শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন

প্রিয় রংপুর মেডিকেল কলেজ এবং আমি: অমলিন স্মৃতিগুলো কত মধুময়-মফিজুল ইসলাম মান্টু

প্রিয় রংপুর মেডিকেল কলেজ এবং আমি: অমলিন স্মৃতিগুলো কত মধুময়-মফিজুল ইসলাম মান্টু

প্রিয় রংপুর মেডিকেল কলেজ এবং আমি
অমলিন স্মৃতিগুলো কত মধুময় [২য় ব্যাচ সেশন ১৯৭১-১৯৭২]-মফিজুল ইসলাম মান্টু

১.
মাতৃভুমি বাংলাদেশ তার উত্তরাঞ্চল এর ঐতিহাসিক মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ। আমি ছিলাম মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের ১ম ব্যাচ এবংএই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান্টির ২য় ব্যাচের শিক্ষার্থী । চিকিতসকের পরিচয়ে প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের কাছে অপরিসীম ঋণ স্বীকার করতেই হবে আমাদেরকে।
গৌরবের সেই দিনগুলি এরপর দেশে-বিদেশের যাপিত জীবনের সুখ-দুখখ হাসি-আনন্দের স্মৃতিগুলি নিয়তই চোখের রেটিনায় জ্বলজ্বল করে আহা কি মধুময় সে অনুভুতি।কত কথা কাহিনীর মত হয়ে আছে এমত গল্প হায় সে বর্ণনা অনেক দির্ঘ।সংক্ষেপে কিছু বলার চেষ্টা।
কত বর্ণনার শহর এই রংপুরের কেন্দ্রবিন্দু পাড়া মুলাটোল কোতয়ালি থানার চারপাশ ঘিরে ব্যপ্ত।যেখানে আমার জন্ম (১আগষ্ট ১৯৫৩)। বাসার উত্তরে থানা ভবনের দক্ষিনে (এখন তিলোত্তমা হোটেল) প্রশস্থ মাঠ বিশাল বটগাছের ছায়াঘেরা বিকেল ছিল বাল্যকালের আনন্দধাম। এই পাড়ার পাশের পাড়াগুলো পুর্ব দিকটায় সেনপাড়া নিউসেন পাড়া গুপ্তপাড়া। দক্ষিনদিকে লিচুবাগান পাকপাড়া গোমস্তাপাড়া আরও পশ্চিমে মুনশিপাড়া শহরের প্রাচীন জনবসতিগুলো ছিল এই শহরের শিক্ষা সংস্কৃতি খেলাধুলা নাটক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মুলচত্বর।শিশুযুবা সহ সবস্তরের সৃষ্টিশীল মানুষের মুক্তমনা কাজে উতসাহের আকরভুমি।
রুচিবান জনগোষ্ঠির আবাসভুমির এমন পরিবেশে বাংগালি সংস্কৃতিলালিত পরিবারে বেড়ে ওঠা এ গল্প(পরে বর্ণিত হবে)
উল্লেখ্য যে জন্মকালথেকে ১৯৫৯ মুলাটোল এরপর মাত্র ৬ মাসকাল নিউজুম্মাপাড়া আবার মুলাটোলে ফিরে যাওয়া (বিশেষ কারনে)তারপর ১৯৬৪ সালে আবার বর্তমান আবাস নিউজুম্মাপাড়ায় থিতু হয়ে আছি আমাদের এক অনাবিল আনন্দময় পরিবারের যৌথ বসবাসময় চত্বরের বাড়িতে।
রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠার জন্মক্ষনঃ
মনে পড়ে ১৯৬৬ সালের কথা। এর ভিত্তিপ্রস্থর অনুষ্ঠান।আমার বড়ভাই প্রকৌশলী হাজী মুজিবর রহমান মানু (তিনি মেট্রিক পাশ করে ততকালীন রংপুর সরকারি কলেজের১ম বর্ষের ছাত্র আর আমি ৮ম শ্রেণীতে রংপুর হাই স্কুলে পড়ি’) দুজনেই গেলাম সেই অনুষ্ঠানে।বিশাল আয়োজন আমরাও তার তরুন সাক্ষি।কে জানত এই প্রতিষ্ঠানেই আমার পেশাগত শিক্ষার চারণভুমি হবে এই স্বপ্নের রংপুর মেডিকেল কলেজ।তারপর কত দিন গড়িয়ে গেলো।
ফিরে তাকাই ২০২০ সালের আজকের এমন জীবনের প্রায় পড়ন্ত বেলায়।চোখ ভারি হয়ে আসে কষ্টের অশ্রুজলে স্মরণে আসে প্রয়াত প্রিয় বন্ধুদেরঃ
বন্ধুরা পরজীবনে চিরশান্তিতে থেকো।-
ডাঃ কামরুল পিন্নু (শালবন)ডাঃ মুক্তা(পার্বতিপুর) (দুজনেই দুস্কৃতিকারিদের দ্বারা নিহিত)
অকাল প্রয়াত ডাঃ জায়েনুর জয়েন(কামালকাচনা
ডাঃ এ ওয়াই হাবীব আহমেদ কেরানিপাড়া) ডাঃ সৈয়দুল আলম( নিলফামারী)ডাঃ নুরল আমিন(চিলমারী) ডাঃ আজহার বাবলু (বেতগাড়ি)
ডাঃ আখতার হোসেন তীতু (নওগাঁ) ডাঃ নুরল ইসলাম খোকন (গাইবান্দা)ডাঃ মজিবর রহমান চৌধুরী (বদরগঞ্জ) ডাঃ সাইফুল ( কুড়িগ্রাম) ডাঃ আনিসুল (কুড়িগ্রাম) শিক্ষা সমাপ্তের আগে মাহমুদা শিরিন সোহেলী (রাধাবল্লভ)
সদ্য প্রয়াত বন্ধু তিনবার নির্বাচিত মহান জাতীয় সংসদ সদস্য ডাঃ ইউনুস আলি সরকার
প্রমুখ (অসমাপ্ত)
আমাদের ক্লাশ শুরু হয়েছিলো ২৪ জানুয়ারি ১৯৭৩সালে। এ অঞ্চলের ঐতিহাসিক কারমাইকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র ৬৫ জনকে সহ মোট চান্স পেয়েছিলাম প্রথমে ১০০জন পরে আরো ২৫ জন এবং বাংলাদেশের জাতির পিতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর বিশেষ সুপারিশে (সৈয়দপুরের শহিদ ডাঃ জিকরুল হক এম পি মহোদয়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ তার পুত্র এনামুল হক) সহ ১২৬ জন কে নিয়ে আমাদের শিক্ষা জীবন শেষ হয় ১৯৭৮ সালে।
আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ জন ছিলো ছাত্রী (এ প্রসংগ পরে)
সহপাঠীদের সকলের মধুময় সান্নিধ্যে আমাদের বন্ধুজীবনের প্রায় সবাই পরবর্তিতে তাদের কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে সম্মানিত প্রসংশিত এবং পরিবার পরিজন নিয়ে দেশে বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত এ কথা বলতে বুক ফুলে যায় আনন্দে গৌরবে।সবাই ভালো থেকো বন্ধুরা।
মেডিকেল শিক্ষাজীবনের প্রথম অভিজ্ঞতায় এই কলেজটি সদ্য স্বাধীন দেশের ধংসস্তুপের মধ্যে দির্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি নানা সংকট শিক্ষক স্বল্পতাসহ বহুবিধ ঘটনাবহুল অধ্যায় পার করছিলো। আমরা ছিলাম তার জ্বলন্ত সাক্ষি।(সে বর্ণনা এখানে নয়)
তবে আমাদের শিক্ষজীবনে আমাদের স্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের অনেকেই ছিলেন তুখোড় মেধাবী সারা দেশে এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও সুপরিচিত।
ঐ সময়ে মাত্র দুই ব্যাচ থাকায় আমাদের সবার নাম সহ পরিবারের অনেকের খবর স্যারেরা জানতেন।এমনকি ক্যাম্পাসেও স্যারদের পরিবারের সংগেও আমাদের নিবিড় সম্পর্ক সারা শিক্ষাজীবন এমনকি এখনো কারো কারো সংগে বিদ্যমান আছে।স্যারদের সবার প্রতি জানাই অসীম কৃতঞ্জতা স্রদ্ধা ভালোবাসা।
সেই স্রদ্ধেয় শিক্ষক কয়েকজনের নামঃ
ডাঃ মোমতাজুল ইসলাম (অধ্যক্ষ)
অধ্যাপক ডাঃ আবদুস সালাম- এনাটমি ( ভাষা সৈনিক) বিভাগীয় প্রধান এবং অধ্যাপক এম এ বারি স্যার
একি বিভাগের
ডা গোলাম রব্বানী স্যার পরে সহযোগী অধ্যাপক মেডিসিন( নাট্যনির্দেশক অভিনেতা জনপ্রিয় চিকিতসক) ডাঃ বিনোদ বিহারি সাহা (বীর মুক্তিযোদ্ধা))। সেনপাড়া নিবাসী ডাঃ তারিকুল ইসলাম স্যার।মুনশিপাড়া নিবাসি ডাঃ সাইফুল ইসলাম হুমায়ুন স্যার।
ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ছিলেন জাদরেল শিক্ষক অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল হাই স্যার(পরে উপ-উপাচার্য বিএসএমএম ইউ আর ঢাকা) একি বিভাগে ছিলেন অধ্যাপক ডাঃ আহসান উল্লাহ স্যার( পরে মহাপরিচালক স্বাস্থ্য মহাঅধিদপ্তর)
পরে যোগ দেন অধ্যাপক নায়েব আলী স্যার (অধ্যক্ষ)
এরপর এলেন অধ্যাপক মোঃ শহিদুল্লাহ স্যার (অধ্যক্ষ)
আরও ছিলেন ডাঃ এন সি দেবনাথ স্যার ডাঃ আনয়ারুল হক স্যার(কলেজ রোড) ডাঃ আবদুল্লাহ স্যার ডা নজরুল স্যার (পরে রেডিওলজি)প্রমুখ।
৩য় বর্ষের বিষয়ের–
অধ্যাপক ডাঃ মাহফুজুল হক স্যার (ফার্মাকোলজি বিভাগীয় প্রধান পরে অধ্যক্ষ।স্যার ছিলেন নাট্যকার নির্দেশক অভিনেতা)।
আরো ছিলেন ডাঃ এখলাস উদ্দিন স্যার ডাঃ আনিসুল হক স্যার প্রমুখ।
জুরিস প্রুডেন্স (ফরেনসিক মেডিসিন) এ শিক্ষক ছিলেন রংপুরের ততকালীন সিভিল সার্জেন
ডাঃ সিরাজুল হক স্যার (খন্ডকালীন উল্লেখ্য ওনার মেয়ে আমাদের কলেজের ৩য় ব্যাচের কৃতিছাত্রী বাংলাদেশে টেস্ট টিউব বেবী প্রজনন টেকনোলজির পাইওনিয়ার অধ্যাপক ডাঃ ফাতেমা পারভিন।)
হাইজিন এ শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক ডা এম এ বারী স্যার এবং প্যাথলজি মাইক্রবাইওলজি বিভাগে ছিলেন অধ্যাপক ডাঃ মইদুল ইসলাম স্যার (প্যাথলজি) ও অধ্যাপক ডাঃ আনোয়ারুল আলম স্যার (ভাইরোলজি ও মাইক্রোবাইওলজি)
আরও ছিলেন ডা অমিয় ভুষন চৌধুরী স্যার(বীর মুক্তিযোদ্ধা) ডাঃ বেলী সামসুন নাহার ম্যাডাম(বিশিষ্ট কবি) ডাঃ মন্মথ নাথ দে স্যার প্রমুখ।
মেডিসিন বিভাগে ছিলেন –উপমহাদেশের বিশিষ্ট চিকিতসক কয়েকজনঃ
অধ্যাপক ডাঃ মোঃ তাহির স্যার (পরে উপাচার্য সাবেক আইপিজি এম আর এন্ড রিসার্চ ঢাকা)
অধ্যাপক ডাঃ মোঃ ওয়ালিউল্লাহ স্যার
অধ্যাপক ডাঃ জি এম চৌধুরী স্যার
অধ্যাপক ডাঃ আবু নাসের স্যার
অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল মান্নান স্যার
অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আফতাবুজ্জামান স্যার
আরও ছিলেন ডাঃ গোলাম রব্বানী স্যার (পুনরুল্লেখ)
আরও ছিলেন ডাঃ নিত্যানন্দ বর্মন স্যার।প্রমুখ
সার্জারি বিভাগে ছিলেন প্রখ্যাত সার্জন
অধ্যাপক ক্যাপ্টেন ডাঃ আব্দুল ওয়াহেদ স্যার
অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আতিয়ার রহমান স্যার
অধ্যাপক ডাঃ আবু সিদ্দিক মিয়া স্যার
অধ্যাপক ডাঃ রশিদ ই মাহবুব স্যার (সাবেক উপ- উপাচার্য বিএসএম এম ইউ এন্ড আর ঢাকা)
অধ্যাপক ডাঃ আব্দুস সামাদ স্যার
আরও ছিলেন অধ্যাপক ডাঃ আব্দুস সালাম(ইউরোলজিষ্ট)প্রমুখ
স্ত্রী ও প্রসুতি বিভাগে ছিলেন
প্রখ্যাত চিকিতসক অধ্যাপক ডাঃ আব্দুল বায়েস ভুইয়া স্যার অধ্যাপক ডাঃ জোবায়েদ স্যার
আরও ছিলেন অধ্যাপক ডা নুরজাহান ম্যাডাম
ডাঃ হুমায়রা খানম(সহযোগী অধ্যাপক)
অধ্যাপক ডাঃ ঝর্ণা ম্যাডাম
অধ্যাপক ডাঃ মেরিনা খানম প্রমুখ
এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগে ছিলেন
অধ্যাপক ডা নাসির উদ্দিন হুমায়ুন স্যার (চক্ষু)
অধ্যাপক ডাঃ আসাদুল হক খান স্যার (নাক কান গলা)
অধ্যাপক ডাঃ ফজলুল হক স্যার( চক্ষু বিখ্যাত ফুটবলার)
অধাপক ডাঃ এম মুজিবুল হক স্যার( চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগ)
অধ্যাপক ডাঃ বিডি সাহা স্যার( শিশু)
অধ্যাপক ডাঃ এএসকিউএম সাদেক স্যার (রেডিওলজি)) এ ছাড়া আরও অনেক জন সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
আমাদের শিক্ষকগন আমাদের শিক্ষকতা দানের পাশাপাশি আমাদের নানা গঠনমূলক কাজে বিভিন্নভাবে উতসাহ অনুপ্রেরনাময় বিশেষ ভুমিকা পালন করতেন যা আমাদের ভবিষ্যত জীবনের পাথেয় হিসেবে চির অম্লান হয়ে আছে।

২.
প্রথম দিন ২৪ জানুয়ারি ১৯৭৩ (৯ মাঘ)
সকাল ৭ টায় প্রথম ক্লাস নিচ তলার সর্বউত্তরে এনাটমি লেকচার হল(তখনও কোন গ্যালারি তৈরী নেই)।
আমি আর বাল্যবন্ধু রশিদ প্রচন্ড শীতে দুজনেই বাই সাইকেলে (বাসা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার ১৫ মিনিটের যাত্রাপথ) কলেজের করিডোর দিয়ে ক্লাসের দিকে যাচ্ছি।পেছন থেকে মেয়ে কন্ঠে জোড় কন্ঠস্বরের ডাকে পেছনে দেখি কারমাইকেল কলেজের সহপাঠি ছবি ও সোহেলী। রংপুর শহরের রাধাবল্লভে বাসা।
ছবি/সোহেলী ঃ এই মান্টু! এই রশিদ! এখন কিন্তু আমরা মেডিকেলের পড়াশুনায় এসেছি।আগেতো কথা বলতাম না এখন কিন্তু কথা বলব।
আমি/রশিদঃ জী ঠিক। তাই হবে।
একসাথে ক্লাসের দিকে যাত্রা-
ক্লাস গমগম করছে।নব-নবীনের কোলাহলে তীব্র শীতেও উষ্ণতা ছড়িয়ে একে অপরের সাথে আলাপ পরিচয় আনন্দময় এক পবিত্র পরিবেশ।
দুজন ছাত্র কে দেখলাম ধবধবে সাদা এপ্রোন গায়ে বসে আছে পাশাপাশি পরে নাম জানলাম বিজয় সরকার এবং পশুপতি সাহা অথবা গুরুদাস শিকদার (ফরিদপুরের)।অন্যান্যদের সম্ভবতঃ এপ্রোন তখনো তৈরী হয় নি।
ধীর স্থির ভাবে লেকচার ডায়াসে উঠলেন প্রফেসর ডাঃ আব্দুস সালাম ( এনাটমি বিভাগীয় প্রধান)পরে স্যারের বিষয় জেনে আমরা গর্বিত যে তিনি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের একজন মহান ভাষা-সৈনিক।স্যার প্রথম ক্লাসেই মেডিকেল শিক্ষা নিয়ে কিছু বললেন আমাদের সবাই দাড়িয়ে নিজেদের পরিচয় পর্ব শেষ হলে তিনি কিছু উপদেশ দিলেন।দুরুদুরু বুকে প্রথম ক্লাশের সমাপ্তি টেনে পরের ক্লাস টিউটরিয়াল কিন্তু কে নেবেন জানা হলো না।
ক্লাসের শেষে করিডোরে জটলায় কে একজন বললে এই জানো তোমরা আমাদের জন্য চমতকার বিদেশি ইউনিয়ন শার্ট এসেছিলো কিন্তু প্রথম ব্যাচের বড় ভাইয়েরা আমাদের দেন নাই।সবাই মন খারাপ করলাম প্রস্তাব আসলো এক্ষুনি প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে যেতে হবে।হৈ হৈ করে স্যারের সামনে গেলাম।চেম্বারের সামনে তিনি সৌজন্যতায় কথা বললেন ভবিষ্যতে এ বিষয় দেখবেন বললেন।আমরা কেউ কেউ প্রতিবাদ মুখর হলাম এবং অন্যায়ের বিপক্ষে প্রতিবাদী ব্যাচ হিসেবে প্রথম দিনেই কলেজকে জানান দিলাম। (পরের বর্ননায় আরও বলতে হবে)
উল্লেখ্য যে আমাদের ঐ সময়ে অরিয়েন্টেশন ক্লাস চালু ছিল না সুবিধামত দেশের আটটি মেডিকেল আলাদা ভাবেই প্রথম ক্লাস এভাবেই শুরু করত।তবে কয়েকদিনের মধ্যেই কলেজের পক্ষে নবীন বরণ অনুষ্ঠান হলো প্রধান অতিথি ছিলেন ততকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিভাগের অন্যতম উপ-পরিচালক রংপুর ধাপ নিবাসী ডাঃ টি এইচ বসুনিয়া স্যার।
(স্ত্রী -প্রসুতি বিভাগীয় প্রধান ডাঃ কামরুন নাহার জুই এবং রচিমহা উপ-পরিচালক এনেস্থেসীয়লজিষ্ট ডাঃ মিলন এখন এবাড়িতে আবাস গড়েছেন)।
প্রধান অতিথি আমাদের বিভিন্ন উপদেশ মুলক বক্তব্যের এক পর্যায়ে বললেন “শোন! মেডিকেলে ঢুকতে কষ্ট ঢুকে কষ্ট বেড়ুতে কষ্ট বেড়িয়ে কষ্ট”।
সত্যি সেদিন স্যারের কথায় আমরা হেসেছিলাম কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই বাক্যের সত্যতা এখনো আমরা হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করি।
এমন নবীন বরন আরো হয়েছিল কলেজের সিনিয়র ভাই (১ম ব্যাচ) দের ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে।যেমন ছাত্র ইউনিওন মতিয়া গ্রুপ ও মেনন গ্রুপ ছাত্রলীগ মুজিববাদী এবং জাসদ গ্রুপ মোট চারটি সংঠনের উদ্যোগে। সে অনুষ্ঠান গুলোতে আমি সহ গান করে এমন অনেকে গান গেয়েছিলাম। সে স্মৃতি এখনো মনে হয় এই তো সেদিন
একটা প্যারোডি করেছিলাম” মেডিকেলে পড়তে এসে ঘুরছি গোলক ধাধায় -” ( ঢাকা শহর দেখতে এসে ঘুরছি গোলক ধাধায়–শিল্পী আব্দুল জব্বার)
আরেক অনুষ্ঠানে গাইলাম– ” প্রেমময় এইদিন চিরদিন বুঝি আর হলো না ” (প্যারোডি -গীতিময় এইদিন চিরদিন বুঝি আর হলো না
শিল্পী -সাবিনা ইয়াসমিন)।
(আমাদের মেডিকেলের জনপ্রিয় এসব নাটক সাংস্কৃতিক খেলা প্রসংগে আরো বর্ননা দেয়া হবে ।)
(বন্ধু হাসিব নাজনু সৌদি প্রবাসী ঐ সময়ের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী – pl wait।)
প্রথম দিনের ক্লাসে আমরা নিশ্চিত হয়ে যাই যে ঐতিহাসিক কারমাইকেল থেকেই মেডিকেলে চান্স পেয়েছিলাম প্রায় ৬৫ জন আর বাকিরা অন্যান্য কলেজ/জেলা থেকে।এদের মধ্যে মেয়েরা চান্স পেয়েছিল ১৩ জন। নিয়মিত ক্লাসে এসেছিল ১২ জন (অন্যজন ছিল বাংলাদেশে টেষ্ট টিউব বেবি প্রযুক্তির পথিকৃত অধ্যাপক ডাঃ ফাতেমা পারভিন এবং সে আমাদের সেশনে ভর্তি হলেও ৩য় ব্যাচের সংগে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক শিক্ষা কোর্স শেষ করে)
আমাদের এই ১২ জন সহপাঠিদের নিয়ে অনেক মজার স্মৃতি আজও অম্লান এবং তাদের প্রতিজনের সাথেই আমাদের আন্তরিক যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব অটুট আছে।
(এ বিষয়ে মেজর ডা রফিককে অনুরোধ কিছু ইনপুট দেয়ার জন্য এই পোস্টে এবং আশা করি আগ্রহী সব বন্ধুদেরকেও লিখতে আহবান জানাই)
আপাততঃ তাদের নাম এখানেঃ
কারমাইকেল থেকে আমাদের সহপাঠি- –
ডাঃ আফরোজা বেগম রীনা (গুপ্তপাড়া)
ডাঃ হোসনে আরা ছবি (রাধাবল্লভ)
মাহমুদা শিরিন আফরোজ সোহেলী (রাধাবল্লভ)
ডাঃ উম্মে সালমা লুলু (শালবন)
অন্য কলেজ/জেলা থেকেঃ
ডাঃ হাবিবা খাতুন অধ্যাপক( ডোমার)
ডাঃ জেসমিন আকতার মিলি রংপুর গংগাচরা
ডাঃ আঞ্জুমান আরা বেগম রানী (পীরগাছা)
ডাঃ মমতাজ বেগম (কামাল কাচনা)
ডাঃ সামসুন নাহার রেনু(গোমস্তপাড়া)
ডাঃ নাজমা চৌধুরী মালতি (শালবন)
ডাঃ সেলিনা আকতার জাহান নার্গিস (বগুরা)
ডাঃ জিন্নাত আরা হায়দার শেফালী (বগুরা)
ডাঃ আরিফা বেগম (বগুরা)
এখনতো যেকোন উচ্চতর শিক্ষায় মেয়েরাই বেশী চান্স পায়।
আমাদের আরেক বন্ধু নুরুল আমিন মেডিকেলে চান্স পেয়েও ভর্তি না হয়ে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং (এগ্রি) তে ভর্তি হয়।পরে সেখান থেকে বের হয়ে অন্য বিষয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করেন।তার সংগেও আমাদের বন্ধুত্বের যোগাযোগ অব্যাহত আছে।


মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি নতচিত্তে কৃতজ্ঞতা জানাই তিনি আমাদের এই জীবন আনন্দময় কর্মমুখরতায় এখনো সুস্থ রেখেছেন।
আজ কয়েকটি ছবি দিয়ে শুরু করলামঃ
প্রিয় বন্ধুরা আমার এ লেখা সরাসরি লিখছি দির্ঘ ৪৭ বছর পর স্মৃতি থেকে যা মনে আছে।সহপাঠি বন্ধুদের আহবান জানাই এতে সক্রিয়তায় অংশ গ্রহনের।দেখি কতদুর যেতে পারি।এ লেখায় তুলে আনতে চাই
আমাদের একাডেমিক জীবন সফলতা / ব্যার্থতা।
বিভিন্ন পর্যায়ের নানা মজার/অযাচিত ঘটনা।
আমাদের বিভিন্ন শিক্ষাসফর /পিকনিক/আনন্দভ্রমন।
জনপ্রিয় নাটক/সংগীত /সাহিত্য/ক্রীড়া /অন্যান্য।
ঐ সময়ের রাজনৈতিক /সামাজিক পরিবেশ/কয়েক বন্ধুর এবং আমাদের প্রতিবাদী বিষয়/কারো কারো স্বল্পকালীন কারাজীবন ইত্যাদি।
বন্ধুদের জুটিবেঁধে জীবন ও স্মৃতিময় ঘটনা (খুরশিদ ভাই প্রসংগ) ইত্যাদি। আপাততঃ এনিয়ে এগুতে চাইঃ
কত অপ্রতুলতার ভেতর এগিয়ে যাচ্ছিল কলেজের শিক্ষা জীবন। এমন কষ্ট দুখখ চলেছে প্রায় একবছর।
নতুন ক্লাস শুরুর পর অনেকগুলো সংকট আমাদের সামনে আসে যা তরুনবয়সে আমাদের কি করার আছে ভাবনায় পরলো সবাই।শিক্ষক স্বল্পতা ছিল প্রকট আবাসিক হোষ্টেল মানসম্পন্যতা নেই। মেয়েদের অস্থায়ী ব্যাবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা। আমরা যারা শহরের তাদের যাতায়াত সমস্যা। অনাগত সমস্যা হাসপাতাল তখনো নতুন ভবনে আনা যায়নি।ইত্যাদি নিয়ে শিক্ষার্থী অভিভাবক চিন্তিত।
কিন্তু বুকে সাহস নিয়ে আমরা সবাই মিটিংয়ে বসলাম আলোচনা বক্তৃতা নরমগরম হুংকার।অনেকে বললো ৬৯’এর গনআন্দোলনের প্রতিবাদ মিছিলে আমরা স্লোগান দিয়েছি ৭০ এর স্বাধিকার থেকে অতঃপর নির্বাচনে বাংগালির বিজয় দেখেছি ৭১ এর বাংলাদেশ অর্জনের পথে মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি/পরক্ষভাবে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি। অতএব বন্ধুদের আহবান জানানো হলো লড়াই সংগ্রাম করতে হবে।
“রংপুর মেডিকেলকে পুর্নাঙ্গতা দিতে হবে”। প্রণীত হলো নানা দাবি আদায়ের পথে পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন কর্মসূচি। আমাদের মহতি এ উদ্যোগে ধাপে ধাপে গড়ে উঠলো নানা মতামত পক্ষ/বিপক্ষ সংলাপ আলোচনা।স্থানীয় প্রশাসন/রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ/সাংবাদিক/ সুধী/ এমনকি রাজধানী ঢাকায় গিয়ে জনপ্রতিনিধি/মন্ত্রী /অতঃপর ততকালীন প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বংগবন্ধুর মত বিশাল হৃদয়ের এক মহান নেতার সংগে সাক্ষাত সব আমাদের স্বর্ণজ্জ্বল অধ্যায়।
আন্দোলন কর্মসুচিতে পালিত হয়েছিল কলেজ ক্যাম্পাস/ শহর সহ রাজধনী ঢাকায় /বিভিন্ন মোড়ে জনবহুল স্থানে পিকেটিং /মিছিল /সমাবেশ/সভা/।
সবশেষে আমরন অনশন কর্মসূচী।
সারা বাংলাদেশ ছড়িয়ে গেলো এ খবর।সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে জনপ্রিয় সরকারের শাসন আমলে শান্তিপূর্ণ অহিংস এই দেশের সর্বপ্রথম আমরন অনশনের মত প্রতিবাদী কর্মসূচি।
ভাবা যায় আজও গা শিউরে ওঠে।
আজকের প্রাচুর্যপূর্ণ নন্দিত পুর্নাঙ্গ রংপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে এসে অতিতের সেই দিনের চিত্র মেলানো যাবে না।
ইতিহাসগুলোকে কেউ স্মরণও করেন না।
সবার সুচিন্তিত মতামতে
রংপুর মেডিকেল কলেজকে পুর্নাঙ্গ রূপ দিতে হবে এর জন্য প্রণীত হলো ১১ দফা দাবি। এ দাবি পুরন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে এমন ঘোষণায় গঠিত হলো ঐতিহাসিক
“সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।”
ততকালীন বিভিন্ন মতের দলের সমন্বয়ে এ কমিটির সবাই শপথ নিলো দলীয় পরিচয়ের উর্ধে থেকে সবাই এ দাবির সপক্ষে অবিচল থাকবে। ঐ সময়ের ছাত্র ইউনিয়ন দুই গ্রুপ এবং ছাত্রলীগ দুইগ্রুপ এবং স্বতন্ত্রদের নিয়ে গঠিত হবে মুল স্টিয়ারিং কমিটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তা সাধারন ছাত্র সভায় অনুমোদনের পর এসব সিদ্ধান্তমত কর্মসূচি এগিয়ে যাবে। সে বর্ননা অনেক দির্ঘ।এ কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব করে ছিলেন (তারা প্রত্যেকে নিজদলের সিদ্ধান্ত সহ কাজ করতেন বিশ্বস্ততার সাথে) –প্রতিনিধি
ডাঃ জীবন ঘোষ (মুজিববাদি ছাত্র লীগ)
ডাঃ নুরুল আমিন( জাসদ ছাত্রলীগ)
ডাঃ বিজয় কুমার সরকার (ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া) অধ্যাপক ও মেজর জেনারেল অবঃ।
ডাঃ এটিএম মোজাম্মেল হক বকুল (বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন) এবং
ডাঃ মোঃ ইসপাহাক(স্বতন্ত্র)।
এদের মুল চালিকাশক্তি ছিলো প্রত্যেক আদর্শমতের নেতৃত্ত্ব এবং সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের অকুন্ঠ সমর্থন।কয়েকজন নেতৃত্বস্থানীয় বন্ধুদের নাম
ডাঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন
ডাঃ একরামুল হোসেন স্বপন
ডাঃ মাহমুদুল বারী দোহা
ডাঃ মোঃআব্দুর রউফ (সাবেক অধ্যক্ষ রচিম রংপুর)
ডাঃ নজরুল ইসলাম গাইবান্ধা
ডাঃ এ টি এম মোজাম্মেল হক বকুল
ডাঃ মোঃ আব্দুর রকিব প্রমুখ।(অসমাপ্ত)
পরবর্তিসময়ে এদের সবাই পেশাভিত্তিক বি এম এ ও জাতীয় রাজনৈতিক দলে/প্রতিষ্ঠানে জাতীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন হন।
বন্ধু ডাঃ ইউনুস পরপর তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।তিনি সম্প্রতি আমাদের মাঝে নেই তার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
দাবি আদায়ে অনশন প্রসংগঃ
দাবি পুরনের মিথ্যে আশ্বাস এবং দাবি আদায়ের সংগ্রাম ত্বরান্বিত করতে সিদ্ধান্ত হয় আমরন অনশনের।এগিয়ে আসেন ২য় ব্যাচের অকুতভয় সাহসী চারজন বন্ধু (তোমাদের প্রতি নিরন্তর অভিবাদন ও ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা)
ডাঃ মোঃ ইউনুস আলী সরকার( মুজিববাদি ছাত্রলীগ) ডা নাজমুল ইসলাম বাবলা (জাসদ ছাত্রলীগ)
ডাঃমোঃআলতাফ হোসেন সরকার(জাসদ ছাত্রলীগ )
ডাঃ অমল কুমার বর্মন (বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন)
এই ঐতিহাসিক আন্দোলন নিয়ে আরো বিশদ তথ্যমুলক লেখা প্রিয় বন্ধু ডাঃ একরামুল হোসেন স্বপন ডা মাহমুদুল বারী দোহা ডাঃ বকুল ডাঃ আব্দুর রউফ প্রমুখ বা অন্যান্য বন্ধুরা লিখলে অজানা আরও অনেক জানা যাবে (অনুরোধ জানাই)।
( পেশাভিত্তিক সংগ্রামের কথা পরের পুর্বগুলোতে আসবে)

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge