সোমবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:১৫ অপরাহ্ন

পাতা প্রকাশ ঈদ সংখ্যা ২০২০

পাতা প্রকাশ ঈদ সংখ্যা ২০২০

‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়
আজিকে যে রাজাধিরাজ কাল সে ভিক্ষা চায়-’

জীবনটা এমনই। ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন। কখন যে কী হবে তার হিসেব মেলানো ভার। ভাটিয়ালী গানেও এমন চিত্র-‘আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি আবার দেখি নাই রে।’ ভাঙা গড়ার খেলা চলতেই থাকে অহির্নিশ। চলমান খেলার শিকার হয়ে স্বপ্ন ক্ষয়ে যায়, হতাশা, উৎকণ্ঠার স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরান্তর। সে খেলায় এবার দোদুল্যমান বিশ্ব। কোথাও যেনো সামান্যতম আলোর রশ্মি নেই, ঘোর অমানিশা। এ পৃথিবী যেনো অচেনা। মানুষ আছে কিন্তু বাঁচবার ব্যাকুলতায় উন্মুখ। কাছে যাবার সময় নয়, দূরত্বেই বাঁচার নিশ্চয়তা। স্বজনদের মধ্যেও ব্যবধানের ভেদরেখা। সে কথাই ধ্বনিত গানে-‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই, মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই।’ এখন দারুণ সময়, দিন বদলে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। এমন শঙ্কার আলোড়ন বিশ্ব কখনো দেখেছে মনে হয় না। করোনা নিয়ে এসেছে মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বের দেশগুলো স্তম্ভিত, এমন সংকট কতদিন চলবে, মুক্তির পথই বা কী, সে চিন্তায় হতবিহ্বল। প্রবল পরাক্রমশালী দেশগুলোর শাসকরাও চেয়ে চেয়ে দেখছেন তাদের তেমন কিছুই করার নেই। করোনার কাছে অসহায় আমরাও।
পরিবর্তন, শঙ্কা, হতাশা যত গভীরই হোক, জীবনের গতি থেমে থাকবে না এটাই প্রকৃতির নিয়ম। সে নিয়ম মেনেই মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম উপাসনা রোজা এসেছে। গৃহবন্দী মানুষ রোজা রাখছেন, লকডাউনের বেড়া ভেঙে জীবীকার জোগর করছেন। মসজিদে সীমিত মুসল্লির অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতায় ঘরে ঘরে নামাজ পড়ার মাধ্যমেই কামনা করা হচ্ছে স্রষ্টার নৈকট্য ও মার্জনা। করোনার সর্বনাশা ছোবল থেকে মুক্তির জন্য আকুতি ঝরছে কণ্ঠে কণ্ঠে।
এমন এক বৈরি পরিবেশে ঈদুল ফিতরও দূরে থাকবে না। সময়ের তরিতে ঈদ আসবে। প্রশ্ন হলো বৈশ্বিক মৃত্যুর মিছিল মানুষের মনে যে দীর্ঘশ্বাস জন্ম দিচ্ছে তাতে ঈদে কী আনন্দ পসরা সাজাতে পারবে? শত শত বছর আগে থেকে ঈদ আনন্দের যে সওগাত নিয়ে হারিজ হতো সে পরিবেশ কী শুধুই স্মৃতির সুবাস ছড়াবে। প্রিয় পাঠক, অতলান্ত বেদনা ও হতাশার মধ্যেও ঈদের অতীত সময় নিয়ে ভাবা যেতেই পারে। তাহলেও কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইবে।
‘শত যোজনের কত মরূভূমি পারায়ে গো,
কত বালূচরে কত আঁিখ-ধারা ঝরায়ে গো,
বরষের পরে আসিলে ঈদ।’

বছর ঘুরে অফুরন্ত আনন্দ সওগাত নিয়ে এসেছে ঈদ। জীবন জুড়ে তাই বইছে খুশির জোয়ার । দূরে গেছে সব মালিন্য, কষ্ট অনুভব। ছোট,বড়, গরীব-ধনী সবাই ঈদ আনন্দে মাতোয়ারা। ঈদ আনন্দ তো শুধু একদিনের নয়। এ আনন্দ বহমান প্রাণে প্রাণে, কালে কালে। বাংলাদেশের মানুষ উৎসর প্রিয়। উৎসব কখনো পারিবারিক, কখনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক, কখনো জাতীয়, সর্বোপরি উৎসব ধর্মীয়। ধর্মীয় উৎসবের চেতনাবাহী ঈদুল ফিতর। ঈদ সামাজিক মহামিলনের উৎসবও।
ঈদ উৎসবের আনন্দ অনুভব সূচিত হয় রমজানের রোজার মাধ্যমে। ঈদের বার্তা সামাজিক যে সাম্য, রোজার মাধ্যমেই তার সূচনা । ধনী-গরীব সব পেশার মানুষ যখন রোজাদার তখন সমাজ থেকে ঘুঁচে যায় ভেদ।
রোজার শেষে আকাশে উঠেছে সাওয়ালের এক ফলি আলোকিত চাঁদ। চাঁদ দেখার আনন্দ উলল্লাস শহর-গ্রাম-গঞ্জ সবখানেই। চাঁদ দেখার সাথে সাথে কণ্ঠের উচ্ছাস- ঈদ মোকারক ,ঈদ মোবারক। কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয় কাজী নজরুলের অমর গানের সুর-
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ।’

কণ্ঠে কণ্ঠে সাম্যের গান-
‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন হাত মিলাও হাতে
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।’

ঈদে আয়োজন হয়েছে রকমারী খাবারের। সেমাই, পিঠা, ফিরনী পায়েস, জরদা, পোলাও বিরানী বহু ধরনের খাবারে তৃপ্তির স্বাদ নিয়েছে সবাই। শহর অনেকটা ফাঁকা হলেও প্রণের স্পন্দনে মেতে উঠেছে গ্রামগুলো। আপনজন, আত্মীয় স্বজন মিলে মিশে উপভোগ করছে ঈদানন্দ। ঈদগাহে ধনী নির্ধন, ছোট বড় সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাাহর কাছে মঙ্গল প্রার্থনা করেছে। মহান স্রষ্টা তুমি প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ কর, আমাদের সম্মানিত কর, মর্যাদাবান কর, আমরা যেনো বিশ্বে মাধা উঁচু করে বাঁচতে পারি সে শক্তি দাও।
ঈদ মানেই নতুন জামাকাপড়, জুতা পরে সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে শিশু-কিশোর যুবা সববয়সের মানুষের বেড়ানো। আনন্দ যাত্রায় পার্ক, মিউজিয়াম, বিনোদনকেন্দ্রগুলো ভরে যায়। আয়োজন হয় হাডুডু, নৌকাবাইচ, ষঁড়ের লড়াই প্রভৃতি খেলার। সব মিলিয়ে ঈদ অফুরাণ আনন্দ আর স্বস্তির দোলা দিয়ে যায়।
কিন্তু এবারের বাস্তবতা যে একেবারেই ভিন্ন। করোনার বিস্তারে বাংলাদেশও বহুমুখী সংকটে নিপতিত। অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প, কলকারখানা, যোগাযোগ, কৃষি, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা ক্ষতির সম্মুখিন হয়নি। কর্মহীন অভাবগ্রস্ত মানুষেদের কাছে খাবার ও অন্যন্য সামগ্রী পৌঁছানোর সরকারী প্রয়াসের সাথে অনেকের সহযোগিতা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু লোভী স্বার্থবাদী জনপ্রতিনিধিদের একটা অংশ মেতেছে চুরির নেশায়। ভাবতে অবাক লাগে অভুক্ত মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নিতেও কুণ্ঠাহীন তারা। এমন অমানবিক আচরণ চরম হতাশার। এ রকম লেভী মানুষের জন্যই বাংলাদেশ বরাবরই অগ্রগামীতার সঠিক পথ পায় না। এদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি বিধান দরকার। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও দুর্নীতি মাত্রা লাগাম ছাড়া। পিপিআই, মাস্কসহ অনেক সামগ্রী মানসম্মত না হওয়ায় চিকিৎসকসহ অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়। সত্য বলাতে অনেকের ঘাড়ে নেমে এসেছ বদলী, শাস্তির খড়্গ। যা নিতান্তই অপ্রত্যাশিত।
ঈদ আনন্দের পূর্ণতা মেলে জাকাত, ফেতরা দান খয়রাতের মাধ্যমে। অপরের জন্য নিেেজকে বিলিয়ে দেয়ার যে মহৎ আনন্দ তার প্রমাণ মেলে ঈদে গরীবরা জাকত, ফেতরা পেয়ে সামিল হয় ঈদ আনন্দে। এটা তাদের অধিকার।
এবার রোজায় ইফতারের পসরা তেমন ছিল না, ঈদের কেনাকাটার সুযোগও মেলেনি। কারণ করোনা মহামারির ছোবলে মানুষের জীবন গতিহীন। করোনায় আক্রান্ত হবার শঙ্কা, স্বজনদের মৃত্যুতে বেদনার স্রোত। এবার ঈদের আচার সীমাবদ্ধ রাখতেই হবে। আর সে অর্থ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে দিতে হবে। সরকার সঙ্কট মোকবেলায় আন্তরিক, কিন্তু সরকারের একার ওপর দায় চাপিয়ে নির্ভার হবার মতো পরিস্থিতি এবার নেই। পড়শির হক, আত্মীয়-স্বজনের হক নিজের সামর্থ থেকেই আদায় করার মনেবৃত্তি খুব বেশি প্রয়োজন। তরুণদের এ বিষয়ে উদ্যোগী হবার যথেষ্ট সুযোগ আছে। এবার সঙ্কট কালে কৃষকদের ধান কাটতে প্রসংশাযোগ্য অবদান রেখেছে তরুণরা। ছাত্রলীগ ও অন্যান্য সংগঠনের পক্ষে ধান কাটার যে সহযোগী মনোভাব তা অব্যাহত রাখলে অতীতের দুর্নাম ঘোচাতে সহায়ক হবে। জনপ্রতিনিধিদের আরও সততা ও নিষ্ঠা মানুষের প্রত্যাশিত। করোনার মহামারীতে অভুক্ত মানুষের মুখের গ্রাস যারা কেড়ে খায় তারা ক্ষমার অযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ ‘প্রশ্ন’ কবিতায় সে প্রশ্নই করেছেন স্রষ্টার কাছে-
‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?’

না, এরা স্রষ্টার কাছে, মানুষের কাছে, অন্য কারও কাছে ভালোবাসা বা ক্ষমা পেতে পারে না। এদের জন্য দরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যর্মী, পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, আনসার, গ্রামপুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সবস্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ যারা করোনা বিস্তার রোধে কাজ করেছেন, পাশে থেকে সেবা দিয়েছেন, বাড়িয়েছেন মমতার হাত তাদের কাছে জাতির কৃতজ্ঞতা অনিঃশেষ। সেবা দিতে গিয়ে করোনা যাদের মৃত্যুর বাঁধনের বেঁধেছে তাদের অবদান স্মরিত হবে শ্রদ্ধার সাথে। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মানবিক দিক বিবেচনা করে সহয়াতা, প্রনোদনামূলক ইতিবাচক কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য।
পরিবেশ যেমনই থাক ঈদের আনন্দ প্রসার ঘটাতে দান, খয়রাত করতে হবে বেশি বেশি, মানুষকে ভালোবাসতে হবে, দূর করতে হবে হিংষা বিদ্বেষ, দুর্নতির অশুভ জাল থেকে মুক্ত হতে হবে। করোনা বাংলাদেশ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ধ্বস রেখে যাবে তা থেকে উত্তরণ সহসাই ঘটবে এমন আশা করাও বৃথা। তাই মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী সহায়তার মানসিক প্রস্তুতি রাখা সময়ের দাবী। সাথে দরকার করোনা জয়ের সাহস ও দৃঢ় মনোল। কণ্ঠের সঙ্গী প্রত্যয়ী সুর- আমরা করবো জয়..।
সত্য হলো করোনার আগ্রাসনে আক্রান্ত কিংবা স্বজন হারানো মানুষ ঈদের আনন্দে শরীক হতে পারবেন না। আর এমনটাই স্বাভাবিক। নিয়মরীতি মেনেই সান্ত¦না দিতে হবে তাদের। সর্বোপরি করোনা বিস্তার রোধে মানতে হবে যাবতীয় নির্দেশনা। মূল কথা ঈদের আনন্দ বিস্তৃতি দিতে সবাইকে নিবেদিত থাকতে হবে কল্যাণ কর্মে । ঈদুল ফিতরের শিক্ষা- সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে ” এ বোধ বিস্তৃত হলে করোনার নিদানকালে ঈদের খুশী কিছুটা হলেও বিস্তৃতি পাবে।
লেখক: বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ; ভুতপূর্ব অধ্যাপক, বাংলা, কারমাইকেল কলেজ,রংপুর।

রংপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অতি সমৃদ্ধ ও সুপ্রাচীন। রংপুরের উর্বর ভূমিতে ছিল জমিদার বিত্তবানদের আবাস। সেইসাথে এঅঞ্চলে আগমন ঘটেছিল অনেক আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষের। এছাড়াও রংপুর জন্ম দিয়েছে অনেক আলোকিত মানুষকে যারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে রংপুরকে করেছেন ধন্য।
রংপুরের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের মধ্যে নবাব নূর উদ্দিন বাকের মোহাম্মাদ জং (নুরুলদিন), ফকির মজনু শাহ্, মাওলানা কেরামত আলী, জমিদার সুরেন্দ্র নাথ রায়চৌধুরী, খান বাহাদুর তসলিম উদ্দিন আহমেদ, কবি হেয়াত মাহমুদ, খান বাহাদুর এ্যাডঃ শাহ্ আব্দুর রউফ, মণি কৃষ্ণ সেন, তুলসী লাহিড়ী, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, কাজী মোঃ ইলিয়াস, সাংবাদিক মহমুদ হোসেন, পাখী মৈত্র, ডঃ ওয়াজেদ মিয়া, সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন-এই নামগুলি। আরও অনেক নাম চলে আসে যা এই পরিসরে হয়তো লেখা সম্ভব নয়। কিন্তু বাধ্যতামূলক একটি নাম যা না উল্লেখ করলে রংপুরের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের তালিকা সম্পূর্ণ হবে না। তিনি হচ্ছেন- বাঙ্গালী নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত। ভারতীয় উপমহাদেশে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে তাঁর নাম সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।
আমি ইচ্ছে করেই বেগম রোকেয়া নামটি শেষে এনেছি। কারণ, রংপুরের এতো সব স্মরণীয়, বরণীয় ব্যক্তিত্বের সাথে আর একটি নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হয়। তিনি হচ্ছেন মৌলভী খেরাজ আলী। বেগম রোকেয়া যে কাজ শুরু করে গিয়েছিলেন সেই পথ ধরে তিনি সেই কাজকে এগিয়ে নিতে আজীবন চেষ্টা করে গেছেন। আর তাই তাঁর পরিচয় দেয়ার জন্যই বেগম রোকেয়ার নাম শেষে বলা।
রংপুরের বিভিন্ন জনহিতকর, কল্যাণকর কাজের সাথে নারী সমাজের শিক্ষা, জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি মহৎ কাজ করেছেন মৌলভী খেরাজ আলী। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী। তাঁর এই লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা একটি ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন ঘটনা। নারী জাতির জাগরণের জন্য বেগম রোকেয়ার মধ্যে যে আবেগ ও বাস্তব প্রয়োজনবোধ কাজ করেছিল ঠিক একই ধরণের বোধ উচ্চকিত ছিলো মৌলভী খেরাজ আলীর মধ্যে। তিনি গত শতাব্দীর প্রথম দিকেই বুঝতে পেরেছিলেন মায়েরা না জাগলে দেশ কখনই জাগবে না। অথচ, সেই সময় পর্যন্তও এমনকি তার অনেক পরেও এই উপমহাদেশের মা, বোনদের ‘রান্না করা, খাওয়া এবং আবারও রান্না করা’ এই চক্রের মধ্যেই বাঁধা ছিল। শৈশবে কন্যা হিসেবে পিতার আশ্রয়ে, যৌবনে স্ত্রী হয়ে স্বামীর আশ্রয়ে এবং বার্ধক্যে পুত্রের আশ্রয় প্রাপ্তি ছিল নারী সমাজের নিয়তি। পাশাপাশি এই ধারণাও ছিল যে, নারী সমাজের একমাত্র কাজ পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়া নইলে লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা।
আসলে খেরাজ আলী বেগম রোকেয়ার প্রদর্শিত পথ ধরেই নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে কাজ করে গেছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন নারী সমাজকে শিক্ষা, জ্ঞানের আলোকে আলোকিত করতে। এই উদ্দেশ্যেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী। যে লাইব্রেরীতে নারীদের আসতে হবে না। বাসায় বসেই নারীরা বই পড়ার সুযোগ পাবেন। জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেদের চিনতে পারবেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘সুশিক্ষিত লোক মানেই স্বশিক্ষিত’। তার এই উপলব্ধি ছিল বাস্তব সম্মত। মূলত এই বোধ থেকেই তিনি মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্মভূমিতেই বেগম রোকেয়ার মৃত্যুর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ১৯৩৩ সালের ২৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী’।
বেগম রোকেয়ার স্কুল শুরু হয়েছিল মাত্র তিন খানা বেঞ্চ ও সাত জন ছাত্রী নিয়ে। আর খেরাজ আলী তার ‘খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী’র অস্তিত্ব প্রকাশ করেছিলেন মাত্র ৯৩টি বই নিয়ে। এই লাইব্রেরীর নামের মধ্যেই এর তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য নিহিত আছে। খাতুন শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে মহিলা। তাই কোন ব্যক্তির নামে যে এই লাইব্রেরীর নামকরণ করা হয়নি তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।
এই প্রতিষ্ঠানের ঘোষণাপত্রে দেখা যায় লাইব্রেরী সম্পর্কে লেখা রয়েছে, ‘A laibrary for the women folk’. মানে দাঁড়াচ্ছে মহিলাদের জন্যই এই লাইব্রেরী। ‘সার্কুলেটিং’ ইংরেজি শব্দ যার মানে ভ্রাম্যমান। অর্থাৎ মফস্বল শহরের সম্রান্ত মহিলারা যারা খুব একটা ভ্রমণ করেননা তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরীর নাম রাখা হয়েছে ‘খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী’। আসলে এই লাইব্রেরী ভ্রাম্যমান বা চলন্ত লাইব্রেরী হিসেবেই পরিচিত। বাড়িতে মহিলাদের কাছে বই পৌঁছে দেয়া হতো। আজ ভাবতেই বিস্মিত হতে হয় কি অসাধারণ সেবামূলক কাজ ছিল এই লাইব্রেরী পরিচালনা। কাঁধের ব্যাগে বই নিয়ে সাইকেল চালিয়ে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই দিয়ে আসতেন এবং সপ্তাহান্তে গিয়ে ঐ বই ফেরত নিয়ে নতুন বই দিয়ে আসতেন।
এই লাইব্রেরী সম্পর্কে কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ২৬ বৈশাখ ১৩৪২ বঙ্গাব্ধ তারিখে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘‘খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী’ নামে একটি লাইব্রেরী মৌলভী খেরাজ আলী কর্তৃক স্থাপিত হইয়াছে। লাইব্রেরীর উদ্দেশ্য অশিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের স্ত্রীলোক ও বালিকাদের মধ্যে সৎ সাহিত্য প্রচার। লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা এক উদারচেতা ও উৎসাহী যুবক, যিনি নিজেই পুস্তকের বোঝা লইয়া হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলের গৃহে গৃহে পুস্তক পৌঁছাইয়া থাকন’।
রংপুরের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা ‘রংপুর দর্পণ’ ১৬ চিত্র ১৩৪১ সংখ্যায় এই লাইব্রেরী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘মৌলভী মোহাম্মাদ খেরাজ আলী এই প্রতিষ্ঠানের জনক। উন্নত ও অভিনব আদর্শে ইহা রংপুরের এবং রংপুরের বাহিরের বহু বিশিষ্ট লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে। প্রতি মাসে পাঁচ পয়সা প্রদানে নানাবিধ সুখপাঠ্য সৎ গ্রন্থ পাঠের সুবিধা প্রদান করায় বহু পরিবারের মধ্যে জ্ঞান প্রচারের বিশেষ সহায়তা হইয়াছে’।
মৌলভী খেরাজ আলী ৫ বৈশাখ ১৩৫৩ বঙ্গাব্ধে বর্তমান গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ীর গড়েয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী আলীম উদ্দিন আহমেদ। মাতার নাম মোছা. করিমননেছা। তিনি ১৯১৬ সালে গাইবান্ধা হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ময়মনসিংহ এর আনন্দ মোহন কলেজে পড়তে যান। কিন্তু পিতা মারা যাবার কারণে তার পক্ষে আর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না অর্থাভাবে। জীবন জীবিকার তাগিদে চাকুরীতে যোগ দিলেন সিভিল কোর্টে কেরানী পদে। ‘খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী’ প্রতিষ্ঠা হবার পরে তাকে বদলী করা হলো নীলফামারীতে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই রংপুর জজ কোর্টে ফিরিয়ে আনা হলো তাঁকে। এখান থেকেই তিনি রেকর্ড কিপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৫২ সালে। রংপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় ছিল তাঁর নিবাস। দীর্ঘজীবী মৌলভী খেরাজ আলী ১৯৮৭ সালে ইন্তেকাল করেন।
গত সোমবার ছিলো মৌলভী খেরাজ আলী’র ১২৩তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা রংপুরের এই বরেণ্য ব্যাক্তিকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হোক।
তথ্য সূত্র :
১. ইন্টারনেট
২. খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরীর মেমোরান্ডাম
৩. মৌলভী খেরাজ আলীর জন্ম শত বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা
৪. খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরীর ৫২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণিকা
৫. রংপুর সংবর্তিকা : মুহাম্মদ আলীম উদ্দিন

লেখক : সাবেক সভাপতি, বিভাগীয় লেখক পরিষদ, রংপুর

এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা দিন কাটাচ্ছি। আজ ২ মে এই লেখাটা লেখার সময় পর্যন্ত দেশ মরন অণুজীব করোনা আক্রান্ত। এ পর্যন্ত(২মে) সারা দেশে ৮৭৯০ জন এবং রংপুরে জন করোনায় আক্রান্ত মানুষের কথা জানা গেছে। যেভাবে দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির খবর জানা যাচ্ছে সেখানে সামনের কয়েকদিনে আল্লাহ্পাকের বিশেষ রহমত ও কুদরত ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার কোন সম্ভাবনা নেই বলে বিভিন্ন মহল মনে করছেন। এ কারণে এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর মানুষ উদযাপন করবেন সম্পূর্ণ নতুন এক পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। যে পরিস্থিতি হয়তো সেদিন রোজা না রাখার উপলব্ধির মধ্যে ঈদের আনন্দ সীমিত থাকবে।
ঈদ সারাবিশ্বের মুসলমানদের জীবনে এক তাৎপর্যময় দিন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে মুসলমানদের জীবনে রমজান মাসে। বড় বরকতময় এই মাস। রহমত, বরকত, মাগফিরাত আর নাজাদের বার্তা নিয়ে আসে এই পবিত্র মাস। ঈদ শুধুমাত্র আমাদের ধর্মীয় উৎসব নয়। ঈদ সম্প্রীতি আর সৌহার্দের বন্ধন। ঈদ এক মাস কঠিন সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের জন্য আল্লাহ্পাকের এক চমৎকার উপহার। ঈদ বাঙালি মুসলমানদের আনন্দ- বিনোদন এবং মিলনমেলা। ঈদ আমাদের লোক সংস্কৃতিতে আনন্দ সঞ্চারিত এক মধুর দিন। কিন্তু এবার এক বড় বিপন্ন সময়ে ঈদ এসেছে আমাদের জীবনে। জীবনের প্রবহমান স্রোতে ঈদ নামক এই মহাআনন্দযজ্ঞে শামিল হবার প্রস্তুতি আমরা নিতে পারছি না। আজ বিশ্ব থমকে আছে করোনা নামের অদৃশ্য এক মহা অপশক্তির কাছে।
আমাকে বলা হয়েছে ঈদ উপলক্ষে একটা বিশেষ সংখ্যার জন্য স্মৃতিচারণ মূলক লেখা দিতে। যেখানে ঈদের আনন্দ নেই, নেই কোন আমেজ সেখানে ঈদ সংখ্যায় লেখা! মন সায় দেয় না। কিন্তু এরপর মনে এ নিয়ে পজিটিভ ধারণা আসে। মন্দ হবে না, ঘরবন্দি মানুষ অনলাইনে লেখা পড়ে একটু হলেও উৎকন্ঠিত খবরের ফাঁকে কিছুটা ভিন্নতা পাবেন। সে কারণে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।
ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন যে, অষ্টম শতাব্দীতে আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের নোয়াখালী অঞ্চলে ইসলামের যাত্রা ঘটেছিল। সেই থেকে যদি আমরা বাংলায় ইসলামের সূচনা ধরি তাহলে অন্তত বারোশো বছর ধরে আমাদের মধ্যে ইসলাম অস্তিত্বশীল আছে। আর এই ক্রিয়া বাঙালি সমাজের কোন না কোন অংশে, যেভাবেই হোক একটি সক্রিয় জীবনাদর্শরূপে ইসলাম অস্তিত্বশীল আছে। তবে এখানে কথা আছে যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে বাংলাভাষী সমাজে ইসলামের প্রচার এত স্বল্প হয়েছিল যে, তা নিতান্তই উল্লেখের দাবি রাখে মাত্র। বাংলায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছিল প্রধানত উত্তর ভারত থেকে আসা সুফিদের দ্বারা।
আমার জন্ম ঠিক সত্তুরে।আমি তাই আগের কিংবা মানসচোখে এর অনেকদিন পর্যন্ত ঈদের চিত্র-অবস্থা অবলোকনকারী নই। আশির দশকের শুরুতে আমার মন ও মনন তখন কিছু ভালোলাগা কিছু ভিন্নতা উপলব্ধি করতে পারে। তখন ঈদের কিছু স্মৃতি মনে গেঁথে আছে। ঈদের আগে থেকে দেখতাম আমার বড়ম্মা (জ্যাঠিমা) একটা হাতে ঘোরানো মেশিন দিয়ে সেমাই বানাতে ধরেন। সে সেমাই বানানো দেখেই বুঝতাম এসে গেছে আনন্দময় সেই দিন। ঈদের আগের দিন ছিল চাঁদ দেখার জন্য একটা বড় হুল্লোর। তখন তো এতো মিডিয়ার যুগ ছিল না, ছিল নিজের চোখে চাঁদ দেখার ওপর ঈদের দিনক্ষণ নির্ধারণ আর ছিল চাঁদ দেখার ঘোষণা দিয়ে বিশেষ সাইরেন। এই সাইরেনটা যে কি ,কীভাবে কোথা থেকে বাজে এ নিয়ে থাকতো সেসময় অনেক জল্পনা। ভাবনায় ছিল সাইরেন সম্ভবত বিশাল একটা বিশেষ ধরনের মাইক! সে যাই হোক, ঈদের দিন সকাল সকাল আম্মা ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। তারপর নতুন সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দিতেন। খুব বিরক্তিকর ছিল এই সকাল সকাল গোসলটা। এরপর ছিল নতুন কাপড়ের ভাঁজ খোলার আনন্দ! তবে আমাদের সে সময় প্রতি বছর সকলের নতুন প্যান্ট-শার্ট হলেও পাজামা-পাঞ্জাবি কিন্তু হতো না। আরেকটা কথা তখন ওই বয়সে আমাদের মার্কেটে যাওয়া হতো না। একদিন আব্বা-আম্মা যাবার সময় সুতো দিয়ে আমাদের শরীরের মাপ নিয়ে গিয়ে কাপড় কিনে আনতেন। আমাদের ওই বয়সের ছেলে-মেয়েদের তৈরি পোশাকের প্রচলন ছিল। তারপর ঈদগাহ মাঠে যাবার আগে দেয়া হতো নতুন শিশি খুলে আতর। আহ্ কি সুন্দর সে আতরের গন্ধ! তখন আমরা বাড়িতে পরার রাবারের স্পঞ্জ পরেই ঈদের নামাজে যেতাম আর নতুন জুতা কি চামড়ার স্যান্ডেল পরা হতো ঈদের নতুন শার্ট-প্যান্টের সাথে। তখন ঘোরাঘুরি বলতে ছিল আব্বার সাথে দু-একজন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যাওয়া। আর অপেক্ষা ছিল দুপুরে পোলাও-গোস্ত খাওয়ার।
তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। গায়ে একটু দিন- দুনিয়ার হাওয়া লাগছে। চুলে সিঁথি কাটা বুঝি। বুঝি চাচাদের বেলবটম প্যান্ট আর বড় কলারের টেডি শার্ট। কয়েকমাস ধরে স্বপ্ন দেখতে থাকলাম এবারের ঈদে এই ধরনের পোশাক বানাবো। তখন কিন্তু তৈরি পোশাকের প্রচলন মানে পাওয়া যেত শুধু শিশুদের জন্য। এর মাঝে বড় চাচা আনলেন ওনার জন্য হিল জুতো। আহ্ কি তার রূপ! কি তার জৌলুস! আমি সেই হিল জুতার দেওয়ানা হয়ে গেলাম! রোজার মাসে আব্বার সাথে গেলাম ঈদের শপিং মানে কেনাকাটা করতে। প্যান্ট-শার্টের কাপড় কিনে যদিও বানাতে দেয়া হলো কিন্তু তা পুরোপুরি চাচার স্টাইলে হলো না। ছোট মানুষের ওরকম স্টাইল ইঁচড়ে পাকা লাগবে বলে শুনতে হলো। তখন জুতা কি চামড়ার স্যান্ডেল কেনাকাটা হতো বেশি সাতাশে রোজার পর। তো ওরকম সময়ে গেলাম জুতো কিনতে। আগের রাতে ঘুম ঠিকমতো আসে না হাই হিল জুতোর চিন্তায়। তখন শহরে জেনারেল বুট হাউস, মজিবর এন্ড ব্রাদার্স ( এটা ছিল চাচাদের দোকান), এ বি বুট হাউস ও বেঙ্গল সু স্টোর ছিল । তো চাচাদের দোকানে আমার সাইজে জুতো না পেয়ে আব্বা মুখ কালো করে আমাকে নিয়ে অন্য দোকানে খুঁজতে লাগলেন এবং এক সময় আমি আমার স্বপ্নের জুতো পেয়ে গেলাম বেঙ্গল সু স্টোরে। ঈদের কাপড় কবে পরা হবে এ নিয়ে ছোটবেলায় ছিল সকলের মধ্যে অধীর আগ্রহ। পোশাক ও জুতো কেনার পর আমাদের বয়সী অনেকেই তখন প্রায় প্রতিদিনই সেসব বের করে নেড়েচেড়ে দেখতাম। কি যে সুখ ছিল সে অপেক্ষায়। কিন্তু এখনকার ছোটদের সেই আকর্ষণটা দেখা যায় না।
এরপর এলাম তরুণ বয়সে। তখন খুব ঝোঁক হয়েছে সেবা প্রকাশনীর বই কেনা ও পড়ার। আর ছিল বিচিত্রা, আনন্দ বিচিত্রা ও রোববার-এর ঈদ সংখ্যা কেনার। ঈদের কাপড় কেনাকাটার টাকা তখন আব্বা দিয়ে দিতেন হাতে। সেই টাকা পেয়ে তখন কাপড়ের বাজেট কমিয়ে কিনতাম সেগুলো। ঈদ সংখ্যা কেনার সেই যে অভ্যেসটা হয়েছে আজো তা ছাড়তে পারিনি। এখনো আমার কাছে ঈদ সংখ্যা না থাকলে ঈদটা পানসে মনে হয়।
যখন উপার্জন করতে শুরু করলাম তখন আপনজনদের কিছু উপহার দিতে পারলে ভীষণ আনন্দিত হতাম। এরপর যাকাত যখন দেয়া শুরু করলাম তাতে মনে একটা ভীষণ প্রশান্তি ছুঁয়ে যাওয়া শুরু করলো।
ঈদের খাওয়া-দাওয়া সেকাল আর একালের মিল কিন্তু রয়েই গেছে। হয়তো আইটেম ও রন্ধন কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু সেই সকালে সেমাই ও দুপুর কিংবা রাতে পোলাও-গোস্ত এখনো অমলিন আছে। এখন যদিও অনেক আইটেম যোগ হয়েছে গৃহিনীর খাবার টেবিলে কিন্তু সেমাই ও পোলাও-গোস্তের সেই আনন্দটা রয়েই গেছে। লাচ্ছা সেমাইয়ের প্রচলনটা আশির দশকের শেষ দিকে শুরু হয়। তখন লাচ্ছা সেমাই মানে হেভি একটা ব্যাপার স্যাপার।
ঈদের দিন কি করা হতো ? লাখ টাকার প্রশ্ন। নামাজ আদায় করে এসে শুরু হতো পা ছুঁয়ে সালাম করার পর্ব। প্রথমে বাবা- মা,দাদা-দাদী দিয়ে শুরু। তারপর পাড়া প্রতিবেশী। সালামের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল সেলামির টু- পাইস কামানো। তারপর নতুন পোশাক, নতুন জুতা কি চামড়ার স্যান্ডেল পরে মাঞ্জা মেরে বের হওয়া হতো। দুপুরে পরিবারের সকলে একসাথে বসে ভালো মন্দ যাই হতো তা খাওয়া। এরপর শুরু হতো ম্যারাথন ঘোরাঘুরি। আমাদের সেই তরুণ সময়ে বাইসাইকেল নিয়ে দল বেঁধে পাড়ায় পাড়ায়, রাস্তায় রাস্তায় ঘোরাঘুরির একটা প্রচলন ছিল। আর ছিল রিক্সায় করে ঘোরাঘুরি। রিক্সা ঠিক করা হতো ঘন্টা হিসেবে। আট কি দশ টাকা ঘন্টা। এরপর আর একটু বড় হলে তখন ঘোরাঘুরির বাহন ছিল মোটরসাইকেল। আর ছিল রাস্তার ধারে উচ্চ শব্দে ডেক সেটে গান ছেড়ে আড্ডা দেয়া। তবে আমাদের তরুণকালে এখনকার মতো হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্ট কি ফুচকার (যদিও তখন ছিল না) দোকানে খাওয়া ও আড্ডা ছিল না। তবে বিভিন্ন ভার্সিটি কিংবা বাইরে পড়াশুনা করা বন্ধুদের সাথে দেখা করাটা ছিল খুব আনন্দের।
সেসময় একটা মজার দৃশ্য দেখা যেত। রাস্তায় কিছু কিছু ছেলে মেয়েকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যেত! ঘটনা কি, ওটা কি স্টাইল? আসলে সেসময় তো এখনকার মতো এতো ব্রান্ডের কিংবা বিদেশি জুতা-স্যান্ডেল ছিল না। যেগুলো পাওয়া যেতো সেগুলোর নতুন চামড়ার ঘষা লেগে খুব দ্রুত পায়ে ফোসকা পড়ে যেত। পরে তুলা কি নরম কাপড় পায়ে মুড়িয়ে সেসব জুতা স্যান্ডেল পরতে হতো।
কয়েক বছর আগে আমার ভারতের কোচবিহারে ঈদ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে যা দেখেছি তার ইঙ্গিত লেখার শুরুতেই দিয়েছি। সেখানকার ঈদে একটা মজার ব্যাপার দেখেছি আর তা হচ্ছে ঈদ উপলক্ষে গ্রামাঞ্চলে কোন একটা মাঠ খুব সাজ সজ্জা করে সেখানে বিভিন্ন খেলাধুলা কি নাচ-গান কি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ব্যাপারটায় অনেকটা পূজা পূজা ভাব থাকে।
আমাদের তরুণকালে দেখেছি ঈদের দিন কি পরের দিন পাড়া-মহল্লায় কি গ্রামে আয়োজন করা হতো প্রীতি ফুটবল ম্যাচ ও বিভিন্ন লোক ঐতিহ্যের খেলাধুলার। সিনিয়র-জুনিয়র কিংবা বিবাহিত-অবিবাহিতদের মধ্যে হতো তুমুল লড়াই। আর ছিল ঈদের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কি মঞ্চ নাটকের আয়োজন। বিভিন্ন পাড়া ও গ্রামে এ নিয়ে চলতো তুমুল আয়োজন ও প্রস্তুতি।
সবচেয়ে ভালো লাগতো পাড়ার ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করা এবং নামাজের পর ধনী-গরিব, ছোট-বড় নির্বিশেষে একে একে সকলের সাথে কোলাকুলি করা। আমাদের এই রেওয়াজটা এতো বেশি প্রিয় যে আমরা এখনো এ কারণে এখানেই ঈদের নামাজ আদায় করি।
এই বিষণ্ণ ও উদ্বিগ্ন সময়ে সকলেই আমরা সকলের জন্য দোয়া করি।আল্লাহ্পাক আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। লেখক : বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক

ইসলামি পুনরুজ্জীবনবাদী ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও বাংলার মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ফরায়েজী আন্দোলনের গুরুত্ব রয়েছে। সমগ্র বাংলাঅঞ্চল জুড়ে এই আন্দোলন ছড়িয়ে না পড়লেও বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, খুলনা, যশোর, ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল। ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলেও এর ঢেউ লেগেছিল।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ অর্থাৎ কলেমা, নামাজ বা সালাত (দিনে পাঁচ ওয়াক্ত), রোজা বা সাওম, জাকাত এবং হজ্জ- এর মধ্যে প্রথম তিনটি সকলের পালনীয় আর শেষের দুটি বিত্তশালীদের পালনীয়। এই ছিল শরীয়তুল্লাহর ধর্ম-সংস্কার-আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ। এই পাঁচটি ফরজ কাজ আদায়ের জন্য শরিয়তুল্লাহ তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানাতে। ফরজ আদায়ের জন্য আন্দোলন বলে একে ‘ফরায়েজি’ আন্দোলন নামে পরিচিত। আর এর অনুসারারীরা ‘ফরায়েজি’ বা ‘ফরাজি’ নামে পরিচিত। ইতিহাসবিদ সুপ্রকাশ রায় ফরাজিদের মনে করেছেন একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে। শুরুতে তেমন থাকলেও পরে এটি রাজনৈতিক আন্দেতালনেও রূপ নিয়েছে।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের শুদ্ধচর্চার আন্দোলানের মাধ্যমে ফরায়েজিদের যাত্রা শুরু হলেও দীর্ঘ চর্চায় এদের ধর্মীয় মতাদর্শে আরো কিছু অনুষঙ্গ যুক্ত হয়। শরিয়তুল্লাহ পির-মুরেিদর সম্পর্ককে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক মনে করতেন। তাই এর পরিবর্তে ওস্তাদ-সাগরেদ সম্পর্ক প্রতিস্থাপন করলেন। তাঁর এই মতবাদ তখন সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফরায়েজ পালনের পাশাপাশি আরো ৪টি মতাদর্শ ফরায়েজিরা গ্রহণ করেছিলেন।
১. ‘তওবা ও ওয়াদা’: ওস্তাদের কাছে সাগরেদগণ উপস্থিত হলে তওবা করবেন।তিনি সমস্ত শেরেক, বেদাত, নফরমানি অন্যায়-অত্যাচার তওবা করবেন এবং আল্লাহর যাবতীয় আদেশ ও নির্দেশে যথাসাধ্য পালনের ওয়াদা করবেন। প্রশংনীয় বিষয় হলো, আজ থেকে দুইশ বছর আগে হাজি শরিয়তুল্লাহ বাংলাভাষায় এই তওবা পাঠ করাতেন। ফরায়েজিদের এই জন্য ‘তওবার মুসলিম’ও বলা হয়। তবে পিরদের তওবার চেয়ে এর আচরণগত পার্থক্য রয়েছে। পিরেরা মুরিদ বানায় হাতে হাত রেখে। মুরিদরা বিশ্বাস করেন যে, হাতের স্পশেৃল মাধমে পিরের আশীর্বাদ মুরেিদর কাছে পৌঁছে যায়। ফরায়েজিরা স্পর্শ করাতে ‘বেদাত’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ‘গোনাহ’ হিসেবে গণ্য করে।
২. ‘তাওহিদ’: তাওহিদ মানে আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস। কিন্তু তিনি এই ধারণার সঙ্গে আরেকটু যুক্ত করেন যাতে অন্য কিছুর সঙ্গে আল্লাহর অংশীদারিত্বের সংযোগে বিরত থাকাকে আমলে নেন। তিনি মনে করতেন, কোনো বিশ্বাস ও কাজের সঙ্গে যদি নাস্তিকতা, শেরেক ও বেদাতের সামান্য সংশ্রবও থাকে তবে তা হবে তাওহিদ-বিরোধী। এই ধারণা থেকে তিনি হিন্দুদের পূজা তথা নানান আচার-অনুষ্ঠাােন চাঁদা দেওয়াকে নিষিদ্ধ করেন। পিরের মুরিদ হওয়া, ফাতিহা পাঠ ও এই ধরনের কাজকে দিনি তাওহিদ-বিরোধী মনে করতেন। তাঁর অনুসারীরা এসব মেনে চলতেন।
৩. ‘জুমা-নামাজ’: ফরায়েজরা মনে করতেন, হানাফি আইন অনুসারে ‘মিসর আল জামি’তে অর্থাৎ যেখানে ইসলামি শাসক ও কাজি আছে এবং যাঁরা মুসলিম দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত সেখানেই শুধু জুমা ও ঈদের নামাজ প্রযোজ্য। তাই ব্রিটিশ শাসনে তাঁর জুমা ও ঈদের নামাজকে অবৈধ মনে করতেন। তবে এই বিতর্ক শরিয়তুল্লাহর অনেক আগেই শুরু হয় ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি সালতানাত প্রতিষ্ঠার সময়ে, সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে। শরিয়তুল্লাহ জুমার নামজ না পড়ানোর যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের বেশিরভাগ গ্রামে তখন মসজিদ ছিল না। এবাদতখানা থাকলেও তা ওয়াকফ্ সম্পত্তি ছিল না। গ্রামে তখন বৈধ আমির, কাজি বা হাকিম বাস করেন না। তাই গ্রামগুলোকে ‘মিসর আল জামি’ মনে করার সুযোগ নেই। তারা দেশটিকে ‘দারুল হারব’ মনে করতেন। তাই জুমার নামাজ আদায় করার যাবে না। ব্রিটিশ শাসন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ফরায়েজিরা জুমার নাজম পড়েনি, ঈদের নামাজ পড়েনি। তবে ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা জেলার রিকাবিবাজারে ফরায়েজি উলামা সম্মেলন আহ্বান করেন তৎকালীন ফরায়েজি-প্রধান আবু খালিদ রশিদউদ্দিন। এতে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা আবুল বারাকাত আবদুল রউফ দানাপুরী। তাঁদের যৌথ ঘোষণায় বলা হয় যে, এতদিন ফরায়েজিগণ দেশটিকে দারুল হারব বিচেনা করতে বলে জুমা ও ইদের নামাজ অবৈধ ছিল। এখন আল্বলাহর রহমতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই নামাজ পড়ায় আর আপত্তি নেই। তবে এর সঙ্গে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, জেলা ও মহকুমা শহর, কিংবা বন্দর-গঞ্জ যেখানে ৪হাজার লোকের বসতি রয়েছে সেখানে এই নামাজ পড়া বৈধ।
৪. উৎসব-আচার-প্রথা: ফরায়েজিরা কেবল আকিকা পালন করত। ছেলে হলে দুটি ছাগল আর মেয়ে হলে একটি ছাগল জবাই করে স্বজনদের খাওয়ানো হতো এবং শিশুর নাম রাখা হতো। শিশুর প্রথম চুল কামানো কিংবা মৃত্যুর পরে অনুষ্ঠান পালন করতেন, তবে তাতে আড়ম্বরতা বর্জন করতেন। বরযাত্রীদের সমবেত যাত্রাকেও তিনি অবৈধ মনে করতেন। দাফনের সময় ফাতিহা পাঠকেও তিনি বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। কাউকে পির মানা, পিরের হাতে হাত রেখে তওবা করাকে তিনি অনুমোদন করেননি। তিনি সামাজিক সংস্কারেও হাত দিয়েছিলেন। হিন্দুদের বর্ণপ্রথার মতো মুসলিম সমাজেও জোলা (তাঁতি), বেলদার (খনক), নিকারী (মাছ সংগ্রাহক), কলু (তেল সংগ্রাহক), কাহার বা চাকর (পালকিবাহক ও পাখাচালক) এবং দাই- এদেরকে নিম্নশ্রেণির মুসলমান মনে করা হতো। সৈয়দ, শেখ, পাঠান, মোল্লা, চৌধুরী প্রভৃতি পদবিধারী মুসলমান এঁদেরকে হেয় চোখে দেভখত। এতে সমাজে বৈষম্যের সৃষ্টি হতো। হাজি শরিয়তুল্লাহ তালুকদার বংশে জন্মে নিলেও তার পূর্বপুরুষ জোলা ছির বলে প্রচলিত রয়েছে। বিরোধীরা তাঁকে জোলার পিরে বলেও আখ্যা দিত। প্রথমে তিনি জেলা ও তাঁতিদের পদবি বদল করে ‘কারিগর’ রাখেন। তাতেও বৈষম্য দূর না হলে ‘পদবি’ ছাড়া নাম লেখাকে উৎসাহিত করেন। ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় ফরিদপুরে ৫৮৮৫২২ জন মুসলমানের মধ্যে ৫৭৪৭৪০ জন মুসলিম তাদের পদবিহীন নাম ব্যবহার করে। হিন্দু নারী অর্থাৎ দাই বা ধাত্রীদের দিয়ে নবজাতকের নাড়িকাটার বিরোধিতা করেন তিনি। এসময় দাইয়েরা তাদের নিজস্ব রীতির আচার সংসআকার মান্য করতেন, যাকে ফরায়েজিরা গোনাহ বলে মনে করত। তাই মুসলমান নারীদের মধ্যে নাড়িকাটা এবং দাইয়ের কাজ করানোর জন্য উৎসাহ দিলেন। এর ফলে মুসলিম সমাজে দাই বা ধাত্রীসমাজ সৃষ্টি হলো। ফরায়েজিরা পোশাকের প্রতিও নজর দিয়েছিলেন। আগে পুরুষের ধূতি পরিধান করতেন। শরিয়তুল্লাহ তাঁর অনুসারীদের ধূতির বদলে পাজামা ও লুঙ্গি পরিধানের নির্দেশ দেন। এটি হিন্দুদের থেকে আলাদা হওয়ার পাশাপাশি নামাজের সুবিধার কথাও বলা হয়েছে। ধূতি রে সেজদা দিলে হাঁটু অনাবৃত হয়ে পড়ে, তাই লুঙ্গি বা পাজামা পড়ার প্রতি তিনি উৎসাহ দেন। এইধরনের স্বতন্ত্র রীতিনীতির কারণে ফরায়েজিদের পৃথক ধর্মাচার গড়ে ওঠে।
ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হাজি শরিয়তউল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০)। তাঁর জন্ম ১৭৮১ সালের মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার শ্যামাইল গ্রামে। এটি তখন বাকেরগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত, পরে ফরিদপুর জেলাভুক্ত হয়, এখন মাদারীপুর জেলায়। মাদারীপুর জেলাকে ভেঙে তাঁর নামে একটি পৃথক জেলা গঠিত হয়েছে। তবে শরিয়তউল্লাহর জন্মস্থান এখনো মাদারীপুর জেলার মধ্যেই রয়েছে।
শরিয়তউল্লাহর পিতার নাম আবদুল জলিল তালকদুার। তিনি একটি ছোট তালুকের মালিক ছিলেন। বংশ পরিচয়ে তাঁতি সম্প্রদায়ের বলে মুসলিম সমাজে নিম্নবর্গ হিসেবে গণ্য হতেন। ৮ বছর বয়সে শরিয়তউল্লাহ পিতৃহীন হন। চাচা আজিমউদ্দিন তালুকদারে কাছে লালিত হন। চাচার আদর সত্ত্বেও কিছুটা উচ্ছৃংখলতায় কাটে তাঁর ছোটবেলা। একদিন একটি উৎসবে চাচার তাঁকে ভর্ৎসনা করলে তিনি মনোকষ্ট নিয়ে বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি মাওলানা বাশারত আলি নামে এক শিক্ষকের কাছে কোরান শেখেন। এরপর শিক্ষকের নির্দেশে তিনি হুগলি জেলার ফুরফুরায় গিয়ে দুই বছর আরবি ও ফারসি ভাষা শেখেন। শরিয়তউল্লাহর আরেক চাচা আশিক মিয়া মুর্শিদাবাদ আদালতে চাকরি করতেন। ফুরফুরা থেকে তিনি চাচার কাছে চলে যান। সেখানে এক বছর থেকে তিনি চাচা ও চাচিকে নিয়ে মাদারীপুরে গ্রামের বাড়িতে ফেরার উদ্যোগ নেন। একটি পালতোলা নৌকায় এত দূরের পথে রওয়ানা দেন। পথে নৌকাডুবি হলে চাচা-চাচি প্রাণ হারান। তিনি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও তাঁর মন আর বাড়ি ফিরতে চায় না। তিনি কলকাতায় শিক্ষক বাশারত আলির কাছে ফিরে যান। এসময় বাশারত আলি বিট্রিশশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা যাওয়ার প্রস্তৃতি নিচ্ছিলেন। বাশরাত আলি তখন প্রিয় শিষ্য শরিয়তউল্লাকেও সঙ্গে নেন। ১৭৯৯ থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত তিনি মক্কায় অবস্থান করেন, হজব্রত পালন করেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধর্মশিক্ষা লাভ করেন। তিনি এই দীর্ঘ সময়ে একজন ইসলামি পণ্ডিত ও তার্কিক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি ইসলামি জ্ঞানের আলোকে মানুষকে জাগাতে চাইলেন। সেই চিন্তা থেকেই তিনি শুরু করেন ধর্মীয় আন্দোলন। ইতিহাসে যা ‘ফরায়েজি আন্দোলন’ নামে পরিগণিত।
মক্কায় শরীয়তুল্লাহ ৫ বছর বাঙালি মাওলানা মুরাদের বাসায় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি আরবি সাহিত্য ও ইসলামি আইন শেখেন। এরপর ১৪ বছর তিনি মক্কার হানাফি আইনজ্ঞ তাহির সোম্বলের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই তাহির সোম্বল ছোট আবু হানিফা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি একটি ধর্মীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ১৮২০ সালে শরিয়তুল্লাহ যখন দ্বিতীয় বার মক্কায় যান, তখন বাংলায় ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁর কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ করেন। অর্থাৎ তাহির সোম্বলকেই তিনি প্রকৃত ওস্তাদ মান্য করেছেন। তাঁর পুরো নাম শেখ তাহির আল সোম্বল আল মক্কি। সোম্বল আর মক্কি দুটি পদবি-ই এসেছে স্থানের নাম থেকে। শরিয়াতুল্লাহ দর্শনশাস্ত্র শেখার জন্য কায়রোয় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমিত চেয়েছিলেন। কিন্তু তাহির সোম্বল সেই অনুমতি দেন নি যুক্তিবাদী দর্শন তাঁর চিন্তার গতিপথ বদলে দিতে পারে এই আশঙ্কায়। এমনকি দেশ ফেরার ক্ষেত্রে তিনি আপত্তি করেছিলেন আরো কিছুদিন আধাত্মিক জ্ঞান অর্জনের কথা বলে। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হলেও তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বেশকিছুদিন অধ্যয়ন করেন। ১৮১৮ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং মুসলিম সমাজের জীবনধারা প্রত্যক্ষ করেন। পরে মক্কা গিয়ে ওস্তাদের অনুমতি এনে ধর্মসংস্কারের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
জেমস ওয়াইজ তাঁর ‘নোটস অন দি রেসেস, কাস্টস এন্ড ট্রেডস অব ইস্টার্ন বেঙ্গল’ (১৮৮৪) গ্রন্থে যেমন বলেছেন, ‘তিনটি প্রজন্ম বা পঞ্চাশবছর ধরে অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর (১৭৬৫ খ্রি.) থেকে পূর্ববাংলার মুসলমানদের কোনো অভিভাবক ছিল না। ফলে এলাকার মুসলমান সমাজ তাদের জাতীয় বিশ্বাস থেকে ক্রমশ দূরে সরে যায় এবং তাদের আচারসমূহ হিন্দুদের কুসংস্কারসমৃদ্ধ আচারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখা যায়।’ (পৃ. ২১) এরকম সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে হাজি শরিয়তুল্লাহ ধর্মসংস্কারের উদ্যোগ নেন।
ইসলামের জন্মভূমি আরবদেশে অবস্থানের কারণে হাজি শরিয়তুল্লাহ ইসলামের মূলধারা তথা আরবীয় ধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি ইসলামের ফরজ আদায়ের সংগ্রাম শুরু করেন। তাঁর ধারণায় ইসলামের মৌলচেতনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সচেষ্ট হন। ফরিদপুর জেলা গেজেটিয়ারের (১৯৭৭) ভাষ্যে জানা যায়, `Shariutulla started movement among the most depressed classes of the muslims, the peasants and the artisans towardfs whome even their comparatively fortunate co-religionists were different’. (পৃ. ৬১). এই যে depressed classes-র কথ বা হলো, এর একটা কারণ হতে পারে যে, তিনি নিজে ছিলেন জোলা বা তাঁতি পরিবারের সন্তান। তাই নিজের সম্প্রদায়ের মানুষকেই প্রথম উদ্বুদ্ধ করেন।
মুঈন উদদীন আহমেদের ভাষায়, ‘তিনি শিরক ও বিদাত বিদূরিত করেন।’ শিরক ও বিদাতের তালিকায় ছিলÑ পিরপূজা, কবরপূজা, গাজী-কালু ও পাঁচপিরের শিন্নি, বেড়া-ভাসানো, জারিগান, হাসান-হোসেনের শাহাদাত বরণ স্মরণের অনুষ্ঠান, নাচ-গান-ফাতিহা পাঠ, খতনার অনুষ্ঠান, কান ফোরানি, বিয়ের জাঁকজকম আয়োজন, মেয়েদের প্রথম মাসিক উপলক্ষে ঘরের চারদিকে কলাগাছ রোপণ, রথযাত্রায় অংশ নেয়া প্রভৃতি। তিনি মহরমের মাতম, উরস, মিলাদ প্রভৃতি আয়োজন বন্ধ করে দেন। হিন্দুদের দুর্গাপূজা, কালীপূজা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে চাঁদা দেয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তাঁর এই আন্দোলন ফরিদপুরে আশেপাশের জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমে তিনি ওহাবি আন্দোলনের প্রতিও আনুগত্য প্রকাশ কনেন। তাই শুক্রবারের জুমার নামাজ পড়া ও দুই ঈদে নামাজ পড়ায় নিরুৎসাহ দিলেন। তিনি যখন মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে শিশুর নাভি কাটার ব্যাপারে আপত্তি দিলেন, তখন প্রথমে নীরব প্রতিবাদ ঘটে। তিনি বললেন, নাভি কাটার পদ্ধতি এসেছে হিন্দুদের কাছ থেকে, তাই এটি গোনাহর কাজ। এই ফতোয়া দেওয়ার পরে তিনি অনেকের সমর্থন হারান। তবে নিম্নশ্রেণির মুসলমান তথা কৃষক সমাজ তাঁর সঙ্গে থাকায় অভিজাত মুসলিম এবং হিন্দু জমিদারগণ শরিয়তুল্লাহর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। ১৮৩১ সালে ঢাকার নয়াবাড়িতে সম্ভ্রান্ত মুসলিমদের সঙ্গে তাঁর এই ধরনের মতবাদ নিয়ে বিতর্ক হয়, এবং এক পর্যায়ে তিনি ঢাকা থেকে বিতাড়িত হন। তখন তিনি মাদারীপুরের শিবচর থানার বাহাদুরপুর গ্রামে ফিরে এসে প্রচারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকেই ধর্মসংস্কারের কাজ অব্যাহত রাখেন। তিনি মুসলমানদের ধর্মনিষ্ঠার প্রতি জোর দিয়েছিলেন। কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ তাঁর ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু তাঁর ডাকে কৃষক-প্রজারা যখন সংগঠিত হতে থাকল, তখন প্রশাসন, জমিদার ও অভিজাতশ্রেণি তাঁর কর্মকাণ্ড বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়। ১৮৩৯ সালে তাঁর কর্মকাণ্ডের প্রতি সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ১৯৪০ সালে তিনি মৃতুবরণ করেন।
তাঁর পুত্র মুহসীনউদ্দিন দুদুমিয়া (১৮১৯-১৮৬২) পিতার অসমাপ্ত আন্দোলনের হাল ধরলেন। তিনিও ১২ বছর বয়সে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্কায় প্রেরিত হন। ৫ বছর পরে তিনি দেশে ফিরে এসে পিতার আদর্শ প্রচারে লিপ্ত ছিলেন। শরীয়তুল্লাহর চেয়ে দুদু মিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তি একটুও কম ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিই ছিল বলা যায়। শরীয়তউল্লাহ বক্তা হিসেবে অসাধারণ ছিলেন আর দুদুমিয়া কাজের ক্ষেত্রে বেশি পারদর্শী ছিলেন। পিতার আন্দোলনের মূল চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে তিনি ফরায়েজিদের সংগঠিত করে জমিদার ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেন।
ওস্তাদ দুদুমিয়া লাঠি চালনা শিক্ষা করে তাঁর সাগরেদদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এভাবে তিনি বিশাল এক লাঠিয়াল বাহিনি গঠন করেন। জালালউদ্দিন মোল্লা ছিলেন সেই লাঠিয়াল বাহিনির প্রধান সেনাপতি। অত্যাচারী জমিদার, তালুকদার, জোতদার এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে এই লাঠিয়াল বাহিনি বেশ কয়েকটি আক্রমণ পরিচালনা করে। জমিতদারদের সঙ্গে সংঘর্ষে লাঠিয়ালবাহিনির শত শত সদস্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করে।
দুদুমিয়া বেশ কিছু প্রাশাসনিক সংস্কারেও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শরিয়তুল্লাহ আন্দোলন থেকে এখানে তিদনি আলাদা হয়ে উঠলেন। তিনি জমিদার ও প্রশাসনের অত্যাচার থেকে কৃষকদের রক্ষার জন্য পুরানো পঞ্চায়েতপ্রথা চালু করেন। জনগণের বিবাদ ও মামলা নিষ্পত্তির জন্য নিজেই শালিস ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেন। সরকারি আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা এবং ন্যায়বিচারে অনিশ্চয়তার ফলে প্রজারা হতাশ ছিল। এরা দুদুমিয়ার আদালতেই বিচার নিয়ে আসত। আর সরকারি আদালতে মামলার সংখ্যাও কমতে থাকে।
ফরিদপুরের কানাইপুরের জমিদার সিকদার ও জয়নারায়ণ ঘোষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে পূজার খাজনা রদ করেছিলেন। ১৮৪২ সালে ঘোষদের বাড়ি আক্রমণ করে জমিদারে ছোটভাই মদন নারায়ণ ঘোষকে ধরে নিয়ে তাঁর লাঠিয়াল বাহিনি। জমিদারের মামলায় ১১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে দুদুমিয়া ও তাঁর বাহিনির সদস্যরা মুক্তিলাভ করে। এরপর দুদুমিয়া ঘোষণা করেন যে আল্লার দুনিয়ায় কর ধার্য করার ক্ষমতা কারো নেই। তিনি সবাইকে কর দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এই আন্দোলন বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দুদুমিয়া হয়ে ওঠেন রায়ত ও প্রজাদের ত্রাণকর্তা।
এবার জমিদারেরা ক্ষেপে ওঠে ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে। তারা নীলকরদেরও প্ররোচিত করে ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। পাঁচচরের নীলকর এন্ডু এন্ডারসন ডানলপ ফরায়েজিদের কার্যক্রম সহ্য করতে পারেননি। তিনি তাঁর গোমস্তা কালিকাপ্রসাদ কাঞ্জিলালকে দিয়ে ফরায়েজিদের নানানভাবে হেনস্থা করেন। দুদুমিয়াকে দুবার গ্রেফতার করানো হয় ডাকাতির অভিযোগে। কিন্তু প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যান। এরপর ফরায়েজিদের জোর করে নীলচাষে বাধ্য করা হলে ফরায়েজিরা প্রবল ক্ষুব্ধ হয়। তাদের দমনে ডানলপের পক্ষে গোমস্তা কাঞ্জিলালের লোকজন বাহাদুর দুদুমিয়ার বাড়িতে হামলা করে এবং চারজন চৌকিদারকে খুন করে। দুদুমিয়া মামলা করতে গেলে থানা মামলা নেয়নি। পরে দুদুমিয়ার লাঠিয়াল কাদির বক্স (জ. ১৮১৬ আনু.) ও তাঁর লোকজন কাঞ্জিলালকে ধরে নিয়ে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা থানার মৌডুবি চরে নিয়ে হত্যা করে বঙ্গোপসাগরে লাশ ভাসিয়ে দেয়। ডানলপ পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। জেমস ওয়াইজের লেখা থেকে জানা যায়, ১৮৪৫ সালে ৫ ডিসেম্বর বিরাট এক বাহিনি নিয়ে ফরায়েজিরা পাঁচচলে ডানলপের নীলকুঠি আক্রমণ করে গুড়িয়ে দেয়। পাশের গ্রাম লুঠ করে এবং গোমস্তাকে বন্দি করে।’ এই ঘটনায় ফরিদপুর আদালতে ৬৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং সকলের শাস্তি হয়। পরে উচ্চ আদালতে আপিল করে সকলেই খালাস পায়। ওই হামলায় ডানলপের ক্ষতি হয় ২৬ হাজার টাকা। তবে এঘটনার জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের মাত্রা কমে যায়। কাদির কক্স ফরায়েজি ফৌজের সাহসী নেতা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে আরো কিছু অভিযান পরিচালিত হয়। পরে মুসকুসদপুরের চাঁদহাট নারায়ণদিয়া গ্রামের ধনুমিয়া ও তাঁর অনুসারীরা পিটিয়ে ডানলপকে হত্যা করে।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় দুদুমিয়া ৮০ হাজার লাঠিয়াল নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিলে সরকার ভীত হয়ে তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতায় অন্তরীণ রাখে। পরে সিপাহি বিদ্রোহ দমন হলে এবং ইংলন্ডের রানি ভিক্টোরিয়া ভারতের শাসনভার গ্রহণ করার পরে ১৯৫৯ সালে দুদুমিয়াকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ১৩৭ বংশাল রোডে অবস্থান করেন। সঙ্গে ছিল তাঁর ১৮তম স্ত্রী। এই ছোট স্ত্রী ছির ব্রাহ্মণকন্যা। কথিত আছে যে, জোর করে কিংবা কৌশল করে বৃদ্ধ বয়সে এই বিয়ে তিনি করেছিলেন। তবে ১৮টি স্ত্রী থাকলেও ইসলামের নিয়ম মেনে তিনি একসঙ্গে ৪টির বেশির স্ত্রী সঙ্গে রাখেননি। মৃত্যুর আগে তিনি বাহাদুর গ্রামে ফিরে যান এবং সেখানেই ১৮৬২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পরলোকগমন করেন। নিজ গ্রামে তঁর কবর এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
দুদুমিয়ার মৃত্যুর পরে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে ফরায়েজি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। তাঁর তিন পুত্র গাজিউদ্দিন হায়দার, আদুল গাফ্ফার নোয়ামিয়া (১৮৫২-১৮৮৪) এবং সাইজউদ্দিন আহমেদ। দুদুমিয়ার পরে নেয়ামিয়াই এই আন্দোললেন নেতৃত্ব দেন। দুদুমিয়ার তিনজন বিশ্বস্ত সহকারী মুনশী ফয়েজউদ্দিন মোখতার, বানি ইয়াসিন মিয়া এবং খলিফা আবদুল জব্বার অভিভাবকের মতো নেয়ামিয়াকে বুদ্ধিপরামর্শ দিতেন। পিতার মতো শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাথেন তিনি। প্রতিটি গ্রামে খলিফা ও পেয়াদা নিয়োগ করা হয়। এরাই শাসক ও বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁর আমলে ১৯৭৯ সালে দুটি বড় ঘটনা ঘটে। একটি হলো পালং-এর চক্রবর্তী জমিদারদের সঙ্গে সংঘর্ষ। আরেকটি হলো ফরায়েজি ও তাইউনিদের মধ্যে জুমা বিতর্ক। এই সময় মাদারীপুরের মহকুমাশাসক ছিলেন কবি নবীনচন্দ্র সেন। তাঁর ‘আমার জীবন’ গ্রন্থের তৃতীয় ভাগে এই বিষয়ে উল্লেখ আছে। এসময় জৈনপুরের মাওলানা কেরামত আলি বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করতে এসে ফরায়েজি আন্দোলনের বিরোধিতা করেন এবং তাদেরকে ‘খারিজি’ বলে ফতোয়া দেন। তিনি গ্রামে-গঞ্জে হাটে-বাজারে-মসজিদে ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। এতেও ফরায়েজিরা বিভ্রান্ত হয়। দুইপক্ষের অবস্থানে রংক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা তৈরি হয়। সেই অবস্থান থেকে উত্তরণের জন্য নবীনচন্দ্রের প্রস্তাব মতে প্রকাশ্য বাহাসের আয়োজন করা হয়। কিন্তু ১০ ঘণ্টা বিতর্কের পরেও তার মীমাংষা হয় না। তখন কৌশলে নবীনচন্দ্র নোয়ামিয়াকে বশ করে রংক্তক্ষয় আড়োতে সক্ষম হন।
মাত্র ৩২ বছর বয়সে নোয়ামিয়ার মৃত্যুর পরে ফরায়েজি আন্দোলনে নেতৃত্বে দেন তাঁর ছোটভাই সাইদউদ্দিন আহমেদ (১৮৫৫-১৯০৬)। নবাব সলিমুল্লাহ সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করেন। ইংরেজদের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করে খানবাহাদুর উপাধি লাভ করেন। তাঁর আমলে ফরায়েজি আর তাইউনিদের জুমা বিতর্ক তীব্র হয়। গ্রামাঞ্চলে জুমা ও ইদের নামাজ বৈধ কিনা তাই নিয়ে এই বিতর্ক। একপর্যায়ে সাধারণ মুসলমানরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। দুই পক্ষ ‘জুমাওয়ালা’ আর ‘বেজুমাওয়ালা’ নামে পরিচিত হতে থাকে। মাদারীপুরে বাইরেও এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০৩ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে দুটি বির্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর জানা যায়। ফরায়েজিদের পক্ষে বিতর্কে নেতৃত্ব দেন খলিফা আবদুল জব্বার আর অপরপক্ষে থাকেন মৌলবি ইউসুফ আলি।
তাঁর পুত্র আবু খালিদ রশিউদ্দিন বাদশামিয়া (১৮৮৪-১৯৬২) ফরায়েজি আন্দোলনের চেয়ে খেলাফত আন্দোলনের প্রতি বেশি দায় বোধ কনে। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনের জন্য তিনি বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা দেন নবাব সলিমুল্লাহকে। অসযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় আলিপুর কারাগারে নীত হন। তিনি ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে দেশের বাইরেও পরিচিত ছিলেন। হজ্জ পালন করতে গেলে সৌদি ারবের তঃকালীন সুলতান তাঁকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানান। ১৯২৬ সালে শেরেবাংলা কৃষক প্রজার্টির পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ১৯৪০ সালে তিনি ‘বারবণিতা উচ্ছেদ আন্দোলন’ শুরু করেন এবং চাঁদপুর থেকে ৫৭০ জনকে উদ্ধার করেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান নেজামে ইসলামি পার্টির হয়ে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৫১ সালের ১৩ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র পির মুহসীনউদ্দিন দুদুমিয়া (১৯১৭) নাম ধারণ করে ফরায়েজি আন্দোলনের ধারা সমুন্নত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু দ্বিতীয় দুদুমিয়াও এর হাল ধরে রাখতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে তিনি ফরিদপুর মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে তিনি এমএলএ নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে তিনি এমএনএ নির্বাচিত হন । ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে ‘বাংলাদেশ ফরায়েজি জামাত’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
ফরায়েজি আন্দোলনের জন্ম তয় তৎকালীন ফরিদপুর, বর্তমান মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার বাহাদুর গ্রামে। ক্রমে িে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৩৭ সালে স্থানীয় ‘দর্পণ’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয় শরিয়তুল্লাহর ১২০০ তাঁতি ও মুসলম্না অনুসারী রয়েছে। ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, যশোর, খুলনা, পাবনা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলায় এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৪৩ সালে বেঙ্গল পুলিশের প্রতিবেদনে দুদুমিয়াকে ৮০ হাজার লোকের নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৮৭৯ সালে আসামের এক প্রতিবেদনে সিলেট, গোয়ালপাড়া, লক্ষ্মীপুর, শিলচর, দারাং ও কামরূপ জেলায় ফরায়েজিদের অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে।
শরিয়তুল্লাহর উত্তরসূরিরাই ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্বে দিলেও এর বাইরে বেশ কয়েকজন ফরায়েজি নেতা ছিলেন, যাঁদের অবদানকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যায়। চাঁদপুরে প্রথম খলিফা ছিলেন মুনির উদ্দিন। তিনি হাতিয়া থেকে চাঁদপুরে এসেছিলেন আরবি এবং ফার্সি শেখার জন্য। হাজি শরিয়তুল্লাহর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি চাঁদপুর অঞ্চলের প্রথম খলিফা নিযুক্ত হন। মুনিরউদ্দিনের জামাতা হামিদ উল্লাহও পরে খলিফা হন। পাহলোয়ান গাজী মুনশি নামে একজন তত্ত্বাবধায়ক খলিফা ছিলেন তার অধীনে ২৮টি গ্রাম ছিল ফরায়েজিদের। এ সময় চাঁদপুরে কোনো আইনি আদালত ছিল না। ফরায়েজিরাই বিচারকাজ পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করত। ফরিদপুর শহরের কমলাপুরের জালালউদ্দিন মণ্ডল ফরায়েজি হয়ে কোরান অধ্যয়ন করেন। আরবি ও ফারসি ভাষায় দখল অর্জন করায় তাঁর পরিবারে পদবি মণ্ডলের পরিবর্তে মোল্লা করা হয় শরিয়তুল্লাহর নির্দেশে। তিনি একজন কুস্তিগীর হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। দুদু মিয়া এই জালাউদ্দিন মোল্লাকেই তাঁর লাঠিয়াল বাহিনির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব তিদয়েছিলেন। যশোরের আগার ওেমাহাম্মদ সুতকারের ছেলে ফাইজউদ্দিন মোখতার ছিলেন কুস্তিগির। কলকাতায় গিয়ে তিনি তিতুমিরে পেশাদার কুস্তিদলের সদস্য হন। ১৮৪০ সালে তিনি ফরিদপুরে আসেন এবং শরিয়তুল্লাহর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি জালালউদ্দিন মোল্লার মেয়েকে বিয়ে করে ফরিদপুরেই বাস করেন। ফরিদপর বিচারিক আদালনে তিনি মোখতারি কাজ করতেন। ১৮৪৯ সালে দুদুমিয়া তাঁকে ফরায়েজিদের লিগ্যান এটর্নি নিয়োগ করেন। দুদমিয়িার মৃত্যুর পরে তাঁর পুতদের অভিভাবক নিযুক্ত হন তিনি।
ফাইজুদ্দিন মোখতারের বড় ছেলে মৌলবি কফিলউদ্দিন আহমেদ বাহাদুরপুর এবং ঢাকার মোহনিসিয়া মাদ্রাসা পড়ালেথখা করেন। ১৮৮৫ সালে ফরিদপুরে ফিরে ফরায়েজি আন্দোলনে যোগ দেন। খানবাহাদুর সাইদউদ্দিন তাঁকে প্রথমে খলিফা ও পরে তত্ত্বাবধায়ক খলিফা নিয়োগ করেন। তিনি ফরিদপুর ও গোয়ালন্দ মহকুমার দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর তত্ত্বধানে দুইজন বড় খলিফা ছিলেন, একজন জাহানপুরের কাজেম মোল্লা, আরেকজন তালমার মুন্সি গিয়াসউদ্দিন শাহ ফকির। এরকমভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খলিফা ও তত্ত্বাধায়ক খলিফা নিয়োগ করা শরিয়তুল্লাহর শেস সময়ে। পরে দুদুমিয়া িে খলিফাদের নিয়েই স্বাধীন দেশ গঠনের পরিকল্পন করেছিলেন।
ফরায়েজি খিলাফত ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল সকল ফরায়েজিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা। এতে সর্বোচ্চ পদের নাম ছিল ওস্তাদ। এর পরে ছিল উপরস্থ খলিফা। তারপর ছিল তত্ত্বাধায়ক খলিফা। এরপর গ্রাম খলিফা এবং ওয়ার্ড খলিফার পদও বিদ্যমান ছিল। আর ২০০ তেকে ৫০০ ফরায়েজি পরিকার নিয়ে একটি ফরায়েজি ইউনিট ছিল। প্রতি ইইনিটে একজন করে খলিফা নিযুক্ত ছিল। দশটি বা তার বেশি গ্রাম নিয়ে একটি করে সার্কেল ছিল, যাকে বলা হতো গির্দ। গির্দের প্রধান খলিফা হলেন তত্ত্বাধায়ক খলিফা। এদের এক বা একাধিক পেয়াদা বা পিওন ছিল। ইউটেন খলিফারা দৈনিবক ফরজ আদায়ের বিষয়টি দেখভাল করতেন। তাদের কল্যাণে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতেন। বিয়ে, তালাক, সম্পদ বাঁটোয়ার, ঝগড়া, বিবাদ সব সকল কাজে খলিফাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ছিল। এলাকায় মসজিদ না থাকলে মসজিদ নির্মাণ ও ইমাম নিয়োগের মাধ্যমে ফরায়েজি আদর্শ প্রচারের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। আর এলাকায় উৎপাদিতে ফসল থেকে জাকাতের মতো সাহায্য নেওয়া হতো ইউনিটের কার্য পরিচালনার খরচ মেটানোর জন্য। এভাবে প্রশাসন ব্যবস্থা চালু ছিল ফরায়েজিদের মধ্যে। দুদুমিয়ার পরে নোয়ামিয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা চালু ছির তীব্রভাবে। তারপর থিতিয়ে আসে।
তবে দুদুমিয়ার মৃত্যুর পরে এই আন্দোলনে ভাটা পড়ার কারণ কেবল নেতৃত্ব-সংকট নয়। আদর্শেরও সংকট বর্টে। তাঁর উত্তরসূরিরা রাজনৈতিক নেতা হয়েছেন, নতুন দল গঠন করেছেন, নির্বাচেনে জয়ী হয়ে আইনসভায় গেছেন। কিন্তু ফরায়েজি আন্দোলনকে যুগোপযোগী করার দরকার তাঁরা বোধ করেন নাই। ফরায়েজিরা তাঁদের অনুসারীদের বাইরের মুসলমানদের বলত রেওয়াজি। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে রেওয়াজিরাই টিকে গেছে, আর ফরায়েজিরা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাহ্মসমাজের মতোই অনেকটা। কিন্তু ব্রাহ্মধর্ম বিলুপ্ত হলেও ব্রাহ্মদর্শন এবং রেনেসাঁকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ফরায়েজি আন্দোলনও তেমনিভাবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ফরায়েজিরা চেয়েছিল ইসলামের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে। এটিও রেনেসাঁ বটে!। ফরায়েজিরা বর্ণপ্রথা বিলোপ করেছে, কৃষকদের প্রতি শোষন-জুলুম বন্ধ করেছে, জমিদার-নীলকর ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে। বাঙালির মুসলমানের ইতিহাসে শরিয়তুল্লার এই আন্দোলনন জায়গা পেয়েছে। কিন্তু এত বড় প্রভাববিস্তারী আন্দোলন কেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। শরীয়তুল্লাহর আদর্শের উত্তরাধিকারী হয়েছে তাঁর রক্তের উত্তরসূরিরা। তাই পিরবাদের বিরোধিতা কররেও এরা পিরবাদেই আটকে রয়েছে। এখনও বাহাদুরপুর গ্রামে শরীয়তুল্লাহ ও তার ছেলে দুদুমিয়াকে পির হিসেবেই মান্য করে ওরসের মতো আয়োজন চলে। তাছাড়া জমিদারপ্রথা বিলোপ হওয়ায় কৃষকদের সংগঠিত করার ব্যাপারে ধর্মীয় উত্তেজনা চালু রাখা যায় না। এলাকার জমিদাররা ছিল হিন্দু। তাই জমিদারদের বিরুদ্ধে শোষিত প্রজার আন্দোলনকেও হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের আন্দোলন হিসেবে মনে করে অনেকে যুক্ত হয়েছে, এখন তো আর হিন্দু প্রতিপক্ষ নেই। ধর্মপালনের প্রতিবন্ধকতা হলে ব্রিটিশ সরকার তথা হিন্দু জমিদারদের অভিযুক্ত করা তে, কিন্তু ১৯৪৭ এর পরে তো আর খ্রিস্টান কিংবা হিন্দু প্রতিপক্ষ নেই। তাই আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। আরেকটি বড় ব্যাপার হলো, এখানের মুসলিমরা পঞ্চদশ দশক থেকেই একধরনের জীবনাচরণ বেছে নিয়েছিলেন। সেটি এই ভারতবর্ষীয় লোকাচার, যার সঙ্গে সনাতন আচার-অনুষ্ঠানের যোগ ছিল। কিন্তু শান্তিকামী মুসলমান তাতে ধর্মীয় উপকরণ না খুঁজে সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপকরণ খুঁজেছিলেন বলে সমস্যা হয়নি। ইসলামের মূলচেতনার উপর ভিত্তি করে অঞ্চলভিত্তিক লোকসংস্কৃতিকেই মুসলমানরা লালন করে এসেছে। তাই তারা ওরস কিংবা মিলাদের মধ্যে হিন্দুদের মেলা-মহোৎসবের মিল থাকলে তাতে ধর্মীয় কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখেনি। শরিয়তুল্লাহ এসবের মধ্যে অনৈসলামিক কাজ দেখলেও ‘রেওয়াজি’রা তা মনে করেনি। তাই দুদুমিয়ার পরে আবার রেওয়াজিরা অর্থাৎ লোকসংস্কৃতির ধারক সাধারণ মুসলিম জনগণ ফরজ আদায়ের ব্যাখ্যাকে নিজেদের লোকসংস্কৃতিজ্ঞান দিয়েই বিচার করেছে। এভাবে ফরায়েজি আন্দোলন আর অগ্রসর হয়নি।
লেখক : উপপরিচালক, বাংলা একাডেমি

বিশ্বের অন্যতম মুসলিম দেশ ইরান। সে দেশে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার উৎসব সাধারণভাবে এদেশের মতো আনন্দ উদ্দীপনায় পালিত হয় না, কারণ তাঁদের সংস্কৃতিতে ঈদে নওরোজ বা ফার্সি ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন শুভ নববর্ষ ১ ফারওয়ার্দিন ঈদ হিসেবে জাঁকজমক ও আনন্দ উদ্দীপনার মধ্যে পালিত হয়। যার প্রস্তুতি চলে সারা বছরব্যাপী। ইরানের ঈদে নওরোজ উৎসব চলে বছরের প্রথম দিন থেকে প্রায় পনেরো দিন পর্যন্ত। বছরটি শুরু হয় বসন্তকালে। যখন ফসলের ক্ষেতে কচি ধানের সবুজ ডগা লিকলিক করে ফসলের মাঠকে দেয় অনিন্দ্য এক রূপ।
ইরানে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা অনাড়ম্বরভাবে পালন করা হয় এবং সে ইতিহাস খুঁজতে গেলে শিল্প, অর্থ, সংস্কৃতিসমৃদ্ধ এই দেশটির হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে পেছন ফিরে তাকাতে হবে বহুদূর। এশিয়া অঞ্চলের এই দেশটি পারস্য সাম্রাজ্য কয়েক হাজার বছর ধরে লালন করে আসছে তাঁদের নিজের সংস্কৃতি। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি লালন করে এ দেশটি এখনও এগিয়ে যাচ্ছে আরও সমৃদ্ধির পথে। ফার্সি, তুর্কি, আরবি, উর্দু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর এ দেশটির রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি। তাঁদের উচ্চশিক্ষা ফার্সিতে চলছে এবং সাধারণভাবে সমগ্র জনগোষ্ঠী ফার্সিতেই কথা বলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ যেমন ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশের আচার-আচরণ থেকে এরা (ইরানিরা) শিক্ষা-সংস্কৃতি-শিল্পে অনেক বেশি অগ্রসর এবং নিজস্বতায় সমৃদ্ধ।
নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের ভেতর প্রাক-ইসলামী যুগে পারস্যে একেশ্বরবাদের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দারিয়ুসকেই মনে করা হয়। নৃতত্ত্ব¡বিদের গবেষণায় সে দেশের পুরোনো শহর সিরাজ, ইসপাহান, হামাদান, বখতেরান, খোরাশান প্রদেশের বিভিন্ন পাহাড়ের গায়ে খোদিত শিলালিপি, রাজা-বাদশাহদের খোদাই করা প্রাসাদ থেকে অনুমান করা যায় যে, সেদেশে সভ্যতার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। প্রাচীন সাসানীয় যুগে (২২৪-৬৫১ খ্রিস্টপূর্ব) তাঁরা অগ্নিউপাসক ছিলেন বলে মনে করা হয়। প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো একটি প্রাচীন মন্দির এখনও সিরাজের পারসেপোলিস নামক শহরের উপকুলে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। উন্নত এক জাতি হিসেবে হাজার বছর ধরে পারসিক জনগণ শিক্ষা, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, অঙ্কশাস্ত্র জোতির্বিদ্যা ইত্যাদিতে এক স্বর্ণোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিল।
ইরানের দিনপঞ্জি ফার্সি তারিখ এবং ইসলামী হিজরি সনের শুরু ধরা হয় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (দঃ)-এর হিজরতের সময়কাল থেকে। ফার্সি তারিখও ওই সময় থেকে গণনা করা হয়। হিজরি সন হিসাব হয় চন্দ্রমাস হিসেবে কিন্তু ফার্সি তারিখ গণনা হয় খ্রিস্টীয় সনের মতো। চন্দ্রবছর প্রতিবৎসর প্রায় ১১ দিন (১০ দিন ২১ ঘণ্টা ১৪ সেকেন্ড এর মতো) সৌর বছরের চেয়ে কম হওয়ায় হিজরি সন এখন চলছে ১৪৩৮ কিন্তু ফার্সি সন চলছে ১৩৯৭। হিজরি মাসের প্রথম মাস মহররম মাস। কিন্তু ফার্সি প্রথম মাস ফারওয়ার্দিন (ইংরেজি ২১ মার্চ)। ইরানে ৪টি ঋতু বিদ্যমান। প্রতিটি তিন মাস হিসাবে প্রথম তিন মাস বসন্তকাল (ফারওয়ার্দিন, উরদিবেহেশত ও খোরদাদ) এরপর শীতকাল (তীর, মোরদাদ, শাহরিয়ার) বর্ষাকাল (মেহের, আবান, আজার) এবং গ্রীষ্মকাল (দেই, বাহমান, ইসফান্দ)। নতুন ফসলের আহ্বান মাঠে মাঠে কৃষকের ব্যস্ততা, গ্রীষ্মের দাবদাহ শেষে ঋতুরাজ বসন্তের শুরুতে ইরানে নববর্ষের প্রথম দিন তাঁরা পালন করেন ঈদে নওরোজ মহাআনন্দে, মহাসমারোহে। নতুন জামাকাপড়, উন্নত আপ্যায়ন, সামাজিক সম্মিলন, অতিথি আপ্যায়ন একে অপরকে নানা উপহার ইত্যাদির সমন্বয়ে ঈদে নওরোজ শুভ নববর্ষ ইরানিদের কাছে বর্ণময় সুন্দর। রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদের বোনাস ও দীর্ঘকালীন ছুটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি, নগর-বন্দরকে আলোকিত সাজসজ্জা, বাড়ি-ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি কাজ করা হয় ঈদে নওরোজ আসার কয়েকদিন আগে থেকেই। প্রথম দিন থেকে এই মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত তাদের নানা অনুষ্ঠানাদি লেগেই থাকে। সবচেয়ে মজার দিন ১৩ ফারওয়ার্দিন, ওইদিন তারা সবাই ঘরের বাইরে বেড়িয়ে পড়েন, খাওয়া দাওয়া বাইরে করেন, আমাদের দেশের বনভোজনের মতো। এই দিনটির বিশেষ মাস সিসদাই বিদার (সিসহাদ ১৩ তারিখ, বিদার অর্থ মিলন)। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, গোটা ইরানের মানুষ বছরের ওই নির্দিষ্ট দিনে বনভোজনে মিলিত হয়, পারিবারিক গ্রুপের মাধ্যমে। ঈদে নওরোজে ধর্মীয় রীতির মধ্যে ইসলামী কোনো রীতির প্রতিফলন অনুপস্থিত।
নিবন্ধে ঈদে নওরোজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলতে হয় ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা এ দুটি উৎসবে ইরানে তেমন প্রাণবন্ত নয়। আমাদের এই উপমহাদেশের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নয়। সংখ্যালঘু সুন্নি মুসলমানগণ দল বেঁধে জামাতের সাথে নামাজ পড়েন বড়ো বড়ো শহর এবং সুন্নি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। ঈদের নামাজ ওয়াজিব এবং অন্যান্য বিশেষ করে শিয়া মুসলমানরা এই নামাজ ফজরের নামাজের সঙ্গেই আদায় করে নেন। ঈদ অ্যাডভান্স, ঈদ বোনাস ওই সময়ে দেয়া হয় না, দেয়া হয় ঈদে নওরোজের প্রাক্বালে। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর-এর শাসন আমলে ইরানে ইসলামের বিজয় পতাকা ওড়ে। ১৯৭৮-৮১ খ্রিস্টাব্দে ইসলামী বিপ্লব হওয়ার পর প্রায় ৩২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু ঈদে নওরোজের পুরোনো ঐতিহ্য এখনও সে দেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড়ো উৎসব। ইরানের মুসলিম জনগোষ্ঠী ঈদুল আজহার চন্দ্র মাসে অনেকে পবিত্র হজ পালন করেন। হজের যাবতীয় রীতি পালন করেন। ঈদুল আজহার কোরবানীতে দুম্বা, উট ইত্যাদি কোরবানী করেন। বিত্তশালী ইরানিদের অনেককে কোরবানী দিতে দেখা যায়।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত থেকে ইরানে কর্মরত চিকিৎকগণ আমরা কয়েকটি পরিবার মিলে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার উৎসব পালন করতাম এবং নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ঈদের জামাতের ব্যবস্থা করা হতো। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ইরানে অবস্থানকালীন এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তাছাড়া অন্যান্য অনেক মুসলিম প্রবাসী তাঁদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসগুলোতেও বিশেষ ব্যবস্থায় ঈদের উৎসব পালন করেন। ঘরোয়াভাবে আয়োজিত এ আনন্দ অনুষ্ঠানগুলো পরিবার-পরিজন নিয়ে হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে কাটিয়ে দেয়া হতো ইরানে। এই দুটি দিনে শুধু ওই দিনের জন্য সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। দীর্ঘ ছুটি না থাকার ফলে ঈদ অনুষ্ঠানগুলো সংক্ষিপ্তভাবেই শেষে করা হতো। বিদেশ বিভূঁইয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে সেই আনন্দময় স্মৃতিগুলো খুব সুখময় ছিল বৈকি। লেখক : বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব

তাদের সিংহভাগেরই টার্গেট থাকতো থার্টি থ্রি অর্থাৎ ৩৩ নাম্বার। সারাবছর পড়াশোনার সাথে আলাপ আলোচনা নেই কিন্তু পরীক্ষার পূর্বে এদেরকেই দেখা যেত মনোযোগী পরীক্ষার্থীর ভূমিকায়।
ছাত্রজীবনে দেখেছি সবচেয়ে উত্তম এবং সংক্ষিপ্ত সাজেশন তৈরি করতে পারতো এসব নকলবাজেরা। দেখা গেছে একটি রচনারই নকল নিয়ে গেছে পরীক্ষার হলে আর সৌভাগ্যক্রমে সেটিই চলে এসেছে। লিখলে নিশ্চিত থাকতো ২০ এর মধ্যে ১২ মার্কস পাবেই পাবে। আর বাকি ৮০ মার্কস থেকে মোট ৩৩ পূর্ণ করা খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না।
নকল করারও ছিল নানা পদ্ধতি। শুনে বা দেখে বিস্মিত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। নকল প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে এত মাথা না খাটিয়ে সে সময়টা পাঠ্যে মনোযোগ দিলে ভালো ফলাফল এমনিতেই নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। তারপরও কেন শিক্ষার্থীরা নকল করত। আত্মবিশ্বাসের অভাবই নকল করার মূল কারণ।
সেই সময়ের নকলের কিছু কালচার নিয়ে আলোকপাত করা যাক। সবচেয়ে কমন স্টাইল ছিল পুরিয়া। পরীক্ষার আগের রাতে না ঘুমিয়ে হোমিওপ্যাথি সাইজের কাগজে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরে লিখে ভরিয়ে ফেলা হতো সম্ভাব্য সব প্রশ্নের উত্তরে। আবার কেউ কেউ ফুলহাতা শার্টের বাম হাতের তালু থেকে শুরু করে বাঁ দিক বরাবর যতদূর লেখা যেত সেটুকু নকলে ভরিয়ে ফেলত। এছাড়াও আরো কিছু উপায় ছিল। বারো ইঞ্চি স্কেল, সেট স্কয়ার, টি স্কয়ার, জ্যামিতি বক্স, পেন্সিল বক্সের প্রতিটি অংশই নকল করার জন্য উপযুক্ত জায়গা ছিল। এমনকি পরীক্ষার প্রবেশপত্র এবং পুরোনো প্রশ্নপত্রে পেন্সিল দিয়ে নকল লিখেও পরীক্ষা পাস করেছে অনেকে। পরীক্ষার হলে খাতা পরিবর্তন করে লেখাও নকলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এক শ্রেণির হল পরিদর্শকের সহযোগিতাও নকলবাজদের নকল করতে উৎসাহিত করত। তবে নকলবাজদের মধ্যে যারা একটু ভীতু টাইপের তাদের অনেকে বাম হাতের নখে পেন্সিল দিয়ে লিখে নকল করত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আর ডান হাতের নখে লেখার কাজটি করে দিত আরেক নকলবাজ।
আরেকটি জনপ্রিয় কালচার ছিল বলপয়েন্ট কালচার। কলমের গায়ে সুই অথবা কাটা কম্পাস দিয়ে লিখে একটার পর একটা কলম নকল লিখে ভরিয়ে ফেলা হতো। এক্ষেত্রে সোনামুখি সুইয়ের ব্যবহার অধিক উপযোগী ছিল। কলমের যদি প্রাণ থাকতো তবে মানুষের চেয়ে কলমের উপলব্ধি হতো বেশিÑ লাইফ ইজ নট এ বেড অফ রোজেস। এ জাতীয় নকলে অভ্যস্ত পরীক্ষার্থীদেরকে ঘন ঘন কলম পরিবর্তন করতে দেখা যেত। হল পরিদর্শক কলমের অবয়বের উপর তীক্ষè নজর রাখলেই নকলবাজকে সহজেই চিনহিত করতে পারতেন। এ কালচারে অভ্যস্ত পরীক্ষার্থী পর্যাপ্ত আলো সরবরাহ না পেলে বিরক্তি বোধ করতেন। কারণ আলোর যথার্থ প্রতিফলন না হলে কলম থেকে নকল উদ্ধার করে খাতায় প্রতিস্থাপনে বিঘ্নতা সৃষ্টি হতো। আরো আশ্চর্য লাগতো কলমের হেড বা খাপা কালচারের কথা শুনে। এখানে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো শুধু পরীক্ষার্থীকে ঘন ঘন বলপয়েন্টের হেড বা খাপ পরিবর্তন করতে হতো। তবে এ জাতীয় নকলবাজদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে কালি নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া বলপয়েন্টের হেড সংগ্রহে পরীক্ষার আগে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যেত।
আরেকটা সনাতন পদ্ধতিতে নকল করার কথা আজকাল আর শোনা যায় না বা সুযোগ নেই সেটি হলো বেঞ্চিং সিস্টেম। পরীক্ষার আগের দিন কিংবা পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে দপ্তরির সাথে আঁতাত করে বেঞ্চের ওপর প্রশ্নের উত্তরগুলো লিখে রাখা হতো। তবে এক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা শেষ করে ব্লেড দিয়ে বেঞ্চ চেঁচে পরবর্তী পরীক্ষার্থী উপযোগী করে রেখে যেতে হতো। এ সিস্টেম গ্রামগঞ্জের সেন্টারগুলোতে আজো কমবেশি চোখে পড়লেও শহরের স্কুল কলেজগুলোতে আধুনিক আসবাবপত্র তথা ডেস্ক ব্যবহারের কারণে অনেকটা বিলুপ্তির পথে।
বেঞ্চিং সিস্টেম নিয়ে এক শিক্ষকের মুখে শোনা অভিজ্ঞতার কথা বলছি। পরীক্ষার হলে একদিন লক্ষ্য করলেন একটি বেঞ্চের এবং উত্তরপত্রের লেখা পুরোপুরি মিলে গেছে। কালবিলম্ব না করে পরীক্ষার্থীকে শিক্ষক পাঠালেন পরিষ্কার একটি ইট নিয়ে আসতে। ছাত্রটি হয়তো ভেবেছিল শাস্তি হিসেবে ইটটি হাতে করে রোদে দাঁড়িয়ে রাখা হবে। কিন্তু ঘটল একেবারে অন্যরকম ঘটনা যা কল্পনাতেই আনতে পারেনি পরীক্ষার্থী। শিলপাটার সাথে আমাদের সবারই কমবেশি পরিচয় রয়েছে। শিক্ষক তখনই ইটটিকে বানালেন শিল আর বেঞ্চকে বানালেন পাটা। শিলপাটার মতো ইট আর বেঞ্চ ঘষাঘষির মাধ্যমে নকলগুলো উদ্ধারের অনুপযোগী করে দিয়ে বললেন, এবার সুবোধ বালকের মতো পরীক্ষা দাও। বর্তমানে নকলের যে কালচারটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে সেটি হলো মাইক্রো সিস্টেম। পরীক্ষার আগে পুরো বই কিংবা সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা নোট ফটোকপি মেশিনে অর্ধেক সাইজে নামিয়ে এনে নকল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে পরীক্ষার আগে মার্কেট চলাকালীন বা গভীর রাতে ফটোকপির দোকান যদি বাহির বা ভেতর থেকে বন্ধ দেখা যায় তাহলে সন্দেহের উদ্রেক হয়। ফটোকপি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ নকলবাজদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
অনেক সময় অভিভাবকদের নির্দেশ থাকে নকল করার উপযোগী পরিবেশ না পেলেও খাতা যেন লিখে ভরিয়ে ফেলা হয়। এ রকম একটি ঘটনা না বলে পারছি না। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পরীক্ষার্থী প্রস্তুত। কিন্তু পরীক্ষকের কড়া প্রহরার কারণে নকল বের করাই দুরুহ হয়ে পড়ল। পরীক্ষক বললেন, কি ব্যাপার তুমি লিখছো না যে। পরীক্ষার্থী তখনই লিখতে শুরু করলো। সেদিন পরিবার সম্পর্কে একটি প্রশ্ন এসেছিল। পরীক্ষার্থী যা লিখেছিল তার কিছু অংশ প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরছিÑ
‘পরিবার বলতে আমার বাড়ির চেয়ারকে বোঝায়। পরিবার বলতে হেড ছাড়া কলমকে বোঝায়। পরিবার বলতে আমার জানালা দিয়ে দেখা ঐ বাড়ির গরুটাকে বোঝায় যে গরুর চারটি পা আছে, দুটি চোখ আছে, দুটি কান আছে, দুটি শিং আছে…।’
পরীক্ষার হলে নকল করার সুযোগ না পেয়ে অনেকে রাত জেগে টিভিতে দেখা সিরিয়ালের ঘটনাও লিখে আসে। একবার এক পরীক্ষার্থী তিন ঘণ্টার পুরোটা সময় বসে না থেকে আগের রাতে হিন্দি ছবির পুরো ঘটনা লিখে চলল। তিন ঘণ্টা সিনেমার ঘটনা লেখার পরও তার লেখা যেন শেষ হচ্ছিল না। পরীক্ষক খাতা টেনে ধরে বললেন, স্টপ রাইটিং। ছেলেটি লিখেই চলছে এবং সে অবস্থায় পরিদর্শকের কাছে একটা মিনিট সময় চেয়ে বলে উঠলÑ স্যার, নায়ক-নায়িকার মিল দেওয়া বাকি। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নকল পারদর্শিতায় মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না কোনোকালে। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা অসাধারণ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকত। বর্ণিত তরিকাগুলো ছাড়াও খোপা, সেমিজ এবং জামার উল্টোপিঠ নকলের কাজে ব্যবহার করত তারা। কিছু কিছু মুহূর্তে নারী পরিদর্শক ছাড়া মেয়েদের কাছ থেকে নকল উদ্ধারের চিন্তা করাটাই ছিল বিপদজনক।
প্রযুক্তি উৎকর্ষতায় নকল পদ্ধতিতেও এসেছে ডিজিটাল হাওয়া। চাক্ষুষ প্রমাণ দেখতে চাইলে ঝটপট দেখে ফেলুন সঞ্জয় দত্ত অভিনীত ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ হিন্দি সিনেমাটি। এমনও শোনা যাচ্ছে আজকাল ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ডে সীমিত সংখ্যক শব্দ সেভ করে এনেও নকল করছে অনেকে।
মাদ্রাসা পর্যায়ের অনেকেই ধোয়া তুলসি পাতা নয়। তাদের কেউ কেউ টুপির ভেতরে নকল রেখে কাজটি করে থাকে। এছাড়া রুমাল কালচারের কথাও উল্লেখযোগ্য। পরীক্ষার হলে অনেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে অন্যের দেখে লেখার অভ্যাস রয়েছে যা নকলের শামিল।
নকল করে পাস করে মামা চাচাদের ধরে হয়তো বাংলাদেশে চাকরি পেয়ে যায় অনেকে। ফলে বঞ্চিত হয় প্রকৃত মেধাবীরা। যারা নকল করে পাস করে তাদের অনেকেই বাংলা বা ইংরেজিতে ভাব বিনিময় করার কৌশল রপ্ত ব্যর্থ হয়। সৃজনশীল কিছু করে দেখানো তো দূরের কথা এক ধরনের হীনম্মন্যতা বোধ এদের তাড়িত করে ফেরে। পারিবারিক এবং সামাজিক সর্বক্ষেত্রে গুটিয়ে রাখা ভাব দেখা যায়। কারণ নকল করে পাস করার ফলেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে। মোটকথা এক ধরনের অর্ন্তজ্বালা সবসময় নকলবাজদের তাড়িত করে। আশার কথা বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন অনেকটাই নকলবাজদের কালো থাবা থেকে মুক্ত। কিন্তু শোনা যায় সেখানেও লেগেছে ডিজিটালি হাওয়া। কাজেই আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে যারা দেশকে পরিচালিত করতে চান তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলতে চাই বাংলাদেশে পরীক্ষার হলে নকল নামে কোনো শব্দ ছিল/আছে এটাকে ভুলে যেতে হবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, ফোকলোর, জাদুঘর ও মহাফেজখানা বিভাগ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা

সরব উপস্থিতি। “ছন্দে খুশির গন্ধ” গ্রন্থটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
“ছন্দে খুশির গন্ধ” একটি শিশুতোষ ছড়ার বই। পাতা প্রকাশ গ্রন্থের কোয়ালিটির সাথে কখনো আপোষ করে না, তারই প্রমাণ এই বই। মোট ৫৩ টি ছড়া আছে বইটিতে। প্রচ্ছদ শিল্পী মুবাশ্বির দুহা’র করা শিশুদের উপযোগী নান্দনিক প্রচ্ছদ সহজেই নজর কাড়ে। পাঠককে আকৃষ্ট করে বইটির প্রতি। বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন “লাল পাহাড়ির দেশে যা… রাঙামাটির দেশে যা…” গানটির লেখক বিখ্যাত কবি শ্রী অরুণ কুমার চক্রবর্তী। তিনি অল্প কথায় সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখকের মানুষ, কবি আর ছড়াকার সত্ত্বাকে। আর লেখক সুশান্ত নন্দী এ বইটি উৎসর্গও করেছেন দু’জন লেখককে —- ত্রিপুরার ছড়াকার অমল কান্তি চন্দ ও পশ্চিমবঙ্গের কবি সৌমিত বসুকে।
সুশান্ত নন্দী তাঁর “ছন্দে খুশির গন্ধ” বইয়ের ছড়া রচনায় বেছে নিয়েছেন সহজ শব্দ আর সরল বিষয়। আর সহজ সহজ শব্দ আর সরল বিষয় বাছাই শিশুতোষ ছড়ার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। পুরো বইজুড়ে এই বিষয়টা বিদ্যমান। ছুটি, মাকে, আমার একুশ তোমার একুশ ছড়াগুলো পড়লে এ বিষয়টা স্পষ্ট বুঝা যায়। যেমন “ছুটি” ছড়ায় তিনি লিখেছেন-
“ ছুটি ছুটি দে ছুট
দীঘা আর জুনপুট,
খুব বেশি নয় দূর
আমাদের তারাপুর।”
কিংবা “মাকে” ছড়ায় আমরা দেখি-
“ও মা আমার ইচ্ছে করে
আকাশ পথে উড়বো,
স্বপ্ন চোখে অলীক পুরে
পরীর সাথে ঘুরবো।
মায়ের সাথে যাবই আমি
রূপকথার দেশে,
ইচ্ছে গুলো পাখীর ডানা
ডাকবে ভালোবেসে।”
জন্মস্থান ও মাতৃভূমির প্রতি মানুষের চিরন্তন আকর্ষণ, যা কখনো বিচ্ছিন্ন হবার নয়। লেখকের মাঝে এই আকর্ষণ অন্য দশ জনের চেয়ে একটু বেশিই দেখা যায়। আর এর প্রতিফলন দেখা যায় তাঁদের সৃষ্টিকর্মে। সুশান্ত নন্দীও এ থেকে দূরে রাখতে পারেন না নিজেকে। আর এর প্রতিফলন আমরা দেখি ইন্ডিয়ান আর্মি, জুম পাহাড়ের গান, আমার বাংলা, বীর সুভাষ প্রভৃতি ছড়ায়। তিনি লিখেছেন-
“… রক্ত এসে যাচ্ছে মিশে
সবুজ গেরুয়ায়
বীর শহীদের ইতিহাস
আমার পতাকায়।
… (ইন্ডিয়ান আর্মি)
আবার “বীর সুভাষ” ছড়ায় তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে শ্রদ্ধাভরে বলেছেন—
“…স্বাধীন ভারত গড়লে তুমি
সেনা হলে
মহান দেশে তুমি মোদের
দেশের ছেলে।”
শিশুদের জন্য ছড়া লিখতে গিয়ে, তাদের আনন্দ দিতে গিয়ে তিনি ভুলে যান নি সমাজের অবহেলিত শিশুদের কথা। ভুলেন নি তাদের প্রতি দায়িত্বের কথা। তাই তো মানবতাবাদী এ ছড়াকার লিখতে পেরেছেন-
“ …বর্ণমালা কেউ বোঝে না
যায়নি কোন ইস্কুলে,
খাবার পেলে হাসলে যিশু
একটি করে দিস তুলে।”
… ( ফুটপাথের যিশু)
সমাজের অবহেলিত শিশুরা আমাদের সন্তানের মতোই। সে কথাও ছড়াকার আমাদের স্মরণ করে দিয়েছেন “ফুটপাথের যিশু” ছড়ায়-
“আমার যিশু তোমার যিশু
হাজার যিশু ঐ পথে,
এই দুনিয়ার দুঃখ কুড়োয়
হাটের ভীড়ে কান্না সাথে।”
ধর্ম শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। ধর্ম শিক্ষা দেয় মানবতার। মানুষের কল্যাণের জন্যই ধর্ম। আর এই শিক্ষাটাই বুঝি তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন কোমলমতি শিশুদের মনে- ছড়ার ছন্দে ছন্দে, ছড়া পাঠের আনন্দে। তাই আমরা তাঁর ছড়ায় পড়তে পারি –
“… দুর্গা আসে কাশের বনে
শিউলি শালুক ফুলে
আজ বোধনের প্রথম শিশির
দুর্গাকে দাও তুলে।
দুর্গা থাকুক নিরন্নদের
আর্তজনের পাশে
বিষন্নতা ভুলে ওরা
শুধুই যেন হাসে।”
… (সবার দুর্গা)
ধর্মীয় অনুষ্ঠান যে শুধু নিজের আনন্দের জন্য নয়, সমাজের অসহায় মানুষদেরও সুখে রাখার শিক্ষা দেয় সে কথাই তিনি তুলে ধরেছেন “পুজোর ছবি” ছড়ায়। তিনি লিখেছেন-
“…পূজার খরচ বাঁচিয়ে রেখো
খুশির ঝাঁপি থেকে
পথ শিশুরা উঠুক
খুশির ছোঁয়া মেখে।”
কিংবা-
“… পুজোর খরচ বাঁচাই এসো
শপথ করি আজ,
দুঃখি জনের সেবাই পুজো
এইতো মহৎ কাজ।”
… (পুজো পাঁচালী)
এছাড়াও ভুখা মাইনষের দুগগা পূজা ছড়াটেও এর স্বপক্ষে কথা বলেছেন তিনি।
প্রতিটি লেখক প্রকৃতির কাছে ঋণী। আবার প্রতিটি শিশু প্রকৃতির কাছে শিখে। প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয় সবাই। শিল্প- সাহিত্যের অনেকটা জুড়ে থাকে এই প্রকৃতি। সুশান্ত নন্দীও মেতেছেন প্রকৃতি বন্দনায়, ছড়ায় ছড়ায়। শরৎ ফুল, বৃষ্টি তুমি, একটু জলের জন্য, ঋতুরাজে ফাগুন সাজে, বৃষ্টি নৌকো প্রভৃতি ছড়ায় ফুটে উঠেছে প্রকৃতির রূপ। যেন প্রকৃতি ঘর বেঁধেছে ছড়ার মাঝে। শিশুদের কাছে তিনি প্রকৃতির পরিচয় দিয়েছেন এভাবে ——
“ এসে গেছে বসন্ত
এসে গেছে দোল,
ফাগুনের বনে আজ
জাগে হিন্দোল।
রং লেগে গেছে মনে
খুশি খুশি রব,
এসে গেছে এসে গেছে
পলাশ পরব।”
… (ঋতুরাজে ফাগুন সাজে)
আবার প্রকৃতিকে সুন্দর ও স্বাভাবিক রাখার মিনতিও তিনি জানিয়েছেন ছড়ায় ছড়ায়। “একটু জলের জন্য” ছড়ায় কবির সে আহ্বান আমাদের মনকে নাড়া দেয়।
…জলের নাম জীবন যদি
বাঁচাই সবে মিলে,
পৃথিবীও বাঁচবে তবে
নাচবে আলো বিলে।
একটা দুটা সবুজ সারি
বাঁচাই সবে গাছ,
বুকের মাঝে খুশির দোলা
হাজার মহৎ কাজ।
একটি গাছ একটি প্রাণ
সবাই জানো বুঝি,
মেঘের দেশে সবাই মিলে
নতুন জীবন খুঁজি।”
শিশু সাহিত্যের ক্ষেত্রে সরল বাক্যে বর্ণনায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে ছড়াকার সুশান্ত নন্দী প্রায় শত ভাগ সফল হয়েছেন, এ কথা বলা যায়। “ছন্দে খুশির গন্ধ” বইয়ের সব ছড়াতেই সরল বাক্যে বর্ণনার ক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বৃষ্টি শ্রাবণ, ভাষা পরব, সারি গান, পাখিদের জলসা ছড়াগুলো পড়লে আমরা এর প্রমাণ পেতে পারি। যেমন “বৃষ্টি শ্রাবণ”-এ তিনি লিখেছেন-
“ বৃষ্টি পড়ে
টিনের চালে
পুকুর ডোবায়
গাছের ডালে।
বৃষ্টি পড়ে
সজনে পাতায়
বর্ষাতিতে
খুকির ছাতায়।”
কিংবা “ভাষা পরব” ছড়ায় আমরা দেখি তিনি লিখেছেন-
“…একুশ আমার একুশ তোমার
একুশ মনের মাঝে
আমার মনের একুশ তোমার
হৃদয় জুড়ে বাজে।”
এই বইয়ের অন্যান্য ছড়াগুলোও সরল বাক্যে বর্ণনার কারণে শিশুদের কাছে তা হয়েছে সহজে পাঠ উপযোগী। সব কেন ভুতুড়ে, ভীতু বীরের কথা, ভাল্লাগেনা, পশুরাজের মেনু কার্ড, ভুতুড়ে কাণ্ড, ব্রিটিশ বাবু ও কৃপণসহ অধিকাংশ ছড়ার জন্য লেখক বেছে নিয়েছেন হাস্য রসাত্মক কোন বিষয়। এর ফলে শিশুরা ছড়া পাঠের সাথে সাথে সুযোগ পাবে অনাবিল আনন্দে মাতার।
ছড়াকার সুশান্ত নন্দী তাঁর “ছন্দে খুশির গন্ধ” বইয়ের প্রতিটি ছড়া রচনার ক্ষেত্রে বেছে নিয়েছেন সহজ শব্দ আর সরল বিষয়।মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন সরল বাক্যে বর্ণনায়। এর ফলে ছড়াগুলো শিশুদের জন্য হয়ে উঠেছে সহজে পাঠ উপযোগী। শিশুরা ছড়ার ছন্দে, পড়ার আনন্দে যেমন প্রকৃতির সাথে পরিচিত হবে তেমনি পাবে মানবতা আর ধর্মের শিক্ষাও। এর ফলে ছড়া পাঠের আনন্দের সাথে সাথে ঘটবে তাদের মানসিক বিকাশ।

শিস খন্দকার : কেমন আছেন? এবারের গ্রীষ্মকাল কেমন কাটছে?
মজনুর রহমান : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। গ্রীষ্মকাল…না—বর্তমান ঋতু ধরতে হবে ‘করোনাকাল’। জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘করোনাকাল কেমন কাটছে?’
শিস খন্দকার : তো করোনাকালে আপনার লেখালেখি কেমন চলছে?
মজনুর রহমান : লেখালেখি? এমন একটা সময় এখন যে সবকিছু হঠাৎ হঠাৎ কেমন অস্বাভাবিক হয়ে যায়। লেখালেখি থেকে শুরু করে পুরো জীবনযাত্রাই এরকম। হঠাৎ হঠাৎ কিছুই লিখতে ইচ্ছে করে না; আবার মাঝেমাঝে বেশকিছু লিখতে ইচ্ছে করে। মাঝখানে ছোটছোট দুটি গল্প আর গোটা চার-পাঁচেক কবিতা লিখেছি। এই আরকি!
শিস খন্দকার : এই বৈশ্বিক মহামারিতে প্রায় দুমাস ধরে আমরা বাংলাদেশিরা কার্যত লকডাউনে আছি। বলা চলে আমাদের সবধরণের কাজই বন্ধ। এমতবস্থায় আমাদের লেখালেখিটা আগের চেয়ে তুলনামূলক বেশি হওয়ার কথা, কিন্তু কেন হচ্ছে না?
মজনুর রহমান : ঐতো একটু আগেই যা বললাম। এটা একধরণের মানসিক চাপ। এই ঘটনাটি আমাদের কাছে আকস্মিক। ধরুন যে ডিসেম্বর থেকে শুরু। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াচ্ছে কখন থেকে? আমরা ভয় পেতে শুরু করলাম কখন থেকে? খুব বেশি হলে জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি। অলমোস্ট ফেব্রুয়ারি আরকি। তারপর থেকেই মানুষের মনের মধ্যে যে চাপটা, এটাকে একেকজন একেকভাবে নিচ্ছেন। যার ফলে কেউ লিখতে পারবেন, কেউ পারবেন না। এমনকি মানুষের অন্যান্য স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও এখানে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সবার রুটিনে চেঞ্জ, সবার লাইফস্টাইল চেঞ্জ। যার ফলে একেকজনের একেকরকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ফলে কেউ লিখতে পারছেন, কেউ পারছেন না। আবার কেউ কিছুক্ষণ পারছেন, কিছুক্ষণ পারছেন না—যেটা আমার ক্ষেত্রে হচ্ছে।
শিস খন্দকার : বাংলাদেশ তথা বিশ্বের প্রতিটি সংকট মোকাবেলার নেপথ্যে আমরা ইতোপূর্বে দেখেছি যে শিল্প একধরণের বড় অবদান রেখেছে। আমরা জানি যে শিল্প মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। বিগত পৃথিবীর মোড়লদের এইসব শিল্প নানভাবে প্রভাবিত করেছে। চলমান পৃথিবীর শিল্পীদের হাতেও প্রতিনিয়ত শিল্পের নির্মাণ অব্যহত। কিন্ত তা কি বিশ্ব মোড়লদের কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছে বা করছে?
মজনুর রহমান : আমার মতে, করতে পারেনি। বর্তমান যে মহামারি চলছে এবং তা যেভাবে প্রভাবিত করছে, এর ওপর দিয়ে কোনো শিল্পই প্রভাবিত করতে পারেনি। এর প্রভাব এতোটাই। সবাই এখন বিপদে আছে, যার ফলে অন্য কোনো মাধ্যম বা আর্ট মানুষের মনে প্রভাব ফেলবে—বিশেষ করে বিশ্ব মোড়লদের ওপর প্রভাব ফেলবে, প্রভাব ফেলে ভালো কিছু হবে—এটা আমার কাছে মনে হয় না। কারণ বিশ্ব মোড়লদের একজনকে ইতোমধ্যে দেখা গেছে যে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে তহবিল প্রত্যাহার করেছেন। এর আগে তিনিই জলবায়ু প্রকল্প হতে তহবিল প্রত্যাহার করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরূপ সংকটে বিশ্ববাসীর জন্য যতটুকুই করে, এতে তাদের তহবিল প্রায় পনেরো পার্সেন্ট। এই পনেরো পার্সেন্ট যদি তারা প্রত্যাহার করেন, এটি অবশ্যই বিশাল একটি ক্ষতি। অন্যকোনো কাজের মাধ্যমে ওনার মনোভাবের পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না।
শিস খন্দকার : আপনি সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলছেন। কিন্তু দিনশেষে তিনিও তো একজন মানুষ। শিল্প তো মানুষকেই ছুঁয়ে যায়। ওনাকে কি বব মার্লে, বব ডিলানরা ছুঁয়ে যায় না?
মজনুর রহমান : এটা তো মানুষের নিজের ওপর নির্ভর করে। উনি মানুষ হলেও আমরা হয়তো ওনাকে ছুঁয়ে যাবার মতো শিল্প করতে পারিনি, কেউই হয়তো পারেননি।
শিস খন্দকার : এক্ষেত্রে কি আমাদের শিল্পই ব্যর্থ? নাকি তাঁদের দিক থেকে মানবিক বোধের সংকট?
মজনুর রহমান : শিল্পের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে ব্যক্তি এটাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন তার ওপর। যে শিল্প ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ব্যর্থ, সেই শিল্পই ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে সফল হতে পারে, আবার সেই শিল্পই শি জিম পিংয়ের কাছে ব্যর্থ হতে পারে। অর্থাৎ শিল্পের সফলতা কিংবা ব্যর্থতা আপেক্ষিক। এক আপনি চূড়ান্তভাবে বলতে পারবেন না।
শিস খন্দকার : আচ্ছা, এবার আপনার লেখালেখির দিকটায় আসি। আপনার লেখালেখির শুরুর গল্পটা শুনতে চাই।
মজনুর রহমান : আমার লেখালেখির শুরু অনেকটা আকস্মিকভাবে। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন কিশোরগঞ্জে (নীলফামারি), আমার উপজেলা আরকি। কিছু লেখালেখির লোকজন ছিলেন, যাদের সাথে আমার পরিচয় হয় এবং হঠাৎ করেই বিষয়টির দিকে আমি অনুপ্রাণিত হই। আমার পারিবারিকভাবে লেখালেখি করেন যদিও এমন কেউ নেই, তারপরেও নিজের থেকেই কিছু অভ্যাস গড়ে ওঠে—গান শোনা, বই পড়া ইত্যাদি। কিশোরগঞ্জেই একটি সংগঠন ছিলো, রাজনৈতিক সংগঠন, সেটার সাথে আমি জড়িত হই। এটি একটি ছাত্র সংগঠন। আমি এখানে বলে রাখি যে সেটি ইসলামী ছাত্রশিবির নয়; অন্য একটি ইসলামী ছাত্র সংগঠন। তাদের কিছু সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি ছিলো পত্রিকা বের করা। আমি তো ধর্মীয় লেখা লিখতাম না। গল্প, কবিতা, রম্য এরকম লেখা আরকি।
শিস খন্দকার : সাহিত্য ঘরনার লেখা আরকি…
মজনুর রহমান : হ্যাঁ হ্যাঁ। সাহিত্য ঘরনার বিভিন্ন মননশীল লেখা। ইসলামী তো আমার সাইট না, সেটা আমি করতে পারতাম না। আমার এসব লেখাই ছাপা হতো। এটাই ছিলো মূল উৎসাহ—এটা স্বীকার করতে হবে। যদিও তাদের সঙ্গে আমার এখন সেভাবে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। তবে তারা আমার সব লেখা ছেপেছিলো। গল্প, কবিতা—যা দিয়েছি তাই ছেপেছে। এভাবেই উৎসাহটা পাই। এরপর রংপুরের যুগের আলোতে ছাপা হয়, লিখতে থাকি। এসএসসির পরে তো রংপুরেই চলে আসি। এসে ধীরেধীরে সবাইকে পেতে পেতে একটা আলাদা প্লাটফর্ম চলে এলো, আলাদা একটা জগৎ। এভাবেই এখন পর্যন্ত চলছে আরকি।
শিস খন্দকার : আমরা জানি, আপনি মূলত একজন কবি। ইতোমধ্যে আপনার একটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭তে—‘বেমানান বয়োস্কোপ’। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্ত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তাঁর নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যদি চলচ্চিত্রের চেয়ে ভালো কোনো মাধ্যম তিনি পেতেন—তবে সেই মাধ্যমকেই তিনি বেছে নিতেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আপনি কি কবিতাকে এরূপ ভাবেন?
মজনুর রহমান : নিজেকে প্রকাশ? নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ভাবি না ওনার মতো করে। কারণ হলো, নিজেকে প্রকাশের যত মাধ্যমেই আমি থাকি না কেনো নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না আসলে। তবে নিজের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে আমি কবিতাকেই সবচেয়ে ভালো—সবচেয়ে আনন্দদায়ক মাধ্যম হিসেবে মনে করি আমার জায়গা থেকে।
শিস খন্দকার : কবি না হলে সাহিত্যের কোন মাধ্যমকে বেছে নিতেন? কী হতেন?
মজনুর রহমান : গল্পকার।
শিস খন্দকার : ছোটবেলায় আপনার জীবনের লক্ষ্য কী ছিলো? সেটি কী হতে পেরেছেন?
মজনুর রহমান : না, হতে পারিনি। আমার লক্ষ্য বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। জীবনে প্রথম হতে চেয়েছিলাম, কারের ড্রাইভার। কার চালিয়ে পরিশ্রম ছাড়াই বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায়—খুব ছোটবেলার লক্ষ্য। তারপর হতে চেয়েছিলাম পাইলট। বাস্তবতার সাথে সঙ্গতি রেখে পড়তে চেয়েছিলাম ডাক্তারি—সেগুলোর একটিও হওয়া হয়নি। তবে একটা সময় থেকে কবি হতে চেয়েছি এবং এখন পর্যন্ত শুধু এই লক্ষ্যটি আমি পূরণ করতে পেরেছি।
শিস খন্দকার : আপনার কাছে কবিতা কী? আপনি কবিতাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?
মজনুর রহমান : আমার মতে কবিতা হলো—মানবমণ্ডলির অভিন্ন অনুভূতি প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম।
শিস খন্দকার : আপনার মাথায় কবিতার ইমেজ কীভাবে আসে?
মজনুর রহমান : আমার মাথায় কবিতার ইমেজ আগে আসে না; আগে কবিতার শব্দ আসে। শব্দ আসে, বাক্য আসে—তারপর ধীরেধীরে একটি ইমেজ তৈরী হয়। আমার কাছে এরকম হয় আরকি।
শিস খন্দকার : ক্রমান্বয়ে ফ্রেমে বেঁধে ফেলেন…
মজনুর রহমান : ক্রমান্বয়ে বাঁধার চেষ্টা করি।
শিস খন্দকার : সমকালীন কবিদের কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? কাদের লেখা বেশি ভালোলাগে?
মজনুর রহমান : সমকালীনদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে ভালোলাগে ইমতিয়াজ মাহমুদ, এরপর তানিম কবির, হাসান রোবায়েত। এরপর…আরো বলতে হবে? না থাক। বেশি লিস্ট করলে অনেকে বাদ যাবেন!
শিস খন্দকার : সমকালীনদের কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানতে চেয়েছিলাম।
মজনুর রহমান : ও আচ্ছা, মন্তব্য। আমি যে ধরণের কবিতা পছন্দ করি, যে ধরণের লিখতে চাই বা পড়তেও পছন্দ করি—এর দুটি ধরণ রয়েছে। সত্য কথা বলছি, কার কাছে কেমন লাগবে জানি না। ধরণ দুটি হলো, এক—সহজ-স্বাভাবিক কথা, যেকোনো ধরণের ইমেজ তৈরি করা। এটা আমার সবচেয়ে পছন্দের ধরণ—যেটা ইমতিয়াজ মাহমুদ এবং তানিম কবিরের কবিতায় পাওয়া যায়। আরেকটি হলো—আমি সব কথা বুঝবো না, কিন্তু প্রচণ্ড একধরণের ভালোলাগা কাজ করবে—এটি হাসান রোবায়েতের কবিতায় পাই আমি। এই দুই ধরণের কবিতার মধ্যেই মূলত এখনকার সময়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য নিহিত। এই সময়ে এধরণের কবিতাই লেখা হচ্ছে, যেটাকে অনেকে পোস্টমডার্ন বা উত্তর-আধুনিক কবিতা বলেন।
শিস খন্দকার : সমকালে যে উত্তর-আধুনিক কবিতা হচ্ছে, তা কি আমাদের বিগত সময়ের কবিতাকে অতিক্রম করেছে বা করতে পারবে বলে আপনার মনে হয়?
মজনুর রহমান : সেটা আমার মনে হয় না। মনে হয় না এ কারণেই—আমার কাছে মধ্যযুগের ভারতচন্দ্র রায়গুণাকারের এমন কিছু কবিতা রয়েছে, যেগুলোর কাছে বর্তমানে আর কারো কবিতা তার সাপেক্ষে ভালো মনে হয় না। পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতা, এমনকি রবীন্দ্রনাথের এমন কিছু কবিতা রয়েছে—এখনকার সময়ের কবিতা সেগুলোর ধারেকাছেও যেতে পারে না। বিষয় হচ্ছে যে, সময়ে সময়ে এবং কবিতে কবিতে আলাদা। কেউ কাউকে অতিক্রম করবে, এটা আমার কখনই মনে হয় না। আমি মনে করি না। অনেকে মনে করেন, অতিক্রম করে যাবে বা অতিক্রম করা দরকার, অতিক্রম করে যাওয়া উচিৎ, ভাঙা উচিৎ—এগুলো আমার কাছে হাস্যকর কথাবার্তা মনে হয়। ভালো করে পড়লেই বোঝা যায়—এটি অতিক্রম করার জিনিস না।
শিস খন্দকার : ২০২০—এক মহামানবের জন্মশতবর্ষ। তাঁকে নিয়ে একটু প্রশ্ন করি।
মজনুর রহমান : অবশ্যই।
শিস খন্দকার : বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন মানুষ, যাঁকে আমরা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা দলের ফ্রেমে আবদ্ধ করতে পারি না। তিনি সর্বজনীন—অন্তত আমাদের বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে একথাটি সত্য। তবে কি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশেরই সমার্থক?
মজনুর রহমান : অবশ্যই। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সমার্থক-এর সংক্ষেপে ব্যাখ্যা এরকম—প্রত্যেক জাতিরই একজন মহান নেতা থাকেন। কত বড় মহান তা সে জাতির সাপেক্ষেই নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির সাপেক্ষে তিনি এতো বড় যে তাঁকে বাংলাদেশের সমার্থক না করে পারা যায় না। ওনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কত মহান হতেন বা আদৌ হতেন কি না—সেটা বলার উপায় নেই। কিন্তু ওনার ব্যক্তিত্ব, ওনার নেতৃত্বের সাপেক্ষে বলতে হবে—বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সমার্থক। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ—এভাবেও বলা যায়। তবে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা বা পরিচয় করিয়ে দেওয়া ভিন্ন বিষয়, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।
শিস খন্দকার : আপনি জেনে থাকবেন, বিবিসির শ্রোতা জরিপে বিশজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচন করা হয়েছিলো। সেক্ষেত্রে তিনিই প্রথম। এটাকে কীভাবে দেখেন?
মজনুর রহমান : জরিপের বাইরেও আমার কাছে তিনি বাঙালি হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে নিঃসন্দেহে প্রথম। বরং ঐক্ষেত্রে ‘বাঙালি’র স্থানে যদি ‘বাংলাদেশি’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো, তবে আমি আরোও বেশি গর্ববোধ করতে পারতাম বলে মনে করি। তখন আরোও নিজের অর্থাৎ আমার বা আমাদের মনে করা সহজ হতো।
শিস খন্দকার : আমরা একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। কবিরা তো প্রেমিক মানুষ। কবিরা উপুর্যপরি প্রেমে পড়তেই থাকেন, তাদের জীবনে প্রেম আসেই। আমি নারী প্রেমের কথা বলছি। এ প্রসঙ্গে আপনার জীবনের পটভূমিটা যদি বলতেন।
মজনুর রহমান : তাই বলে বাসায় বসে (হাসি)! নারী প্রেমের পটভূমি শুধু কবিদের জীবনেই না, যেকোন জীবনেই থাকে এবং অধিকাংশক্ষেত্রেই তারা একাধিকবার প্রেমে পড়ে। এটা কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়। তবে কবিদের ক্ষেত্রে হয়তো বিষয়টি এভাবে আলোচিত হয় যে কবিরা বেশি প্রেমে পড়েন, কবিরা বারবার প্রেমে পড়েন। কিন্তু কবিদের বাইরেও বিশ্বের বড়বড় রাজনীতিবিদদের আমরা কি একাধিকবার প্রেমে পড়তে দেখিনি? দেখেছি। তারা কিন্তু কবি নন। অনেক বড়বড় কেলেঙ্কারি, যেগুলো আমরা জানি। কবিরা একাধিকবার প্রেমে পড়বে, অন্য সাধারণ আর দশজনের মতো কবিও যেহেতু মানুষ—পড়তেই পারে। বিষয় হচ্ছে সে ব্যক্তিত্বের জায়গায় নিজেকে কতটা অটল রাখতে পেরেছে। একাধিক প্রেমে পড়া দোষের না; দোষের হচ্ছে নিজেকে অসৎ করা। আরো বেশি কিছু কি শুনতে চেয়েছেন?
শিস খন্দকার : না…না (হাসি)। তবে এমন কি কোনো নারী ছিলেন বা আছেন—যিনি আপনার লেখাকে প্রভাবিত করেছেন?
মজনুর রহমান : না। নারীরা আমার জীবনে লেখাকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি। কিন্তু প্রেমে যে পড়লাম, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে হয়তো কিছু লিখেছিলাম। যেগুলো হয়তো এখন বস্তাবন্দি অবস্থায় হারিয়ে গেছে বা পুড়ে গেছে। কিন্তু নারীটির কারণে লিখেছি—এরকম মনে হয় না। বিষয়টি বোঝাতে পারলাম কি না—জানি না। ঘটনার কারণে লিখেছি; নারীর কারণে না।
শিস খন্দকার : আচ্ছা। আপনার কাছে সমকালীনদের কিছু নাম শুনেছি, যাদের লেখা আপনি পড়েন। সর্বসময়ের বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে আপনি কাদের বেশি পড়েন?
মজনুর রহমান : সর্বসময়ে? এই প্রশ্নটি আমি নিজেও নিজেকে করেছি। এর উত্তর দুরকম আসে। আমার সবচেয়ে প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ, তারপরে আল মাহামুদ। রবীন্দ্রনাথ? রবীন্দ্রনাথ সবকিছুর ওপরে, কিন্তু তিনি সবচেয়ে প্রিয় কবি নন। আর জীবিতদের মধ্যে আমি তিনজনের কথা বলেছি—ইমতিয়াজ মাহমুদ, তানিম কবির এবং হাসান রোবায়েত। আরও অনেককেই ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালোলাগাগুলো ঘুরেফিরে। আর এনারা ফিক্সড হয়ে গেছেন, বলা যায়। ঘুরেফিরে বলতে যেমন—মোহাম্মদ জসীম নামে একজন কবি আছেন, ওনার কবিতা খুবই ভালো লাগে। তারপর শাহেদুজ্জামান লিংকন—তিনি কবিতা কম লেখেন, কিন্তু যা লেখেন চমৎকার! তারপর শিস খন্দকার—জবাব নেই! এই ভালোলাগাগুলো ঘুরেফিরে। তারপর রংপুর অঞ্চলে আরও আছেন দুজন—আহমেদ মওদুদ ও সাম্য রাইয়ান। তারপর হলেন নাদিয়া জান্নাত। এই অঞ্চলভিত্তিকও কিছু বললাম আরকি। অঞ্চলভিত্তিক বলাতে ওনারা যে কী মনে করবেন। অঞ্চলের গণ্ডি হয়তো ওনাদের পুরোপুরি পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি, একজন আছেন—মাহবুবুল ইসলাম এবং আর একজন বাদল রহমান। অসম্ভব ভালো কবিতা লেখেন, পড়লেই বুঝতে পারবেন। তারপর শহীন মোমতাজ আছেন, ওনাকে সবাই অবশ্য জানেন। ভালো লাগে। তারপর হোসেন রওশনের কবিতা ভালো লাগে।
শিস খন্দকার : ভাবলে হয়তো এরকম আরও কিছু নাম চলে আসবে।
মজনুর রহমান : হ্যাঁ, সেটাই।
শিস খন্দকার : আমরা এ পর্যন্ত আপনার একটিমাত্র বই পেয়েছি। আপনার কবিতার তো পাঠক রয়েছেন, যারা নিয়মিত আপনাকে পড়তে চান, বিশেষত রংপুর অঞ্চলে। আপনার কি মনে হয় না আরও কিছু নিয়ে আসা উচিৎ? আরও কিছু বই?
মজনুর রহমান : বই অবশ্যই দরকার। কবিতার ক্ষেত্রে এখানে বাস্তবতা হলো, আমরা রংপুরকে অতিক্রম করতে পারি না। এর কারণ আমরা রংপুরে থাকি; ঢাকায় থাকি না। এরূপ বাস্তবতায় যা হয়, কবিতার বই আমাদেরকে টাকা দিয়ে বের করতে হয়। আমার প্রথম বইটি যদিও প্রকাশক করে দিয়েছিলেন। কিন্ত সেবার তার যে লসটা হয়েছে, তাতে বোঝাই যায় যে তিনি আর সে ঝুঁকি নিবেন না। কবিতার বই থাকা উচিৎ অবশ্যই। কারণ মানুষ চলে যাবেন, কিন্তু তার বইটি থাকবেই। সেই বই আমি এখন টাকা দিয়ে বের করার অবস্থায় নেই অথবা আমি ইচ্ছুক নই।
শিস খন্দকার : আপনার কথার সূত্র ধরেই একটি প্রশ্ন করি। বললেন, যদি ঢাকায় থাকতেন। তবে কি বর্তমানে লেখক হিসেবে উঠে আসার ক্ষেত্রে ঢাকাকেন্দ্রীক হওয়া আবশ্যক?
মজনুর রহমান : এটা তো বাস্তবতা। যদি কেউ প্রতিষ্ঠিত হতে চান ঐ অর্থে, যে অর্থে প্রশ্নটি করেছেন। সেই অর্থে তাকে ঢাকাকেন্দ্রীক হতে হবে। ঢাকার বাইরে থেকে কয়জনের বই প্রকাশকরা নিজের থেকে বের করেন, এটা আপনি হাতে গুনেগুনে বলে দিতে পারবেন। আর ঢাকায় থেকেথেকে কীভাবে হচ্ছে, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কারণ প্রকাশনার মাধ্যম, প্রকাশক, পত্র-পত্রিকা সবই ঢাকাকেন্দ্রীক। কাস্টমার বা বইয়ের গ্রাহক-পাঠকও ঢাকাকেন্দ্রীক! এমনকি বইমেলা—যে জাতীয় বইমেলা হয়, সেটিও ঢাকাকেন্দ্রীক। এভাবেই সবই প্রায় ঢাকাকেন্দ্রীক হচ্ছে।
শিস খন্দকার : এতে আমাদের কবিতা কতটা উপকৃত হচ্ছে? এতে কি আমাদের কবিতারই ক্ষতি না?
মজনুর রহমান : এতে কবিতার ক্ষতি না। তবে ক্ষতিটা যেখানে হচ্ছে, তা হলো—বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়াতে। ওনারা যা করছেন, তা তো বাস্তবতার কারণেই করছেন। আমার একটি লক্ষ্য পূরণে বা বই বিক্রি করতে যদি ঢাকায় যেতে হয়, তবে অবশ্যই আমাকে ঢাকায় থাকা উচিৎ। কিন্তু সাহিত্যের ক্ষতি যেটা হচ্ছে, বলা যায় যে সেটা হাতে ধরে কেউ করছেন না। কিন্তু ক্ষতি হচ্ছেই। তবে এখন অঞ্চলভিত্তিক বেশকিছু বইমেলা হচ্ছে, অঞ্চলভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠছে। সেক্ষেত্রে আমি অনুরোধ করবো এই অঞ্চলের প্রকাশকদের, বইগুলো যদি সারাদেশে তারা বাজারজাত করতে না পারেন তবে ক্ষতিটা আরও বেশি হবে, যে ক্ষতির কথা আপনি বলছেন।
শিস খন্দকার : তাহলে যেসকল সম্ভাবনাময় লেখক আড়ালে-আবডালে কিংবা মফস্বলে লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী হবে? সামাজিক মাধ্যম তথা ফেসবুকে ঢুকলে কিন্তু এরকম অনেককে চোখে পড়ে।
মজনুর রহমান : হ্যাঁ, পড়ে। কিন্তু আমার পরামর্শ তাদের জন্য না। আমার অনুরোধ বা পরামর্শ সরকারি মহলের প্রতি। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় রয়েছে, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র রয়েছে, বাংলা একাডেমি রয়েছে—এরা এই কাজগুলো করতে পারে। এরা যদি উদ্যোগ নেয় সরকারিভাবে প্রতিবছর সাতটি বা আটটি বিভাগ হতে বা বিভাগীয় শহর হতে—চল্লিশ বছরের নিচে যেসব তরুণ লিখছেন তাদের মধ্য থেকে তিনটি করে কবিতার বই, তিনটি করে গল্পের বই, তিনটি করে উপন্যাস বের হবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এগুলো বাংলা একাডেমিতে রাখা হবে, বাংলা একাডেমির বইমেলায় বিপণন হবে। সরকারের জন্য এটি খুব বড় কিছু না। কিন্তু এই কাজটি যদি হয়, তাহলে সারাদেশের সাহিত্য বিকেন্দ্রীকরণ হবে, আড়ালে-আবডালে যারা রয়েছেন—তাদের উপকার হবে, আন্ডাররেটেড যারা রয়েছেন—তারা উঠে আসবেন। দিনশেষে এটা বাঙালি জাতির জন্যই ভালো হবে। কারণ এমন ভালোভালো লেখা আছে, যেগুলো তারা পাচ্ছেন না। আবার এমন এমন কিছু অপসাহিত্য হচ্ছে, যেগুলো তাদের গিলতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। তাই সরকারকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা বিশেষ দরকার।
শিস খন্দকার : এই যে বললেন, আন্ডাররেটেড। সমকালীনদের মধ্যে আপনার মতে কবি হিসেবে ওভাররেটেড কারা আর আন্ডাররেটেড কারা?
মজনুর রহমান : ওভাররেটেড বলা আমার ঠিক হবে না, তবে আন্ডাররেটেডদের নাম বলাই যায়। ওভাররেটেডদের নাম বললে বিতর্কের সৃষ্টি হয় আরকি। এমন অনেক ভালো কবি রয়েছেন, যারা ফুরিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁরা জোর করে লিখছেন। এরকম নাম অনেক বলা যাবে, কিন্তু বিতর্ক হবে, তাই বলতে চাই না। আন্ডররেটেড কবি—আমি রংপুর অঞ্চলের যে কয়জনের কথা বলেছি, এদের বেশিরভাগই আন্ডাররেটেড। যেমন—শিস খন্দকার। আমি নিজেকেও আন্ডাররেটেড মনেকরি—এটা আত্মবিশ্বাস থেকে বলা। আপনার নাদিয়া জান্নাত বলুন, হোসেন রওশন বলুন—এরা সবাই আন্ডাররেটেড। এদের আরও গুরত্ব পাওয়া উচিৎ ছিলো, আরও বেশি প্রচার হওয়া উচিৎ ছিলো। সেটা হয়নি আঞ্চলিকতার কারণে। অন্য অঞ্চলে কে কে আছেন, আমি সবার কথা বলতে পারবো না। কিন্তু এরকম হচ্ছে।
শিস খন্দকার : আপনার একমাত্র বই ‘বেমানান বায়োস্কোপ’ নিয়ে উপলব্ধি কী?
মজনুর রহমান : বইটি প্রকাশের পরপরই আমার উপলব্ধি শেষ হয়ে গেছে। রংপুর বইমেলায় বই নিয়ে যতটুকু সাড়াশব্দ—তাতে মনে হয়েছে এতো তাড়াতাড়ি বই করা উচিৎ হয়নি। কবিতা যাচাই-বাছাই, গেটাপ-মেকাপেও তাড়াহুড়ো হয়েছিলো। মনে হয়, আরও সময় নিয়ে কাজটি করা যেত।
শিস খন্দকার : শেষ প্রশ্ন। কথা আর না-বাড়াই। লেখক হিসেবে আপনার চূড়ান্ত লক্ষ্যটা জানতে চাই।
মজনুর রহমান : লেখক হিসেবে চূড়ান্ত লক্ষ্য—বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ আমার কবিতা বা লেখা পড়বেন। এটি অনেক আগে থেকেই ছিলো, কিন্তু আমি একটু অলস প্রকৃতির মানুষ হওয়ায় সেভাবে পরিশ্রম করতে পারি না বা করি না। আমার দুটি সমস্যা—প্রথমত, অলসতা আর দ্বিতীয়ত, আমি মুখচোরা। যেভাবে মানুষ এক্ষেত্রে আগান, আমি সেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতে চাই না। এটা আমার স্বভাব।
শিস খন্দকার : এই সংকটকালে সপরিবারে ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
মজনুর রহমান : আপনিও ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শীত তোয়াক্কা না করে সকালেই ঘুম থেকে উঠে গোসল করে নতুন জামা পড়ার দিনগুলো বড্ড জলদি অতীত হয়ে গেল – মনে মনে ভেবে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো শিখা।
দুধ ফুটছে চুলায়। সেমাই, পায়েস রান্না হবে। শিখা ডিভোর্সী। এই একটা শব্দ ওকে যেন পরিবার, সমাজ থেকে একটু আলাদা করেই রেখেছে। মুচকি হাসলো শিখা। ওর কোন আক্ষেপ নেই। ওই বাড়ি থেকে নিজে ডিভোর্স দিয়ে তারপর বাপের বাড়ি এসেছে শিখা। বাপের বাড়ি হলেও সংসারটা ভাইয়ের। মা, ভাই, ভাবী, একমাত্র ভাইঝি এই হলো সংসার। শিখা টিউশনি করিয়ে নিজের খরচটা চালিয়ে নেয়। তবুও ভাইয়ের সংসারে ডিভোর্সী শব্দটাকে সাথে নিয়ে টিকে থাকা বেশ কঠিন।
একমাত্র ভাইঝি চার বছরের ছোট্ট মেয়ে তমা। শিখাকে ছাড়া ওর চলে না। তমার গোসল, খাওয়া, ঘুম পাড়ানো, গল্প বলা সব আবদারের জায়গা শিখা। শিখাও যেন সবার খোঁটা সহ্য করে হাসিমুখে সংসারে টিকে থাকে এই মেয়েটার জন্য। বড্ড মায়াবী মেয়েটা। যখন বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে যায় শিখা আলতো করে আরও জাপটে ধরে রাখে ওকে। ওর মুখে ফুপিমা ডাক শুনলে শিখার মুখ উজ্জ্বল হয়, চোখ ছলছল করে।
নাস্তাগুলো টেবিলে সাজিয়ে রেখে তমার ঘুম ভাঙায় শিখা। কপালে চুমু দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে গোসল করিয়ে দেয়। নতুন জামা পড়িয়ে, কপালে ছোট্ট একটা টিপ দিয়ে দেয় শিখা। মেয়েটাকে পরীর মত লাগছে।
“পরী”- শব্দটা বলেই ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করলো শিখা। সেবার যখন ও জানতে পারলো ওর ভেতরে একটা জীবন বড় হচ্ছে, শিখা বারবার পেটে হাত রাখতো। প্রতিবার ওর মনে হতো মেয়ে হবে। আয়নার সামনে গিয়ে কতবার নিজেকে দেখতো। মনে মনে ভেবে রেখেছিলো নাম রাখবে পরী। রফিক প্রায়ই বলতো ছেলে হবে। কিন্তু শিখার মন সবসময় বলতো পরী হবে। একদিন মার্কেটে গিয়ে লাল টুকটুকে একটা ফ্রক কিনেও এনেছিলো। রফিক দেখে বললো – “অযথা খরচা”। শিখার মন খারাপ হলেও ফ্রকটা দেখে মন ভালো হয়ে গেল।
খুব মন দিয়ে রান্না করার চেষ্টা করছে শিখা। সকাল থেকে পরীর কথা মনে পড়ায় বারবার কান্না আসছে ওর। আজ মেয়েটা থাকলে তমার মতই বয়স হতো। নিজ হাতে নতুন জামা পড়িয়ে, পায়েস খাইয়ে দিয়ে কপালে একটা চুমু দিতো। কত স্বপ্ন ছিলো ওর মেয়েটাকে ঘিরে। রফিক রগচটা ছিলো, প্রায়ই অফিস শেষে হাই ক্লাস সোসাইটির পানীয় গলাধঃকরণ করে মাঝরাতে বাড়ি ফিরতো। বিয়ের পর শিখা সেই রাতগুলোতে রফিকের চড়, লাথি খেয়ে পড়ে রইতো ঘরের এক কোণায়। মেয়েটাকে শিখা এই হাই ক্লাস লোকদের সাথে বড় হয়ে উঠতে দিতো না। “সরল কিন্তু সাহসী হবে পরী” – বলতো শিখা। মেয়ে হলে রফিকের এসব অভ্যাসও চলে যাবে এই আশায় পেটে হাত রেখে হাসে শিখা। নিজেকে সুখী লাগে ওর।
ঐদিন রাতেও দেরি করে ফিরলো রফিক। শিখা অপেক্ষা করতে করতে ডাইনিং টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। দরজায় বেশকিছুক্ষণ নক করলে তারপর ঘুম ভাঙে শিখার। প্রচন্ড বজ্রপাত আর বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। দরজায় নক করার শব্দ বৃষ্টির সাথে মিশে যাচ্ছে বারবার। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতেই রফিক কষে একটা লাথি মারলো শিখার তলপেট বরাবর। একটা কাঁচি যেন ওর শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরা বেয়ে চলে গেল। ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল শিখা। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো। বজ্রপাতের শব্দে মিশে গেল চিৎকার। তাকিয়ে দেখলো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে পা থেকে মেঝ বরাবর, হাত দিয়ে রক্ত ছুঁয়ে বলে উঠলো “পরী”! এরপর শিখার জ্ঞান ফেরে হাসপাতালের বিছানায়।
তমার হাসির খিলখিল শব্দে চিন্তায় ছেদ পড়ে শিখার। আজ ঈদের দিন মন খারাপ করতে চায় না শিখা। চোখ বোঁজে অতি সন্তর্পণে। স্পষ্ট মা ডাক কানে আসে ওর। মুচকি হাসি ফুটে ওঠে শিখার ঠোঁটে। মায়েরা হাসলে রূপকথার পরীর মত সুন্দর লাগে বোধয়!

পর্যন্ত পড়ে মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ নিয়েছে। সেজো বোন রাবেয়া ক্লাস ফোরে পড়ে আর সবার ছোট আল-আমীন এর বয়স সতেরো মাস। বাবা রফিকুল ইসলাম অন্যের জমি চাষ করে আর বাড়িতে গরু,মুরগী,হাঁস পুষে। কোনরকমে জোড়াতালি দিয়ে চলছে সংসার।পেটেভাতে বেঁচে থাকা। সঞ্চয় বলে কিছু নাই। রোগবালাই হলে ভরসা নিকটস্থ স্যাটেলাইট ক্লিনিক। আগের তিনজন নরমাল ডেলিভেরীতে হলেও শেষের জনের সিজারিয়ান সেকশন লেগেছে। বাসাতেই চেষ্টা করেছিল রহিমা খালা। এলাকার সব ডেলিভারি সেই করে। আগের তিনজনও তার হাতেই জন্ম। গ্রাম্য দাই রহিমা খালা রাত দুটার সময় যখন রফিকুলকে বললো, মুই ভালো বুজোছো না তোরা এলায় অমপুরোত নিয়া যান। এতরাতে মাথায় বাজ পড়ার দশা। পাশে এসে দাঁড়ালো গ্রাম্য চিকিৎসক আমিরুল ভাই। সে এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রংপুরে একটা ক্লিনিকে ভর্তি করায়। রাতেই সিজার হয়। আকাশছোঁয়া বিল পরিশোধ করতে টাকা ধার করতে হয়। সে টাকা পরিশোধ এখনও হয়নি। তার উপর সামনে ঈদ। রফিকুলের বুকটা হাহাকার করে ওঠে।
কি করবে বুঝতে পারে না। এতগুলো মুখের অন্ন জোগান তার উপর ধার শোধ। আলমকে শার্ট কিনে দেয়াটা জরুরি হয়ে গেছে। একটা শার্ট পরেই সে ছয়মাস কাটিয়ে দিল। এদিকে বৌয়ের শাড়িও ত্যানাত্যানা হয়ে গেছে, যদিও সে মুখ ফুঁটে কখনই কিছু চায় না। এ সংসারে এসে সেতো কিছুই পেলো না। বাকি তিনজনকেও কাপড় দেয়া দরকার। বড় ছেলে গ্যারেজে কাজ করে যা পায় ওর খেতেই চলে যায় তাও মাসে-মাসে একহাজার টাকা তার মাকে দেয়। এটাও কম কি? তামাক কিছু আছে, সেগুলা বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে তা দিয়ে ঈদের খরচ করার মনস্থির করে রফিকুল। এখন তামাকের দাম কম কয়েকদিন পর বিক্রি করতে পারলে কিছু টাকা বেশী পাওয়া যেত কিন্তু উপায় নাই। সোমবার হাটে তামাক নিয়ে সকাল-সকাল রওনা দেয় রফিকুল। আলম,রাবেয়াকে বলে তান্কু বেঁচি বিকালোত তোমারগুলাক নয়া জামা কিনি দেইম এলা। বারেক মিয়ার গদিতে নামমাত্র টাকায় তামাকগুলো বিক্রি করে দেয় রফিকুল। টাকা কয়টা পাবার পর মনে হয় কতদিন হয়ে গেল গোস্ত খায় না। আজ বাজারে এতো ভীড়! ঈদের আগের হাট। আধা কেজি গরুর গোস্ত কেনার পর টাকা দিতে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখে কোন টাকা নেই। ঘেমে নেয়ে ওঠে রফিকুল। সব পকেট হাতড়িয়েও কোন টাকা পাওয়া গেল না। ঈদের আগে পকেটমার তার সর্বস্ব নিয়ে গেছে। এলোমেলো পা ফেলে বাড়ির দিকে রওনা হয় রফিকুল। একেকটা পায়ের ওজন মন খানেক মনে হয় রফিকুলের। বাড়িতে অপেক্ষায় তার সন্তানেরা আজ তাদের নতুন জামা কেনার কথা।

অন্যরা যখন বৃন্দাবনে তখন আমি রাজপথে। নানান রকম এক্সপেরিমেন্ট চালাই। সময় সুযোগ পেলে কলেজ লাইব্রেরীতে যাই। আর মেসে থাকলে তো টিভির রুমের শিরোমণি আমি। হাজার রকম আইডিয়ার উৎগীরণে প্রেম উঁকি দিতে সাহস পায়নি ফাস্ট ইয়ারে। তবে মনে মনে নিজেকে প্রেমিকই ভাবতাম।
আমি না হয় কাউকে ভালোবাসিনি তাই বলে কি মেয়েরাও কেউ বাসে নাই আমাকে? ওটা জরিপ করা হয়নি। মেয়েরা প্রেমে পড়বে এমন যোগ্যতাও আমার নেই। কারণ প্রেমের ফুয়েল তো টাকা-যা বরাবরই আমার সাধনার বাইরে।
ছেলেমেয়েরা প্রেম-ট্রেম চুটিয়ে করছে। ফাস্ট ইয়ার গেলো সেকেণ্ড ইয়ার গেলো। থার্ড ইয়ারে এসে প্রেম একটু উঁকি দিতে লাগল। তবে কার সাথে প্রেম করব? মেয়ে তো নাই। সবাই বুকড! পোড়াকপাল! আশে-পাশে সুন্দর সুন্দর মেয়ের উড়াউড়ি। লেকিন এরা কেউ আমার নয়, হতেও পারে না। কারণ এদের স্বপ্ন পুরুষ সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর্মি অফিসার। আমার মতো আলা ভোলার খাওয়া নাই। ফোর্থ ইয়ারের ফাইনাল দেবো দেবো এমন আগে মানে টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলো আর কি। আসলে সময়টা সঠিক মনে নেই। কাইজেলিয়া রোডে হাঁটছি- একটা মেয়ে! আরে ভাই বুকের মধ্যে বিশাল একটা ক্ষত তৈরি করল। ভাইরে হাজার হাজার মেয়ে আছে, দেখেছি- এমন মেয়ে তো আগে দেখি নাই! মেয়েদের ফলো করার অভিজ্ঞতা ছিলো না বলে তাকে ফলো করার চিন্তা মাথায় এলো না। বুঝলাম না কোথায় থাকে, কিসে পড়ে, বাড়ি কই, নাম কি। শুধু তর্জমা করলাম -সে একটা মেয়ে। এই মেয়ে যে ক্ষত তৈরি করল-তা মেসে আসার পরও পূরণ হয়নি। রাতে ছটফটাতে ছটফটাতে সময় পার করেছি। ভাইরে, আমি কি প্রেমে পড়েছি? বুঝলাম না।
কাইজেলিয়া রোড ধরে ক্যাম্পাসে ঢুকছি। ভাইরে দেখি-ওই মেয়েটা! কই যেনো যাচ্ছে। সাথে তার একটা মেয়ে। মানে রুম মেট হতে পারে অথবা বান্ধবি টাইপের কেউ। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি- ওই মূহুর্তে বাতাসটা আসল। আহা! তার চুল উড়ল! আমি হ্যাবলার মতো দেখছি, মেয়েটা বুঝতে পেরে একটা মুচকি হাসি দিলো। কিছুদিন পর বুঝলাম ওই মেয়েটা কমার্সের কোনো সাবজেক্টে পড়ে। কারণ দূর থেকে তাকে কমার্স বিল্ডিং-এ দেখতে পেয়েছি।
এরপর থেকে ক্রমাগত আমি উতলা হতে থাকি। মনে মনে আসমান-জমিনে খোদাই করতে থাকি- সে আমার! অনামিকা মেয়েটার জন্য এত সুন্দর আকুলতা আগে কখনো উদিত হয়নি আমার জনমেও। তার দেখা পেয়েছি কদাচিৎ। এই কাইজেলিয়া রোড, লালবাগ, খেলার মাঠে, থার্ড বিল্ডিং আর শহিদ মিনারে।
হঠাৎ একদিন দেখি আমার খুব কাছের বন্ধু তাকে চেনে। সে তাকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করল। বুঝলাম মেয়েটা আমার ইয়ার মেট। তাতে কি? মেয়েটা তো অসাম!
একদা এক সময়- কারমাইকেল কলেজিয়েট প্রাইমারি স্কুলের মাঠে বাচ্চাদের কুজকাওয়াজ প্রাকটিস দেখছি। মনে হলো, ওদের প্রাকটিস ভিডিও করি। ভিডিও করা শুরু করলাম। হায় রে হায়- ওই সময় সেই মেয়েটা কালো একটা ব্যাগ হাতে হোস্টেলের দিকে যাচ্ছে। ভাগ্য ভালো মেয়েটার ছবি এমনি এমনিই আমার ভিডিওতে চলে আসে। মেয়েটা আমার পাগলামি দেখে হাসি দিয়েছে। তারপর বুঝলাম সে কোন হোস্টেলে থাকে। মেসে এসে বারবার সেই ভিডিওটায় মেয়েটাকে দেখি। ওমা- কি সুন্দর!
দিনকে দিন মরিয়া হয়ে যাচ্ছি। ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল চলে এলো। মেয়েটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। মেয়েটাকে মাথায় নিয়ে ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষা দিলাম। আগে কখনো মেয়েটাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাসে আসিনি। তবে এবার এলাম। কলেজিয়েট স্কুলের মাঠে ঘোরাঘুরি করলাম-কারন পাশেই মেয়েটার হোস্টেল। ভাগ্য কাকে বলে- মেয়েটাকে দেখতে পেলাম।
একসময় বুঝতে পারলাম- আমি পুরুষ! চাইলেই সব পাওয়া যায় না। এই সভ্যতায় পুরুষের অলংকার টাকা! লেকিন আমার তা নেই। আর মেয়েটা অনার্স শেষ করল। মানে অচিরেই তার বিয়ে হবে! মনটা এসব ঐতিহাসিক যুক্তি মানতে চাইছে না, বাস্তবে বিদ্রোহ করেও লাভ নেই। কি করি যে!
তবুও বিপ্লবী হওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল। সে আমার- হ্যাঁ, তাকে তো অন্তত আমার মনের কথাটা জানাতে পারি। এটা তো দরকার। এক বন্ধুকে বললাম। বন্ধুটা বলল,এখন চাকরির চিন্তা কর। ওসব বাদ দে।
আমার এক ইয়ারমেট ওই মেয়েটার হোস্টেলে থাকে। কখনো তার সাথে কথা হয়নি। তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম। মনটা আর বেশি সায় দিলো না।
আন্দোলন চলছে মাথায় ও মনে। আসলেই তো আমি পুরুষ! এটা ভুললে অন্ধকারে হারিয়ে যাবো। লেকিন ওই মেয়েকে যে তীব্র ভালোলাগে! তারপরেও আমার পুরুষত্ব মেয়েটা ভোলার জন্য জাগরণ তৈরি করতে থাকে। উৎসাহ দেয়। ফাস্ট ইয়ার, সেকেণ্ড ইয়ারের মেয়েরা বুকড, এই মেয়ে কি খালি? সেও হয়তো কোনো টাকা ওয়ালার সাথে চুক্তি সেড়েছে।
একদিন দেখলাম, মেয়েটা বিসিএস-এর বই নিয়ে হাঁটছে। মানে মনে হলো, সিরিয়াস সাধনা করছে। আবার মনে হলো, আরে না বিসিএস-এর বই নিয়ে ঘোরা তো আজকালকার স্টাইল।
অনেক কষ্টে মেয়েটাকে ভুলতে চেষ্টা করছি। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম- আরে কতো মেয়ে আছে! এটা সুন্দর, সেই রকম-ঠিক আছে। তাই বলে এর জন্য তো আমার জীবন থেমে থাকতে পারে না। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ। লেকিন ওই যে পাথরে আঁকা ছবি মুছে গেলেও হৃদয়ে আঁকা ছবি মুছে না। মোছার চেষ্টা চলছে। এমন একদিন দেখি, মেয়েটা একটা ছেলের সাথে রিক্সায় ঘুরছে! কি হাসি! মনে মনে সান্ত্বনা দিলাম নিজেকে-ছেলেটা তো মেয়েটার ভাইও হতে পারে! না। কাজ হচ্ছে না। তাকে তো আমি বাতিল করেছি- তারপরও কেন আসে তার প্রসঙ্গ? কার সাথে ঘুরবে, শুবে তাতে আমার কি? আবার ভাবি, যাক , গেছে ভালো হয়েছে।
মোটামুটি মেয়েটাকে ভুলে গেছি। মানে দুই হাজার তেরো সালের দিকে। ছাব্বিশে মার্চ সারা দেশে একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে। ক্যাম্পাসে এলাম। শহিদ মিনারের সামনে আয়োজন। একদম পেছনের দিকে দাড়ালাম। ভিডিও করবো জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার দৃশ্য। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শুরু হলো- আমি পেছন থেকে মোবাইলে ভিডিও শুরু করেছি-জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া শেষ না হতেই দেখি ওই মেয়েটা হাসি হাসি ভাব নিয়ে ক্যামেরার সামন দিয়ে যাচ্ছে। হ্যাবি পুলকিত হলাম। আবার কষ্টও পেলাম। রাতে রুমে এসে যখন ভিডিওটা দেখতে লাগলাম বারবার মেয়েটা চোখের সামনে ভাসে। আর বুকের মধ্যে ক্যামন ক্যামন করে।
জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার ঐতিহাসিক ভিডিওটা যখনই দেখি তখন ওই মেয়েটা চলে আসে। মেয়েটার কথা ভাবতে এবং ছবি আঁকতে কোথা থেকে যেনো ইশারা আসে- বুঝি না। মেয়েটাকে ভুলতে বাধ্য হয়ে ভিডিওটা ডিলিট করে দিয়েছি কিন্তু সে আবছা হলেও আজও সুযোগ পেলে খানিকটা উঁকি দেয়!

ফজরের আজান হয়ে গেছে। আকাশে তেমন মেঘ নেই। ছেঁড়া-ফাঁড়া মেঘের ফাঁক গলিয়ে ভোরের আলো চক চক করছে।
সারারাত যে রকম বৃষ্টির প্রতাপ ছিল তার চিহ্ন ফুটে আছে আশেপাশে ডোবা খানাখন্দে। ঘোলাপানি টইটই করছে।
এরই মধ্যে চারদিকে ফর্সা হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব বলেছেন এ সময়ে চারদিকে বেহেশতের হাওয়া বয়।
লোকজন নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হচ্ছে।
সকালের আবহাওয়া বেশ গুমোট। কারণ এই তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও রাতে যে বাইরে কেউ থাকতে পারে এটা অনেকেরই বিশ্বাস হচ্ছে না।
অথচ ঘটনা এখানেই। ভোর বেলা রফিক প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য রেলের ব্রিজের নিচে যায়। অন্যান্য দিনের মত নির্বিঘ্নে শুভকাজটা সারার জন্য প্রস্তুত হতেই আচমকা তার চোখে পড়ে ফ্যাকাশে কিছু একটার ওপর। গলাকাটা লাশ! ভয়ে সে চিৎকার করে ওঠে।
সারারাতের বৃষ্টিতে ভিজে রক্ত ধুয়ে মুছে লাশটা ফ্যাকাশে হয়ে ফুলে গেছে। মাথাটা কারা যেন কেটে নিয়ে গেছে।
হাওয়ার তোড়ে কথাটা এককান দু’কান করে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ ছুটে যায় রফিকের কাছে আদ্যোপান্ত শোনার জন্য। আবার কেউ কেউ ছোটে থানায়।
যেহেতু রফিকই প্রথম দেখেছে লাশটা তাই ভয় পেলেও সে বিরাট একটা কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে।
ছোট বেলায় যখন কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের ঘটনা মনে পড়ে। রাতে ঘুমের ঘোরে কত আমেরিকা যে আবিষ্কার করেছে। কিন্তু সকাল হলেই টের পেত তার আবিষ্কৃত আমেরিকা হল চৌকি থেকে গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে শুয়ে থাকা।
মসজিদের মুসল্লিরা বিভিন্নজন বিভিন্ন মন্তব্য করতে করতে লাশ দেখার জন্য যায়। মহিলাদের একটা অংশ সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে জটলা করে দেখছে এবং যারা আসতে পারেনি তাদেরকে সকৌতুকে বলার জন্য মনে মনে ঘটনাটা গুছিয়ে নেয়।
কেউবা আবার আহাজারি করতে থাকে- কার বুকের ধন গো….। না জানি তার বাবা-মার এখন কী অবস্থা!
ইতোমধ্যে শত শত লোক লোক জড়ো হয়েছে। সংবাদপত্রের ভাষায়- মানুষের ঢল নেমেছে।
সাংবাদিক এলো, ছবি তুললো, নানারকম প্রশ্ন করলো। রফিক মিয়াকে প্রশ্ন করলে সে সদম্ভে সব ঘটনা বললো। তার খুব খুশি খুশি লাগছে এই ভেবে যে, তার ছবি হয়তো পত্রিকায় ছাপবে। এমনও হতে পারে তাকে টেলিভিশনেও দেখাতে পারে।
খয়বর শেখ মসজিদের মোয়াজ্জিন। তিনি দোয়া দরূদ পড়তে পড়তে এলেন। লাশ দেখে তিনি আরেকবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করলেন। স্বগতভাবে তার মুখ দিয়ে বের হল- ছেলেটার বয়স বেশি হবে না। আল্লাহ-তালা আলিমুল গায়েব। কার মৃত্যু কোথায় তিনিই ভাল জানেন।
অনেকে বলাবলি করছে- এটা কি ছেলে নাকি মেয়ে? আজকাল তো মেয়েরাও ছেলেদের পোষাক পড়ে। শহরে দেখোনা!
অনেকে ফোড়ন কাটে- তোর মাথাটাথা খারাপ? দেখাই যাচ্ছে ছেলে।
বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মন্তব্য। গাঁয়ের মাতবর ইসহাক ব্যাপারী হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে এলেন। সদরের নেতাদের সাথে তার আবার উঠাবসা আছে।
গত বছর চেয়ারম্যানি ভোটে অল্প ভোটে হেরে গেছেন তিনি। লোকজন শ্রদ্ধায় নাকি সহানুভূতিতে জায়গা করে দিল বোঝা গেল না।
ব্যাপারী সাহেব এসেই খুব সূক্ষ্মভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লাশ দেখলেন। কেউ একজন কানে কানে তাকে কী যেন বললো। তিনি লাশের ময়লা ভরা দামি কোর্তা নেড়ে চেড়ে বার বার দেখলেন।
হঠাৎ চমকে উঠেন লাশের ডান হাতের দিকে চেয়ে। তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুল নেই লাশের হাতে। কারা যেন কেটে ফেলেছে। এই কথা শুনে উপস্থিত দর্শকেরা আরেকবার কেঁপে উঠল।
শহীদ ছেলেটা বয়সে তরুণ। বুকে ভয় ডর বলতে কিছু নেই। সে তাড়াতাড়ি করে লাশের গায়ের জামার বোতাম খুলে ফেলল। লোমশ বুকে অসংখ্য দাগ। সারা গা ফুলে গেছে। কাঁধের নিচে একটা কালো দাগ।
ব্যাপারী সাহেব অনেক্ষণ তাকালেন।
ব্যাপারী শহীদের দিকে দৃষ্টি দিতেই শহীদ বলে ফেলল- ব্যাপারী চাচা, আমার মনে হয় এ আমাদের আকু। ওর ঘাড়েও একটা কালো দাগ দেখেছি আমি।
ব্যাপারী সাহেব সব কিছু বুঝেছেন এমন একটা ভঙ্গিতে কঠিন সুরে হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠলেন – আমি সব বুঝেছি। আবারো আমাদের কে নির্বাচনে হারানোর জন্য কেউ আকুকে মেরেছে। ভাইসব, সামনের নির্বাচনে আমাদের জয় নিশ্চিত দেখে আমাদের প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আকু আমাদের একজন বলিষ্ঠ কর্মী ছিল। আমরা আকু হত্যার বিচার চাই।
সমস্বরে লোকজন সায় দিল।
এই সময়ে কেউ একজন ব্যাপারীর কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলল-চাচা, আকু মরে নাই। আমাদের আকু বেঁচে আছে, এ অন্য কেউ হবে। ব্যাপারী বিষয়টা বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি করে কিছু আর বলতে পারল না।
তবু গলায় জোর টেনে বলল- আকু না হলেও সে আমাদেরই কেউ। আমরা এর একটা বিহিত চাই।
যেহেতু নির্বাচনের আর বেশিদিন বাকি নাই। কদমগাছার মানুষ একটা গণ্ডগোলের আঁচ পেল।
পরদিন সকালবেলা চায়ের দোকানে তুমুল কথাবার্তা। নিহতের লাশ নিয়ে বেসামাল যুক্তি-তর্ক। একজন ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল- আরে পুলিশ তো লাশ নিয়ে গেছে। দেইখো তোমরা, দুইদিন পর সব গুজব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
আরেকজন টেবিল থাপড়ে বলল- আরে মিয়া তোমার দেখি মাথাটা নষ্ট হয়ে গেছে। যেনতেন দলের লোক মরে নাই। বিহিত না হয়ে যাবে কই। শোনো নাই ব্যাপারী সেদিন কি কইলো!
চায়ের দোকানে যখন এরকম ঝড় উঠছিল, ঠিক তখনি সবার শিরদাঁড়া দিয়ে আরেকটা ঠাণ্ডা ঝড় বয়ে গেল।
কদমগাছার দক্ষিণ বিলে আমন ক্ষেতের ভেতরে মানুষের বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া গেছে। চোখ-মুখ বিকৃত, ফোলা। আজরাইল যেন জান কবচের সময় খুব কুদাকুদি করেছে।
কাটা মাথা দেখেছে মনার বাপ। রাতে জাল পেতেছিল আমন ক্ষতের আইলে। যদিও বুক ধুকপুক করছিল। কিন্তু মাছের নেশা বড় নেশা।
ছোটবেলা থেকেই মনার বাপের মাছ ধরার প্রতি প্রবল ঝোঁক। এমনকি মাছ মেরে মেরে নিজের পড়াশোনা করার ইচ্ছেটাকেও মেরে ফেলেছিল।
মনার বাপ প্রতিদিন সকালে জাল তুলতে যান। আজও সেরকম।
গতদিনের মরা লাশের বিষয়টা মনের ভেতর থাকলেও সেটা কিছু না। মাথায় গামছা বাঁধা। ঠোঁটের কোণে একটা জ্বলন্ত বিড়ির মোথা। জালের দশ-বারো হাতের মতো তুলে ধানের গাছের ভেতর। ওটা কী যেন গোল মানুষের মাথার মতো! মনার বাপ ভয়ে জমে যায়।
কালকের ঘটনাটা মনে করে তার ভয় আরেক দফা বেড়ে যায়। প্রথমে মুখ দিয়ে কথা বের হয়নি। ডান পা টা কাদায় ডুবে গেছে। দেহের সমস্ত শক্তি জড়ো করে সে একটা চিৎকার দিল।
গতদিনের মতো আজও শুধু কাটা মাথা দেখার জন্য লোকজন জড়ো হয়েছে। রহস্য মানুষের মনে কৌতুহল বাড়িয়ে দেয়।
কৌতুহলকে মানুষ দাবিয়ে রাখতে পারেনা। কাটা মাথাটার মুখটাকে চেনা যায় না। ছেলেটার মন্দভাগ্য। রাত দুপুরে বেঘোরে মারা গেল। যেন তেনভাবে নয়, একেবারে মাথাটাকে দেহ থেকে আলাদা করে ফেলল। মাথা এক মুলুকে আর দেহ আরেক মুলুকে।
সাথে সাথে পুলিশ এলো। সাথে অল্পবয়স্ক গোছের ওসি সাহেব এলেন। ওসি সাহেব মনার বাপকে জেরা করলেন। মনার বাপ ভয়ে ভয়ে হলেও সত্য কথাটা বলে পুলিশের জেরা থেকে মুক্তি পেলেন।
ব্যাপারী সাহেব ওসি সাহেবকে বললেন- ওরা জানবে কী? ওরা তো আর মিছিল-মিটিংয়ে থাকে না। মার্কা নিয়া চিল্লাচিল্লি করেনা। আমি জানি কারা মারছে আকুকে।
এলাকার চেয়ারম্যান সিরাজ মাস্টার। তিনি সদরে কি কাজে গিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি এসে পড়ায় ব্যাপারী চুপ হয়ে যায়। দু’জনের আলতো চোখাচোখি হয়।
চেয়ারম্যান ওসি সাহেবের সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে ঘন্টা খানেক পরে দলবল নিয়ে চলে যায়।
ব্যাপারী এবার আস্তে আস্তে সরব হয়। এরমধ্যে তাকে ঘিরে কিছু লোকজন জমা হয়। তিনি হঠাৎ গলা বাড়িয়ে হাত নেড়ে বলে উঠলেন- ওরা আমার ডানহাত ভেঙে দিয়েছে।
তারপর জনগণের উদ্দেশ্যে বললেন- ভাইসব, আপনারা ঐ খুনি সিরাজ মাস্টারকে ভোট দেবেন না। সে একটা নিরীহ ছেলেকে বিনাদোষে খুন করেছে। এরা দেশ ও জাতির দুশমন। আপনারা এই অধমের কথা একটু মনে রাখবেন।
বামদিক থেকে একটা মিছিল এলো- আকু ভাইয়ের হত্যাকারীর বিচার চাই, বিচার চাই ।
ওসি সাহেব ব্যাপারীর প্রতি ঝুঁকে কানে কানে কী যেন বললেন। ব্যাপারী বুঝতে পারলেন।
আবেগ আপ্লুত হাসিতে তার মুখ মণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
পুলিশের দল ব্যাপারীর বাড়িতে খাওয়া দাওয়া সেরে চলে গেলেন। গ্রামে আরেকবার স্বস্তি ফিরে এলো।
পত্রিকায় লাশের ছবিসহ সংবাদ ছাপলো- ‘কদমগাছায় গলাকাটা লাশ উদ্ধার’।
মামলা হয়েছে পাল্টাপাল্টি। দুই পক্ষই পুলিশের সমাদর করল নিখুঁতভাবে।
নানাকথার গুঞ্জনে চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে আর কথার মাঝে মিশে যায়।
যতদিন যায় গুঞ্জনও কমে যায়। পুরনো কথা যেমন শুনতে বিরক্ত লাগে তেমনি বিতৃষ্ণা আর দৈনন্দিন ব্যস্ততার চাপে চাপা পড়ে যায় আকুমিয়ার খুনের রহস্য।
রফিক মিয়ার মনে দাগ কেটে থাকে ঘটনাটা। মুণ্ডুহীন লাশ শুধু তার চোখের সামনে ভাসে। অন্য সবাই ভুলে গেলেও রফিক ভুলতে পারেনা। ওর মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে-রাজনৈতিক মরার কী আর খোঁজ থাকে। তা আবার গরীব মানুষের পোলাপাইন হইলে তো কথাই নাই।
নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। আকু মিয়ার জায়গায় অন্য আরেকজন মিছিল করে। দিনের সূর্য প্রতিদিনের মতো সকালে ওঠে বিকেলে অস্ত যায়। শুধু পরিচিত জনের বুক চিড়ে বের হয় একটা পঁচা বাসি দীর্ঘশ্বাস।

ঈদ মানেই খুশি, তাইতো ঈদকে আমরা সবাই ভালোবাসি। ধনী-গরিব কারো কাছেই যেন এর গুরুত্ব মোটেই কম নয়। নীলিমা গ্রামের এক সাধারণ মেয়ে। সারাদিন লাফালাফি হইহুল্লোড় করেই তার দিন কেটে যায়। ওর স্বপ্ন অনেক বড়। ছোট ছোট স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য অবিরাম কর্মে নিয়োজিত সে। মা অন্যের বাসায় কাজ করে। ওর ছোট ভাইয়ের নাম নিলয়; যে কিনা সবসময় তার বোনের সাথে খুনসুটিতে মেতে থাকে। প্রত্যেক মেয়ের মতো নীলিমারও শখ ঈদে লাল টুকটুকে একটা জামা পরবে,
লাল ফিতা মাথায় দেবে, তারপর রং-বেরঙের চুড়ি পরে ভাইবোনদের সাথে ঘুরতে যাবে। স্বপ্নের দেশে পাড়ি দেয়ার ইচ্ছা কার না থাকে?পড়াশোনায় সে মোটেও খারাপ নয়। এবার পিইসি পরীক্ষায় সে সাধারণ বৃত্তি পেয়েছে। কোন ঈদেই সে একটা নতুন জামা পরতে না। তবুও তার আনন্দ যেন কারো থেকে কম নয়।যেখানে দু-বেলা ভালোভাবে পেটের দায় মেটানো দুস্কর, সেখানে একটা নতুন জামা কেনা তাদের জন্য মোটেই সহজ ব্যাপার নয়।বাবার কাছে ও আবদার করেছে লাল ফিতা, চুড়ি, জামার জন্য। রিক্সা চালিয়ে তার বাবা জীবিকা নির্বাহ করে। মেয়ের কথায় না বলা অসম্ভব তার বাবার কাছে। যদিও অন্যান্য রিক্সা চালকদের মতো শারীরিক সামর্থ্য তার নেই।কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় দিনে ৬ ঘন্টার বেশি কাজ করতে অক্ষম তিনি। তার মেয়েকে লাল টুকটুকে জামায় দেখবে বলে তিনি দিনভর রিক্সা চালানো শুরু করে দিলেন।অন্যান্য দিনের তুলনায় তিনগুণ বেশি আয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। কষ্টে দিন অতিবাহিত হলেও বাজারের শ্রেষ্ঠ জামাটাই তিনি তার মেয়েকে দেবার পণ করেছেন। ঈদের আর মাত্র দুইদিন বাকি। বাজারে একটা রমরমা ভাব চলে এসেছে। মেয়ের জামা কেনার টাকাও প্রস্তুত। যেখানে বস্তির দোকান ছাড়া তারা জামা কেনার কথা চিন্তাও করে না, সেখানে শহরের সবচেয়ে বড় শপিংমলে আজ তার পা পড়েছে। এইদিকে তার রোগের প্রকটতা দিনদিন বেড়েই চলেছে, সেদিকে তার কোন খেয়ালই নেই। সেদিন তার গায়ে ছিল একটা সাদা গেঞ্জি। শপিংমলের সবাই তাকে দেখে একটু অবাক-ই হয়েছে। শপিংমলের সবচেয়ে বড় দোকানটায় তিনি ঢুকে পড়লেন জামা কেনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন সিঁড়িতে। গড়িয়ে গড়িয়ে একদম শেষ সীমানায় গিয়ে পড়লেন। শরীরে পরিহিত সাদা গেঞ্জিটা সম্পূর্ণই লাল রক্তে ভিজে গেল। এই নতুন রাঙা গেঞ্জিটা পরেই গাড়ি থেকে তার বাবাকে নামাতে দেখে সম্পূর্ণ পৃথিবী যেন নীলিমার মাথায় ভেঙে পড়ল। সে কল্পনা করেছিল অন্যান্য ঈদের চেয়ে সত্যিই বোধহয় এই ঈদটা অন্যরকম হবে।তার ভাবনা ভুল বৈ কিছু ছিল না। লাল জামার পরিবর্তে সে পেল একটা লাল গেঞ্জি। যা সারাজীবন স্মৃতি হিসেবে তাকে বইতে হবে। সত্যিই এই ঈদটা তার মনের খাতায় অনেক বড় স্মৃতির স্থান দখল করে নিল।

ভারতের ৫৭২টি প্রিন্সলি ষ্টেট যেগুলো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট পাকিস্হানে যোগ দিলো, যেগুলো হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে যোগ দিলো। বাংলা ও পাঞ্জাবকে কেটে ভাগ করতে হলো। সমস্যা বাধলো হায়দ্রাবাদ, কোচবিহার ও কাশ্মির নিয়ে। হায়দ্রাবাদের সংখ্যাগরিষ্ট নাগরিক হিন্দু কিন্তু রাজা নিজাম ওসমান আলী মুসলমান, কাশ্মিরের রাজা হরিসিং হিন্দু কিন্তু প্রজা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর কোচবিহারের রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ন ভুপ বাহাদুর হিন্দু, প্রজা হিন্দু ও মুসলমান সবাই মিলে স্বাধীন থাকতে চাইলো। নেহেরুর এক ধমকে হায়দ্রাবাদের নিজাম ওসমান আলীক ভারতে যোগ দিতে হলো। রাজা মুসলমান তাতে কি প্রজাতো হিন্দু। কোচবিহার স্বাধীন থাকতে চাইলেও পারলেন না . হয়ে গেলেন পশ্চিম বাংলার একটি জেলা। আর কাশ্মির হয়ে গেলো যুদ্ধক্ষেত্র। এবারে নেহেরু বললেন প্রজা মুসলমান তাতে কি রাজাতো হিন্দু।
১ অক্টোবর ১৯৪৭ খ্রিঃ সদ্য গঠিত স্বাধীন পাকিস্হান তার যাত্রা শুরু করলো ভারতের সাথে যুদ্ধ দিয়ে। যদি এই যুদ্ধ না হতো, তাহলে ৭৭ ভাগ মুসলমানের দেশ কাশ্মির পুরোটাই হয়ে যেতো ভারতের। সম্ভবতঃ এ সব কারনেই বিবিসি জরিপ দল মন্তব্য করেছেন, India does not accept the two-nation theory and considers that Kashmir, despite being a Muslim-majority state, is in many ways an “integral part” of secular India. দ্বি-জাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলেও কাশ্মিরের বেলায় ভারত টু নেশন থিওরি মানে নাই। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রিন্সলি ষ্টেট হওয়া সত্ত্বেয় ভারত নানাভাবে কাশ্মিরকে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের অংশ দাবি করে। ১৯৫১ খ্রিঃ কাশ্মির সমস্যা সমাধানে কমনওয়েলভূক্ত দেশগুলির জোট এগিয়ে এসেছিলেন। অষ্ট্রেলিয়ার তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী Robert Menzies প্রস্তাব করলেন অবাধ সুষ্ঠ গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলির যৌথবাহিনী, ভারত-পাকিস্হানের যৌথ বাহিনী এবং গণভোট সম্পাদনকারী নির্বাচন কমিশনারের স্হানীয় আধা সামরিক বিাহিনী মোতায়েন করে একটি অবাধ নিরপেক্ষ গণভোট অনুষ্ঠান সম্পাদন করা সম্ভব। পাকিস্হান অষ্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাব মেনে নিলেন কিন্তু ভারত প্রত্যাক্ষাণ করলেন এইবলে যে এখানে পাকিস্হানের সৈন্য থাকতে পারবে না। কারন পাকিস্হান তাদের ভাষায় এ্যাগ্রেসর। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ভারত পাকিস্হান দুই দেশকে আন্তর্জাতিক প্রস্তাবনা মেনে নিতে এবং সম্মান জানাতে আহবান জানালেন এই যুক্তিতে যে ভারতের স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী, ভারত পাকিস্হান দুটি দেশই ১৯৪৮ ও ১৯৪৯খ্রিঃ গণভোটের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলো। একারণেই সে সময় ভারতের স্বাধীনতা দ্রুত সম্ভব হয়েছিলো। ১৯৪৭ এর আগে কাশ্মির সমস্যা দৃশ্যমান হলে ভারতের স্বাধীনতা বিলম্বিত হতো। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের পক্ষ থেকেও বলা হয় যদি ভারত পাকিস্হান নিজেরা নিজেদের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হন তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আর্বিট্রেশন মানতে হবে। পাকিস্হান মেনে নিলেন কিন্ত নেহেরুর ভাষ্য ছিলো অদ্ভুত এবং গোয়ার্তুমিতে ভরা। নেহেরু বললেন তিনি তৃতীয় পক্ষের নাক গলানো পছন্দ করবেন না। ১৯৫২খ্রিঃ দিল্লি চুক্তির আলোকে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার সাথে ১৯৫৪খ্রিঃ কাশ্মিরের স্হায়ী বাসিন্দা সম্পর্কিত ৩৫এ ধারাটি যুক্ত করা হয়। কাশ্মিরের সদর-ই-রিসায়াত বকসি মোহাম্মদ ভারতের রাষ্ট্রপতির এই আদেশ বাস্তবায়নে নিয়োজিত থাকেন। বকসির নেতৃত্বে ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৪ জম্মু ও কাশ্মিরের সংসদ ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা গ্রহন করে, ১৭ নভেম্বর ১৯৫৬ তা আইন হয় এবং ২৬ জানুয়ারী তা সম্পূর্ণরুপে কার্যকর হয়। কিন্তু পরের বছর ১৯৫৭ সারের ২৪ জানুয়ারি জাতিসংঘ একটি সিদ্ধান্তে জানায় ভারতীয় সাংবিধানিক সংসদ এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। জনগণের আস্হার প্রতিফলন ঘটাতে হলে ১৯৪৭খ্রিঃ ভারত-পাকিস্হান স্বাধীনতা আইনের নির্দেশনা অনুয়ায়ী একটি অবাধ, নিরপেক্ষ গণভোটের বিকল্প নাই।
এবারে শুনুন সেই বিখ্যাত মন্তব্য, “ইসলাম খাতরে মে হ্যায়” এর গল্পঃ-
১৯৮০খ্রিঃ এর পর থেকে কাশ্মিরে ভারত বিরোধী কার্যক্রম জোরদার হোতে থাকে। সোভিয়েত- আফগান জিহাদ এবং ইরানি ইসলামিক বিপ্লব ছিলো কাশ্মিরি যুবসমাজের উৎসাহের সূত্র। এ লক্ষে মাঠে নামে জম্মু ও কাশ্মির লিবারেশন ফোর্স (জেকেএলএফ) এবং পাকিস্হানি ইসলামিস্ট গ্রুপ জেআইজেকে। ১৯৮৪ খ্রিঃ কাশ্মিরে শুরু হয় সন্ত্রাস ও আতংকবাদী কার্যকলাপ। এটা বেশী করে বোঝা গেলো ১৯৮৪ খ্রিঃ ফেব্রুয়ারী মাসে যখন কাশ্মির লিবারেশন ফ্রন্টের মিলিট্যান্ট মকবুল ভাটের শাস্তি কার্যকর করা হলো সারা ভারতের কোথাও কোথাও এবং কাশ্মিরে যুব কাশ্মিরিরা ভারত বিরোধী দেশদ্রোহী কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হলো খোলামেলা ভাবে। প্রধানমন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহ আজাদ কাশ্মিরে সফরে গেলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় তিনি হাসিম কোরেশির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। ফারুক আব্দুল্লাহ বলেন তিনি ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে আন্দোলনের গতি প্রকৃতি ও অবস্হা পর্যবেক্ষনে আজাদ কাশ্মিরে গেছেন যেমন তার বাবা শেখ আব্দুল্লাহ ইন্দিরা গান্ধীর বাবা প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর পরামর্শে পাকিস্হানে গিয়ে আইয়ুব খানের সাথে দেখা করেছেন। খুব সামান্য ভারতীয় নেতৃবৃন্দ এসব কথা বিশ্বাস করলেও ফারুখ আব্দুল্লাহর ভাগ্যে নেমে আসে কালো ছায়া। ২ জুলাই ১৯৮৪ খ্রিঃ ফারুক আব্দুল্লাহকে সরিয়ে তার জায়গায় প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো হয় তারই ভগ্নিপতি গোলাম মোহাম্মদ শাহকে।
এই গোলাম মোহাম্মদ শাহ ছিলেন অনির্বাচিত এবং মনোনিত প্রধানমন্ত্রী । ১৯৮৬খ্রিঃ জেকেএলএফ সদস্যদের পাকিস্হান অংশের আযাদ কাশ্মিরে আর্মস ট্রেনিং দিয়ে কাশ্মিরে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ আছে। শাহ সাহেব কাটা দিয়ে কাটা তুলতে চাইলেন। এ সময় তিনি জম্মু ও কাশ্মির জামায়াতে ইসলামীর নেতা মৌলভী ইফতেখার হোসেন আনসারী, মোহাম্মদ শাফি কোরেশি, এবং মহিউদ্দিন সালাতি ইত্যাদি নেতৃবৃন্দের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তাদের মাধম্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের সমর্থণ পেতে চাইলেন। এতে বিভিন্ন ইসলামপন্হি সংগঠনগুলো পলাতক অবস্হা থেকে বাইরে আসতে থাকে এবং তাদের কর্মসূচি নিয়ে কিছুটা স্বস্হিতে থাকে। এ সময় জম্মুতে ১৯৮৬ খ্রিঃ তাদেরই পরামর্শে জম্মু সরকারি কর্মচারি সচিবালয় প্রিমিসিসে মুসলমান কর্মচারিদের নামাজ আদায়ের জন্য তিনি একটি মসজিদ নির্মানের আদেশ দেন। বলাবাহুল্য এই মসজিদটির খুব কাছেই কিংবা পাশেই ছিলো একটি হিন্দু মন্দির। ফল হলো হিতে বিপরীত। মন্দির অপবিত্র ও সনাতন ধর্ম বিনষ্টের প্রতিবাদে একপর্যায়ে হিন্দু সংগঠনগুলো রাস্তায় নেমে পড়লো। মুসলমানরাও পিছিয়ে থাকলো না। এ সময় মোহাম্মদ শাহ কাশ্মির উপত্যকায় এসে বললেন জম্মুতে ইসলাম খাতরে মে হায়। ফলে যা হবার তাই হলো। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লো গোটা জম্মু ও কাশ্মিরে। টার্গেট হলেন কাশ্মিরি পন্ডিতরা। ১৯৮৬খ্রিঃ ফেব্রুয়ারী মাসের অনন্তনাগ দাঙ্গায় একটি হিন্দুরও প্রাণ যায়নি। তবে তাদের ঘরবাড়ি লুট, অগ্নিসংযোগ, ও অন্য মালামালের ক্ষতি সাধন হয়। ফলে ১৯৯০খ্রিঃ এর মধ্যে জম্মু কাশ্মিরের সমস্ত কাশ্মিরি পন্ডিত সমাজ একে একে সবাই কাশ্মির উপত্যকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিবিসির জরিপ মতে ভারত অধিকৃত কাশ্মির থেকে ১৯৪৭-৪৮খ্রিঃ সময়ে ৫,২৫,০০০ মুসলিম ভারত থেকে পাকিস্হান অধিকৃত কাশ্মিরে যায়, ২,২৬,০০০ জন হিন্দু পাকিস্হান থেকে ভারতে আসে। এবং ভারত অধিকৃত কাশ্মির থেকে ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শহরে যায় ৫,০৬,০০০ জন যার প্রায় অর্ধেকই কাশ্মিরি পন্ডিত নামে পরিচিত।
অনন্তনাগ রায়ট কারণ অনসন্ধান করে দেখা গেছে ইসলামিষ্ট মৌলবাদীরা এ রায়টে অংশ নেয় নাই। বরং সেকুলার পার্টির সদস্যরাই এই ঘটনায় ঘি ঢেলে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। শাহ সেনাবাহিনীও তলব করেছিলেন। কিন্তু এসবে কোন কাজ হয় নাই। একই বছর অর্থাৎ ১৯৮৬ খ্রিঃ ১২ মার্চ তৎকালিন গভর্ণর জগমোহন কতৃক গোলাম মোহাম্মদ শাহের সরকারকে ডিসমিস করা হয় এবং তখন থেকেই জগমোহন সরাসরি কাশ্মির শাসনভার নিজ হাতে তুলে নেন। ভারতের সিনেমা অভিনেতা অনুপম খের সেই পন্ডিত কুলের একজন বলে শোনা যায়। পাকিস্হানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ক্রিকেট প্লেয়ার বন্ধু নভজোত সিধুকে আমন্ত্রন জানানো হলেও এই কাশ্মিরি পণ্ডিতকে পাকিস্হান আগমনের ভিসা দেয়া হয় নাই।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ অঞ্চল। এ দেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত অনেকপ্রাকৃতিক নিদর্শন লক্ষ করা যায়। এগুলো হলো কান্তজিউ মন্দির, রামসাগর, স্বপ্নপূরী, ভিন্নজগৎ, পাহাড়পুর, সোনা মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, তাজহাট রাজবাড়ি, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি।
বাংলাদেশের দক্ষিনাংশে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এ সাগরটির কথা মনে পরলেই পর্যটকদের প্রিয় নগরি কক্সবাজারের কথা মনে পরে। এ কক্সবাজারের যেমন রয়েছে সৌন্দর্য তেমনি রয়েছে কয়েকটি সুন্দর জায়গা। এ গুলোর মধ্যে হিমছড়ি, মহেশখালি, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন প্রভৃটি উলেুখযোগ্য।
শুরুটা হলো যেভাবে
কয়েক বছর আগের কথা। একদিন শুনতে পেলাম, আমরা সপরিবারে কক্সবাজার যাচ্ছি। এ কথা শুনে আমার মনটা নেচে উঠলো।
আমাদের কক্সবাজার যাওয়ার আগে বাবা এবং তার এক বন্ধু শ্যামলী কাউন্টারে চট্টগ্রামগামী কোচের টিকিট কিনলো। কারন, তার পরিবারও আমাদের ভ্রমনসঙ্গী ছিল। যেদিন আমরা রওনা দেব সেদিন নির্দিষ্ট সময় আমরা শ্যামলী কাউন্টারে পৌছি। গিয়ে আমরা দেখতে পাই আমার বাবার বন্ধুর ফ্যামিলির সবাই আমাদের মত সেখানে পৌছেছে।
সেদিন মাগরিবের নামাজের পর আমরা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হই। বাসে আমার জায়গা হয় জানালার পাশে। আমার জায়গার পাশে আমি বাবাকে বসতে বলি। কিন্তু আমার বাবা বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে।” তখনি আমার সামনে এল মিলন এবং বাবার কথায় আমার পাশে বসে গেল সে। মিলন যখন আমার পাশে বসল, আমি দেখলাম সবাই জায়গা করে নিয়েছে নিজেদের মত। একটু পরেই শ্যামলী পরিবহন চট্টগ্রাম মুখে তার যাত্রা শুরু করল। প্রথমে বাসটি আস্তে এবং পরবর্তীতে জোড়ে চলতে লাগলো।
রাতের আধার পেরিয়ে আমাদের গাড়ী চলতে লাগল। আমি জানালা দিয়ে দেখলাম, রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে আলো জ্বালানো হয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে সে সব দৃশ্য। কিছুক্ষনের মধ্যেই চেকার এসে আমাদের টিকিট চেক করল। বগুড়া শহরে যখন আমাদের গাড়ী প্রবেশ করল, তখন এশার আজান দেওয়া শুরু হয়েছে। তাই, আমরা সেখানে নামাজ পরলাম। এশার নামাজ শেষে আমাদের গাড়ী আবার চলতে লাগলো। ইতিমধ্যে, শ্যামলী পরিবহন ফুড ভিলেজে পৌছালে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। রাত ১২টায় ঢাকা পার হয়ে আমাদের বাস পরদিন ভোরে চট্টগ্রাম পৌছে। এ সময় কাউন্টারে সব রেখে আমরা সেখানে ফযরের নামাজ আদায় করি। নামাজের পর আমরা রওনা দেই সেই কাঙ্খিত স্থান কক্সবাজারে।
স্বপ্নের হিমছড়ি
দিনটি ছিল শুক্রবার। তাই জুম্মার নামাজের আগে আমরা কোন প্রোগ্রাম না রেখে কক্সবাজারে পশুসম্পদ অফিসের রেস্টহাউজে উঠি। সেদিন নামাজ শেষে আমরা গাড়ী নিয়ে হিমছড়ির দিকে রওয়ানা দেই। সাথে ছিল আমার মামা-মামী আর খালাত বোন।
হিমছড়ি গিয়ে পৌছাতেই, আমার নজরে এল সুন্দর পাহাড়ে ভরা প্রকৃতি। আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন হিমছড়ির ঝর্ণার কথা। এ ঝর্ণাটিও আমার দৃষ্টির বাহিরে গেল না। হিমছড়িতে একটি সিড়ি ছিল পাহাড়ে ওঠার। আমি বাবাকে বললাম, “আব্বু আমি উপরে উঠি।” “উপরে উঠবি ! তুই তো পারবি না।” “অবশ্যই পারবো।”
ব্যাস আমি উপরে উঠতে শুরু করলাম আমার বাবার সাথে। কিন্তু, বেশিক্ষন সিড়ি বেয়ে উঠতে পারলাম না। তবুও সেখান হতে দৃষ্টি দিলাম সমুদ্রে। তখনি আমার মন আনন্দে ভরে উঠলো। আসরের পর আমরা লাবনী সি-বিজ এ গেলাম সমুদ্রকে কাছ হতে দেখার জন্য। সারা বিকেল পার করার পর আমরা নামাজ পরে রেস্ট হাউজের দিকে রওয়ানা হই।
মহেশখালির পথে যাত্রা
পরদিন সকাল বেলা। ঘুম হতে খুব ভোরেই উঠতে হলো। বাবা বললেন, “পিয়াল রেডি হ-য়। আমরা মহেশখালি যাব।” “কি বললে ! মহেশখালি। আমি এখনেই যাচ্ছি রেডি হতে।” এ সময় দেখলাম মিলনের বাবা বাথররুমে যাচ্ছেন। আমি বুঝে গেলাম তিনি গোসল করবেন।যাইহোক, সকালের নাস্তা খেয়ে নদীর ঘাটের দিকে সবাই রওয়ানা হলাম। নদীর ঘাটে গিয়ে দেখি বিশাল কারবার। প্রতিটি ট্রলারে মাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নৌকাগুলো পানির বুকে ঢেউ খাচ্ছে। বরফ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাছকে সতেজ করার জন্য।
আমরা একটি যাত্রীবাহি ট্রলারে উঠলাম, মহেশখালি যাওয়ার জন্য। ট্রলারের ভিতর ধুকতেই দেখলাম, সবাই তাদের জায়গা দখল করে বসে আছে। ট্রলারের ভিতরটা দেখতে ঠিক বাসের মত। পিছনে মটর লাগা, সামনে আছে সারেং।
অনেকক্ষন ট্রলারে যাত্রা করার পর, আমরা মহেশখালিতে এসে পৌছাই। নৌ-ঘাট হতে আমরা সোজা রওয়ানা দিলাম মহেশখালীর বৌদ্ধ বিহারে। বৌদ্ধ বিহারে পৌছাতেই চোখে পড়ল ক্ষুদে ভিক্ষুকদের। ওরা বৌদ্ধ বিহারে ঘোরাঘুরি করছে। সেখানকার নিয়োজিত প্রধান আমাদেরকে মন্দিরের ভিতর, গৌতম বুদ্ধের মুর্তির কাছে নিয়ে যায়।
এরপর, আমরা সেখান হতে রওয়ানা হই, হিন্দু মন্দিরে। নদীর পাশে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে অবস্থিত এ মন্দির। এ মন্দির পর্যবেক্ষন করে আমরা নামাজ পড়ে ¯িপ্রটবোর্ডে কক্সবাজার ফিরে আছি। এভাবেই আমাদের মহেমখালী ভ্রমন শেষ হয়।
দুলাহাজরার পথে
পরদিন সকাল। কিছুক্ষনের মধ্যেই একটি গাড়ি, আমাদের রেষ্টহাউজের সামনে এসে দাড়ায়। গাড়ি হতে নামলেন আমার মামা। এরপর, আমরা তার আত্বিয়ের বাড়ি দিয়ে রওয়ানা হই দুলাহাজরা সাফারী পার্কের দিকে। আমাদের সাথী হন আমার মামী ও আমার খালাত বোন। যাইহোক, সাফারী পার্কে পৌছেই চোখে পড়ে এর সৌন্দর্য মন্দিত বিভিন্ন স্থান। সেখানে একটি ম্যাপে সাফারী পার্কের স¤পূর্ণ অংশ পর্যবেক্ষন করি। সুন্দর পরিবেশে সাজানো হয়েছে পার্কটি। এ পার্কের একটি টাওয়ার আমাকে রোমাঞ্চকর মুহুর্তে নিয়ে যায়। চড়তে থাকি আমি টাওয়ারে। আমার সাথী হন, আমার বাবার বন্ধু আর তার পরিবার। টাওয়ারে উঠেই যেন আমি মনে করি আমিও একজন সাহসী যুবক। সাফারী পার্ক হতে আসার সময় আমরা একটি প্রামান্য চিত্র দেখে রওয়ানা হই কক্সবাজারের দিকে।
সমুদ্র সৈকতে কিছুক্ষণ:
কক্সবাজারে থাকা কালে একদিন আমরা সাগর সৈকতে রওয়ানা দেই। সাগর পাড়ে গিয়ে আমরা মনোরম হাওয়া উপভোগ করি। এরই মধ্যে আমি খালি পায়ে হাটতে শুরু করেছি। আমার বোন ও মিলনের মা মাটিতে পড়ে থাকা ঝিনুক কুড়াতে শুরু করেছে।কিছুক্ষনের মধ্যে আমার চোখ যায় একটি ঘোড়ার দিকে। তখনেই আমি আমার বাবাকে বললাম, “আব্বু আমি ঘোড়ায় চড়ব।” “ঠিক আছে। চড়।” এরপর কিছুক্ষন ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোর পর আমি অন্যদের সাথে লাবণী সি-বিচে পৌছি। এ ভাবেই কেটে গেল আমাদের সেদিন। আমরা প্রহর গুনতে লাগলাম আগামী দিনগুলোর প্রতিক্ষায।
বান্দরবানের স্মৃতি ঃ
কক্সবাজার হতে যাওয়ার আগে আমরা বান্দরবানে সফরে গিয়েছিলাম। বান্দরবান পৌছেই আমরা গাড়ী ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম টাইগার হিলের উদ্দেশ্যে। আমি ও মিলনের ছোট ভাই ছিলাম গাড়ীর সামনে। খুব সুন্দর ভাবে পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে চলছিল আমাদের গাড়ী।
টাইগার হিলে পৌছেই দেখতে পেলাম কুয়াশা ঘেড়া পরিবেশ। আকাশের সাথে তখন পাহাড় মিলেছে দূরে। এজন্যই মনে হয় কাজী নজরূল লেখে গিয়েছিলেন, “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ।” যাইহোক, সেই পাহাড় হতে নেমে আমরা চিম্বুক পাহাড়ে পৌছিলাম। পাহাড়ের উপর হতে বান্দরবান শহরটি দেখাচ্ছিল খেলনা শহরের মত। বান্দরবান হতে আসার সময় আমরা শৈলপ্রপাতে যাই। সেখানে আমার বাবা তার বন্ধুর সাথে ছবি তোলে। ছবি তোলা শেষে আমরা পারি জমাই কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।
কক্সবাজার ছাড়ার স্মৃতি ঃ
বান্দরবান হতে আসার কিছুদিন পর আমরা কক্সবাজারত্যাগ করি। কক্সবাজার হতে যাওয়ার সময় আমার খুব মন খারাপ হল যে এই সুন্দর জায়গাটি আমাকে ছাড়তে হবে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হল আমরা তো কক্সবাজার ছাড়লেও এখনি বাড়ি যাচ্ছি না। কারণ আমরা যাচ্ছি চট্টগ্রামের দিকে। সেখানেই আছে অনাবিল আনন্দ।
কক্সবাজারের যে রেস্ট হাউজে আমরা থাকতাম তার কেয়ারটেকার ছিল আতি ভাল মানুষ। যে কটা দিন আমরা সেখানে ছিলাম সে কটা দিনেই তিনি আমাদের আপন করে নিয়েছিল। তাই আমাদের যাওয়ার দিন তিনি অনেক কেঁদেছেন। সেই দৃশ্য আজ আমার চোখেরসামনে ভেসে উঠে।
যাওয়ার দিন সকালে আমরা নাস্তা খেয়ে রেডি হলাম। আমাদের টারমিনালে নেওয়ার জন্য আমার মামার গাড়ী আমাদেরবাংলোর সামনে এসে থামলো। আমরা রেডী হয়ে গাড়ীতে চড়লাম। চড়ার আগে আমার একটি সার্ট সেই কেয়ারটেকারকে দিয়ে দিলাম। এ সময়ই সে সেই উপহারটি সসম্মানে গ্রহণ করল। জানি না কক্সবাজারের কথা ভুলতে পারব কিনা জানি না। তবে চট্টগ্রামের কথা ভেবে আমি খুব আনন্দাতিত হয়ে উঠি এটা বলা যায়। আর এভাবেই শেষ হয় আমার কক্সবাজার ভ্রমন।
চট্টগ্রাম ও আমরা ঃ
আমরা যখন চট্টগ্রাম পৌছিলাম তখন প্রায় দুপুর। আমরা খুব ভালভাবেই পৌছি সেখানে। তারপর আমরা একটি টেম্পু ভাড়া করে রেস্ট হাউজের দিকে রওয়ানা দেই। আমাদের রেস্ট হাউজটি ছিল তিন তলা বিশিষ্ট। আমরা গোলাকার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। আমরা ২য় তলায় এবং মিলনেরা ৩য় তলায় আবস্থ্না নিলাম।
দুপুরে হ্লাকা খেয়ে আমরা বিশ্রামে চলে গেলাম। বিকালে আমরা স্বীদ্ধান্ত নেইফয়েজ লেকে যাব। তাই আমরা বের হলাম ফয়েজ লেকের দিকে।
ফয়েজ লেকের বৈচিক দৃশ্য ঃ
আমরা যখন ফয়েজ লেকে পৌছি তখন দেখতে পেলাম সুন্দর করে সাজানো হয়েছে এর গেট। ১ম এই আমরা টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্রবেশ করেই এর সৌন্দয্যে আমরা হারিয়ে গেলাম আমরা। এর অপরুপ দৃশ্য আমাদের পাগল করল।
আমরা এর আকাবাকা রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষন হাটলাম। কিছু ছবি তুললাম। মিলনেই তুলল সেই সব ছবি। তারপর আমর্ াচড়লাম ফ্যামিলি কোস্টারে। তবে সবাই না। আমি, আমার বোন এবং মিলনের ভাই ইমন। আমরা যখন ফয়েজ লেক হতে বের হলাম তখন রাতের লাইট গুলো জ্বলে উঠেছে। আমরা সবাই সেদিন আইসক্রিম খেয়েছিলাম এবং এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্মৃতি।
রাঙ্গামাটির কথা ঃ
চট্টগ্রাম যাওয়ার পরদিন আমরা রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। রাঙ্গামাটি পৌছে আমরা সৌন্দর্যউপভোগ করতে লেগে গেলাম। প্রথমে আমরা একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করলাম সৌন্দর্য দেখার জন্য। এরপর, আমরা নৌকায় চড়ে নদীর কোল ঘেসে জেগে থাকা পাহাড়ের দৃশ্য উপওেভাগ করতে লাগলাম।
কিছুক্ষন পর আমরা রাঙ্গামাটির বিশেষ আকর্ষন ঝুলন্ত ব্রীজে গেলাম । তারপরসেটি দেখে আমরা আবার নৌকায় উঠলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য। রাঙ্গামাটি হতে আসার সময় আমরা পেদা টিং টিং এ নামাজ পড়ে রওয়ানা হলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আর এভাবেই শেষ হয় রাঙ্গামাটি সফর।
চট্টগ্রামের অতিথিশীলতা
আসলেই চট্টগ্রাম শহরটা খুব সুন্দর। যেদিন আমরা রাঙ্গামাটি যাই সেদিন রাতে আমরা বাবার সাথে তার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গেলাম। সেখানেই আমাদের রাতের খাবার খেতে হয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যার পর পরই তার বাবসায় গিয়ে আমরা হাজির হই। তার ছিল একটি ছেলে। সে ছিল দুষ্ট প্রকৃতির।
আমরা যাওয়ার পর পরই বাবার বন্ধু আমাদের দেখে তার স্ত্রীকে বলল, “দেখ লতা-পাতা (আমার বাবা-মায়ের নাম) এসেছে।” “তাই নাকি।” আন্টি অর্থাৎ তার স্ত্রী জবাব দিল। এরপরই শুরু হয়ে গেল আড্ডা। যে ছেলেটির কথা বলছিলাম অর্থাৎ আমার বাবার বন্ধুর দুষ্ট ছেলে সে আমার বন্ধু মিলনের কাছে যাচ্ছে আর বলছে, “দুলাভাই, চকলেট খাও।” আমি বুঝলাম না কেন সে একথা বলছে। হতে পারে তার দুষ্টামির একটি দিক। অথবা অন্য কিছু।
রাত যত গভীর হয় আমাদের আড্ডা তত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত শুকনা খিচুরির সাথে ইলিশ মাছ (আরও আইটেম ছিল) খেয়ে আমরা রওয়ানা হই রেস্ট হউজের দিকে।
১৪ ফেব্রুয়ারী ভালবাসা দিবসে জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্স-এ
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৬। আন্তর্জাতিক ভালবাসা দিবস। এদিনে ভ্যালেন্টাইস নামে এক প্রেমিক তার প্রেমিকার জন্য নিজেকে বলিদান করে দিয়েছিল। এদিন আমি আর আমার পরিবার খুব সকালে পৌছাই জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সে। স্মৃতি কমপ্লেক্সটি দেখতে বেস সুন্দর লাগছিল। সেখানে প্রবেশ করতেই প্রথমে চোখে পড়ল সংসদ ভবনের মডেল। এর পাশে একে একে স্মৃতিসৌধ এবং শহীদ মিনার। সংসদের মত এগুলোও ছিল একেকটা মডেল।
এ কমপ্লেক্সে এসব মডেল ছাড়াও কান্তজিউ মন্দির, বড় কাটড়া, ছোট কাটড়া, সোনা মসজিদ (যা কমপ্লেক্স এর নামাজ ঘড় হিসাবে ব্যাবহিত হচ্ছে), তাজহাট রাজবাড়ি ইত্যাদি মডেল লক্ষ করা যায়। সেদিন ভালবাসা দিবস উপলক্ষে সেখানে ফ্যাশন শো ও ড্যান্স প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। আমরা সন্ধ্যার পর কিছুক্ষন অনুষ্ঠান দেখে রেষ্ট হাউজের দিকে রওয়ানা হলাম। আর এভাবেই আমাদের কমপ্লেক্স দেখা শেষ হয়।
ঢাকায় একদিন ঃ
দেখতে দেখতে আমাদের ভ্রমন শেষ হয়ে এল । ভ্রমনের শেষ দিন আমরা রওয়ানা দেই ঢাকার উদ্দেশে। ঢাকায় এসে আমরা (মিলনের পরিবার ও আমরা) দু’দলে ভাগ হয়ে গেলাম। আমি ও আমার পরিবার ঢাকায় উঠলাম আমার এক বড়আব্বার বাসায়।
আমার বড়আব্বার নাম আমিনুল হক (টুকু), যিনি বর্তমানে ইহজগতে আর নেই। তার দুই মেয়ে। বড়টির নাম নশিন আর ছোটটির নাম নিটুশি। আমরা যখন সেখানে পৌছি তখন ৩:৩০ মিনিট হবে। ওখানে পৌছে আমরা দুপুরের খাবার খাই। আমরা জ্যাঠাতো বোন ইতি আপু সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিল।
সেদিন সন্ধ্যার পর আমরা সেখানে কম্পিউটার দেখতে বসে গেলাম। এ সময় আমাদের জন্য চিকেন ফ্রাই আনা হল এবং আমরা তা মজা করে খেলাম। এ সময় ইতি আপুর বড় ভাই আমার সুমন ভাইয়াও সেখানে উপস্থিত ছিল। রাত ৯টায় দিকে আমার বড়আব্বা (বর্তমানে যিনি মৃত) বাড়িতে প্রবেশ করলেন। এ সময় নিটুশির সাথে তার কিছু কথা হয়ে যায়। যাইহোক, রাতের খাওয়া খেয়ে আমরা সেদিনের মত শুয়ে পড়ি আর অপেক্ষা করতে থাকি কখন সকাল হবে। আর কখন আমরা বাড়ি যাব। কারণ আমাদের বাড়ি যেতে আর বেশি দেরি নেই।
আমরা অনেক স্মৃতিময় মুহুর্ত পার করেছি পাহাড়, সমুদ্র আর প্রকৃতির মাঝে। ঢাকা যাওয়ার পর দিন সেখান হতে যখন পলাশবাড়ী আসি তখন সব সময় মনে হয়েছিল পূর্বের স্মৃতিমাখা সেই সব দৃশ্যের কথা। বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি আর চট্টগ্রামের সে সব স্মৃতি আজ আমাকে মুগ্ধ করে। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।

ধরুন, দেয়াল ঘড়ি এবং আমার ছবিটা উল্টো করে যদি টাঙানো হয় দেয়ালে- তাহলে, মনে এবং চোখে কি রকম প্রতিক্রিয়া হবে? দু’পায়ে দু’রকম কেডস্ পড়লে কেমন দেখা যাবে? শার্ট-প্যান্ট উল্টো করে পড়লে কেমন লাগবে? এরকম অদ্ভুত উল্টাপাল্টা যতসব হিজিবিজি ভাবনা সর্বদা খেলা করে হৃদয়ের মনে এবং বাস্তবিকই সে করেও ফেলে তা নিজেকে জানতে। দেখতে চায় মানুষ কতটা নিজেকে নিতে পারে নিজের মতোন করে।
হৃদয় এপ্লাইড ফিজিক্সের ছাত্র, লেখাপড়ায়ও সে বেশ ভালোই, তবুও তাকে পারিবারিকভাবে পাগলাটে বলেই জানে সবাই।
বন্ধুদের মধ্যে কার কি সমস্যা, কার অর্থের প্রয়োজন, কার পড়া বিষয়ে বুঝতে কি সমস্যা, সবকিছুই হৃদয় তার মেধা ও মনন দিয়ে আন্তরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করে থাকে, তাই বন্ধু মহলেও সে আবার অনেক জনপ্রিয়, তাই তো বন্ধুরা তাকে হ্যালো মিঃ হৃদয় খান বলেই ডাকে। মানে তার আকিকা করা নাম ‘হৃদয় রহমান’ হারিয়ে গিয়ে এখন হয়ে গেছে হৃদয় খান।
জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী হৃদয় খানের পরিচিত গানের কলি প্রায়শই তার চঞ্চল মনে দোলা দিয়ে যায়-
“মন তোরে বলি যতো, তুই চলেছিস তোর-ই মতো… “।
আকাশটা ঘণ-মেঘে ঢেকে গেছে, থেকে থেকে মেঘের গর্জন, বিজলি চমকাচ্ছে, মাঝে মাঝে বাতাসের সাথে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বিরুদ্ধ অবস্থায় কলেজ ক্যাম্পাসে নীলা হন্তদন্ত হয়ে হৃদয় কে খুঁজছে।
নীলা, সাথী, সাগর, শাওন, আগুন এরা আবার সকলেই হৃদয়ের খুব ভালো বন্ধু, “একের জন্য সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” এমন একটা গাঁটছাড়া অমায়িক আদর্শিক বন্ধুত্ব তাদের। তাদের মধ্যে হৃদয়টা একটু আলাদাই, মানে, যে কোন কঠিন সমস্যারও সে একটা সুন্দর সমাধান দিয়েই দেয় অনায়াসে।
নীলা, ক্যাম্পাসে হৃদয় বাদে সকল বন্ধুদের পেয়ে গেল। সাথী বলছে- কিরে নীলা, তোর একি অবস্থা! কি এমন হয়েছে যে চোখ মুখ সব একরাতেই বসিয়ে ফেলেছিস? বাকী সব বন্ধুরাও বলে- হ্যাঁ তাইতো দেখছি আমরাও কি হয়েছে রে নীলা? নীলা বলে- তোরা চুপ করতো, আগে বল্ হৃদয় কোথায়? সাগর বলে- কি আশ্চর্য, নীলা! এই বিরুদ্ধ আবহাওয়াতেও তো আমরা তাকেই খুঁজছি নাকি? নীলা বলে- হ্যাঁ তা তো ঠিকই, আসলে আমার মাথাটাই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে।
কি এমন হলো সোনা তোমার, যে ছটফট করে শুধু হৃদয়কেই খুঁজছো, কাহিনী কি? এই কথা বলেই আগুন বলে- ও.. হৃদয় তো আবার দার্শনিক মানুষ, তারে তো খুঁজবাই! আমি একবার ঐ ঝিলের ধারে তারে একা বসে থাকতে দেখেছিলাম, একটা অন্যকাজে ব্যস্ত ছিলাম তাই হৃদয়ের সঙ্গে তখন চোখাচোখি হয়েছে কিন্তু কোন কথা হয়নি। চলতো দেখি ভাবুক সাহেব হয়তো ওখানেই আছেন…
যথারীতি হৃদয় কে ওখানেই পেয়ে গেল তারা। আবহাওয়ার দিকে হৃদয়ের যেন কোন মালুমই নেই! সে শুধু অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে হাত তুলছে আর নামাচ্ছে আর বিরবির করে মনে মনে কি যেন বলছে!
শাওন পেছন থেকে হৃদয় কে ধাক্কা দিয়ে বলে- এই যে খান সাহেব, হয়েছে আর উপরে তাকাতে হবেনা, আমার দিকে তাকান, আমরা আপনারে সেই কখন থেকে হন্যে হয়ে খুঁজছি, মানে আপনারে নীলা ম্যাম খুঁজছেন, আর আপনি এখানে বসে বসে কি গুনছেন? সম্বিত হৃদয় পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে নীলাসহ সবাই দাঁড়িয়ে। নীলার চোখেমুখে বিষন্নতার ছায়া, যেন বুকের মধ্যে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। হৃদয় তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে কি এমন হলো যে আমার খোঁজ? আমিতো আকাশ গুনছিলাম, ভাগ করছিলাম, বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর ভাগে কতটা হিস্যে পড়লো। নীলা বলে- এই, হেয়ালি রাখ্, আমি বড্ড সমস্যায় পড়েছি। সাথীসহ সবাই নীলাকে বলে- তখন থেকে শুধু সমস্যা সমস্যাই করছিস, কি হয়েছে তাতো একবারও আমাদের বললি না, এখন তো হৃদয় কে পেয়েছিস ওকে বল্, আমরা না-হয় যাই…
নীলা, সকল বন্ধুদের বলে- দোস্ত, তোরা মাইন্ড করছিস কেন্? আমি চেয়েছি হৃদয়সহ সকল বন্ধুরা একসাথে মিলিত হয়ে কথাটা শেয়ার করতে। হৃদয় বলে- এই তোরা থাম্ তো। নীলা বলতো কি হয়েছে বল্? নীলা অশ্রুসিক্ত নয়নে কান্না ভেজা কন্ঠে হরহর করে বলতে থাকে- আমার না বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, কয়েকদিন ধরেই আবছা আবছা শুনছিলাম, কিন্তু গতরাতে মা ভালোভাবেই জানালো। ছেলে, বাবা’র পরিচিত একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কানাডায় থাকে, এই ঈদে দেশে আসবে বিয়ে করতে। হৃদয় মনোযোগ সহকারে নীলার কথাগুলো শুনে বলে উঠলো- এতে আমিতো সমস্যার কিছুই দেখছিনা, কি সমস্যা, বিয়ে করে ফ্যাল্। নীলা বলে- এটা কোন সমাধান হলো? আমার পড়া এখনো শেষ হয়নি, তা ছাড়া আমি নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে এখন বিয়ে করবোনা। হৃদয় স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হৃদয়ে ব্যথাভরা অট্টহাসিতে বলে ওঠে- হা – হা – হা! তাহলে তুই কার পায়ে দাঁড়িয়ে আছিস্ রে। শোন, একটা কথা বলি- আমিওনা এতক্ষণ বসে বসে ওই দাঁড়িয়ে থাকা নিয়েই ভাবছিলাম, মানে পৃথিবীটা তো কমলালেবুর মতো চ্যাপ্টাসহ গোল, তাই আমি কিছুতেই সমাধান আনতে পারছিনা আমাদের ভূখণ্ডে আমার অবস্থান কি রকম? মানে, আমি কি দাঁড়িয়ে আছি নাকি বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি, এই তোরা কেউ কি জানিস কিছু, একটু বলবি আমায়…
নীলা রেগেমেগে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলে- তুই কি কোনদিন সিরিয়াস হবি না হৃদয়? আমি মরি আমার জ্বালায় আর সে আছে ফান্ নিয়ে! নীলার সঙ্গে অন্য বন্ধুরাও বলে ওঠে- ঠিক-ই তো, এটা তো ঠিক হলোনা হৃদয়। হৃদয় বলে- আমি কি সমাধান দিবো? সাথী তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে- নীলার জন্য তো আমাদের একটা কিছু করতেই হবে। সাগর, আগুন, শাওন ওরাও বলে- একটা কাজ করলে কেমন হয় আমরা খালাখালুকে বুঝিয়ে বললাম যে, নীলা তো এখন বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়, সামনে ওর ফাইনাল পরীক্ষা, পরীক্ষাটা শেষ হোক, তারপর নাহয়…। নীলা বলে- আমার বাবা-মা রে তোমরা চেনো না, ওগুলো করে কিছুই লাভ হবেনা। হৃদয় নিরবতা ভেঙে বলে- শোন্ নীলা ছেলেটাকে আগে দেশে আসতে দে, তারপর তার সাথে আমরা মিট্ করবো, তোর পড়াশোনার ব্যাপারে তুই তাকে বলবি যে, বিয়ের পরেও পড়তে দিতে হবে, নাহলে এ বিয়েতে তুই রাজি নস। আর বিয়ের পরেও তো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া যায়, কেন এই যে, আমাদের সাথী করছে না। সাথী বলে- হ্যাঁ একটু তো সমস্যা হয়-ই, তবে কথায় বলে নাঃ “ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়”। হৃদয় বলে- ঠিক তাই, তারপরেও যদি বর ব্যাটারে তাড়ানো না যায় তখন দেখবো নে কি করা যায়। নীলা বলে – তোরা যে কি শুরু করলি, আপসোস আমার মনের কথাটা তোরা কেউ-ই ঠিকভাবে বুঝলি না। হৃদয় বলে- তোমার মনের কথাটা কি বন্ধু, একটু খোলাসা করে বলে ফ্যালো দেখি। নীলা অনুচ্চারিত কন্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে- “এ.. ন্যাকা, যেন কিছুই বোঝেন না”। এদিকে আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। সবাই বলছে এই হৃদয়-নীলা আমরা কি এভাবে বৃষ্টিতে ভিজবো, তাহলে তোরা থাক আমরা যাই, এই বলে- ক্যাম্পাস বিল্ডিংয়ের দিকে তারা দে দৌড়। হৃদয়-নীলাও বলে ওঠে- আমরা থাকবো মানে, কি বলছিস তোরা? এই বলে তারা দু’জনও দৌড়তে যাবে এমন সময় হৃদয়ের আংগুলে থাকা নীলা-পাথরের আংটিতে নীলার ওড়না জড়িয়ে যায়, তখন তারা একে অপরের দিকে অপলক চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ! এদিকে মাটিতে অঝোর ধারায় বৃষ্টি গান গাইছে, যেন উভয়ের চোখস্নাত দৃষ্টিতে বেজে উঠছে অমলিন সুরঃ তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম…

ঘুম থেকে উঠে সায়ীদ জোরে চিৎকার করে বলতে থাকে,
: আমার দাদুভাই কৈ? আমার দাদুভাই কৈ?
রান্নাঘর থেকে তড়িগড়ি করে ছুটে আসেন সায়ীদের মা, বিথি আক্তার।
: কি হয়েছে, বাবা? এত জোরে চিৎকার করছো কেন?
সায়ীদ কাঁপতে কাঁপতে বলল,
: আমার দাদুভাই কৈ?
: কেন? তোমার দাদুভাই তো গ্রামের বাড়িতে আছেন। এখন কেমন করে আসবেন?
: কেন? একটু আগে দাদুভাইয়ের সাথে আমার কথা হয়েছে। দাদু, আমাকে রেডি হতে বলেছে। আমরা দু’জন ঈদের শপিং করতে যাবো। ছেলের কথা শোনে বিথি আক্তার মুখে হাসি এনে বললেন,
: ওহ! এ কথা। শোন বাবা, তুমি তোমার দাদুভাইকে স্বপ্নে দেখেছো। আসলে তোমার দাদু বাড়িতেই আছেন।
: আচ্ছা, আম্মু আমরা কখন বাড়ি যাব?
: তোমার বাবার অফিস বন্ধ হলে আমরা বাড়ি যাব।
: আব্বুর অফিস বন্ধ হতে আর ক’দিন বাকী?
: চারদিন। আমরা পরদিনই রওনা দেবো।
: পাঁ-চ-দি-ন। মা, আটদিন পর তো ঈদই। কালপরশু গেলে কি হয়?
: ওরে আমার কলিজার টুকরা, দাদুর বাড়ি যেতে এত ব্যাকুল হয়ে গেলে। একটু ধৈয্য ধর। দেখতে দেখতে পাঁচদিন কেটে যাবে। তাছাড়া তোমার বাবার অফিস বন্ধ না হলে কি করে যাব?
: আচ্ছা, ঠিক আছে।
সকাল, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। সায়ীদের বাবা, সামজীদ চৌধুরী অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। গা থেকে পোশাক ছাড়তে ছাড়তে সায়ীদকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন,
: সায়ীদ, কোথায় তুমি?
: জ্বি আব্বু, আমি আসছি। (হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে সায়ীদ)
: কি ব্যাপার! বাপজান, চোখেমুখে হাসি চিকচিক করছে যে। স্কুল, কোচিং বন্ধ হওয়ায় বেশ আনন্দে আছো দেখছি।
সায়ীদ বাবার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
: বাবা, আমরা দাদুর বাড়ি যাব। আম্মু বলেছেন, আরও চারদিন পর। তোমার আর অফিস নাকি চারদিন পর বন্ধ হবে।
: হ্যাঁ, তোমার মা ঠিক কথাই বলেছে। কী! দাদুর বাড়ি ঈদ করতে খুব ইচ্ছে করছে?
পাশ থেকে বিথি আক্তার বললেন,
: শুধু ইচ্ছে করছে না; রীতিমতো পাগলামি শুরু করে দিয়েছে।
: ‎বুঝলাম না।
: ‎আজ ঘুমের মধ্যে পর্যন্ত “দাদা, দাদা” বলে প্রলাপ বকেছে। আবার তোমার অফিস বন্ধ হলে যাব বললে আফসোসে পুড়েছে।
সামজীদ চৌধুরী মনে মনে খুশি হলেন। সায়ীদকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়ে বললেন,
: আর ক’টা দিন, বাবা। এরপর আমরা সবাই বাড়ি যাব। আমাদের গ্রামটা চিরসবুজ। তোমার খুব ভালো লাগবে।
: ‎আমি দাদুর সাথে ঘুরবো। দাদুর সাথে ঈদের শপিং করবো।
: ‎আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন আমার সাথে এসো ফ্রেশ হয়ে নিই।
সায়ীদকে সঙ্গে নিয়ে বাথরুমের দিকে চলে যান সামজীদ চৌধুরী।
রবিবার। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকে সায়ীদের সে কী আনন্দ! আজই দাদুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে তারা। সদরঘাট থেকে সীপ বরাবর নয়টায় হাতিয়ার উদ্দেশ্যে ছাড়বে। সবকিছু গুছিয়ে নিতে আটটা বেজে গেল। সামজীদ চৌধুরী বাইরে থেকে এসে বললেন,
: কৈ, তোমরা এখনও রেডি হওনি?
: হ্যাঁ, আমরা তো রেডি হয়ে আছি। সিএনজি কি পেয়েছো?
: হ্যাঁ, বাসার সামনে সিএনজি দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে তাড়াতাড়ি বের হও। হাতে তেমন সময় নেই।
: আচ্ছা, তোমরা ব্যাগগুলো নিয়ে সিএনজির দিকে যাও। আমি সবকিছু ভালোভাবে দেখে ঘরে তালা দিয়ে আসছি।
সামজীদ চৌধুরী ছেলেকে নিয়ে সিএনজিতে এসে বসেন। একটুপর বিথি আক্তারও সিএনজিতে ওঠে বসেন। এরিমধ্যে সিএনজি সদরঘাটের দিকে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে। সিএনজি ৮টা ৩৫মিনিটে সদরঘাটের সামনে এসে থামলো।
সামজীদ চৌধুরী সিএনজি থেকে নেমে ঝটপট টিকিট সংগ্রহ করে সবাইকে নিয়ে সীপে উঠলেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে সীপ হাতিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ সাড়ে ছয় ঘন্টা পর হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে এসে নামলো তারা। সায়ীদের দাদুর বাড়ি ঘাট থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে। সামজীদ চৌধুরীকে চেনেন এমন অনেকে এগিয়ে এসে সংক্ষেপে খোঁজখবর নেন। এরপর সায়ীদরা রিক্সা যোগে দাদুর বাড়ি চলে আসে।
অনেকদিন পর ছেলে, ছেলের বৌ আর নাতিকে কাছে পেয়ে সৈয়দ আহমেদের পৃথিবীতে যেন আনন্দের বন্যা বইছে। সায়ীদ দাদুকে দেখে এক দৌড়ে কাছে এসে জড়িয়ে ধরে। দাদা-নাতি খুশিতে কাঁদতে থাকে। এ যেন পরমাত্মার বাঁধন।
মাগরিবের নামাজ আদায় করতে সায়ীদকে সাথে নিয়ে মসজিদে আসেন সৈয়দ আহমেদ। দাদা-নাতি নামাজ আদায় করে গাঁয়ের হাটের দিকে আসেন। এলাকার সবাই সায়ীদকে বেশ আদর করেন। সায়ীদ সবার নানান প্রশ্নের জবাব দেয়। সে খুব মজা পায়।
শহরে অনেক মানুষ। কিন্তু কেউ কাউকে চিনে না। কেউ কারো সাথে কুশল বিনিময় করে না। সালাম বিনিময় পর্যন্ত করতে চায় না। অথচ দোকানে বসতে না বসতে অনেকেই ওর দাদুকে সালাম দিচ্ছে। আবার অনেকে ওর পাশে বসে ওকে নানান প্রশ্ন করছে।
এসব ভাবতেই সায়ীদের কচিমনে আনন্দের ফাল্গুধারা বইতে শুরু করেছে।
এরপর তারাবীর নামাজ আদায় করে রাত দশটায় বাড়ি ফিরে তারা।
পরদিন নাতিকে নিয়ে হাতিয়ার শহরখ্যাত ওছখালি’র সিঙ্গাপুর সুপার মার্কেটে ঈদ শপিং করতে বের হলেন সৈয়দ আহমেদ। গ্রামের বাড়িতে এতো সুন্দর মার্কেট থাকতে পারে তা সায়ীদের জানা ছিল না। দোকানগুলোও বিচিত্র্য পোশাকে সয়লাব ।
দাদার হাত ধরে সায়ীদ একটি বড় দোকানে প্রবেশ করলো। সায়ীদের পছন্দমতো পায়জামা, পাঞ্জেবী, জুতা আর বাড়ির সবার জন্য ঈদের পোশাক কেনা হলো। সায়ীদের চোখেমুখে বিজয়ের উল্লাস। দাদুকে কাছে পেয়ে সে যেন জীবনের সব সুখ খুঁজে পেয়েছে। দোকানীকে সব খরচ মিটিয়ে দিয়ে সায়ীদের দিকে তাকান তিনি। সায়ীদ তখনও দাদুর মুখের দিকে মুগ্ধ চোখে নির্বাক তাকিয়ে আছে। দাদু সায়ীদের আবেগকে বুঝতে পারেন। মুহূর্তে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমো খান।
এরপর সায়ীদের জন্য একটি চশমা কিনলেন। সায়ীদকে চশমাটি পরিয়ে আবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন সৈয়দ আহমেদ।
বাড়ি এসে মায়ের কাছে, বাবার কাছে দাদুর সাথে ঈদ শপিংয়ের মজার মজার গল্প করতে থাকে সায়ীদ। ছেলের এমন উচ্ছ্বাস দেখে সামজীদ চৌধুরীর ত্রিশ বছর আগের কথা মনে পড়ে যায়। ছোটবেলার সামজীদ হয়ে নিজের দাদুকে নিয়ে বাবার কাছে মুগ্ধতার গল্প বলার স্মৃতির রোমন্থনে দু’চোখ জলজল হয়ে ওঠে তার।
আজ ঈদ। ফজরের আযানের পর থেকে বাড়ির মহিলাদের কর্মতৎপরতা শুরু হয়ে গেছে । কেউ নকশা করে পিঠা তৈরি করছে। কেউ বিভিন্ন আইটেমের সেমাই, ফিরনি, পায়েস তৈরি করছে। সায়ীদের দাদি মজা করে বিরিয়ানি রান্না করছেন। ফজরের নামাজ আদায় করে বাবার সাথে ঘরে ফিরেন সামজীদ চৌধুরী। সায়ীদ তখনও ঘুমাচ্ছে। সারারাত জেগেছিল। ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ আগে সায়ীদের চোখে ঘুম নামে।
দাদুর গলার আওয়াজ কানে পৌঁছতেই তার ঘুম ভাঙে । এরপর দাদুর সাথে গোসল করে ঈদের নতুন পোশাক পরে সায়ীদ। গায়ে সুগন্ধি মেখে বাবা ও দাদুর সাথে ঈদগাহে আসে সে। অনেক মুসল্লীর সাথে ঈদের নামাজ আদায় করে তারা। নামাজ শেষে একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করছে। সায়ীদ পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। এরপর বাসায় ফিরে এসে বাবা-মা, দাদা-দাদি, ফুফুকে কদমবুসি করে। সবাই তাকে ঈদ বকশিশ দেয়।
ঈদ বকশিশ পেয়ে তার সে কী আনন্দ!
এরপর সবাই খাবার ঘরে এসে বসলো। খাবারের ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সবাই খুব মজা করে খেলো।
কিছুক্ষণ পরপর পাশের ঘরের লোকজন এসে খোশগল্প করে ঈদের খাবার খেয়ে আবার চলে গেল। এভাবে সারাদিন দাদার বাড়ি মেহমানদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যায় সায়ীদদের পরিবারের সবাই মেহমান হয়ে পাশের ঘরে গেল। সায়ীদ তাদের আদর আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়।
রাতে সায়ীদকে নিয়ে দাদা-দাদি উভয়ে মজার মজার গল্পে মেতে উঠেন। সায়ীদ মুগ্ধ হয়ে দাদার গল্প শোনে।
মাঝরাত পার হয়ে শেষরাত। তবু সায়ীদের চোখের পাতা মিলছে না। মুগ্ধতা ফুরায় না। এ যেন অফুরান ভালোবাসার অনাবিল মুগ্ধতা।
ঈদের তিনদিন পর তারা আবার শহরে ফিরে আসে। সবকিছুই আগের মতো করে চলতে থাকে। সামজীদ চৌধুরী নিয়মিতভাবে অফিসে যাচ্ছেন। সায়ীদও রুটিনমাফিক স্কুল ও কোচিং -এ যাওয়া-আসা শুরু করেছে। এরিমধ্যে একদিন ঘুমের ঘোরে সায়ীদ জোরে চিৎকার করে বলে ওঠে,
“আমার দাদুভাই কৈ? আমার দাদুভাই কৈ?”

মোসলেমা গৃহকর্মী তিন বাসায় কাজ শেষে নিজ বাসায় ফিরে য়েতে বেলাগড়িয়ে যায়, বড়কন্যাটিবিয়ে দিয়েছিলো, যৌতুকের টাকা পরিশোধ করতে নাপারায় তার সংসাওে চলে এসে লুটিপুটি খেয়ে গড়াগড়ি দিচেছ। কোলে সন্তান তাই অন্য কোথায়ও কাজে যেতে পারেনা ঘরে থাকলে নানান জন ঘোটাঘুটি করে বলে কেন তোর বিয়ে টিকলোনা এ-নিয়ে আলোচনার হাট বসে আরও বলে এরকম একটু আধটু হয়ে থাকে তারপর সংসার নিয়ে কেন পড়ে থাকলি না স্বামীর ঘর বেহশত, তোর মা এমনিতো খাবার যোগার করতে হিমশিম খাচ্ছে তুই আবার একটা ঝামেলা হয়ে দাঁড়ালি এরকম কথা প্রায় তাকে শুনতে হয়। দ্বিতীয়টি শালবন পৌর স্কুলে ক্লাশ সেভেনে পড়ে, পড়াশুনায় মোটামুটি ভালো হঠাৎ করে শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়াতে নানারকম পরীক্ষা ও চিকিৎসা করার পড়ও রোগ ধরা পড়ছে না কেউ বলছে জ্বীনের আঁচড় লাগছে কেরানিপাড়ায় একজন কবিরাজ আছে ঝারফুক ভালো করতে পারে, হরেক রকম চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল তারপরেও এদিক -সেদিক কওে দিন ভালো যাচ্ছিলো।
ছোট ছেলেটি যেন আদরের ঘরের দুলাল পড়াশুনায় মন নেই বলে বেড়ায় বড় হলে নাকি শাকিবের মত অলরাউন্ডার হবে, মোসলেমার স্বামী আতোয়ার রিক্সাচালক হাঁপানির রোগী, একদিন রিক্সা চালালে তিনদিন বসে হাপাঁয় শালবন কাঠের গোলার ওখানে একরুম ভাড়া কওে গাদাগাদি করে থাকে। হঠাৎ কওে করনা ভাইরাস দেখা দেওয়ায় দেশ বির্পযয়ের মুখে পড়েছে, সেই বির্পযয়ের কষ্টিপাথরের ঘর্ষণ তার কাঁধে চেপেছে, গৃহকর্ত্তীরা শংকা আঁচ করে তাকে কিছুদিনের জন্য ছুটি দিয়েছে, লোকজনের চলাচল কমে গিয়েছে তার স্বামী আয় করতে পারছে না এমনি তো রোগী যা আয় কওে মন্দেও ভালো , তাছাড়া সবাইকে ঘরের মধ্যে থাকতে বলা হয়েছে, সে বাসায় কাজ কওে পাওনা ও বাড়তি যা পেত তাই দিয়ে দিন পার করে দিতো এখন খাবারের সংকটে ভুগছে। ছুটি দেওয়ার সময় গৃহকর্ত্তীরা অবশ্য তার হাতে কটা টাকা গুঁজে দিয়েছিলো সান্তনা স্বারক স্বরুপ, দু-একদিনের মধ্যে তা ফুরুৎ এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
পাড়ার ব্যস্ত রাস্তা গুলোফাঁকা দু-চারটিরিক্সাচলাচলকরে। বিশেষ কওে সকালবেলা লক্ষ্য করলে দেখা যায় ফাঁকা রাস্তায় তিন-চারটি কুকুর জড়ো হয়ে ঝিমুচ্ছে। কেউ পাশ দিয়ে গেলে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে ওদের চোখে একধরণের বিষন্নতার ছাপ দেখা যায়, হোটেল রেস্তরাগুলো বন্ধ সেখানকার ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে পেট ভরতো ওগুলো বন্ধ থাকায় ওরায় বিপদেও মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ওরাও বুঝতে পারছে না হঠাৎ কওে কি হলো? শহর ফাঁকা নতুন কোন যুদ্ধ শুরু হলো নাকি? কামান, রাইফেলের গোলাগুলির শব্দ শোনা যায় না এ-আবার কেমন যুদ্ধ, এ-ভাবে কতদিন চলতে হবে? মোসলেমা একজন গৃহকর্মী ও বাসায় যায় অনেকের মধ্যে তাঁকে ভালোলাগে অন্যজন থেকে একটু আলাদা, বিপদ-আপদে তাঁর কাছে মনের কথা খুলে বলে মন ভালো থাকলে তাকে সাহায্য করতে চেষ্টা করে। সে তাঁর বাসায় যেয়ে কলিং বেল টিপলে কর্ত্তী দরজা খুলে তাকে দেখে বলে কিরে কোথা থেকে আসলি? সে বলে হোমকোয়ারাইনটেন থেকে ওখানে থাকলে খাবার যোগার কিভাবে হবে? তা ভালো কথা কিছু যোগার করতে পারলি? সে বলে অনেক খানে ঘোরাঘুরি করলাম কোথায় পেলাম না সবখানে বলে শেষ আগে আসলে দেওয়া যেত। শুধু ঘোরাঘুরি আর হয়রানি রাস্তায় মিলিটারিনামছে টহল দিচ্ছে খুব কড়াকড়ি দেখলে ধরেনিয়ে যায় বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করছে, তার কর্ত্তী বলে শুনলাম অনেকে সাহায্য পাচ্ছে বস্তায় কওে আনছে তুই কিছুই পাসনা এ-কেমন কথা? আরকদিন পর লকডাউন করে দিবে তখন কি করবি? কিকরবোনা খেয়ে থাকতেহবে তোর স্বামীর খবর কি? কি খবর চান সে তোএকদমঅচলহয়েপড়ছেসারাদিনশুয়ে থাকে, তুই কিছুই করতে পারিস না শুধু বকবক করতে পারিস পত্রিকা, টিভি ফেসবুকের পাতাজুড়ে চালডাল বিতরণের ছবি, অমুক দানবীর নিজ এলাকায় খাদ্য বিতরণ করছে তোর পাড়ায় এমন কেউ নেই যে একটু সাহায্য করবে? যা একটু দেই একদিন-দুদিনে শেস কওে দিস। সে বলে আপা আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে? বলতে পারছিনা , ঠিক আছে একটা টাকা রাখ কোন রকম টেনে টেনেচালা, দেখাযাক আগামীতে কি হয়? মেসলেমা কি বলতে যেয়ে ঠিক করে বলতে পারলো না, যা পেল তাই নিয়ে সন্তোষ্ট থাকতে হবে যাহোক আজ রাতে দুটো ভাত পেটে পড়বে, আগামী দিন কি হবে হৃদয়ের বর্ণমালায় আঁকিবুকির ছবি এঁকে বাড়ি ফিরে।

অনেকদিন হলো ছোট্ট শিমুল বাবাকে দেখে না। দেখবেই বা কী করে! ওর বয়স যখন ৬ মাস, তখন বাবা পরিবারের সবাইকে সুখি করতে বিদেশে পারি জমায়। ছোট্ট শিমুল এখন স্কুলে যায়। ও এখন অনেককিছুই বুঝতে পারে। শিমুলের ক্লাসের বন্ধুরা প্রায়ই বাবার সাথে স্কুলে যায়। বাবার সাথে ছুটিদিনে ঘুরতে যায়। রাস্তার মোড়ো দাঁড়িয়ে ফুস্কা খায়। ক্লাসে সবাই বাবাকে নিয়ে গল্প করে। ওদের গল্প শুনে শিমুলেরও বাবাকে খুব মনে পড়ে। ও বাবাকে খুব মিস করে।
ও প্রায়ই মাকে বলে, ‘মা মা! আমি বাবার কাছে যাবো। তুমি বাবাকে আসতে বলো না! আমার বন্ধুদের সবার বাবাই ভালো। আমার বাবা পঁচা! ওরা বাবার সাথে স্কুলে যায়, ছুটিরদিনে ঘুরতে যায়। শুধু আমিই বাবার সাথে ঘুরতে পারি না। বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারি না।’ মেয়ের কথা শুনে মায়ের মনটাও বিষাদে ভরে ওঠে। অজান্তেই চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ে। মেয়েকে শান্তনা দিয়ে বলে, তুমি মন খারাপ করো না, মা। তোমার বাবা চলে আসবে। এইতো আর কটাদিন।’
নাছড় বান্দা । বাবাকে তার চাইই চাই! মা, শিমুলকে স্মার্টফোনে ভিডিও কলে ধরিয়ে দেয় বাবাকে। ভিডিও কলে মেয়ের নিষ্পাপ মুখটি দেখে বাবার বুকটা হুহু করে কেঁদে ওঠে। বাবাকে কাছে পাবার আকুতি দেখে বাবা নিরবে অশ্রু মুছে দু’চোখের। মেয়ের ছুবি সামনে ভাসলেও, তাকে ছুতে পারে না অসহায় বাবা। একটু বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে পারছে না মেয়েকে। সে গতসপ্তাহেই প্রিয় সন্তানকে দেখতে দেশে ফিরলেও আজও বাড়ি ফেরা হয়নি তার! কারণ, সে এখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে ভর্তি আছে। জানা নেই আর কোনোদিন প্রিয় সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে কি না! প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে হয়তো আর দেখা হবে না। না বলা কথাগুলো হয়তো আর বলা হবে না। প্রিয় সন্তানের মুখে বাবা বাবা ডাক আর হয়তো শোনা হবে না কোনোদিন! এসব ভাবতে ভাবতে উষ্ণ জলে চোখ ভিজে যায় ইকবালের।

“ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…” ঈদ শুধুমাত্রই একটি উৎসব নয়, ঈদ হল এমন এক শক্তি যেটা ম্যাগনেটের মত কাজ করে অর্থাৎ দূরের মানুষকে কাছে টেনে এনে তৈরি করে প্রীতি আর অটুট বন্ধন। আমার কাছে ঈদের মানেটা একটু ভিন্ন রকম। আমার কাছে ঈদ মানে গরিব-দুঃখী আর দুস্থ মানুষের মুখের এক ফোঁটা হাসি। আমার কাছে ঈদ মানে অনাহারীর মুখে খাবার আর বস্ত্রহীন দের নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া। আমার কাছে ঈদ মানে বন্দি পাখিকে মুক্ত করে দেওয়া। আমার কাছে ঈদ মানে শুভ অর্থাৎ কল্যাণকর সবকিছু। আর এটা এমন এক মহিমাময় দিন যেদিন মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে আমরা পূর্ববর্তী বছরের দোষ -ত্রুটি এবং পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারি। যাই হোক, একজন ছাত্র হিসাবে ঈদের দিনে খুবই মজা করি। ঈদের আগেই পেয়ে যাই নতুন জামাকাপড়। ঈদের সবচেয়ে সুন্দর এবং পবিত্র যে জিনিসটি তা হল- মানুষে মানুষে মেলবন্ধন। সবাই ছুটে যেতে চায় তার পরিবারের কাছে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ ঘাট কোথায় নেই ভীড়? সব জায়গায় মানুষের পদচারণা আর আপন মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য যদি প্রাণের ঝুঁকি পর্যন্তও নিতে হয় তাতেও পরোয়া করে না কেউ।এসময় অসহায় বাবা ফিরে পায় তার সন্তানকে; ছেলে কাছে পায় তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে ;ভাই খুঁজে পায় তার আদরের বোনকে। অজানা এক মর্মব্যথা সঞ্চার হয় তাদের মনে। মনের অজান্তেই চোখ থেকে নির্গত হয় এক ফোঁটা অশ্রু। এভাবেই ঈদ তৈরি করে স্নেহ, ভালোবাসা, মায়া- মমতা। কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে আমরা আছি সেখানে করোনা নামক এক ভাইরাস কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ। এই মহামারী থেকে রক্ষা পেতে আমাদের গৃহবন্দী থাকতে হবে। তাই এবারের ঈদ উদযাপন নিঃসন্দেহে অন্যবারের চেয়ে ভিন্নতর হবে। আমার বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী এবং আত্মীয় স্বজনেরা আক্ষেপ করে বলে যে এবারের ঈদে কোন মজা হবে না। এবার যেহেতু ঈদে ঘরে থাকবো তাই নতুন জামা কাপড় কেনা হবে না। কিন্তু আমি যদি আগেরবারের ঈদ উদযাপনের সাথে এবারের ঈদের তুলনা করি তাহলে মনে হয় এবারের ঈদই বেশি আনন্দের। কারণ প্রতিবারের ঈদের চেয়ে এবারের ঈদে আমি দুস্থ- অসহায়, গরীব মানুষদের সাহায্য করার বেশি সুযোগ পাবো। আমার মনে হয় জামা কাপড়ের টাকা দিয়ে যদি আরেকজন দুঃখী দরিদ্র মানুষের এক বেলা খাবার হয় বা তাদের উপকার হয়, তাহলেই আমার ঈদের আনন্দ সার্থক! মানুষকে সাহায্য করার মধ্যে যে কি পরিমান প্রাপ্তি তা আমি এখন কিছুটা হলেও বুঝতে পারি । বর্তমান প্রজন্মের একজন হিসেবে কখনোই গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উদযাপন করা হয়নি যার ফলে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ ঘাটে যে মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে তা কখনো উপভোগ করা হয়নি। কিন্তু তাই বলে ঈদে কম আনন্দ করিনি। আমি আমার না বলা কথাগুলোর কিছু কথা শেয়ার করছি ঃ তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। দুষ্টমি এবং চালাকি ও কম করতাম না। ছোটদের কাছে ঈদ মানেই সালামি। একবার হয়েছে কি! বাবার সাথে তার পরিচিত আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। আঙ্কেল আমাকে দেখে খুবই খুশি হলেন এবং যথারীতি আপ্যায়ন করলেন। ফেরার সময় আমি আংকেল এবং আন্টিকে সালাম করলাম, যাতে সালামি পাই। তারাও যথারীতি আমার দিকে সালামি বাড়িয়ে দেয়ার আগেই তাদের হাত থেকে সালামি নিতে চাইলাম। কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সালামি নিতে অস্বীকৃতি জানালাম। যদিও সেটা ভান ছিল কিন্তু জোর করেই তারা আমার হাতে সালামি গুঁজে দিলেন এবং আমিতো মহা খুশি। পরক্ষণেই একটু পাশে গিয়ে গুনতে থাকলাম কত টাকা তারা সালামি দিয়েছেন!তো টাকা গোনা শেষ হওয়ার পর দেখি, বাবা আঙ্কেল এবং আন্টি তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ঘটনায় তারা মজাই পেয়েছেন। কিন্তু বাবার মুখের কথা মনে করে আমি তো দে চম্পট! এরকমই অনেক মজার ঘটনা রয়েছে আমার স্মৃতির পাতায়। প্রতিবারই বেসরকারি টিভি চ্যানেল গুলোতে নাটক দেখি কিন্তু এবছর ঈদ যেহেতু ঘরে বসেই উদযাপন করতে হবে। তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদগাহে নামাজ পড়বো, মার রান্না করা বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেব। আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের সাথে শুভেচ্ছা এবং মত বিনিময় করবো। পাশাপাশি টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখবো, সবশেষে এটাই বলব” যারা সত্যিকারে ঈদের মর্মার্থ বোঝেন, তাদের কাছে এবারের ঈদ আরো বেশী আনন্দদায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। শেষ করবো নিজের লেখা ঈদের একটি কবিতা দিয়ে –
রমজানের ঐ রোজার শেষে উঠল খুশির চাঁদ
আনন্দ আর উত্তেজনায় কাটে সারা রাত।
হলো সকাল, ঘুম থেকে উঠলাম জেগে,
তাড়াতাড়ি করো, নামাজে যেতে হবে- বললেন বাবা ডেকে
গোসল করে সকালে খেলাম সেমাই,
নতুন পাঞ্জাবি পড়ে নিজেকে যেন লাগছে জামাই জামাই।
নামাজ শেষে কোলাকুলি হলো সবার,
বাসায় কিন্তু সবাই আসবেন, খেয়ে যাবেন নতুন খাবার।
খেয়ে দেয়ে বের হলাম বন্ধুদের সাথে
কত জায়গায় ঘুরলাম, বেড়ালাম পথে পথে।
সন্ধ্যায় টিভিতে দেখলাম নাটক
ঈদের এই অনুষ্ঠানগুলোতে বাড়িতে সবাই আটক।
সবশেষে কাটলো ভালোই দিন
মনটা আমার খুশিতে তাই তাক ধিনা ধিন ধিন।

মাগো এ’তো দেখি চমকে যাওয়ার মতোই ব্যাপার, বার তিনেক চোখ বুলায় ম্যাসেজ বক্সে, সৌম্যর ম্যাসেজ, অনেক আগেই বন্ধু হয়েছে ফেসবুকে কিন্তু কথা হয়নি কখনো, সৌম্যর সাথে দেখা হয়েছে দু একবার তবে কথা হয়নি, আড়াল থেকেই তাকে দেখা। অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ, সৌম্যকে ঘিরে অনেকেরই আগ্রহ, এক নামেই সারা দেশ ব্যাপি পরিচয়। কিন্তু অধরা সেভাবে দেখে না সৌম্যকে। কেমন যেনো একটু পাগলাটে ভাব কথায়, ছেলে মানুষির ছোঁয়া সেই সাথে স্মার্টনেস কম নয়, অধরা বরাবরই এ টাইপের মানুষের ফ্যান। যে দু একবার তাকে দেখেছে খুব লুকিয়ে তার ছেলে মানসি লক্ষ্য করেছে।
ইনবক্সে লেখা,- পিচ্চি মেয়ে কেমন আছো? ম্যাসেজটা পড়ে খিল খিল করে হেসে ফেলে অধরা। পাল্টা জবাব দেয়, -কে পিচ্চি?
কেনো তুমি
আমি পিচ্চি? কে বলেছে আপনাকে আমি পিচ্চি?
জানেন আমার বয়োস কতো? আমার মেয়ে কত বড়?
জানি বুড়ি তোর বয়োস কতো, তুই তো দেখতে পিচ্চিই।
পাল্টা প্রশ্নো সৌম্যর, -আমার বয়োস কতো বলতো?
অধরা বুঝতে পারে না কত বলবে তবুও বলে ৪৫
না হলো না আমার বয়োস ৫৩ ঠিক বয়োসে বিয়ে করলে তোর মতো একটা মেয়ে থাকতো আমার।
অধরা হেসে ফেলে বলে, – একদম না আমি কিন্তু অত ছোটো না, হয়েছে তুই অনেক বড়, ভালো থাক বুড়ি,
অধরা হেসে ফেলে তার এমন পাগলামীতে, তারপর ফোনের সুইচ অফ করে সুয়ে পড়ে অধরা, আগামী কাল একটা গ্রোগ্রামে আছে তার সকালেই উঠতে হবে সংসারের টুকিটাকি কাজ সেরে তবেই তো বের হবে। ঘুমিয়ে পড়ে অধরা, সকালে টুকিটাকি কাজ সেরে ফ্রেস হয়। এবার প্রোগ্রামের জন্য প্রস্তুতি, আলমিরায় জমিয়ে রাখা শাড়ি গুলোতে চোখ বুলায় কিন্তু ভেবে পায় না কোনটা পড়বে অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় আজ নীল রঙের শাড়িটাই পড়বে, যথারীতি হাল্কা প্রসাধনে নীল শাড়ি আর কপাল জুড়ে একটা টিপ। বের হওয়ার আগে একটু নেটে সার্চ দেয় অধরা, প্রতিদিন সাকালের অসংখ্য শুভ বার্তার সাথে আজ আরেকটি শুভ বার্তা যোগ হয়, সৌম্য লিখেছে, -কেমন আছো ভালো মেয়ে? দিনটা অনেক সুন্দর কাটুক, খুব অবাক হয় অধরা কখনো তুই কখনো তুমি কখনো পিচ্চি, কখনো বুড়ি। মন্দ লাগছেনা সৌম্যর পাগলামো, কোনো রিপ্লে দেয় না অধরা ভাবে প্রোগ্রাম শেষ করে বাসায় ফিরে উত্তর দিবে তার, মেয়েকে তার হোম ওয়ার্ক বুঝিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে পড়ে অধরা, পথে তার বন্ধুদের কল আসতে থাকে একের পর এক, -কিরে কতদূর আসছিস না যে? অধরা উত্তর দেয়, -চায়ে চুমুক লাগা আর একটা আমার জন্য রেডি কর দেখবি দু চুমুক না দিতেই তোদের সামনে হাজির হবো আমি। অনুষ্ঠান যথারীতি শুরু হয়, বন্ধুরা অপেক্ষা করছে-।
চার্জার রিকসা ছুটছে , কতদিন দোস্তদের সাথে দেখা হয় না আজ সবার সাথে দেখা হবে, জমিয়ে রাখা কত গল্প, কত হাসি সব সব একসাথে শেয়ার হবে ভাবতেই চঞ্চল হয়ে উঠে ভেতরে ভেতরে অধরা, রাস্তাটা যেনো শেষ হচ্ছে না।শহরের মাঝে প্রচন্ড জ্যাম আটকে আছে অটো অধরা অস্থির হয়ে উঠে মনে হচ্ছিলো অটো থেকে নেমে দৌড় দিবে, নিজের এমন পাগলামো চিন্তায় নিজেকে বোকা ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না। আনমনে হেসে ফেলে, আনমনে গুনগুন করে গাইতে থাকে পাগল মন মনরে মন কেনো এত কথা বলে। নাহ্ এবার বোধ হয় ভীড় কিছুটা কমলো, তাড়া দেয় অধরা, -ভাইজান একটু জোড়ে দৌড় লাগান যায় না? অটো চালক পেছনে ফিরে তাকায়, লোকটার একটা চোখ নষ্ট এক চোখ ভালো , ঘাড় কাত করে সন্মতি জানিয়ে বাড়িয়ে দেয় অটোর স্পিড, অধরা আবার গুনগুন শুরু করে, – মন আমার পাগলা ঘোড়া রে কই থোন কই লইয়া যায়-
মায়াবী পৃথিবীর সব সুখ ভর করে অধরার চোখে, মুখে, অস্তিত্বে। ছুটছে অটো শাড়ির আঁচল উড়ছে বাতাসে। রাস্তার বাঁক ঘোড়াতেই শাড়ির আঁচল আটকে যায় চাকায় অধরা চিৎকার করে, -অটো থামাও। আর কিছু
বলতে পারে না, এক সময় নিজেকে আবিস্কার করে ক্লিনিকের বেডে, অধরার মেয়ে মনামী পাশে বসে মাকে হাজার প্রশ্নো করতে থাকে, -খুব লেগেছে মা? কি করে হলো? আর হবে না কেনো তুমি যত অস্থির, আর কখনো শাড়ি পড়বা না বুঝলা । ব্যাথাটা যদি হাতে না লেগে গলায় লাগতো কি হতো? এমন অজস্র প্রশ্নো মেয়ের, অধরা মেয়ের দিকে তাকায় এক হাতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর কল্পনায় হারিয়ে যায়, ভাবে, – সে যদি মরে যেতো মেয়েটার কি হতো? মেয়েটা নিশ্চই খুব কাঁদতো, ওর নিশ্চই খুব কষ্ট হতো। ওকে কে দেখে রাখতো, ও যে খুব অভিমানী কে ওকে আদর করে অভিমান ভাঙাতো? আর ভাবতে পারে না অধরা মেয়েকে চেপে ধরে বুকে। মনামী মাকে সাবধান করে বলে, – ছাড়ো মা হাতে ব্যাথা পাবা। দু দিন পর রিলিজ নিয়ে বাড়ি ফেরে অধরা , ডাক্তারের প্রেসক্রিশন অনুযায়ী ঔষধ চলছে, ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠছে অধরা। ক ‘ দিন অসুস্থতার জন্য নেটে ঢোকা হয়নি তার, মোবাইলে ফেসবুক ওপেন করে, ইনবক্স ভরে আছে, পরিচিত জন বন্ধুদের ম্যাসেজে। এক এক করে চোখ বুলায়, সৌম্যর বেশ কটা ম্যাসেজ জমে আছে, ও লিখেছে, – মিষ্টি মেয়ে ভালো আছো তো?
তুমি কি ব্যস্ত কথার উত্তর নাই কেনো?
যা তোর সাথে আর কথা নেই।
অধরা কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের থেতলে যাওয়া হাতের ছবিটা তুলে ধরে ফেসবুকে, ক্যাপসনে লিখে দেয়, : এই বেশ ভালো আছি
ছবিটা ফেসবুকে ভেসে বেড়ায় পরিচিত জন বন্ধুরা বুঝতে বাকি থাকে না অধরার অবস্থা।
ম্যাসেজ বক্সে জমতে থাকে হাজারো বার্তায়।কারো উত্তরই দেয়া হয়না, ক’দিন কেটে যায় এখন অনেকটাই সুস্থ্য অধরা। প্রতিদিই দু চারটা শুভ বার্তা পাঠায় সৌম্য। জানতে চায় -এই পিচ্চি তোমার বাড়িটা কোথায়? অধরা প্রশ্নো করে কেনো? সৌম্য বলে, – এমনও তো হতে পারে তোমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছি প্রচন্ড বৃষ্টি দৌড়ে ঢুকে গেলাম তোমার বাড়িতে এক কাপ চা তো খাওয়াবে, কি খাওয়াবে না?
অধরা এমন পাগলামীতে হেসে ফেলে। বলে বৃষ্টি দু চার মাসে হবে কিনা সন্দেহ যাই হোক তারপরও ঠিকানাটা দিলাম। অধরা ঠিকানা লিখে দেয়। ক’দিন কেটে যায় সৌম্যর আর কোনো ম্যাসেজ আসে না ইনবক্সে, অধরা ভাবে লোকটা হারিয়ে গেলো নাকি। অধরা বেশ ক’বার ম্যাসেজ লিখতে যেয়েও লিখে না কেমন যেনো আড়ষ্ঠতা ঘিরে রাখে তাকে। মনের ভেতর উৎকন্ঠা সৌম্যর কি অসুখ করেছে, এমন পাগলা টাইপের একটা মানুষ কি করে এমন চুপ মেরে গেলো মেলাতে পারে না। এখনো পুরোপুরি সুস্থ্য না অধরা। বিকেলে রোদে বসে অধরা।
বিকেলের রোদ মেখে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখার মজাই আলাদা, এমন কিছু মুহূর্ত উপভোগ করছে আর মনে মনে ভাবে, -আহা জীবনানন্দ তোমার চোখ দুটো কি আমায় দিয়ে গেলে? আমার কাছে প্রকৃতি এত সুন্দর মনে হয় কেনো!
অধরা চারদিকে চোখ বুলায় হঠাৎই চোখ পড়ে তার বাড়ির পথ ধরে কেউ একজন আসছে,লোকটা যতই কাছে আসছে ততোই ঘোর লেগে যাচ্ছে অধরার! ভুল দেখছে না তো!
সৌম্য সেই গুণী স্মার্ট পাগলাটে মানুষটাই তো। অধরা উঠে দাঁড়ায় কিছু প্রশ্নো করার আগেই সৌম্য বলতে থাকে, -এই পিচ্চি হাতের যা অবস্থা করেছিস ছবি দেখে আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। কবে কখন বৃষ্টি হবে তখন তোর বাড়ির সামন দিয়ে যাবো কি না সেটা বলা মুসকিল তাই আর দেরী করতে পারলাম না চলে এলাম। আমি জানি এই হাত নিয়ে তুই চা বানিয়ে খাওয়াতে পারবি না তারপর এলাম, অধরা যেনো তখনো ঘোরের মাঝেই থাকে। সৌম্য বলে, – কিরে পিচ্চি ঘরে বসতেও বলবি না।অধরার ঘোর কেটে যায় লজ্জা পায় বলে, – বসতে বলবো না মানে? চায়ের আড্ডাটা মিস করছি না। মৌম্যকে বসতে দিয়ে রান্না ঘরে যায় অধরা, ট্রেতে নাস্তা কফি বানিয়ে সৌম্যকে খেতে দেয়। সৌম্য প্রশ্নো করে, -অবাক হয়েছিস তাই না? অধরা মাথা নেড়ে উত্তর দেয় হু,
সৌম্য প্রশ্নো করে হু কি?
অধরা উত্তর দেয় হু মানে হ্যাঁ
সৌম্য বলে, – ও আচ্ছা,
ক’ মিনিটের গল্পের মাঝেই যেনো সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, উঠে দাঁড়ায় সৌম্য, বলে,- থাকো মিষ্টি মেয়ে খুব ভালো থেকো, যেতে হবে-
হুট করে এমন অসুস্থ হলে বৃষ্টির অপেক্ষা করতে হয় না তাই চলে এলাম। এই বলে সৌম্য পা বাড়ায়, এক পা দু পা করে এগুতে থাকে। আধো আঁধারে মেলাতে থাকে সৌম্যর চলে যাওয়া।
অধরা তাকিয়ে থাকে সেই আঁধারের দিকে,তারপর কিছু শূন্যতা জমতে থাকে তার বুকের ভেতর…

১. ত্রানের চাল
চালের বস্তা দুর্বল হলে যা হয়। এক পাশে ফুটো হয়ে ধড় ধড় করে পড়তে শুরু করলো। মাথা থেকে নামাতে নামাতে বেশ কিছু চাল রাস্তায় ইট পাথরে মিশে গেলো।
রহিমা শাড়ির আঁচল দিয়ে শক্ত করে বেঁধে নিলো। তাতে ঠিকমতো ঢাকা হলো না বুকটা।
ইজ্জত! হায়রে গরীবের ইজ্জত!
সাতদিন পর আজ পেলে ত্রানের চাল। তিনদিন অভুক্ত ছেলে মেয়েরা পথ চেয়ে আছে তার।
রোদে তপ্ত পিচ ঢালা রাস্তায় জোড়ে জোড়ে পা চালায় রহিমা।
২. করোনা পজিটিভ
বাবা, আমার করোনা পজিটিভ হলে কি আমাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসবে?
ছেলের এমন প্রশ্ন শুনে বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে, ‘না বাবা, কোনদিনও না, কখনোই না। বাবারা কখনোই ছেলে-মেয়েদের বোঝা মনে করে জঙ্গলে ফেলে আসে না। বাবা তুমি বাড়ি থেকে বের হবে না, তাহলে তোমাকে করোনা ধরতেই পারবে না।’
৩. পরিষ্কার হাত
আবুল সাহেব এক পুরানো দোকানে একটি মজার আয়না পেলেন। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার করার পর আয়নার সামনে ধরলে সহজেই বোঝা যাবে হাত পরিষ্কার হয়েছে কিনা?
অফিস থেকে বাসায় ফিরে বার বার হাত ধোয়ার পরেও আবুল সাহেবের হাত পরিষ্কার হচ্ছে না!
উনি স্পষ্টই বুঝলেন ধুষখোরের হাত কখনই পরিষ্কার হয়না।
৪. স্বর্ণলতা
স্বর্ণলতা আকাশ ছুঁতে চায়, পারে না। রীপা উচুতলার বাসিন্দা হতে চায়,পারে না। অতি উচ্চ অট্টলিকার তলা গুনতে গুনতে ঢাকনা খোলা ম্যানহোলের পরে যায় সে।
একদিন পর নিথর দেহের সন্ধ্যান পায় সিটি কর্পোরেশন এর লোকেরা।
৫. ঘুষখোরের লাশ
সারাজীবন ঘুষ খেয়ে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছেন জামাল উদ্দিন সাহেব। কিন্তু ছেলে মেয়েদের মানুষ করতে পারেননি।
জামাল উদ্দিনের লাশ বিশাল অট্টলিকা বাড়ির আঙ্গিনায়। ৩ ছেলে ও ২ মেয়েরা জামাইসহ এসেছেন। লাশ দাফন করার আগেই ছেলে মেয়েদের মাঝে মারামারি লেগে গেলো বাসার ভিতর। তুমুল মারামারি। আত্বিয়স্বজন সেই মারামারি থামাতে ঘরে ছুটলেন।
লাশ পড়ে রইলো একা।
সেই সুযোগে একদল কুকুর লাশকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেললো নিমিষেই। এলাকাবাসীর কেউ-ই আগে কখনো কুকুরগুলোকে দেখেছেন বলে মনে পড়লো না কারোই।
৬. যৌতুক
আব্দুর রাজ্জাক মাষ্টার একজন সদ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন।
বিয়ে করলেন ৫ লাখ টাকা যৌতুক নিয়ে। বিয়ের ছুটি শেষে ক্লাসে পড়াচ্ছেন, “যৌতুক একটি সামাজিম ব্যাধি”।
৭. সিজার
নিশা কলেজে পড়ার সময় এক এক্সিডেন্টে কিছু রক্ত দেখে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। আজ সেই নিশা ওটি রুম থেকে সিজার হয়ে ছেলের জন্মদিলো। জ্ঞান ফিরে হাসিমুখে ছেলের কপালে চুমু খেলো গর্বিত মা। সিজার হবার সামান্যতম ভয়ের লেশমাত্র তার মধ্যে নেই।
৮. স্মৃতি
‘তোমার স্মৃতি বুকে নিয়ে বাকী জীবন কাটাতে চাই’।
ব্যক্তিগত ডায়রীর শেষ পৃষ্ঠায় লিখে ঘুমালো আদনান। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাংলেও আজ আর ঘুম ভাংলো না তার। আদনান এখন নিজেই স্মৃতি হয়ে সবার বুকে স্থান পেলো।
৯. ঈদ মোবারক
বিয়ের সতেরো বছর পর স্ত্রীর মোবাইল নাম্বার থেকে এসএমএস এলো-‘ঈদ মোবারক’। তবারক মিয়া ফিরতি এসএমএস দিলো-‘কে রে তুই?’
১০. ফাঁসি
স্বামী হত্যার দায়ে দোসী প্রমাণিত হয়ে সাথীর ফাঁসি হচ্ছে আজ ভোর ৪.০১ মিনিটে। ঘড়ির কাটা ৪.০০ টা বাজতেই সজল সাথীর দেয়া সমস্থ চিঠি একটি ব্যাগে ভরে অজানার উদ্দ্যেশে রওনা হলো।

পরিবার নিয়ে ডালভাত খেয়ে বেঁচে থাকার মতো আমার একটা ব্যবসা আছে। ব্যবসার কাজে প্রায় প্রায় চট্টগ্রম যেতে হয় আমাকে। নির্বিঘ্ন যাতয়াতের মধ্যে কাজগুলো সম্পন্ন হলেও এবারের ফিরতি যাত্রায় ঘটলো নানারকম জটিলতা। ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। সিএনজিতে কদমতলী থেকে একেখান বাস স্ট্যান্ড। সিএনজি থেকে নামার আগেই একজন লোক এসে বলছে রংপুর গেলে আসেন আমাদের গাড়ি এখনি ছাড়বে। সিএনজি থেকে মাথা বের করে দেখি আমার পরিচিত ছেলেটি, সে বাসের হেলপার। একটু বলে রাখি: আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঢাকা: চট্টগ্রাম কোচস্ট্যান্ডের পাশেই এবং কোচের টায়ার সংক্রান্ত কাজ: কারবার। তার সাথে কুশল বিনিময় করে নিলাম। সে বললো টিকিট না নিয়ে থাকলে নেবার দরকার নেই, আমি মালগুলো বক্সে রাখছি, পাশে চায়ের দোকান দেখিয়ে বললো:
‘ওখানো সুপারভাইজার আছে গিয়ে চা খান।’
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাজধানী এই চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের একেখান থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর শত শত বাস উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
রাত ঠিক আটটায় গাড়ি ছাড়ে। সিটিগেট পর্যন্ত কিছুটা জ্যাম থাকলেও পরে আর তেমন জ্যাম লক্ষ্য করা যায়নি। অভিজ্ঞ ড্রাইভার নিজ দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
গাড়ি চলছিল দ্রুত, ঢাকা পেরিয়ে চান্দাইকোনা এসে জ্যামে আটকা পড়ে প্রায় দু’ঘণ্টা, তারপর আবারো চলতে শুরু করে গাড়ি। হোটেল ফুট ভিলেসে বিরতি দেবার নিয়ম থাকলেও দেয়া হয়নি। গাড়ি চলতে চলতে আবারও হঠাৎ করে আটকে যায় জ্যামে, কীসের জ্যাম: উৎসাহিত যাত্রীর প্রশ্ন, উত্তর নেই কারো কাছে। সুপারভাইজার সাহেব নিরাপত্তার জন্য সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন: ‘কেউ গাড়ি থেকে নামবেন না।’ রাতের অন্ধকারকে পেছনে ফেলে কুসুমিত আলো প্রোক্ষেপণের পাঁয়তারা করছে একটি নবীন সকাল। গাড়ির যাত্রীরা কেউ কেউ ঘুমের মতো করে ঝিমুচ্ছে আবার অনেকে বেঘোরে ঘুমিয়ে নিচ্ছেন নাক ডেকে।
বেশ কিছু সময় পর একটি এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে সামনের দিকে ছুটছে, কয়েক মিনিটের মধ্যে আরো কয়েকটি এম্বুলেন্স আমাদের পিছুফেলে এগিয়ে যায়। আরো ঘণ্টা খানেক পর পুলিশের সার্জেন্ট, তারও পরে পুলিশের পিকাপ ভ্যান পোঁ: পোঁ করে বীরদর্পে এগিয়ে যায়। আমরা ঠিক তেমনই থাকি: কেউ সিটে হেলান দিয়ে কেউ জানালার পর্দা সরিয়ে রাস্তার পাশে উৎসুকভাবে তাকিয়ে আছি।
বিপরীত দিকে ফিরছে: এম্বুলেন্সগুলো, পুলিশের সার্জেন্ট…।
খবর এলো সিরাজগঞ্জ ব্রিজের কাছে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিন ঘণ্টা পর আবার বাস ছাড়ে রংপুরের দিকে। সকালের সুবাতাসের সাথে পিচঢালা পথ অতিক্রম করে চলতে চলতে আকস্মিকভাবে গতি থেমে যায় বাসের। বাসের চাকাগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে চলতে এক সময় থেমে যায়। কী হলো, কী হলো: গাড়িতে থাকা যাত্রীদের হৈচৈ, জানালার পাশ দিয়ে মাথা বাইরে নিয়ে যা দেখা গেল, তা হলো একগুচ্ছ মানুষের জটলা, হায় হায়! কী মুশকিল!
জটলা থেকে ভেসে আসা শব্দানুকরণ ‘ক্যাবারে তুমি জানোনা তোমার ডাইভার ভাইয়ের ফাঁসি হোচ্চে আর তুমি কোন আক্কেলে গাড়ি চালাচ্চু? তোমাগরে ডাং ছাড়া সোজা হবুনা বারে…।’
এর মধ্যে অন্য এক পাতি শ্রমিক নেতা: ‘গাড়ি এটি সাইট কুরা থো’
একপ্রকার গায়ের জোর খাটিয়ে বাসখানাকে সাইড করে রাখা হলো। পিছনে আরেক বাস আসা দেখে পাতি নেতারা সেই বাসের দিকে চলে যায়। ড্রাইভার বাসের স্ট্রাট বন্ধ করে নেমে যায় গাড়ি থেকে। সাথে নামে যাত্রীরাও। গাড়ি থেকে নেমে যা আবিষ্কার করা গেলো, তা হলো: সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে গাড়ির ড্রাইভারের ফাঁসির সাজা রেখে নতুন আইন পাস হয়েছে তারই প্রতিবাদে মটর শ্রমিকদের এমন অঘোষিত আন্দোলন।
আমি যে গাড়িতে ছিলাম সেই গাড়িতে থাকা গোলাপ নামের সাতাশ কি আঠাশ বয়স হবে ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি উঠেছে সিরাজগঞ্জে যাবে ঠাকুরগাঁ, তার নানী মারা গেছে বাদ জোহর জানাজা, ঠাকুরগাঁও এর বাস না পেয়ে রংপুরের বাসে উঠেছে সেখান থেকে অন্য বাস ধরে চলে যাবে কিন্তু বাস যখন থেমে যায়: নেমে যায় ড্রাইভার তখন হতাশ হয় গোলাপ। চেহারার এমন করুন পরিনতিতে দেখে মায়া হলো, দেখি বেচারার জন্য কিছু করা যায় কি: না। এই ভেবে বগুড়ায় অবস্থানকারী আমার খালতো ভাই টিটুকে মোবাইলে ফোন করি।
: আসসালামু আলাইকুম। অপর প্রান্ত থকে নারী কণ্ঠ।
: ওয়ালাইকুম আসসালাম, কিডা?
: আমি শাহীন, আপনি কে? এটা টিটু ভাইয়ের নাম্বার না?
: হ বারে, উনি রংপুরে, মোবাইল বাসায় রাইখে গেছে। কোন শাহীন?
পরিচিত নারী কণ্ঠই যে আমার ভাবীর তা আর বুঝতে বাকি রইল না।
: ভাবী, ভাবী আমি কামারপাড়ার শাহীন।
: ও বুঝবার পাচি, তা এদ্দিন পর ভাবীর কথা মনে পইলো, কেমন আছো, খালাম্মা, তোমার বউ, ছাওয়াল: পুয়াল সব কেইংকা আচে? তোমার ভাই কাইল আতোত রংপুর গ্যাচে, ভুল করি মোবাইল রাখি চলি গ্যাচে।
: ও, ভাবি আমি তো আপনাদের বাসার কাছে।
: কি কও।
: তুমি বোগড়া আচ্চু! ক্যা? কি কামোত এটি…
: ভাবী, আমি কাল রাতে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়েছে বাড়ি যাবার জন্য। কিন্তু শেরপুর এসে দেখছি মটর শ্রমিকদের ধর্মঘট, যেতে দিবেনা। সেখান থেকে পুলিশ সাহায্য করে যাত্রীবাহী বাসগুলো ছেড়ে দিয়েছে। তারপর বগুড়ার অনেক জায়গায় আটক করে আবার ছেড়ে দেয়। কিন্তু মাটিডালি মোড়ে এসে আর ছাড়তে চাইছে না। তাই ভাইকে ফোন দিলাম, ভাই যদি বাসটি ছাড়িয়ে দিতে পারতো তাহলে বাসে একটা ছেলে আছে তার নানী মারাগেছে সে গিয়ে জানাজা করতে পারতো।
: তুমি মাইড্ডালি মোড়ে? তাইলে হামার বাসাত চলি আইসো, পাঁচটাকা নিবে অটো ভাড়া। কি আসিচ্চু তো?
: না ভাবী, আজ না, আর একদিন আসবো, চৌদ্দঘণ্টা থেকে বাসে আছি শরীর ন্যাশপ্যাসা হয়ে গেছে।
: কথা কইওনা, তুমি ওটি বিমানের কাচোত থাকো, হামি তোমার ভাস্তিক লিয়া আসিচ্ছি।
ভাবীর সঙ্গে কথা শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যে আমার মোবাইলে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো, আমার ভাইয়ের ফোন।
: শাহীন, তুই নাকি বগুড়ায়, তোর ভাবী বল্লো।
: জ্বী, ভাই, আপনি কিভাবে জানলেন?
: তোর ভাবী ফোন করেছে, আমি রংপুরে এসেছি রংপুরের বাসায় ফোন করে জানালো, তোর ভাবী আসতেছে তুই বাসায় যাবি।
আমি কিছু বলার আগেই ফোন কেটে দ্যায় ভাই।
বাসের পাশে দাঁড়িয়ে আগের মতই অপেক্ষায় আছি, কখন বাস ছাড়বে। কখন বাসায় যাবো। এমন অপেক্ষা করছি আরো অনেক সময় ধরে। বিভিন্ন ভাবনা নিয়ে পায়চারি করতে করতে ফোন বেজে ওঠে, আমার ভাবীর কল করেছে। ভাবীর নাম্বার অনেক বছর অগে থেকেই লিপিবদ্ধ ছিল আমার ফোনে। ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে ভাবীর বাক্য:
: ক্যাবারে তুমি কুটি? বড় রাস্তার বগলে আসো, হামি এটি বিটিক লিয়া খড়াইছি…
ফোনে কথা বলতে বলতে বলতে ফিরে দেখি মোবাইল কানে ধরে ভাবী উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে।
ফোনে আর কথা না বাড়িয়ে কয়েক’পা এগিয়ে গিয়ে ভাবীর পিছনে দাঁড়িয়ে সালাম দিতেই চমকে উঠে ফিরে তাকায়:
: কেমন আচু তুমি?
: ভালো আছি ভাবী।
পাশে কলেজ পড়ুয়া ভাতিজি টুম্পা, তার সাথে কুশল বিনিময় হয়। কথা হয় হালকা পাতলা। এবার ভাবী তাড়া দেয়:
: চলো।
অনেক বলাকওয়ার পরও ভাবীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেলোনা কিছুতেই।
যেহেতু যেতেই হচ্ছে তাই বাসের কাছে ফিরে এসে পরিচিত সুপারভাইজার কে বলতে হয়, সে যেনো আমার লাগেজ, চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসা ব্যবসার কিছু মালামাল আমার চেম্বারে পৌছয় দেয়।
বাসের স্টাফ তিন জন, পুরো রাস্তা জুড়ে তারা যথেষ্ট আতিথেয়তা করেছেন, কুমিল্লার নূরজাহান হোটেলে বিরিয়ানি থেকে শুরু করে খাইয়েছেন চা, চলন্ত বাসে কিছুক্ষণ পরপর পান, বগুড়ায় বাস আটকানোর পর নাস্তা আর কোমল পানীয়।
ভাবীর ডাকে পিছু ফিরে বড় রাস্তা ধরি। আমরা তিনজন। পরে রিকসা নিয়ে আজিযুল হক কলেজের উদ্দেশ্যে।
চারজনের ছোট্ট পরিবার নিয়ে বসবাস করা খালাতো ভাই কর্মের সূত্র ধরে বগুড়ায় অবস্থান করছেন দীর্ঘদিন ধরে, সেইসাথে বিয়েটাও সেরে নিয়েছেন এখানে। মহাসড়ক বামে রেখে চিকন গলিপথ পেরিয়ে রিকসা নামিয়ে দেয়।
রাতজাগা পাখির মতো চোখে ঘুম নিয়ে ফ্রেস হয়ে সবার সাথে গল্পের ফাকে সকালের নাস্তা খাওয়া হয়। তারপর একটা দীর্ঘ ঘুম। ভাতিজি টুম্পার ডাকে প্রায় চারঘণ্টার ঘুমের অবসান পায়। শরীর আর মন: মেজাজ বেশ ফুরফুরে লাগছিল। আহা, ঘুমের মাঝে প্রশান্তি!
দুপুরের খাবারের আয়োজন ছিল দারুণ। মনে জমানো অনেক গল্পের সাথে খাবারের পর্বটাও বেশ মজাদার। ভাবীর হাতের রান্না বলে কথা! খাবার তারিফ করতে করতে পেটপুরে খাওয়া শেষ হয় আমাদের।
বিকেল চারটা পেরিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। গাড়ির সুপারভাইজার ফোন করে ফেরার তাড়া দিলেন। ভাবী ভতিজিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা চলে আসি গাড়ির কাছে। মটরশ্রমিকদের মিটিং চলছিল নানাবিধ দাবীদাওয়া নিয়ে। মিটিং দেখে একটা আশার আলো ফুটে ওঠার ভাব মনে মনে জন্ম নিচ্ছিল কিন্তু বক্তারা একের পর এক ভাষণ দিয়েই চলছে, শেষ হবার কোনো নামগন্ধ পর্যন্ত নেই। হরেকরকম দাবীদাওয়ার সমাপ্ত ঘটে সন্ধ্যা ছয়টা পার করে। অবশেষে মিললো মহেন্দ্রক্ষণ। আটকে রাখা গাড়িগুলো ছেড়ে দিলেন। আমরা যে যার মতো গাড়িতে উঠে বসে পড়ি নির্ধারিত সিটে। গাড়ি চলতে শুরু করে আবার জ্যাম ঠেলে।

বেশ কিছুদিন পর সিরাজ সাহেবের আজ রাতে ঘুমটা বেশ ভালো হয়েছে। সকাল প্রায় নয়টা, অভ্যাস বশতঃ ঘুম ভেঙ্গেছে আরও এক ঘন্টা আগে। অফিসে যাওয়ার তাড়া নাই কারণ, মাস তিনেক আগে তিনি চাকুরী থেকে অবসর পেয়েছেন। চাকুরীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরলসভাবে সেই সকাল ৮ টায় বেরিয়ে ফিরেছেন রাত ৮ টায়। কাজে ফাঁকি তো দূরের কথা নেহায়েত প্রয়োজন না হলে পাওনা ছুটি পর্যন্ত তিনি নেননি। নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ দেখে মুগ্ধ হয়ে অফিসের সেকেন্ড অফিসার তার একমাত্র মেয়ে শরিফা খাতুনের সঙ্গে বিয়ের জন্য একে ওকে ধরেন। তার ধারনা ব্যাংকের চাকুরী ঐ রকম সততা ও নিষ্ঠা থাকলে এ ছেলে একদিন অনেক উপরে উঠতে পারবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। অবশেষে অনেক চেষ্ঠা তদবির করে সিরাজ সাহেবের সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিতে সক্ষম হন তিনি।
দীর্ঘ ৩৫ বছর ৩ মাসের সকল স্মৃতি, একে একে তার মনের পর্দা ছুঁয়ে যায়। সুখের চেয়ে দুঃখের স্মৃতিই বেশি। চাকুরী করা অবস্থায় তবু না হয় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন স্ত্রী শরিফা খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক খুব মধুর না হলেও তিনি অনেকটা ছাড় দিয়েই চলেছেন। স্ত্রী যখন যা চেয়েছে সাধ্যমত তাই দেওয়ার চেষ্ঠা করেছেন। দায়িত্ববোধ এবং ন্যায় নিষ্ঠতার কারণে শুধু পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। এ কারণে হয়ত তাদের মধ্যে একটা মানুষিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এসব ভেবে মনটা ভীষণভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে উঠলো। ভেবেছিলেন অবসরের পর স্ত্রী শরিফার সঙ্গে সারাক্ষণ কাটাবেন, তার সঙ্গে একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করে অতীতের সব রিক্ততা-তিক্ততা ভুলে যাবেন। হায় অদৃষ্ট! যে সময় যায় সে সময় আর কখনও ফিরে আসে না। তার হাতে যখন অফুরন্ত সময় স্ত্রী তখন হাজার ডাকেও আর ফিরে তাকায় না। এতো চড়াই-উৎরাইয়ের পরও তাদের ছেলে-মেয়ে দুটি লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়েছে। ছেলে ডাক্তার হয়ে সরকারি চাকুরী করছে আর মেয়ে চাকুরীজীবি জামাইয়ের সঙ্গে চট্টগ্রাম আছে। মেয়ের সন্তান প্রসবের এক মাস আগে আজ চার মাস হলো স্ত্রী শরিফা সেখানে গেছে, আজ পর্যন্ত ফেরার নাম-গন্ধ নেই। সিরাজ সাহেব অনেক বার ফোন করে তাকে আসতে বলেছেন, কোন সদুত্তর পাননি। সিরাজ সাহেব ভাবেন মানুষ এত নির্দয় হয় কি করে? একটা লোক “আমি চার মাস ধরে একা আছি, কি খাচ্ছি, কেমন আছি এসব ভাবনা কি একবারো তার মাথায় আসে না? মেয়ে মানুষের মন নাকি নরম হয়, সব মিথ্যে কথা।”
এসব নিয়ে আর ভাবতে চাননা সিরাজ সাহেব। তিনি মনে মনে স্ত্রীর উপর রাগ করেন কিছুটা অভিমানও। সে যদি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারে আমি পারব না কেন? আমিও খাব-দাবো, ঘুরে বেড়াব। পরক্ষণই আবার কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হলেন সিরাজ সাহেব। এতদিন কর্তব্য কাজে ডুবে থাকার কারণে বর্তমান সমাজ এবং পরিবেশের পরিবর্তনটা বুঝতে পারেননি তিনি। একে পরিবর্তন না বলে অধঃপতন বলাই উচিত। সভ্যতা বলত যদি গাড়ি-বাড়ি মস্ত দালানকোটা প্রশস্ত রাস্তা-ঘাট আর দামি পোশাক বোঝায় তাহলে বোঝা যায় আমরা অনেক সভ্য হয়েছি আর যদি সভ্যতা মানে হয় নীতি, নৈতিকতা ও সততা, তাহলে আমার আবারও আদিম যুগে ফিরে গেছি। মানুষের ভদ্রতা, বিনয়, সততা সমূলে লোপ পেয়েছে। পক্ষান্তরে বেড়েছে হিংসা, বিদ্বেষ এবং লোভ। নতুন প্রজন্ম ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট অভিভাবকরা যদি সচেতন না হোন তাহলে ধ্বংস অনিবার্য। এই তো সেদিন এদিক-ওদিক ঘুরে একটি রেষ্টুরেন্টে ঢুকলেন তিনি এক কাপ চা খাবেন বলে। তার অফিসের জুনিয়র কলিক রশিদ সাহেবের কলেজ পড়ুয়া ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে আর সিগারেট ফুকছে। তাকে দেখেও না দেখার ভান করল। বাসায় একদম একা, হাতে অফুরন্ত সময়। তাই সময় কাটানো জন্য এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার মনে হলো এই কলেজেই তো পড়েছি, দেখি না এতদিন কি পরিবর্তন হয়েছে? সিরাজ সাহেব দেখলেন পরিবর্তন অনেক হয়েছে। আগে যে চাঁপা গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে পরানদা চানাচুর বেচতো, আজ সেই চাঁপা গাছটিও নেই। পরানদাও নেই। অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। কেউ গোল হয়ে বসে গল্প করছে। একটু দূরে লক্ষ্য করতেই চোখে পড়লো ছেলে-মেয়ে একে অপরের কোলে-পিঠে মাথা রেখে শুয়ে বসে আছে। সিরাজ সাহেবের শুধু মনে হলো আমাদের সময় একটা ছেলে ও একটা মেয়ে এরকম তো দূরের কথা, ক্লাশের বাইরে সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে কথা বলারও সাহস পেত না। আর এক মুহুর্তও দেরী না করে তিনি চলে আসেন।
আর একদিন কি মনে করে তিনি চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়েন। সিরাজ সাহেবের ইচ্ছে ছিল কাছে থেকে বাঘ, ভাল্লুক, পশু-পাখি দেখবেন কিন্তু তিনি একি দেখতে পেলেন! শত শত বিভিন্ন বয়সী মানুষের সামনে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া আদম সন্তানরা এ কোন আদিম খেলায় মত্ত? যা দেখে খাঁচার বন্দী পশুরা পর্যন্ত লজ্জায় চোখ বন্ধ করে বসে আছে। কোন পিতা-মাতা তার সন্তানের এমন নৈতিক অধঃপতনের কথা জানলে সন্তান জন্ম না দিয়ে নিঃসন্তান থাকাই শ্রেয় মনে করবে। এমন দৃশ্য দেখার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন এমন বেফাস জায়গায় তিনি আর কখনো ভুলেও যাবেন না।
সিরাজ সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন বাইরে ঘুরে ফিরে অযথা বিব্রত হওয়ার চেয়ে ঘরে বসেই বইপত্র আর খবরের কাগজ পড়ে সময় কাটাবেন। প্রতিদিন বিপুল উৎসাহ নিয়ে খবরের কাজগ খুলে বসেন, কাগজ খুলেই দেখতে পান খুন, ধর্ষণ, ঘুষ কেলেঙ্কারী, দুর্ঘটনা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের কাঁদা ছোড়াছোড়ি ও মিথ্যাচারে ভরা। প্রতিদিন একই ধরনের খবর পড়ে পড়ে বিতৃষ্ণা এসে যায় সিরাজ সাহেবের।
একদিন শহরের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েন সিরাজ সাহেব। এটা তার খুব পরিচিত একটা জায়গা, যদিও বেশ কিছুদিন এদিক আসা হয়নি। হ্যাঁ এটাইতো তার বন্ধু, সহপাঠী গোফফার আলীদের বাড়ি। বিরাট গেট আগে খুব ছোট ছিল। কি মনে করে ভিতরে ঢুকে পড়েন। বিশাল বারান্দার কোণে একটি আরাম চেয়ারে বসে আছে গোফফার আলী। সামনে দাঁড়িয়ে পনের-বিশ জন ছাত্র, অছাত্র, নেতাকর্মী। নেতৃস্থানীয় একজন বলছে, “লিডার মিছিলে শুধু ককটেল মারব নাকি দু’একটা লাশ ফেলে দিব?” গোফফার মিয়া সিগারেটে একটি লম্বা টান দিয়ে বললেন, “আরে না না, এসময় অত বড় রিক্স নেয়া যাবে না। থানার ও.সি নতুন এসেছে শুনেছি সুবিধের লোক না। কিছুতেই কিছু গিলতে চায় না। এর মধ্যে একটু আলাপ পরিচয় করে নেই। তারপর না হয় দেখা যাবে। তবে খেয়াল রাখবে মিছিল যেন কিছুতেই চৌরাস্তা পর্যন্ত না আসে।” ঠিক আছে লিডার, আমরা তাহলে এখন আসি, বলে হাত উঠিয়ে সালাম জানালো। গোফফার মিয়া বললেন, একটু দাড়াও বলেই ড্রয়ার থেকে একটা প্যাকেট বের করে তার হাতে দিলেন। খুশি হয়ে আবারও সালাম দেয়ার ভঙ্গিতে হাত উঠাল এবং উপস্থিত অন্য সকলে একইভাবে হাত উঠিয়ে ছালাম দিয়ে বেরিয়ে গেল।
সিরাজ সাহেব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন। সকলে চলে গেলে সিরাজ সাহেব গোফফার মিয়ার নজরে পড়লেন। গোফফার মিয়া চেঁচিয়ে বললেন, আরে সিরাজ না, কখন এসেছো? দাঁড়িয়ে কেন, এসো বসো। সিরাজ সাহেব ধীরে ধীরে বারান্দায় উঠতে উঠতে বললেন, এসেছি বেশ কিছুক্ষণ আগে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার নেতাগিরি দেখছিলাম। গোফফার মিয়া একটি গর্বের হাসি হেসে বললেন, নেতাগিরির আর দেখছোটা কি?
গোফফার মিয়া অন্দর মহলের দিকে তাকিয়ে একটা চিৎকার দিলেন, গোলাপী বাইরে দু’কাপ চা দে, বলেই একটু নড়ে চড়ে বসে বললেন, বল বন্ধু, এবার তোমার খবর বল। কেমন আছো? ছেলে-পুলে কি করছে? ইতিমধ্যে গোলাপী দু’কাপ চা এনে দু’জনের হাতে দেয়। গোফফার মিয়ার ইশারায় গোলাপী তার কাঁধে হাত দিয়ে মেসেজ করতে থাকে। গোফফার আবার বলেন, বললে না তোমার ছেলেটা কী করে? সিরাজ সাহেব বললেন, ও এম.বি.বি.এস পাশ করে সরকারী ডাক্তার হয়েছে। গোফফার মিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, কয় টাকা বেতন পায়? আমার ছেলে বল্টু ঠিকাদারী করে, এবার এক কোটি টাকার একটা কাজ পেয়েছে। সিরাজ সাহেব মনে মনে বললেন, কিসের সাথে কিসের তুলনা। এমন সময় গোফফার মিয়ার ছেলে বল্টু ভিতরে ঢুকলো। সোজা অন্দরে যাচ্ছিল। গোফফার মিয়া তাকে ডেকে বললেন, তোমার সিরাজ আঙ্কেল, আমার বন্ধু, ব্যাংকের ম্যানেজার ছিল। বল্টু শুধু ও; বলে ভিতরে চলে গেল। একটু পরে ভিতর থেকে ডাক দিলো গোলাপী এদিক আয়।
সিরাজ সাহেব আর দেরি না করে বেরিয়ে এলেন। গেটটার দিকে আর একবার তাকাতেই চোখে পড়লো বড় বড় অক্ষরে লেখা গাফফার খান, সাবেক…। সিরাজ সাহেব মনে মনে একটু হাসলেন, গোফফার মিয়া আবার কবে গাফফার খান হলেন? রাজনৈতিক নেতা বলে কথা। তারা তো আর সি.এস.পি অফিসার নয়, যে নামের এক বর্ণও পরিবর্তন করার ক্ষমতা থাকবেনা। রাজনৈতিক নেতারা যখন খুশি তখন নাম পরিবর্তন করতে পারেন। সে ক্ষমতা তাদের আছে।
সিরাজ সাহেব রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লেন। কিছুতেই ঘুম আসছেনা। জীবনটাকে বড়ই অর্থহীন মনে হচ্ছে। এই মুহুর্তেই স্ত্রী শরিফা বেগমের কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে। এ সময় সে পাশে থাকলে এতটা অসহায় লাগতো না। যে করেই হোক শরিফাকে বিষয়টা বোঝাতে হবে। তার প্রতি যদি কোন অবহেলা, অন্যায় হয়ে থাকে, তার মনে যদি বিশেষ কোনো দুঃখ থাকে তা ঘোঁচাতে হবে। কিন্তু কিভাবে? এসব ভাবতে ভাবতে রাত গড়িয়ে সকাল হয়। সারারাত এক ফোঁটা ঘুমও হয়নি। রাতে না ঘুমানোর কারণে কিছুটা অসুস্থতাবোধ করতে লাগলেন তিনি। বুকের বাম পাশটায় হালকা একটা বাথ্যা অনুভব করছেন। ব্যথাটা ক্রমান্বয়ে প্রচন্ড আকার ধারণ করে। এক সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরদিন হসপিটালের বিছানায় জ্ঞান ফিরলে দেখতে পান, স্ত্রী শরিফা পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। সিরাজ সাহেব খুশি হয়ে স্ত্রীর একটা হাত ধরলেন কিন্তু একি? কথা বলার আপ্রাণ চেষ্ঠা করেও কোন কথা বলতে পাচ্ছেন না। স্ত্রী শরিফা বিষয়টা বুঝতে পেরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন, ওগো কথা বলো, রাগ করে থেকো না। আমি চলে এসেছি। তোমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবো না। সিরাজ সাহেবের দু’চোখ বেয়ে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো।

হঠাৎ কি একটা স্বপ্ন দেখে মৃদুলের ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো,চারিদিকে সুনশান নীরবতা,এ যেন এক অন্য পৃথিবী! হয়তো করোনা ইস্যুর কারণে সৃষ্টি কর্তা এই পৃথিবীর মানুষগুলোকে অন্যকোন গ্রহে স্থানান্তরিত করেছেন! কেননা,এই ক’দিনেই চেনা পৃথিবীটাই মৃদুলের কাছে অচেনা লাগছে!
গত কয়েক’টা দিন এমনই ভাবে কাটছে। অফিসেও তেমন কাজ নেই তার। চারদিকে করোনা আতঙ্কে বাজার,দোকান-পাট,রাস্তা-ঘাট সবই বন্ধ। শুনছে পুলিশ নাকি গত কয়েকদিন থেকে পাবলিকের উপর বেজায় নাখোশ! অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশী খেলোয়াড়রা যেভাবে ইন্ডিয়ান বোলারদের উপরে ক্ষেপে তুলোধুনো করে ছেড়েছিলো,ঠিক তেমনি করেই নাকি তারা এবার পাবলিকের উপর ব্যাটিং চালাচ্ছে! সেই ভয়েই মৃদুলও বাসার বাহিরে যায়না!
তাই সকাল বিকেল রাত শুধু ঘুম আর ঘুম! এ যেনো ঘুমন্ত মানুষের রাজ্য!প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে যাচ্ছেনা! গেলেও আর্মি,পুলিশ আর ভোট চোর পাতি নেতাদের লাঠির আঘাতের ভয় আছে! তাই মৃদুল সারাদিন বাড়ির বাইরে যায়না!
প্রথম প্রথম মৃদুলের অন্য রকম একটা ফিলিংস কাজ করতো,আর যাই হোক কাজ হতে তো বাঁচাগেল! কিন্তু এই ক ‘টা দিনেই সে বুঝে গেছে ,এটা মৃদুলদের মতো উচ্চ শিক্ষিত কামলাদের জন্য জেলখানার আযাব সমতুল্য! হঠাৎ করে কাজ হতে মুক্ত হওয়ায় গা ছমছম করে!কোথায় যেন একটা অচেনা ব্যথা অনুভব হয়! এ সময় যদি একজন সঙ্গী পাশে থাকতো?
অথচ কত বছরই তো সে একাকী কাটিয়ে দিলো,কখনোই তো কারও অভাববোধ মনে হয়নি! কিন্তু আজকাল এমন লাগে কেন? বনলতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেতো কখনই এমন লাগেনি তার!
বনলতা মৃদুলের জীবন থেকে দূরে সরে গেছে সেই কবে! অথচ এই লকডাউনের সময়টাতে কেন জানি বারবার বনলাতার কথাই তার মনে পড়ছে। অথচ দীর্ঘ চারটা বছর একবারের জন্যেও বনলতার কথা তার মনে পরেনি। আর বনলতাও তার খোঁজ নেয়নি! তাহলে এখন বার বার কেন বনলতা মৃদুলের স্বপ্ন রাজ্যে ভীড় করছে,বুঝতে পারছেনা। তবে কী মৃদুল ইদানিং একাকীত্ব বোধ করছে?
কত শীত,বসন্ত চলে গেছে মৃদুল একটি বারের জন্যও খেয়াল করেনি! অথচ এর মাঝে কত যে অষ্টাদশী মৃদুলের জীবনে উঁকি মেরেছে,সে একবারের জন্যেও তাদের দিকে ফিরেও তাকায় নি। কিন্তু হঠাৎ তার এমন শূণ্যতার কারণ কী সেও খুঁজে পাচ্ছেনা,সেতো চেয়েছিল একাকীই বাকি জীবনটা অতিবাহিত করবে। তবে এখন কিসের অভাববোধ রোজ তাকে গ্রাস করছে?
যখনই ঘুমাতে যায়,তখনই অনুভব করে কেউ একজন তার বুকে মাথা দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে! আর তার কপালে আলতো চুম্বন দিয়ে বলতে থাকে,চাইলেই কি আমাকে ভুলে থাকতে পারবে?
-কে,কে তুমি? আমি তোমাকে তো চিনতে পারলাম না!
-সত্যিই কি তুমি আমায় চিনতে পারনি? আমার উষ্ণ বুকের উথাল পাথাল ঠেউ অনুভব করতে পারনি না? আমার বাঁকা ঠোঁটের নরম ছোঁয়াটা তোমার হৃদয়ে দাগ কাটছে না?
-কে,বনলতা! কিন্তু বনলতা তো সেই কবে চলে গেছে! তাহলে কে এই রমণী?
-মৃদুল,কি ভাবছো এ সব! তুমি তোমার বনলতাকে এতো তারাতা‌ড়ি ভুলে গেলে? অথচ দেখো আমি কিন্তু তোমাকে এখনো ভুলতে পারিনি! পৃথিবী করোনা ভাইরাস দিয়ে যখন মানব জীবন শুণ্য করে চলছে প্রতিনিয়ত! তবুও আমি সব বাধা পেরিয়ে তোমার কাছে ছুটে এসেছি,তোমাকে আমার কাছে রাখব বলে! চলো দুজনে আজ হারিয়ে যাব,নিস্তেজ পৃথিবীর সকল মায়া-মমতা ত্যাগ করে ওই দূর আকাশে বুকে! এসো সোনা,তোমার বনলতা তোমাকে নিতে এসেছে! আমার হাত ধরে,দ্রুত চলো! নয়তো করোনা ভাইরাসের বিষাক্ত ছোবলে তুমি,আমি এক হতে পারবনা!
-না,আমি তোমার সাথে যাবনা!আমাকে তুমি ভুলে যাও! এ পৃথিবীর বুকেই আমি হাজার বছর ধরে নিঃশ্বাস নিতে চাই! কেউ আমাকে এখান হতে নিয়ে যেতে পারবেনা।
-কি বোকার মতো কথা বলছো মৃদুল,আমি কত দূর হতে তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি, তুমি একবারও খেয়াল করেছো? তুমি না গেলে আমি মনে অনেক কষ্ট পাবো! আর তুমিছচাইলেও এই পৃথিবীটা তোমাদের নেই! এ পৃথিবীর সবকিছু তোমরা কবেই ধ্বংস করেছো! অযথা এ পৃথিবীর মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই! চলো সোনা,তোমাকে আজ আমার সঙ্গে যেতেই হবে!
-না,বনলতা না! তোমাকে আমার আর প্রয়োজন নেই,তুমি যেখানে আছো সেখানেই থাক! আমাকে ছেড়ে দাও,আমি তোমার সঙ্গে যাবনা! আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
বনলতা মৃদুলকে তার বুকে আরো শক্ত করে জড়াতে থাকে,আর অট্টহাসিতে পৃথিবী প্রকম্পিত করতে থাকে! আর বলতে থাকে, “বললেই হলো,আমি তোমাকে নিয়েই যাব! এ পৃথিবীতে এখন আর তোমার কোনো অধিকার নেই!”
হঠাৎ করেই,বিকট শব্দ করে মৃদুলের ঘুম ভেঙ্গে গেল! সারা শরীর ঘেমে একাকার! চারদিকে তাকিয়ে দেখে,কোথাও কেউ নেই! চারদিকে ঘন অন্ধকার,দূর হতে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে,এবার বুঝি মৃদুলের জীবনেও ওপাড়ের ডাক এসে গেছে!

গত সপ্তাহে মিজান সাহেবের সহকর্মী হাসান সাহেব হার্ট এ্যাটাক করে মারা গেছেন হঠাৎ। অল্পবয়সী স্ত্রী আর সাত বছরের স্কুল যাওয়া পরীর ছানার মত মেয়েটিকে ছেড়ে তিনি এত অল্পবয়সে চলে গেলেন। অফিসের সকলেই বড় আফসোস করছিলেন হাসান সাহেবের স্ত্রী- কণ্যার কথা ভেবে।
রোববার মানে সপ্তাহের ব্যস্ততার শুরু।
সকাল মানেই দৌঁড় শুরু হয়ে যায় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা- ঘুম থেকে যুদ্ধ করে টেনে তুলে বিছানা থেকে নামানো, জোর করে বাথরুমে পাঠানো, সেখানে চুপচাপ বসেই আছে ছেলে, এদিকে সময় এগিয়ে চলেছে।
বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আবার নিজের অফিসে ঠিক সময়ে পৌঁছে ডিজিটাল এ্যাটেন্ড্যান্স। টেনশন। বাথরুমে ঘুমিয়েই পড়লো নাকি বাচ্চা- তাকে দরজায় দাঁড়িয়ে তাড়া দেয়া, বের হয়ে এলে ব্রাশ করানো। তারপর টেবিলে বসিয়ে ব্রেকফাস্ট। তা মুখে কি তুলতে চায় ঘুম থেকে উঠেই!
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী হলে বাসায় ঝড় বয়ে যায় প্রতিদিন সাতসকালে।
মুখে খাবার নিয়ে বসে বসে চুপচাপ টিভিতে কার্টুন দেখে ছেলে। পৃথিবীতে সময় যে নদীর স্রোতের গতিতে অতীত হচ্ছে অবিরাম তা কেমন করে বুঝবে নার্সারিতে পড়া শিশু।
প্রায় প্রতিদিন সকালে মিজান সাহেব তার স্ত্রীর সাথে ছেলের ব্রেকফাস্ট নিয়ে বাহাস করেন। স্ত্রীর নিজেরও অফিস আছে সাড়ে আটটায়। তারপরও ছেলেকে খাওয়াতেই হবে। এত বলেন মিজান সাহেব, সাতসকালে ছেলে না খায় তো ঠিক আছে। টিফিন তো দিচ্ছোই। না হয় আমি ওর পছন্দের খাবার কিনে দেবো স্কুলের ক্যান্টিন থেকে।
স্ত্রীর এক জবাব- না, বাইরে থেকে ফাস্টফুড কিনে খাওয়াবে না বাচ্চাকে।
ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এই জ্যামের স্রোত ঠেলে সঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছা সম্ভব হবে না। স্কুলের সামনের রাস্তা যেন লক্ড হয়ে যায় সকালে সব ছেলেমেয়েদের স্কুলে প্রবেশের সময়।
মিজান সাহেব যতই অস্থির হয়ে স্ত্রীকে বোঝাতে চান, তার স্ত্রী ততই নিপুণ ধৈর্যের সাথে বাচ্চার মুখে ওমলেট আর পরোটা জোর করে পুরে দিয়ে বাচ্চাকে খাওয়ানোর যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে থাকেন।
খাওয়ানো শেষ হলে ইউনিফর্ম পরিয়ে, আইডি কার্ড, নেমপ্লেট ঠিকঠাক ঝুলিয়ে, জুতা পরিয়ে বসার রুমে ছেলেকে বসিয়ে রেখে ঝড়ের মত ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ান।
ততক্ষণে মিজান সাহেব প্রস্তুত হয়ে ছেলেকে নিয়ে বের হয়ে যান একেবারে। ছেলেকে স্কুলের গেটের ভেতরে পাঠিয়ে তারপর উল্টোপথে জ্যাম ঠেলে রিকশা নিয়ে অফিসে সঠিক সময়ের মধ্যেই পৌঁছতে পারলে তার মনে হয় যেন যুদ্ধ জয় করেছেন।
অফিসে পৌঁছার পর তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। আহা বেচারি। সকালে সবার ব্রেকফাস্ট, ছেলের টিফিন, মিজান সাহেবের লাঞ্চ প্রস্তত করে ছেলেকে খাইয়ে, স্কুলের জন্য রেডি করে, নিজের মুখে কিছু দেয়ার সময়টাও থাকে না তার। রেডি হয়ে নিজেকেও অফিসের পথে ছুটতে হয়।
প্রতিদিনের মত ছেলেকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করতে মিজান সাহেবের স্ত্রী সোমার চলছে সময়কে হারিয়ে দেয়ার প্রতিযোগিতা।
ডাইনিং টেবিলে বসে মিজান সাহেব রুটি সবজি আর ওমলেটে ব্রেকফাস্ট সেরে রুমে এসে অফিসের পোষাক পড়ছেন।
গত বৃহস্পতিবার থেকে মনটা বড় ব্যথিত, উদ্যোমহীন। কেমন একটা বৈরাগ্যে-বিষাদে ভেতরটা কেমন অচল-অচঞ্চল হয়ে আছে মিজান সাহেবের।
সহকর্মী হাসান সাহেব দুপুরে তার মেয়েটাকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আবার অফিসে ফেরার সময় বাসা থেকে বের হতেই বুকে প্রচন্ড ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান বাসার সামনেই। হসপিটালে নেয়ার মত সময়ও পায় নি তার স্ত্রী।
তরুণী স্ত্রী, সাত বছরের শিশুকণ্যাকে এই শহরে একেবারে সহায়হীন, অভিভাবকহীন রেখে অকস্মাৎ হাসান সাহেবের এই মৃত্যু বড় বেশি শোকের ছায়া নামিয়ে আনে অফিস সহকর্মী, পরিচিত বন্ধু-স্বজনদের মধ্যে।
হাসান সাহেব অন্যায়ভাবে বাজে আচরণ করতেন মিজান সাহেবের সাথে বিভিন্ন সময়ে। যা মিজান সাহেব ভুলতে পারেন না কোনদিন। অফিস পলিটিক্সে মিজান সাহেবকে বরাবরই প্রতিপক্ষ বানিয়ে নানাভাবে হ্যারাস করতে তৎপর থাকতেন হাসান সাহেব।
মৃত্যুর পর লোকটি অপরের সাথে কেমন আচরণ করতো তাই মনে পড়ে লোকের। মিজান সাহেবেরও মনে পড়েছে।
আজ রবিবার। সপ্তাহের প্রথমদিনে জীবনের টানে যখন সবার দৌঁড় শুরু হয়ে গেছে তখন মিজান সাহেবের কোন ব্যস্ততা নেই যেন। ধীরে ধীরে অনিচ্ছা নিয়ে গায়ে শার্ট চাপছেন, টাইয়ে নট বাঁধছেন।
ছেলেকে রেডি করে বসিয়ে রেখে স্ত্রী নিজে রেডি হতে এসে যখন দেখে বিভ্রান্তের মত মিজান টাইয়ে নট বাঁধছে- তখন তার অবাক হবার পালা।
যে সহকর্মীরা সবসময় অফিস পলিটিক্সের ঘোঁট পাকাতো হাসান সাহেবের সাথে, শেষ কৃত্যের সময়টাতে তাদের শোকটা ছিলো এমন রকমের- দেখে মিজান সাহেবের মনে হয়েছে আরোপিত ও অতিরঞ্জিত। তার ভুলও হতে পারে মিজান সাহেব ভাবেন একবার।
অনেকেই কেঁদেছেন। আহা আহা করেছেন।
মিজান সাহেব কাঁদেন নি। কাঁদতে পারেন নি। কেমন চুপচাপ ছুটির দুইটি দিন কাটিয়েছেন। তাঁর ভেতরটা শুষ্ক হয়ে আছে। অফিসের বস ও সহকর্মীদের সামনে কোন কোন সহকর্মীকে কেঁদে আকুল হতে দেখেছেন তিনি। কান্না বা শোক প্রকাশের মত ভেতর থেকে কোন সাড়া পাননি মিজান সাহেব।
অথচ হাসান সাহেবের ছোট্ট ফুলের মত মেয়েটির মুখ এক মুহূর্তের জন্য তার মন থেকে সরাতে পারেন নি। সপ্তাহের ছুটির দিন দুটিতে যতবার নিজের ছেলের মুখ দেখেছেন ততবার হাসান সাহেবের মেয়েটির করুণ বিহ্বল মুখ মনে পড়েছে তার।
আজ সকালে যখন ছেলে স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে স্পাইডারম্যানের ছবিওয়ালা স্কুলব্যাগে বই, খাতা, টিফিন ভরে অপেক্ষা করছে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাবার জন্য তখন হাসান সাহেবের মেয়ের কথা ভেবে বুক ফেটে কান্না বের হয়ে আসছে মিজান সাহেবের। চোখ কেবল ঝাঁপসা হয়ে আসছে তার।
রুমে ঢুকে স্ত্রী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে মিজান সাহেবের এই ভেঙে পড়া অবস্থা দেখে। নিজের অফিসের জন্য রেডি হতে হবে তা যেন ভুলে গেছে মিজান সাহেবের স্ত্রী সোমা।
-হাসান সাহেবের মেয়েটা আর বাবার হাত ধরে স্কুলে যাবে না কোনদিন, সোমা- বলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন মিজান সাহেব।
বাবার কান্না শুনে স্কুল ইউনিফর্ম পড়া ছোট্ট ছেলেটি জুতা পড়েই ভেতরের রুমে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে কেমন অবাক চোখে বাবাকে দেখে।
মিজান সাহেব ছেলের সামনে হাঁটুগেড়ে বসে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলেন, পৃথিবীতে অনেক দুঃখ আর শোক, বাবা।
অনেক দুঃখ আর শোক।
তারপর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে একহাতে ছেলেকে, অন্যহাতে অফিসের ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসেন মিজান সাহেব। পথে নেমে ঘড়িতে দেখেন বেশ দেরি হয়ে গেছে। ছেলের ক্লাস বসে যাবে পৌঁছতে পৌঁছতে। অফিসে পৌঁছতেও আজ দেরি হবে তার।
পৃথিবীতে শোকে কাঁদবার সময়টুকুও যেন নেই- ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসের পথে জ্যামের ভেতর রিক্সায় বসে কেবল মনে হতে থাকে মিজান সাহেবের।

রংপুর অঞ্চলের জমিদারির ইতিহাস বেশ পুরোনো। প্রাচীনকালে বৃহত্তর রংপুর কোচবিহার রাজ্যের অধিনে ছিল। মধ্যযুগে মোগলরা কোচ রাজাকে তাদের শাসনের অধিনে আনলে রংপুর কোচ মোগল রাজস্ব ব্যবস্থাধিনে শাসিত হতে থাকে। বৃটিশ আমলেও প্রাচিন জমিদারির প্রথা বহাল ছিলো। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় ছোট বড় প্রায় ৭৫ খানা জমিদারির কথা জানা যায়। তার মধ্যে ১৮ খানা বড় জমিদারি ছিল। এসব জমিদারির মধ্যে একমাত্র মহিপুর জমিদার ছিল মুসলমান এবং বাকি সবই ছিল হিন্দু জমিদার। সবগুলো স্থায়ী হলেও তিন খানা জমিদারি বহিরাগতদের দ্বারা পরিচালিত হতে দেখা যায়। এখানে বড় ১৮ খানা জমিদারির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
কুন্ডি জমিদার :- কুন্ডি পরগণার নামকরণ সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এটি কখনও কুন্ডি কখনও ফকির কুন্ডি কখনও সুর্যকুন্ডি নামে অভিহিত হয়েছে। পায়রাবন্দ পরগণার পুর্ব সীমানায় ঘাঘট নদীর পাড় এবং পশ্চিমে বদরগঞ্জ রেল স্টেশনের মধ্যবর্র্তী অঞ্চল কুন্ডি পরগণা নামে খ্যাত। সদ্য:পুস্করিনী গ্রাম কুন্ডি পরগণার কেন্দ্রবিন্দু বলে জানা যায়।
বাংলার সুবাদার মানসিংহ মোগলদের হয়ে এ পরগণা দখল করেন। তিনি ১৫৯৮ সালে পুরহিত শঙ্কর মুখোপাধ্যায়কে কুন্ডির জায়গীর প্রদান করেন। তার পুত্র কেশব চন্দ্র ১৬০৬ সালে রায় চৌধূরী উপাধী সহ মোগল বাদশাহী ফরমানে কুন্ডির জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১৭ সালে এ জমিদারি ভেঙ্গে চারটি জমিদারিতে পরিনত হয়। যা ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত বলবৎ ছিলো।
এ জমিদার বংশের উল্লেখ যোগ্য অবদান হল রংপুরে কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য ১২৫ বিঘা জমি দান, রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ ও পাবলিক লাইব্রেরীতে অর্থ ও পুস্তক দান, নারী শিক্ষায় বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন, দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা, ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা, সর্বপরি কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় ৪১৯ বিঘা জমি দান।
পাঙ্গার রাজ বংশ :- কুড়িগ্রাম জেলার রাজার হাট উপজেলার প্রাচীন পাঙ্গা নামক স্থানে পাঙ্গা জমিদারির গোরাপত্তন হয়। কামরুপাধীপতি রাজা নিলাম্বর ১৪৮৩ সালে কোটেশ্বরে (পাঙ্গার প্রাচীন নাম) একটি শিব মন্দির নির্মান করেন। কোচবিহার ইতিহাস গ্রন্থ মতে মহারাজা বিশ্ব সিংহের জ্যেষ্ঠ পুুত্র নরসিংহের (১৫৩৩-১৫৮৭) বংশধর থেকে পাঙ্গার রাজ বংশের উৎপত্তি। প্রাচীন পাঙ্গার জমিদারির আওতায় ছিল পাঙ্গা, বিশগিরি, পাটগ্রাম ও টেপা নামক চারটি পরগণার সমন্বয়ে বিশাল এলাকা। এর অধিকারীরা রাজা বলে অভিহিত হতেন।
কোচবিহারের মহারাজা প্রাণ নারায়ন (১৬৩২-১৬৬৫) পাঙ্গা দখল করলে মোগল হস্তক্ষেপে রাজা বাসুদেব পাঙ্গা ফেরত পান। কিন্তু অন্য তিনটি অঞ্চল হারান। এভাবে বৃহৎ পাঙ্গা জমিদারির পতন ঘটে এবং ক্ষুদ্র পাঙ্গা জমিদারির উদ্ভব হয়। শাসকরা গহীন জঙ্গলে নিজেদের লুকিয়ে ফেলে বিচ্ছিন্ন ভাবে শাসন কার্য পরিচালনা করতে থাকেন।
দীর্ঘ চারশত বছরের জমিদারি ভাগ হতে হতে শেষ পর্যন্ত রাজা ভাগ্যকুলের অধিনে ক্ষুদ্র একটি জমিদারিতে পরিনত হয়। তার আমলেই (১৯৪৯-১৯৫০) নিলাম হয়ে সরকারের খাস জমিতে পরিনত হয়।
ঘোড়াঘাট জমিদারি :- ঘোড়াঘাট জমিদারি যা নয় আনা ইদ্রাকপুর বা নয় আনা ঘোড়াঘাট (রংপুর অংশ) এবং সাত আনা ইদ্রাকপুর বা সাত আনা ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর অংশ) সহ সিক্কামহল নির্ধারিত রাজস্ব হারে ৫টি জায়গির অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তালুক নিয়ে এ প্রাচীন জমিদারি গঠিত ছিল। যা দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ এবং রংপুর জেলার দক্ষিনাংশ সহ সমগ্র বগুড়া ও মালদাহ জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এছাড়া সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের সুচনায় পরগনা পলাশদী (পলাশ বড়ি) স্বরূপপুর এবং কুন্ডিও উক্ত জমিদারির অন্তরভুক্ত হয়। সে সময় মোগল পুর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে ঘোড়াঘাটে প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হত।
ধারনা করা হয় প্রাচীন কাল থেকেই ঘোড়াঘাটে একটি সামন্ত পরিবারের অস্তিত্ব ছিল। যা মুসলিম বিজয়ের পরবর্তী সময়ে বহাল থাকে।
বৃটিশ আমলে ১৭৮৬ সালে রাজা গৌরনাথের সময়ে ১৫,০০০ টাকা রাজস্ব বকেয়া পরে। কোম্পানী রাজস্ব বৃদ্ধি করায় পরবর্তীতে তা কৃষক প্রজা বিদ্রোহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারী দেনার দায়ে ৫৯ টি লাভজনক পরগনা নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। ফলে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরেই নয় আনা জমিদারি মানচিত্র থেকে মুছে গিয়ে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমিদার ও তালুকের জন্ম হয়। গোবিন্দগজ্ঞ ও পার্শবর্তী থানা নিয়ে বর্ধনকোট নামে একটি ক্ষুদ্র জমিদারির জন্ম হয়। যার বার্ষিক রাজস্ব ছিল মাত্র ৭৭২৭ টাকা। উনিশ শতকের তৃতীয় দশকে এটি আরও ক্ষুদ্র ১০টি জমিদারিতে বিভক্ত হয়। রাজা শ্যাম কিশোরের সময়ে নিলামে গেলে নয় আনা জমিদারি পুর্বে মালঞ্চ, পশ্চিমে ময়মন্থপুর, উত্তরে তাজপুর ও দক্ষিণে কেশবপুর পর্যন্ত মাত্র ৫/৬ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে সীমাবন্ধ হয়ে পড়ে। শ্যামকিশোরের পুত্র শৈলেন রায় এর সময়ে ১৯৫০ সালে এ জমিদারি বিলুপ্ত হয়।
তুষভান্ডার জমিদার বংশ :- ২৪ পরগনার অধিবাসী মুরারিদেব ঘোষাল ১৬৩৪ সালে রসিক রায় বিগ্রহ নিয়ে কোচবিহারে আগমন করেন। রাজা প্রাণ রায়ের রাজত্ব কালে (১৬৩২-১৬৬৫) মহারাণী কর্তৃক একটি ‘উপেন চৌকি” তালুক প্রাপ্ত হয়ে তিনি ঘনশ্যাম গ্রামে বসতি স্থাপন করেন।
উপেন চৌকি তালুক দানের ফলে মুরারিদেব ঘোষাল উত্তর ঘনশ্যাম, ঘনশ্যাম, ছোটখাতা, বামুনিয়া ও শেখ সুন্দর এ ৫টি মৌজা লাভ করেন। কোচ রাজারা শূদ্র এবং কোন ব্রাক্ষন শূদ্রের দান হিন্দু বিধান মতে গ্রহন করতে পারেন না। সে কারনে মুরারিদেব রাণীর প্রদত্ত উপেন চৌকি দানের সম্পত্তি গ্রহনের আপত্তি জানিয়ে খাজনা গ্রহনে অনুরোধ জানান। অপরদিকে দেবতার পুজার উদ্দেশ্যে নিবেদিত সম্পত্তিতে খাজনা গ্রহনও হিন্দু ধর্মের পরিপন্থি । এমতাবস্থায় মহারাণী খাজনার বদলে তুষ (ধানের খোসা) গ্রহনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
তুষভান্ডার জমিদার বাড়িতে পূর্বে তুষ স্তুপাকারে রাখা হত। সেখান থেকেই কোচবিহার রাজবাড়িতে নেয়ার ব্যবস্থা ছিল । এজন্য এ জমিদারির নাম তুষভান্ডার হয় বলে অনেক ঐতিহাসিক মত দিয়েছেন।
তুষভান্ডারের অন্যতম জমিদার কালিপ্রসাদ রায় চৌধুরীর নাম অনুসারে কালিগঞ্জ বন্দরের নামকরণ করা হয়।
এ বংশের শাসক রমনি মোহন উপমহাদেশে বাংলা শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৮৮০-১৮৮৭ সালে রংপুর জিলা স্কুলের সেক্রেটারী থাকা কালে তিনি শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজীর বদলে বাংলা করার প্রস্তাব দেন। যার ফলে বৃটিশরা বাংলায় বাংলা স্টাইপেন স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
মহীপুর জমিদার বংশ ঃ- মহীপুর বর্তমান গঙ্গাচড়া থানার লক্ষীটারী ইউনিয়নের একটি গ্রাম। তিস্তা নদী মহীপুরকে কাকিনা পরগনা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।
কার্যির হাট চাকলার অধিকারী আরিফ মোহাম্মদ রংপুরে মোগল অভিযান প্রাক্কালে কোচবিহার রাজ্যের একজন সেনাপতি ছিলেন। তিনি কোচ রাজা কর্তৃক কার্যিরহাট চাকলার চৌধুরী নিযুক্ত হন এবং মোগল আক্রমনে কোচ পক্ষ ত্যাগ করে মোগল বশ্যতা স্বীকার করে অন্যান্য জমিদারদের মত নিজ অবস্থান বজায় রাখেন। তিনি কার্যিরহাটের সাড়ে চার আনা নিয়ে সাড়ে চার আনা কার্যিরহাট বা মহীপুর জমিদারি নামে নতুন জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।
মহীপুরই একমাত্র মুসলিম জমিদারি যা কোচ মোগল দ্বন্দ্বকালীন সময় থেকে শুরু করে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল।
কাকিনার জমিদার ঃ- কাকিনা যা কোচ আমলে কংকিনা নামে পরিচিত ছিল। ইন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তী ১৬৭৬ সালে কাকিনার বিলাত গিতালদহের অন্তর্গত ১০ টি তালুক ইজারা গ্রহন করেন। ১৬৩৪ সালে রমানাথ নামে এক ব্যক্তি কোচ রাজা প্রাণ নারায়নের রাজ দফতরে মজুমদারের কার্যে নিয়োজিত ছিলেন। ১৬৮৭ সালে ঘোড়াঘাটের ফৌজদার ইব্রাহিম কোচ রাজা মহীন্দ্র নারায়নের বিরুদ্ধে (১৬৮২-১৬৯৩) যুদ্ধে লিপ্ত হলে রমানাথের দুই দৌহিত্র রাঘবেন্দ্র নারায়নকে পরগনা বাষট্টির ও রাম নারায়নকে কাকিনা চাকলার চৌধুরী নিযুক্ত করেন। এভাবেই ইন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তির চাকলাদারি শেষ হয়ে কাকিনায় রাম নারায়নের মাধ্যমে নতুন জমিদারি সৃষ্টি হয়। এ বংশ একাধারে আড়াইশত বছর জমিদারি চালায়।
বৃটিশ আমলে মহেন্দ্র রঞ্জন রায় চৌধুরীর (১৯০৯-১৯৩০) বিলাসিতার ফলে ২৫০ বর্গমাইলের জমিদারি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে এবং নিলামে ওঠে।
এ জমিদারির অন্যতম অবদান হল রাজা শম্ভু চন্দ্রের শাসনামলে তার পালিত পুত্র কৈলাশরঞ্জনের স্মৃতি রক্ষার্থে (১৮৬০-১৮৬৫) কৈলাশরঞ্জন মধ্য ভার্নাকিউলার স্কুল প্রতিষ্ঠা। যা আজও রংপুরে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রেখে যাচ্ছে।
পরগনা বাষট্টি (ঘড়িয়ালডাঙা) জমিদার বংশ ঃ- কুড়িগ্রাম জেলার রাজার হাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নের খেতাব খাঁ মৌজায় অবস্থিত ঘড়িয়ালডাঙা জমিদারি প্রাচীন কাগজপত্রে পরগনা বাষট্টি নামে খ্যাত। পরগনা বাষট্টি কোচ শাসনামলে ফতেহপুর চাকলাধীন এলাকা ছিল বলে জানা যায়। মোগলদের রংপুর দখলের পর ফতেহপুর চাকলার ৬২ টি মৌজা বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তালুক নিয়ে একটি আলাদা পরগনার সৃষ্টি হয় বলে এটি পরগনা বাষট্টি নামে অবিহিত।
পরগনা বাষট্টি জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা রতনেশ্বরের বংশধরদের থেকে পরবর্তিতে ক্রয় সূত্রে বা দত্তক সূত্রে এ জমিদারি সাবেক ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছায় অবস্থিত ঘড়িয়ালডাঙা নিবাসি কোন ব্যক্তির নিকট হস্তান্তর হয় বলে এ জমিদারি ঘড়িয়ালডাঙা জমিদারি নামে অভিহিত হয়।
পরগনা বাষট্টি জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা রতনেশ্বরের পিতা রঘুরাম ১৬৭৬ সালের দিকে চাকলা কাকিনার একজন সাধারন কর্মচারি ছিলেন। ১৬৮৭সালে মোগলরা কোচ রাজা মোদনারায়নের (১৬৮২-১৬৯৩) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে রঘুরামের দু পুত্র রতনেশ্বর ও রামনারায়ন মোগলদের পক্ষ নেন। বিনিময়ে রতনেশ্বরকে পরগনা বাষট্টি সহ টেপার জমিদারি প্রদান করা হয়।
রতনেশ্বরের মৃত্যুর পর তার পুত্র রতিনন্দন টেপা জমিদারি কোচ মহারাজার খাস নবিস মহাদেব রায় কে বন্ধক দেন। এভাবে তারা টেপা জমিদারির মালিকানা হারায়।
বাংলা ১৩৫০ সালে বসন্ত রোগ মহামারী আকার ধারন করলে তৎকালিন জমিদার শরৎচন্দ্র রায় চৌধুরী ধ্বংসোম্মুখ জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব এস্টেট ম্যানেজার যামিনী মোহন বসুনিয়াকে অর্পন করে স্বপরিবারে কলকাতায় পাড়ি জমান। প্রাচীনকালে পরগনা বাষট্টির আয়তন ছিল ২৫০ বর্গমাইল। জমিদারি বিলুপ্তির আগে সরকারি জমা ছিল ৪১৫১ টাকা ৭ আনা মাত্র।
টেপা জমিদার বংশ ঃ- রংপুর শহর থেকে ২৩ কিঃ মিঃ দক্ষিনে মহাদেব রায় টেপা মধুপুর গ্রামে টেপা জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পাবনা জেলার কাঁড়াইল গ্রামের একজন বরেন্দ্রীয় কায়স্ত ছিলেন। কোচবিহার মহারাজা রূপনারায়নের তিনি খাস নবিস ছিলেন। পরগনা বাষট্টির জমিদার রতিনন্দন টেপা পরগনা মহাদেব রায়কে বন্ধক দেন। যা তার পুত্র রঘুনন্দনও পরিশোধে ব্যর্থ হলে মহাদেব রায়কে স্থায়ীভাবে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। এভাবেই মহাদেব রায় ক্রয় সুত্রে টেপা জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।
এ বংশের স্বনামধন্য জমিদার ছিলেন শ্রী অন্নদামোহন রায়। তার নামে অন্নদানগর রেল স্টেশন উৎসর্গীকৃত। তিনি কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্নে চাঁদা আদায়কৃত মোট ৭ লক্ষ টাকার মধ্যে নিজে ১ লক্ষ টাকা দান করেন।
ইটাকুমারী জমিদার বংশ ঃ- মোগল অভিযানের প্রাক্কালে ফতেহপুর চাকলার ছয় আনা অংশের অধিকারী নরোত্তম নামক বৈদ্য বংশীয় জনৈক ব্যক্তি কোচবিহার মহারাজার দফতরে একজন কানুনগো ছিলেন। তার পুত্র রঘুনাথ, রঘুনাথের পুত্র সুকদেব নন্দী এবং সুকদেব নন্দীর পুত্র রাজা রায় উক্ত পরগনার জমিদার হন। রাজা রায়ের ৭ সন্তানের মধ্যে দুই জন ছাড়া কারো পুত্র সন্তান না থাকায় ছয় আনা অংশের চাকলা ফাতেহপুর উক্ত দুজন পুত্রের মধ্যে বিভাজন করে দেয়া হয়। প্রথম ভাগ তিন আনা ফতেহপুর যা ইটাকুমারী নামে খ্যাত তা লাভ করেন রাজা রায়ের জ্যেষ্ঠপুত্র শিবচন্দ্র।
ইটাকুমারী ফাতেহপুর পরগনার ৪১৩.৮৮ একর বিশিষ্ট একটি গ্রাম যা পীরগাছা থানা হেডকোয়াটার্স থেকে ৪ মাইল উত্তরে অবস্থিত। শিবচন্দ্রের জমিদারির সময়ে সমগ্র উত্তরবঙ্গে প্রজা বিদ্রোহ চলছিল। তিনি বৃটিশ ইজাহাদার দেবী সিংহের দ্বারা গ্রেফতার হন। বহু টাকার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে জমিদারদের নিয়ে এক সম্মেলন করেন। তারপর শিবচন্দ্র মন্থনার বিদ্রোহী জমিদারনী জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানীর সাথে মিলে দেবী সিংহের অত্যাচার থেকে রংপুরের কৃষক প্রজাদের রক্ষা করেন।
বামনডাঙ্গা জমিদারি ঃ- বামনডাঙ্গা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা রামেশ্বর মোগলদের কাচওয়ারা অভিযানের সময় কোচবিহার মহারাজের দফতরে মুস্তোফীর পদে বহাল ছিলেন। তিনি জমিদারি হিসেবে ফতেহপুর চাকলার আট আনা (অর্ধেক) কোচ মহারাজের নিকট থেকে লাভ করেন যা বামনডাঙ্গা পরগনা হিসাবে খ্যাতি লাভ করে।
বামনডাঙ্গা জমিদার বংশের শেষ জমিদার হিসাবে দুজনের নাম পাওয়া যায় মনীন্দ্র রায় চৌধুরী ও জগৎচন্দ্র রায় চৌধুরী। ১৯৪৫ সালে মনীন্দ্র রায় চৌধুরী রংপুর জমিদার এসোসিয়েশনের সম্পাদক নির্বাচিত হন।
মন্থনা জমিদারি (পীরগাছা) ঃ- রংপুরের পীরগাছা থানা ও রেল স্টেশনের অনতিদুরে অবস্থিত ফতেহপুর চাকলার মন্থনা জমিদার বাড়ি। এ জমিদারের প্রতিষ্ঠাতা অনন্তরাম কোচবিহার মহারাজার একজন কর্মচারী ছিলেন। তিনি (১৭০৩-১৭০৪) সালের দিকে মহারাজা রুপ নারায়নের শাসনামলে রংপুর পীরগাছা এলাকায় একটি ছোট্ট তালুক লাভ করেন। তার নামানুসারে উক্ত তালুকের নামও অনন্তরাম হয়। ১৭১১ সালে মোগল বাহিনী কাচওয়ারা দখলে তৎপর হয়ে উঠলে অন্যান্য কোচ কর্মচারীদের মতো অনন্তরামও মোগল পক্ষে যোগদান করে মন্থনা জমিদারিতে তার পুর্ব পদ বহাল রাখেন।
এ জমিদারির অন্যতম শাসক ছিলেন জয়দুর্গা দেবী যিনি ইতিহাসে দেবী চৌধুরানী নামে পরিচিত। তিনি তার জীবদ্দশার অধিকাংশ সময় রংপুরে প্রজা বিদ্রোহের সাথে জরিত ছিলেন। তার নামে বহু গল্প ও কিংবদন্তি এ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে।
ডিমলার রাজবংশ ঃ- ডিমলার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জগৎবল্লভ সেন। আঠার শতকের শুরুতে উরিষ্যার নবাবের অধিনে তিনি একজন উচ্চ পদস্থ্য রাজকর্মচারী ছিলেন। তিনি বাদশাহী ফরমানে বহু জায়গীর লাভ করেন। জগৎবল্লভ সেনের বংশধর হররাম সেন ১৭৫৫ সালে উরিষ্যা থেকে এসে রংপুরের মাহীগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। নবাব আলীবর্দি খান তাকে উত্তরবঙ্গের কতকাংশের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফর নবাব হলে তিনি রংপুরের পার্শবর্তী স্থানের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। এ সময়েই তিনি রংপুরের কার্যিরহাট পরগনার ইজারাদার নিযুক্ত হন এবং ডিমলায় তার কাছারীবাড়ি নির্মান করেন।
ডিমলার জমিদারি দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে বিস্তৃত ছিল। তবে তৎকালিন নীলফামারী মহকুমায় এ জমিদারির বেশ বড় অংশ ছিল। ডিমলা জমিদারির মোট আয় ছিল ২ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকা। এবং সরকারী জমা ছিল সাড়ে ৩৫ হাজার টাকা।
এবংশের খ্যাতিমান পুরুষ জানকি বল্লভসেন, ১৮৬৯ সালে তার বাগান বাড়িতে রংপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং তিনি পৌর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি ১৮৯৪ সালে মাতা শ্যামা সুন্দরীর নামে ঘাঘট নদী থেকে শহরের ভিতর দিয়ে মাহীগঞ্জের বাহির পর্যন্ত দ্বীর্ঘ শ্যামা সুন্দরী খাল খনন করেন। কাছারী এলাকায় শ্যামা সুন্দরী খালের স্মৃতি স্তম্ভটি আজও তার কীর্তির পরিচয় বহন করে।
তাজহাট জমিদারি ঃ- ধারনা করা হয় মোগল সম্রাট ১ম বাহাদুর শাহের সময় (১৭০৭-১২) মোগলদের নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে শিখরা পাঞ্জাব থেকে বাংলায় আসেন। পালাতক শিখদের অন্যতম অধস্তন পুরুষ মান্নালাল রায় রংপুরের মাহীগঞ্জের তাজহাটে আস্তানা গড়েন। পৈত্রিক পেশায় তিনি একজন জুহুরী ছিলেন এবং সে সময় মাহীগঞ্জের তাজহাটে উক্ত ব্যবসায়ে প্রচুর অর্থ উপার্যন করেন। মনিমুক্তা খচিত বহু দামি দামি ’’তাজ’’ (টুপি) বিক্রির জন্য সেখানে হাট বসত বলে মাহীগঞ্জের উক্ত জায়গাটি পরবর্তিতে তাজহাট নামে খ্যাত হয়। ১৭৭০-৯০ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক ডামাডোলে রংপুরের আর্থসামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে। এমতাবস্থায় ইজারাদারদের অত্যাচারে সরকারি রাজস্ব প্রদানে জমিদারের অপারগতা সবকিছু মিলিয়ে যে অবনতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা মান্নালালের জন্য সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে। মহাজনী ব্যবসায় উচ্চ সুদে জমিদারদের টাকা ধার দিয়ে অল্প দিনেই তিনি এতো বেশি অর্থ উপার্যন করেন যে তা ব্যয় করার জন্য রংপুর সহ পার্শবর্তী জেলায় জমিদারি কিনতে শুরু করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্থের কুফলে বহু নিলামী সম্পত্তি তিনি ক্রয় করে উনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে রংপুরে একজন প্রভাবশালী জমিদার হিসাবে খ্যতি লাভ করেন।
তাজহাট জমিদারি রংপুর,দিনাজপুর,বগুড়া ও পুর্নিয়া জেলায় বিস্তৃত ছিল। তবে বেশি ছিল রংপুর জেলার ১০টি থানায়।
এ বংশের শেষ জমিদার গোপাল লাল রায়। তিনি ১৮৯৭ সালে বর্তমান রাজবাড়িটি নির্মান করেন। যা উত্তরবঙ্গে একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্তিÍক নিদর্শন। রংপুর কারমাইকেল কলেজে গোপাল লাল হোষ্টেল এবং জি এল রায় রোড় তার অর্থে নির্মিত।
নলডাঙ্গা জমিদারি ঃ- নলডাঙ্গা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা কাশীনাথ লাহিড়ী উনিশ শতকের সত্তর দশকে কোচবিহার রাজ্য প্রশাসনে একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি ছিলেন। তিনি রাজ্যের সংকট মুহুর্তের সুযোগে রাণীর আস্থাভাজনে পরিনত হন। এবং বহু ব্রাক্ষোত্তর ভূমি নিজ নামে বেনামেতে লাভ করেন। কাশীনাথ লাহিড়ী যে সমস্ত ভূমি বরাদ্দ নিয়েছিলেন তার অধিকাংশই ছিল রংপুর অঞ্চলে অবস্থিত কোচবিহার রাজ্যের জমিদারি সমুহের এলাকায়। এছাড়া ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনের কুফলে সময় মত সরকারি রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ জমিদারদের নিলামকৃত তালুকও কাশীনাথ ক্রয় করে এক বিড়াট জমিদারি স্থাপনের পটভুমি তৈরি করেন। উনিশ শতকের সূচনালগ্নে কাশীনাথ লাহিড়ী তার নব প্রতিষ্ঠিত জমিদারির হেডকোয়াটার্স রংপুরের নলডাঙ্গায় স্থাপন করেন।
বাহারবন্দ পরগনা ও কাশিমবাজার জমিদারি ঃ- কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণী গ্রাম রাজা রঘুনাথ রায়ের সময় থেকে বাহারবন্দ জমিদারির প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। প্রাচীনকালে এ পরগনা জঙ্গলে আবৃত ও স্বল্প বসতিপুর্ন জমিদারি ছিল। তবুও রাজা রঘুনাথের সময় এটির সরকারি জমা ছিল ৮৪ হাজার টাকা এবং মোট রাজস্ব আদায় ছিল তিন লক্ষ টাকার মত। মহারাজ প্রাণ নারায়নের রাজত্বকালে (১৬৩২-৬৫) কোচ রাজ্যের দক্ষিনে বাহারবন্দ,তাজহাট,বাকদুয়ার,বড়িতলা নামক স্থান সমুহের এবং একটি সৃদৃঢ় বাঁধ বা আইলের উল্লেখ পওয়া যায়। রাজ্যের কিয়দংশ উক্ত বন্দ বা বাধেঁর ভিতরে অবস্থিত হাওয়ায় ভিতর বন্দ ও কিয়দংশ বাইরে থাকায় বাহারবন্দ নামে খ্যাত। সে সময় বাহারবন্দ পরগনা ৫ চাকলা ৫৫ পরগনা ও ভিতরবন্দ ১২ পরগনায় বিভক্ত ছিল। যার আয়তন ছিল ৬ হাজার বর্গমাইল।
বৃটিশ শাসনের সুচনায় বাহারবন্দ পরগনা কাশিমবাজার মহারাজা কান্তনন্দির কাছে হস্তান্তরিত হয়ে যায়। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার কাশিমবাজার কুঠি আক্রমনের সময় কান্তনন্দি ওয়ারেন হেস্টিংসকে আশ্রয় দেন। ১৭৭২ সালে হেস্টিংস কোম্পানির গর্ভনর নিযুক্ত হলে তার প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। তিনি বাহারবন্দ পরগনা রানী ভবানীর কাছ থেকে বলপূর্বক নিজ ছোট ভাই বিশেন নন্দির নামে ইজারা গ্রহন করেন। শুধু তাই নয় বাংলার বিভিন্ন জেলায় লাভজনক পরগনা গুলো নিজ ছেলে ও ছোট তিন ভাইয়ের নামে ইজারা গ্রহন করেন। যার তৎকালিন সরকারি জমা ছিল ১৪ লক্ষ টাকা। কাশিমবাজার এটেস্ট বাহারবন্দ পরগনা ইজারা নেয়ার পর বাহার বন্দ জমিদারির প্রশাসন কেন্দ্র ধামশ্রেণী থেকে উলিপুরে স্থানান্তরিত হয়।
মাহীগঞ্জ গিরি গোসাঞী এস্টেট ঃ- মাহীগঞ্জ গিরি গোসাঞী এস্টেটের প্রতিষ্ঠাতা শিতল গিরি বিহার অথবা উত্তর ভারতের গিরি সম্প্রদায়ের শৈব সন্নাসী শাখার মানুষ ছিলেন। কাকিনার জমিদার রাজা রামনারায়নের নিকট থেকে ১১৪০ বঙ্গাব্দে নীলফামারীর গয়াবাড়ি পরগনার মদনপুর তালুক লাখেরাজ হিসাবে লাভ করেন। এবং সেখানে শিতলশ্বের শিব বিগ্রহ স্থাপনের মাধ্যমে এক মন্দির স্থাপন করেন। পরবর্তি সময়ে তিনি উক্ত পরগনার আরও কয়েকটি তালুক ক্রয় করে দেবোত্তর এস্টেটের ভিত্তি মজবুত করেন। তার সিনিয়র শিষ্য রামহেডগিরি গয়াবাড়ি, ডিমলা ও জলঢাকা এলাকায় আরো কয়েকটি তালুক ক্রয় করে উক্ত এস্টেটের আয়তন বৃদ্ধি করেন। তিনি গয়াবাড়িতে একটি আশ্রম নির্মান করেন। এভাবে গয়াবাড়ি গোসাঞী এস্টেটের প্রধান কার্যালয়ে পরিনত হয়। রামহেডগিরি ১২৪৭ বঙ্গাব্দে রংপুরের মাহীগঞ্জে তার জমিদারির প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন।
মহারাজ শৈলেন্দ্র গিরির সময়ে বগুড়ার শেরপুর গিরি গোসাঞীর মালিক লক্ষন গিরি (১৮৭০-৭৫) উত্তরাধিকার বিহীন ভাবে মারা গেলে উক্ত এস্টেট মাহীগঞ্জ গোসাঞী এস্টেটের আওতাভুক্ত হয়।
পায়রাবন্দ জমিদারি ঃ- রংপুর শহর থেকে ৮ মাইল দক্ষিনে ঘাঘট নদীর পারে পায়রাবন্দ একটি আতি প্রাচীন জনপদ। রংপুর কামরুপ রাজ্যের শাসনাধীন থাকা কালীন কামরুপ অধিপতি রাজা ভবদত্তের কন্যা পায়রাবতীর নামানুসারে এ জনপদের নামকরন করা হয়। এ জমিদার বংশের ইতিহাস পুরোটাই ধোয়াচ্ছন্ন। তবে এর শেষ জমিদার জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের। যার কন্যা উপমহাদেশের নারী জাগরনের অগ্রদুত মহিয়সী বেগম রোকেয়া। কিভাবে তাদের পূর্ব পুরুষ এই জমিদারির মালিক হয় তা নিয়ে ঐতিহাসিক মতবিরোধ রয়েছে।
দেওয়ানবাড়ি জমিদারি ঃ- দেওয়ানবাড়ি একটি ছোট্ট জমিদারি যা উনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা নৃসিংহ মজুমদার পশ্চিমবঙ্গের মালদাহ জেলার শিবগঞ্জ থানার পুশুরিয়া গ্রামের অধিবাসি ছিলেন। তিনি ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য রংপুরে আসেন। নিজ যোগ্যতা তাকে রংপুর কালেক্টরে ভালো চাকরি পেতে সাহায্য করে। অল্প দিনেই তিনি সেরেস্তাদার পদ লাভ করেন। তখন সেরেস্তাদারেরা দেওয়ান নামে পরিচিত ছিল বলে নৃসিংহ মজুমদার দেওয়ানজি নামে বেশি পরিচিতি লাভ করেন।
দেওয়ান নৃসিংহ অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর অর্থের মালিক হন যা দ্বারা তিনি বহু নতুন নতুন তালুক ক্রয় করেন। খাজনা বাকি পরার অজুহাতে বহু নিলামি তালুক অল্প দামে ক্রয় করেন। তালুকগুলোর অধিকাংশই নীলফামারী অঞ্চলে ছিল।এভাবে বহু বিচ্ছিন্ন ও ক্ষুদ্র তালুক তাকে মোটামুটি একজন উঠতি জমিদারে পরিনত করে। তিনি বর্তমান রংপুর শহরে অবস্থিত নওয়াব গঞ্জ এলাকায় একটি জমিদার বাড়ি নির্মান করেন যা আজও দেওয়ান বাড়ি নামে পরিচিত।
শেষকথা ঃ- ইতিহাস তথ্য ও উপাত্তের উপর ভর করে গড়ে উঠে। রংপুর অঞ্চলের জমিদারের ইতিহাস তেমন বিষদভাবে কোথাও নেই। রংপুর জেলা ও আশপাশের জেলাগুলোর উপর রচিত ইতিহাস গ্রন্থে জমিদার অধ্যায়টি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে আলোকিত হয়েছে।
অধিকাংশ লেখক একজন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। কোন কোন গ্রন্থে (যেমন- রংপুর জেলার ঐতিহাস-মোয়াজ্জেম হোসেন সম্পাদিত; নীলফামারী জেলার ইতিহাস-মনি খন্দকার সম্পাদিত) তার প্রবন্ধেই জমিদারি অধ্যায় শেষ হয়েছে। তিনি আমাদের কারমাইকেল কলেজ ইসলামের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মনিরুজ্জামান। যিনি রংপুরের জমিদারির উপর গবেষনা করে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেছেন। তাই রংপুর অঞ্চলের জমিদারদের উপর কিছু লিখতে গেলে তার স্বরনাপন্য হওয়ার বিকল্প নেই। এই প্রবন্ধটিও অনেকটা তাঁর রচিত “রংপুরের ইতিহাস” গ্রন্থের উপর ভর করে রচনা করা হয়েছে। সময় স্বল্পতায় খান চৌধুরী আমানত উল্লাহর কোচবিহারের ইতিহাস,মো ঃ লুৎফর রহমানের রংপুর জেলার ইতিহাস সহ বহু প্রয়োজনীয় গ্রন্থ পাঠের সুযোগ হয়নি। সব মিলিয়ে রংপুর অঞ্চলের জমিদারের উপর ইতিহাস রচনা অনেকটা সময় সাপেক্ষ ও আরও গবেষনার বিষয় বলে মনে হয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১। রংপুর জেলার ইতিহাস-মোয়াজ্জেম হোসেন সম্পাদিত
২। ঘোড়াঘাট উপজেলার অতীত ও বর্তমান- আব্দুল আজিজ
৩। রঙ্গপুর-রংপুর, ইতিহাস থেকে ইতিহাসে- মোস্তফা তোফায়েল
৪। কুড়িগ্রাম জেলার ইতিহাস- মোঃ রশিদুল হাসান
৫। বৃহত্তর রংপুরের ইতিহাস- মোস্তফা তোফায়েল হোসেন
৬। নীলফামারী জেলার ইতিহাস- মনি খন্দকার সম্পাদিত
৭। রংপুরের ইতিহাস- ড. মুহম্মদ মনিরুজ্জামান।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge