শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম স্মারক সংখ্যা ২০২১

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম স্মারক সংখ্যা ২০২১

মো: শাহ আলম। লেখক নাম: মোহাম্মদ শাহ আলম/প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম।পিতা মো: আছিম উদ্দিন,মাতা খছিমন নেছা। জন্ম ৬ই জুলাই, ১৯৫৫খ্রিস্টব্দ। জন্ম রংপুরের পীরগাছা থানার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসর্দার গ্রামে। পঞ্চানন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, অন্নদানগর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি( রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড), বিএ সম্মান(বাংলা) কারমাইকেল কলেজ রংপুর(রাবি), এমএ (বাংলা) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
সাহিত্য কর্ম: লেখালেখি সূচনা: স্কুল জীবনে। কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, নিবন্ধ,গল্প, ফিচার প্রকাশ স্থানীয় ও জাতীয় পত্র-পত্রিকায়। বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা, উপদেশক। প্রকাশন্া: ভাওয়াইয়া (যৌথ গবেষণা); ধবল আলোর মায়াবী ডাক(কাব্যগ্রন্থ); সাহসী নিসর্গ( যৌথ কাব্য); বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা (গল্পগ্রন্থ); ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন(যৌথ ছড়াগ্রন্থ),গবেষণা গ্রন্থÑ ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা। প্রকাশিতব্য গ্রন্থ ‘রংপুরের ভাষা আন্দোলন; নীতিকবিতা: বিশ্লেষণের আলো; কবিতার বই ‘বিদ্রোহী আঁচলে বসন্ত, ‘লিমেরিক’, ‘আমার যত গান।’ সাহিত্য পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
সম্পাদনা: রংপুর সাহিত্য পত্র, অভিযাত্রিক সাহিত্য পত্রিকা, মুহম্মদ আলীম উদ্দীন এর ৭৫ বছর পূর্তি স্মারক – প্রজ্ঞার পাললিক ঘ্রাণ; নায়েম এর প্রশিক্ষণ পত্রিকা, বিভিন্ন দেয়াল পত্রিকা, কলেজ ম্যাগাজিন।
প্রফেসর শাহ আলম দক্ষ সংগঠক, গীতিকার,নাট্যকার ও আবৃত্তিকার বাংলাদেশ বেতার; বেতার অনুষ্ঠান উপস্থাপক, কথিকা পাঠক,পাণ্ডুলিপি সরবরাহক ,বিভিন্ন সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ, আলোচক হিসেবে যোগদান, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্কের বিচারক, সভাপতি, স্পিকারের দায়িত্ব পালন, আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ। আবৃত্তি ও বিতর্ক ক্ষেত্রে রেখে চলেছেন অনবদ্য অবদান। করোনা সময়ে ফোনে অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন।
বিতর্ক: ১৯৭৭ এ বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন কারমাইকেল কলেজ দলের পক্ষে। দলনেতা ছিলেন রকিবুল হাসান বুলবুল, সদস্য আনওয়ারুল ইসলাম রাজু। বিজয়ী হয় তার দল। কারমাইকেল কলেজে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে যোগ দেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন কারমাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদ। বিতর্ক চর্চা বেগবান করতে বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন, কর্মশালায় প্রবন্ধপাঠ, বক্তব্য রাখেন, বিতর্ক ও উচ্চারণ বিষয়ে প্রশিক্ষন দেন। এখনও বিতর্ক আয়োজনে সভাপতি, মডারেটর, স্পিকার, বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন সুনামের সাথে। তার হাত ধরেই বিতর্ক আন্দেলন বেগবান হয়েছে, তৈরি হয়েছে অনেক তার্কিক। অব্যাহত আছে সে ধারা।
আবৃত্তি: ছাত্রীবন থেকেই সম্পৃক্ততা আবৃত্তির সাথে। স্কুলে আবৃত্তি প্রেিযাগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও আবৃত্তি করে সুনাম অর্জন করেছেন। আবৃত্তিতে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। রংপুরে অভিযাত্রিক সংসদে আবৃত্তি বিভাগ খুলে আবৃত্তি প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন । প্রস্তুত করেন আবৃত্তি বিষয়ক পাঠক্রম। এরপর ২০০২ এ প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চ কেন্দ্র।’ গত ১৮ বছর ধরে প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন, আবৃত্তি, উপস্থাপন, শুদ্ধ উচ্চারণ, বাকভঙ্গির নানা বিষেয়ে। বহু আবৃত্তি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন, করছেন। তাঁর প্রশিক্ষত শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সুনামের সাথে আবৃত্তি, সংবাদপাঠ, উপস্থাপন, সাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আসছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী তার কাছে শিখেছেন আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক, সুন্দর বাচনভঙ্গি, এখনও শিখছেন অনেকেই।
উপস্থাপন: প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম একজন দক্ষ উপস্থাপক। অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেছেন। দেবীগঞ্জ চীন-মৈত্রী সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোহাম্মদ শাহ আলম সে অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন এবং প্রশংসা অর্জন করেন। কারমাইকেল কলেজে একটি অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া প্রধান অতিথি ছিলেন সে অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন প্রফেসর শাহ আলম। ২০০৭ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার মিঠাপকুর এবং গঙ্গাচড়ায় দুটি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন। এছড়াও বহু সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ও বিজ্ঞজনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান উপস্থাপন, সেমিনার পরিচালনা করেন তিনি। করোনা কালেও রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের অনলাইল সাহিত্য বৈঠক সঞ্চালনা এবং তবুও কাছাকাছি নামের একটি জীবন, তথ্য ও বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন। করোনা সংকট উত্তরণে সচেতনতা সৃষ্টিতে বেসরকারি সংস্থা ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র উদ্যোগে বিশেষ অনলাইন আলোচনাভিত্থিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। স্বরশৈলী আবৃত্তি, উপস্থাপন ও বিতর্ক চর্চা কেন্দ্রের আয়োজনে বাংলা নববর্ষ বরণ-১৪২৮ অনুষ্ঠান, রবীন্দ্র জয়ন্তী-১৪২৮, নজরুল জয়ন্তী-১৪২৮ অনলাইনে সঞ্চালক ছিলেন তিনি। এছাড়াও দেশে বিদেদেশে অনলাইনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। করোনা সময়ে অনলাইনে স্বরশৈলী আবৃত্তি, উপস্থাপন ও বিতর্ক চর্চা কেন্দ্রে প্রতিসপ্তাহে শুক্রবার করে ক্লাস নেন তিনি। প্রশিক্ষণ দেন আবৃত্তি, উপস্থাপন, শুদ্ধ উচ্চারণ,রস, বিতর্ক বিষয়ে।
অধ্যাপনা, প্রভাষক,বাংলা চিলাহাটি সরকারি কলেজ,নীলফামারী; ভূতপূর্ব অধ্যাপক, বাংলা, কারমাইকেল কলেজ,রংপুর; সাবেক উপাধ্যক্ষ-উলিপুর সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ,সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর।
সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সংশ্লি¬ষ্টতা: জীবন সদস্য বাংলা একাডেমি; সম্মানিত সদস্য ড. এম.এ. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, ঢকা, পরিচালক স্বরশৈলী আবৃত্তির্ চর্চা কেন্দ্র; রংপুর; সাবেক সম্পাদক ও সভাপতি রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ; উপদেষ্টা রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ, উপদেষ্টা রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদ, উপদেষ্টা ত্রৈমাসিক নতুন সাহিত্য; উপদেষ্টা শিল্পধারা, রংপুর, উপদেষ্টা, ফিরে দেখা (সাহিত্যের কাগজ)রংপুর; সভাপতি মাহিগঞ্জ কলেজ রংপুর, প্রধান উপদেষ্টা শহিদ শংকু বিদ্যানিকেতন, রংপুর, উপদেষ্টা ইন্টারন্যাশনাল গ্রামার স্কুল (আইজি এস),রংপুর উপদেষ্টা প্রথম আলো বন্ধুসভা রংপুর, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, রংপুর, সদস্য, সচেতন নাগরিক কমিটি(সনাক) টিআইবি, রংপুর; সদস্য, সুজন, রংপুর, সাবেক অধ্যক্ষ, রংপুর অটিস্টিক ওয়েলফেয়ার সেন্টার, সাবেক সেমিনার সম্পাদক, বাংলা সেমিনার কারমাইকেল কলেজ,রংপুর, সাবেক সদস্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি,রংপুর; প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ; প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক বিতর্ক পরিষদ, কারমাইকেল কলেজ; আজীবন সদস্য বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, রংপুর; উপদেষ্টা স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন, কারমাইকেল কলেজ ইউনিট,রংপুর; উপদেষ্টা সোনার তরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ, অন্নদানগর; উপদেষ্টা স্পন্দন নাট্য গোষ্ঠী, কারমাইকেল কলেজ; উপদেষ্টা, সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী ও ক্রীড়া সংগঠন বাংলার চোখ, সাবেক সদস্য রংপুর প্রেসক্লাব; সাবেক সহকারি সম্পাদক(সাহিত্য)দৈনিক দাবানল,রংপুর;, সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ বন্ধু সভা ইউনিট, সহ-সভাপতি বেগম রোকেয়া ফোরাম,(আরডি আর এস) রংপুর; উপদেষ্টা, পেশাজীবী ফোরাম, আরডিআরএস, রংপুর; উপদেষ্টা নলেজ কেয়ার একাডেমি, রংপুর, সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক অভিযাত্রিক, আজীবন সদস্য রংপুর পাবলিক লাইবে্িরর, সহ-সভাপতি রংপুর মেট্টপলিটন কমিউনিটি পুলিশিং; যৌথ প্রতিষ্ঠাতা হাজী রহমতুল্লাহ্ পাঠাগার, বামনসর্দার, পীরগাছা,রংপুর।
সম্মাননা: শিক্ষকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ড. এম.এ. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন জাতীয় পদক, রংপুর নাগরিক পদক(১৯৯৫),নগরিক নাট্যগোষ্ঠী,রংপুর, সাহিত্য পদক(১৪০৮ বঙ্গাব্দ) বাংলাদেশ কবিতা সংসদ, পাবনা; সোনার তরী সাহিত্য সংসদ পদক, অরুণিমা সাহিত্য পদক (কাব্য) ,পাবনা(২০১৪), আইডিয়া পাবলিকেশন্স শ্রেষ্ঠ পাণ্ডুলিপিকার পদক(২০০১৭, ২০১৮), সম্মিলিত লেখক সমাজ আয়োজিত বই মেলা-২০১৮-বিশেষ সম্মাননা স্মারক, সাংগঠনিক অবদান ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পদক, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের জন্য কারমাইকেল কাইজেলিয়া শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংসদের (কাকাশিশ) সম্মাননা পদক (২০১৮), সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদের(কানাসাস) সম্মাননা পদক (২০১৮), আবৃত্তিতে অবদানের জন্য জয়পুরহাট আবৃত্তি সংসদের সম্মাননা পদক (২০১৮), বিতর্কে অবদানের জন্য ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন (এন ডি এফ)২০১৮সম্মাননা স্মারক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট ফেডারেশন(ব্রুডা) এর ২০১৯ এ ‘বিতর্ক গুরু’ উপাধি পদক, মুজিব শতবর্ষে বাংলাাদেশ কাব্য চন্দ্রিকা সাহিত্য একাডেমি ‘আজীবন সম্মাননা পদক-২০২০; ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজ সম্মাননা পদক; রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ বিশষ সম্মাননা পদক(সাহিত্য-২০১৯); রংপুর মেট্রোপলিটন কমিউনিটি পুলিশিং এর বিশেষ সম্মাননা স্মারক(২০২০); বিভগীয় লেখক পরিষদ পদক-২০২০(সাহিত্য), শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান রাখায় ‘মানবতার কল্যাণ ফাউণ্ডেশন পদক; রোকেয় দিবস ২০১৯ এ জেলা প্রশাসন রংপুরের সম্মাননা স্মারকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা লাভ।
সহধর্মিনী হালিমা খাতুন কারমাইকেল কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভোগের শিক্ষক ছিলেন, দুকন্যা- আফিফা ইশরত চেতনা, ডা. আছিফা ইশরত তনিমা।

শাহ আলম আমার অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র। দীর্ঘ পথ চলতে চলতে কখন যে ওকে পরিবারের একজন ভেবে আপন করে নিয়েছি- আজও অবাক হয়ে ভাবি। আমার মনে ওর আসন গভীরে। শাহ আলম কারমাইকেলে এইচএসসি পড়েছে। তখন ওকে চিনতাম না। চেনা হলো, জানাজানি হলো বাংলা অর্নাসে ভর্তি হবার পর। আপন আলোয় বিভাময় হয়ে সবার সামনে তার আসা। ক্লাশে মনোযোগী, পড়ালেখায়ও ভালো। সবচেয়ে আকর্ষণ করতো তার বলার ভঙ্গি। ওরা দল বেঁধে মাঝেমধ্যেই আসতো বিভাগের কার্যালয়ে। কথা হতো সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে। কী ভাবে পড়বে, নোট করবে, কী করলে ভালো ফলাফল হবে এমন প্রশ্ন করতো ওরা। এর মধ্যে দেখলাম তার অসাধারণ কর্মতৎপরতা ও নেতৃত্বগুণ। বিভাগের যে কোনো কাজে তার কোনো আপত্তি নেই, কাজও করতো সুচারুরূপে। ওদের ব্যাচে অনেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বেশ এগিয়ে ছিল এর মধ্যে নাম করা যায় শাহ আলম, রকিবুল হাসান বুলবুল, আনওয়ারুল ইসলাম রাজু, সাহানা বেগম ইরা, কাওসার জাহান লিনা, বিলকিস সুলতানা শিরির। ওরা নিজের উদ্যোগেই প্রকাশ করেছিল ‘শোনিতে সূর্যোদয়’ নামে ভাষা দিবসের পত্রিকা। সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেকের সাথে বিজয়ী হতো শাহ আলম। প্রতিযোগিাতা আয়োজনে, উপস্থাপনায় সহযোগিতাও করতো আনন্দিত চিত্তে। মৌখিক পরীক্ষা নিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষকগণ আসলে শাহ আলম আর তার বন্ধুরা তাদের দেখভাল করতো আন্তরিকভাবে। তাদেরকে স্বাগত জানানো, হোটেলে রাখার ব্যবস্থা, খাওয়া, বেড়ানো, বিদায় দেয়া সবই করতো ওরা। প্রফেসর অধ্যাপক শাহ আব্দুল হাই বিভাগে বাংলা সেমিনার প্রতিষ্ঠা করেন। তখনও বিশ্ববিদ্যালয় সেমিনারের অনুমতি দেয়নি। অধ্যাপক শাহ আব্দুল হাই বাংলা সেমিনারের সূচনাকারী। সে সেমিনারের প্রথম সেমিনার সম্পাদকের গুরু দায়িত্ব পালন করে শাহ আলম। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই চেয়ে এনে সমৃদ্ধ করে বাংলা সেমিনারকে। বাংলা বিভাগের পক্ষে ওরা বন্ধুরা মিলে জেলা প্রশাসন আয়োজিত রংপুরের প্রদর্শনীতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উৎপত্তি ও বিকাশ বিষয়ে স্টল দেয় এবং প্রথম স্থান অধিকার করে। এতে শাহ আলমের ভূমিকা ছিল অনবদ্য।

বেতারের তরুণকণ্ঠ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অন্যান্যের সাথে কণ্ঠস্বর পরীক্ষা দেয় শাহ আলম। নির্বাচক ছিলাম আমিও। আমি মুগ্ধ হয়েছি তার আবৃত্তি ও বাচন ভঙ্গিতে। পরে আমাদের সুপারিশে ও বাংলাদেশ বেতারে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে থাকে। ভাবতে ভালো লাগে ও এখন বেতার ব্যক্তিত্ব।

কারমাইকেল কলেজের পক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় রকিবুল হাসান বুলবুল আনওয়ারুল ইসলাম রাজু ও মোঃ শাহ আলম। বাছাই বোর্ডে আমরা যারা ছিলাম প্রত্যেকেই সঠিক নির্বাচন করতে পেরেছিলাম জন্যই কারমাইকেল বিতর্ক দলটি বিজয় অর্জন করেছিল।

মনে পড়ে কারমাইকেল কলেজে নাটক মঞ্চায়নের কথা। অনেক নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল অধ্যক্ষ কুদ্দুস বিশ্বাসের আগ্রহে ও সহযোগিতায় শিক্ষকগণের অভিনয়ে নাটক মঞ্চায়নের কথা। শাহ আলম তখন কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগে প্রভাষক। সে ‘বঙ্গেবর্গী’ নাটকে অভিনয় করে সিরাজ-উদ দৌলার চরিত্রে। মুগ্ধ হয়েছি তার অভিনয় নৈপুণ্যে।

কারমাইকেল কলেজে ছাত্র অবস্থায় যেমন সাংস্কৃতিক কর্মধারাকে বেগবান করেছে শিক্ষক হিসেবেও তার অবদান বিশেষ স্মরণীয়। মনে আছে কারমাইকেল কলেজে ও তখনও যোগ দেয়নি। আমরা জাকজমকের সাথে তিনদিন ধরে কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসবের আয়োজন করেছি। শাহ আলম তখন নীলফামারী সরকারি কলেজের প্রভাষক। সে উৎসবে শাহ আলম অনুষ্ঠানের অনেক পর্ব উপস্থাপন করেছে, ধারা বর্ণনা দিয়েছে। তার সহযোগী ভূমিকা আমাদের আয়োজনকে ঋদ্ধ করেছে।

১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ও প্রভাষক হিসেবে যোগ দেয় কারমাইকেল কলেজে। তারপরই ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে দুটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে একটি ‘কারমাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদ’ অন্যটি ‘কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ’। তার তত্ত্বাবধানে সংগঠন দুটি দারুণ বেগবান হয়। এ ছাড়াও স্পন্দন, বাঁধন, কারমাইকেল থিয়েটার, বনফুল বিভিন্ন সংগঠন পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল পথিকৃতের। কারমাইকেল কলেজে সেমিনার আয়োজন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি অনুষ্ঠান, বরণ, বিদায় সব অনুষ্ঠানে অগ্রগামী ভূমিকা রেখেছে শাহ আলম। অনুষ্ঠান উপস্থাপনকে শৈল্পিক পর্যায়ে নিতে তার দক্ষতা বিস্ময় জাগিয়েছে আমাদের মনে। মানপত্র লেখাতেও তার পারঙ্গমতা বিশেষ স্মরণযোগ্য। একসময় মানপত্র লেখার কাজটা আমিই করতাম। শাহ আলম আসায় আমার ভার লাঘব হয় অনেকটা। কলেজে শিক্ষক অথবা শিক্ষার্থীদের বরণ, বিদায় সব অনুষ্ঠানের মানপত্র লিখতো কাব্যিকতায়। ভালো লাগতো আমাদের। কলেজে সাহিত্যিক, উর্ধতন কর্মকর্ত, মন্ত্রী যিনিই আসুন না কেন উপস্থাপনের দায়িত্ব পড়তো শাহ আলমের ওপর। ও নিষ্ঠার সাথে পালন করতো দায়িত্ব।

মজার কথা হলো শাহ আলম নীলফামারী থেকে কারমাইকেলে বদলী আদেশ পেয়েও যোগদানে দেরি করছিল। আমার সাথে দেখা করলে বললাম তুমি যোগ দিচ্ছ না যে? ও বললোÑ ‘স্যার ভয় করছে, সাহস পাচ্ছি না। এত বড় কলেজ, অনার্স এম এ পড়াতে হবে, আামি পরবো তো স্যার?’ আমি সাহস দিয়ে বলেছিÑ ‘কোনো ভয় নেই, তুমি ভাল করবে। যোগ দাও তাড়াতাড়ি।’ ও যোগ দিয়েছে। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রপ্রিয়তা, সুনাম ও খ্যাতি সবই পেয়েছে। বিভাগ থেকে পত্রিকা প্রকাশে দিনরাত শ্রম দিয়েছে। তার তত্ত্বাবধানে বাংলা বিভাগ থেকে ‘ময়ূখ’সহ বেশকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। বিভাগের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সপ্তাহে শাহ আলম বিপুল মেধা ও শ্রম দিতো।

আমার খুব মনে পড়ে শাহ আলম প্রফেসর হবার খরটি ফোনে আমাকে জানিয়ে আবেগ তাড়িত হয়ে দোয়া চেয়েছিল। আমি নিজেও আবেগে আপ্লুত হই একটি ঘটনায়। শাহ আলম সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করবে। আমাকে ফোন দিয়ে জানালো -‘স্যার আপনাকে ছাড়া আমি যোগ দেব না। আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে।’ আমি বারণ করলাম- ‘আমার কী দরকার?’ ও শুনলো না সে কথা। বললো-‘স্যার আমি রিক্্রা নিয়ে আপনার বাসায় যাব, আপনাকে সাথে করে কলেজ যাব।’ তাই করেছিল শাহ আলম। দাপ্তরিক কাজ শেষে আমাকে সালাম করে বিভাগীয় প্রধানের চেয়ারে বসেছিল সে। তখন আমার চোখে পানি, এমন সম্মান বিরল আমার কাছে। যতদিন বিভাগীয় প্রধান ছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতো, একসাথে খেতাম। বনভোজনেও যাবার আমন্ত্রণ জানাতো। শুধু আমাকে নয় সব শিক্ষককে অকুণ্ঠ সম্মান প্রদর্শন করে শাহ আলম। ছাত্র হিসেবে যেমন সম্মান করছে, পরে সহকর্মী হিসেবেও সামান্য ব্যত্যয় হয়নি।

বলেছি ও পারিবারিক ভাবে জড়িয়ে আছে। আমার মেয়ে-জামাইরা নিজের চাচার মতো শ্রদ্ধা করে। ওর স্নেহও অবাধ। একটা ঘটনা না বললেই নয়। আমার ৭৫ বছর পূর্তিতে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রন্থটির সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে শাহ আলমের ওপর। তারপর ও দিনান্ত মেধা ও শ্রম দিয়ে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে। গ্রন্থটির সুন্দর নামকরণ করেছে -‘প্রজ্ঞার পাললিক ঘ্রাণ’। গ্রন্থের উপ-বিভাগগুলোর নামকরণ, প্রুফ সংশোধন, মেকাপ সব কিছুতেই নিরলস মেধা ও শ্রম দিয়েছে শাহ আলম। আমার প্রকাশিত অনেক গ্রন্থেরর প্রুফ দেখে দিয়েছে, কম্পিটারে বসে সংশোধনে সাহায়তা করেছে আনন্দিত চিত্তে। আমার বাসার যে কোনো আয়োজনে ওকে ডাকলেই আসে দ্বিধাহীনভাবে। ওর মধ্যে কোনো সংকীর্ণতা নেই, নেই অহঙ্কার, বিলিয়ে দেবার মধ্যেই ওর আনন্দ। তাই সমাজকে নানা ভাবে সেবা দিয়ে চলেছে শাহ আলম।

রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ প্রতিষ্ঠায় শাহ আলমের ভূমিকা বিস্ময়কর। আমি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও চার বছর সম্পাদক, চার বছর সভাপতি ছিল। এখন কার্যনির্বাহী সদস্য। সংগঠনটির জন্য ওর আন্তরিক কাজকর্ম বিস্ময়কর। শাহ আলম আমার বাড়ির কাছে নলেজ কেয়ার একাডিমিতে ‘স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চাকেন্দ্র’ নামে একটি সংগঠন পরিচালনা করে। শেখায় আবৃত্তি ও উপস্থাপন। আমাকে সে সংগঠনের উপদেষ্টার সম্মান দিয়েছে। সনদে আমার স্বাক্ষর দেবার সুযোগ রেখেছে। স্বরশৈলী‘র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, ইফতার, ফল উৎসব, পিকনিকসহ সব অনুষ্ঠানেই আমন্ত্রণ জানায় আমাকে। ভালো লাগে, আমি হৃষ্টচিত্তে যোদ দিই।

শাহ আলমকে নিয়ে আরও অনেক কিছু লেখার অবকাশ আছে। সুযোগ আসলে আাবার লিখবো। বাস্তবতা হলো আমরা গার্বিত ওর জন্য। ছাত্র হিসেব ওর কর্মকাণ্ড দেখে ভালো লাগে। ওর প্রকাশিত বইয়ে আমার মন্তব্য প্রকাশ করে ও আমাকে সম্মানিত করেছে। ওর স্ত্রী হালিমা খাতুনও খুব ভালো, কন্যা চেতনা ও তনিমা আমাকে মানে, শ্রদ্ধা করে। শাহ আলম আমার কৃতি ছাত্র, নিজে খ্যাতিধন্য শিক্ষক, লেখক, সমাজকর্মী, সংগঠক সজ্জন সর্বোপরি একজন নিবেদিত সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবী। ও ভদ্র, নম্র, বন্ধুবৎসল, মানব প্রেমী, নিরহঙ্কারী, সুজনশীল মানুষ। প্রিয় ছাত্রটির ৬৫ তম জন্মদিনে আমার অন্তরের অন্তরস্থল হতে দোয়া ও আশীর্বাদ থাকলো। শাহ আলম দীর্ঘজীবী হবে, পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে ও শান্তিতে বসবার করবে। সর্বোপরি সমাজকে আলোকিত করবে এমন কামনা।

[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর]

কখনো কখনো কিছু কথা, কোনো কোনো ঘটনা স্মৃতির পাতা আলোকিত করে। আমার দীর্ঘ জীবনে সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে অনেকের সাথে মিশবার, কাজ করবার সুযোগ হয়েছে। অনেকেই আপন কর্মে উজ্জ্বল, বিশিষ্টজন হয়ে উঠেছেন। তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। তাঁর লেখা গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, নাটক বহুল প্রশংসিত।
আমার ভাইয়ের মেয়ে ফাতেমাতুজ্জোহরা শান্তি (ইংরেজি সাহিত্য) এবং মোহাম্মদ শাহ আলম (বাংলা সাহিত্য) প্রভাষক হিসেবে একই সাথে একই কলেজে যোগদান করেছিলেন। পরে মোহাম্মদ শাহ আলম কারমাইকেল কলেজে অনেকদিন সুনামের সথে অধ্যাপনা করেছেন। তবে চাকরির শেষবেলায় দুজনই সরকারি রেগম রোকেয়া কলেজ থেকে অবসরে গেছে। এ কারণেও তার সাথে আমার নিবিড় যোগ। আমার আত্মীয় না হলেও তারসাথে অনুজ অগ্রজের সম্পর্কটি গড়িয়েছে পারিবারিক সম্পর্কে। বয়সে ছোট হলেও আমি তাকে আপনি বলেই সম্বোধন করি।
বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর প্রিয়তা দারুণ। ছাত্র-ছাত্রীদের শুধু পাঠকক্ষে নয় গড়ে তোলেন সংস্কৃতিমনা হিসেবে। বিশেষ করে আবৃত্তি, উপস্থাপন, শুদ্ধ উচ্চারণ, বিতর্ক, স্বরপ্রক্ষেপণ ইত্যাদি শেখান বিশেষ দক্ষতায়। তাঁর অনেক শিক্ষার্থীই এখন দেশের আলোকিত মানুষ। তারাও অপার ভক্তিতে মনে রেখেছে তাদের প্রিয় শাহ আলম স্যারকে। এখনও পরামর্শ নেয় নানা কাজে। একই সাথে বিভিন্ন কাজ করার সুবাদে আর অনেকের সাথে কথা বলে আমি জানতে পেরেছি সে কথা।
চাকরি জীবন শেষ হলেই বুঝি অন্ধকার ঘনিয়ে এলো জীবনে, এমন ভাবা ঠিক না। বয়স কোনো বিষয় নয় যদি সদ্বব্যবহার করার কৌশল আয়ত্ব করা যায়, যা প্রফেসর শাহ আলম করতে পেরেছেন। কারণ সৃষ্টির আনন্দেই জীবন সুন্দরতায় ভরে ওঠে, আনন্দ-বেদনার সমন্বয়ে আত্মা সামনে চলার শক্তি পায়। লেখালেখি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজকর্ম, ধর্ম, নৈতিক নানাবিধ কাজে জড়িয়ে থাকলে অনেকটা খুশিতে, উচ্ছ্বাসে কেটে যায় সময়। অবসর জীবনে যা করে যাচ্ছেন প্রফেসর শাহ আলম।
রংপুরের নাট্যচর্চার অতীত ও বর্তমান ইহিতাস সমৃদ্ধ ও বহুল প্রশংসিত হলেও এ নিয়ে তথ্যবহুল কোনো গ্রন্থ ছিল না। প্রফেসর শাহ আলম দুরূহ এ কাজটি বহু শ্রম ও মেধা দিয়ে করেছেন। তিনি গবেষণা করে লিখেছেন- ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা’ নামের গ্রন্থ। এতে রংপুরের প্রায় সব নাট্য সংগঠন, মঞ্চের বিবরণ, নাট্যকার, অভিনেতা,অভিনেত্রীগণের জীবন বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন সুনিপুণভাবে। নাট্যাঙ্গনে আমার যে অবদান, কর্মধারা তা নিয়েও লিখেছেন যথাযথ। এ জন্য আমি এবং রংপুরের নাট্যকর্মীগণ লেখকের কাছে কৃতজ্ঞ।
দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা, সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, বিভাগীয় লেখক পরিষদ, রংপুর মেট্রোপলিটন কমিউনিটি পূলিশিং এর পদক, সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। তিনি বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য, রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের সাবেক সম্পাদক, সভাপতি, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষতের উপদেষ্টা, রংপুর পাবলিক লইব্রেরির আজীবন সদস্য, শিল্পকলা একাডেমির রংপুরের সদস্য, স্বরশৈলী আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক চর্চা কেন্দ্রের প্রুতিষ্ঠাতা পরিচালক , মিিহগঞ্জ কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি, ফিরেদেখা সংগঠনের উপদেষ্টা, বাংলাদেশ অবসপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি রংপুরের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠেনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করছেন সুনামের সাথে। তাঁর নিবেদন অবাক করার মতো। আর কাজে তার একাগ্রতা আমাকে বিস্মিত করে।
বাংলাদেশ অবসপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি রংপুরের চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহ আলম। আমি সাধারণ সম্পাদক। সংগঠনটির উন্নয়নে তার ভূমিকা বলিষ্ঠ। গরীব সদস্যগণকে ঈদে, পূজায়, করোনায় বিশেষ সাহয়তার উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসা অর্জন করেছেন। শীতবস্ত্র বিতরণ, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, ঔষধ বিতরণ ব্যবস্থা, খেলাধুলার আয়োজন ও সংগঠনের কর্মধারা যথাযথ পরিচালনে তার ভূমিকা ইতিবাচক। আগামী দিনগুলোতে লেখালেখি ও সমাজ উন্নয়ন কর্মের মাধ্যম আলো বিস্তার করবেন এ আশা।
এখন তার পাারিবারিক কিছু কথা বলি। বড় ভাই বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ফজলুল হক। তিনিও সমাজকর্মী, দানশীল। ভাবীও চিকিৎসক, নাম ডা. নাহিদ বানু দিলরুবা ইসলাম। প্রফেসর শাহ আলমের সহধর্মিণী হলিমা খাতুন কারমাইকেল কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করতো। এখন অবসরে । রবিউল ও জাহেদুল দুভাই চাকরি করছে। বড় মেয়ে আফিফা ইশরত চেতনা শিক্ষকতা করছে, এমফিল থেকে পিএইচডি কোর্সে আছে। ছোট মেয়ে আছিফা ইশরত তনিমা এমবিবিএস পাশ কওে চিকিৎসক হিসেবে জীবন শুরু করেছে। সব মিলিয়ে সুখের সংসার তাদের। আমার আশীর্বাদ অফুরাণ তাদের প্রতি। তারা নিরহংকার, নম্র, ভদ্র, বিনয়ী, অতিথি পারায়ণ। পরিশেষে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলমের ৬৭তম জন্মদিনে তার নিরলস সাহিত্য, সংস্কৃতি সাধানা, লেখালেখি, সমাজকর্মের বিস্তৃতি প্রত্যাশা করছি। স্রষ্টা তাকে নিরোগ দীর্ঘ জীবন দেবেন, কর্মই তাকে চিরন্তনতা দেবে এমন আশায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

[লেখক: নাট্য, সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী, ও সংগঠক, প্রেসিডেন্ট, রাজা রামমোন রায় ক্লাব, রংপুর]

রংপুর কারমাইকেল কলেজের শতবর্ষ উদযাপণ দিবস ছিলো গত বছরের শেষ দুটি দিন্। ১৯১৬ সালে ২০৫ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই কারমাইকেলের বিরাট বিশাল প্রাঙ্গণ, নতুন-পুরাতন শিক্ষার্থীদের মহামিলনের চারন ভূমিতে রুপ নিয়েছিলো সে দুটিদিন। ৫১ বছর আগের ফনিক্স সাইকেলে ধাবমান তরুন সেই আমি আজ এতটা প্রবীনে পরিনত হোয়েছি, এটা ভাবতেই ইচ্ছে করে না। কালের স্বাক্ষী কারমাইকেলের সেই শতবর্ষি বৃক্ষটি আজও ওখানেই দাড়িয়ে আছে, ওর পাশ দিয়ে যেতেই সেদিন সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ৫১টা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেলো তাই না? আমি থমকে দাড়ালাম, কে বললো? মিথ্যেতো বলেনি।
১৯৫৬ সালে কারমাইকেলের ছাত্র মোহাম্মদ আলিমুদ্দিন, ১৯৬২ সালের হালিদা হানুম, ১৯৬৬ সালের মুসতাক ইলাহী, ১৯৭৫ এর মোহাম্মদ আলাউদ্দিন মিয়াসহ শত শত কিংবা কয়েক হাজার প্রাক্তণ এবং হাজার হাজার নবীন ছাত্রের পদধুলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিলো শতবর্ষী কারমাইকেল। এ রকমই একজন ছিলেন শাহআলম। তিনি এই কারমাইকেলের বাংলা বিভাগের ছাত্র ও শিক্ষক দুটোই ছিলেন। এখন দুটোতেই অবসরপ্রাপ্ত। রংপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গণের বহুল পরিচিত মুখ অধ্যাপক শাহআলম তার অবসর জীবনটাকে নিরবতায় ঢেকে দেন নাই। তিনি ছাত্রজীবনের শুরুতেই যেমন সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন তেমনি অবসরে সরব চঞ্চল থেকেছেন ঢাকা ও রংপুর বেতারের অনষ্ঠানমালা নিয়ে, সময় দিয়েছেন নবীন প্রবীন কবিদের আসরে, শিল্পিদের মঞ্চে, প্রতিযোগিতায় বিচারকের আসনে এবং বিচিত্রানুষ্ঠানে ব্যস্ততম সময় অতিক্রান্ত করেছেন। এই পর্যায়ে তিনি রংপুরে ও রংপুরের বাইরে বিভিন্ন সৃজনশীল অনুষ্ঠানে অতিথী হয়ে বক্তিতা করেছেন, প্রতিনিধিত্ব করেছেন সুশীল সমাজের এবং তারই মতো অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে পাশে থেকেছেন তাদের সুখে দুঃখে।
আমাদের দুচোখ ভরা স্বপ্নই ছিলো কারমাইকেল কলেজের ছাত্র হওয়া, কারমাইকেলের গম্বুজগুলো আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকতো। তাছাড়া ঐ কলেজে যাতায়াতের জন্য একটি নতুন ফনিক্স সাইকেল প্রাপ্তির অফার আমাকে স্কুল জীবন থেকেই দেয়া হয়েছিলো। এসএসসি পরীক্ষার কয়েকদিন আগে আব্বা অফারটি কনফার্ম করলেন। “ভালো করে পড়, কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হোতে পারলে একটা নতুন ফনিক্স সাইকেলে চড়ে ক্লাসে যেতে পারবে।” সেদিনের সেই ফনিক্স সাইকেল যে কত বড় আকর্ষণীয় ও মর্যাদাবৃদ্ধিকারী বস্তু ছিলো তা বোঝানোর মতো শব্দ আমার জানা নাই, সম্ভবও নয়।
শতবর্ষে শতপ্রাণ, ঐতিহ্যের জয়গান। কারমাইকেলের শতবর্ষপুর্তি অনুষ্ঠানে সবাই সবাইকে খুঁজছিলো, চিনতে পারছিলেন না হতাশ হয়ে মাইকে বছর উল্লেখ করে ঘোষণা আসছিলো। ঘোষণা শুণে একত্রিত হচ্ছিলেন সবাই, সেই সাথে ফটো সেসন। কারমাইকেল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত প্রোফেসর মোজাম্মেল হক তার সময়ের ছাত্রদের ডেকে এনে গ্রুপ ছবি তুলছেন। শতবছরের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে কলরবে মেতে উঠার এমন এক ক্ষণে কারমাইকেলের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ আলিমুদ্দিন আমাকে কাছে পেয়ে বললেন ঐযে শাহআলম, সে আমার ক্লাসের ভালো ছাত্রদের একজন ছিলো। আর প্রোফেসর মোজাম্মেল হক স্যার বললেন শাহআলম আমারও প্রিয় ছাত্র ছিলো।
আজ ৬ জুলাই সেই শাহআলম পা রখলেন ৬৫ বছরে। পাতা প্রকাশের সম্পাদক জাকির আহমদ খবরটি স্মরণ করিযে দিয়ে বললেন, “একই ট্রাকে, একই তালে, লয়ে, ছন্দে, মীরেবাধা জীবনের অনেক লম্বা একটা সময় পেরিয়ে এসেছেন তিনি। আমাদের প্রাণ প্রিয় গ্রহটা সবাইকে সাথে নিয়ে সূর্যটাকে ৬৫ পাক দিয়েছে, ৬৫ বর্ষা ও বসন্ত দেখেছেন তিনিও। বয়স যতই হোক, মুখে বলি বা নাই বলি, জন্মদিন আমাদের সবারই ভালো লাগে। যদিও এইক্ষণে গ্রহবাসী আমরা সবাই এক অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ এর ছোবলে আহত, ক্ষতবিক্ষত, আমাদের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্হ, এরই মধ্যে অধ্যাপক শাহআলমের জন্মদিনটা একচিলতে খুশি, এক পশলা বৃষ্টি, আর এক দমকা হাওয়ার ধাক্কার মতো আনন্দময় একটা অনলাইন বার্তা হোতে পারে।” আমি সহমত পোষন করে বললাম, হ্যাঁ যথার্থই বলেছেন, শাহআলম দীর্ঘজীবী হোন, নিরোগ থাকুন এটাই হোক এবারের জন্মদিনে আমাদের সবার বার্তা।

[লেখক : লেখক ও গবেষক]

রংপুর বেতারে যোগ দিয়েছি বেশ কয়েক বছর হলো। বেতার মানেই জন সম্পৃক্ততা। সে নিয়মেই পরিচয় রংপুরের বির্ভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে। অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী, শিল্পী, গীতিকার, নাট্যকার, যন্ত্রী, অভিনেতা, অভিনেত্রীসহ কত কত মানুষ। সে পথ ধরেই পরিচয় প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম এর সাথে। ধীরে ধীরে জানি তার কর্মধারা সম্পর্কে। তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সংগঠক সর্বোপরি বেতার ব্যক্তিত্ব। রংপুর বেতারের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা প্রায় ৪৫ বছর থেকে। আমার কক্ষে মাঝে মধ্যেই কথা হয়, আলাপচারিতায় জানতে পারি তিনি ছাত্র জীবন থেকেই বেতারের সাথে যুক্ত। দীর্ঘদিন তরুণ কণ্ঠ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তরুণকণ্ঠ অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনও করেছেন অনেক দিন। তারপর সময়ের অগ্রযাত্রায় তিনি বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত হয়ে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রফেসর শাহ আলম রংপুর বেতারে নতুন লিখিয়েদের অনুষ্ঠান কথামালা পরিচালনা করতেন। শ্রোতাবৃন্দের পাঠানো লেখাগুলো নিয়ে তিনি যে গঠনমূলক আলোচনা করতেন তাতে লেখকগণ খুশী হতেন, লেখার মান উন্নত করার পথও পেতেন। তিনি বেতারের পাÐুলিপি প্রদায়ক, আলোচক, উপস্থাপক। তিনি বেতারের গীতিকার, নাট্যকার, আবৃত্তিকার। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান সম্ভারের সূচনাকাল থেকেই কখনো পাÐুলিপি দিয়েছেন কখনও পাঠ করেছেন কথিকা। সে ধারা এখনও অব্যাহত আছে। বেতারের জন্য অনেক গীতিনকশা লিখেছেন তিনি, লিখছেন। ভাষার মাস ফেব্রæয়ারি, স্বাধীনতার মাস মার্চ, বিজয়ের মাস ডিসেম্বর, বঙ্গবন্ধুর জন্মমাস মার্চ, শোকের মাস আগস্ট-এ বিশেষ অনুষ্ঠানে পাÐুলিপি সরবরাহ, অংশ গ্রহণ করেছেন, করছেন। ‘সাহিত্য বিচিত্রা’ অনুষ্ঠান পরিচালনা ও অংশগ্রহণ অনেক দিন ধরেই অব্যাহত আছে। ফোন ইন অনুষ্ঠান গাড়িয়াল বন্ধু সঞ্চালনা করেছেন অনেকদিন। আবৃত্তির অনুষ্ঠান ‘সুরঞ্জনা’ উপস্থাপন করেন, অংশ নেন আবৃত্তিতেও। কবি ও কবিতা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন, সবুজ মেলা অনুষ্ঠানে শিশুদের উপযোগী কথিকা পাঠ, নাটক পর্যালোচনা অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছেন। বেতার আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সভাপতি ও বিচরকের দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সাথে।
রংপুর বেতারের যে কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থাকেন তিনি। বিশ্ব বেতার দিবসের শোভাযাত্রা অথবা বিশেষ অনুষ্ঠানে তার অংশগ্রহণ থাকে। বেতারের রজত জয়ন্তীতে সেমিনার অংশে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রফেসর শাহ আলম। শোকসভা থেকে শুরু করে অন্যান্য বিশেষ আয়োজনে তাকে পাওয়া যায়।
প্রফেসর শাহ আলম আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক, শুদ্ধ উচ্চারণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। সে কারণে বেতারের উপস্থাপকগণের ‘অরিয়েন্টেশন’ সময়ে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন উপস্থাপন কৌশল, শুদ্ধ উচ্চারণ, বাচন ভঙ্গি বিষয়ে। গীতিকার নির্বাচক বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
জেনেছি ঢাকা বেতারেও সাক্ষাতকার, আবৃত্তি, কথিকা পাঠসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার অংশগ্রহণ আছে। তিনি প্রায় এক বছর ‘যুগে যুগে বাংলা’ নামে পাÐলিপি সরবরাহ করেছেন ঢাকা বেতারে। বহির্বিশ্ব কার্যক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান নিয়ে ‘গীতাঞ্জলি’ এবং কাজী নজরুলের গান নিয়ে অনুষ্ঠান ‘অগ্নিবীণা’ অনুষ্ঠানে পাÐুলিপি প্রদান করেছেন। করোনার জন্য তা বন্ধ আছে। করোনা সময়েও তিনি ফোনে শিক্ষার্থীদের সহপাঠক্রমিক কার্যাবলী বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন রংপুর বেতার অনুষ্ঠানে।
সব মিলিয়ে প্রফেসর শাহ আলম বেতারের সুহৃদ, নিজের মেধা ও মনন দিয়ে বেতারের অনুষ্ঠানের মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছেন। বেতারকে ঘিরে তাঁর বহুমুখী যে কার্যক্রম তা অব্যাহত থাকবে এ আশা। জন্মদিনে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা।

[লেখক: আঞ্চলিক পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার রংপুর]

সুপ্রিয় বন্ধু শাহ আলম জীবনের পথপরিক্রমায় অত্যন্ত সাফল্য ও সুনামের সাথে তা শিক্ষকতার মহান পেশাগত জীবন এবং সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জগত, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি জাতীয়জীবনের নানা ক্ষেত্রেও সাফল্যের সুবর্ণ সাক্ষর রেখে ৬৭তম শুভ জন্মতিথিতে পা দিতে যাচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ। এটা তার মতো আমাদেরও অত্যন্ত গর্বের,গৌরবের ও আনন্দের বিষয়। ৬৭ তম জন্মতিথিতে বন্ধুকে জানাই অফুরন্ত শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন।
শাহ আলমের সাথে আমার বন্ধুত্ব ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সহযাত্রা প্রায় অর্ধ শতাব্দীর। আসলে মেঘে মেঘে বেলাতো আর কম হলোনা! মাসেরই ১৯ তারিখে আল্লাহ চাহেতো আমিও ৬৭ বছর পূর্ণ করে ৬৮তম জন্মদিনে পা রাখবো।
এই দীর্ঘ জীবনে বিভন্ন অঙ্গনে অনেক বন্ধু-বান্ধবীর হিরন্ময় সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য হয়েছে । এদের মধ্যে শাহ আলম অন্যতম। পড়াশুনা, লেখালেখিসহ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, টিভি,বেতার, সংগঠন, বিতর্ক, আবৃত্তিসহ নানামুখি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমরা মানিকজোড়। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একই রকম।
আমাদের সেইসব পাগলামির ফিরিস্তি তুলে ধরতে গেলে এক বিশাল মহাকাব্য লিখতে হবে।
কিন্তু বয়সের ভার পারিবারিক নানা বিপর্যয় এবং সর্বোপরি সম্প্রতি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে শারিরীক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পরায় বন্ধুকে নিয়ে ইচ্ছে থাকলেও পারছিনা। আশাকরি বন্ধুসহ সবাই ক্ষমাসুুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
আর তাছাড়া সুপ্রিয় ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু ভাইয়ের কবিতার ভাষায়- “বন্ধু তো বন্ধুই”। সেখানে সকল শর্ত অচল। শর্তহীন ভাবে গড়ে ওঠা আমাদের বন্ধু্ত্ব শুধু আমরণ অটূট থাকবেনা; মৃত্যুর পরেও আমাদের সন্তান-সন্ততির মাধ্যমে পারিবারিক পর্যায়েও তা প্রবহমান থাকবে ইনশাল্লাহ।
বন্ধু তো বন্ধুই। তার সাথে সকল আনন্দ- উল্লাস, সুখ-দুঃখ-ব্যাথা ইত্যাদির অনুভূতি নিঃশর্ত ভাবে ভাগ করে নেয়া যায়। তাইতো আমার একটি প্রিয় কবিতার কথামালায় বন্ধুকে প্রণতি জানাতে চাই-
” বেয়াড়া মনটাকে কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে আটকাতে চাই/
বন্ধু, আমাকে কিছু ইট, বালি আর সিমেন্ট পাঠাতে পারো?
রডের কাজটা না হয় বুকের পাঁজর দিয়েই চালাবো!”
সেই সাহসী বুকের পাঁজরে আজ হানা দিতে চায় অজানা আতংক। আসুন এই বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে সবাই সবার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাই। আবার আসুক দিন সেই পুষ্পিত সূর্যের । আমিন।

[লেখক : লেখক ও গবেষক]

খুদে মানুষ। মনে ভয়- কি লিখতে কী লিখে ফেলি! সঙ্গত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহা পরিচালক এর ভাষ্য দিয়ে সূচনা করি-‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা’ গ্রন্থটি তথ্য সমৃদ্ধ অনবদ্য গ্রন্থ।
এতোটুকু বলে কী আর দায় এড়ানো যায়? সহজ নয়, বেশ কঠিন কাজ। আর গ্রন্থ আলোচনা তো শুধু প্রশংসা অথবা নিন্দা নয়। সম আলোচনা। লেখক মোহাম্মদ শাহ আলম এর অভিমত ‘এমন সন্ধানী কাজ আয়াসসাধ্য।’ তবে তিনি প্রীত হয়েছেন অনেকের সহযোগিতা তার প্রবল আগ্রহ কর্মে
নয়টি প্রবন্ধের সমাহারে রচিত মোহাম্মদ শাহ আলম এর এ গ্রন্থ। প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম : নাটক: উৎপত্তি ও বিকাশ; রংপুর: স্বাধীনতা পূর্ব নাট্য চর্চা; রংপুর: নাট্য চর্চায় নাট্য সমাজ; নাট্যম , রংপুর: নাট্য চর্চায় নাট্যকার ও অভিনেতা, নির্দেশক, প্রযোজক; রংপুর: সাংগঠনিক নাট্য চর্চা ; রংপুর: প্রাতিষ্ঠানিক নাট্য চর্চা; রংপুর: উপজেলা পর্যায়ে নাট্য চর্চা; নাট্য চর্চায় সংকট ও সংকট মুক্তির ভাবনা। চমৎকার শ্রেণিবিন্যাস।
আলোচিত এ গ্রন্থের ভূমিকায় আলোকিত রংপুরের নাট্য চর্চার ইতিহাস ‘সত্য হলো বাংলা মৌলিক নাটকের সূচনা রংপুর থেকেই। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে রামনারায়ণ তর্করত্ন ‘কুলীন কুল-সর্বস্ব’ নামে যে নাটক লেখেন তা থেকে বাংলা মৌলিক নাটকের যাত্রারম্ভ। নাটকটি লেখার মূল প্রেরণাদাতা ও রংপুর কুণ্ডী পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরী। ’১৮৮৫ তে প্রতিষ্ঠিত রংপুর ‘ড্রামেটিক এসোসিয়েশন(আরডিএ) রংপুরের নাটকে জোয়ার আনে। পরবর্তীতে গড়ে ওঠে অনেক নাট্য সংগঠন। নাট্যাভিনেতা কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, নতুন নতুন নাট্যকার, আব্যাহত রাখেন সৃজনধারা। পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশে প্রাচীনকাল যে বিষয়টি প্রধান ভূমিকা পালন করছে তা হচ্ছে বই। বই জ্ঞান চর্চার অন্যতম মাধ্যম। সভ্যতার মাপকাঠি, যোগাযোগের মাধ্যম। বই জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধার। একটি ভালো বই চিরকালের বন্ধু। একটি ভালো বই মানব জীবনে প্রকৃত আনন্দের উৎস। এমন বিবেচনায় ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চা ’গ্রন্থটি একটি ভালো গ্রন্থ।
নিঃসন্দেহে বড় মনের মানুষ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। ভূমিকা পর্বে তাঁর মূল্যায়নÑ ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা’ গ্রন্থটি রংপুরের নাট্যাঙ্গনের তথ্য সমৃদ্ধ অনবদ্য গ্রন্থ। প্রথম প্রবন্ধের শিরোনামÑ নাটক, উৎপত্তি ও বিকাশ। অনুসন্ধানী লেখক শুধু শিরোনামের বৃত্তে বন্দী থাকেননি, সীমার মাঝে ছড়িয়েছেন অসীমের আলো। দৃষ্টান্তÑ নট থেকে নাটকের সংজ্ঞা, অভিনয় .উৎপত্তি, বিকাশ। দুএকজন নয়, লেখকের অভিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়েছে প্রখ্যাত চারজন লেখকের প্রজ্ঞাদীপ্ত সংজ্ঞা। প্রসঙ্গত নিকলে‘র অভিমতÑ ‘ নাটক জীবন সম্বন্ধীয় ধারণার এমন ধরনের কাব্যিক প্রকাশ যা অভিনেতারা রূপ দিতে পারে এবং যা শব্দমাধুর্য শোনার জন্য ও আঙ্গিক ক্রিয়াদি দেখার জন্য উপস্থিত দর্শকদের আনন্দ দান করতে পারে।’ নাটকের রসের কথা আছে- ট্রাজেডি, কমেডি, মেলোড্রামা, ফার্স প্রসঙ্গে। রূপ এর দিক থেকে- গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, গীতি-নৃত্যনাট্য, বিষয় চিন্তায় পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, চরিতমূলক নাটকের নানা দিক তুলে ধরেছেন লেখক।
নাট্যম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- নাট্যম নাটক অভিনয়ের অন্যতম মাধ্যম। লেখকের বর্ণনায়- ‘বর্তমান সময়ে যে কোনো সংস্কৃতিক কার্যক্রম, আলোচনা অনুষ্ঠানের জন্য অন্যতম অবলম্বন রংপুরের টাউন হল।’ প্রসঙ্গত রংপুর নাট্য সমাজের কথা বলা হয়েছে। রংপুর টাউন হলের পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে বিচিত্র চিন্তায়। কাকিনার জমিদার মহিমারঞ্জন রায় এর ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে জানা যায় সে কথা। এ মে অভিনীত হয়েছিল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা নামের নাটকটি। অসংখ্য নাটক ম ায়নের সাক্ষী এ হল।
বেদনার ইতিহাস ভুলবার নয়। ১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধ সময়ে রপুর টাউন হল ছিল পাক হানাদারদের নির্যাতন কেন্দ্র। মোহাম্মদ শাহ আলম এর বর্ণনা-‘চিত্ত বিনোদনের এ হলে পাকিস্তানি হানাদাররা ১৯৭১ এ নিষ্ঠুর নির্যাতন চালায় নারীদের উপর। বীরাঙ্গনাগণের আর্তচিৎকার, গুমোট কান্না, আহাজারিতে ভারী ছিল এখানকার বাতাস। পাকঘাতকরা রংপুর টাউন হলকে করেছিল ‘নারী নির্যাতন কেন্দ্র।’ অনেক নারী হারিয়েছেন সম্ভ্রম, অনেক মুক্তিকামী মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। লেখক তথ্য দিয়েছেন পৈশাচিক সে ঘটনা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ‘রংপুর টাউন হল কনসেন্টেশন ক্যম্প ১৯৭১’ নামে নাটক ম স্থ হয়েছে বৃহৎ ক্যানভাসে। বিভীষিকাময় স্মৃতি ধারণ করে আজও দাঁড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হল। রংপুর টাউন হল ছাড়াও শাশ্বত বাংলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ম ও অন্যান্য মে র পরিচিতি দিয়েছেন লেখক।
’রংপুর: স্বাধীনতা পূর্ব নাট্য চর্চা’- প্রবন্ধে প্রথম মৌলিক নাটক প্রসঙ্গে লেখকের অভিমত-‘বাংলা মৌলিক নাটকের সূতিকাগার রংপুর। আর সূচনাকার রাম নারায়ণ তর্করত্ন।’ এ অংশে বাংলা নাটকের প্রাথমিক যে চর্চা তার যথাযথ বিবরণ দিয়েছেন গ্রান্থাকার মোহাম্মদ শাহ আলম। স্বল্প অবয়বে হলেও বাংলা নাটকের মৌলিক যাত্রার বিষয়টি বেশ স্পষ্ট।
রংপুর: নাট্য চর্চায় নাট্য সমাজ’- প্রবন্ধে লেখক লিখেছেন- ‘ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ভারতবর্ষে নানা বাধাকে সাথে নিয়েই রংপুরের নাট্য চর্চার পথ উন্মুক্ত করে নাট্য সমাজ। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠন টিকেছিল ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় বাধা-বিঘ্নের পাহাড় ডিঙিয়ে রংপুরে নাট্য-প্লাবন বইয়ে দিয়েছে নাট্য সমাজ।’ লেখক মোহম্মদ শাহ আলমের তথ্য নির্ভর উপস্থাপন থেকে জানা যায় নাট্য সমাজের স্বর্ণযুগের কথা। যে সময় নাট্য প্রতিভাধরগণ নাট্যভুবনে উজ্জ্বলতা দেন। আলোকিত অনেক নাট্যজনের নাম আছে গ্রন্থটিতে। তিতু মুন্সি, প্রবোধ মুখার্জী, কাজী মোহাম্মদ ইলয়াস, রবীন্দ্রনাথ মৈত্র, তুলসী লাহিড়ীসহ অনেকেই বইয়ে দেন নাট্যবন্যা। রংপুরে হলে বসে শরৎ চন্দ্র দেখেছেন দত্তা নাটকের অভিনয়। চিরকুমার সভা, কুসুম কুমারী, মানময়ী গার্লস স্কুল, পল্লী সমাজ, ছেঁড়াতারসহ অনেক নাটক ম ায়িত হয়েছে নাট্য সমাজের উদ্যোগে, বিস্ময় ও বিমুগ্ধ চিত্তে অভিনয় উপভোগ করেছেন দর্শক শ্রোতা। রংপুরের নাট্য চর্চায় ও নাট্য আন্দোলনে বিপুল ভূমিকা রেখে একটানা সাতাত্তর বছরের কর্মধারার ইতি ঘটে রংপুর নাট্য সমাজের গর্বিত পথ পরিক্রমার। লেখক শাহ আলম প্রায় ভুলে যাওয়া ইতিহাসকে আলোক উজ্জ্বল করেছেন এ অংশে। যা বর্তমান প্রজন্মকে বিশেষ উৎসাহিত করবে।
যাঁদের গৌরবময় ভূমিকায় রংপুরের নাট্যচর্চা আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে তাদের অনেকের নামই পাওয়া যাবে গ্রন্থটিতে। আমি সেখান থেকে কিছু নাম তুলে ধরছি- প্রকাশ চন্দ্র চৌধুরী, সুরেন্দ্র লাল রায়, ললিত চন্দ্র প্রামাণিক, গিরিন ঘোষ, ওয়াই মাহফুজ আলী জররেজ, আব্দুল মজিদ, কাজী মহম্দ ইলিয়াস, কাজী মহম্মদ ইউনুস, অধ্যাক নুরুল ইসলাম, মীর আলতাফ আলী, ডা. আশুতোষ দত্ত, ডা. জুন, অধ্যাপক এ হাদি, মোনাজাত উদ্দিন, এম এ মজিদ, মহম্মদ আনসার, নগেন চন্দ্র বর্মন, মানস সেন গুপ্ত, এ এস এম আনোয়ার হোসেন, শামসুজ্জোহা বাবলু, মোহাম্মদ নাতেক, এ কে এম শহিদুর রহমান বিশু, রামকৃষ্ণ সোমানী, ফরিদা সুলনাতা বাণী, মতলূব আলী, সবিতা সেনগুপ্তা, বিনয় কুমার বণিক, কে এস এম আতোয়ারুজ্জামান, বিপ্লব প্রসাদ, মোস্তফা কামাল রাঙ্গা, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, মনোয়ার বেগম, খন্দকার আবুল মাহমুদ, হাসান আলী, মোসলে হক, এমাদ উদ্দিন আহমদ, আজিক মণ্ডল, সেকেন্দার রহমান দুদু, আবদুল মালেক, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, রাজ্জাক মুরাদ, আনিসুল হক, রফিকুল আসলাম চৌধুরী, মাহবুব রহমান, এমদাদুল হক ফারুক, আরিফুল হক রুজু, শাহাজাদা মিয়া আজাদ, হোসনে আরা বেগম, নিপুণ রায়, হামিদুল ইসলাম, রকিবুল হাসান বুলবুল, মনসুর আলী বালু, আবদুল কাইয়ুম খান, এ এম সরোয়ার হোসেন, গোলাম সরওয়ার মীর্জা, মহিতুজ্জামান লাবলূ, মিজান তালুকদার, নিজামুল ইসলাম, নার্গিস রহমান, কাজী মোর্শেদ জাহান লিলি, চাষী মমতাজ, গৌরি দাসগুপ্তা, জোবায়দুল ইসলাম, আশরাফী মিঠু, জি এম, নজু, মোল্লা মোসাদ্দেক হোসেন, রাবেয়া আক্তার মনি, রহিমা আক্তারী নূপুর, শিলা মনসুর, ইফতেখার আলম রাজ, মোতাহার ডালু, সতীশ চন্দ্র রবিদাস, জাহাঙ্গীর কবীর, সুকুমার বর্মন, মাহাতাব লিটন, মকসুদুল হক, এমার উদ্দিন মণ্ডল, জহিরুল হক । আরও অনেকেই আছেন যাদের অবদানের কথা তুলে ধরে কর্মধারার বিবরণ দিয়েছেন লেখক মোহাম্মদ শাহ আলম। অসংখ্য নাট্যকর্মী, প্রযোজক, পরিচালক রংপুরের নাট্যভুবন সজীব ও প্রাণবন্ত করতে, স্থানীয় নাটকের পরিধি বাড়াতে নিবেদিত ভূমিকা পালন করেছেন । বাস্তবতা হলো ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা’ গ্রন্থে লেখক শুধু নামের আলো ছড়াননি, তাদের চলা, বলা, কলা-কৌশলগত বর্ণনা দিয়েছেন তাদের প্রাপ্তির আলোতেই। নাট্যকর্মীগণের জন্ম, ঠিকানা, অভিনীত নাটক, লেখা নাটক, প্রযোজনা, পরিচালনা, রূপসজ্জা, ম বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন স্থান, কাল নিরপেক্ষভাবে। আমার বিশ্বাস এর মাধ্যমে তারা সবাই পাবেন চিরন্তনতা। ইতিহাসে থাকবেন সমুজ্জ্বল।
রংপুর: সাংগঠনিক নাট্য চর্চাÑ নিছক জনশ্রুতি নয়, প্রমাণিত সত্য ‘রঙ্গপুর’ নাট্য ক্ষেত্রে অনন্য বিপ্লব সৃজনকারী এক স্থান। আর তা অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত। নাট্য সমাজ থেকে পরবর্তীতে বহু সংগঠন নাট্য চর্চায় রেখে চলেছে বলিষ্ঠ ভূমিকা। গ্রন্থটিতে তুলে ধরা হয়েয়ে অনেক সংগঠনের কার্যক্রম। সংগঠনুলোর প্রতিষ্ঠা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, কারা কারা কর্ণধার, কী কী নাটক প্রযোজনা করেছে এমন অনেক দিক উপস্থাপন করেছেন লেখক। এর মাধ্যমে সাংগঠনিক চর্চার দিকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সংগঠনগুলোর কিছু নাম উল্লেখ করছিÑমাহিগঞ্জ নাট্য সমিতি,শিখা সংসদ, ঘাঘট সংসদ, শতাব্দীর আহ্বান, সোনালী নাট্য গোষ্ঠী, সারথি একাডেমি, নাগরিক নাট্য গোষ্ঠী, ভাই-বোন শিল্পী গোষ্ঠী, রংপুর থিয়েটার, রংপুর পদাতিক, সারথি নাট্য সম্প্রদায়, রংপুর নাট্য চক্র, বিকন নাট্য কেন্দ্র, কোরাস, রংপুর নাট্য কেন্দ্র, চেতনা নাট্য গোষ্ঠী, সৌখিন নাট্য গোষ্ঠী, রঙ্গপুর নাট্যধারা, শাপলা শালূকের আসর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র রংপুর।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নাট্য চর্চায় বিশেষ অবদান তেমন প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গে অনেক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে গ্রন্থটিতে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে নাট্যাভিনয় করে কারমাইকেল কলেজের স্পন্দন নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ(কানাসাস), কারমাইকেল থিয়েটার(কাথি), কারমাইকেল কাইলেজিয়া শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংসদ(কাকাশিশ)। রংপুর মেডিকেল কলেজের যে নাট্য তরঙ্গ ছিল সে প্রসঙ্গও সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। বাংলাদেশ বেতার রংপুরের নাট্য চর্চা ও বিকাশে রয়েছে অনবদ্য ও গৌরবজনক ভূমিকা। বেতার নাট্যকার, অভিনেতা, প্রযোজক, বেতার নাটকের অনেক তথ্য মেলে গ্রন্থটি থেকে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি রংপুরের নাট্যাবদানের প্রসঙ্গ আছে যথাযথ।
পরবর্তী অধ্যায়ে আলেচিত হয়েছে উপজেলা পর্যায়ে নাট্য চর্চা। যথার্থই, কোথায় নেই নাটক? গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই নাটকের উর্বর ভূমি। মোহাম্মদ শাহ আলম ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে নাটকের যে বিস্তার জানিয়েছেন সে তথ্য। যা গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধি দিয়েছে।
সংকট তো সর্বত্রই। নাটকও মুক্ত নয় এ থেকে। ভালো নাটকের অভাব, পৃষ্ঠপোষকাতার অভাব, ম সংকট, তরুণদের নিষ্ঠার অভাব, আকাশ সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব নানা কারণে নাট্য অঙ্গন সংকটাপন্ন। এগুলোর সমাধান চেয়েছেন লেখক। নাটকের সংকট ও সংকট মুক্তি নিয়ে লেখকের অভিমত- ‘সমাজমানসে নাটক নিয়ে ইতিবাচক চেতনা বিস্তৃতি পেলে রংপুরসহ সারা দেশের নাটক গতিশীল হবে, আর ত্বরান্বিত হবে দেশের ও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা।’ আমিও সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করি- সংকট মুক্ত হবে নাট্যাঙ্গন। গ্রন্থটির প্রচ্ছ্বদ সুন্দর। বিশেষ করে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী রংপুর টাউন হলের ছবি ব্যবহারে গ্রন্থের নামকরণের সাথে মানিয়ে গেছে। ধন্যবাদ জানাই রংপুরের আইডিয়া প্রকাশনকে এমন গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রকাশের জন্য। প্রকাশক সাকিল মাসুদসহ সংশ্লিষ্ট সবাই প্রশংসার দাবিদার। ছাপা ভালো, মুদ্রণ প্রমাদও কম।
অতীত ও বর্তমান সময় নিয়ে আরও কথা থাকলে ভালো হতো, বোধকরি গ্রন্থ পরিধির বিষয়টি ভেবেছেন লেখক। সীমাবদ্ধতা কোথায় নেই? তবুও বলবো অসাধারণ একটি প্রয়াস। নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ শাহ আলম এর লেখা ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা’ গবেষণাধর্মী সৃষ্টি, রংপুরের নাট্যাঙ্গনের অনন্য দলিল। যা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান পিপাসা বাড়াবে এবং ইতিহাসমুখি হতে উৎসাহিত করবে, আনন্দের আলোকে উজ্জ্বল করবে। ধন্যবাদ লেখক মোহাম্মদ শাহ আলমকে এমন আয়াসসাধ্য গবেষণা গ্রন্থের জন্য।

[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বাংলা, মাহিগঞ্জ কলেজ,রংপুর]

প্রিয়জন,স্বজন প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। ওর সাথে কোথায় দেখা হয়েছিল এখন তা মনে করতে পারি না। মনে হয় কতদিনের চেনা, যেনো গত চার দশক নাকি পাঁচ দশক? সে যতদিনই হোক মনে হয় আমরা একই পরিবারের সন্তান। কেনো নয়? শাহ আলমের জন্মদাতা মা-বাবা, ওর জীবনসঙ্গী হালিমা খাতুন, ফুটফুটে দুকন্যা চেতনা ও ডা. তনিমা সবার কাছে আজন্মকাল বুঝি আমরা পরম আত্মীয়। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের জাতীয় দিবসসমূহে, দেশের এ অঞ্চলের নানা উপলক্ষ্যে, নানা আয়োজন, অনুষ্ঠান, মেলা, পার্বণ, প্রাঞ্জল সামাজি-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনেকের সাথে আমরা দুজন এখনও সরব। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আয়োজকের মূলভূমিকায় বা সাথে থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব, কাজ সামলিয়েছি, করেছি, করছি। সে সবের ফিরিস্তি এক দীর্ঘ প্রসঙ্গ।
গত কয়েক দশকে নানাসময়ে পত্র-পত্রিকা, স্মরণিকা, গবেষণাধর্মী গ্রন্থ, অন্যান্য গ্রন্থের প্রকাশনার কাজে কত দিনরাত্রি একসাথে কাজে, পরিশ্রম কষ্ট শেষে প্রাপ্তির আনন্দযাপন করেছি তা মনে হলে খুব ভালো লাগে। এর মাঝে সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সুখ-দুঃখ একসাথে ভাগ করে নিয়েছি। নানা কাজে নিজের শহর রংপুর ছাড়াও, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও অন্য জেলা, উপজেলা, প্রাতিষ্ঠানে অনুষ্ঠান, সেমিনার, সাহিত্য উৎসব, সম্মেলন করে বিভিন্নভাবে নিজেরাই অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি, আরও কাছাকাছি এসেছি, সাথে কত গুণি কৃতি মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কত আড্ডা, কত গল্পে এই যে আস্বাদন প্রাপ্তি তা আমাদের জীবনে নিশ্চই এক মহৎ অর্জন।
আমার সহযাত্রী প্রফেসর শাহ আলম-এর শিক্ষক জীবন আর আমার চিকিৎসক জীবন আর আমার চিকিৎসা পেশার সাথে সংযুক্ত শিক্ষক জীবন নিয়ে আমাদের পথচলা অব্যাহত আছে। সে সব প্রাঙ্গণে কাছের মানুষ প্রতিভাদীপ্ত প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম আমার, আমাদের যাত্রাপথে এক বড় সাথী, অবলম্বন, উপলক্ষ্য যাই বলি না কেন তা বুঝি বর্ণনার পরিসবে অনেক কম বলা হবে। প্রিয় স্বজন শাহ আলম, স্নেহভাজন শাহ আলম, তুমি ভালো থেকো, দীর্ঘায়ু হও। আনন্দযাপনে কাটুক তোমার প্রতিদিন। শুভ জন্মদিনে অনেক শুভাশিস।

[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, চিকিৎসক, সংগঠক]

প্রফেসর শাহ আলম বাংলার ছাত্র, বাংলার শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই কাটছে ভাওয়াইয়ার উর্বরভূমি রংপুর এলাকায়। সংস্কৃতি জগতের সাথে আছেন সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ বেতার রংপুরের সাথে সমৃক্ত নানা ভাবে। পেশা আর নেশার কারণে ভাওয়াইয়া তার প্রিয় ভিষয়। আর তাই নিজের আগ্রহ, শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’।
লেখক বইয়ের শুরুতে ‘প্রসঙ্গ-কথা’-এ এ বই লেখার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘রংপুরের সম্পদ ভাওয়াইয়া নিয়ে ভাবনাটা গ্রামীন বালককাল থেকেই। সুরের মাদকতা বাঁধতো মায়ার বাঁধনে। তিয়াস মিটতো না। বার বার শোনার আগ্রহ থাকতো তরতাজা। রংপুর বেতারের তিস্তা পাড়ের গান অনুষ্ঠানে বিখ্যাত শিল্পীগণের ভাওয়াইয়া শুনে শুনে আকর্ষণ সতেজতা পায় আরও।’ বাংলাদেশ বেতার, রংপুরের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক, শুভার্থী অনেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
লেখক ‘ভাওয়াইয়া প্রসঙ্গ’, ‘ভাওয়াইয়ায় প্রেম’, ‘ভাওয়াইয়ায় শরীর’, ‘ভাওয়াইয়ায় প্রকৃতি’, ‘ভাওয়াইয়ায় লোকজ উপাদান’ এই পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন তাঁর গ্রন্থটি। সবশেষে আছে ‘ভাওয়াইয়ায় ব্যবহৃত রংপুরের আঞ্চলিক কিছু শব্দ এবং আধুনিক অর্থ’ শিরোনামে এক পৃষ্ঠার একটি অভিধান সংযুক্ত হয়েছে। তবে এটিকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ ছিল। এটি যেমন আরও একটু বিস্তৃত করা যেত, পাশাপাশি শব্দগুলো ক্রম অনুযায়ী সাজানো যেত।
লেখক ভাওয়াইয়ার একটি পরিচিতি তুলে ধরেছেন এ গ্রন্থে। ড. ওয়াকিল আহমদ. ড. আশুতোষ ভট্টচার্য, বিবেকানন্দ মহন্ত প্রমূখ লেখকের উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। ভাষাবিদ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সসন-এর সংগৃহীত ভাওয়ায়ার প্রথম নিদর্শন আমরা পাই এভাবে-
পর্থম যৈবনের কালে না হৈল মোর বিয়া
আর কতকাল রহিম ঘরে একাকিনী হয়া,
রে বিধি নিদয়া।
ভাওয়াইয়া নামের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর নানা বিভাজন নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
ভাওয়াইয়ায় প্রেম প্রসঙ্গে নানা উদাহরণ দেয়া হয়েছে। প্রেমই এ গ্রন্থের প্রধান আলোচ্য বিষয়। ‘প্রেম বিনে ভাব নাহি’ এমন সত্যে সমর্পিত অধিকাংশ ভাওয়াইয়া। ভাওয়াইয়া গানে ধারাক্রমিক কাহিনী নেই, আছে খন্ডিত প্রেমের বিবরণ। এর মূল উপজীব্য বিষয় প্রেম এবং ভাওয়াইয়া প্রেমের গান এমন দাবী অনেক বিশ্লেষকের মত প্রফেসর আলমের। আর এই প্রেম নর-নারীর প্রেম যা অবশ্যই লৌকিক। বিশেষ করে নারী মনের অভিব্যক্তির অধিক প্রকাশ ঘটেছে। মিলনের আনন্দ ক্ষণিকের আর প্রেম বিরহের কাতরতাই দীর্ঘ। সেজন্যই হয়তো ভাওয়াইয়ায় বিচ্ছেদ বোধের যন্ত্রণা সবচেয়ে বেশি।
ভাওয়াইয়ায় প্রেমিকদের নানা নামে সম্বোধন করা হয়েছে। লেখক এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কালা’, কবিরাজ, চ্যাংড়াবন্দু, বন্দুয়া, অসের ঢ্যানা, রসেরকালা, চিকনকালা, প্রাণপতি প্রভৃতি নামে অভিহিত করেছেন। পৌরাণিক চরিত্রে সম্বোধন করার দৃষ্টান্তও তুলে ধরা হয়েছে। লেখক প্রেমের বিভিন্ন রূপও তুলে ধরেছেন এতে। যেমন বিবাহ পূর্ববর্তী প্রেমাকাক্সক্ষা, স্বামীপ্রেম, দাম্পত্য প্রেম, পরকীয়া প্রেম, বৈধব্য জীবনে প্রেম, বাৎসল্য প্রেম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বদেশপ্রেম। গ্রন্থে উদ্ধৃত করা হয়েছে দেশপ্রেমের গান, এভাবে-
সোনার বাংলা করতে স্বাধীন
যাঁরা দিল প্রাণ
আজকে শুনি সবার মুখে
তাদেরই জয়গান
অথবা
উপসী বাংলা সোনার বাংলা
বাংলা হামার মাও
স্বাধীন বাংলার সগায় হামরা
একটা মায়ের ছাও রে
একটি মায়ের ছাও।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রচিত হয়েছে-
স্বনির্ভর বাংলা গড়ি
নিজের ফসল খাইরে
আর যাব না বাইরে।
লেখক তার গ্রন্থে ভাওয়াইয়া গানে শরীরের বর্ণনা দিতে যেয়ে শুধু যে নারীর শরীরের বর্ণণা দিয়েছেন, তাদের রূপচর্চার, সৌন্দর্যচর্চার বর্ণনা দিয়েছেন তাই না, এর মধ্যে তিনি শরীরের বর্ণণার মধ্যে দারিদ্রের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি তুলে ধরেছেন-
আমার পেদনোতে ছেঁড়া তেনা
আমার নাইয়র যাওয়া হইলো না।
ভাওয়াইয়ায় প্রকৃতি অধ্যায়ে লেখক বাংলার বর্ষা, বাংলার শীত, বাংলার প্রকৃতি, কৃষি, শাকসবজি, চাঁদ, নদীর তীর, জোসনা, সন্ধ্যা, পাখির ডাকের কথা সমৃদ্ধ ভাওয়াইয়া গানের উদাহরণ টেনে গন্থকে সমৃদ্ধ করেছেন।
ভাওয়াইয়ায় লোকজ উপাদান অধ্যায়ে সমাজের নানা উপকরণ তুলে ধরা হয়েছে। শ্রমজীবী, পেশাজীবী মানুষের বিচিত্র কর্মকান্ড তুলে ধরা হয়েছে। উঠে এসেছে যৌতুক, পণপ্রথার মত অপসংস্কৃতি। এসেছে লোকজ উপাদান তাঁতের দৃশ্য। মাদুলীর বিবরণও বাদ যায়নি। পীরের দরগাও বর্ণিত হয়েছে। ছিকার ব্যবহার, তামাক, হুকো, পান, সুপারি, গহনা, পিড়া, বালিশও বাদ যায়নি।
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম-এর ‘ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ গ্রন্থটি ২০১৭ অমর একুশের গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়। এ্যাড আইডিয়া প্রেস এন্ড পাবলিকেশন, রংপুর-এর প্রকাশক মাসুদ রানা সাকিল কর্তৃক এটি প্রকাশিত হয়। সাড়ে পাঁচ ফর্মার ঝকঝকে ছাপার এই বইটি প্রফেসর আলমের দীর্ঘদিনের শ্রেণিকক্ষের দরদে লেখা একটি গবেষণা গ্রন্থ। বিনিময় মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ১৫০ টাকা।
লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা মোঃ আছিম উদ্দিন ও মা ফছিমন নেছাকে। বইটির ফ্লিপ কভারে কারমাইকেল কলেজের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দীন লিখেছেন বইটি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য, যা ভূমিকার মতই। এতে বইটি হয়েছে সমৃদ্ধ। বইয়ের শেষ পাতায় লেখক সম্পর্কে একটি ছোট পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী প্রফেসর শাহ আলমের জীবন এখানে সংক্ষেপে বিধৃত হয়েছে।সাধারণ পাঠক শ্রেণির কাছে এটি প্রিয় গ্রন্থ হয়ে উঠবে নিশ্চয়। পাশাপাশি এটি গবেষকদের কাজে আসবে, সহায়ক হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

[লেখক: লালন গবেষক ও উপ পুলিশ কমিশনার, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।]

ধীরে ধীরে তিনি একটি ছায়াবৃক্ষ হয়ে উঠেছেন। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হয়ে উঠেছেন একজন নির্ভরতার মানুষ। একজন অভিভাবক। তিনি একাধারে একজন শিক্ষক, গবেষক, কবি, লেখক, আবৃত্তিকার, উপস্থাপক এবং একজন বিশিষ্ট সংগঠক। তিনি আমাদের অতি প্রিয় প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম।
৬ জুলাই ১৯৫৫ সালে রংপুর জেলার পীরগাছা অন্নদানগর বামন সর্দার গ্রামে জন্ম মোহাম্মদ শাহ আলমের। পিতা মোঃ আছিম উদ্দিন ও মাতা ফছিমন নেছা অল্প কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। জনাব শাহ আলমের শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের পঞ্চানন প্রাইমারি স্কুল থেকে। অন্নদানগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৭২ -এ এসএসসি এবং ৭৫ -সালে কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। কারমাইকেল কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭৭ সালে এম এ সম্পন্ন করেন।
সাপ্তাহিক মহাকালে ছাত্র জীবন থেকেই কাজ শুরু করেন। এরপর দৈনিক দাবানল চালু হলে সেখানে সহ সম্পাদক হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা তথা কর্মজীবন শুরু হয়। শিক্ষকতা শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। এ সময় তিনি রংপুরের মাহিগঞ্জ কলেজের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ৮৭-তে যোগদেন চিলাহাটি কলেজে। এই কলেজটি আত্মীয়করণের পর তিনি ৯১ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজে একবছর অধ্যাপনা করেন। ৯২ তে কারমাইকেল কলেজে যোগদান করেন। ২০১১ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান থেকে ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা জীবনে মোহাম্মদ শাহ আলম ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের ছিল অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক। ছিলেন অতি প্রিয়ভাজন সহকর্মীদের। শিক্ষাদানের তাঁর আন্তরিকতা এবং কৌশল ছিল শিক্ষার্থীদের অতি প্রিয়। তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের গুরু, অভিভাবক এবং আপনজন। আর তাইতো শাহ আলম স্যারের নাম তার ডিপার্টমেন্ট ছেড়েও অন্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জনপ্রিয় ছিল।
স্কুল ছাত্র জীবন থেকেই লেখালেখি শুরু হয় শাহ আলমের। প্রথম লেখালেখি গান দিয়ে। কলেজ জীবন থেকে কবিতা ফুটতে শুরু করে তাঁর কলম থেকে। অনার্সে থাকতেই হাত দেন সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনায়। পরবর্তী জীবনে কবিতা ছাড়াও প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ছড়া, গল্প, ফিচার ইত্যাদি লিখতে থাকেন। সাহিত্য,ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট পড়াশুনা, নান্দনিকত্ব সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান এবং মানুষ ও প্রকৃতি সম্পর্কে অবজারভেশন তাঁর লেখনীতে নিয়ে আসে বৈচিত্র। লেখা হয়ে উঠে হৃদয়গ্রাহী। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। দৈনিক দাবানলের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি এই অঞ্চলের নবীন লেখকদের বিকশিত হবার পথ মসৃণ করে দেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ’ বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা’, কাব্যগ্রন্থ’ ধবল আলোয় মায়াবী ডাক’, যৌথ কাব্যগ্রন্থ’ সাহসী নিসর্গ’, যৌথ ছড়াগ্রন্থ’ ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন’, গবেষণা গ্রন্থ’ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’,’ ভাওয়াইয়া (যৌথ)’ ,ও’স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চা’। এছাড়া বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অনেক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ উপস্থাপন করেছেন তিনি। লেখালেখি ছাড়াও সম্পাদনাতেও সিদ্ধহস্ত তিনি। রংপুর সাহিত্যপত্র, অভিযাত্রিক সাহিত্য পত্রিকা, মুহাম্মদ আলীম উদ্দিন স্মারক গ্রন্থ সহ বিভিন্ন দেয়ালিকা, কলেজ ম্যাগাজিন ও গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করেছেন। বেতার ও শাহ আলম যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের তিনি একজন গীতিকার, নাট্যকার, আবৃত্তিকার, অনুষ্ঠান উপস্থাপক,কথিকা পাঠক। তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিতর্ক ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার তিনি একজন জনপ্রিয় বিচারক। এখানে উল্লেখ্য যে জনাব শাহ আলম বিতর্ক ও আবৃত্তির ক্ষেত্রে রেখে চলেছেন অনবদ্য অবদান। স্কুল জীবনে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে আবৃত্তিকে তিনি একদম হৃদয় দিয়ে মুড়িয়ে নেন। শুধু আবৃত্তি করে নিজের শুনাম অর্জন করেননি বরং ভেবেছিলেন আবৃত্তিকে ছড়িয়ে দেবার কথা। কলেজ অঙ্গনে আগ্রহীদের আবৃত্তি বিষয়ক শিক্ষা দিতে দিতে স্থানীয় অভিযাত্রিক সাহিত্য সংসদে পৃথক আবৃত্তি বিষয়ক স্বতন্ত্র পাঠক্রম প্রস্তুত করে প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করেন। আরো ব্যাপক ও স্বতন্ত্র পরিসরের প্রয়োজনে ২০০২ সালে রংপুরে প্রতিষ্ঠা করেন স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র। এখানে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে আবৃত্তি, উপস্থাপন,শুদ্ধ উচ্চারণ, বাকভঙ্গি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের বহুজন দেশের বিভিন্ন মাধ্যমে কৃতিত্বের সাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কারমাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদ। তাঁর তত্ত্বাবধানে এখানকার বিতর্ক দল বেতার, টেলিভিশন সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সাক্ষর রাখে। বিতর্ক চর্চা বেগবান করতে তিনি বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ এবং সংগঠনে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন। এ যেন তাঁর আত্মার সাথে মিশে গেছে। আর তাইতো শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি এখনও বিতর্ক আয়োজনে সভাপতি, মডারেটর,স্পিকার, বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রফেসর শাহ আলম একজন আপাদমস্তক সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব। বিপুল সাংগঠনিক চেতনা লালন করে তাঁর এই পথচলা। তিনি বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য, রংপুর স্বরশৈলীর অন্যতম পরিচালক, রংপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের চার বছর সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। নতুন সাহিত্য পত্রিকা, সাহিত্যের কাগজ ফিরেদেখা, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ ও সোনার তরী সাহিত্য সংসদের উপদেষ্টা। শুধু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে নন। প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম মানব কল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন এই ধারার সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি রংপুর জেলা শাখার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সচেতন নাগরিক কমিটি ( সনাক) রংপুর শাখার সদস্য, সাবেক অধ্যক্ষ রংপুর অটিস্টিক ওয়েলফেয়ার সেন্টার, আজীবন সদস্য বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, রংপুর, উপদেষ্টা স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন বাঁধন, কারমাইকেল কলেজ ইউনিট,সহ- সভাপতি বেগম রোকেয়া ফোরাম (আরডিআরএস) রংপুর, উপদেষ্টা পেশাজীবী ফোরাম, আরডিআরএস রংপুর, উপদেষ্টা নলেজ কেয়ার একাডেমি, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন সদস্য, সাবেক সদস্য রংপুর শিল্পকলা একাডেমি, প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ, প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক কারমাইকেল কলেজ শিক্ষক বিতর্ক পরিষদ, উপদেষ্টা কারমাইকেল স্পন্দন নাট্যগোষ্ঠীসহ আরো কিছু সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং আছেন।
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম তাঁর কর্মের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বেশকিছু পদক ও সন্মাননা পেয়েছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, রংপুর নাগরিক পদক, পাবনা কবিতা সংসদের সাহিত্য পদক, সোনার তরী সাহিত্য সংসদ পদক, পাবনা অরুণিমা সাহিত্য পদক, আইডিয়া প্রকাশনীর শ্রেষ্ঠ পাণ্ডুলিপি পদক, সম্মিলিত লেখক সমাজের বইমেলা সন্মাননা স্মারক, জয়পুরহাট আবৃত্তি পরিষদ সন্মাননা, ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন সন্মাননা, কাকশিস গুণীজন সন্মাননা, কানসাস রজতজয়ন্তী পদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রুডার বিতর্ক গুরু সন্মাননা, পঞ্চগড় ধূমকেতু সাহিত্য পরিষদ সন্মাননা এবং জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষকতার জন্য ড. ওয়াজেদ মিয়া স্মৃতি পদক উল্লেখযোগ্য।
অবসর জীবন আর অবসরের নয় বরং তিনি মুক্ত বলাকার মতো যেন উড়ছেন তাঁর প্রাণের কর্মে। তাঁর স্বকীয়তার ভুবনে তিনি জড়াচ্ছেন সোনার পালক।
জীবনসঙ্গিনী হালিমা খাতুন ছিলেন কারমাইকেল কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রদর্শন শিক্ষক। এখন অবসর জীবনে সংসারগৃহে ব্যস্ত। প্রফেসর শাহ আলমের এই পথচলার অন্যতম প্রেরণাদায়ী। দুজনের অবসর জীবন কাটছে কামার পাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে। তাঁদের সংসারে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে আফিফা ইশরত চেতনা বেতার ঘোষিকা এবং ভালো আবৃত্তিকার। ছোট মেয়ে আছিফা ইশরত তনিমা এমবিবিএস পরীক্ষা দিচ্ছেন।
জনাব শাহ আলম শুদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, যে কোন বিশুদ্ধ চর্চার জন্য এর ভিত্তিমূল ঠিক রাখতে হবে। তিনি দেশ ও মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের সুন্দর চেতনাকে বিকশিত করে। বর্তমান প্রজন্মকে তাই শুদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি মনোযোগী হওয়ার ওপর জোর দেন।

[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সংগঠক]

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম একটি নাম। শুধু নামই নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি দশের মধ্যে এগারো। বরেণ্য ব্যক্তিত্ব শাহ আলম সম্পর্কে আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে কিছু বলা সত্যিই দুঃসাহসের। তাঁর ৬৫তম জন্মদিনে পদর্পণের শুভক্ষণে পাতা প্রকাশ তাঁকে ঘিরে একটি অনলাইন স্মারক সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিহাসের সাক্ষী হবার লোভ সামলানো কঠিন। তাই কিছু লিখবার প্রয়াস আমার।
আমি প্রফেসর শাহ আলম স্যারের সরাসরি ছাত্র নই। ছাত্রতুল্য। সবসময় আমার মধ্যে একটা দুঃখবোধ কাজ করে এই ভেবে কেন তাঁর মত গুণি শিক্ষকের ছাত্র হলাম না। তবে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং তা আত্মীকতায় একাকার। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা এবং সাংগঠনিক পরিমÐলে প্রফেসর শাহ আলম একটি আলোকিত নাম। যাঁর আলোয় আমরা অনেকেই আলোকিত। দীর্ঘদিনের নিরলস সাধানায় তিনি নির্মাণ করেছেন আলোময় সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবন। তাঁর আলোকিত আভা শিক্ষাক্ষেত্রকেও করেছে বিভাদীপ্ত। নিজের স্বকীয়তায় উজ্জ্বল শাহ আলম স্যারের জীবন ও জগৎ দেখার বোধ অসাধারণ গভীর। সামাজিক নানা বিষয় বিচিত্র অনুভবে উপস্থাপন করেছেন এবং করে চলেছেন তাঁর সাহিত্যকর্মে। সমাজসেবায় তিনি অনন্য। ঈর্ষণীয় সাংগঠনিক দক্ষতায় তিনি আপন মহিমায় উজ্জ্বল।
তাঁর সাহিত্য চর্চার সুচনা স্কুল জীবন থেকেই। কবিতা, গল্প, গান, ছড়া, প্রবন্ধ, নাটক, গবেষণাকর্মসহ সাহিত্যের বিবিধ শাখায়তাঁর অবারিত বিচরণ। কলেজ বার্ষিকী ও সমিয়িকী, স্থানীয় ও জাতীয় পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা’, কাব্যগ্রন্থ ‘ধবল আলোর মায়াবী ডাক,’ গবেষণা গ্রন্থ ‘ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা।’ যৌথভাবে প্রকাশিত হয়েছে গবেষণা গ্রন্থ- ‘ভাওয়াইয়া’, কাব্য ‘সাহসী নিসর্গ’(সম্পাদনা- মনোয়ারা বেগম), ছাড়ার বই ‘ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন’। তিনি সম্পাদনা করেছেন অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দিন এর ৭৫ বছর পূর্ত স্মারক ‘প্রজ্ঞার পাললিক ঘ্রাণ’,পুথি রহিব নিশানী(কবি হেয়াত মামুদ স্মারক গ্রন্থ, রংপুর জেলা প্রশাসন) ও আরও গ্রন্থ,পত্রিকা। তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি দেশ, মাটি, মানুষ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, দেশের মানুষের জীবন, সমাজ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য চেতনা, প্রগতির চেতনায় ভাস্বর। আঙ্গিক ও প্রকরণগত ক্ষেত্রেও বিশিষ্টতার পরিচয় স্পষ্ট।
তিনি বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার, নাট্যকার, আবৃত্তিকার, কথক, অনুষ্ঠান পরিচালক। সাংবাদিকতার জগতে বিচরণ করেছেন দীর্ঘদিন। গোলাম মোস্তফা বাটুল সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’ ও রংপুরের প্রাচীন দৈনিক দাবানলের সহকারী সম্পাদক(সাহিত্য), দৈনিক প্রথম আলোর ‘উত্তরের আলো’ ক্রোড়পত্রে লিখেছেন অনেকদিন, ছিলেন রংপুর প্রেসক্লাবের সদস্য।
তিনি একজন ভালো আবৃত্তিকার, দক্ষ উপস্থাপক এবং বিশিষ্ট আবৃত্তি সংগঠক। ছাত্র জীবনে আবৃত্তিতে অর্জন করেন অনেক পুরস্কার। রংপুরে আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থাপন, প্রমিত উচ্চারণ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন থেকে পালন করে চলেছেন অগ্রণী ভূমিকা। রংপুর অভিযাত্রিক সংসদে আবৃত্তি শাখার যাত্রা তাঁর হাত ধরেই। তিনি রংপুরে গড়ে তুলেছেন ‘স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র’ নামের একটি সংগঠন। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তিনি আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন শিক্ষার্থীদের। তিনি স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের পরিচালক। তাঁর বহু ছাত্র-ছাত্রী দেশে-বিদেশে বেতার, টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যমে সংবাদপাঠক, উপস্থাপক, আবৃত্তিকার, অভিনয়, চলচ্চিত্র, নাটক নির্মাণকারী হিসেবে সুনামের সাথে কাজ করছে। সামাজিক ও সাংগঠনিক পর্যায়ে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এর ‘বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষা’ প্রকল্পে গবেষণার কাজ করেছেন। বিতর্ক চর্চায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। কারমাইকেল কলেজে ১৯৯৩ থ্রিষ্টাব্দে অন্যান্যের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘কারমাইকেল কলোজ বিতর্ক পরিষদ’। তিনি বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত¡াবধায়ক শিক্ষক। এর আগে ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে কারমাইকেল কলেজ দলের সদস্য হিসেবে জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দলের বিজয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯৩ এ শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি নায়েম, ঢাকায় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বক্তা হন, বিজয়ী হয় তাঁর দল। বিতর্ক পরিষদের তত্ত¡াবধায়ক শিক্ষক হিসেবে কলেজে আদালত বিতর্ক, সংসদীয় বিতর্ক, সনাতনী বিতর্ক, বারোয়ারী বিতর্ক, রম্য, ভৌতিক ও অন্যান্য বিতর্ক আয়োজন, আন্তঃজেলা, অন্তঃবিভাগ বিতর্ক উৎসব আয়োজনে রাখেন বিশেষ ভূমিকা। তা ছাড়া রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজ, বিয়াম স্কুল ও কলেজ, প্রথম আলো বন্ধুসভা, সুজন, সনাক(টিআইবি) ও অনেক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিতর্ক আয়োজনে রাখেন বিশেষ ভূমিকা। পালান করেন সভাপতি, স্পিকার, বিচারকের দায়িত্ব। বিভিন্ন বইমেলা আয়োজন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কসপ, আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক, শুদ্ধ উচ্চারণ প্রশিক্ষণে তাঁর ভূমিকা অনন্য।
রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন প্রফেসর শাহ আলম। প্রতিষ্ঠাকালে যুগ্ম সম্পাদক, পরে চার বছর সম্পাদক, দুবছর সহসভাপতি, এবং চার বছর সভাপতি পদে আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে সংগঠনটির অগ্রযাত্রায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে পরিষদের অগ্রযাত্রায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। এছাড়াও তিনি জীবন সদস্য বাংলা একাডেমি, সম্মানিত সদস্য ড. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ‘বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি’ রংপুর জেলা শাখার চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ, উপদেষ্টা ত্রৈমাসিক নতুন সাহিত্য, উপদেষ্টা বিভাগীয় লেখক পরিষদ, উপদেষ্টা ফিরেদেখা(সাহিত্যের কাগজ),উপদেষ্টা পেশাজীবী ফোরাম,সহসভাপতি বেগম রোকেয়া ফোরাম, উপদেষ্টা আইজিএস, উপদেষ্টা নলেজ কেয়ার একাডেমি, সদস্য সনাক,সুজন রংপুর। এমন অনেক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করছেন তিনি। অধ্যাপনার সাথে সংযুক্ততা দীর্ঘদিনের প্রায় ৩৬ বছর। আগেই বলেছি তিনি একজন অনন্য ও অসাধারণ গুণী শিক্ষক। এখন তার ছাত্ররা প্রশংসায় পঞ্চমুখ, শাহ আলম স্যার বলতেই এখনও অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী যেনো ফিরে যায় সেই শ্রেণি কক্ষে।
অসীম ধৈর্য ও নিষ্ঠা যার বহুগুণের মধ্যে অন্যতম। অসামান্য গুণের অধিকারী এ মানুষটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিসীম ধৈর্য, নিষ্ঠা আর সততার পরিচয় দিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। যাপিত জীবনে যখন যেখানে অবস্থান করেছেন সেখানেই একটা আননদ জগৎ সৃষ্টিতে তিনি সিদ্ধহস্ত। সেখানকার প্রতিজন সদস্য যেন তাঁর পরম আত্মীয়, একান্ত আপনজন। বিষয়টি আমাকে অবাক করে।
পরিশীলিত জীবনবোধ সমৃদ্ধ পরিচ্ছন্ন মানসিকতার কর্তব্যপরায়ণ বিশেষ এক চরিত্রের মানুষ তিনি। দাদা, দাদী, বাবা, মা, ভাইয়ে‘র কাছে পরম ¯েœহাস্পদ এ মানুষটি। বোন,ভগ্নিপতিসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কাছেও বিশেষ প্রিয়। পিতা-মাতার প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও কবর্ত্যবোধ তাঁকে করেছে আরও মহান। মা তাঁর কাছে শহরের বাসাতে থেকেছেন দীর্ঘদিন। অসুস্থতার একপর্যায়ে অনেকটা অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় প্রফেসর শাহ আলম এর সহধর্মিনী হালিমা খাতুন, দুকন্যা চেতনা, তনিমা এবং স্যার নিজে মায়ের সেবা করেছেন গভীর আন্তরিকতায়। বাবা গ্রামে থাকলেও নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন চিকিৎসার। মায়ের যেনো কষ্ট না হয় সেজন্য যতœ নিয়েছেন নিজেদের উজাড় করে দিয়ে। পরম শ্রদ্ধেয় মা ইন্তেকাল করেন শাহ আলম স্যারের বাসাতেই-২০১৯ এর ২রা জুলাই। এবার তাঁর মৃত্যুর প্রথম বর্ষপূর্তি পালন করেছেন গ্রামে মিলাদ, দোয়া অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে।
সাহিত্য-সংস্কৃতি, অধ্যাপনা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকার জন্য ছাত্র জীবনে এবং পরবর্তীতে অর্জন করেছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পদক। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑশিক্ষকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ড. এম.এ. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন জাতীয় পদক, রংপুর নাগরিক পদক, সাহিত্য পদক, বাংলাদেশ কবিতা সংসদ, পাবনা; অরুণিমা সাহিত্য পদক (কাব্য) ,পাবনা, আইডিয়া পাবলিকেশন্স শ্রেষ্ঠ পাÐুলিপিকার পদক(২০০১৭, ২০১৮), সাংগঠনিক অবদান ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পদক, সম্মিলিত লেখক সমাজ আয়োজিত বই মেলাÑ২০১৮Ñবিশেষ সম্মাননা স্মারক, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের জন্য কারমাইকেল কাইজেলিয়া শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংসদের (কাকাশিশ) সম্মাননা পদক, সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদের(কানাসাস) সম্মাননা পদক, আবৃত্তিতে অবদানের জন্য জয়পুরহাট আবৃত্তি সংসদের সম্মাননা পদক, বিতর্কে অবদানের জন্য ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন (এন ডি এফ)২০১৮সম্মাননা স্মারক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট ফেডারেশন(ব্রæডা) এর ২০১৯ এ ‘বিতর্ক গুরু’ উপাধি পদক, ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজ সম্মাননা পদক, মুজিব শতবর্ষে বাংলাাদেশ কাব্য চন্দ্রিকা সাহিত্য একাডেমি ‘আজীবন সম্মাননা পদক-২০২০’ পদকসহ আরও অনেক পদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন তিনি।
অনেক কথাই অনুক্ত থাকলো প্রফেসর শাহ আলম সম্পর্কে। কর্মে, গুণে, ভাবনায়, অন্বেষণে অনেকটা স্বতন্ত্র। তাই তাকে নিয়ে যতটুকু বলেছি তাতেই আমার বলতে দ্বিধা নেই তাঁর বিপুল কর্মধারায় তিনি দশের মধ্যে এগারো। তাঁর অবদানে আমাদের তরুণ প্রজন্ম আলোকিত হচ্ছে আজও, সমাজও তাঁর অবদানে ঋদ্ধ। ৬৫ তম জন্মদিনে স্যারের প্রতি জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। স্যার দীর্ঘজীবী হোন, আলো ছড়াতেই থাকুন।
পাতা প্রকাশ প্রফেসর শাহ আলম স্যারের ৬৫ তম জন্মদিনে স্মারক সংখ্যা প্রকাশ করলো সেজন্য পাতা প্রকাশের সবাইকে বিশেষ করে জাকির আহমদকে ধন্যবাদ জানাই। শুভ কামনা সবার জন্য।

[লেখক: সভাপতি, রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ, সাহিত্যিক, উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, রংপুর সদর]

কবে থেকে তাঁকে চিনি সেটা বলতে না পারলেও কবে থেকে তাঁর সাথে কথা সেটা বোধ হয় বলা যায়। দশক তিনেক আগে তাঁর শ্বশুরালয়ে কোন এক সন্ধ্যায় দেখা। তিনি তখন ঐ বাড়ির ছোট জামাই। কারণ তখন পর্যন্ত তাঁর শ্যালিকারা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়েন। তারা কোথাও পাত্রস্থ হন নাই। সে সুযোগে তিনি বহু বছর ছোট জামাই হিসেবে দখল দারিত্ব বজায় রাখেন।
আমি তখন বহিরাগত। বলা যায় অনুপ্রবেশকারী। আমাকে নিয়ে তাঁর শশুড়বাড়ীতে বেশ অসস্থি। বলতে পারেন বেজায় অপছন্দের মানুষ ছিলাম। তবুও প্রাণের টানে সদা সন্ধ্যায় যেতাম। আমার মতন বাউন্ডুলে মানুষ, মাথায় সাম্প্রদায়িক শক্তির আরোপিত খুনের মামলা। বিচারে দÐ হলে ন্যুনতম যাবজ্জীবন, ওপরে ফাঁসি। ফাঁসির আসামীকে পছন্দ হবার কারণ নেই কারুর বরং মহাবিপদ। বলতে পারেন দশ নম্বর মহাবিপদ। এ রকমকালে তাঁর সাথে দেখা ও কথার সূচনা। তারপর থেকে ক্রমান্বয়ে কাছাকাছি হবার চেষ্টা করেছি। অধ্যাপক মানুষ। একটু ব্যক্তিত্ব নিয়েই চলতেন। ফলে আমার সঙ্গে ঠিক ব্যাটে বলে হয়ে উঠছিল না তাঁর। আমি রাজনীতির মানুষ। মাঠে ময়দানের লোক। আর তিনি এসব এড়িয়ে চলতেন। রাজনীতির সাতে পাঁচে নেই, ফলে ওনার সাথে কোন ভাবেই মিলে উঠছিল না। তবে একটা জায়গায় মিল তিনি সাহিত্য কেন্দ্রিক মানুষ আর আমি অনুরাগী। তবুও মিলে নাই। ফলে ঘনিষ্ঠতা হয়ে ওঠে নাই। বলা যায় পুর্ববৎ দূরত্বই প্রবহমান থাকে বেশ ক’বছর।
ইচ্ছা আর অনিচ্ছাতেই হোক নব্বইয়ের গোড়ার দিকে তাঁর শ্বশুর বাড়িটা আমারও শ্বশুরবাড়ী হয়ে যায়। এরপর তাঁর আর দূরে থাকা সম্ভব হয়নি। গত তিন দশকের শোনা ও দেখায় তার প্রতি আমার এক ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে।
প্রথমত তিনি যে কোন ঝামেলা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। সাহিত্য কেন্দ্রিক কাজ গুলোকেই তিনি তাঁর কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিনি একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে যেমন সমাদৃত তেমনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য বরণীয় মানুষে পরিণত হয়েছেন। একজন ডাকসাইটে উপস্থাপক ও সুবক্তা। একজন বক্তার সুবক্তা হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ধারায় যে জ্ঞান থাকা দরকার তাঁর সবটুকুই রয়েছে। তিনি একজন দক্ষ সংগঠকও। চাকুির জীবনে কলেজ ও বাড়ি করা লোক তিনি ছিলেন না। তিনি বির্তক ও সাহিত্য সংগঠন গড়া ও সে সংগঠনকে মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে যথেষ্ট মেধা বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর হাতে গড়া ছাত্ররা উত্তর জনপদে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখছেন। এক সময় রংপুরে অভিযাত্রিক দাপুটে সংগঠন ছিল। সেখানে নানা সীমাবদ্ধতার জন্য অনেকেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতে না পেরে পৃথক পৃথক সংগঠন গড়েন। যার একটি রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ। রংপুর সাহিত্য- সংস্কৃতি পরিষদ রংপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে অশেষ অবদান রেখে চলেছে।সংগঠনটি একটা লিডিং অবস্থানে। যা প্রফেসর আলীম উদ্দীনকে ধরে প্রফসর শাহ আলমসহ তার কতিপয় সহযাত্রীর অনন্য কীর্তি। লেখক ও বাচিক শিল্পী স্বত্তায় তিনি অনন্য। বাচিক শিল্পের অগ্রযাত্রায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র। ব্যক্তি জীবনে একটু ভিতু হলেও তাঁর মধ্যে অহংবোধ নেই।
সবচেয়ে সুখের বিষয় তিনি গোটা পরিবারকেই সাহিত্যের ধারায় নিতে পেরেছেন। পিতা ও কন্যা একত্রে মঞ্চে সঞ্চালকের আসনে আমাদের সমাজে খুব একটা দেখা যায় না। আমরা এরকমটাই দেখে অভ্যস্ত পিতা বা মাতা সংস্কৃতি অঙ্গনে গেলেও তিনি তার উত্তরাধিকারদের একই ধারায় দেখতে চান না। যার প্রতিফলন সমাজে প্রকট। বিকল্প নেই, সেটা পরিবার বলুন বা সমাজ ও রাষ্ট্রে বলুন সবখানেই এ শূণ্যতা।
পীরগাছার বামনসর্দারের মতন নিভৃত গ্রাম থেকে শহরে এসে সাহিত্য সাধনা ও সাহিত্যকে ধরে একঝাঁক প্রজন্ম গড়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। মোহাম্মদ শাহ আলম পেরেছেন। তিনি কর্ম ও গুণে কালোরতীর্ণ হয়েছেন। তাঁর জন্মদিনে আমার প্রণতি থাকলো।

[লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, কুড়িগ্রম উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা]

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। শিক্ষকতা পেশায় সংশ্লিষ্ট থাকায় রংপুর সাহিত্যাঙ্গনে অনেকের কাছেই তিনি ‘শাহ আলম স্যার’ নামে পরিচিত। ৬ই জুলাই ১৯৫৫ সালে রংপুরের পীরগাছা থানার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসর্দার গ্রামে তাঁর জন্ম। অবসরে গেলেও মেধা ও মননে একজন তরুণ গুণীজন তিনি। কারমাইকেল কলেজ রংপুর (রাবি) থেকে বাংলাসাহিত্যে সম্মান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্কুল জীবন থেকেই কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, নিবন্ধ, গল্প, ফিচার লেখা শুরু করেন তিনি। তখন থেকেই তাঁর লেখা স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে আসছে। তিনি বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন চিলাহাটি সরকারি কলেজ, নীলফামারীতে; কারমাইকেল কলেজ, রংপুরে; উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন উলিপুর সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রামে এবং তিনি সাবেক বিভাগীয় প্রধান বাংলা বিভাগ, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর। তিনি ১৯৯২ সালে কারমাইকেল কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কারমাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদ। দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি একজন দক্ষ সংগঠক। শিক্ষকতা থেকে অবসরের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা লক্ষ্যণীয়।
১৯৭৮ সালের ৫ মে অভিযাত্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ, রংপুর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন একেএম শহীদুর রহমান (মুত্যু ৯ আগস্ট ২০২০) এবং সভাপতি প্রফেসর মেতাহার হোসেন সুফী। প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম অভিযাত্রিকের যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি আবৃত্তি বিষয়ক পাঠক্রম প্রস্তুত করে প্রথম আবৃত্তি বিভাগ খুলে আবৃত্তি প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ২০০২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র।’ তখন খেকে এ পর্যন্ত তিনি প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন, আবৃত্তি, উপস্থাপন, শুদ্ধ উচ্চারণ, বাকভঙ্গির নানা বিষেয়ে। তাঁর প্রশিক্ষত শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে আবৃত্তি, সংবাদপাঠ, উপস্থাপন এবং সাহিত্য বিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আজ সুনামে প্রতিষ্ঠিত।
সাহিত্যের উর্বর ভূমি রংপুরে ২০০২ সালে ‘রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহিত্যাঙ্গনে তরুণদের স্থান করে দিতে এবং লিখিয়ে গড়ে তোলার মানসিকতায় সে সময় ড. মোঃ রেজাউল হক, প্রফেসর মুহম্মদ আলীম উদ্দীন, প্রফেসর জালাল উদ্দিন আকবর, মহফিল হক, মুক্তিযোদ্ধা মুকুল মোস্তাফিজ, সাংবাদিক আব্দুস সাত্তার, প্রফেসর মনমথনাথ সরকার, ডা. মফিজুল ইসলাম মান্টু, আনোয়ারুল ইসলাম রাজু, প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম, সাংবাদিক আফতাব হোসেন, সোহরাব দুলাল, কাজী আশফাক, নাসিমা আক্তার প্রমুখ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সম্মিলিত লেখক সমাজ, রংপুরের আয়োজনে ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত রংপুর বইমেলায় তরুণদের উৎসাহ প্রদানে বইমেলার উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। সংগঠনপ্রিয় প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ছড়া সংসদ, রংপুরের আন্তর্জাতিক ছড়াকার সম্মেলনের তরুণ আয়োজকদের সাথে সম্পৃক্ত থাকার মাধ্যমে তাদের উৎসাহ প্রদান করেছেন। রংপুরে বিভিন্ন সাহিত্য আলোচনায় বা সাংস্কৃতিক আয়োজনে অনেকের সাথে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম এঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এখনো তিনি যে সব সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত তা হলো- জীবন সদস্য বাংলা একাডেমি; সম্মানিত সদস্য ড. এম.এ. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, ঢাকা; পরিচালক স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র; রংপুর; উপদেষ্টা রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ; উপদেষ্টা রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদ; উপদেষ্টা ত্রৈমাসিক নতুন সাহিত্য; উপদেষ্টা শিল্পধারা, রংপুর; উপদেষ্টা, ফিরে দেখা (সাহিত্যের কাগজ) রংপুর; সভাপতি মাহিগঞ্জ কলেজ রংপুর, প্রধান উপদেষ্টা শহিদ শংকু বিদ্যানিকেতন, রংপুর; উপদেষ্টা ইন্টারন্যাশনাল গ্রামার স্কুল (আইজি এস), রংপুর; উপদেষ্টা প্রথম আলো বন্ধুসভা রংপুর; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী কল্যাণ সমিতি, রংপুর; সদস্য, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) টিআইবি, রংপুর; সদস্য, সুজন, রংপুর; আজীবন সদস্য বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, রংপুর; উপদেষ্টা স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন, কারমাইকেল কলেজ ইউনিট, রংপুর; উপদেষ্টা সোনার তরী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ, অন্নদানগর; উপদেষ্টা স্পন্দন নাট্য গোষ্ঠী, কারমাইকেল কলেজ; সহ-সভাপতি বেগম রোকেয়া ফোরাম, (আরডিআরএস) রংপুর; উপদেষ্টা পেশাজীবী ফোরাম, আরডিআরএস, রংপুর; উপদেষ্টা নলেজ কেয়ার একাডেমি, রংপুর; উপদেষ্টা, সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী ও ক্রীড়া সংগঠন বাংলার চোখ, আজীবন সদস্য রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি; সহ-সভাপতি রংপুর মেট্টোপলিটন কমিউনিটি পুলিশিং; যৌথ প্রতিষ্ঠাতা হাজী রহমতুল্লাহ্ পাঠাগার, বামনসর্দার, পীরগাছা, রংপুর। প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম গীতিকার, নাট্যকার ও আবৃত্তিকার বাংলাদেশ বেতার; বেতার অনুষ্ঠান উপস্থাপক, কথিকা পাঠক, পাণ্ডুলিপি সরবরাহক।
তাছাড়ও তিনি সাবেক অধ্যক্ষ, রংপুর অটিস্টিক ওয়েলফেয়ার সেন্টার; সাবেক সেমিনার সম্পাদক, বাংলা সেমিনার কারমাইকেল কলেজ, রংপুর; সাবেক সদস্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, রংপুর; প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ; প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক বিতর্ক পরিষদ, কারমাইকেল কলেজ; সাবেক সদস্য রংপুর প্রেসক্লাব; সাবেক সহকারি সম্পাদক (সাহিত্য) দৈনিক দাবানল, রংপুর;, সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ বন্ধু সভা ইউনিট।
প্রকাশনা: ভাওয়াইয়া (যৌথ গবেষণা); ধবল আলোর মায়াবী ডাক (কাব্যগ্রন্থ); সাহসী নিসর্গ (যৌথ কাব্য); বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা (গল্পগ্রন্থ); ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন (যৌথ ছড়াগ্রন্থ), গবেষণা গ্রন্থÑ ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্য চর্চা। সম্পাদনা করছেন রংপুর সাহিত্য পত্র, অভিযাত্রিক সাহিত্য পত্রিকা, মুহম্মদ আলীম উদ্দীন এর ৭৫ বছর পূর্তি স্মারক-প্রজ্ঞার পাললিক ঘ্রাণ; নায়েম এর প্রশিক্ষণ পত্রিকা, বিভিন্ন দেয়াল পত্রিকা, কলেজ ম্যাগাজিন।
সম্মাননা: শিক্ষকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ড. এম.এ. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন জাতীয় পদক, রংপুর নাগরিক পদক (১৯৯৫), নগরিক নাট্যগোষ্ঠী, রংপুর, সাহিত্য পদক (১৪০৮ বঙ্গাব্দ) বাংলাদেশ কবিতা সংসদ, পাবনা; সোনার তরী সাহিত্য সংসদ পদক, অরুণিমা সাহিত্য পদক (কাব্য) ,পাবনা (২০১৪), আইডিয়া পাবলিকেশন্স শ্রেষ্ঠ পাণ্ডুলিপিকার পদক (২০০১৭, ২০১৮), সম্মিলিত লেখক সমাজ আয়োজিত বইমেলাÑ২০১৮Ñসম্মাননা স্মারক, সাংগঠনিক অবদান ও সাহিত্য- সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পদক, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের জন্য কারমাইকেল কাইজেলিয়া শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংসদের (কাকাশিশ) সম্মাননা পদক (২০১৮), সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদের (কানাসাস) সম্মাননা পদক (২০১৮), আবৃত্তিতে অবদানের জন্য জয়পুরহাট আবৃত্তি সংসদের সম্মাননা পদক (২০১৮), বিতর্কে অবদানের জন্য ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন (এন ডি এফ) ২০১৮ সম্মাননা স্মারক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট ফেডারেশন (ব্রুডা) এর ২০১৯ এ ‘বিতর্ক গুরু’ উপাধি পদক, মুজিব শতবর্ষে বাংলাাদেশ কাব্য চন্দ্রিকা সাহিত্য একাডেমি ‘আজীবন সম্মাননা পদক-২০২০; ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজ সম্মাননা পদক; রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ বিশষ সম্মাননা পদক (সাহিত্য-২০১৯); রংপুর মেট্রোপলিটন কমিউনিটি পুলিশিং এর বিশেষ সম্মাননা স্মারক (২০২০); বিভগীয় লেখক পরিষদ পদক- ২০২০ (সাহিত্য), শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদান রাখায় ‘মানবতার কল্যাণ ফাউণ্ডেশন পদক; রোকেয় দিবস ২০১৯ এ জেলা প্রশাসন রংপুরের সম্মাননা স্মারকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা লাভ করেন।
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম একজন গুণী লেখক। সাহিত্যের সকল শাখায় যাঁর বিচরণ, তিনি সাহিত্যাঙ্গনকে ছেড়ে থাকতে পারেন না। বিশেষ করে রংপুর টাউন হলে সরকারি বেসরকারি যে কোনো সাহিত্যানুষ্ঠানে অনেকের সাথে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করে সাহিত্যাঙ্গনকে প্রাণবন্ত করে রাখছেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রকৃতির সুন্দর মনের অধিকারী তাঁকে পেয়ে উজ্জীবিত আমরা। রংপুরের তরুণ লেখকদের উৎসাহ প্রদানে তিনি তাদের সাথে আছেন, থাকবেন। ৬ জুলাই তাঁর জন্মদিনে তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। তিনি আমাদের মাঝে তাঁর উদারতা, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা বিলিয়ে দিচ্ছেন, দেবেন বহুকাল।

[লেখক: বিশিষ্ট ছড়াকার ও সংগঠক]

অধ্যাপক মো: শাহ আলম। রংপুরের একটি প্রিয় মুখ। চিন্তাশীল ও শুদ্ধচর্চার মানুষের কাছে তিনি সবসময়ই অবিসংবাদিতভাবে অনুসরণীয়। কখনো কখনো অনুকরণীয়ও। বয়সে তিনি অন্যঅনেকের চেয়ে প্রবীণ। কিন্তু চিন্তা ও চেতনায় তরুণ, প্রগতিশীল। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে, তিনি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। শক্তিশালী আলোকর্তিকা হয়ে উঠছেন। অসংখ্যজনে আলো ছড়াচ্ছে। তাইতো তাঁর প্রজ্ঞার আভা ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানাপ্রান্তে। পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ছড়িয়েছে।
অধ্যাপক মো: শাহ আলম স্যারের সারের সাথে আমার পরিচয়টা সংক্ষিপ্ত। একজীবন সাপেক্ষে খুবই সংক্ষিপ্ত। মাত্র একদশক। আমি তাঁর শ্রেণিকক্ষের শিক্ষর্থী নই। এটা আমাকে মাঝেমাঝেই বেদনা সঞ্চার করে। তবুও তাকে খুব আপন শিক্ষক মনে হয়। হৃদয়ের গভীর থেকে শিক্ষক মনে হয়। আমার জীবনে বেশকিছুটা সময় সুযোগ হয়েছে তাঁর পাশে বসে ভাষা শেখার, কথা বলার কৌশল শেখার। তিনি দীর্ঘদিনযাতব বিতর্ক নিয়ে কাজ করছেন। ভাষা নিয়ে কাজ করছেন। শুদ্ধ বাংলা চর্চা করছেন। এবং এই কাজে তিনি সমসাময়িক অন্যঅনেককের চেয়ে একটু অন্যরকম। একটু বেশি আলোকিত মুখ। পরিচিত মুখ।
স্যারের সাথে আমার সবচেয়ে বেশি দেখা হতো বিতর্কের মঞ্চে। তিনি কখনো বিচারিক দায়িত্ব পালন করতেন, কখনো মডারেটর, আবার কখনো সভাপতি। বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপনা প্রভৃতি প্রতিযোগিতার বিচারিক দায়িত্ব পালনে তাঁর সাথে দেশের বেশকিছুপ্রান্ত ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর পাশে বসে থাকার সুযোগ হয়েছে। এবং সেই পুরো সময়জুড়ে আমি তাঁর কাছে শুধু শিখেছি। তাই তো, তাঁর সান্নিধ্য আমাকে সবসময় আনন্দ দেয়।
বিচারিক মঞ্চে আমি থাকতাম সবচেয়ে কমবয়সী মানুষ। বিতর্কে প্রথম বিচারিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছে তাঁর আমন্ত্রণে। তখন আমার বয়স খুবই কম। তিনি আমার মতো ছোট্ট, আনাড়ে মানুষকে তাঁর পাশে বসিয়ে বিচারিক দায়িত্ব পালন করাতেন। হাতেকলমে শেখাতেন। বিচারিক কাজ শেষে আবার মাইক্রোফোনটাও এগিয়ে দিতেন আমার দিকে। এভাবেই আমি একসময় তাঁর শিক্ষার্থী হয়ে উঠলাম। তিনি আমাকে সাহসী করে তুললেন। একবার সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্যার, আপনার উত্তরাধিকার হিসেবে কী কাউকে তৈরি করেছেন? আপনি যখন থাকবেন না তখন আপনার স্বপ্ন কে বয়ে বেড়াবে?’ আমি উত্তরাধিকার বলতে তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকার বোঝাই নি। বুঝিয়েছিলাম তাঁর শুদ্ধচর্চার পথচলার কথা। স্যারও সেটাই বুঝলেন। প্রশ্ন শুনে স্যার হাসলেন। বললেন, অনেকেই তো আছে। ওরাই ঠিক করবে কে হবে আমার উত্তরাধিকার।
অধ্যাপক মো: শাহ আলম সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত। পেশাগত জীবনে অবসর যাপন করছেন। কিন্তু তার ব্যস্ততা একটুও কমে নি। একথা সত্য, আমরা সবাই ব্যস্ত থাকি। কিন্তু কাজে ব্যস্ত থাকা মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে কম। খুবই কম। হাতে গোনা। তিনি সেই কমসংখ্যক, হাতে গোনা মানুষের একজন। অসংখ্যজনে তিনি আজ প্রিয়ভাজন। যখনই তাঁর সহচর হওয়ার সময় হয়েছে তখনই তাকে নতুন করে চিনেছি। আর বুঝেছি তিনি কত বড় মাপের মানুষ! মানুষ মাপা কঠিন। মানুষ মাপতে যাওয়া মস্ত বড় ভুল। আমি সেই ঔদ্ধত্যও দেখাতে চাই না। কিন্তু জীবন থেকে এটুকু জেনেছি, মানুষের সৃষ্টিশীলতা তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। অধ্যাপক মো: শাহ আলম জীবনব্যাপি একজন সৃষ্টিশীল মানুষ। তিনি মানুষ সৃষ্টি করেন। অসংখ্যজনে তিনি তাঁর স্বপ্ন বপন করতে পেরেন। তাঁর শিক্ষার্থীরা এখন দেশের নানাপ্রান্তে সুস্থধারার কর্মকাÐে ক্রিয়াশীল। তাঁর সহচর হয়ে, যখন সেসব জায়গায় যাওয়ার গেছি তখন দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর হাতেগড়া অসংখ্য শিষ্যকে। তারা আজ সারাদেশে আলো ছড়াচ্ছেন। অধ্যাপক মো: শাহ আলম তাঁদের শিক্ষক এই পরিচয় দিতেই তারা আজও আনন্দবোধ করেন।
অধ্যাপক মো: শাহ আলম স্যারের চেহারা আজও দীপ্তি ছড়ায়। তাঁকে দেখলে আজও আমি বিস্মিত হই। কত শত নক্ষত্র তিনি জন্ম দিয়েছেন! হৃদয়ে ধারণ করেছেন। তাকে নিয়ে ভাবলেই মাঝেমাঝে আমার খানিকটা জটপাকিয়ে যায়। ভাবি, যিনি এত অসংখ্য নক্ষত্র হৃদয়ে ধারণ করেছেন তিনি না জানি কত বড়! আজ শত নক্ষত্রের জনকের জন্মবার্ষিক। তার জন্য নিরন্তর শুভকামনা। তিনি এভাবেই আলো ছড়াবেন। হৃদগর্ভে আরও অসংখ্য নক্ষত্র ধারণ করবেন। আমাদের ভাষা ও সুস্থচিন্তার পথচলাকে আর অনেকটা পথ এগিয়ে নিয়ে যাবেন এই প্রত্যাশা। শতবর্ষী হয়ে উঠুন অধ্যাপক মো: শাহ আলম।

[ লেখক : শিক্ষক, বেগম রোকয়া বিশ্ববিদ্যালয়]

বন্দনা মোর ভঙ্গীতে আজ
মোহাম্মদ শাহ আলম-চিরায়ত চেতনার এক চির উজ্জ্বল যাপনের নাম। যতই গভীরে নামি – অতল; যতই উপরে ভাসি – অসীম; গোধূলিভাস্যেযতটানীরব –ততটাই বন্ধু ভেতরেভেতরে।মনে ও মননে নিরেট বাঙালিয়ানা আরাধ্য তাঁরআজন্মের। বোধ ও বোধির উৎসার থেকে উপলব্ধিজাত যাপন আপন করে নিয়ে মাটিমুখী দৃষ্টি লালন করে জীবন চিনেছেন তিনি। আর মানুষ তো তার নিয়ত নিরীক্ষার নিবিড় নির্বেদ। তাঁরজ্ঞান ও মনীষারপ্রস্ফুটনপ্রতিনিয়তউজ্জ্বলতরকরেছেলাখোশিক্ষার্থীরচলারপথ। নত হই অবনত আবাহনে -‘আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো, নমো হে নমো, তোমারেস্মরি, হে নিরুপম,/নৃত্যরসে চিত্ত মমউছল হয়ে বাজে—/বন্দনা মোর ভঙ্গীতে আজ সঙ্গীতে বিরাজে’ (রাবীন্দ্রনাথ, বিচিত্র, ১)।
আপনস্বাতন্ত্র্যেনিভৃতচারী
দ্বিধাহীন বলি, কারমাইকেলেরচত্ত্বরে আমি চিনেছি সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলমকে। আর মানুষ শাহআলমকেচিনেছি অনেক কাছ থেকে, ক্লাসের বাইরে। তিনিআমার চেতনার জগতে জ্বালিয়েছিলেন সুরের শিখা। মনে আছে আজো, যেদিন প্রথম স্যারের সামনে ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম ১৯৯২ সালে, রংপুর টাউন হল চত্ত্বরের একটি অনুষ্ঠানে। সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম গাম্ভীর্যের গভীরে কতটা বন্ধু তিনি। একবারের জন্যেও বুঝতে কষ্ট হয়নি – অন্তরে তাঁর বন্ধুত্বের অনন্ত আভা। ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’- এই তাঁর বোধের জগৎ। মুক্তি-উন্মূখ এই মানুষটির কাছে অবনত হই রাবীন্দ্রিক উচ্চারণে-“মানুষের একটা দিক আছে যেখানে বিষয়বুদ্ধি নিয়ে সে আপন সিদ্ধি খোঁজে।সেইখানে আপন ব্যক্তিগত জীবনযাত্রানির্বাহে তার জ্ঞান, তার কর্ম, তাররচনাশক্তি একান্ত ব্যাপৃত। সেখানে সে জীবরূপেবাঁচতে চায়।কিন্তু মানুষের আর-একটা দিক আছে যা এই ব্যক্তিগত বৈষয়িকতার বাইরে।সেখানে জীবনযাত্রার আদর্শে যাকে বলি ক্ষতি – তাইলাভ, যাকে বলি মৃত্যু – সেইঅমরতা। সেখানে বর্তমান কালের জন্যে বস্তু সংগ্রহ করার চেয়ে অনিশ্চিত কালেরউদ্দেশে আত্মত্যাগ করার মূল্য বেশি। সেখানে জ্ঞান উপস্থিত-প্রয়োজনের সীমাপেরিয়ে যায়, কর্ম স্বার্থের প্রবর্তনাকে অস্বীকার করে। সেখানে আপনস্বতন্ত্র জীবনের চেয়ে যে বড়ো জীবন, সেই জীবনে মানুষ বাঁচতে চায়” (ভূমিকা, মানুষের ধর্ম)।শাহআলম স্যার এই বড় জীবনের নিভৃতচারী এক নিঃসঙ্গ নির্বাহী।
কত অজানারে জানাইলে তুমি
যা কিছু অতীত, যা কিছু পুরাতন Í সেখানেই প্রোথিত মানুষের প্রার্থণার ভাষা-উপভাষা। বাংলা সাহিত্যের উৎস থেকে উতসবমুখরতা, সবকিছুইশাহআলম স্যারের সাবলীল প্রকাশে সরব। চর্যাপদের জীবনভাস্য থেকে তিনি খুঁজে তুলেন বোধের বিস্তার, মধ্যযুগীয় ধর্ম-ধারনা থেকে প্রসারিত হয় তাঁর ভাবনার শাখা-প্রশাখা; যা এসে আধুনিকতায় হয় বহু-বিস্তারী আলোক-বিচ্ছুরণ। শাহআলম স্যারের ক্লাসে উপস্থিত আছি, আথচ সাহিত্যের বহুবর্ণআনন্দ-উৎসারআলোকিত করেনি বোধের জগত – এমনটি ঘটেনি কখনো। কিভাবে যে তিনি প্রাচীন সাহিত্যের আলো-অন্ধকার থেকে মধ্যযুগের ¤øানিমামাড়িয়েআধুনিকতার আলোয় উঠে আসেন তাঁর কথার কারিগরি দক্ষতায়- সেটা ভাবলেআজো এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন তাড়িত করে স্মৃতির স্মারক। চেতনারদুয়ারে করাঘাত করে রাবীন্দ্র ভাবানুরণনঃ
“কত অজানারে জানাইলে তুমি, /কত ঘরে দিলে ঠাঁই Í
দূরকে করিলে নিকট বন্ধু, /পরকে করিলে ভাই।
পুরানো আবাস ছেড়ে যাই তবে, /মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে,
নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন/সে কথা যে ভুলে যাই।
দূরকে করিলে নিকটবন্ধু, /পরকে করিলে ভাই।”[গীতাঞ্জলী, ৩]
বহ্নিময় চেতনার দীপ্তিঃ
ভাব ও ভাষার ভারবাহী ভাবনাগুলোমন্থন করেশাহআলম স্যার বানাতে পারেন উপশমের মলম; যা বোধকে করে বহ্নিময়, চেতনাকে করে দীপ্তিমান। উৎস থেকে বহ্নি থেকে জীবনের যাত্রাপথে যাতনাময় যে জ্বালা, তাকে এক অনাবিল আলোয় তিনি করে তোলেন উতসবমুখর। তাই তো প্রাচীন সাহিত্যের উৎস থেকে বহ্নিময় শিখাকে তিনি প্রজ্জ্বলিত করে তোলেন আধুনিকতার মশালে। নিজেকে সকল প্রাপ্তির উর্ধে রেখে লোভহীন নির্লিপ্ত প্রকাশ সাহিত্যের মূল সৌন্দর্য। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলছেনÍ“মানুষের দুর্ভাগ্য এই যে, উপলক্ষের দ্বারা লক্ষ্য প্রায়ই চাপা পড়ে; সে গানশিখিতে চায়, ওস্তাদি শিখিয়া বসে; ধনী হইতে চায়, টাকা জমাইয়া কৃপাপাত্র হইয়াওঠে; দেশের হিত চায়, কমিটিতে রেজোল্যুশন পাস করিয়াই নিজেকে কৃতার্থ মনেকরে(সাহিত্য, সৌন্দর্যবোধ)।শাহআলম স্যার এখানে সর্বান্তকরনে সফল এক সারথির নাম। যে কোনপ্রয়োজনে সর্বজনীন তিনি। অবলীলায় মিশে যানসকলকাতারে; কিন্তুসেখানেওতিনিনিজস্বতায়, স্বকীয়তায়প্রোজ্জ্বল-
সফল শিক্ষকের দুটো বড় গুণ ছিল স্যারের মধ্যে। পানির মত, নিশ্বাসের মতো এগুলো তাঁর প্রকৃতির ভেতর খেলা করত : প্রীতি আর প্রিয়তা। প্রীতি মানে ভালোবাসা, যা শিক্ষকের হৃদয় থেকে ছাত্রের দিকে অবারিত ধারায় বয়ে যায়। ৃনা হলে ছাত্রের হৃদয়জগতে তিনি সজীব ভাবে গৃহীত হবেন না, ছাত্রেতহৃদয় জেগে উঠবেনা, ছাত্রের কাছে তিনি আচরণীয়বাঅনুসরণীয় হয়েউঠবেননা। আরপ্রিয়তা মানে ছাত্রেরকাছে শিক্ষককে প্রিয়, ঈপ্সিত বা আনন্দময় হয়ে উঠতে ইহবে (আব্দুল্লাহ আবুসায়ীদ – আমারস্কুল-জীবনেরশিক্ষকেরা)।
এবংআমারই অহঙ্কারের বীজ
যন্ত্রজীবনেমন্ত্রময় এই দিনযাপণশাহআলমস্যারেরসাংস্কৃতিক উদযাপনের উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে জীবন আর দৈনন্দিনতার তীব্র টান শাণিত হয়েছে শিল্পের ছোঁয়ায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক অসাম্য আর অসঙ্গতিতে শাহআলমস্যারসর্বদাই সোচ্চার, নম্রতায়উচ্চকণ্ঠ।লেখনীতেতিনিরৌদ্রেরডানাদিয়ে ঢেকে দেনধর্ম ও সমাজের গ্রহণ।রসবোধ আর রসদের সমাহারে তিনি আবার সততভাসমান। একদিকে শ্বাসত বাংলা আর সর্বজনীন সংস্কৃতির নিরেট উপস্থাপন, অন্যদিকে জীবনের অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয় – এই দ্বিবিধ সংশ্লেষ ও সংযোজনে তিনি রেখেযাচ্ছেন দক্ষতার ছাপ। ঠাট্টা-মশকরার ভঙ্গিতে সজোরে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে তোলেনতিনিআমাদের বিবেকের বোধ, কেননা তাঁর ‘লোনাস্বাদে ফুটে থাকে কান্নার ফুল’ (মোহাম্মদ শাহআলম / ধবল আলোর মায়াবী ডাক)।
অস্তিমান হাওয়ার বাসনায় আমার প্রার্থনা সমূহ
বোধ ও বোধির ‘দীর্ঘকালের সাধনা ও সৃষ্টির প্রবাহ ও সংরক্ষণ’ স্যারেরজীবনকে দিয়েছে পেলব অনন্যতা। গোলাম মুরশিদ তাঁর ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ গ্রন্থের ভূমিকায় বলছেন-“জন্মের সময় আমরা একটি জন্তু হয়ে জন্মাই। কিন্তু সংস্কৃতিই আমাদের মানুষে পরিণত করে। পরিণত করে সামাজিক জীবে। সংস্কৃতি দিয়েই একটা মূল্যবোধ, মন-মানসিকতা, ধ্যান-ধারণার অধিকারী হই। বিদগ্ধ রুচির সুশীল মানুষে পরিণত হই”। “ধর্ম সাধারণ মানুষের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত-মার্জিত লোকের ধর্ম”- মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এই বোধের অভাব আজোআমাদের ভাবিত করে। আজো আমরা দেখি বিশ্বাসের অন্ধ আস্ফালন আর রাজনীতির ন্যাংটো খেলা সংস্কৃতির প্রতিপক্ষ হয়ে বধ করে রোদের বিকাশ।স্যারেরজীবনেরপ্রতিটি পৃষ্ঠায় অঙ্কিত ছবিগুলো যেন কথা বলে যায় শব্দ ও সুরের তালে তালে, স্মৃতিরকানেকানে। প্রতিটি রেখা ও রঙের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে আমাদের অবোধ বিকেল, বিকেলের আকাশে উড়ন্ত ঘুড়ির বিকাশ।অস্তিমানহাওয়ার বাসনায়উত্থিত আজ আমারপ্রার্থনাসমূহ। স্যারেরএইঅমলিনপথচলায়সুস্থতাচাই, চাইদীর্ঘায়ু
‘ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো,
ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!
(আবুল হাসান / ঝিনুক নীরবে সহো)

[লেখক : শাহ আলম স্যারের ছাত্র। লেখক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।]

আমি যার কথা আপনাদের কাছে বলতে চাইছি-তিনি আমার ‘ভগ্নিপতি‘ !
অনেক পদের ‘-পতি‘ থাকেন, যেমন ধরুন-রাষ্ট্রপতি, সভাপতি, কোটিপতি, নৃপতি, ভূপতি, দলপতি, বিচারপতি– ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি মনে করি যত-শত ‘পতি‘ই থাকুক না কেন, ভাইবোনদের কাছে ‘ভগ্নিপতি‘ শব্দটি হচ্ছে সবচেয়ে প্রিয় ও আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ব্যক্তি কতটা জ্ঞানী-গুনী-ধনী-মনি-খনি (!) হলে তাঁর হাতে বোনের হাত মিলিয়ে দেয়া যায়।
তেমনি একজন ব্যক্তি অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহ্ আলম।
জন্ম ১৯৫৫ সাল, রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসর্দার গ্রামে।
গ্রামের নামটি শুনেই বুঝতে পাচ্ছেন (বামন আবার সর্দার), এ ছেলে ঘরে বসে থাকার জন্য জন্মেনি।
কোনরকম গ্রামের স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে-দে দৌড়।
দেশের ছোটবড় সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে, সর্বশেষ রংপুর বেগম রোকেয়া কলেজ থেকে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালন শেষে প্রজাপতির ডানায় ভর করে মুক্তজীবনে উড়ে বেড়ানোর চেষ্টা।
কিন্তু চাইলেই কি বিধাতা সবাইকে সবকিছু দিয়ে দেন !
তাঁর নিজের হাতেগড়া ছাত্র- শুভাকাঙ্খী দের হাতছানি তাঁকে ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। বরং তাঁর ব্যস্ততা আগের চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
রংপুর সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব শেষে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। সাথে আছে স্বরশৈলী আবৃত্তি উপস্থাপন ও বিতর্ক চর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালকের দায়িত্ব।
এছাড়াও রংপুরের যেকোনো শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সবাইকে অনুপ্রাণিত করাও যেন তাঁর কর্তব্যের একটা অংশ হয়ে দাড়িয়েছে।
আমার নিজ চোখে দেখা নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বা সিডনী টাওয়ারের সর্বোচ্চ চূড়ার আলোক রশ্মি আলো ছড়িয়ে শুধু যে নিজের অবস্থান নির্দিষ্ট করে তার নয় সাথে সাথে তাবৎ শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে থাকে।
ঠিক তেমনই আমার ভগ্নিপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহ্ আলম।
তিনিও রংপুর তথা দেশের একজন উজ্জ্বল বাতিঘর।
শিক্ষা-জ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতি- অসাম্প্রদায়িতা-মুক্তচিন্তা-চেতনার এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
মিটমিট করে নয় বরং দাউদাউ করে জ্বলা এক ‘বাতিঘর‘।
যিনি যুগের পর যুগ ধরে নতুন প্রজন্মকে নবদিগন্তের পথ দেখাবে।
আমি এই নির্লোভ-নির্ভিক-চিরতরুণ-প্রচারবিমুখ শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সুস্থ্য ও সুন্দর জীবন কামনা করি।
শুভ জন্মদিন।।
(তাঁর সহধর্মিনী হালিমা খাতুন-আমার বড়বোনের প্রিয় বান্ধবী।
সে সুবাদে উনি আমার ‘ভগ্নিপতি‘! আর সে পরিচয়েই আমার এতবড় ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস!)

[লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, রংপুর মেডিকেল কলেজ, রংপুর।]

“অনুশীলন,অনুশীলন এবং অনুশীলন। নিজেকে তৈরি করার একটাই পথ।”একজনকে বদলাতে এই বাক্যটিই যথেষ্ট। যাঁর মুখনিঃসৃত এই কালজয়ী মন্ত্রটি আমাদের বার বার শুনতে হয়েছে যিনি নিজে অনুশীলন করেন এবং সবাইকে অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি হলেন দীক্ষাগুরু অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহ আলম স্যার।চলনে -বলনে, পঠন- পাঠনে তিনি আপদমস্তক একজন শিক্ষক।শেখানো তাঁর মহান ব্রত।অহর্নিশ ধ্যান, জ্ঞান, ভাব ভাষায় প্রমিত উচ্চারণ,শিক্ষা -সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়ন ইত্যাদির পেছনে ক্লান্তিহীন পথচলা তেজদীপ্ত এই সৈনিকের।বক্তৃতা,উপস্থাপন,আবৃত্তি সব ক্ষেত্রেই তার দুর্দান্ত পদচারণা।সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি সূর্যের মত দীপ্তিমান।নিরহংকারী কেতাদুরস্ত এই মানুষটি আমাদের আদর্শ ও গর্ব।
শিশু বেলাতেই আমরা কথা বলা শিখি।কিন্তু ভাষার দাবি পূরণ করে কতজন কথা বলি?আমরা অনেকে নিজের খেয়ালখুশি মতো ভাষা উচ্চারণ এবং বাড়তি ভাব আনার জন্য বিভিন্ন ভঙ্গিতে কথা বলি।উচ্চারণ একটা শিল্প এবং শুদ্ধবাক ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক।এই শিল্প লালন করতে হলে উচ্চারণ রীতি অনুসরণ করে ধীরে ধীরে রপ্ত করতে হয়।আর এই কাজটি দীর্ঘ বছর থেকে সযতনে লালন করে আসছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান স্বরশৈলী আবৃত্তি, উপস্থাপন ও বিতর্ক চর্চা কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানের নিবেদিত প্রাণভোমরা অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহ আলম। যিনি সুচারুভাবে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।উচ্চারণ শিল্পে ব্রতী মানুষটি মেধা, শ্রম, যোগ্যতা দিয়ে মমতার পালকে আগলে রেখে চলেছেন প্রতিষ্ঠানটিকে।
পাণ্ডিত্য অনেকেরই আছে।কিন্তু কতজন বিলিয়ে দেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে? আমি কাছ থেকে দেখেছি তাঁর মধ্যে শেখানোর তীব্র পিপাসা।আমার মনে হয়েছে শেখানো যেন তার দায়।শিক্ষার্থীর মধ্যে শেখার আগ্রহ তৈরি এবং শেখানো দুটি কাজই করতে দেখেছি সমান্তরালভাবে। উদার চিত্তে লব্ধ জ্ঞান তিনি শেখান আন্তরিকতার সাথে। শিক্ষার্থীর আগেই তাঁর উপস্থিতি যতটা অবাক হয়েছি ঠিক ততটা শিক্ষকতাও শিখেছি। কথা বলাও যে শিল্প এ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হলে বাস্তব সত্যটির সাক্ষাত অন্তত আমার হতো না। করোনাকালে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থমকে দাঁড়ালেও থেমে নেই স্বরশৈলী পরিবার।প্রযুক্তি ব্যবহার করে শেখানো কার্যক্রম তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানো দক্ষ মাঝির মতো।শিক্ষার্থীর মাঝে শেখার আনন্দের বোধটুকু জাগিয়ে তুলছেন এই সুনিপুণ কারিগর।
আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক সবই শিল্প চর্চার অংশ। এসবের সাথে শুদ্ধ উচ্চারণ পূর্ব শর্ত।অবসরে যাওয়া এই অধ্যাপক শিশুকে যেভাবে হাঁটতে, কথা বলতে শেখায় ঠিক তেমনি শব্দে অল্পপ্রাণ- মহাপ্রাণ, ঘোষ- অঘোষ ও নাসিক্য ধ্বনি,র,ড়,ঢ়- স,শ,ষ এবং বিভিন্ন ফলা, অ ধ্বনির সংবৃত – বিবৃত,এ বর্ণের,হ এর যুক্ত ব্যঞ্জনের উচ্চারণ ও মুখভঙ্গি ইত্যাদি শেখান হাতেকলমে।আবৃত্তির ক্ষেত্রে কবিতার ধরণ, রস,ছন্দ,প্রেক্ষাপট সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণাও দিয়ে থাকেন।শব্দযন্ত্রের ব্যবহার,একক কিংবা যৌথ পরিবেশনা এবং উচ্চারণে কণ্ঠের কাজ কিভাবে করতে হয় তাও শেখান এই অধ্যবসায়ী শিল্পী।তাঁর মধ্যে ধৈর্যচ্যুতি কিংবা ক্লান্তি কোনটিই চোখে পড়েনি।শুদ্ধ বাকের জন্য প্রয়োজন বাকযন্ত্রের পরিচর্যা বা ব্যয়াম।ঠিক নিয়মে বাকযন্ত্রের পরিচর্যার মাধ্যমে বাগিশ্বর হতে হয়। এ বিষয়েও সম্যক ধারণা দেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব।
তাঁর মধ্যে রয়েছে অসাধারণ নেতৃত্বের গুণ।উপযুক্ত নেতৃত্বই পারে একটি কর্মসূচীর সফল বাস্তবায়ন।তাঁকে শ্রেণিপাঠে,সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন আয়োজনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখেছি দক্ষতার সাথে।যে কোন সংকট উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।তিনি অত্যন্ত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেই চলেছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা ভূয়সী প্রশংসা করার মতো।
নিরন্তর ছুটে চলা কর্মব্যস্ত সদা হাস্যোজ্জল মানুষটি আকণ্ঠ ডুবে থাকেন কাজের নেশায়। বিভাগীয় শহর রংপুরের প্রায় সব শিল্প-সাহিত্যের অনুষ্ঠানে তাঁর সরব উপস্থিতি লক্ষণীয়।৬৭ বছর বয়সেও তাঁর মধ্যে দেখেছি যৌবনদীপ্ত পৌরুষ। তাঁর চলায় নেই কোন বিরাম চিহ্ন।আসলে তিনি প্রমাণ করেছেন বয়সের সাথে বার্ধক্যের কোন সম্পর্ক নেই।কাজী নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি- যাহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন।” ঠিক এই মহানুভব মানুষটির ভেতর ঝংকৃত হতে থাকে যৌবনের সাইরেন।সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা গুণীব্যক্তি সাহিত্য জগতে ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
তাঁর কোমল পরশে ফুলের পাপড়ির মতো হাজারো আলোকিত মুখ সুবাস ছড়াচ্ছে দেশ ও দেশের বাইরে।এই সৃষ্টিশীল পথিকৃৎ, কর্মবীর এবং বাংলা একাডেমির জীবনসদস্য যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টি ও কর্মের মাধ্যমে। তাঁর ৬৭তম জন্মতারিখে স্বরশৈলী পরিবারের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাই এবং তাঁর পরিবারের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রত্যাশা করি।

[মো. আব্দুছ ছালাম : সহকারী অধ্যাপক, দইখাওয়া আদর্শ কলেজ, ও, সদস্য, স্বরশৈলী পরিবার।]

অধ্যাপক শাহ আলম স্যারের জন্মদিন আজ। একজন শান্ত, স্নিগ্ধ, প্রাজ্ঞাবান, সৃষ্টিমুখর মানুষ। নিয়ত নিরহংকার, শিক্ষার্থী-অন্তপ্রাণ, শাহ আলম স্যার আমাদের। কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেছেন। অবসর গ্রহণ করার পর শাহ আলম স্যারের কর্মমুখরতা যেন ক্রমেই বাড়ছে। রংপুরের সাস্কৃতিক অঙ্গনের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত যে ব্যক্তিটিকে সদা জাগ্রত দেখবেন, তিনিই আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় প্রফেসর শাহ আলম স্যার।
মনে পড়ে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে কারমাইকেল কলেজ ডিবেটিং সোসাইটি‘র(বিতর্ক পরিষদ) জন্মলগ্ন থেকে স্যার আমাদের তত্বাবধায়ক শিক্ষক। আমার বিতর্ক জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কোচ হিসেবে পেয়েছি স্যারকে। স্যারের প্রশিক্ষণের জোরে আমি কারমাইকেল কলেজের জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক দলের দলনেতা হিসেবে ১২ বার নেতৃত্ব দিয়ে ৮ বার শ্রেষ্ঠ বক্তা হবার সৌভাগ্য অর্জন করি।
স্যারের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ মডেল বিতর্ক করি আমারা কারমাইকেল কলেজে বাংলামে । মজার ব্যাপার জাতিসংঘ মডেল বিতর্কে স্যার নিজেও অংশগ্রহণ করেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের ভূমিকায়। আমি চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স হিসেবে বিতর্কটি পরিচালনা করি। ৫৬টি দেশের রাষ্ট্রনেতাগণ যোগ দেন অধিবেশনে। এরপর আতাদল বিতর্ক, সংসদীয় বিতর্ক, রম্য বিতর্ক, আন্তঃবিভাগ, আন্তঃজেলা বিতর্কসহ প্রায় দেড়শতাধিক বিতর্কে নেতৃত্ব দিয়েছি শাহ আলম স্যারের তত্ত্বাবধানে।
আজ স্যারের জন্মদিনে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম ও শুভেচ্ছা। অনেক ভালোবাসা স্যারকে। মহান আল্লাহ সু-স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করুন।

[লেখক; তার্কিক, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি, বিউপি, সম্পাদক, জার্নাল অফ ইএলটি এন্ড এডুকেশন]

আমি আর শাহ আলম পিঠাপিঠি। আমি এসএসসি ১৯৭১ (অনু-৭২) আর ও ১৯৭২ এ। সেই শিশুকাল থেকে আজ অব্দি সময় কাটছে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে।
গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জীবন্ত এক পরিবারে আমাদের জন্ম। দাদার তত্ত্বাবধানে একই টেবিলে একই গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে পড়া লেখার হাতে খড়ি। দাদা হাজী রহমতুল্লাহ ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সংস্কৃতিমনা। দরাজ কণ্ঠস্বরের অধিকারী। পুঁথি পাঠে ও আজান দেয়ার ক্ষেত্রে তার সুনাম বিস্তৃত ছিল গ্রাম ছাড়িয়ে অনেক দূরে। আমার মনে হয় দাদার সে দরাজ কণ্ঠস্বর আলম পেয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে পুথি পাঠের জন্য ডাক পড়তো দাদার। আমাদের এলাকায় দাদা একজন বিখ্যাত মোয়াজ্জিন হয়ে উঠেছিলেন। গ্রাম ছাড়িয়ে অনেকদূর পর্যন্ত মানুষ শুনতেন তার আজানের ধ্বনি। যা ছিল বিস্ময়েরে।
আমার বাবা পালাগান, জারিগান, কবিগান, মহরমের আখড়ার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। আমাদের বাড়িতে ছিল হারমোনিয়াম, কলেরগান, নাটকের মঞ্চ সাজানোর যাবতীয় কাপড়, সরঞ্জাম, রাজা-বাদশার চরিত্র রূপায়নের পোষাক(রয়্যালড্রেস)। আমার মনে আছে আমরা স্কুল জীবন থেকেই একসাথে অনেক নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। আলম খালি গলায় সুন্দর ভাওয়াইয়া গাইতে পারত। কবিতাও আবৃত্তি করতো সুললিত কণ্ঠে। স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনষ্ঠানে ওর আবৃত্তি থাকতই। একবার ‘নন্দলাল’ কবিতা আবৃত্তি করে ও প্রথম স্থান অধিকার করে। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এক দর্শক তাকে একটি রূপার মেডেল দিয়েছিল। সেটা পেয়ে আমাদের কী উচ্ছ্বাস! স্কুলের শিক্ষকগণের সাথে নাটকে অভিনয় করেছি আমরা দুভাই। এমনি করে অনেক আনন্দের সাথে আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই বাংলার প্রতি ওর দুর্বলতা ছিল। দেখতাম উপন্যাস, কবিতা, গল্পের বই সংগ্রহ কর পড়ত। পরে তো বাংলা সাহিত্যেই পড়ালেখা করেছে।
স্কুলে পড়ার সময় একবার ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে এক কবিয়াল এসেছিলেন আমাদের এলাকায়। কী মাতামাতি সে সময়। গ্রামের দুচারজনসহ আমরা দুভাই সে কবিয়ালের সাথে মঞ্চে বসে থেকেছি রাতের পর রাত, সাথে গেছি যেখানে যেখানে তারা গান করতে যান। তবলার পরিবর্তে হাড়ি বাজানোর প্রচলন ছিল তখন। আলম কবিয়ালের গানের সাথে হাড়িও বাজিয়েছে সুন্দর করে।
গ্রামীণ আবহে নানা কর্মধারায় আনন্দমুখরতায় সময়গুলো কেটেছে আমাদের। আমি কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে রংপুর মেডিকেল কলেজে পড়েছি। আলম কারমাইকেল কলেজে এইচএসসি এবং বাংলা অনার্স পাশ করে এমএ পড়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন, অংশগ্রহণ, পত্রিকা প্রকাশ নানা কর্মে যুক্ত থেকেছে। ও পাগলের মতো সাংস্কৃতিক কাজে নিবেদিত থাকতো ছোটবেলা থেকেই। মাঝেমধ্যে পরিবার থেকে বাধা দিতে চেয়েছিÑ কিন্তু ও সামান্যতম সরেনি। পরে আমরা মেনে নিয়েছি, বুঝেছি ওর আনন্দ সাংস্কৃতিক কর্মধারাতেই। আমার সে ছোট ভাইটি এখন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। এক নামেই অসংখ্য মানুষ ওকে চেনে, মন খুলে প্রশংসা করে। আমার কাছে এটা খুবই গৌরবের।
ওর একবার থাইরোয়েড অপারেশন হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন। যে নার্ভটা স্বরযন্ত্রী নিয়ন্ত্রণ করে তা থাইরোয়েড গ্রন্থির ভেতর দিয়ে যায়। অপারেশনের সময় এ নার্ভটিতে ইনজুরি হয়ে স্বরযন্ত্রীর ক্ষতি হতে পারে। একজন ডাক্তার হিেেসবে বিষয়টি আমাকে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। অহর্নিশ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি ওর কণ্ঠের মাধুর্য ও কারুকার্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে। আমি আল্লাহর নামে লিল্লাহ বোর্ডিং এ একটা খাসী কোরবানী দিয়েছি। অশেষ শুকরিয়া আল্লাহ আমার কোরবানী কবুল করেছেন। সবার দোয়ায় ওর কণ্ঠস্বরের কোনো ক্ষতি হয়নি। এখনও ও সুচারুভাবে অব্যাহত রেখেছে যাবতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।
ওর আরমঙ্গলের জন্য কায়মনে সবসময় দোয়া করি, আপনারও দোয়া করবেন এমনটাই কামনা।

[লেখক: প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলমের বড় ভাই, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, সাবেক বিভাগীয় প্রধান (চক্ষু) রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল]

প্রফেসর মোহাম্মদ শাহআলম
সাহিত্যে জগতের এক প্রাণপূরুষ।
মেঘের ডাকে সাড়া দিয়ে রঙধনু থেকে রঙ নিয়ে লিখে গেলে গান,কবিতা, প্রবন্ধ ছড়া।
সামাজিক অগ্রগামিতা,যুগচেতনা, তোমার স্পষ্ট, ভাবনার মহাকালের চিন্তা সমাজকে বদলে দিয়ে একি সুরে বেঁধে এক পথে হেঁটে ফসলের গানে দেশকে ভরে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা।
তুমি সাহিত্যে ভুবনের এক পথিকৃৎ, যুগচিন্তক। পয়ষট্টি বছরে পা দিয়েও ক্লান্তি নেই চোখে। তুমি এক বিস্ময়, দুর্বেধ্যের সীমানা তুলে আলো ছড়াতে ব্যস্ত তুমি।

শুভ জন্মদিন হে শিক্ষাগুরু
জন্মের শুভক্ষণ সমুজ্জ্বল প্রীতিময় হোক
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অর্ঘ্য তোমার চরণতলে-
অগ্রজ অনেক শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সমাজ উন্নয়নে রেখেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। সে পথের দিকে তাকালে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্প্রসারণে আরো একজন নিরলস কর্মীর নাম করতেই হবে তিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু প্রফেসর শাহ আলম স্যার। সদা হাস্যোজ্জ্বল ও বিনয়ী মানুষটি হাজার হাজার শিক্ষার্থীর হৃদেয় সদা ভাস্বর হয়ে আছেন স্বমহিমায়। তারই ফল্গুধারায় বহমান রয়েছে তারই হাতে গড়া কারমইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদ, কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ(কানাসাস)। স্পন্দন, কাকাশিশ, বাঁধন সব সংগঠনই তাঁর কর্মধারায় হয়েছে গতিশীল। আবৃত্তি, উপস্থাপন, প্রমিত উচ্চারণ শেখাতেতিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র। সবাই মিলে গড়েছেন রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ। সংগঠন তৈরিতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। করোনাকালেও তিনি পরিচালনা করছেন সাহিত্য আড্ডা, তবুও কাছাকাছি অনুষ্ঠান। অনলাইনে যোগ দিচ্ছেন জেলা প্রশাসন, টিআইবি, সনাক, বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র, শিল্পধারা, রংপুর অনলাইন স্কুল, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ও সংগঠনের আয়োজনে।
তারই সৃষ্টিশীল আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শানিত হচ্ছে তার্কিক, আবৃত্তিকার, কবি, নাট্যশিল্পীসহ অনেকেই। স্যার একজন উদার পৃষ্ঠপোষক, সুবক্তা, বাগ্মী, চমৎকার আবৃত্তি শিল্পী আবার সুদক্ষ উপস্থাপকও।ব্যক্তি জীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল ও সফল পিতা। সহযোগিতার হাত পরিবারের প্রতি বিস্তৃত। তিনি নিয়মনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে সবার শ্রদ্ধার পাত্র। অধ্যাপক আলীম উদ্দীন স্যার তাঁর জীবনেরই একটি অংশ বলে আমি জানি। কারমাইকেল কলেজ চত্বরে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার বাধা-বিঘœ দূর করতে তিনি ছিলেন দক্ষ ও নির্ভীক মাঝি।
পরম করুণাময়ের কাছে বিনত প্রার্থনা স্যারকে দীর্ঘজীবীকরুন, সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় শাহ আলম স্যারের পথচলা দীর্ঘায়িত হোক।

[লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী (২০০১-০২), বাংলা বিভাগ, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর।]

কারমাইকেল কলেজে বাংলা বিভাগে পড়েছি। আমার আনন্দ আমি শাহ আলম স্যারের ছাত্রী। আজ জীবনের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তা অনেকটা সহজ হয়েছে স্যারের আন্তরিক সহযোগিতায়। তারপরও মনে হয় স্যারের কাছ থেকে আরও অনেক নেবার ছিল। তা হয়ানি জন্যই মনে হয় বাংলা সাহিত্যে পড়াটা অনেকটাই কেমন যেন অগোছালো। স্যারের কাছ থেকে নেবার অনেক সুযোগ হয়েতো ছিল, কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগাইনি। এখন আমিও শিক্ষক। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এমন নানা কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে হয়। এখন মনে পড়ে যদি স্যারের সাহচার্য এখনও পেতাম তা হলে আরও ভালো আয়োজন করতে পারতাম, শিখতে পারতাম, নিজেকে আরও যোগ্য করে উপস্থাপন করতে পারতাম।
তবে এখনও স্যারের কাছ থেকে অনেক কিছুই নেবার চেষ্টা করি। পথচলায় থমকে গেলে আজও দূর থেকেই স্যারের পরামর্শ নিই। স্যারও পরম ধৈর্য নিয়ে সহযোগিতা করেন, পরামর্শ দেন, শেখান। তিনি প্রাজ্ঞ শিক্ষক, বিপুল তার প্রিয়তা। তাঁর বাচনভঙ্গি অসাধারণ, সাংগঠনিক দক্ষতা ঈর্ষণীয়। তাই তো স্যারের আদর্শ অনুসরনের চেষ্টা করি সবসময়। পরম শ্রদ্ধেয় শাহ আলম স্যারের আজ জন্মদিন। শুভ কামনা স্যারের জন্য, পরিবারের জন্য। আল্লাহ তাঁকে সুস্থতার সাথে বাঁচিয়ে রাখুন অনেক অনেক দিন। তারুণ্যের পরিস্ফুটনে পুষ্পিত হোক স্যারের প্রতিটি মুহুর্ত, আর এমন চাওয়া নিরন্তর…।

[লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ, মিরপুর, ঢাকা।]

তাঁকে নিয়ে লিখবো বলে শুরু করলাম চিন্তা। কিন্তু বিপত্তি হলো সেখানে! চিন্তা করে, স্মৃতি হাতড়ে দেখি, কত কাজ একসাথে, কতশত স্মৃতি! দেখি, স্মৃতির ময়ুর ডানায় রঙিন, নরম পালক ভরা। পেখম মেলতেই বিমোহিত হই, কী অপরূপ সাজে সেজে আছে স্মৃতির পালক! চোখ সরানো দায়। কত সময় আমাদের একসাথে চলা! পারিবারিক সুদৃঢ় বন্ধনের কারণেও তিনি আমাদের পরিবারেরই যে একজন। তারপরও মনে হলো, লিখে যাই, দেখা যাক কোথায় গিয়ে ঠেকে, দেখি, কতটুকু’ছোট করে’‘চুম্বক অংশটুকু’ বলা যায়।
বিতর্ক হলো পরিপূর্ণ শিল্প। কী নেই এখানে? বিতর্কের প্রাণ হলো যুক্তি তবে তা হতে হয় সুযুক্তি। তত্ত্ব ও তথ্যের ধারালো অস্ত্রে যুক্তি হয়ে ওঠে অকাট্য, সুযুক্তি। আর আবেগ হলো বিতর্কের শরীর। উপস্থাপন শৈলিতে আবেগ অনেক বড় জায়গা করে থাকে।
প্রখ্যাত বিতার্কিক বিরূপাক্ষ পাল’বিতর্কে আবেগঃ হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন,’বিতর্ক যদি একটি শিল্প হয় কিংবা শৈলী হয়, তাহলে এ কথাও মনে রাখতে হবে পৃথিবীর কোন শিল্প বা শৈলীই আবেগবর্জিত নয়। পৃথিবীর এমন কোন বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি যা আবেগবর্জিত, এমন কোন বিখ্যাত ভাষণ সৃষ্টি হয়নি যার সাথে আবেগের সার্থক মিথস্ক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, এমন কোন উদ্বুদ্ধকরণ ঘটেনি যার গভীরতম আসনে আবেগ উদ্দীপকের ভূমিকায় অধিষ্ঠিত ছিল না। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই আবেগ মানুষের চিরবন্ধু, চিরনর্ভর।’
বিরূ’দার উপরের কথাগুলো খুবই যুক্তিযুক্ত মনে হয়, বিশেষ করে যাঁকে নিয়ে লিখছি তিনি একদিকে যেমন প্রচন্ড আবেগপ্রবণ অন্যদিকে সুযুক্তির ধারালো অস্ত্রে সত্য ও সুন্দর প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করতে শাণিত করে আসছেন আমাদের বিতর্ক অঙ্গন।
অন্যদিকে বিশিষ্ট সাংবাদিক মাহফুজ আনাম বলেছেন,’বিতর্ক কিন্তু শুধু তথ্য ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নয়। এর মধ্যে একধরনের সৌন্দর্য থাকবে। বিতর্কের শব্দচয়ন ও উচ্চারণভঙ্গি সাধারণ বক্তৃতার চেয়ে আলাদা।’
যিনি শিক্ষাগুরু, জ্ঞানের ফেরিওয়ালা হয়ে বিতরন করে গেছেন তাঁর শিক্ষকজীবনে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজসহ বিভিন্ন মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে, যিনি থেমে নেই এখনও সেই তিনিই উচ্চারণ, শব্দচয়ন, বাচনের সৌন্দর্যের ব্যাপারে কতটা যত্নবান ও পারঙ্গম তাঁকে যারা চেনেন বা জানেন সবার জানা, আমার নতুন করে জানানোর কিছু নেই। তিনি নিজেই এই বিষয়ের যোগ্য একজন প্রশিক্ষক তা আর কারও অজানা নয় বা কোথাও অগ্রহণযোগ্যও নন।
১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রিয় বন্ধু আনোয়ারুল ইসলাম রাজু ও দলনেতা প্রয়াত মোঃ রকিবুল হাসান বুলবুলসহ জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কারমাইকেল কলেজের হয়ে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কে অংশগ্রহণ শুরু। এরপর বিতর্ক উদ্যানে তাঁর পথচলা চলতেই থাকলো।
১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ। তখন কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক তিনি। কলেজের কিছু উচ্ছল, বুদ্ধিদীপ্ত, উদ্দমী তরুণ-তরুণীদের উৎসাহ, সাহস, আন্তরিকতা সর্বপরি তত্ত্বাবধানে দিয়ে তাঁর আর এক বন্ধু কারমাইকেল কলেজেরই ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক এ.এইচ.এম আবুয়াল ইসলামসহ সে বছরেরই ২রা অক্টোবর গঠন করলেন’ডিবেটিং সোসাইটি’ যা পরবর্তীতে’বিতর্ক পরিষদ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। শুরু হলো বিতর্ক সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এই যাত্রার অগ্রপথিক হয়ে তখন যেমন ছিলেন তিনি, আজও এতটুকু আন্তরিকতা, ভালবাসা, স্নেহের কমতি নেই এই সংগঠন ও এর সদস্যদের প্রতি। কী পুরনো, কী নতুন সদস্য সবার সাথেই আত্মিক বন্ধন তাঁর তাঁরই আপন করে নেয়া, আন্তরিকতা, ভালবাসা আর প্রচন্ড সাংগঠনিক দক্ষতার ফল। সংগঠক তৈরি করা যায় না, তৈরি হয়। তিনিই দেখিয়ে গেছেন, শিখিয়ে গেছেন আমাদের।
সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সেই কবে থেকে নিবিড় করে যুক্ত আছি পরম শ্রদ্ধায় আর ভালবাসায় এই মানুষটির সাথে। কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়নকালীন কত অনুষ্ঠান আয়োজন ও অংশগ্রহণ করেছি! রংপুরের বিতর্ক, বিতর্ক আন্দোলন, বিতর্ক চর্চা, অনুশীলন আর বিতর্ক সংগঠন হিসেবে আমার প্রাণের সংগঠন’বিতর্ক পরিষদ’ প্রতিষ্ঠার প্রায় শুরু থেকেই পুরোপুরি যুক্ত যে মানুষটির সাথে, সংগঠন পরিচালনা, বিতর্ক চর্চা ও যুক্তিবাদী, মেধা-মননশীল, যোগ্য, উপস্থাপনযোগ্য, আধুনিক চিন্তা, চেতনার মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে তাঁর সাহচর্য ও পরামর্শ পেয়ে আসছি দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত। নানা চড়াই-উৎরাই, আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-না পাওয়া, ভাঙ্গা -গড়া, সুখ-দুঃখ সাথী করে বিতর্ক ও বিতর্ক পরিষদ নিয়েই তিনি কাজ করছেন আমাদের সাথে। যিনি আমাদের তাঁর প্রশস্ত, কোমল, ভালবাসা, স্নেহ, মমতাভরা বুকে আগলে রেখেছেন, পরামর্শ দিয়ে চলেছেন, বিতর্ক, বিতর্ক সংগঠন বিশেষ করে আমাদের সন্তানতুল্য প্রাণের সংগঠন’বিতর্ক পরিষদ’কে নিয়েই যাঁর ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন তাঁকে নিয়ে’ছোট্ট করে’‘চুম্বক অংশ’ লেখা বা সে লেখায় তাঁকে তুলে ধরা কি সম্ভব? তাঁর সাথে কাটানো পুরোটা সময়ই যে আমার জীবনের’চুম্বক অংশ!’
১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দের কথা হবে। পথ চলতে চলতে, নানা টানাপোড়েনে বিতর্ক পরিষদ যখন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছিল, অনুশীলনসহ অন্যান্য কর্মকান্ড যখন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল ঠিক তখনই একদিন বাংলা বিভাগের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি হঠাৎ খুব কষ্টে, আবেগে বলে ফেললেন, “পলাশ, কোন কর্মকান্ডই যখন নেই, তখন এক কাজ করো, বিতর্ক পরিষদ বন্ধ করে দাও।” তখন আমি প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে। তাঁর আবেগ ও কষ্টের প্রতি সম্মান জানিয়ে, আমার সবচেয়ে প্রিয়, ভালবাসার সংগঠন বিতর্ক পরিষদের এমন দুঃসময়ে আমিও খুব আবেগতাড়িত হয়ে বলে ফেললাম, “স্যার, আমাকে ৩ মাস সময় দেন আর আমার জন্য দোয়া করবেন। ৩ মাস পর না হয় সিদ্ধান্ত নেবেন বিতর্ক পরিষদ বন্ধের ব্যাপারে।” তিনি দোয়া করতে, ভালবাসতে, স্নেহ করতে, সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সবসময় সবাইকে সজীব থাকতেও যে একেবারেই কার্পণ্য করেন না তার প্রমাণ হলো, সেই চেয়ে নেয়া ৩ মাস আজও শেষ হয়নি। আজও বিতর্ক পরিষদ স্বমহিমায় উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে চলেছে। আমি আমারটুকু করেছিলাম, করে যাচ্ছি, অন্যরাও তাদেরটুকু করেছে ও করে চলেছে। আত্মবিশ্বাস প্রবল, আগামীতে করে যাবে আরও মেধাবী প্রজন্মের অনেকে। তাইতো আমরা সবাই গর্ব করে বলি ও বলে যাব,’আমাদের বিতর্ক পরিষদ।’ এই’আমি’ থেকে’আমরা’ হওয়ার শিক্ষাটাও ছিল খুব জরুরি। আবেগ ও অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন-সে এক অন্যরকম মুগ্ধতা! ঠিক যেমন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত T.S Eliot ১৯১৯ সালে পৃথিবীকে নড়েচড়ে বসার জন্য লিখেছিলেন, “No poet, no artist of any art, has his complete meaning alone. His significance, his appreciation is the appreciation of his relation to the dead poets and artists. You cannot value him alone…the mature poet acts as a sort of catalyst in terms of how he uses emotion and experience in his poetry.”
তাঁকে নিয়ে বলতে গিয়ে T.S. Eliot কে আরও একবার স্মরণ করি। তিনি লিখেছিলেন, “Innovation and creativity are important, but truly accomplished poets must understand how their works relate to both the present and the past.” নতুন নতুন চিন্তা, যুক্তিবাদী, সমাজ সচেতন, সুস্থ ও সুষ্ঠু চিন্তার আলোকিত মানুষ গঠন, সত্য ও সুন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য ভাল ভাল কাজ করার বিষয়কে তিনি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, বর্তমানকে পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়ে সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করে চলেন। ঠিক যেন ইলিয়টের মানসপটের সেই সাংস্কৃতিক গুণসম্পন্ন, দক্ষ, পরিপূর্ণ কবির মত।
আমাকে নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েও জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমার নাম যুক্ত করাসহ নানা প্রতিযোগিতা ও সাংগঠনিক নানা কর্মকান্ডে আমাকে যুক্ত করে যত চ্যালেঞ্জ তিনি নিয়েছিলেন, খুব ভাল করতে না পারলেও সম্মান রক্ষা করতে পেরেছি বলে এখনও আমাকে নিয়ে যে কোন চ্যালেঞ্জ নিতে তিনি প্রস্তুত, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি নুড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে আর কুঁড়ি ফুটিয়ে ফুটিয়ে হয়েছেন দক্ষ বিতর্ক সংগঠনের জগদ্দল পাথর।
কত রাতজাগা গল্প আমাদের! আনন্দ-বেদনায় বুকে বুক জড়িয়ে কতদিন যে দু’জনের চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে! কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক পরিষদের মত সৃষ্টিশীল, সুশীল, যুক্তিনির্ভর মানুষ গঠনের সংগঠনের গুরুদায়িত্ব যখন আমার কাঁধে, তখন তৎকালীন রংপুরেই শুধু নয় সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম বিতর্ক বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ পত্রিকা’মনীষা’র ২য় সংখ্যার আমি সম্পাদক। এই পত্রিকা প্রকাশে তাঁর নানা পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় রাতদিন ছোটাছুটি, পরিশ্রম করে অবশেষে জন্ম নিলো’মনীষা-২’! সন্তান জন্মদানের মত গর্বিত পিতা হবার আনন্দ ভাগাভাগি করেছি তাঁর সাথে একসাথে।
“পৃথিবীতে সকলের চেয়ে বড়ো জিনিস আমরা যাহা কিছু পাই তাহা বিনামূল্যেই পাইয়া থাকি, তাহার জন্য দরদস্তুর করিতে হয় না। মূল্য চুকাইতে হয় না বলিয়াই জিনিসটা যে কত বড়ো তাহা আমরা সম্পূর্ণ বুঝিতেই পারি না”-রবিঠাকুরের এই কথাগুলো এক্ষেত্রে খুব যথার্থ মনে হয়, মনে হয় তাঁকে নিয়ে আমাদের জন্যই লেখা কিনা..!
যেখানে সব আশা শেষ হয়ে যায়
কিংবা আশাগুলো হয়ে যায় ম্রিয়মাণ,
সেখানে তিনি আমাদের আশার বাতিঘর!
তিনি যে পরম শ্রদ্ধার, ভালবাসার,
আমার, আমাদের প্রিয় মোঃ শাহ আলম স্যার!
সাথে থেকে সিক্ত হই, ঋদ্ধ হই
শুদ্ধ চর্চা, আশায়, ভালবাসায়
ভরে ওঠে মন,
বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে ছিলেন,
আছেন নরম পালক বিছিয়ে
থাকবেনও আজীবন!
৬৫তম জন্মদিনের শুভক্ষণে প্রণতি আমার
সম্ভার হবেন সবার,
শততম জন্মদিনেও থাকবেন এমন
থাকবে শ্রদ্ধা, ভালবাসার জোয়ার!
নতশিরে সে দোয়া করি হাজার বার!

[লেখকঃ সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক, বিতর্ক পরিষদ-সাবেক দলনেতা, জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক দল, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর-অনুষ্ঠান ঘোষক, উপস্থাপক, সংবাদ পাঠক, নাট্যশিল্পী, গীতিকার, পান্ডুলিপি লেখক, ধারাভাষ্যকার, বাংলাদেশ বেতার-মার্কেটিং কনসালটেন্ট।]

জীবন চলার প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন পড়ে কারো না কারো সহযোগিতা। এ সহযোগিতা হতে পারে বন্ধুর মতো সাথে থেকে নিভৃত পথ চলতে সাহায্য করা, হতে পাওে অভিভাবকের মতো সামনে থেকে পথ চিনিয়ে দেয়া, নয়তেবা গুরুজনের মতো ভালো-মন্দেও বিচার কওে সমাধানের পানে এগিয়ে যেতে সহায়তাকরা। নিজের অবস্থান থেকে দাঁড়িয়ে আজ যদি নিজেকেই প্রশ্ন করি এমন কতজনকে জীবনে পেয়েছি? তবে হয় তো বা অনেক নামই আসবে কিন্তু সবার আগে যে নামটি গর্বের সাথে উচ্চারিত হবে তিনি হলেন পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। সেই ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে পরিচিত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি দিন, প্রতিটি চলা, প্রতিটি সিদ্ধান্তে যার উপস্থিতি একান্ত। খুব মনে পড়ে চরম আর্থিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ হবার উপক্রম। স্যারকে সবকিছু জানালাম। স্যার বললেন ভেঙে পড়ো না। উপায় একটা বের হবেই। পরেরদিন টিচার্স রুমে ডেকে নিয়ে বললেন কাল থেকে বাসায় এসো। পরদিন থেকে দায়িত্ব পড়লো স্যারের মেয়ে চেতনাকে পড়ানোর। স্যার এমনি টাকা দিলে আমার কাছে যেনো তা করুণার মনে না হয়, সেজন্য এমন ব্যবস্থা। তার পর যথারীতি আবার পড়ালেখা, চাকরি, আজকের সম্মানজনক অবস্থান। সেদিন স্যারের মানবিক সহায়তা না পেলে জীবনের পথ রুদ্ধ হতে পারতো।
স্যার আমাকে আবৃত্তি শিখিয়েছেন, বিতর্ক পরিষদের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, বেতাওে অনুষ্ঠানের সুযোগ করে দিয়েছেন। ঢাকায় অবস্থান সময়ে সহযোগিতা করেছেন। এমনি অনেক স্মৃতিহৃদয় কোণে জমে আছে শাহ আলম স্যারকে নিয়ে। আল্লাহর কাছে ঐকান্তিক প্রার্থনা স্যারের ভালো কাটুক আগামী দিনগুলো। সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকুন অনেক অনেক দিন। শুভ জন্মদিন স্যার।

কিছু কিছু মানুষ থাকে যাঁরা জাতীয় পর্যায়ের উল্লেখযোগ্যদের কাতারে না থাকলেও তাঁদের চেয়ে কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নন। প্রফেসর মোহাম্মদ শাহআলম বিভাগীয় রংপুর তথা সমগ্র উত্তরাঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে চিরহরিৎ মহীরুহ হয়ে আছেন।
রংপুর কারমাইকেল কলেজের সুুুবিশাল সবুজ অঙ্গনে তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলাম কারমাইকেল নাট্য-সাহিত্য সংসদ (কানাসাস) এর সূত্রে। একজন সৃজনশীল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে যেমন দেখেছি, চিনেছি এবং জেনেছি আবার তাঁর কাছে শিখেছিও অহর্নিশ। একজন শিক্ষিত মানুষের জন্য সংস্কৃতিমনা হওয়াটা জরুরি নয় কিন্তু শুদ্ধ উচ্চারণ তথা পরিশীলিতভাবে কথা বলাটা জরুরি। প্রমিত উচ্চারণ যেমন প্রয়োজন প্রমিত বানানের ব্যবহারটাও বাচন এবং ভাষাশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর এই বিষয়টিই আমরা শিখেছি আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রফেসর শাহআলম স্যারের কাছ থেকে। আমার জানামতে রংপুর অঞ্চলের সংস্কৃতি অঙ্গনের অথবা রংপুরের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পড়াশোনা শেষ করে যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পেশায় জড়িত তাদের একটি বড় অংশ স্যারের সরাসরি ছাত্র অথবা কোন না কোনভাবে তাঁর সাথে সম্পর্কিত।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত শুদ্ধ বাচনিক চর্চাকেন্দ্র ‘স্বরশৈলী আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ রংপুর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ উচ্চারণ চর্চার একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান। তিনি একাধারে শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, আবৃত্তিকার, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক। তিনি একই সাথে বেতার ব্যক্তিত্ব, গীতিকার ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।
তাঁকে দেখেছি একজন উদার ও ক্লান্তিহীন সাদামনের মানুষ হিসেবে সংগঠক হিসেবে। আমরা কারমাইকেল কলেজের বেশ কয়েকটি সংগঠন সৃষ্টিলগ্ন থেকে বছরের পর বছর তাঁর একনিষ্ঠ সহযোগিতায় এবং নির্দেশনায় সারাবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি।
আমার কবি হয়ে ওঠা বা সম্পাদক হয়ে ওঠা অথবা সংগঠক হয়ে ওঠার নিঃসন্দেহে কারিগর তিনি। তাঁর উৎসাহেই আমার ছড়ার পত্রিকা ‘ছড়ুয়া’র যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাঁর হাত ধরেই ছাত্রাবস্থায় রংপুর বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত হতাম। সাহিত্য নিয়ে অবাধ স্বপ্ন দেখতাম।
এমন একজন স্বপ্নের কারিগরের ৬৫ বছরে সবুজ পদার্পণ নতুন করে উৎসাহ জাগায়। আমরা তাঁর স্নেহধন্য ছাত্ররা, শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করি তিনি চির তরুণ। তারুণ্য তাঁকে ছুঁয়ে থাকুক আরো অনেকগুলো বছর।
স্যার, ৬৫তম জন্মদিনে আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

ষাট পেরিয়ে পয়ষট্টিতে এখন শ্রদ্ধেয় স্যার প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। আমার সেই দিনগুলো, যখন আমি ছিলাম কারমাইকেল কলেজের এক উদ্যমী তরুণ, স্যার তখন প্রভাষক; বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটির তরুণ শিক্ষক।কিন্তু তারুণ্য সে তো প্রভাষকে যেমন, প্রফেসর হয়েও কি কমেছে কিছু তাঁর।নাহ্।বরং একই রকম তারুণ্যে উজ্জ্বল তিনি অবসরেও।
পুরানো কিছু কথা মনে করতে চাই, আজ; স্যারের এই পয়ষট্টিতে। যে কথাগুলো স্যারের সেই প্রভাষক সময়ের। যদিও আজ যে তরুণরা স্যারকে পান, তারাও সে সময়ের চেয়ে কোনো অংশেই কম পান না তাঁকে।
পত্রিকা ছাপানো,সাংস্কৃতিক আয়োজন,ত্রাণ,শীতবস্ত্র বিতরণ এ জাতীয় যে কোনো কাজে তাঁকে সহজেই পেয়েছি আমি। কোনোদিন মনে হয় নি তিনি রাশভারী, বদরাগী ধরণের মানুষ।
৯৮ সালে বন্যায় ভাসছে বাংলাদেশ। রংপুর ও এর আশপাশের এলাকাগুলোও তখন এ দুর্যোগের কবলের বাইরে নয়। ছাত্র শিক্ষক সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছু করছে। আমিসহ আমার বন্ধু রংপুর চেম্বারের বর্তমান পরিচালক প্রণয় কুমার বণিক, গ্রামীণ ফোনের জিএম হাসানুর রহমান রাকিব,ডেপুটি সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান শান্ত ,পারভেজ হোসেন, আরিফ ইসলাম, সুমন, অ্যাড. ফিরোজ, তুলিপ,রায়হান,লিখন, পিকেএসএফের পরিচালক নাছের রোজা, আমেরিকা প্রবাসী শাকিল, মলি, মিলা,জুনু, শম্পা, জেসমিন, মনি, মোনাক্কা,ছোটভাই সোহেল,মালেক, চয়ন, রাজিবসহ আরো অনেকে মিলে গড়ে তুলি উদ্যোগ সমাজকর্মী ছাত্র-ছাত্রী সংগঠন। রংপুর শহরের চার থেকে পাঁচটি পাড়ার বাসায় যেয়ে যেয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করি।মনে আছে ১৩ বস্তা চাল, চিড়া, মোমবাতি, ম্যাচ, খাবারস্যালাইন নিয়ে চলে যাই গাইবান্ধা। সেখানের বালাসি ঘাট থেকে নৌকা ছেড়ে চলে যাই গহীন চরে। সারা দিন ত্রাণ দিয়ে ফিরি মাঝ রাতে। উদ্যোগের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমার এ কাজের প্রেরণা ছিলেন সেদিনের প্রভাষক শাহ আলম।
মনে আছে আমাদের সাথে যাবার কথা ছিলো স্যারেরও।কিন্তু ভাবীর গলায় মাছের কাটা বিঁধে যাওয়ায় সেদিন যেতে পারেন নি তিনি।
কিন্তু কি করেন নি তিনি আমাদের জন্য? আমরা রাত ভর শীতবস্ত্র দিব। স্যার ব্যবস্থা করলেন কারমাইকেল কলেজের বাসটি। অধ্যক্ষ আব্দুল হাই স্যারকে সাথে নিয়ে রাতভর থাকলেন আমাদের সাথে।
এরপর আমাদের এসব আয়োজনের সিডি তৈরি করবার জন্য স্যার ও বন্ধু শাকিল সাররাত সময় দিলেন ফিজু ভাইয়ের স্টুডিওতে। যা পরবর্তীতে প্রচার করা হয়েছিলো রংপুরের লোকাল ডিস চ্যানেলে।
এই অনুষ্ঠান করতে যেয়ে আমরা শাহ আলম স্যারের বাসায় শ্যুটিংও করেছিলাম।স্যারের মেয়ে চেতনা আলম আর আমি অভিনয় করেছিলাম।আর সে অনুষ্ঠানটির ভিডিও গ্রাহক ছিলেন ডেপুটি সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান শান্ত এর বাবা মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আফজালুর রহমান।
কারমাইকেল কলেজে উদ্যোগ সমাজকর্মী ছাত্র ছাত্রী সংগঠনের একটি নার্সারী গড়ে তোলার জন্য বাংলামঞ্চের উত্তরে লালবাগ হাট ঘেঁষে দুই বিঘা জমির ব্যবস্থা করে দেন শাহ আলম স্যার।
সংগঠনটিকে নিঃখরচায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনে প্রত্যক্ষ সহায়তা করেন তিনি।
শুধু আমাদের উদ্যোগ সমাজকর্মী ছাত্র-ছাত্রী সংগঠন নয়, বরং পুরো কর্মজীবন নিজের কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মনন গঠনে কাজ করেছেন শাহ আলম। প্রভাষক শাহ আলম থেকে প্রফেসর শাহ আলম এবং অবসরের পর অদ্যাবধীও এ ধরণের সম্পৃক্ততায় কাটছে তাঁর জীবন।কাজ করছেন সাহিত্যাঙ্গনে সাহিত্যিক ও কবি তৈরিতে।কাজ করছেন শুদ্ধ উচ্চারণ আর বাচিক শিল্পের প্রচার প্রসার নিয়ে।প্রকৃততই তিনি থেকেছেন যে কোনো শুভ উদ্যোগের সাথে নিরন্তন।
যখন অন্য শিক্ষকরা সারাদিন ব্যস্ত সময় পার করেছেন ছাত্রদের প্রাইভেট পড়াতে; শাহ আলম স্যার তখন ব্যস্ত ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের সুবোধ আর মনন গঠনে।
এ মানুষটির জন্মের আলো ছড়িয়ে পড়ুক তাঁর সকল ছাত্র-ছাত্রী ও তাঁদের পরিবারে।মানুষটি আরো বাঁচুক সুস্বাস্থ্য নিয়ে; আলো ছড়াক সমাজের আনাচে কানাচে।

[লেখক : সাংবাদিক, ঢাকা।]

যৌবনের গান অভিভাষণে নজরুল খুব চমৎকারভাবে যৌবন আর বার্ধক্যের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। নজরুলের সেই জরা-যৌবনের দারুন এক রুপায়ন দেখেছি স্যারের মাঝে। সাধারণত মানুষ অবসরে গেলে মানসিকভাবে বুড়ো হয়ে যায়। আলসে দিন যাপন, বই পড়া, ইবাদত অথবা নিভৃতচারী হয়ে বাকি জীবন পার করে দেয়। কিন্তু স্যার আলসে দিন যাপনে বিশ্বাসী মানুষ না। তিনি কর্মবীর।
স্যারের সরাসরি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থী হবার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু এ তাতে সৌভাগ্যের বারিধারা কিঞ্চিৎ কম হয়ে যায় নি। এ কথা নিশ্চিত করেই বলতে পারি যে স্যারের শ্রেণিকক্ষের অনেক শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি সান্নিধ্য পাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তা সম্ভব হয়েছে যে সেতু বন্ধনের মাধ্যমে তার নাম “সংস্কৃতি”। আজ স্যারের ৬৫ তম জন্মদিন। বয়সটা বার্ধক্যে নুয়ে পড়ার মতো। কিন্তু তার মাঝে বার্ধক্যের লেশ মাত্র নেই। বরং অবসরে যাবার পর তিনি যেনো নতুন এক জীবন পেয়েছেন। পেশাগত ব্যাস্ততার কারনে যে শৈল্পিক কাজগুলো এতদিন করা হয়ে ওঠেনি সে কাজগুলো করে চলেছেন আপন মনে। তিনি একজন পরিশুদ্ধ সংস্কৃতির ধারক, বাহক ও লালনকারী। তার অনুপ্রেরণায় আমার মতো অনেকেই সাংস্কৃতিক জগতে এসে এক গভীরতর জীবনের সন্ধান পেয়েছেন।
একজন শিক্ষকের বড় গুণ হলো শিক্ষার্থীকে তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর বিশ্বাসের শক্তিতে বেঁধে ফেলা। এই জায়গাতেই শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহ আলম একজন সফল মানুষ। তিনি তার স্নেহ, ভালোবাসা, জ্ঞান, বিশ্বাস আর কাজের মাধ্যমে আমাদেরকে বেঁধেছেন। তিনি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন যেখান থেকে একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর কাছে শুধু অবাক বিস্ময় হয়ে থাকেন। সংগঠন করার এই এক সুবিধা যে স্যারের মতো এমন ঋদ্ধ একজন মানুৃষের স্নেহাশিষ পাওয়া যায়। স্যার এখনো মানসিকভাবে অবসরে যাননি। তাই এখনো অনেক ছেলেমেয়ে স্যারের কাছে সরাসরি আবৃত্তি চর্চার সুযোগ পাচ্ছে। মহীরুহের কাছে সামন্য পাওয়াও অনেক সৌভাগ্যের, আনন্দের। আজ তার ৬৫ তম জন্মদিনে তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আপনি সুস্থ থাকুন। নিরাপদে থাকুন। আপনার আর্শিবাদে আমরাও যেনো এই বৈরী সময়েও শুদ্ধ সংস্কৃতি মনে প্রাণে লালন করতে পারি। শুভ জন্মদিন স্যার।

আমি প্রফেসর শাহ আলম স্যারের একজন ছাত্র। ছাত্রী জীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত (১৯৯৫-২০২১) দীর্ঘ ২৭ বছর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সাথে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি অসারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি একাধারে প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, আবৃত্তি ও বিতর্ক প্রশিক্ষক, উপস্থাপক ও বিশিষ্ট সংগঠক।
মানুষ বেঁচে থাকে কর্মে, সৃজনশীলতায়। শিক্ষক হিসেবে তিনি অসাধারণ প্রেরণাদাতা। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন সামাজিক নানা কর্মধারায়। আমার জানামতে তিনি কারমাইকেল কলেজের অনেক সংগঠনের স্বপ¦দ্রষ্টা, পথপ্রর্দশক। তিনি একাধারে কারমাইকেল কলেজ নাট্য-সাহিত্য সংসদের(কানাসাস) প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক উপদেষ্টা, বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক। এ ছাড়াও কারমাইকেল থিয়েটার, স্পন্দন, বাঁধন ও অন্যান্য সংগঠনের অন্যতম উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংঠনকে তিনি ভালোবাসেন নিজের পরিবারের মতো। সংগঠনের বিপদে, সংকটে সবসময় নিজেকে বিলিয়ে দিতে দেখেছি, এখনও দেখি। তিনি-মেধা মনন, দক্ষতা, সততা, আন্তরিকতা দিয়ে সংগঠনকে সহযোগিতা করেন। আমি হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও এ গুণি শিক্ষকের কাছ থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিখেছি। সংগঠন কেমন করে পারিচালনা করতে হয়, অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করতে হয় সবই শিখিয়েছেন হাতকলমে। তাঁর সুচারু কর্মধারা প্রেরণা হয়ে আজীবন থাকবে আমার মনে গভীরে। তিনি স্বরশৈলী আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক চর্চা কেন্দ্রের পরিচালক, আরও অনেক ভালো কাজের সাথে জড়িত। আমিও তার ভালো কাজগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মঙ্গলধর্মী কাজ করতে চাই। তাঁর আদর্শকে সমুন্নত করতে চাই।
আমি এ গুণি শিক্ষক ও সংগঠকের ৬৭ তম জন্মদিনে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। প্রিয় স্যারের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

[লেখক: সাবেক সভাপতি, কারমাইকেল কলেজ নাট্য-সাহিত্য সংসদ(কানাসাস), জয়েন্ট এক্্িরকিউটিভ ভাসই প্রেসিডেন্ট, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড]

মানব জীবনের মূল্যবান সম্পদ হলো সাংস্কৃতিক বোধ এবং সেই বোধের শুদ্ধতা। সংস্কৃতি মানুষের জীবনে বড় এক বিশ্বাস। কারণ সংস্কৃতিই তার পরিচয়। সমাজের একজন সদস্য হিসেবে মানুষ যে সাংকৃতিক চর্চার মাধ্যমে বেড়ে ওঠে, সেখানেই তার অস্তিত্ব জড়িয়ে থাকে। জীবনকে সুন্দরভাবে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়ার যে প্রেরণা, তাই সংস্কৃতি। সমাজের বুক থেকে আঁধার মিশিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত বিচ্ছুরিত হয় যে আলো, তাই সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিকে ভালোবেসে- বাংলা সাহিত্য চর্চাকে নিত্যসঙ্গী করে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন যিনি, তিনি প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম। রংপুর অঞ্চলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতে এক অপরিহার্য নাম। আমাদের বাতিঘর হিসেবেই তাকে আমরা জানি। তিনি কারমাইকেল কলেজ, রংপুর এর বাংলা বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, উপস্থাপক, আবৃত্তিশিল্পী এবং গীতিকার, দক্ষ সংগঠক। তাঁকে আমি প্রথম দেখি ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে কারমাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদের সাপ্তাহিক অনুশীলনে। আমি নতুন সদস্য হিসেবে বিতর্ক পরিষদে যুক্ত হয়েছি। তিনি বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বিতর্ক, আবৃত্তি, উপস্থাপন বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক পরিষদে তাঁর হাত ধরে অসংখ্য তার্কিক, উপস্থাপক, আবৃত্তিকার তৈরি হয়েছে। তার তত্ত্বাবধানে কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক দল বহুবার টেলিভিশন বিতর্কে অংশ গ্রহণ করেছে। তিনি বহুদিন বিতর্কপরিষদের তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিতর্ক পরিষদের ইতিহাসে যুগযুগ ধরে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলমের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পরবর্তিতে আমি রংপুররের আবৃত্তি সংগঠন স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রে ভর্তি হলে আবার তাঁর সান্নিধ্য পাই। তিনি স্বরশৈলীর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে শুধু আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে তৈরি করার জন্যই কাজ করেন না। বরং তাদেরকে জীবন অনুরাগী এবং সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আবৃত্তি প্রতিষ্ঠানটি রংপুরের আবৃত্তি শেখার অনন্য প্রতিষ্ঠান। এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে আবৃত্তিচর্চায় অগ্রণীভূমিকা পালন করে আসছে। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন যখন মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ ও সাবলিল করেছে, মানুষে মানুষে যোগাযোগকে ত্বরাণি¦ত করেছে, তখন স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রও একধাপ এগিয়ে তার অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি উৎসব, অনুষ্ঠান ও দিবস স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র এখন অনলাইনে উদ্যাপন করছে। এসব কিছুই প্রফেসর মোহাম্ম্দ শাহ আলমের বিপুল উৎসাহ ও নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফসল।
প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ-এর সাবেক সভাপতি, সচেতন নাগরিক কমিটি রংপুর এর সদস্য (টিআইবি), বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি রংপুর-এর চেয়ারম্যান, এমন অনেক সংগঠনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে আসছেন। তিনি বাংলা একাডেমির একজন জীবন সদস্য। তিনি বাংলাদেশ বেতার, রংপুর এ দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য বিষয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা ও আলোচক হিসেবে কাজ করেন। মোদ্দাকথা রংপুর অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জগতে প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলমের বিচরণ অবাধ ও উল্লেখযোগ্য। বয়সের ভার কখনো তার কর্মকে প্রভাবিত করতে পারেনি। বরং বয়সকে ছাপিয়ে তিনি আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন তার সৃষ্টির আলোয়।
এই আলোকিত ব্যক্তিত্বের হাত ধরেই আমার সাংস্কৃতিক জগতে পদার্পণ। তিনি আমার শিক্ষাগুরু, আমাদের আলোকবর্তিকা, আমাদের বাতিঘর। তাঁর হাত ধরেই আমার চেতনার পথকে সচল করে চলছি আজও। বিনয়ী, সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহিত্যপাগল এই মানুষটিকে আজীবন মনে রাখতে চাই। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শকে ধারণ ও লালন করে জীবনের বোধকে আরো পরিশীলিত করতে চাই। কারণ শিক্ষাগ্রহণ, জীবন চর্চা, অভিজ্ঞতা মানুষের বোধকে শুদ্ধ করে। ধীরে ধীরে মানুষ আত্মবিশ^াসী হয়ে উঠে। এই বিশ^াস দিয়েই মানবজাতি যুগযুগ ধরে বুনে যায় জীবনের জয়মাল্য।

[লেখক: আবৃত্তি ও বিতর্ককর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা]

আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় একজন মানুষের কথা বলতে এসেছি। জানি না কীভাবে শুরু করবো! যিনি আমার কাছে দুর্লভ হীরক খণ্ডের চেয়েও মূল্যবান, যার আছে জাজ্বল্যমান তারকারশ্মি সমান সুপ্ত ও বিকশিত প্রতিভা। তাঁকে নিয়ে লেখার সাহসটাই বিশাল মনে হচ্ছে, ভয় লাগছে জানি না স্যার কি ভাববেন! হয়ত আমি আবেগ দিয়ে সবটা প্রকাশ করতে পারবো না। এ প্রিয় মানুষ সম্পর্কে তবুও কিছু লেখার চেষ্টা করছি।
সবার আগে স্যারের জন্মদিনে অনেক অনেক শুভ কামনা ও শুভেচ্ছা। আমার লেখা আমাদের সবার প্রিয় প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম স্যারকে নিয়ে। আমার দেখা একজন বিশাল ধৈর্যবান আর ক্ষমাশীল মানুষ তিনি, যা সবসমই আমার মন ছুঁয়ে যায়। তাঁর কাছে অনেক শেখার আছে, জানার আছে। কীভাবে ছোট হয়েও বড় হওয়া যায়, বিপদে কিংবা হাজার বিরক্তিতেও ধৈর্য নিয়ে চলতে হয়। কী করে হাসিমুখে পথ চলতে হয়, মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে হয়। এ সবই শেখা যায় তাঁর কাছে। স্যার তো আলোর প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন শুধু আমাদের অপেক্ষায়। যারা আলোয় আলোয় আলোকিত হতে চায় তাদের জন্যই অপেক্ষা।
স্যারের আলোয় অনেকেই আলোকিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। স্যারকে আমি বলি একজন জাদুকর। যিনি জাদুর মায়ায় মোহাচ্ছন্ন করে রাখার বিশাল ক্ষমতা রাখেন কথা ও কাজে। তিনি এতটা বন্ধুভাবাপন্ন যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তাঁর হাজার হজার ছোট ছোট গুণের ভাণ্ডারগুলো যেনো জাদুর বাক্্ের সাজিয়ে রাখেন, সে জাদুর বাক্্র খুললেই চারদিকটা আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে শেখা ছোটদের কেমন করে ভালোবাসতে হয়, ক্ষমা করা শিখতে হয়। স্যারের মনটা সত্যিই ভোরের আস্তে আস্তে করে ফোটা স্নিদ্ধ, সুন্দর পুষ্পের মতো। স্যার একাধারে শিক্ষক, অভিভাবক, পিতা, কখনো বন্ধু। স্যার সব মানুষের মাঝে মিশে যান যেমন দরকার। আমি তাঁর একজন শিক্ষার্থী হয়ে নিজেকে অনেক গর্বিত মনে করি। হয় তো ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি জন্যই এমন গুরু পেয়েছি।
স্যার এত মায়া দিয়ে, যত্ন নিয়ে, এত ধৈর্য নিয়ে তার জাদু তথা আবৃত্তি, উপস্থাপন, শুদ্ধ উচ্চারণ, ছন্দ, সুন্দর বাচন ভঙ্গি শেখান যা অবাক করার মতো। যা সাত্যিই অসাধারণ। হয়তো নিজেদের অবহেলায় আমরাই ততটা পারি না তাঁর জাদু যথাযথ গ্রহণ করতে। অথচ স্যারের যত্নের ও আগ্রহের কমতি দেখিনি কোনোদিন। তাঁর কণ্ঠ, বাচনভঙ্গি সত্যিই আল্লাহ প্রদত্ত। মাঝে মাঝে স্যারকে আমার রোবোটিক মানুষ মনে হয়। কী ভাবে, কী করে এত পরিশ্রম করেন! ক্লান্তির ছিটে ফোঁটা দেখিনি কনোদিন, দেখিনি বিরক্তি, দেখিনি কোনো শিক্ষার্থীকে সামান্যতম অবহেলা করতে। সবাইকে দারুণ ভালোবাসেন। স্যারের কাছে আমরা চাওয়ার চেয়ে বেশি স্নেহ, ভরসা পাই।
তাঁর মনটা অনন্ত নীল আকাশের মত স্বচ্ছ, তাঁর পথচলা আর শিক্ষা সবই আদর্শের। আমরা প্রয়াসী যদি ধারণ ও লালন করতে পারি। আমি স্যারকে নামাজ ছাড়তে খুব কম দেখেছি। স্যার অনেক অনেক দিন বেঁচে থাকুন, আপনাকে আমাদের খুব দরকার। প্রভাদীপ্ত শিক্ষক আপনি, নতুন থেকে নতুন, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম আপনার আলোয় আলোকিত হোক, নতুন প্রতিভাগুলো আপনার হাত ধরে জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হোক। মহান স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা আপনার মতো একজন গুরু থাকুন যুগ যুগ ধরে। খু-উ-ব ভালো থাকবেন স্যার।

[লেখক: স্বরশৈলী আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক চর্চা কেন্দ্রের শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী]

প্রফেসর শাহ আলম স্মৃতিবিজড়িত নাম। ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষে কারমাইকেল কলেজে বাংলা বিভাগের ছাত্র হওয়ায় স্যারকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। বাংলা বিভাগের যে কজন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রফেসর শাহ আলম অন্যতম। পড়াতেন নজরুল বিষয়ে, কাজী নজরুল প্রিয় লেখাক হওয়ায় স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বেড়ে যায় আরও। স্যার প্রশিক্ষণ দিতেন আবৃত্তি ও বিতর্ক বিষয়ে। যুক্ত হই আবৃত্তি ও বিতর্ক শিখতে। প্রথমে অভিযাত্রিকে পরে স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সাথে। স্যারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে আবৃত্তি ও বিতর্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। স্মৃতিময় সংগঠন কারমাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদ, যার প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক মোহাম্মদ শাহ আলম স্যার। আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে জ্ঞানার্জন করেছি স্যারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায়। কারমাইকেল কলেজ, বেতার, টেলিভিশন বিতর্ক, আন্তঃজেলা বিতর্ক উৎসব থেকে অর্জন করেছি অনেক জ্ঞান। বিতর্ক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হয়ে লাভ করেছি সাংগঠনিক দক্ষতা। ১৬ তম জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিজয়ী হবার যে গৌরব তা শাহ আলম স্যারের নির্দেশনায়, তাঁরই হাত ধরে। বিতর্ক কেন্দ্রিক পত্রিকা মনীষা-৪ প্রকাশিত হয় আমার সম্পাদনায়, যার প্রধান নির্দেশক শাহ আলম স্যার, সাথে ছিলেন অন্যান্য শিক্ষক আর একঝাঁক তার্কিক।
আমি এখন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক। প্রথম যোগদান করি ব্রাহ্মনবাড়িয়ায়। সেখানে বিতর্ক নিয়ে কাজ শুরু করি শিক্ষার্থীদের নিয়ে, স্কুলের দল অশংগ্রহণ করে জাতীয় টেলিভিশন স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায়। সেখানেও বিজয়ী হবার গৌরব অর্জন করে আমার তত্ত্ববাধানকৃত দল। সে বিতর্কে যিনি দূরে থেকেই যথাযথ নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন প্রিয় শাহ আলম স্যার। ফোনেই নিয়েছি তাঁর নির্দেশনা। জীবন গঠনেও কত যে পরামর্শ পেয়েছি তার শেষ নেই। স্যারের কাছে আমার অশেষ ঋণ। আমার যে কোনো সফলতায় আল্লাহর রহমত, আমার চেষ্টা আর শাহ আলম স্যারের দিক নির্দেশনা আমার সম্বল। আগামীতেও স্যারের সহযোগিতা নিয়ে পথ চলতে চাই। আল্লাহ স্যারের দীর্ঘ জীবন দান করুন এমন প্রার্থনা। শুভ জন্মদিন স্যার।

[লেখক: তার্কিক, সিনিয়র শিক্ষক, নৃপেন্দ্র নারায়ণ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়]

একজন বন্ধুসুলভ লেখক, বাচিকশিল্পী, নির্লোভ-সদালাপী-মিষ্টভাষী মানুষ প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম।তাকে কেবল পুরস্কৃত করা যায়। ভালোবাসা যায়। শ্রদ্ধা করা যায়।একজন সু-শিক্ষক হিসেবে তার খ্যাতি ঈর্শ্বণীয়। তার সাথে আমার সখ্যতা সাহিত্যাঙ্গনে। সাহিত্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ শাখায় তিনি বিচরণ করছেন। তার
তার বাবা মোঃ আছিম উদ্দিন, মা ফছিমন নেছা। ছাত্র জীবন থেকেই তার লেখা-লিখির সূচনা। তিনি শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, উপস্থাপক, আবৃত্তিকার, বেতার ব্যক্তিত্ব। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, লিমেরিক, বেতার নাটক, গান লিখে চলেছেন নিয়মিত। তার লেখা প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা’, কাব্যগ্রন্থ-‘ধবল আলোর মায়াবী ডাক’, যৌথ কাব্যগ্রন্থ- ‘সাহসী নিসর্গ,’ যৌথ ছড়াগ্রন্থ ‘ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন’, গবেষণাগ্রন্থ- ‘ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চা’, ‘ভাওয়াইয়া (যৌথ)’। সাপ্তাহিক মহাকাল, দৈনিক দাবানল পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন দীর্ঘদিন।
তিনি বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য, রংপুরের ‘স্বরশৈলী’ আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের পরিচালক, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ-এর উপদেষ্টা, কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত¡াবাধায়ক শিক্ষক, কানাসাস এর প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক উপদেষ্টা, ‘বাঁধন’ এর উপদেষ্টা। এছাড়াও রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি হিসেবে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফিরেদেখা সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম।
সাহিত্যে অবদানের জন্য প্রাপ্তি-১৯৯৫ এ রংপুর থেকে নাগরিক পদক, বাংলাদেশ কবিতা পরিষদ পাবনার সাহিত্য পদক-১৪০৮, সোনার তরী সাহিত্য পদক, ঈশ্বরদীর অরুণিমা সাহিত্য পদক, আইডিয়া প্রকাশন সেরা পাÐুলিপি পদক-২০১৭, ফিরেদেখা পদকসহ আরও পদক লাভ করেন। তিনি কারমাইকেল কলেজের বাংলা বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক, বেগম রোকেয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান। তাঁর জন্ম-১৯৫৫ খ্রি. ৬ জুলাই, রংপুরের পীরগাছা উপজেলার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসরদার গ্রামে। তিনি পঞ্চানন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি, অন্নদানগর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, কারামাইকেল কলেজ থেকে বাংলায় সম্মান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির বাগানে সুবাসিত ফুল ফোটাতেই তাঁর প্রত্যয়ী পথচলা।

[লেখক: প্রকাশক ও সম্পাদক, আইডিয়া প্রকাশন]

প্রাঞ্জল ভাষায় মাইক্রোফোন শাসন করবার মুন্সিয়ানা দেখান প্রফেসর মোহাম্মদ শাহ আলম স্যার।
শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সংগঠক সহ নানা বিশ্লেষণে দীর্ঘ হয়ে যায় তার নামের পরের অংশটুকু। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি যেমনটা স্বাচ্ছন্দ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন ঠিক তেমনটাই শঙ্কিত হয়ে পড়ে আলোচনায় অংশ নেয়া শ্রোতাবৃন্দ।
তরুণদের খোঁজ নিতে প্রায়শই স্যার ফোন দিয়ে কথা বলেন। আমি প্রতিবার একটি কথাই বারবার বলি, স্যার সাবধানে থাকবেন। কারণ স্যারকে আমরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমাদের অভিভাবক হিসেবে চাই।
সাহিত্য নিয়ে স্যারের কাছে আরো বেশী আলোচনা শুনতে চাই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের সাথে সাথে বর্তমান সময়ের কিংবা নব্বই পরবর্তী লেখকদের আলোচনা শুনতে চাই। কবিতার ছন্দ, রস, উপমা অলংকার নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা চাই। তরুণদের নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ শুরু হোক।
আশা করি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাহিত্য অঙ্গনে বিচরণরত অবস্থায় আপনাকে পাবো। সংগঠন এর বলয় ভেঙে আপনি সবার মাঝে বিচরণ করুণ এটাই কামনা করি।
সুস্থ থাকুন সবসময়, দীর্ঘজীবী হোন।
শুভ জন্মদিন স্যার…

সাল ২০১৫। মাসটাছিল ফেব্রæয়ারি। কোন এক শুক্রবারসকাল ১০টা ১৫ মিনিট। বাসা থেকে বের হয়ে আমার আবৃত্তি স্কুল স্বরশৈলী আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রে উপস্থিত হলাম। আর সেখানেই আমার প্রথম দেখা শাহ আলম স্যারের সাথে। আগেও দেখেছি তবে আবৃত্তির শিক্ষক হিসেবে প্রথম দেখা। তখন আমি ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ি। এখন নবম।
শাহ আলম স্যার আমাদেও প্রথম ক্লাশটি নিলেন। আমি ও অন্যরা শুনলাম মুগ্ধ হয়ে। আমার কেবল মনে হয়েছে মানুষ এত সুন্দও করে কীভাবে কথা বলতে পারে? আমার এখনও বেশ মনে আছে স্যার ঐদিন আমাদের আসাদ চৌধুরীর ফুগুন এলেই কবিতার আবৃত্তি শিখিয়ে ছিলেন। ঐ দিনটা আমার জীবনে অন্যতম স্মরণীয় দিন। সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত স্যারের কাছে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এখনও শিখে চলেছি। এখনও আমার যদি কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হয় বা প্রতিযোগিতায় যেতে হয় তাহলে স্যার শত ব্যস্ততায় ও আমাকে শিখিয়ে দেন। আমি মোবাইলেও স্যার এর কছে আবৃত্তি, শুদ্ধ উচ্চারণ শিখি। শাহ আলম স্যারের ছাত্র হিসেবে আমি গর্ববোধ করি।
আমরা কোনো অনুষ্ঠান রিহার্সেল সময়ে স্যারের সাথে আনন্দময় ভালো সময় কাটাই। প্রতিবছর আমরা স্যারের জন্মদিন স্বরশৈলীতে পালন করি। কিন্তু এ বছর করোনার জন্য পালন করা হলো না। তাই বাসা থেকেই স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাই। শুভ জন্মদিন স্যার। আপনি শতায়ু হন।

অন্য ভাইবোনের চেয়ে মাকে অনেকখানিই বেশি কাছে পেয়েছেন। সেই ১৯৫৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মা ছেলের ঠিকানা সব সময় একসাথেই ছিল। দেশের নাম পাল্টেছে ( ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে), পাল্টেছে কত ইাতহাস, মা-ছেলের জীবনেও গেছে অনেক চড়াই-উুড়াই কিন্তু তাদের ঠিকানা ছিল একসাথেই তা যেখানেই হোক। কখনো বামন সর্দার, কখনো চশবাজার আবার কখনো কামার পাড়া। বলছিলাম আমাদের বাবা প্রফেসর মো. শাহ আলম এবং তার মা ফসিমননেসার কথা। আমরা জন্ম থেকেই তাদের একসাথে দেখেছি এবং শুনেছি সারাজীবনই তারা একসাথেই ছিল। মায়ের সান্নিধ্য বেশি পেয়েছে বলেই কিনা জানিনা বাবা বাবা হয়েও খানিকটা ছেলেমানুষ থেকে গেছে। বেশ অভিমানী। একটুতেই মুখ ভার, মন খারাপ। মায়ের আদরের ছেলে বলে কথা। আমরা দাদির কাছে অভিযোগ করতাম, তোমার ছেলে কিচ্ছু পারেনা, কিচ্ছু বোঝেনা, কান্ড দেখলে মনে হয় এখনো ছোটই আছে। দাদি কিছু বলতো না, শুধু হাসতো। সংসার-সন্তানে বাবার তেমন মনযোগ না থাকলেও মায়ের ব্যাপারে ছিল শতভাগ প্রচেষ্টা। সারাজীবনের সঙ্গী মা চির বিদায় নিয়েছেন ছেলের বাড়ি থেকেই। এবং এই প্রথম আলাদা হয়েছে মা-ছেলের ঠিকানা। মা শায়িত আছেন তাদের আদি ঠিকানা বামন সর্দারে। এর ঠিক পাঁচ মাস আগেই হারিয়েছেন বাবাকে। অল্প সময়ের ব্যবধানে শোক এবং শূণ্যতায় ভরে গেছে পৃথিবী। মা-ববাকে হারিয়ে আমাদের ছেলেমানুষ অভিমানী বাবাটি যেন আরো ছেলেমানুষ হয়ে গেছে। বাবা-মা হারানোর কষ্ট অন্যকিছুতেই পূরণীয় নয় জানি। তাই সে চেষ্টাও করিনা। বাবার জন্মদিনে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু এটুকু প্রার্থনা সব শোক ভুলে ছেলেমানুষ হয়েই যুগযুগ বেঁচে থাকুক বাবা, তার কর্ম ছড়িয়ে পড়–ক পৃথিবীব্যাপী। সকল শুভানুধ্যায়ীর কাছে প্রত্যাশা অতীতের মত সামনের দিনগুলোতেও আপনাদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় ভরিয়ে রাখবেন আমাদের বাবার জীবন। শুভ কামনা সবার জন্য।
শুভ জন্মদিন, বাবা।

‘তারুণ্যের আকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা, কে দেবে আশা কে দেবে ভরসা’। -পরিচিত একজন যাত্রার ঢঙ-এ কথাগুলো বলছিলেন। তাকে – বললাম তরুণদের নিয়ে আমাদের গর্বের দিন কী শেষ হতে বসেছে? উত্তরটা যেনো তৈরিই ছিল। বললেন – কেন আপনি কিছু দেখেন না। জঙ্গীবাদ থেকে ইভটিজিং কোথায় নেই তরুণরা। একমত হতে পারলাম না তার সাথে। উত্তর দিলাম- বিশেষ খন্ডিত একটা সময়ের হিসেবে পুরো তারুণ্যকে বিচার করা সঙ্গত নয়। কারণ আমাদের ইতিহাসতো তরুণদের সাহসী কর্মের ইতিহাস। দেশমাতৃকার মুক্তি,ভাষার মুক্তি, যে কোনো সংকট- কোথায় নেই তরুণদের অবদান?
এমনটা বলবার পরে নিজেও ভেবেছি- তরুণদের কর্মধারা আরও মানবিক, আরও গ্রহণযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা হচ্ছে না। সেজন্যই সমাজজুড়ে নানা বিতর্ক। জনে জনে , ঘরে ঘরে তো বোঝানো যাবে না তরুণদের ইতিবাচক কর্মধারার কথা। বর্তমান যা দেখায় তাতেই সবাই গুরুত্ব দিতে চায়। তারপরও অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে তারুণ্যের স্পন্দনের বিপক্ষে দাঁড়াবার সময় আসেনি এখনও।
তারুণ্যে প্রবল বিশ্বস রেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এঁর প্রত্যয়ী আহ্বান-
‘ওরে নবীন,ওরে আমার কাঁচা
ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ
আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’
চির তারুণ্য-ধারক কাজী নজরুল ইসলাম এর বোধ-
‘তারুণ্য দেখিয়াছি আরবের বেদুঈনদের মাঝে, তারুণ্য দেখিয়াছি মহাসমরের সৈনিকের মুখে, কালা-পাহাড়ের অসিতে, কামাল-করিম-মুসেলিনি-সানইয়াৎ-লেলিনের শক্তিতে।’
তরুণরাই জাতির অগ্রগামী শক্তি, বিপ্লবে-সংগ্রমে সাহসী যাত্রী। তারা প্রাণপ্রাযুর্যে ভরপুর। জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক তরুণরাই। আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় তরুণদের জীবনজয়ী সংগ্রামের ফসল। এখনও নানা আবিষ্কার, মানবিক কল্যাণে তরুণরাই সাহসী শক্তি। অতীতেরও নির্মাতা তারা। মেসিডিনিয়ার রাজা আলেকজান্ডার মাত্র তেইশ বছর বয়সে জয় করেন পৃথিবীর অর্ধেক অংশ। সম্রাট আকবর দিল্লির সিংহাসনে বসেন মাত্র তের বছর বয়সে। তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রয়োগ সূচনা মাত্র উনিশ বছর বয়সে। নবী হযরত মুহম্মদ (সা.)এর বয়স যখন বিশের কোঠায় তখন গঠন করেন হিলফুল ফুজুল নামে সংগঠন। যার মাধ্যমে বিবাদমান আরব গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। লিড ট্রটস্কি আটত্রিশ বছর বয়সে পিটাসবার্গে প্রথম সামাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে রাখেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। কিউবার বিপ্লব সময়ে সাহসী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর বয়স ছিল বত্রিশ। তাঁর অন্যতম সহযোগী চে গুয়েভারা তখন তিরিশ বছরের। তেইশ বছর বয়সে মুয়াম্মার গাদ্দাফী লিবিয়ার রাজতন্ত্র উচ্ছেদ আদিম যাযাবর সমাজের আমুল পরিবর্তন এনেছিলেন বেগম রোকেয়া নারীর অধিকার আদায়ে ও শিক্ষা বিস্তারে কাজে লাগিয়েছেন তারুণ্যকে। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলের ছাত্র হয়ে তখনকার মুখ্যমন্ত্রির কাছে বিদ্যালয় সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় কর্মচারীদের দাবি আদায়ে সাহসী আন্দোলন চালিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনকালে জেলে থেকেও প্রেরণা যুগিয়েছিলেন সংগ্রামীদের। অবশেষে তাঁর তারুণ্যদীপ্ত নেতৃত্বে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। অগণিত তরুণ অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে উড়িয়েছে স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা। শামসুর রাহমান এর বলিষ্ঠ উচ্চারণ-
‘আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে-’
সংকট হলো আমাদের তরুণরা এখনও ঐকশেকলে বাঁধা নয়। নানা বিভেদে বিচ্ছিন্ন। স্বাধীনতা সংগ্রাম সময়েও তরুণদের একটা অংশ স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষে কাজ করেছে। তাদের জন্য ভাঙন এসেছে তারুণ্যে। সহযোগিতা থেকে বিরত থেকে তরুণদের একটা অংশ দখলদার পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সহায়তা দিয়েছে। তাদের জন্য দেশ ও মানুষের ক্ষতি বেড়েছে অনেকগুণ। গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের বিপুল ঘটনা তাদের সহায়ততেই ঘটেছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখনও তরুণদের মধ্যে বিভাজনের প্রাচীর ভেঙে পড়েনি। সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সহায়ক তরুণরা এখন জঙ্গীবাদের সাথে সম্পৃক্ত। চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে তারাই ঘনীভূত করছে সংকট।
কিছু তরুণ বিপথগামী তার কারণ বহুবিধ। বাবা-মা সন্তানদের যথাযথ তত্বাবধান করছেন না। দেশী-বিদেশী অপশক্তি সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়াতে ধর্মের অপব্যাখা করে তরুণদের বিভ্রান্ত করছে। তরুণরা মাদকসহ নানা নেশায় পথ হারাচ্ছে। রাজনীতির শুদ্ধপথ থেকে চ্যুত হয়ে লাভের আশায় বেছে নিচ্ছে ভিন্ন পথ। সাইবার অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে তরুণরা। সঙ্গদোষে অপসংস্কৃতি গ্রাস করছে তাদের। বেকারত্ব ভোগাচ্ছে চরম হাতাশায়। বিপুল অর্থের আশায় সুস্থ চিন্তার গণ্ডিতে বসবাস করছে না তারা। জ্ঞানের পথেও তাদের বিচরণ কমে আসছে। অনেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে অন্যের ক্রীড়ানক হিসেবে।
তারুণ্য শক্তির এমন চিত্রই তো শেষ কথা নয়। বিপরীত চিত্রও তো আছে। রানাপ্লাজায় দুর্ঘটনা কবলিত মানুষকে উদ্ধারে সামিল ছিল অনেক তরুণ। বন্যায় সাহয্যের হাত বাড়ায় তরুণরাই। ওরা শহীদ মিনারের যত্ন করে, বধ্যভূমি সংরক্ষণে কাজ করে,অন্ধদের রাস্তা পারাপারে সহায়তার হাত বাড়ায়, টর্নেডো, সিডোরে নিজের জীবন বিপন্ন করেও মানুষের জীবনে আলো সঞ্চার করে। আত্মকর্ম সংস্থানেও এগিয়ে আমাদের তরুণরা। অধিকাংশ খামারে তারা মোধা ও শ্রম দেয় দিনান্ত।শ্রম নির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি তরুণরা মেধা ও প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করছে। তথ্য ও প্রয্ুিক্ত তরুণদের সম্পদের পরিণত করবে এমন আশায় বাংলাদেশের মানুষের অপেক্ষা এখন।
কাজেই শঙ্কার শিহরিত অঙ্গন থেকে বেরিয়ে মুক্ত তারুণ্যের বিকাশে সহায়তা দিতে হবে সবাইকে। এ দায় শুধু রাষ্ট্র একা বহন করতে পারবে না। সামাজিক বিভিন্ন সংস্থা, প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ,গণমাধ্যম, পরিবারের সদস্য সবার ঐকান্তিক উদ্যোগ ও সহযোগিতা এজন্য বিশেষ জরুরী। বিপথগামী তরুণদের আত্মঘাতী নিষ্ঠুর পথ থেকে কর্মময় সৃজনশীল পথে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা সময়ের দাবী। তরুণদের মনোলোকে চেতনার উদ্ভাস জাগাতে হবে- দেশ, মা, মাতৃভূমি তাদের। দেশের কল্যণে তাদেরকেই নিবেদিত থাকতে হবেত। মানুষ খুন, মন্দকর্মে, জঙ্গিবাদে ইহ ও পালৌকিক মুক্তি মেলে না কখনও। এমন চ্ন্তিায় পরিহার করতে হবে সন্ত্রাসী, জঙ্গী সংস্পর্শ। তবেই ঘৃণার বদলে মিলবে সম্মান। হিমঘরে ভালোবাসার স্পর্শহীনতায় পড়ে থাকতে হবে না।
যে তারুণ্য স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াই করেছে- তাদের উত্তরসুরী তরুণরা বিপথগামী হবে কেন? তারা তো মননে, শক্তিতে, সামর্থ্যে এবং ভাবনায় প্রগিতিশীল। তারা তো ভাষা প্রতিযোগের গর্বিত প্রতিযোগী, গণিত অলিম্পিয়ার্ডের বুদ্ধিদীপ্ত অংশগ্রহণকারী, দেশ-বিদেশে মর্যদাবান। শীতের থাবায় কম্পিত অসহায় মানুষের পাশেতো তারা সজীব শক্তি। যা কিছু ভালো তার সাথেই তাদের নিবিড় যুক্ততা। তরুণরাই তো প্রকৃত বন্ধু, ওরাই তো জাতির গর্বিত সন্তান। এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদী, যৌতুক, বাল্য বিয়ে বন্ধে নিরন্তর শ্রমীতো যুবকরাই। তা হলে তারা কেনো ভীতিকর কাজের সাথে থাকবে? কেন সংকীর্ণ স্বার্থে মানুষ খুন করবে? কেন মা-বাবাকে জাতির কছে হেয় প্রতিপন্ন করবে? কেন দেশের উন্নয়নের গতি স্তব্ধ করতে সহাযক হবে। এ পথ তো তাদের হতে পারে না।
করোনাকালেও তরুণদের মাধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে অস্থিরতা। অনেক তরুণ করোনা আক্রান্তদের আন্তরিক সহযোগিতা করছে। হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে, অভাবে আর্থিক ও খাদ্য সহযোগিতা দিচ্ছে। সবাই এমন হলে কথা ছিল না। অনেক তরুণ মাদকের নেশায় হারাচ্ছে ভবিষ্যৎ। মোবাইলে ও অন্যান্য মাধ্যমে মন্দ গেম খেলে, অড্ডা দিয়ে, সঙ্গদোষে ক্ষতি করছে মেধা ও মননের। পারিবারে তারা কোনো কাজে আসছে না, বরং জন্ম দিচ্ছে ভয়াবহ সংকটের । শিক্ষা প্রুিতষ্ঠান বন্ধ, তাই অনেকে লেখা-পড়ার ভুবন থেকে বিদায় নিয়ে অপকর্মে নিজেদের ভাসিয়ে দিচ্ছে। তরুণদের সচেতন হতে হবে। করোনা সময়ে দেশ ও দেশের মানুষের তথা পরিবার ও নিজের কল্যাণের কথা ভেবে সুস্থ চিন্তা ও উদারতা নিয়ে কল্যাণী কর্মে যুক্ত রাখতে হবে নিজেদের। ভাবতে হবে সমৃদ্ধ ও সুন্দর ভবিষ্যতের কথা। তা হলে তরুণরা হবে মর্যাদাবান, করোনা মোকবেলায় তাদের অবদান হবে সুদূরপ্রসারী।
জনসংখ্যার কাঠামো বিচারে অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের তুরুণরা সংখ্যায় বেশি। এখন দরকার কর্মে অগ্রগামীতা। সৃজনশীল কাজে পারদর্শিতা অর্জন করে আপন আপন সক্ষমতাকে প্রকাশ করতে হবে। সৎ, নিষ্ঠাবান, প্রত্যয়ী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে নিজেদেরকেই। নৈতিকতা জাগরণমূলক লেখা পাঠ করতে হবে। ইতিহাসের সঠিক পাতায় রাখতে হবে চোখ । এক সাগর রক্ত ঝরিয়ে প্রাপ্ত যে স্বাধীনতা, যে দেশ, তাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত করার দায় তরুণদের। এ চিন্তা থেকে এখন বাধা-বিঘ্ন ডিঙিয়ে ইতিবাচক কর্মের ভুবনে নিবেদিত থাকতে হবে। কবি কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’র প্রত্যাশা পূরণ করার মধ্যেই খুঁজতে হবে স্বস্তি-
‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হ’য়ে কাজে বড় হবে।
..বিপদ আসিলে কাছে , হও আগুয়ান
নাই কি শরীরে তব রক্ত,মাংস,প্রাণ ?’

১. জীবনের নতুন দৃশ্যপট

গন্তেব্যর সব পথ রুদ্ধ করে বসে আছি
সিঁদুরে সূর্যের শরীর পরখ করি না আর
দুপুরের শুভ্রুতায় মোহহীন থাকি
সাঁঝের আঁচলে দেখি প্রতিচ্ছবিহীন আঁধার ।
এতদিনে মনের কপাটে লেগেছে অর্গল-
রূপহীন, কায়াহীন অন্য এক অস্তিত্ব
মগজ জুড়ে নিয়ত বিলি কাটে
বার বার আমন্ত্রণ জানায় ঘুমের শয্যায়।
ধার করা হাসিতে বেয়নেটের খোঁচা
স্বজন খুঁজে ফিরি দৃষ্টিসীমায়
পৃথিবীর মলাট জুড়ে মৃত্যু-রঙের ফেয়ারা
কুটিল ইচ্ছের পরাগ তবু ছড়ায় দেদার।
জানালা খুলে রাখি ঘরের, মনের
তরতাজা স্বপ্নের ঢেউ ভিজিয়ে দেবে
কায়াহীন ঘাতকের জ্বলন্ত শিখা ।
নির্বাসনের দীর্ঘশ্বাসে ভেঙে যাবে উদ্ধত বাহু
অপেক্ষা, অর্গল খুলে রঙের বাধ্য অনুচর হয়ে
মসলিনে আঁকবো জীবনের নতুন দৃশ্যপট।
(১৪.৭.২০২০)

২. পরাশ্রিত লতাগুল্ম

মুগ্ধতা এমন ছুটির ঘন্টা বাজাবে ভবিনি।
বেলোয়াড়ি চুড়ি, লাল ফিতা, আলতা, আয়না
সব ছেড়ে মুগ্ধতার খোঁজে প্রজাপতি-মন
উর্ধগামী আশার বালিশে ঘুম-পরীর মায়াবী হাত।
বৃষ্টির আলিঙ্গনে পলল শরীরের ঘুম ভাঙে
সমৃদ্ধির ঝর্ণায় অবিরত স্বস্তির স্বাদ নেবার আকুলতা-
ভালোবাসা, সেও নিয়ত হেঁটে যায় কোন অজানায়।
ক্লান্ত রাতের স্বপ্ন শেষে আমিত্বের রঙচটা জীবনে
মেঠো পথের মতো চিকন বৈভব হাঁক দেয়-
‘আমাকে বাঁচাও স্বপ্ন-বিলাসী হায়েনার নখর থেকে।’
প্রপিতামহ লঠির ভর-শক্তিতে বিরক্তির আওয়াজ তোলে-
‘যত্তসব হন্তারক, সাজানো বাগানের নষ্ট মালি।’
লঙ্কা-নুনের থালায় নিত্য দশ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত
আত্মত্যাগের শুষ্ক বীজতলা বিষণ্নতায় কাঁদে-
মৃত্যুর সনদে মেলে বৈভবের ঝাড়বাতি-আকাশ।
এই আমরাই, নৈতিকতার কফিন বয়ে বেড়াই
হাঙরের ব্যাদান মুখে পুরে রাখি বিশ্বের সুখ-সঞ্চয়
ঘরে ফিরে সুখের ক্ষয়িত নক্ষত্র আগলে রাখতে
প্রতিদিন হয়ে যাই পরাশ্রিত লতাগুল্ম !
(১৫.৭.২০২০)

৩. দাহ নয় রঙিন ফোয়ারা

সন্দেহের ঘুনপোকার দাপটে কখনে কখনো ভুলে যাই আমিও মানুষ
অবয়ব জুড়ে মানুষের পুরোটা আদল, তবুও শঙ্কার মেজাজ কমে না!
অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, একা এবং আমি একা
আমার তীক্ষè নজর আমারই দিকে, যে আমি নিজেকে দেখি-
আয়নায় নিখুঁত দৃষ্টি রেখে নিশ্চিন্ত হই, এতো মানুষেরই অবয়ব।
আমার চোখের গোলক দুটো অন্ধ নয়, দৃষ্টি জুড়ে বিপুল আলোর সম্ভার
তাহলে অনিষ্টকারী সরিসৃপদের বিচ্ছুরণ চোখে খেলে না কেন?
আয়নার নিজেকে দেখে টের পাই মানুষের অবয়বে অস্তিত্বমান-
কিন্তু বীরত্বের শিখা নিবু নিবু, সাহস স্পন্দিত নয় মোটেও
কোলে নিশ্চল শুয়ে থাকে সচল হাত, কর্তব্যের সকালে
সিদ্ধান্তহীনতার চাদরে নীরব দর্শক আমি একজন।
প্রেতদের আস্তানায় আমি নির্জীব, বেজে যায় বেসুরো বাঁশি
নিত্য ভোল পাল্টানো চোখের আগুনে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হই
তখনো আমাকে মানুষ ভাবার কলি ফুটতে থাকে একে একে
আয়নায় প্রতিবিম্ব বলে দেয়, আমি মানুষ এবং নিশ্চিত মানুষ-
কল্যাণের, প্রেমের, দ্রোহের, সৌন্দর্যের ছায়াঘন বোধিবৃক্ষ
আমার মনে জন্মায় না কেন, মুখোশ উন্মোচনে কেনো দ্বিধার পাহাড়?
এত এত কান্না, বেহিসেবী অশ্রুপাত, সুবিশাল প্রতারণা, কল্পনার কৃত্রিম রঙ
কাচের চুড়ির মতো ভেঙে যাওয়া নিরাশ জীবন, ওপরে ওঠার প্রদর্শনী
তারপরও মানুষের সংজ্ঞায় লালন করি সবুজহীন হিংস্রতার শাপ-
শাপমুক্তির জন্যই আমি দাহ করব না নিজেকে, স্বপ্নের ডোরে বেঁধে
লিখবো প্রেমের পদাবলী, মনুষ্যত্বের রঙিন ফোয়ারার ইতিকথা।
(১৬.৭.২০২০)

৪. জটিল ধারাপাতে স্বস্তির আঁচল

অবশেষে সরিয়ে নিলে আঁচলের শেষ ছায়াটাও!
ভাবো তো একবার, তাতেই কী মিলিয়ে যাবে সব
তাতেই কী শোধ হবে সকাল, দুপুর, রাতের
ভালোলাগার যত ঋণ?
তোমার চোখের সৈকতে আমার দুরন্তপনা
মুছতে পারবে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে?
তিস্তা, ধরলা, করতোয়ার যৌবনেও আছে
ভিন্নতার রকমারী জোয়ার
তাহলে ভাগ্য এক রৈখিক হবে কেন?
ছিবুড়ির বুড়ি রূপমুদ্ধের কাছে স্বপ্ন মানবী-
তহালে কেন প্রাচীর, যোজন যোজন দূরত্ব।
ঝুম বৃষ্টিতে খুউব মনে পড়ে তোমার অবয়ব
নিবিড় কাছে আসা, কথার মালা গাঁথা
আমার সবটুকু মিলিয়ে তোমার অস্তিত্ব
সবটুকু বিলিয়ে তোমাকেই দেখা।
স্মৃতিগুলো সাপের দংশনে বিষাক্ত করে
বড় নিঃস্ব লাগে, মরুভূমি রুক্ষ্মতায়।
জানো, জীবনের ধারপাত আরও জটিল এখন
সংগ্রামের অভিযাত্রায় আমি তুমিহীন, একা
পূর্ণতার লড়াইয়ে সাতপাকে বাাঁধাপড়া হলো না
অবিরাম দাঁতালো নখড় ছিঁড়ে খাচ্ছে শুদ্ধ সত্তা
প্রজাপতির পাখায় শকুনের রক্ত-আঁচড়
সাঙ্কেতিক চোখগুলোর শ্যেন দৃষ্টি আগুনে জড়ায়,
তুমিও খুলে রেখো চৈতন্যের সবকটা জানালা কপাট।
তোমার কালো চোখে খুঁজবো আমার ছবি
শিহরিত হবো তোমার সত্তায় লীন হয়ে
পিছে পড়ে থাকবে বিঘ্নের জাল, অনন্ত আঁধার
ভাগ্যকে জয় করে আবার আসবে ফিরে-
আবার নতুন যাত্রা, নব পথে, সহযাত্রী আমরা
স্বস্তির আঁচলে ওড়াবো বিজয়ের পাল।
(১৭.৭.২০২০)

৫. সৌন্দর্যে পরিত্রাণ

মঞ্চে দাউ দাউ শিখা, যবনিকা
নায়ক রক্তাভ, ক্ষত-বিক্ষত,পরাজিত-
এমন পরিসমাপ্তির বিপক্ষ স্রোতে আমরা।
ফলবতী সভ্যতায় নিদারুণ আত্মপ্রবঞ্চনা
ধোঁয়াটে ঝলসানো আগুন, ভোগবাদী দাবানল
শঙ্কার লাভা, শতছিন্ন মলিনতার শেষ প্রহরে
নিয়ত সবুজের স্বপ্ন বুনে যাই।
নকশী কাঁথার সুরম্য প্রাসাদ আমাদের
জীবনের গভীর ঢেউয়ে চড়ে
আমরা পৌঁছে যাই মুক্তির নতুন বন্দরে।
রুদ্ধ ভাষা, নিরব ভাবনা, আতঙ্কিত সময়
কলুপ লাগানো অবয়ব আমাদের প্রতিচ্ছবি নয়।
সুবিশাল প্রতারণার আয়োজন
আবার রঙমহল, ইন্দ্রিয়-ভূগোল
মেঘের আড়ালের শক্তি
ধূসর নিয়তিকে পরাজয়ের মালা পরাতে
বিলাপ সমাধান নয়-
নীরবতা সমাধান নয়-
অশ্রুপাত সমাধান নয়-
পুষ্পকেমল হৃদয়ের কঠিন পাথরের মর্মে
প্রজ্ঞার আকাশচারী দুরন্ত বেগে
মনের শুচিজলে আমারা ফেরাবো
পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাগানের সৌন্দর্য
তবেই ‘পরিত্রাণ’ শব্দটি লিখে দেবে মহাকাল।
(১৯.৭.২০২০)

ফটো গ্যালারী

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge