মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:১৫ পূর্বাহ্ন

গল্প # সাইকেল চোর-শামীম খান যুবরাজ

গল্প # সাইকেল চোর-শামীম খান যুবরাজ

আমি তখন কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে যে ক’জন ঘনিষ্ট ছিল তাদেরই একজন তুহিন। ক্লাসের ফাঁকে একদিন তুহিন আমাকে বলল, ‘আমার সাইকেলটা বিক্রি করে দেব দোস্ত, একজন কাস্টমার দেখ।’
তার কথায় আমার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তার জন্য একটা সাইকেল কেনার তাগিদ দিচ্ছিল বাড়ি থেকে। ভাবলাম তুহিনের সাইকেলটা কিনে নিলে মন্দ হয় না। ভালো দামেও নেয়া যাবে। অবশেষে তুহিনের সঙ্গে লেনদেন করে সাইকেলটা নিয়েই নিলাম ছোটভাই হারুনের জন্য।
সাইকেল কেনার পর থেকে তুহিন তাগাদা দিতে লাগল সিট পরিবর্তন ও সাইকেলে নতুন রং দেয়ার জন্য। দেখলাম সিট তো ঠিকই আছে আর রংও তেমন নষ্ট হয়নি, তাই আর ওর কথার তোয়াক্কা করলাম না।
তার কথায় কান দিচ্ছি না দেখে সে আমাকে একদিন ডেকে বলল, ‘আকরাম, সাইকেলটা রং করে নে না। দেখবি কত সুন্দর দেখাবে। টাকা আর কতই লাগবে। টাকা না হয় আমিই দেবো। তুই রংটা করে সাইকেলটার চেহারাটা পাল্টে দে।’
আমি ওর কথায় আশ্চর্য হলেও টাকা নিতে রাজি হইনি। শুধু বললাম, আরেকটু পুরনো হয়ে নিক। রংয়ের বালতিতে ডুবিয়ে নেব তখন।
বাড়ি গিয়ে বিষয়টা নিয়ে অনেক ভাবলাম, হাড়কিপটে তুহিন কেন আমাকে টাকা দিতে চায়? কিছুই মাথায় আসলো না। মেনে নিলাম যেহেতু ক্লাসফ্রেন্ড, বলতেই পারে। এ নিয়ে আর ভাবিনি কখনো।
আমার প্রতিদিন পায়ে হেঁটে কলেজে যাওয়ার অভ্যেস। ছোটভাই হারুন প্রতিদিন তুহিন থেকে নেয়া সাইকেলটায় চড়ে কলেজে যায়। একদিন এক জরুরি কাজে হারুন থেকে সাইকেলটা নিয়ে কালীগঞ্জ হয়ে পলাশ গেলাম। তারপর জামালপুর হয়ে ফেরার পথে গাঁয়ের রাস্তা দিয়ে ঢুকে পড়লাম তাড়াতাড়ি ফিরব বলে। জামালপুর থেকে বেশ কিছুদূর গেলে যে গ্রামটা পড়ে তার নাম নাসেরা। নাসেরার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির মধ্য দিয়ে আমার সাইকেল ছুটে চলছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় গ্রাম্য রাস্তা প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে গরু-বাছুর নিয়ে কৃষকদের বাড়ি ফেরার দৃশ্যগুলো চোখে পড়ছিল। মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে আমার সাইকেল ছুটছে নিজ গ্রামের দিকে। হঠাৎ পথ আগলে দাঁড়াল এক তরুণ। তরুণের চোখে মুখে যুদ্ধজয়ের উল্লাস ‘পেয়েছি, পেয়েছি, পেয়ে গেছি।’ তার চিৎকারে আশেপাশের কয়েক বাড়ি থেকে ছুটে এলো পাঁচ ছয় জন লোক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার হাত থেকে সাইকেলটি কেড়ে নিয়ে হাঁটতে লাগল ডান পাশের সরু রাস্তা ধরে। আমিও হতভম্বের মত ওদের পেছনে হাঁটতে লাগলাম। সরু রাস্তাটি একটি বাড়ির রাস্তা। সাইকেলটি নিয়ে সবাই ঢুকল সেই বাড়িতে। তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, ‘চেহারা তো ভালোই আর করে কিনা চুরির ধান্ধা।’ লোকটার কথা শুনে ‘চিচিং ফাঁক’ বলে আমার মগজের দরজাটা খুলে গেল। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম ওরা আমাকে চোর ভেবেছে, কিন্তু সাইকেলটা তো আমার? আবার ‘চিচিং বন্ধ’ বলা ছাড়াই মগজের দরজা বন্ধ হওয়ার বিকট শব্দ পেলাম। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল, বিষয়টা কী? কোনভাবেই আঁচ করতে পারছি না।
এরই মধ্যে চারিদিক থেকে জড়ো হয় নারী-পুরুষের অর্ধশত মিছিল। একেকজনের মুখে একেক রকম মন্তব্য। আমাকে কথা বলার সুযোগই দিচ্ছে না কেউ। ‘ব্যাটা চোর, ডলা দিলেই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তুহিনকে ডেকে নিয়ে আয়’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
মহা ঝামেলায় পড়ে গিয়েও একপ্রকার নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করলাম। চিৎকার দিয়ে বললামÑ‘আমি চোর-টোর কেউ নই। আপনারা ভুল করছেন। এই সাইকেলটা আমার। আমি রাওনাটের পঞ্চায়েতের নাতি।’ আমার কথায় সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করল। ভিড়ের মধ্যে একটা মুখ হঠাৎ চেনা মনে হলো আমার কাছে। চেনা মুখের সেই মানুষটা আমার দিকেই এগিয়ে এলোÑ ‘আরে আকরাম, তুমি এখানে?’
চেনা মুখটা এবার স্পষ্ট হলো আমার কাছে। সে সীমা, আমার ক্লাসমেট। তুহিনের বোন। তুহিন ও সীমা আমার সঙ্গেই পড়ে। আমি বললামÑ সীমা তুমি এখানে কী করছো?
ততক্ষণে আমার খাতিরদারি শুরু হয়ে গেছে। কেউ হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে। কেউ হাতে শরবত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন ঘর থেকে চেয়ার বের করে বসার জন্য অনুরোধ করলে আমি বসে যাই।
সীমা বলল, এটা আমাদের বাড়ি। আর তুমি এই সাইকেলটা কোথায় খুঁজে পেলে? ভাইয়ার এই সাইকেলটা কিছুদিন আগে চুরি হয়ে যায়।
সীমাকে বললাম, এটা তো তুহিন আমার কাছে বেচে দিয়েছে, চুরি হবে কীভাবে?
এবার ‘চিচিং ফাঁক’ বলা ছাড়াই আমার মগজের গুদামঘরটা খুলে গেল। সাইকেল মালিক নিজেই তাহলে চোর? ব্যাটা তুহিন, এজন্যই সাইকেলে রং করার জন্য প্রতিদিন তোর এত তাগিদ!
স্বসম্মানে আমাকে সাইকেল হাতে বিদায় দিল তুহিনের বাড়ির লোকজন। এদিকে তুহিন ঘটনা আঁচ করতে পেরে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে। বেশ ক’দিন পর কলেজে দেখা ওর সাথে, বললাম-তুহিন টাকা দে না সাইকেলটা রং করে নিই। বেচারা মাথা নিচু করে হনহন করে চলে গেল আর কোনদিন আমার সামনে পড়েনি।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge