মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন

প্রবন্ধ # নদীয়ার গর্ব নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-ড.সীমা রায়

প্রবন্ধ # নদীয়ার গর্ব নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-ড.সীমা রায়

নদীয়ার কৃতী সন্তান দ্বিজেন্দ্রলাল রায় নাট্যকার হিসেবেই সাহিত্য জগতে নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।বাংলা নাট্য জগতে যে ক’জন শক্তিমান নাট্যকারকে আমরা পাই তার মধ্যে অন্যতম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।তাঁর বাংলা নাট্যজগতে আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রহসন নাটক দিয়ে।যদিও তার খ্যাতিলাভ হয় কবি,সাহিত্যিক ও নাট্যকার হিসেবে।১৮৯৫ সালে ‘কল্কি অবতার’ তাঁর প্রথম প্রহসন নাটক।।প্রহসন নাটকটি মজার ছড়া ও হাসির গানের মালা দিয়ে রচিত।নাট্যকার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলাল নাট্যকার অমৃতলাল বসুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।এ অভিমত সুকুমার সেন মহাশয়ের।
নাটকের ক্ষেত্রে তিনি অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালে প্রবেশ করেছিলেন।১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ‘প্রতাপসিংহ’ নাটক রচনার সময় থেকেই দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্যরচনার পূর্ণাঙ্গ যুগ বলা যায়।তবে এর পূর্বেও ১৯০০ এবং ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি যথাক্রমে আরো দুটি নাটক রচনা করেছিলেন।একটি ‘পাষাণী’ ,অন্যটি ‘তারাবাঈ’।দ্বিজেন্দ্রলালের নাটক রচনার যুগ অপেক্ষাকৃত পরবর্তী কালের হলেও বাল্যকাল থেকে নাটক পাঠে তাঁর আসক্তি ছিল।দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্যপ্রতিভার বিচার প্রসঙ্গে এই তথ্যটি স্মরণ রাখা কর্তব্য।কারণ গিরিশচন্দ্র এবং ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের মতো দুই প্রখ্যাত নাট্যকারের পাশে তাঁকে নাটক রচনা করে খ্যাতিলাভ করতে হয়েছিল।
গিরিশচন্দ্র বা ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ ঐতিহাসিক নাটক রচনা করেছেন বটে,কিন্তু তারা কেউই যুগজীবনের উত্তাপকে দ্বিজেন্দ্রলালের মতো নাটকীয় অন্তর্দ্বন্দের অন্তর্ভুক্ত করে তুলতে পারেন নি।শুধু দেশপ্রেমই নয় কল্যাণ, মৈত্রী ও বিশ্বনীতির আদর্শকে তিনি নাটকের মধ্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।ঐতিহাসিক পরিবেশ ও চমৎকারিত্ব ফুটিয়ে তোলায় সাহায্য করেছে তাঁর কাব্যধর্মী ভাষা,চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দকে তীব্রতর করে তিনি নাটকীয় সংঘাত লগ্নগুলিকে উজ্জ্বল করে তুলেছেন।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ভাবোচ্ছ্বাসকে সর্বপ্রথম রূপ দিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ তাঁর “প্রতাপাদিত্য” নাটকে।তারপরে এলেন গিরিশচন্দ্র ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।পৌরাণিক নাটকে ধর্মভাব ও ভক্তিরসিক্ততা রূপান্তরিত হলো এক ইতিহাস- আশ্রিত ,মানব জীবনের আশা- আকাঙ্খার কাহিনীতে।ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক নাটকের পিছনে নবজাগ্রত জাতীয় জীবনের কোন সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার ইঙ্গিত ছিল না।দ্বিজেন্দ্রলাল রচিত নাটকগুলির ইতিহাস প্রসিদ্ধ চরিত্রগুলির বীরত্ব, স্বদেশপ্রেমিকতা,আত্মত্যাগ প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলি বিংশ শতাব্দীর বঙ্গবাসীর মনে বৈপ্লবিক চেতনা ও স্বাধীনতা স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল।দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্যকার খ্যাতির মূলে আছে তাঁর এই ঐতিহাসিক নাটক ও চরিত্রগুলি।
দ্বিজেন্দ্রলাল সহজেই মানুষের মন জয় করেছিলেন আধুনিক মানবচেতনামূলক নাট্য রচনার মধ্য দিয়ে।তার নাটকের মধ্যে দিয়েই বাঙালি জীবনের নাট্য চর্চার ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়।তাঁর নাটক পর্যালোচনা করতে গিয়ে “ভারতী” পত্রিকায় সৌরেন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন,'”মানব হৃদয়ের বিবিধভাব,সেন্টিমেন্ট, প্রবৃত্তি যেন আকার পাইয়া তাহার নাটক মূর্তিমান হইয়াছে।বাংলা নাটকে সেন্টিমেন্টের এমন লীলা দ্বিজেন্দ্রলালের পূর্বে কোনো নাট্যকারই দ্বিতীয় নাটকে দেখাতে পারেন নাই।'”
দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো ব্যক্তি হৃদয়ের দ্বন্দ্বের অপূর্ব প্রকাশ।শেক্সপিয়র সম্পর্কে Stoll বলেছিলেন,
“The illusion he offers is the widest and heights,
the emotion hearouses is the most irresistible and over whelming.”এই অভিমতটি ডি. এল.রায়ের ক্ষেত্রেও মিলে যায়।আবেগ তরল এবং উত্তপ্ত বাগধারা ভাষারীতির উত্থান পতন( ক্লাইম্যাক্স-আন্টিক্লাইম্যাক্স),অপূর্ব কাব্যধর্মী গমগমে সংলাপ– এসবের জন্য তিনি জার্মান নাট্যকার শীলারের কাছে ঋণী।তাঁর নাটকে অভিনয়ের অতিরিক্ত পাঠযোগ্য সাহিত্য গুণও খুব উচ্চ স্তরের।
ডি.এল. রায়ের খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে প্রতিষ্ঠিত।অনেকের মতে ডি. এল.রায় বাংলা নাট্য সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনা করেন অর্থাৎ দ্বিজেন্দ্রলাল ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে অতীত ইতিহাসকে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে উপস্থিত করে তাদের নতুন ভাবে গড়ে তুলেছেন।স্বদেশী আন্দোলনের উন্মাদনায় বাঙালির হৃদয়ে যে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে,সেই নবজাগরণকে দ্বিজেন্দ্রলাল অতীত ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে পরিবেশন করেছেন।ইতিহাসের চরিত্রগুলির মধ্যে তিনি মানবিক অন্তর্দ্বন্দ,আলোড়ন সৃষ্টি করে তাদের আধুনিকীকরণ করেছেন। নাটকগুলিতে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।ঐতিহাসিক নাটকগুলির ভাষা গদ্য ও ঋজু।তাঁর ঐতিহাসিক নাটক গুলি কোথাও ইতিহাসকে বিকৃত করেনি।এ প্রসঙ্গে জীবনীকার দেবকুমার রায় চৌধুরী জানিয়েছেন:
তাঁহার ঐতিহাসিক নাটক গুলি অতি সাবধানতার সহিত লিখিত। কোন স্থানেই তিনি ইতিহাসকে একেবারে অতিক্রম করেন নাই।যেখানে ইতিহাসকার নীরব,মাত্র সেখানেই তাহার মোহিনী কল্পনা অতি নিপুণতার সহিত বর্ণপাত করিয়াছে।
ইতিহাসকে এমনভাবে চাক্ষুস করে তোলা,ঐতিহাসিক নরনারীকে জীবন্ত করা এবং তারই সঙ্গে সমসাময়িক বাংলাদেশের সঙ্গে নাটকগুলির আন্তরিক যোগস্থাপন করা— এতে তিনি অনন্য সাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।তার প্রথম নাটক ‘তারাবাঈ’-এ অমিত্রাক্ষর ছন্দে অপরিণতির ছাপ আছে।টডের ‘রাজস্থান’- এর অনুসরণে লেখা।’রাণাপ্রতাপ সিংহ’ নাটকে হিন্দু- মুসলমান ঐক্য চিত্রটি উল্লেখযোগ্য।’দুর্গাদাস’ নাটকে স্বাদেশিকতার পরিচয় মেলে।’নূরজাজাহান’ তাঁর অনবদ্য কীর্তি।ঐতিহাসিক ট্রাজেডির এক অনবদ্য দলিল। ‘মেবার পতন’ স্বদেশ প্রেমের ভাবনাকে মূর্ত করেছে।’সাজাহান’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ঔরঙ্গজেব, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে বিদেশী প্রভাব দেখা যায়।ঐতিহাসিক নাটকেই তার সর্বোত্তম সিদ্ধি।
ডি. এল. রায়ের পৌরাণিক নাটকগুলিতে ভক্তিভাবের বা রসের প্রাবল্য নেই।তিনি আধুনিকতার পটভূমিতে পুরাণ কাহিনীকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।ফলে পৌরাণিক চরিত্রে আধুনিক যুগের ভাব বৈশিষ্ট্য বিশেষতঃ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য সংযুক্ত হয়েছে।’সীতা’,’ভীষ্ম’ ইত্যাদি পৌরাণিক নাটকে লেখকের পরিণত মননের খোঁজ পাওয়া যায়।
দ্বিজেন্দ্রলালের সামাজিক নাটক মাত্র দুটি—- ‘পরপারে’,’বঙ্গনারী’।তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার করুণ চিত্র,অসহায় ও দুঃস্থ মানুষের আর্তনাদ তাঁর নাটকের সংলাপে ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে।নাটক দুটি অভিনয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও নাট্য গুণে ও সাহিত্য গুণে পরিত্যক্ত হয়েছে।
দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্য রচনার বিশেষ পর্বটি হল প্রহসন।ড. অজিতকুমার ঘোষ বলেছিলেন,” তাঁহার। প্রহসনে ব্যঙ্গ চিত্ররূপের কাটাগুলি একটু তীক্ষ্ণ ভাবেই আছে।” ‘বিরহ’ প্রহসনটি তুলনামূলক উচ্চমানের।’ ‘ত্র্যহস্পর্শ’- তে প্রতিভার ছাপ নেই।ড. সুকুমার সেন তাঁর প্রহসন সম্পর্কে বলেছেন,
“দ্বিজেন্দ্রলালের প্রহসন গুলিতে প্রায়ই কপটাচারের প্রতি উপহাস আছে।সংলাপে কৌতূকের চেষ্টা আছে কিন্তু সে চেষ্টা সর্বত্র সফল হয় নাই।তবে হাসির গানগুলি থাকায় অভিনয়ে কৌতূকাবহ।”
পরিশেষে বলা যায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বা ডি. এল. রায় শুধু নদীয়া জেলা নয়,সমগ্র বঙ্গদেশে তথা ভারতবর্ষের গর্ব তার পান্ডিত্য,ঐতিহাসিক চেতনা,দেশপ্রেম, সঙ্গীত ও সাহিত্য সৃষ্টির জন্য।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge