মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪৫ পূর্বাহ্ন

জমিন আসমান-দিব্যেন্দু নাথ

জমিন আসমান-দিব্যেন্দু নাথ

জমিন আসমান
দিব্যেন্দু নাথ

‘তুমি আছো কি না আছো ভগবান আমার জানা নাই। আমি সাধনে-ভজনে দেখিনি নয়নে, কোথায় তোমায় পাই। তুমি আছো –।’
বাউলা সুরে কম্পিত মাধবপাড়ার মেঠো পথ। এই গান কানে এলে চাষীরা মাথা তুলে তাকায়। সবুজ মাঠে ওরা কাজ করতে এসেছে সেই জৈথাঙ থেকে ভোরে। মাঠে এখন হলুদ আলোর আস্ফালন নেই। তাপদাহে শরীর অবসন্ন; তবুও সবাই চাইছে কাজের পরিমার্জিত রূপটা দিয়ে ফিরতে। কেউ লাঙল টানতে বলদকে হাঁকাচ্ছে, কেউ কাছা-কাটায় কোদাল চালাচ্ছে, কারও কাঁচা আল দ্রুত ভরাট করে নিচ্ছে, আবার কেউ-বা হেঅতের জল জমিতে ফেলছে তাড়াহুড়ো করে। এছাড়াও গিরিশের শিরিষ তলার বাউলের গান নাছোড়বান্দা করে রেখেছে সবাইকে।
বারইগ্রাম থেকে বাউল বোধহয় এসেছেন। সম্ভবত ইন্দুরাইয়ের রথযাত্রা তাঁর মোক্ষম উদ্দেশ্য। ছায়ায় ভরা মাধবপাড়া হয়ে যেতে হয় ইন্দুরাই। ইন্দুরাই গিয়ে ও পথ তিন ভাগে ভাগ হয়েছে। এক ভাগ গিয়েছে পুবে জৈথাঙ পাহাড়ে, আরেক ভাগ উত্তরে নোয়াগাঙ, আরও এক ভাগ গেছে রামনগর । একসময় পথে পিচ ছিল, সংস্কারের অভাবে হাড় বের হয়ে আছে। ত্রিশ-চল্লিশ পরিবারের বসতি নিয়ে গড়ে ওঠেছে আদর্শ মাধবপাড়া। দখিনে অশ্বাখুরাকৃতি জৈথাঙের বহতা নদীর স্রোত কলকল করে সারাবছর। বর্ষায় উন্মাদ নদী ভয়ঙ্কর হলেও রেখে যায় তার তীরে উর্বর পলি। তাতে সারা বছর ফসল ফলিয়ে গাঁয়ের মানুষ বেঁচে থাকে। এই মাধবপাড়ায় আজ এসেছেন বাউল। শুধু পুরুষ নয় ঘোমটা টেনে রমণীরা বেরিয়ে এসেছে ঘাটায় গান শোনে। পার্বতীর ছেলেকে নিয়ে ইমন গেছে গাছতলায়। বিয়ের সাত মাসের মাথায় প্রি-ম্যাচুরেটিতে ছেলে জন্ম হয়েছিল, বলে গিরিশ জানে। লেপার বালতি পেছন বারান্দায় রেখে তাড়াহুড়ো করে পার্বতী যায় পুকুর ঘাটে। ততক্ষণে অনেক চাষিরা চলে এসেছে বাউলের কাছে। গিরিশও হাল ছেড়ে লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মইকাঠি হাতে চলে এসেছে। মাথার ছাতা খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল, কত্তা আপনার স্বরূপ?
ফকির-বাউলের ঠিকানা হয় না বাবাজি। স্বরূপ ত থাকে বৈষ্ণবদের। যদিও আমরা একই ঠিকানার দিশারি, তবে পথ আলাদা আলাদা।
উদাস চেহারা। সদা সমর্পণের ভঙ্গি বাউলের। প্রশস্ত কপালে চন্দনের ফোঁটা মানুষকে শ্রদ্ধাবনত করে। দুয়েকটি তত্ব ছাড়া তেমন পাঠক্রিয়া নেই। বিকারহীন হয়ে গান গায় প্রাণের টানে। গিরিশ বলে,
আইজ দুই-চাইরখান বেশি গান শুনাইয়া যাওন লাগব কর্তা। চিন্তা করইন না যে, সময়ের দাম দিমু।
সময়ের দাম! -মৃদু হাসে বাউল। নিজেই লজ্জা পায় গিরিশ। এবার হেসে হেসে গানে টান দিলেন বাউল।

‘গ্রামে গঞ্জে গান গেয়ে যাই, হাততালি না পয়সা কুড়াই, ফকির ভেবে খাতির করে দশজনায়। আমি মন ব্যাপারী চাই না কড়ি, মন দিয়ে মন ব্যাপার করি নির্দ্বিধায়। ফকির ভেবে খাতির করে দশজনায়।’
গান থামিয়ে বাউল মৃদু কণ্ঠে বলল, আইচ্ছা বাবাজি। একটা হারমোনিয়ামের ব্যবস্থা করলে ভালা হয়।
দ্রুত বাড়িতে যায় গিরিশ। উঠোনে দাঁড়িয়ে ডাকে, ‘বউ বউ’। সাড়া নেই। লাঙল-জোয়াল গোয়ালে রেখে ঘরে আসে। হারমোনিয়াম নিয়ে দ্রুত ফিরে আসে শিরিষতলায়। বাউল গলা ঝেড়ে গান ধরে। আহা কী মধুর কণ্ঠ! আগে কেউ এমন শুনেনি। সবার হাতে উপচার। ক্ষেতের শশা, চিনার, বাঙ্গি, আনারস ছাড়াও কলা দিয়ে খই-চিড়া, দুধ-মুড়ির নৈবদ্য। কয়েকজন কোদাল দিয়ে পরিষ্কার করেছে কিছু জায়গা, মেয়েরা হালকা লেপে বসিয়েছে দীনদয়ালের ঘট। দুপুরের নীরবতা ভেঙে দিয়েছে উচ্ছ্বসিত শ্রোতা-ভক্তরা।
‘ডাকলে কি আর প্রাণ জুড়াবে রে বন্ধু।
না দেখিলে নয়ন।।
করো বন্ধু যা লয় তোমার মন।’
বিনয়ের সাথে বাউলের সুললিত সুর। কত অবলার না বলা কথা ফুটে ওঠছে। বেদনায় কাতর সুর বয়ে গেল গিরিশের পুকুর পাড়ের কদম ডালে। তিন-পুরুষের বাড়ি, পুকুরে কংক্রিটের বাঁধানো ঘাট। কদম জামরুলে বেষ্টিত বাড়ির ভিত আরও মায়াময় করে তুলেছে এই গান। সুরের মূর্ছনায় তিরতির কেঁপে ওঠে গাছগাছালি, কেঁপে ওঠে এক নারীর হৃদয়! কে তুমি বাউল? এ কণ্ঠ যে আমার খুব চেনা গো! কদম ডালে কেন বারবার দোলা লাগে? সুর আর ফুলের গন্ধে মথিত চারপাশ, পার্বতীকে মাতাল করে দিচ্ছে। শিরিষতলায় বসানো গানের আসর যে গিরিশের ইচ্ছেতেই এটা পার্বতীর বুঝতে বাকি নেই। মানুষটা গানের নেশা কিছুতেই ছাড়বে না। ভিড় বেড়েই চলছে। এই গানের তাল, লয় ও পদের সঙ্গে পার্বতীর পূর্ব পরিচয় আছে। ঘাটে বসে সেও গলা মিলিয়ে তাল ঠুকছে। দৃষ্টি আটকে আছে বয়ে যাওয়া বাতাসের ছোট ছোট জলের ঢেউয়ে। হঠাৎ হাতের পুরোল খসে গেল জলে। মুহূর্তে ভয়ার্ত চেহারা পার্বতীর! এই বাউল আমন নয় তো? না না। এত অপমানের পর এ পথে আসার ইচ্ছে থাকবে না তার। পদটি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ভাসছে,
তুমি ভিন্ন আমি ভিন্ন, ভিন্ন না হই মনে,
থাকতে যদি না পাই দেখা রে,
আমার জন্ম অকারণ রে।।
করো বন্ধু যা লয় তোমার মনে।’
বিস্ময়, পুলক উদ্বেগ এক সঙ্গে আঁকড়ে ধরেছে পার্বতীকে। ভাগ্যিস কেউ নেই! না হলে নিশ্চিত সে ধরা পড়ে যেত! নিজের দুষ্টদমন ভাবমূর্তি রাহুগ্রস্ত। সুরের মূর্ছনায় বারবার দগ্ধ হতে লাগল দেহপ্রাণ। ঝাঁপিয়ে পড়ে স্নিগ্ধ শীতল পুকুরের জলে। ভেসে যাওয়া কদম পাপড়ি হাতের ঢেউএ সরিয়ে পর পর ডুব দেয়। শরীর এলিয়ে রাখে অনেকক্ষণ। হয়তো খানিকটা উত্তাপ প্রশমিত হয়েছে জলে, কিন্তু মনের তাপ? তার কি দোষ ছিল? আমন কি এতই বেহায়া? নাকি এসব তার নিছক কল্পনা মাত্র? গায়ক এক সিদ্ধ বাউলসাধক ছাড়া আর কেউ নন। চেষ্টা করেও যেন স্বাভাবিক থাকা অপচেষ্টা মাত্র পার্বতীর। শৈশবে ফোটা গোলাপ আগেই তো ঝরে গেছে। তবে আবার কেন সেই স্মৃতি আজ ফিরে ফিরে আসছে? দাদার আভিজাত্যের বড়াই তার জীবনটা তছনছ করে দিল। কী চেয়েছিল সে আর কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেকে আর সামলাতে পারছে না। সব কথা মনে পড়ছে পার্বতীর। আমন চলে গেলেও রয়ে গেছে কাঙ্ক্ষিত প্রেমের অনুরণন, তার ছেলে। অন্তরে ফোটা গোপন কলির গন্ধ স্পর্শ করেছে আজ আবার প্রাণ। পার্বতীর হৃদয় অবুঝের মতো দোলছে, মনও পরিস্ফুটিত হচ্ছে। মুখে লজ্জামাখা ঘাম ঘাম হাসি। কণ্ঠ বারবার ভাষা ভুলে হারিয়ে ফেলছে ছন্দ। এমন করে একদিন হেমন্তর হলুদ সূর্য ঝকমকিয়ে উঠেছিল আকাশে। পাখিরাইও কাকলিতে ভরিয়ে দিত তার স্কুলের মেঠোপথ। তখনই একদিন হারিয়ে গেল আমন।
ভারাক্রান্ত মনে দু-মাস অতিবাহিত হল। পার্বতীর কোনও খবর নেই। খুঁজতে এল ওবাড়িতে আমন। কিন্তু দেখা করার কোনও সুযোগ নেই। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। কে বা কারা রাতের অন্ধকারে তাকে একা পেয়ে পেছন থেকে আচমকা আক্রমণ করে। মাথা ফাটিয়ে অর্ধমৃত করে ফেলে গেল পার্বতীর বাড়ির সামনে। রক্তাক্ত, সংজ্ঞাহীন আমনকে নেওয়া হল হাসপাতাল। চিকিৎসা চলল বেশ কিছুদিন। তখনই একদিন জয়া এসে জানাল, জলেবাসার গিরিশ পার্বতীর পাণিগ্রহণ করতে টুপুর পরে এসেছে। পার্বতী কেঁদে জয়াকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, খবরটা যেন আমনকে জানায়। আমন নাকি রুদ্রজ ব্রাহ্মণ বাড়ির মেয়ের সর্বনাশ করতে বসেছে। জীবনের সব ছন্দ ঝরে গেল তার। প্রভাবশালী ভাইদের অহংকারে গড়ে উঠল পার্বতীর কুল বাঁচা সংসার। হতাশাগ্রস্ত আমন ভারসাম্যহীন হয়ে ঘোরাঘুরি করল অনেক দিন। একদিন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হারিয়ে গেল অজানা ঠিকানায়। কে জানে কোন পাহাড়, কোন জঙ্গল, কোন পথে পথে ঘুরে এই শিরিষ তলায় এসেছিল সে। দেখতে ভয়ানক চেহারার নির্বাক এক জন্তু ছাড়া কিছু মনে হতো না তাকে। লোকে পাগল বলে ঢিল ছুঁড়ে, তাড়া করে। সব উপহাস চেতনাহীন হয়ে সয়ে যায় সে। স্কুলের নিষ্ঠাবান প্রতিশ্রুতিবান ছাত্র, যে কিনা এক হতভাগীর প্রেমে পাগল হয়ে আজ পথচারীদের ঠাট্টা আর উপহাস করে মিথ্যে আনন্দ পাওয়ার খোরাক। লম্বা চুলদাড়ি মাঝে মায়লা অর্ধবসন পরে কতদিন কত কত গাছতলায় থেকেছে সে, কে জানে!
জবুথবু হয়ে পাড়ে ওঠে পার্বতী। ভিজে কাপড়খানা গুছিয়ে কলসি কাঁখে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। গানের আরেকটি পদটি তাকে অবাক করে দিল।
‘তুমি হইলায় বটবৃক্ষ আমি তরুলতা, প্রাণে প্রাণে প্রাণ মিলাইয়ো রে বন্ধু, কইচি মনের কথা। করো বন্ধু, যা লয় তোমার মনে।’
ছলছল চোখে তাকায় পার্বতী। চুলভেজা জলের সিক্ত গালে কিছুই বোঝা গেল না। কলসিটা কোনওক্রমে বারান্দার রেখে টাঙানো দড়ি থেকে সায়াটা নিয়ে রান্নাঘরের আড়াল হল। সোনালি চাঁপা হাঁটু ঘেঁষে পায়ের পাতায় পড়ল ভিজে কাপড়খানা। ছায়ার ফিতে দিয়ে টাইট করে বেঁধে নিল ধুকপুক করা বুক। তুলতুলে নরম বুকে সায়ার ফিতেটা কষে ধরেছে দু-খানি স্তন। আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে পার্বতীর ঢেউ খেলানো ঐশ্বর্যপূর্ণ মাধুর্য ভরা শরীর। ধন্দে-ধন্দে তাকায় এবার শিরিষ তলায়। তবে কি সত্যি আমন ফিরে এলো? নানা, আমার আমন বাউল হতে যাবে কেন? সে ত পাগল হয়ে হারিয়ে গেছে। বস্ত্রহীন বুকে হাত রেখে উঁকিঝুঁকি দিয়েও দূর থেকে মুখাবয়ব দেখতে পায় না। উৎসুক শ্রোতার মাঝে বেদনা ভরা আরেকটি পদ চুরমার করে দিল ধুকপুক পার্বতীকে।
‘প্রেম করিয়া তোমার সঙ্গে, ঘুরি বনে বনে। শাহ কয় হইব দেখা রে, আমার, শেষ বিদায় ক্ষণ রে। করো বন্ধু, যা লয় তোমার মনে’।
নীরব শ্রোতারা সবাই চিন্ময় জগতের আনন্দে ভাসমান। ইমনের নাস্তিক ভাইকেও দেখা যাচ্ছে। দুটি টুকরি ঝুলিয়ে ভেউয়ের ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাঁধে। গিরিশ স্ত্রীকে দেখে ধীরলয়ে এগিয়ে আসে।
মহাজনের একমুঠ খাওইবার ইচ্ছা আছিল বউ।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বন্ধ চোখে গানের রাজ্যে বিরাজমান বাউল। কখনও কখনও হাত তুলে প্রাণ ভরে আর্শীবাদ করে যাচ্ছেন আনত ভক্তকে। মুখাবয়ব দেখার লোভ সামলাতে পারল না পার্বতী। সেও একবার অল্পবয়েসি ফকিরের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেবে।
তুমি যাও, আমি মহাজনের লাগি আগে একটু চা করে নিয়ে আসি।
বাউল সেবায় স্ত্রীর অনুরাগ দেখে খুশি গিরিশ। ততক্ষণে ভাটা পড়ে গেছে ভক্তগণেরও। সেবায় কি আরও একটা পদ বাড়ানো যায়! সে চিন্তায় গিরিশ আবার যায় শিরিষতলায়।
আমার দীন কুটিরে চলইন কর্তা, একটু বিশ্রাম নিবা।
না বাবাজি! আজকে আরাম দিলে, কালকে সে আরও বেশি আরাম চাইব। কই পামু ফকির ফুল বিছানা?
আপনে ত সিদ্ধপুরুষ, আলসি নাই আপনার।
মাটির দেহ রে সুখ দিয়া লাভ কী? এই দেহ ত পচাদেহ পচবে মাটিতেই। কথায় উত্তর দিয়ে বাউল গানে টান দিলেন,
‘দুই চোখে দুই তুলসী পাতা,
সঙ্গে মাটির হাঁড়ি।
দেবে না কোনও দামি কাপড় সবই নিবে কড়ি।
কার লাগিয়া করছ তুমি সাধের জমিদারি।’
পার্বতী একটি থালায় কয়েক কাপ চা নিয়ে এসে দাঁড়ায়। সবাইকে এগিয়ে দেয় গিরিশ। প্লেটে আনা কাপটা বাড়িয়ে দিল পার্বতী বাউলের দিকে। হকচকিয়ে থাকা পার্বতী এবার সত্যি চমকে উঠল ! আরে এ তো আমন! এই আমন তো আর সেই আমন নয় এখন! সে তো এক সাধকবাউল। ফকিররে পা ছুঁতেই পার্বতীর উষ্ণ এক অনাহূত কম্পন সারা গা বেয়ে প্রবাহিত হল বিদুৎ বেগে। হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে কান্না নেমে এল চোখে। বাউল দু-হাত তুলে মিষ্টি সুরে আর্শীবাদ করল, সুখী হও মা। বলতে বলতে বাউল কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। তা পার্বতীর চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না। বারবার পার্বতীর দৃষ্টিতে চুলদাড়ির মাঝে লুকিয়ে রাখা আমনের সেই মুখখানি। এই গুরুগম্ভীর বাউলের সঙ্গে তার আমনের বিস্তর ফারাক। মুখে আঁচল গোঁজে দ্রুত পালায় পার্বতী ঘরে। বাউলের অন্তরে শুদ্ধ প্রেমভক্তি ছাড়া আর কিছুই নেই। এই বাউলের সঙ্গে তার আমনের তুলনা করলে পার্বতী খুব ভুল করবে। তাই তো চেনা মানুষটাকে বারবার তার অচেনা মনে হচ্ছে। আরও অবাক লাগছে, আদৌ কি বাউল তাকে চিনতে পারেনি? না হলে কেন ‘মা’ সম্বোধন করল?
স্বামীর আদেশ কিংবা নিজের আবেগেই উনুনে জ্বাল বাড়ায় পার্বতী। সমস্ত বিস্ময় তার অনুভুতিকে আষ্টেপষ্টে দ্বিধাবিভক্ত করে চলছে। নেশায় আসক্ত ফকিরের কলেবরও যেন পার্বতীর ঘৃণার বস্তু নয়। বহু আগের চর্বিত প্রেম পুঞ্জীভূত হয়ে পার্বতীর বুকে আজ আবার নতুন প্রেরণায় রঞ্জিত হচ্ছে। ইচ্ছে করলেও ভুলতে পারছে না কিছু। মনে হচ্ছে বারবার ডুব দিতে বাউলের শুদ্ধতা ভরা অন্তরের গহিন গাঙে, বা তা না হয়ে যদিও একবার তার জ্বালাময়ী বুক ঠেসে ধরেতে পারত বাউলের সুশীতল বুকে। সব জ্বালা জুড়িয়ে যেত জন্মের মতো। বারবার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ানো সমাজের নিয়ম, কাঁচের চুড়ি মতো ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করলেও পারছে না সে। কিন্তু মনে তো কোন সমাজ থাকে না! থাকে না কোনও রাষ্ট্রে শাসন। এ রাজ্য কেবলই মোটা দাগের কামনা বাসনায় অভিশপ্ত। আর না পাওয়ার উত্তেজনায় লিপ্ত। যা প্রতি মুহূর্তে সবকিছুতে উস্কানি দেয় মনকে।
নিজেকে তিরস্কার করে ম্লান হাসল পার্বতী।
আমনের স্মৃতি ভরা এই শিরিষতলা কোনও তীর্থস্থান থেকে কম নয় তার কাছে। এদিকে দৃষ্টি গেলেই ঝ্যাৎ-ঝ্যাৎ করে বুক। জীবনে আমনের সঙ্গে আরও একবার দেখা হবে সে কথা জানত তার মন। কিন্তু জানা ছিল না, ফকির বেশে আমন এসে আবার দেখা দেবে এই অভিশপ্ত গাছতলায়। তাপিত বিস্মিত পার্বতী কীভাবে বাউলকে বুঝাবে? আমনের এই কষ্টে ভরা জীবন কোনওদিন চায়নি সে। ইচ্ছে করছে, গলা ছেড়ে, – আমন আমন করে কাঁদতে। কিন্তু পারছে না, স্বামী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে তার দিকে। মুখে হারানোর ছাপ! কাতরে বলল, বাউল আইছে বাড়িত?
হতভম্ব পার্বতী, না।
গেলো কই?
আমি ক্যামনে কই, সঙ্গে ত তোমরা আছিলায়!
স্বামীর কথা শুনে বিব্রত পার্বতী। কোনও উত্তর দেয় না। মাথা নিচু করে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছাড়ে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে রেখেছে আগেই অসফল প্রেমের কান্না আর কারও সামনে কাঁদবে না।- আমাকে এ ভাবেই যদি ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তোমার, তবে কেন দেখা দিলে?
দ্বিধাবিভক্ত গিরিশও নীরব। কি আশায় পিছনে তাকায়। শূন্যতায় ধু ধু ভরা শিরিষতলায়। সমাপ্তি অনুষ্ঠানের নীরবতা ছেয়ে আছে দানপাত্রের পূর্ণতা ঘিরে। এবার হু হু করে কেঁদে উঠল গিরিশ।
আমি এই বাউলের টেকা দিয়া কিনতে গেছলাম বৌ, আমার কত বড় সাহস!
আমন ফাঁকি দেওয়ায় এমনিতেই রিক্ত পার্বতী। ছন্নছাড়া হয়ে ক্রমশ রাত নেমে এলো। গিরিশ গিয়েছে ইমনের কাছ থেকে ছেলেকে আনতে। পার্বতী দেখে বাড়ি খালি। তা হলে কোথায় যেতে পারে আমন? সে কি ইন্দুরাই মেলাতে চলে গেল? সে তো এখান থেকে বেশি দূর নয়! কেন তাকে মা বলে সম্বোধন করল সে? কেন তাকে চিনতে অস্বীকার করল আমন? বুকের ভিতরটা জ্বলতে লাগল পার্বতীর। কিছুতেই ঘরে বসে থাকতে পারছে না। একটা কথা যে বলা হয়নি তাকে, যদি আজ না বলে তা হলে আর কোনওদিন তো কথাটা বলা হবে না।
আচমকা পাগলের মতো ছুটতে থাকে পার্বতী। তখনই ছেলে নিয়ে ঘরে ফিরে গিরিশ। স্ত্রী’র এমন পাগল পাগল অবস্থা আগেই বুঝেছে সে। কিছু কথা বিয়ের আগেই সে জেনেছিল। কিন্তু এই ফকির যে সেই আমন সে বুঝতে পারেনি। সে তার ছেলেকে কাঁধে নিয়ে ছুটতে লাগল পার্বতীর পেছনে। আর যাই হোক এই সংসার ছেড়ে আর যেতে দেওয়া যায় না তাকে। সে ও তার ছেলে এখন বাস্তব, একে অস্বীকার করতে পারবে না পার্বতী।
রাতের অন্ধকারে অনেকটা পথ এসে হাঁপিয়ে উঠল পার্বতী। ধান খেতের মাঠ ধরে আর কত ছুটবে সে রাতের অন্ধকারে। একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, আমন –। ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল রাতের আঁধারে।
কে মা তুমি?
চমকে তাকায় পার্বতী, তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে বাউল!
আমন! তুমি আমারে চিনতে পারছ না? কেন? কেন?
আমন নেই মা, আমনের মৃতদেহ থেকে যে আত্মাটা বেঁচে গেছে সে এই ফকির। তুমি ওকে চিনবে না।
আমি তোমারে এখনও ভালবাসি আমন। তোমার ভালবাসার দানকে একবার আশীর্বাদ করবা না?
তুমি ভুল করতাছ মা, আমি আমন না। আমি এক ফকির।
আমারে সঙ্গে লইয়া যাও তোমার।
তা হয় না, তুমি যে সংসারী।
এমন সময় গিরিশ বেরিয়ে আসে।
না তুমি কোনওখানে যাইতে পারতা না পার্বতী। এই সংসার, আমি আর তোমার এই সন্তান সত্যি। বাকি সব মায়া সব মিথ্যা তুমি সব ভুইল্লা যাও।
ছেলেকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে পার্বতী।
গিরিশ বলে, আমাদের সন্তানকে একবার আশীর্বাদ করেন বাবা?
ফকির ওকে কোলে তুলে নেয়। আদর করে বলে, অনেক বড় হও জীবনে। তারপর আচমকা অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
পেছন থেকে ডাকে গিরিশ-পার্বতী। আর কোনও সাড়া পাওয়া যায় না। চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে পার্বতী। গিরিশ তার পিঠে হাত দেয়, চল ঘরে যাই। তখনই জমিন আসমান ভেদ করে দূরের একটি গানের কলি, পার্বতীর তছনছ করা হৃদয়ে শান্তির ছোঁয়া দিয়ে গেল,
‘….. সোনা বন্ধু রে…. আমি তোমার নাম লইয়া কান্দি।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge