বৃহস্পতিবার, ২০ Jun ২০২৪, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

দেখার চেষ্টা চক্ষু খুলিয়া:৫-মো. শওকত আলী

দেখার চেষ্টা চক্ষু খুলিয়া:৫-মো. শওকত আলী

দেখার চেষ্টা চক্ষু খুলিয়া-৫
মো. শওকত আলী

ইতোপূর্বে কিছু আকর্ষনীয় স্হাপনা আর স্হান দেখতে গিয়েছিলাম যেগুলো অনেকটা ‘রথ দেখা এবং কলা বেচা’র মতো ছিল। তবে কিছু কিছু দর্শনীয় স্হান দেখেছি যেগুলো দেখতে যাবার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল দাপ্তরিক কোন হেতু। অফিস থেকে আদেশপ্রাপ্ত হয়েছিলাম নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার ‘নীলসাগর’ পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন দেবার জন্য। ২০১৯ সালের অগাস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সম্যবিহারে দীঘিটি পরিদর্শন যাই। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১৭ সালে এ দীঘিটিসহ এর পাড়গুলো সংরক্ষণের কাজ শুরু করেছিল।
উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম গোড়গ্রাম।উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কি.মি দূরে এ ইউনিয়নে ধোবাডাংগা নামে একটি গ্রাম আছে। সেখানেই নীলসাগর দীঘিটি অবস্হিত।


জনশ্রুতি আছে মহাভারতীয় যুগে রাজা বিরাট তার রাজ্যের উত্তরদিকের চারণভূমি সীমানার মধ্যে গো-পালের পানি পানের জন্য একটা বিশাল দীঘি খনন করেছিলেন। তখন এটি ‘বিরাট দীঘি’ নামেই পরিচিত ছিল। বৃটিশ আমলে ডিমলার জমিদার যামিনী বল্লাক সেনের মা বৃন্দারানীর নামে এ দীঘির নামকরন হয় ‘বৃন্দারানীর দীঘি’। তবে স্হানীয় জনসাধারণের নিজস্ব উচ্চারণে এটি পরিচিতি পায় ‘বিন্নার দীঘি’ হিসেবে। বাংলাদেশ আমলে এর একটি পোশাকি সুন্দর নামকরণ করা হয় — ‘নীলসাগর’। স্হানীয়রা এখনও বিন্নার দীঘি বলে। আর পর্যটকসহ বাইরের লোকজনের কাছে এটি নীলসাগর নামেই পরিচিত।
দীঘিটির খননকাল মহাভারতীয় যুগে এরকম যে জনশ্রুতি রয়েছে এর সপক্ষে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়না।
পুরাণে মহাভারতীয় যুগের দেব-দেবীর যেরকম বর্ণনা রয়েছে তারসংগে গ্রীক সভ্যতার সময়কালের একটা সাযুজ্য খুঁজে পায় অনেকেই। তাই মহাভারতীয় যুগকে গ্রীক সভ্যতার সমসাময়িক বলে অনেকে মনে করেন।গ্রীক সভ্যতা খ্রীষ্টের জন্মের আগের কাহিনী। সে বিবেচনায় মহাভারতীয় যুগও সেই সময়কালের হবে। কিন্তু দীঘিটা অতো প্রাচীন বলে পুরাকীর্তিবিদরা মনে করেন না। কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এ পর্যন্ত দীঘির ঘাটের যে অংশটুকু উন্মোচিত হয়েছে সে অংশের স্হাপত্যরীতি,নির্মাণশৈলী, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট ইত্যাদি দেখে ধারনা করা হয় এটি দশম বা একাদশ শতকে নির্মিত। সমস্ত ভারতবর্ষে ঐ সময়ের একই স্থাপত্যরীতি, নির্মাণশৈলী এবং ব্যবহৃত উপকরণের অনেক প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন আবিষ্কৃত হয়েছে। সময়ের বিচারে যদি এটাকে দশম বা একাদশ শতকের কোন এক সময়ে দীঘিটি খনন করা হয়েছে বলে ধারনা করা হয় তাহলেও এর পুরাকীর্তি মূল্য অনেক।
গোটা বরেন্দ্র অঞ্চলসহ উত্তরান্চলে প্রাকৃতিক পানির আধার যেমন নদী-নালা, হাওড়-বাওড় কম থাকায় শাসকশ্রেণি একসময় জনকল্যাণে বিভিন্ন এলাকায় দীঘি,পুষ্কুরণী খনন করেছিলেন। সেগুলোর অনেকগুলোই হারিয়ে গেছে। কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও কিছু কিছু রয়ে গেছে। এর মধ্যে নীলফামারীর নীলসাগর আর দিনাজপুরের রামসাগর উল্লেখযোগ্য।
নীলসাগর দীঘিটির জলভাগের আকার ৩২.৭০ একর।আর এর চারিদিকের পাড়ের অংশসহ পরিমাপ করলে এর আয়তন প্রায় ৫৪ একর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দীঘিটির পূর্ব,পশ্চিম আর দক্ষিণ দিকের পাড় তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে উৎখনন করে প্রাচীন তিনটি ঘাটের সন্ধান পেয়েছে। তাদের ধারনা উত্তর প্রান্তেও অনুরূপ একটি ঘাট রয়েছে। উন্মোচিত ঘাটগুলো মাটির নীচে শতকের পর শতক চাপা পড়ে ছিল। তবে উৎখননের পর অনেক অংশ আদিরূপে পাওয়া গেছে যদিও কিছু কিছু অংশ অবিকৃত পাওয়া যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন কাজ শেষ হলে পুরো এলাকার স্হাপনা কাঠামো উন্মোচিত হবে।
ঘাটগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো দীঘিতে নামার জন্য সিঁড়ি নয় বরং র‍্যাম্প এর মতো ঢালু করে দীঘিতে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এগুলো বেশ প্রশস্ত এবং পার্শ্বরেলিং অনেকটা দেয়ালের মত কিছুটা উঁচু করা। নির্মাণশৈলী অত্যন্ত সুন্দর। র‍্যাম্প এর মতো অংশটি দীঘির ভিতরে অনেকাংশে নেমে গেছে এবং ধারনা করা হয় দীঘির মধ্যখানে হয়তো ইদিরার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
দীঘির পাড় বেশ উঁচু করে মাটি দিয়ে বাঁধা ছিল। এর কিছু এখনও অক্ষত রয়েছে। একপার্শ্ব খনন করে পানি নিষ্কাশনের সুন্দর ড্রেনেরও নির্দশন পাওয়া গেছে।


শীতকালে দীঘিতে প্রচুর পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে বলে শুনেছি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই দীঘির কাছাকাছি একটি প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর নির্মাণ করেছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো জেলা প্রশাসন এর একদিকে একটি শিশুপার্ক নির্মাণ করেছে। শীতকালে এখানে পিকনিক করা হয়। মাইকের শব্দ, প্যাকেটজাত নানারকম খাদ্যদ্রব্যের মোড়কের কাগজ,পলিথিন ইত্যাদির কারণে দীঘি এবং দীঘিপাড়ের নৈসর্গিক পরিবেশ অনেকটাই বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি শব্দদূষণ এবং পিকনিকে আগত নানাধরনের।অংশগ্রহণকারীর কারনে পরিযায়ী পাখির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge