বৃহস্পতিবার, ২০ Jun ২০২৪, ১০:২৬ অপরাহ্ন

দেশে ফেরা-কাজী সালমান শীশ

দেশে ফেরা-কাজী সালমান শীশ

‘আচ্ছা ভাই, এখানে এত সুযোগ সুবিধা থাকতে আপনারা কেন দেশে ফিরে যাচ্ছেন?’
এই প্রশ্নের উত্তর কি হতে পারে আমার জানা নেই। তবে গত দশ দিনে ডালাসের বাংলাদেশী কমিউনিটির দাওয়াতে অন্তত পঞ্চাশবার এর উত্তর দিতে হয়েছে। প্রথম প্রথম একই কথা বলতাম। পরে দেখলাম বিষয়টা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে, তাই মানুষ বুঝে একেকজনকে একেক জবাব দিতে থাকলাম।
আমি সাদমান আহমেদ। বাংলাদেশে একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম ও মিডিয়া স্টাডিজ পড়াই- ফিল্ম বানাতে পারি না বলে। আমার বউ সোহানা ডালাসের নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পি.এইচ.ডি. শেষ করেছে সদ্য। বউ ও ৯ বছর বয়সী কন্যা মিমিকে নিয়ে আমি ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি। আগামী পরশুদিন আমাদের ফ্লাইট। ওরা প্রায় তিন বছর পর দেশে ফিরছে। আমি গত পাঁচ বছর আমেরিকা যাওয়া-আসার মধ্যে ছিলাম। কখনোই টানা দুই মাসের বেশি সেখানে থাকিনি। বাংলাদেশ থেকে আরো অনেকে এখানে মাস্টার্স ও পি.এইচ.ডি. শেষ করেছে বা করেনি, কিন্তু স্থায়ীভাবে এদেশে থেকে গেছে। ৬০-৬৫ জনের বিশাল বাংলাদেশী স্টুডেন্ট কমিউনিটির মধ্যে সোহানাই একমাত্র মানুষ যে তল্পিতল্পা গুছিয়ে দেশে ফিরে আসছে। ব্যাপারটায় আমি কিছুটা বিব্রত কারণ তাকে আমেরিকা ত্যাগ করতে হচ্ছে অনেকটা আমার জন্য। আমার কখনো ইচ্ছা করেনি প্রবাসী হয়ে জীবন কাটাতে।

শিশিরের প্রশ্নের আমি উত্তর দিলাম।
-দেশে বাবা-মা থাকেন। উনাদের দুইজনের বয়সই সত্তরের উপর। আমি একমাত্র ছেলে। আমি চাই জীবনের শেষ সময়টা তাদের সাথে কাটাতে।
-কি বলছেন ভাই শেষ সময়! সত্তর একটা বয়স হল? এখানে মর্নিং ওয়াকে যত ওল্ড পিপল দেখেন তাদের সবার বয়সই সেভেন্টি প্লাস। আপনি উনাদের ডালাসে নিয়ে আসেন। কি করবে ডার্টি দেশে থেকে? আর পলেটিক্সের যা অবস্থা!
সবই ঠিক ছিল কিন্তু শিশির লোকটার ‘ডার্টি দেশ’ কথাটা সহ্য হল না। বুঝলাম কথার তালে তালে মনের কথাটা বলে ফেলেছে। ডার্টি দেশ মানে ডার্টি বাংলাদেশ! একজন ৩০-৩২ বছরের লোকের মুখে এই কথা আসে কিভাবে! দুইদিন পর আমরা দেশে ফিরে যাব। এর মধ্যে সবার সাথে ভালো আচরণ করব ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু তার কথাটা চট করে মাথা গরম করে দিল।
-ডার্টি দেশ বলতে?
-আই মিন… এত পলিউশন, নয়েজ, লোকজন মারামারি করে, ভিক্ষুকে ভরা রাস্তাঘাট, ভ্যাপসা গরম আর পলেটিক্স তো ডার্টিই।
-হু। তাই বলে দেশ ডার্টি? আমেরিকা কি? আপনি জানেন আমেরিকার পলেটিক্স কত নোংরা? মিডিল ইস্ট থেকে শুরু করে কত দেশে এরা যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখেছে! কত লাখ লাখ শিশু হত্যার সাথে এরা ডাইরেক্টলি বা ইনডাইরেক্টলি জড়িত!
-হতে পারে, বাট ইউ আর রিয়েক্টিং টু মাচ। আমি জাস্ট বলতে চাইছিলাম এখানে সুযোগ সুবিধা অনেক বেশি। আর কিছু না।
আমি লোকটার সাথে আর কথা বাড়ালাম না। আরেকজনের বাসায় এসেছি, ওয়ান ডিশ পার্টি হচ্ছে। আমাদের দেশে ফিরে যাওয়াকে উপলক্ষ করেই এই দাওয়াত। এখানে শিশির তার ফ্যামিলি নিয়ে এসেছে দাওয়াত খেতে, আমরাও এসেছি। সে আমার বউয়ের সাথেই ইকনোমিক্স নিয়ে পড়েছে। মাঝপথে পি.এইচ.ডি. বাদ দিয়ে কাজে ঢুকে গেছে। আমি বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরালাম। মাথা গরম করলে চলবে না।
রাত ১১টার দিকে পার্টি শেষ হল। এর মধ্যে শিশির আমার সাথে আর কথা বলল না। আমিও এড়িয়ে গেলাম। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল সারাটা সময়। দাওয়াত শেষে গাড়িতে উঠে নিজেকে মুক্ত মনে হল। আমাদেরকে গাড়িতে করে নামিয়ে দিল আরেক বাংলাদেশী পরিবার। বিদায় দিয়ে ঘরে ঢুকতে রাত ১২টা বেজে গেল।

বাসায় ফেরার পর সোহানা আমাকে জিজ্ঞেস করল শিশিরের ব্যাপারে।
-কি হয়েছিল সাদমান? শিশিরের সাথে কিছু হয়েছে?
-কি আবার হবে?
-না… তোমাদের গম্ভীর হাবভাব দেখে মনে হল।
-বাংলাদেশকে ডার্টি বলছে। তুমি চিন্তা করো এরপর আবার নিজেকে ডিফেন্ড করে!
-আচ্ছা।
-এই রকম লোকদের সাথে তুমি মিশেছ কি করে?
-বাচ্চা নিয়ে একা একা ডক্টরেট করেছি। কত ধরণের লোক যে দেখলাম! তবে শিশির কিন্তু মানুষ খারাপ না।
আমি কিছু বললাম না। সোহানাই আবার শুরু করল।
-দুই টাইপের বাংলাদেশী আছে এখানে। অল্প সংখ্যক লোক আছে প্রগ্রেসিভ, আর বাকি সবই কনজারভেটিভ টাইপের। তারা নিজের ১০ বছরের মেয়েকেও হিজাব পরায়, ছেলেদের সাথে মিশতে দেয় না, ম্যাকডোনাল্ডসে বার্গার খেতে দেয় না, খুঁজে খুঁজে হালাল দোকান বের করে খায়, অন্য ধর্মের লোকদের ঘৃণা করে…
-সাদাদেরও ঘৃণা করে?
-না, তা করে না। ধনী হলে খ্রিস্টান, ইহুদি এইগুলা ম্যাটার করে না। আমাদের দেশের মতই। এরা মনে মনে অ্যান্টি হিন্দু। যাই হোক যে কথা বলছিলাম-কনজারভেটিভ ফ্যামিলির মেয়ে বা ছেলেদের বয়স যখন ১৮ হয়, ইউনিভার্সিটিতে যায়, তখন তারা বেশি উল্টাপাল্টা করে। ডিস্কোতে যায়, ড্রিংক করে, লং ড্রাইভে যায়। এইগুলাকেই লাইফ মনে করে।
-হু আমাদের দেশের মাদ্রাসার ছাত্ররা যখন স্বাধীনতা পায়, তখন যেমন করে।
-একদম তাই। আর অ্যান্টি হিন্দু যে বললাম, ঠিক উল্টাটাও আছে। হিন্দু বাংলাদেশীদের অনেকে আছে অ্যান্টি মুসলিম। আফগান, ইরান, পাকিস্তান এদেরকে উদাহরণ দেয় কিন্তু ঘৃণা করে ঢালাও ভাবে। শুধু কট্টরদের কথা বললাম। এমনিতে বেশির ভাগই ভালো। একটা নিয়মের মধ্যে চলতে হয় তো সবাইকে…
-সবখানেই একই রকম।
-এই জন্য বাংলাদেশকে ‘ডার্টি’ বলা আমাকে একদমই অবাক করছে না। এরা দেশ ছেড়ে এখানে এসেছে আমেরিকাকে সার্ভ করতে। এদের কাছে ডলার হল গড। মায়ের দেশের থেকে যেহেতু আমেরিকা ধনী- তাই মায়ের দেশ ডার্টি আর আমেরিকা হেভেন।
-হু। দুঃখ লাগল। মুখের উপর দেশ নিয়ে একটা বাজে কথা বললে সহ্য করা মুশকিল।
-ফরগেট ইট। অনেক রাত হয়েছে। চলো শুয়ে পড়ি।

দুইদিন কেটে গেল। আজকে বিকালে আমাদের ফ্লাইট। এয়ারপোর্ট বেশ দূরে। আমরা সকাল ৮টার মধ্যে বাসা ছাড়ব। রাতেই সব গুছিয়ে রাখা হয়েছে, তবু টুকটাক কত কিছু যে বাকি থাকে! আমি পেট ভরে নাস্তা করে, কফি খেয়েনিলাম। সোহানা বেশি খেল না। তার মন ভীষণ খারাপ- এতগুলো বছরের চেনা পরিবেশ কষ্ট তো লাগবেই। ৮টা বাজার ঠিক ১০ মিনিট আগে হঠাৎ আমার চোখ পড়ল ড্রইংরুমের মেঝের দিকে। একটা চিঠি পড়ে আছে। খামের ওপর বাংলায় আমার নাম লেখা। চিঠিটা লিখেছে ‘ডার্টি বাংলাদেশ’ বলা শিশির।

প্রিয় সাদমান ভাই,
আপনারা ফিরে যাচ্ছেন দেখে মন খারাপ লাগছে। সোহানা আপা আমাদের বড় বোনের মত ছিলেন, উনি চলে যাচ্ছেন তা ভাবতেই পারছি না। সেই ধাক্কা হয়ত সামলে ওঠা যাবে কিন্তু আপনাদের মেয়ে মিমি বেবির অভাব আমাদের সবাইকে কাঁদাবে। ছোট্ট মিমি দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! বাস্তবতা এরকম। তাছড়া সামনের সামার থেকে আমি ট্রান্সফার হয়ে লস এঞ্জেলাসে যাচ্ছি। আরেক স্টেটে, আরেক বাঙ্গালী কমিউনিটির দেখা পাব। এখানকার মানুষদের সাথে শুধু মাঝে মাঝে নেটে বা মোবাইলে কথা হবে। সোজা কথা যোগাযোগ কমে যাবে। এখানে আরেক স্টেটে থাকা আর দেশে বাইরে থাকা প্রায় একই কথা।

ভাই, একটা বিশেষ কারণে এই চিঠি লেখা। সেইদিন বাংলাদেশকে ডার্টি বলার জন্য আমি মন থেকে ক্ষমা চাইছি। আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে অনেক স্ট্রাগেল করে আমেরিকায় এসেছি। বছরের পর বছর থেকে একসময় নিজের ভাগ্যকে এই দেশের সাথে জড়াতে পেরেছি, ইনকাম করে বাঁচতে পেরেছি। বাংলাদেশে থাকলে সৎ উপায়ে উন্নতি করা সম্ভব ছিল আমার জন্য। তবে হাজারটা সমস্যা থাকলেও আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে দেশে ঘুরে আসি, কিন্তু আমার বাস্তবতায় তা সম্ভব না। আপনি যখন এখানে আসতেন আবার কিছু দিন থেকে ফিরে যেতেন… আমার হিংসা লাগত। মনে হত আপনি ইচ্ছা করলেই এখানে আসতে পারছেন, থাকতে পারছেন, আবার ফিরে যেতে পারছেন। আমার বাস্তবতা একেবার ভিন্ন। একবার দেশে গেলে আর ফিরে আসতে পারব কিনা শিওরিটি নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বছরখানেক আগে। এখানে জব করছি, বেবিদের স্কুল, গাড়ি, ইন্সুরেন্স, প্রিমিয়াম নানান ডালপালা জড়ানো।
চিঠিটা আপনার দরজায় ফেলে এসেছি। আপনি পাবেন কিনা জানি না।  আমাদের প্রবাসীদের দেশপ্রেম ঠিক আপনাদের মত না। আপনার মত আমারো রুট বাংলাদেশ, কিন্তু আমার আবেগ অনেকটা মেশিনের মত। বিশ্বাস করুন আমেরিকায় মেশিনের মত থাকলে ও হুজুগে মাতলে সময়টাকে বেশি এনজয় করা যায়। আমি আপনার লেখা কিছু গল্প ও প্রবন্ধ পড়ে বুঝতে পেরেছি- আপনার অনুমানশক্তি প্রবল। এই চিঠিটা কাগজে লিখতে গিয়ে আমি কান্না আটকাতে পারিনি। অনেক বছর পর বাংলায় কিছু লিখলাম তাই ছেলেবেলার অনেক কিছু মনে পড়ে গেল। আপনারা ভালোভাবে পৌঁছান, নেটে কথা হবে।
কখনো আমেরিকায় আসলে অবশ্যই দেখা করবেন। আমরা কোনোদিন ঢাকায় যেতে পারলে অবশ্যই জানাব।
সোহানা আপাকে শ্রদ্ধা আর মিমিকে আমার ভালোবাসা জানাবেন।
-শিশির ইসলাম

পুনশ্চ: আমার মা মারা গেছেন অনেক বছর হল। কালিঝুলি মাখা, কালো ধোঁয়ায় ঘেরা, ধূসর ঢাকা শহরই আমার মা- যার থেকে অনেক দূরে আমার বসবাস। একদিন নিশ্চয়ই দেখা হবে। ভালো থাকবেন।

চিঠিটা হাতে নিয়ে আমি জানলার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। কিছুক্ষণের জন্য মাথাতেই ছিল না যে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য আমাদের তাড়াতাড়ি বের হওয়া দরকার। ভেবে দেখলাম মানুষ কতই না বিচিত্র! এই সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশীর মনে কতই না ভালোবাসা সুপ্তভাবে লুকিয়ে রয়েছে। চিঠিটা না পড়লে তা কখনোই বুঝতে পারতাম না।
উঠি অনেক দূর পথ পারি দিতে হবে।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge