মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন

প্রবন্ধ # পবিত্র ইদুল ফিতরের শিক্ষা- ভ্রাতৃত্ববোধ-মাজহারুল মোর্শেদ

প্রবন্ধ # পবিত্র ইদুল ফিতরের শিক্ষা- ভ্রাতৃত্ববোধ-মাজহারুল মোর্শেদ

‘ইদ’ আরবি শব্দ ‘আওদ্’ বা ‘আওদুন’ মূল শব্দ থেকে ‘ইদ’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। এর শাব্দিক অর্থ ঘুরে ঘুরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। প্রচলিত অর্থে ‘ইদ’ মানে আনন্দ বা খুশি। দিবসটি প্রতিবছর মানুষের কাছে আনন্দ-খুশি, উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ফিরে আসে বলে একে ‘ইদ’ বলা হয়।
‘ফিতর’ অর্থ হলো সাওম বা রোজা ভঙ্গ করা। সুতরাং ‘ইদুল ফিতর’ অর্থ হলো রমজানের মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আনন্দ। মুসলমানদের জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনা ও ধর্মীয় গাম্ভীর্যের মধ্যে ইদ অন্যতম উৎসব।
ইসলামের ইতিহাস পাঠে জানা যায় মদীনাবাসী জাহেলী যুগ থেকে শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ (পারসি নববর্ষ) এবং বসন্তের পূর্ণিমায়‘ মেহেরজান’ নামে দু’টো উৎসব পালন করতো। যা ছিল ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যহীন। এ ব্যাপারে হযরত আনাস (রাদ্বি.) থেকে বর্ণিত- “বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পবিত্র মক্কা নগরী থেকে হিজরত করে মদীনায় আসেন তখন তাদেরকে (বৎসরে) দু’দিন খেলাধূলা করতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, এ দু’দিন কিসের? সাহাবাগণ জবাবে বললেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিবসে খেলাধূলা বা আনন্দ প্রকাশ করতাম। অতপর রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- আল্লাহ তায়ালা উপরিক্ত দিন দু’টির পরিবর্তে তা অপেক্ষা উত্তম দু’টি দিন তোমাদের খুশি প্রকাশ করার জন্য দান করেছেন-এর একটি হচ্ছে-‘ইদুল ফিতর” এবং ‘ইদুল আদ্বহা’
সর্বাধিক মহিমান্বিত ও সাওয়াবে ভর্তি মাস পবিত্র রামাদ্বানের পরেই চন্দ্র বর্ষের দশম মাসের সূচনা দিনের মধ্য দিয়েই মাহে সাওয়ালের আগমন। সাওয়ালের বাঁকা চাঁদ বয়ে আনে মুমিন মুসলমানের আনন্দ উৎসবের এক গুচ্ছ ¯েøাগান- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ইদ’
ইদের উৎসবে একটু আনন্দের মধ্যে থাকা, খেলাধুলা করা বা উপভোগ করার শিক্ষা আমরা নবীজির জীবন থেকে পাই। আয়েশা (রা.) বলেন, ঈদের দিন হজরত আবু বকর (রা.) আমার ঘরে এলেন। সেখানে তখন দু’জন মেয়ে বুআস যুদ্ধের গান গাইছিল। তারা গায়িকা ছিল না। হজরত আবু বকর (রা.) ওই মেয়ে দুটোকে শক্ত ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানি বাদ্য! তাও রাসুলের ঘরে! রাসুল (সা.) বললেন, আবু বকর! ওদের ছেড়ে দাও। প্রতিটি জাতিরই ইদ ও খুশির দিন থাকে। আজ আমাদের ইদের দিন। (সহিহ বুখারি ৯৫২)।
ইদুল ফিতরের তাৎপর্য অপরিসীম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র বাণী- ‘‘যখন ইদুল ফিতরের দিন আসে, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যারা রোজা পালন করেছে; তাদের সম্পর্কে ফিরিশতাদের নিকট গৌরব করে বলেন- ‘‘হে আমার ফিরিশতাগণ, তোমরা বলতো! যে শ্রমিক তার কাজ পুরোপুরি সম্পাদন করে তার প্রাপ্য কি হওয়া উচিত? উত্তরে ফিরিশতাগণ বললেন, হে মাবুদ! পুরোপুরি পারিশ্রমিকই তার প্রাপ্য। ফিরিশতাগণ, আমার বান্দা-বান্দীগণ তাদের প্রতি নির্দেশিত ফরজ আদায় করেছে, এমনকি দোয়া করতে করতে ইদের নামাজের জন্য বের হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় আমার মহিমা, গরিমা, উচ্চ মর্যাদা ও উচ্চাসনের শপথ, আমি অবশ্যই তাদের প্রার্থনায় সাড়া দেব। এরপর নিজ বান্দাগণকে লক্ষ্য করে আল্লাহ পাক ঘোষণা দেন; তোমরা ফিরে যাও, ‘‘আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমাদের সাধারণ পাপরাশিকে পুণ্যে পরিণত করে দিলাম”।
ইদুল ফিতর-এর ফযিলত ও তাৎপর্য সম্পর্কে হযরত সাঈদ আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,- “ঈদুল ফিতরের দিনে আল্লাহর ফিরিশতাগণ রাস্তায় নেমে আসেন এবং গলিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন- মুসলমানগণ! তোমরা আল্লাহর দিকে দ্রæত ধাবিত হও। তিনি তোমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইবাদত কবুল করে অসংখ্য পুণ্য দান করে থাকেন। রোজা রাখার আদেশ করা হয়েছিল তোমাদেরকে, তা তোমরা পালন করেছো যথাযথভাবে। রাতেও জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদত করেছো। অতএব যাও, তাঁর নিকট থেকে গ্রহণ কর তোমাদের ইবাদতের প্রতিদান”। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,- “তখন তারা ক্ষমা প্রাপ্ত অবস্থায় (বাড়িতে) প্রত্যাবর্তন করে।’’
রমজানে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। পুরো মাসে সাহরি, ইফতারি, তারাবিহ, দান-সাদকা ইত্যাদি করে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। চাঁদ দেখে রোজা শেষ করার মধ্য দিয়ে সেই সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের প্রশিক্ষণ ইদুল ফিতরের মাধ্যমে মুসলিম মানসে আনন্দ-ফুর্তিতে, সৌন্দর্য-মাধুর্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ মুছে দিয়ে শান্তি ও সাম্য-মৈত্রীর প্রেরণা জোগায়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে ইদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে পরস্পর শুভেচ্ছা বিনিময় করে, কোলাকুলি করে, খবরাখবর নেয়। যার মধ্য দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয়। এই শিক্ষা সারা জীবন অনুসরণ করে, পরস্পরের মধ্যে শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হয়। মানুষ সুখি ও সমৃদ্ধ জীবনের সন্ধানলাভ করে।
ইদ নিছক ধর্মীয় উৎসব নয়, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। আর ইদের উৎসব সর্বজনীন। তাই প্রতিবছর মুসলমানদের জীবনে ফিরে আসে খুশির ইদ। সিয়াম সাধনার পর এই অবসরযাপন ও বিনোদন এক অনাবিল প্রশান্তি ও আনন্দ বয়ে আনে আমাদের জীবনে। আত্মীয়তা, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের বিভায় উজ্জ¦ল হয়ে ওঠে কয়েকটি দিন। আমাদের অবসাদ-ক্লিষ্ট জীবনের মরা গাঙে প্রাণশক্তির জোয়ার আসে। নতুন উদ্যম ও কর্মপ্রেরণা নিয়ে আমরা আবার কর্ম জীবনে পদার্পণ করি।
ইসলামে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা ফরজ। সারা বছর কর্মব্যস্ততার কারণে আমরা অনেক আপনজনকেই ভুলে থাকি। সবার খোঁজ খবর সঠিকভাবে নেওয়া হয়ে ওঠে না। ইদের উৎসবে সবাই একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাই। আমাদের দেশে অনেক কর্মজীবী মানুষ বাবা মায়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ ও সময় কাটানোর সুযোগ পায় ইদের ছুটিতে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ ও তাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার সুযোগও হয় ইদে।
ইদের আনন্দ উৎসব উপভোগ করতে সবাই চায় প্রিয়জনের কাছাকাছি থাকতে। অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে প্রিয়জনদের কাছ থেকে অনেক দূরে বসবাস করে তাই ইদের উসিলায় তারা নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে ইদের আনন্দ উপভোগ করে। ইদের সময় অপেক্ষাকৃত বেশি ছুটি থাকায় অনেকেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান এ কারণে সামাজিক সম্পর্ক জোরালো হয়।
ইদের খুশির দিনেও অনেক অসহায়-গরিব মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। এছাড়া অনেক পথশিশু কাগজ কুড়িয়ে, বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করে ইদের দিনেও জীবিকা নির্বাহ করে। ইদের আনন্দ তাদের নাগালের বাইরে। তাদের পক্ষে নতুন পোশাক পরা, বিনোদন বা আনন্দ উপভোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারা চিড়িয়াখানা ও শিশু পার্কসহ শিশুদের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে যায়, তবে ইদ আনন্দ উপভোগের জন্য নয়-বরং তাদের বেঁচে থাকার জন্য, জীবিকার সন্ধানে। ভ্রাতৃত্ববোধ ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই ইদের মূল শিক্ষা। পুরোনো বিদ্বেষ আর হানাহানির কথা ভুলে গিয়ে মুসলমানরা একে অপরকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে সাম্যের এ উৎসবে। পবিত্র ইদুল ফিতরে জাতীয় ঐক্য, সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্ব সুসংহত হয়।
মুসলমান সমাজের প্রধান আনন্দ উৎসব ইদ। আর এ উৎসবের মূলে রয়েছে সামাজিক ঐক্য। ইদুল ফিতরের সব অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা বিনিময়ের মাধ্যমে মানবিক ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটাই ইদুল ফিতরের সামাজিক তাৎপর্য। বিশ্বব্যাপী প্রত্যেক মুসলমান যাতে ইদুল ফিতরের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সেজন্য রমজান মাসে অধিক হারে দান, জাকাত ও ফিতরা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ধর্মে। এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমতে পারে। ইদ উৎসবে কেনাবেচা বেড়ে যায়, যা অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে। এসবই ইদুল ফিতরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব। পবিত্র ঈদ মানব সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কালো-সাদা নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে মিলিত হয়।
ইতঃপূর্বে করোনা মহামারির কারণে দুবছর ইদ উৎসবের আমেজ তেমন ছিল না। এবার রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে ও রোজার মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ অগ্নিকাÐের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ঢাকার বঙ্গবাজার ও নিউ সুপার মার্কেটে বড় ধরনের অগ্নিকাÐে বহু ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারিয়েছেন। এছাড়া নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের। তাই তাদের জন্য ঈদ উদযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া আবহাওয়ার বৈরিতা, বিশেষ করে তীব্র গরমে নিম্ন-আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। তাদের উপার্জন কমে যায়; ফলে ঈদ উৎসব ¤ø¬ান হয়ে যায়। তবে এসব সত্বেও ইদ উৎসবের আর্থসামাজিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
আমাদেও দেশে ইদ জাঁকজমকপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। এদিন সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো পোশাক পরে। বাড়িতে ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করে। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও এ আনন্দে শরিক হন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীও এ দিনটিকে যথাযথ মর্যাদা ও আনন্দের সঙ্গে পালন করে। মুসলমানরা ধনী-গরিব নির্বিশেষে একই কাতারবন্দি হয়ে ইদগাহে নামাজ পড়ে। সবাই পারস্পারিক ইদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে ইদের আবেগ ও আনন্দ শেয়ার করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সমাজের ধনী ও সামর্থ্যবানরা দরিদ্রের একটি নির্দিষ্ট হারে জাকাত ও ফিতরা বিতরণ করে, যা ধনীদের জন্য ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক।
ইদুল ফিতর ভালোবাসা ও মিলনের উৎসব, মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি গড়ে তোলার উদযাপন। ইদ সবার জন্য আনন্দ নিয়ে আসে, সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। জাতীয় জীবনে এর আবির্ভাব সর্বত্র দেখা যায়। ভিন্ন ধর্মের মানুষও ইদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুফল ভোগ করে। ইদ উৎসবকেন্দ্রিক আয়োজনও কম নয়। ইদ সামনে রেখে ইদের বাজার চাঙা হয়, যা একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকেও মজবুত করে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ যখন দুর্ভোগ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্রামে ছুটে যায়, তখন তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge