বৃহস্পতিবার, ২০ Jun ২০২৪, ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

তিনটি বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া-রানা মাসুদ

তিনটি বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া-রানা মাসুদ

তিনটি বইয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া
রানা মাসুদ

মফিজুল ইসলাম মান্টু’র স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাসে রংপুর, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক প্রফেসর মো.মোজাম্মেল হক এর ছোটদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং চৌধুরী খালেকুজ্জামান আবহমান গ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন কথাসাহিত্যিক রানা মাসুদ।

শ্রদ্ধেয় মফিজুল ইসলাম মান্টু ভাই আমার অন্যতম পছন্দের একজন মানুষ। দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট এবং সর্বোপরি লেখালেখি ও চিন্তা চেতনায় ব্যতিক্রমবোধ, আধুনিকতা তাঁকে করেছে এক অনন্য ব্যক্তিত্বে।
এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাঁর দুটি ব্যতিক্রম কিন্তু ব্যাপক গবেষণার ফসল এসেছে। একটি হচ্ছে ‘ স্বাস্থ্যসেবার ইতিহাসে রংপুর (এ নিয়ে ইতিপূর্বে সংক্ষিপ্তাকারে রিভিউ দিয়েছিলাম) ও অন্যটি হচ্ছে ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ভাষা-সংস্কৃতির সংগ্রাম ‘।
‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ভাষা-সংস্কৃতির সংগ্রাম ‘ গ্রন্থে বিষয় নির্বাচনে যে ব্যতিক্রম ও অনবদ্যতার পরিচয় দিয়েছেন লেখক, তা আমাকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংস্কৃতির যে একটা বিশাল ভূমিকা ছিল; ছিল অনুপ্রেরণার তা নিয়ে পৃথক একটি গ্রন্থ অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। অবশ্যই অভিনন্দন প্রাপ্য জনাব মফিজুল ইসলাম মান্টুর।
স্নিগ্ধ প্রচ্ছদ প্রথম দর্শনেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বইটি নিয়ে আলোচনা করতে হলে যে ব্যাপক পরিসর ও মেধার প্রয়োজন তার দুটোই আমার অভাব আছে। আমি এই গ্রন্থের বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। আপনারা তাঁর সদ্য প্রকাশিত বই দুটি পড়বেন এবং একজন লেখকের দীর্ঘ পরিশ্রম ও কর্মের ফসলে নিজেরাও সন্ধান পাবেন জানার বিশাল উদ্যানের।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক প্রফেসর মো.মোজাম্মেল হক স্যারের একটা অনন্য গ্রন্থ ‘ছোটদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। আমাদের সন্তানদের তথা ছোটদেরকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে জানাতে এই বইটি একটা সেরা কাজ। স্যার ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু গবেষক হিসেবে বেশ কিছু বই ও নিবন্ধ আমাদের উপহার দিয়েছেন। ছোটদের উপযোগী করে উপস্থাপনের মাধ্যমে এই প্রজন্ম জাতির জনক সম্পর্কে জানতে পারবে সহজেই।
আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে তুলে দেবো এই অনন্য গ্রন্থটি। তাদের জানার জগতকে সমৃদ্ধ করতে সহযোগিতা করবো এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
বইটি বিভিন্ন লাইব্রেরি ছাড়াও রকমারি ডট কমের মাধ্যমে ঘরে বসেই সংগ্রহ করতে পারেন।

আজ এক মহাকাব্যিক বিশালতাকে উপজীব্য করে লেখা আরেক এপিক গ্রন্থের কথা কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আর এর লেখক সুদূরের কেউ নন,আমাদের কাছের, আমাদের অতি পরিচিত শ্রদ্ধেয় চৌধুরী খালেকুজ্জামান। চৌধুরী খালেকুজ্জামানের অসাধারণ দক্ষতা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রত্যক্ষ দর্শন ও দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল এই এপিক গ্রন্থ’ আবহমান’। লেখক তাঁর মুখ ভূমিকায় পাঠককে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে আবহমান ট্রিলজির প্রথম খণ্ড, পাঁচ পর্বের ত্রিস্রোতা এই আলোচ্য গ্রন্থটি। আর একজন লেখকের কত বড় আন্তরিকতা,অধ্যাবসায়, সৃষ্টির প্রতি নিষ্ঠা এবং সর্বোপরি দায়িত্বশীলতার অপরূপ উদাহরণ যোগ্যতা খুঁজে পাই আমরা যখন জানতে পারি একটি উপন্যাসের জন্য একজন লেখকের দীর্ঘ বারোটি বছর সময় লেগেছে। জ্বি এই গ্রন্থটি লিখতে লেখকের বারো বছর সময় লেগেছে। এ ব্যাপারে লেখকের একটা ব্যাখ্যা আছে যে ইতিহাসের প্রতি শতভাগ বিশ্বস্ত থাকতে গিয়ে রচনার গতি শ্লথ হয়ে যায়। আরো আশ্চর্য হয়ে উঠি যখন জানতে পারি ‘এই ভূখণ্ড হঠাৎ করে স্বয়ম্ভূ নয়,এবং এর আদিবাসী মানুষেরা সুদীর্ঘ কালের উত্তরাধিকারের ঐতিহ্যে লালিত’- এমন একটি সিদ্ধান্ত কিংবা সত্য প্রক্রিয়াটিকে যখন অধিকতর জটিল করে তোলে এবং তা স্বত্বেও লেখক তাঁর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন এবং দায়িত্ববোধ থেকে উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে যান। এর ফলে লেখকীয় কৌশল বলা চলে তাঁর এক প্রকার নিজস্বীয়তা কথা সাহিত্যে নবতর রূপ রস,ঢং কিংবা সংঘটন পরিস্ফুটিত হয়। আর তাই প্রতিভাত হয় উদ্ভাসিত চরিত্রের অন্তর্কথন। আর এই অন্তর্কথনেও লেখক সুগভীর কৌশলে ত্রিমাত্রিকতার ব্যবহার রেখেছেন বিপুল পারঙ্গমতার সাথে।
আমাদের এই রংপুর অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক, লোকগাথা, রূপকথা, উপকথা ইত্যাদি বিষয়ে লেখকের বিশাল সমৃদ্ধ জ্ঞানের ভান্ডার শুধু লেখকের মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর রাখে না বরং আমাদের অর্থাৎ একজন পাঠকের জ্ঞানের ভান্ডারকে বিপুল প্রসারিত করে ফিলহাল।
আবহমান ট্রিলজির প্রথম খণ্ড ত্রিস্রোতা পাঁচ পর্বে বিন্যাসিত। কি আছে এই পাঁচ পর্বে ব্যাপ্তিত ত্রিস্রোতায় এ প্রশ্ন স্বভাবতই কৌতূহলী মন আগ্রহী হয়ে ওঠে। মুখ বর্ণনায় অভিযোজিত যে,ব্যক্তিমানুষের আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম-সঙ্কটের উপাখ্যানের সঙ্গে গোটা জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনধারা মিলিয়ে উপন্যাসের ব্যাপ্তিতে জীবন ও সমাজ প্রতিফলিত করার তাগিদ থেকে চৌধুরী খালেকুজ্জামান রচনা করেছেন এপিক বা মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘আবহমান ‘। উপন্যাসে প্রতিফলিত এবং উদ্ভাসিত হয়েছে উনিশ শতকের ষাটের দশকে একটি বিশাল জনপদের মানুষের জীবনের পালাবদল মনে হলেও লেখকের বিপুল জ্ঞান ও মুন্সিয়ানার ফলে এই উপন্যাসে উদ্ভাসিত হয়েছে সেই জনপদের দুইশো বছরের ইতিহাস ও জনসংগ্রাম। মাঝে মাঝে পাঠক মন ভাবিত হতে পারে এ তো ইতিহাসের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত এক মহীরূহ। তবে কেন উপন্যাস। এখানেই একজন শক্তিশালী লেখকের শক্তির পরিচয় প্রস্ফুটিত হয়। একাত্তরের মহান মুক্তি-সংগ্রামে জেগে ওঠা জাতি যে দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বহন করেছে উপন্যাসের আকারে তার রূপদান ব্যাতীত সেই বিশালতা স্পর্শ করবার সুনিপুণ শৈল্পিক প্রচেষ্টার দ্বিতীয় পথ নেই। এক আত্মজ তাগিদ থেকে এই সত্যের অসাধারণ বাঙ্ময় প্রকাশ এই রচনা, এই উপন্যাস।
চৌধুরী খালেকুজ্জামান সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক দীর্ঘ বলা যায়। একজন দক্ষ আমলা থেকে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, দক্ষ সংগঠক, সমাজসেবক এবং সুদক্ষ লেখক, উপন্যাসিক।(তাঁর সম্পর্কে আমার আলোর দ্বীপ সিরিজে বিস্তারিত লেখা আছে) কলেজ জীবন থেকেই লেখালেখির চর্চাটা ব্যক্তি জীবনে ব্যাপক ব্যস্ততার কারণে ব্যাপক পরিসরে তাঁর আত্মপ্রকাশে একটু বিলম্বিত মনে হলেও তা হয়েছে স্মরণীয়। এরকম উপন্যাসের, এরকম সৃষ্টির আত্মপ্রকাশ এক লেখক জীবনে একটাই চির স্মরণীয় হয়ে যায়।
শ্রদ্ধেয় কাইয়ুম চৌধুরীর অসাধারণ শৈল্পিক প্রচ্ছদে সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা থেকে বইটি ২০১১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। সকলকে এই এপিক গ্রন্থটি পড়ার আমন্ত্রণ এবং এর বিপুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge