মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ন

দেখার চেষ্টা চক্ষু খুলিয়া-১৪ মো. শওকত আলী

দেখার চেষ্টা চক্ষু খুলিয়া-১৪ মো. শওকত আলী

দেখার চেষ্টা চক্ষু খুলিয়া–১৪
মো. শওকত আলী

আমার শৈশব- কৈশর কেঁটেছে রংপুর জেলা শহরে। এখন এটি বিভাগীয় শহর হলেও যেমন বড় কোন শহর নয় তখনও ওটি আরও ছোট শহর ছিল। যাকে বলে একেবারে মফস্বল শহর। তারপরও কৈশোরে সেই জেলা শহর থেকে তিন কি.মি দূরে অবস্হিত তাজহাট জমিদার বাড়ি মনে হতো দূরের কোন স্হান। কিন্তু সে জমিদার বাড়ি নিয়ে গল্পের কোন শেষ ছিল না। আমি বড় হয়েও শুনেছি এমন একটা গল্প বা ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।

সময়টা জেনারেল এরশাদের শাসনামল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে মাঝে মাঝে রংপুরে যেতাম। একসময় এরশাদ সাহেব উচ্চ আদালত বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি অন্য ক’টি জায়গার সঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি বেন্চ রংপুরে স্হাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। গরীবের সংসারে টানাপোড়েনের মতই রংপুর শহরে হাইকোর্ট ডিভিশনের জন্য উপযুক্ত ভবন তখন ছিল না। তাই তাজহাট জমিদার বাড়িকে আদর্শ মনে হয়েছিল। হাইকোর্টের জন্য ভবন সংস্কার করতে গিয়ে ঐ ভবনের তালাবদ্ধ একটি কক্ষ খুলে সিন্দুকে নাকি অনেক মূল্যবান অলংকার পাওয়া গিয়েছিল। যেগুলির একটি বড় অংশ নিয়মমাফিক যাদের উপস্থিতিতে খোলার কথা ছিল তাদের মধ্যে জেষ্ঠ্যতম জন নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। তারপর পারিবারিক সমস্যার কথা জানিয়ে পরের ক’দিন ছুটি নিয়ে অন্য জেলায় তার নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। ঐ ঘটনা বা গল্পটি অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতার কারণ হচ্ছে যিনি তাজহাট জমিদার বংশের গোড়া পত্তন করেন তিনি আদতে ছিলেন একজন স্বর্ণকার। মান্নালাল রায় ছিল তার নাম। ভাগ্যলক্ষ্ণীর ‘বর’ পাবার আশায় ভারতের পান্জাব থেকে এসে রংপুরে বসবাস শুরু করেন। তিনি নিজেকে শিখ ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে রুপান্তরিত করেন বলে কথিত আছে। তবে ধর্মান্তরিত হবার ঘটনা বা কত সালে তিনি রংপুরে এসেছেন এগুলো যাচাইয়ের তেমন নির্ভরযোগ্য কোন সুত্র এখনো পাওয়া যায় নি।

ঐ সময়ে মাহিগন্জ ছিল রংপুর শহরের কেন্দ্রস্হল। এই মাহিগন্জের নিকটবর্তী একটি স্হানে মানিকলাল তার ডেরা পেতেছিলেন। তার নাকি একটি মূল্যবান দৃষ্টিনন্দন ‘তাজ’ অর্থ্যাৎ মাথার মুকুট ছিল। রত্নখচিত তার ঐ তাজের খ্যাতির কারণে এলাকাটির নামকরণও হয়ে যায় তাজহাট। মান্নালাল রায় তার জীবদ্দশায় অনেক ভূ-সম্পত্তির মালিক হন এবং ক্রমশঃ রংপুরের অনেক এলাকা তার নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসেন। এভাবেই তিনি জমিদার হিসেবে প্রতিষ্টিত হন।
ঐ জমিদার বংশের এক পুরুষে একজন দত্তক সন্তান ছিলেন গোবিন্দ লাল। তিনি ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে এ জমিদারির উত্তরাধিকার হন। পরবর্তীতে বৃটিশ রাজ থেকে ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘রাজা’ এবং ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে ‘রাজা বাহাদুর’ এবং ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘মহারাজা’ উপাধি লাভ করেন। তার পুত্র মহারাজা কুমার গোপাল রায় যখন জমিদারি গ্রহণ করেন তার আমলেই তিনি জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন। সেটিও বিশ শতকের গোঁড়ার দিকের কথা।
প্রায় ১৬ একর জমির উপর প্রতিষ্টিত এ জমিদার বাড়িটির একটি ব্যতিক্রমী স্হাপত্য নকশা হচ্ছে সম্মুখভাগের মাঝ বরাবর প্রশস্ত একটা সিঁড়ি ক্রমশঃ দোতলায় উঠে গেছে সরাসরি। বিদেশি শ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি এ সিঁড়িটি উপরে উঠে প্রাসাদ ভবনটিকে দুদিকে প্রসারিত করেছে। লোকমুখে জানা যায় যে এ ভবনের কেন্দ্রীয় সিঁড়ির উভয় পার্শ্বে দোতলা পর্যন্ত ইটালীয় মার্বেল পাথরের রোমান দেব-দেবীর মূর্তি দ্বারা সজ্জিত ছিল যেগুলি সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে বা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ভবনটি অনেকটা ইংরেজি বর্ণ ইউ(U) আকৃতির।প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত এবং প্রায় চারতলার সমান উচ্চতা ভবনটির। স্হাপত্য রীতিতে মুগল ঘরনার ধাঁচে তৈরি ভবনটির মধ্যখানের সিঁড়িটি সরাসরি দোতলায় উঠে গেলেও এ সিঁড়ির পিছনদিকে প্রাসাদের নীচতলায় বড় আকারের একটি হলরুম আছে। ভবনের অভ্যন্তরের পুরোভাগের সমস্ত অংশই প্রশস্ত বারান্দাবেষ্টিত। আবার নীচতলা থেকে উপরতলায় উঠার জন্যও রয়েছে দুটো কাঠের সিঁড়ি। পিছনের দিকে একটি গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে।তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সিঁড়িটি বন্ধ রাখা হয়েছে। ভবনটিতে মোট ২২টি কক্ষ রয়েছে।
দোতলার উপরে ভবনটির ছাদের ঠিক মধ্যিখানে একটি বিশাল আকৃতির গম্বুজ রয়েছে। সিঁড়ি থেকে নেমে কিছুটা সামনে মার্বেল পাথরের সুন্দর একটা ফোয়ারা রয়েছে যেটি এখন সম্ভবতঃ নষ্ট। মহারাজা গোপাল রায় তার সৌখিন রানীর জন্য ফোয়ারাটা তৈরি করেছিলেন বলে কথিত আছে ।
এ জমিদার বাড়ি প্রাংগনে ৪/৫টি পুকুর রয়েছে। মূল ফটক থেকে এগিয়ে ভবনটির প্রবেশমুখে দুটি পুকুরে পদ্ম, লাল, সাদা শাপলা এলাকার নান্দনিকতার বাড়তি আকর্ষণ।

১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত অর্থ্যাৎ হাইকোর্ট বেঞ্চ ঢাকায় প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত ভবনটি হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর তাজহাট জমিদার বাড়িকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৫ সাল থেকে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর জমিদারবাড়ির অংশবিশেষ রংপুর জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করছে। জাদুঘরে বেশ প্রাচীন মুর্তিসহ টেরাকোটার শিল্পকর্ম রয়েছে। আরো আছে সংষ্কৃত ভাষায় হাতে লেখা মহাভারত আর রামায়ণের পান্ডুলিপি। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলের কোরআন শরিফও রয়েছে জাদুঘরে।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge