হামরাতো চিটি বিনে প্রেমের কতা ভাইববারএ পারি না। এলকার মতো এতো বেড়াবেড়ি করার জো আছিল না বেটিছাওয়াগুলার। কত্তদিন বাচ্চায় বাচ্চায় থকি অল্পএকনা দেকা হহইলে- মনটা দোতরার মতো ডোলোডং ডোলোডং করি বাজে। ফির কোনদিন দেকা হইবে, না হইবে..। মনের কতা কেমন করি কমো। তখনতো এলকার মতো চেংড়া চেংড়িরা বেশরম আছিল না। বুক ফাটি যায় কিন্তুক মুক ফোটে না। বিশ্বাস করেন বাহে মোড়লের বেটা- কতদিন ‘তোক মোর মনোৎ খাাইছে, তোক মুই ভালোবাসোং’ – এ কতা কবার চাইচো জরিনাক, কিন্তুক কাচত গেইলেই দমবন্দ। কিসের প্রেম, কিসের ভালোবাসা? কনতো তকন উপায় কী? চিটি নেকা ছাড়া আর ঘাটা কই? সেইবাদে তো প্রেমের চিটি নেকচি, কষ্টকরি ভয়ে ভয়ে পাটেদিচি, আর বাচ্চায় থাকচি উয়ার চিটির জন্তে।
হামার মান্টু ডাক্তার আচে না, তাই তো ডাক্তার মানুষ, খাটিখুটি মানসিক দিক নিয়া গবেষণা করি একখান বই নেকচে। বইয়ের নাম- ‘প্রেমপত্র ও মানসিক মজা’। তিনি নেকচেন- ‘মানসিক মজার জন্য প্রেমের বিকল্প নেই।’ প্রেমপত্র নেকার জন্তে বেশি বেশি মন দিবার কতা নেকচেন তিনি। তুলনা করি বলচেন- ‘মোবাইল ফোনে বা ফেসবুকে মানোগত তেমন স্পর্শ থাকে না, মোবাইল ফোনে বা ফেসবুকে সব কথা খুলে বলা যায় না বলে মানসিক অতৃপ্তি থাকে। চিঠিতে এমনটা হয় না, তাই প্রেমের চিঠিতে মজা ও মানসিক স্বস্তি বেশি।’
এখনকার মোবাইল পাগলা ছেলে-মেয়েরা তেমরা যদি মানতে না চাও প্রকৃত প্রেমের মজা চিটিতে- তবে প্রবীণ প্রেমিক রেজাউল করিম মুকুলের দীর্ঘ প্রেম জীবনের চিঠিগুলো পড়ার আহŸান থাকিল। তখন নিচ্চই হামার সাতে একমত হইমেন।
এত যে কবি সাহিত্যিক, তামাক কাই বানাইচে জানেন- প্রেমের চিটি। প্রেমের চিটি কবি বানায়, সাহিত্যিক বানায়, গীতিকার বানায়, হাতের নেকা সুন্দর করে। কবি ফেরদৌসী তো প্রিয়ার গালের কালো তিলের জন্তে বোলে বোকারা, সমরকন্দ রাজ্য ব্যাচে দিবার চাইচলো। বাপের ব্যাটা কবি। হামার নজরুল প্রেমিকাক নেকচে- ‘তুমি আমায় ভালোবাসো তাইতো আমি কবি, আমার এ রূপ সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি।’ নজরুল প্রত্থম বউ নার্গিসকে চিঠিত ন্যাকচে- দেখা..? নাই বা হল এ ধূলির ধরায়। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভলোবাসো, আমাকে চাও, ..ওখানে থেকেই আমাকে পাবে।..প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো..তাহলে তোমার মতো ভাগ্যবতী আর কে আছে। ..তারই মায়াবী স্পর্শে তোমার সকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে।’ চিঠি না নেকলে এমন মন জুড়ানো কতা কি নেকা হইল হয়? কন তো সবায়গুলায়? তোমরা পারমেন মোবাইলত এমতন কতা শুনাবার?
প্রেম করার সময় প্রেমিকার নাল টকটকা ঠোঁট দেকি চিটিত কবিতা নেকি পাটে দিলেন কবি মফিজুল ইসলামÑ
‘ঐ ছায়াপথের বারান্দায় দাঁড়িয়ে
আমিও দেখি তোমার নিটোল ঠোঁট
তোমার ঠোঁটের নরম শরীরে কী স্বাদ
জমিয়ে রেখেছ তুমি,-
কবি মহাদেব সাহা- একখান চিটি নেকার জন্তে কতো যে কষ্ট করচে। নিজেই নেকচেন-
‘তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি
কতোবার দ্বারস্থ হয়েছি আমি
গীতিকবিতার,
কতোদিন মুখস্ত করেছি এই নদীর কল্লোল
কান পেতে শুনেছি ঝর্ণার গান,
… তোমাকে লেখার মতো প্রাঞ্জল ভাষার জন্য
সবুজ বৃক্ষের কাছে জোড়হাতে দাঁড়িয়েছি আমি-’
আর কত কমো চিঠির মজার কতা? চিঠিত ফুল, পাতা, চান্দ, পাংখা, পাকি, হার্টের ছবি আঁকতে আঁকতে কত বড় বড় শিল্পী পয়দা হইচে তার ইয়ত্তা নাই। ফ্যাচবুকোত মুক হা করা হাহা হি হি , কুকুর, বিলাই, শিয়াল এইগলা ভেজালী ছবি দিয়া কী হয়? ওমরা কী শিল্পী হয়?
বাহে দেওয়ানীর বেটা, হামার আকবর ভাই আচে না, ওমার হাতের নেকা খুব ভালো। তাক কেমন করি হইচে জানেন? আকবর ভাই প্রেমের চিটি নেকার ওস্তাদ আচিল। একদিন চিঠি পায়া প্রেমিকা গান ধরচেÑ ‘চিটি লিখেছে বন্ধু আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে, বন্ধু চিটি লিখেছে।’ গানটা শুনি আকবর ভাইর কী মন খারাপ। মনোত জেদ চাপি গেল। সে দিন থাকি গোটা গোটা করি নেকতে নেকতে এলা নেকা খুব সুন্দর হইচে। ভাবীও খুব খুশি।
ভাষা বিশেষজ্ঞ মাতবর সাহেব, প্রেমের টিঠির মদ্য দিয়া একটা নতুন সাংকেতিক ভাষার আবিষ্কার হইচে। সে ভাষার নাম ‘প্রেচিভা’। বোজেন নাই – পুরা নাম ‘প্রেমের চিঠির ভাষা।’ তোতি, মোচি,রচি, মচি, নোচি, তচি, খাচি, ইচি, চেচি। এর মানে হইল- তোমাক মোর মনত খাইচে। ভোÑ মানে ভোমর, জ- মানে জরিনা।
আর মোবইলের কতা কি কমো। এক প্রেমিক ম্যাসেঞ্জারত নেকচে- আই ‘কিল’ ইউ। নেকার কতা আচিল আই ‘ফিল’ ইউ। তাড়াহুড়া করি ‘এফ‘ত চাপ না দিয়া দিচে ‘কে‘ত। পরে কী যে ধোলাই ভাইরে, নগদ হত্যা চেষ্টার মামলা হয় হয়। চ্যাংড়া আর ওপাকে না হাটে। মজা তো নোয়ায় বোজেন কেমন ঠ্যালা।
আরে প্রকৃতির সৌন্দর্য তো প্রেমের টিঠিই বাঁচেয়া থুইচে। চিঠিত যখন ডাকায় – বটের তলাত, পুকুর পাড়ত, নদীর ঘাটত, কদমের তলাত, বিলের ধারত, কাশিয়া ফুলের বাগানত। আহা কী সোন্দর কতা- ‘সন্ধ্যার আলো-আঁধারে তোমার বাড়ির পাশে খেজুর গাছে ছাওয়া, পুকুড়ের পাড়ে কদম তলায় এসো। কোকিলের কুহু কুহু গানে তোমার পরান ভরে যাবে।’ চিঠি পড়িয়া মনটা এক্কেবারে জুড়ি যায়। আর এলা মোবাইল এলারা নেকে- ‘ভুবুজোলা, রাত আটটায় সিটি শপিংমলের পাশে এসো।’ ঐ আরকি মলের আর আবর্জনার গন্দে গন্দে ওমার প্রেম। মজা তো নাই খালি খালি সাজা।
চিঠিত কত মান অভিমান, আগ, কত শংকা, ফোনত কী অমতন আচে। – ‘তুমি যদি আমার কতামতো খাওয়া-দাওয়া না করো তবে আর চিঠি লিখব না, দেখাও করব না।’ অভিমান- ‘তোমাকে একলা ডাকলাম, তুমি সবরি কলা আনলে কেন? তোমার জন্য অপেক্ষা করে চলে এসেছি। তুমি একটা মিথ্যাবাদী। কোকিলও কাককে ফাঁকি দিয়ে কাকের বাসায় ডিম পাড়ে, আর তোমার বাবার ছানিপড়া চোখকে ফাঁকি দিয়ে আমার কাছে আসতে পার না।’ চিঠিত আরও কত কতা শুনতে, মান ভাঙাইতে কতোই যে মজা। ফোনত কী ওইগলা আচে?
এই যে লেখক মুকুল রায় বয়সকালে বোলে ৯ হাজার ৯ শত ৯৯ টা চিঠি নেকচে। এ তথ্য দিচেন বিশিষ্ট প্রেমপত্র গবেষক মনোয়ারা বেগম। শুনচি চিঠিগুলা পড়ি এত মজা পাইচেনÑ সেগুলার সামাজিক গুরুত্ব নিয়া একটা বই নেকার চেষ্টা করতেচেন।
বাহে মাতাব্বর, প্রেমের চিঠির আর্থিক গুরুত্ব অনেক। চিঠির আদান প্রদানের সাতে টাকা পাইসাও বিশেষভাবে জড়িত। প্রেমিক বা প্রেমিকা চিঠি পাটাবার জন্তে টাকা দেয়, যাই নিয়া যায় নিয়া আইসে দুই জাগা থাকি টাকা পায়। ইয়ার ভিতর দিয়া কর্মসংস্থান হয়। মানুষের বিশ্বাসের পরীক্ষাও হয়। হামার সময় তো ডাক বিভাগ চলছিল পত্র মিতালির প্রেমের চিঠি দিয়াই। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ চিরকুমার অধ্যাপক মলয় কিশের ভট্টাচার্য তাঁর ‘প্রেমের চিঠি আদান প্রদান এবং আমাদের দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি’ বইয়ে নেকচেনÑ ‘বাংলাদেশের জিডিপি এতদূর এসেছে তার প্রধান কারণ প্রেমের চিঠি।’ নিজের অভিজ্ঞতা সম্বল করি তিনি বলেছেনÑ ‘বাংলাদেশের তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকা যদি ৩ কোটি হয়, আর প্রত্যেক মাসে ৬০ টাকা খরচ করে চিঠি লেখে তবে মাসে ১৮ কোটি টাকা জিডিপি-তে যোগ হবে। ডাক বিভাগের আয়ও বাড়বে। কাগজ, কলম বেশি বেশি বিক্রি হবে। দেশের মানুষের সুখ নিশ্চিত করতে তাই প্রেমের চিঠি বেশি বেশি করি লেখার প্রবণতা চালু করতে হবে।’
আরে মোবাইলওয়ালারা তো হাড়কিপ্টা। ১০ টাকা ভরেয়া কত কতা কবার ধরে, কথা শ্যাষ না হইতেই নাইনকোনা ফস্যাৎ করি কাটি যায়। ইমারজিন্সি নিয়া কয়Ñ ‘জান আইজ থাউক, বাড়িত থাকি টাকা পাটাইলে পরে কথা বলবো।’ ফ্যাসবুকত গোপন থাকে না কতা, ফির কতা কইতে কইতে চার্জ নাই, কতা বন্দ, নেকানেকিও শ্যাষ। ততক্ষণে প্রেমের আবেগ মরিয়া শুটকা হয়া যায়। ফির ফিরির জন্তে সারাটাআাইত জাগিয়া ফ্যাসবুক চালেয়া নিন্দ হারাম করি ভোরভোরা হয়া ঘুড়ি বেড়ায়। এইদান অবস্তা দেখি এস এম সাথী বেগম নেকচেনÑ ‘এভাবে রাত জেগে জেগে মোবাইলে ম্যাসেজ দেয়া নেয়া, অধিক কথা বলার প্রবণতা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এতে প্রেমের মজা তো থাকেই না ররং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ বোজো এল্যা, হামার চিঠিত এইগলা কোনো ভেজালে নাইÑ যখন খুশি দেখো, যখন খুশি নেকো।
প্রেমের চিঠির মজা হইলো বহুমুকী। পত্র বিশষজ্ঞ আরিফুল হক রুজু গবেষণা করি প্রেমের চিটির তিন রকম মজার খোঁজ পাইচেন। তিনি বিদেশি পত্রিকাত নেকচেনÑ ‘প্রেমের চিটির মজা তিন প্রকারের। ব্যক্তি মজা, পারিবারিক মজা ও রাষ্ট্রীয় মজা।’ একবার এক প্রেমিক মুরগির ঠ্যাংগত চিটি দিয়া পারিবারিক মজার জন্ম দিচিল। ইটের টুকরাত বান্দি ঢিল দিবার সমে চেয়ারম্যানের মাতাত নাগি সেকি মজা, তার বিচারে জন্মিচিল সমাজিক মজা, প্রেমিক জেলখানা থাকি প্রেমিকাক চিঠি লেখার সমে ধরা পড়ি যে কাÐ তা দেশীয় মজা হিসেবে প্রশংসা ও পুরস্কার পাইচে।
বাহে দেওয়ানী চাজী, কতা বাড়াইলে বাড়ে। আর নোয়ায়। সত্যি কথা হইল প্রেমের চিঠির মজাই আসল মজা। গান আচে নাÑ ‘বন্দু চিটি লিইখাছে, জদলি বাড়ি আইতাছেÑÑÑ।’ এ মজা একশ পার্চেন্ট খাঁটি, হালাল, গ্যারান্টিযুক্ত, আদি এবং অকৃত্রিম। আর প্রেমের বেলায় মোবাইল, ফ্যাসবুক একশ পার্চেন্ট ভেজালী, দুইনম্বরী, খালি ফ্যাদলা। মজাও নাই, প্রেমের স্বাদও নাই। আর খালি কি বিয়ার আগত পরেও মজা দেয় প্রেমের চিঠি। ওইগলা পড়ি কত যে শিহরণ, কত সময় যে কাটে। আর ফ্যাসবুকÑ ডিলিট, ফকফকা সাদা। প্রেমের চিঠির মজা পায়ায় তো পরকাশক শাকিল মাসুদ ফিরে দেখা প্রেমের চিঠির সংখ্যা বের করচে। ইয়ার জন্তে কোনদিন বা পদক পায় তাই দেকো। সেই জন্তে হামার সাতে মত মিলান, সগায় কনÑ ‘প্রেমের মজা চিটিতেই, জয় হোক প্রেমের চিঠির।’ ধন্যবাদ দেওয়ানীর ব্যাটা, ধন্যবাদ সগায়গুলাক।
[টিআইবি-সনাক আয়োতিজ সনাক সদস্য ও ইয়েস গ্রæপের একটি রম্য বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন লেখক, কিছুটা সংশোধিত রূপ এ লেখাটি]

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge