সোমবার, ১৭ Jun ২০২৪, ০৩:৫১ অপরাহ্ন

নূরুন্নাহার বেগম এর গল্প ভালোবাসায় নীল পদ্ম

নূরুন্নাহার বেগম এর গল্প ভালোবাসায় নীল পদ্ম

নূরুন্নাহার বেগম এর গল্প ভালোবাসায় নীল পদ্ম

এক গাল হাসি দিয়ে রফিক সামনে এসে দাঁড়াল ৷ অন্যদিন বড়জোড় একটা সালাম দিয়ে দূর দিয়ে হেঁটে চলে যায় ৷ কবে যেন কার কাছে জেনেছি কলেজ রোডে ওর বাসা ৷ আরো জেনেছি ছেলেটা পড়াশুনায় ভালো ৷ কিছুুদিন আগে ওর বাবা কলিম স্ট্রোক করে ৷ ওর মা সহ ওরা দুই ভাই অসহায় অবস্থায় পড়ে যায় ৷ অনেক অল্প বয়সে ওর বাবার সাথে মায়ের বিয়ে হযে়ছিল ৷ তখন সাকুল্যে ওর মায়ের বয়স চল্লিশ পেরোয়নি ৷ একে ওকে জিজ্ঞেস করে কতটুকুই— বা জানা যায় ৷ নেহায়েতই ভাগ্য বলে কথা ৷ হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ অতিক্রম করেছি ৷ এ পাড়াতেই ওদের বাড়ি ৷ কোমর বাঁকানো আঁকা বাঁকা পথ ৷
পুরো শহর এখন এ অঞ্চল ৷ শহরের যে জায়গাগুলো পানিতে বছরের প্রায় আট মাস ডুবে থাকত সেগুলো এত চড়া দামে কেনার সাধ্য ক ‘জনের হয়? রাতারাতি পানি কিনে মানুষ মাটি ভরাট করে বিশাল বিশাল বিল্ডিং বানিয়ে ফেলেছে এক্কেবারে ৷ এখন কত্ত গাড়ি আসে, নানা কেসমের হকার হাঁকে, রাস্তার পাশে দোকানীরা পসরা সাজিয়ে বিক্রি করে ৷ ছবির মত অসংখ্য বাড়িঘর রাস্তার দু ‘পাশে ৷ স্কুল, কলেজ,অফিস, মার্কেট বদলে দিয়েছে এখানকার চেহারা ৷ পলিদের বাড়িটা ঠিক কোনদিকে হবে কিভাবে জানব ৷ রাস্তার পাশে বোবা গাছগুলো দাঁড়িয়ে ৷ কেউ কি চিনবে আমার পলিকে ৷ ও যে আমার কতটা আপন কি করে বোঝাই ৷ এপাশে ওপাশে দেখি নানান রকম স্বাস্থ্যকর সব গাছগাছালি ৷ সামনে এগুতেই নান্দনিক একটা বাড়ি চোখে পড়ল ৷ বাড়ির মালিক সম্ভবত খুব সৌখিন হবেন ৷ বাড়ির সামনে খোলা জায়গা ৷ কিছু রঙিন খেলার সরঞ্জাম ৷ দোলনা, হেলনা বেঞ্চ সাজানো ৷ চারপাশটা সবুজ ৷ বাহারি ফুলের সমারোহ ৷ হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে সেসব ৷ ফুলের গাছের নাম সেঁটে দেয়া ৷ বাতাসে সাঁতার কেটে শিশু, যুবা সহ সব শ্রেনীপেশার মানুষ এখানে অনায়াসে কাটিয়ে দেবে দুদন্ড ৷ পাথরে খোদাই করে বাড়িটির নাম লেখা “স্বপ্ননীড়৷ “
এখানে বোধহয় আজ বৃষ্টি হয়েছিল ৷ চারদিকে সতেজ সজীব চকচকে ভাব ৷ টাকা আর রুচি থাকলে কিনা হয় ৷ গাছের নামগুলো জানার গোপন ইচ্ছায় একটু দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম ৷ সব শেষ করতে পারা গেল না ৷ কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত হয় ৷ বেনী দুলিয়ে ডাগর চোখে একটা মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “খালাম্মা আপনি এখানে কতক্ষন? ” তোমার নাম কি মা ? আমি কি তোমাকে চিনি? আমি তো পলির বান্ধবী রিনা ৷ আপনি আমাকে চিনতে পাচ্ছেন না? বিকেলের রোদ শুয়ে পড়েছে তখন ৷ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রিনাকে জড়িয়ে ধরলাম ৷ বলতো মা পলি কেমন আছে এখন?
পলি, রিনা দুজনই একসময় আমার কাছে কবিতা আবৃত্তি ক্লাসে ভর্তি হলো ৷ ক্লাসে দশ জন ছাত্রী ৷ ওরা দুজন সহপাঠী ৷ আমার বাসার একটা রুমে আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র খুললাম ৷ বেশ সারা পেলাম ৷ নীলু আমার প্রিয়বান্ধবী ৷ এক সাথেই পড়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৷ এই প্রথম নীলু আমার বাড়িতে ওর মেয়েকে নিয়ে এল ৷ একই শহরে থাকি ৷ কারো বাসায় কেউ যাই না ৷ মাঝেমধ্যে সেল ফোনে যা কথা হয় ৷ বাইরে খানিকটা দমকা বাতাস বইছিল ৷ নিমগাছটা থেকে বেশ কয়েকটা শুকনো পাতা উড়ে এসে পায়ের কাছে লুটোপুটি খাচ্ছিল ৷ নীলু চলে যেতে চাইলে বাধা দিয়ে বললাম আরে যাচ্ছিস কেন ? এতদিন পর দেখা চা না খেয়ে যাবি— তা কি করে হয় ? মেয়েকে নিয়ে এলাম, এরপর তো আসতেই হবে ৷ সময় বুঝে তখন চা কেন সঙ্গে আরো কিছু চলবে ৷
বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় আমি ৷ এই আমি প্রজাপতির মত ছুটেছি, দোয়েল পাখির মত লাফিয়ে বেড়িয়েছি ৷ এজন্য মায়ের কত বকুনি খেয়েছি ৷ আব্বাও বলেছে জাহেদা তোমার মেয়েকে একটু সামলে চলতে বলো ৷ রান্না বান্না শেখাও— পরের ঘরে গেলে কেউতো বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে না ৷ কেন মেয়েতো লেখাপড়া শিখছে ৷ বসে তো আর থাকবে না ৷ চাকুরি করবে ৷ দিন এমনি চলে যাবে ৷ জানোতো যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ ৷ চিরকাল তো আর বেঁচে থাকব না যে সব দু: খ কষ্ট দেখে যেতে পারব ৷ কাজেই মেয়েদের সব পরিস্থিতি সামলে নেবার মত যোগ্যতায় তৈরি করতে হয় ৷ তুমি সবসময় একটু বেশি— ই ভাব৷ দিনতো আপন গতিতেই চলে ৷
মনে মনে পলিকেই খুঁজছি ৷ ও আমার কাছে এসে অনেক কেঁদেছিল একদিন ৷ ওর আবৃত্তির কন্ঠ অনেক সুন্দর ৷ চটজলদি সব রপ্ত করতে পারে ৷ আকাশে শ্রাবণ মাসের জ্বলজ্বলে চাঁদ ৷ পুকুরজলে চাঁদের আলো ৷ পলি ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরে রফিককে ৷ স্বপ্ন বদলে যায় পলির ৷ আগে নিজেকে নিয়ে ভাবত এখন রফিক এসে হৃদমাঝারে অনেকখানি জায়গা জুড়ে নিয়েছে ৷ কত আনন্দ— বেদনার সুখস্মৃতি ওর সমস্ত হৃদয় জুড়ে ৷ সবার মত ঘর বাধার স্বপ্ন দেখে পলি ৷ সামান্য দু ‘লাইনের একটা চিঠি ওর সব আশা, ভরসা, পরম নির্ভরতার জায়গা গুড়িয়ে দিল ৷
প্রিয় পলি,
প্রশ্ন করোনা কেন লিখছি তোমাকে ৷ ভালোবাসার প্রান্তছুঁয়ে তোমাকে নিয়ে রচিত আমার “স্বপ্ননীড় ” অসম্পূর্ণ— ই রয়ে গেল ৷ ডাক্তার বলেছে আমি কোলন ক্যান্সারের পেসেন্ট ৷ জানিনা সুস্থ হতে পারব কিনা ৷
আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমার জন্য রেখে দিলাম ৷
তোমার রফিক ৷
পলি নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অভিভাবকদের মতামত অগ্রাহ্য করতে পারেনি শেষ অব্দি ৷ নতুন জীবনসাথীর হাত ধরে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিল ৷ আগের আমিত্বকে সঁপে দিয়েছে দীপের কাছে ৷ সংসারের যাঁতাকলে দুই থেকে চার এখন পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৷ আমার ফোন নং পলির জানা ছিল ৷ বিদেশ থেকে ফেরত এসেই জানিয়েছিল আমাকে ৷
প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল মেয়েটা আছে তো তেমন ৷ সারাক্ষন মুখে লেপ্টে থাকা হাসিটা ? জলতরঙ্গের মত শব্দতোলা হাসিটা ? চারদিকে কুয়াশার মত আচ্ছন্ন হয়ে আছে মেঘমালা ৷ আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি ঝরবে এখুনি ৷ আমাকে কাছে পেয়ে পলি ভুলে গিয়েছিল কাঁদতে ৷ তারপরেও জিজ্ঞেস করেছিল, “সবাই কেমন আছেন? ” এরমধ্যেই ওর অনেক প্রশ্ন ৷ খোলা জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করছে তখন ঠান্ডা শীতল বাতাস ৷

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge