সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন

কারাবাস শেষে-কাজী সালমান শীশ

কারাবাস শেষে-কাজী সালমান শীশ

সকাল ৯টা। ডিসেম্বর মাস শেষ হতে চলল।
চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা। আমি আজ প্রায় ৬ বছর পর জেল থেকে মুক্তি পেয়েছি। জেলের বাইরের রাস্তাগুলো কেমন অচেনা ও আঁকাবাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে যে কোনো সময় রাস্তায় পড়ে যেতে পারি তাই সাবধানে পা ফেলছি। ইচ্ছা করছে আবার জেলখানায় ফিরে যাই। এতদিন পর বের হয়ে আমি কি করব, কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
ঘটনাটা ছিল খুবই সামান্য। আমি বাংলাবাজারে একটা বইয়ের দোকানে কাজ করতাম। অল্প বেতনের কাজ কিন্তু সারাদিন আটকে থাকতে হত। দোকানের মালিক ভালো লোক ছিলেন। তিনি দুইবেলা খাবার দিতেন। থাকতাম একটা ছোট্ট ব্যাচেলার মেসে আড়াই হাজার টাকা ভাড়ায়। কমন বাথরুম হলেও একটা আলাদা রুম ছিল। ঢাকা শহরে এর থেকে সস্তায় বোধহয় থাকা যায় না। যাই হোক, ছয় বছর আগের এক রাতের কথা। আমি ঘুমাচ্ছিলাম হঠাৎ ঘরের দরজায় কেউ টোকা দিল। ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা বাজে। দরজা খুলতেই তিনজন পুলিশ ঘরে ঢুকে আমাকে ধরে নিয়ে গেল।
একটু পরেই জানতে পারলাম আমাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে খুন করার অপরাধে! আমি খুন করেছি অথচ নিজেই জানি না! প্রাথমিক এক দফা ধোলাই দিল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পুলিশ অফিসার। পরে বুঝতে পারলাম আমাকে ধরে আনা হয়েছে অন্য এক অপরাধীকে রক্ষা করার জন্য। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি খুন করে ফেলেছেন এবং তিনি মোটা অংকের টাকা ব্যয় করেছেন পুলিশের পেছনে। লাশ যেহেতু গুম করা সম্ভব হয়নি তাই পুলিশের প্রয়োজন পড়েছে কাউকে আসামী হিসেবে চিহ্নিত করা। সেখানে মিথ্যা আসামী সাজানো হয়েছে আমাকে। প্রথমে ভীষণ অবাক হলেও জেলখাটার সময় জানতে পারলাম—এটা অবাক হওয়ার মত কোনো ঘটনা না। প্রভাবশালীদের বদলী আসামী হিসেবে জেল খাটা বেশ প্রচলিত একটা ঘটনা। আমার ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কেন হয়নি, তা জানি না। আমাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে ছয় বছরের মাথায়। কয়েক মাস আগে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। হয়ত এখন নতুন আসামীদের জেলে ভরার জন্য খালি জায়গা দরকার। জানি না কিছুই। আমি রবিউল আলম হাওলাদার। ছয় বছর জেলখাটার আগে বয়স ছিল ৪১। এই ছয় বছরে বয়স যেন এক যুগ বেড়ে গেছে।
আমি হেঁটে হেঁটে বাংলাবাজারের দিকে গেলাম।
দূর থেকে দেখলাম বইয়ের দোকানটা একই রকম আছে। অন্য একজন কর্মচারী আর মালিকও আছে দোকানে। আমি নিজেকে আড়াল করে নিলাম। তারপর কি মনে করে ভাবলাম দোকানে গিয়ে একটু দেখা করে যাই।
– স্যার ভালো আছেন?
– আরে রবিউল কেমন আছো? এতদিন পরে?
– আমার জেল হয়েছিল স্যার।
– সবই জানি রবিউল… খুব কষ্ট পেয়েছিলাম ঘটনাটা শুনে। কিছুই বুঝতে পারি নাই যে কি করব।
– ওরা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। বেকসুর খালাস দিয়ে দিয়েছে।
– রবিউল চলো আমরা সামনের চায়ের দোকানে বসে কথা বলি।
– না স্যার আজকে না। আমি এসেছিলাম দোকানটা দেখতে। বড় মায়া ছিল দোকানটার জন্য। আরেকদিন এসে আপনার সাথে কথা
বলব। আজকে আসি।
– আরে এক কাপ চা তো খেয়ে যাও…
– আরেকদিন।
আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে গলিটা পার করলাম। দোকানের মালিক ভদ্রলোক মানুষ। আমার জেল হওয়ার পর উনি একবারো খোঁজ করতে যাননি। খুনের আসামী—তাই ঝামেলা নিতে চাননি। একদিক দিয়ে ঠিকই করেছেন কারণ উনি তো আসলেই জানেন না যে আমি খুন করেছিলাম কি না। আমি নিজেই জানতাম না। অভিমান হয়েছিল। জীবনের প্রতি, নিজের ভাগ্যের প্রতি।
পার্কের বেঞ্চে দুপুর পর্যন্ত শুয়ে থেকে বাস স্টান্ডের উদ্দেশ্যে বের হলাম। বাসের টিকিট করে গ্রামের বাড়ি চলে যাব। বাড়িতে বৃদ্ধ মা ছাড়া আর কেউ নেই। ছয় বছর আগেই মা বেশ অসুস্থ ছিলেন। এতদিন বেঁচে আছেন কিনা কে জানে… জেলখানা থেকে চাইলে উনাকে খবর দেয়া যেত, কিন্তু দেয়া হয়নি। আসলে কারাবাসের প্রথম দুই বছর আমি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম। সবকিছু শান্ত ও স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে গেলেও ব্রেইনে বড় ধরনের শক পাই। মিথ্যা মামলায় জেল খাটার যন্ত্রণা আমার শরীর নিতে পারলেও, ব্রেইন নিতে পারেনি। অন্তত প্রাথমিক অবস্থায় নিতে সময় লেগেছিল। মায়ের সাথে এই কয়েক বছর কোনো যোগাযোগই না হলেও মাকে নিয়ে নোট বইয়ে লিখেছি অনেক কথা। সেখানেই মায়ের সাথে কথা হত কল্পনায়। কথা হত চেনা-অচেনা অনেকের সাথেই। সেই নোটবুক থেকেই আমি জানি—মা বেঁচে নেই। মা অনেকদিন আগেই মারা গেছেন।
বাস ছাড়ার পর জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছিল। মনে হচ্ছিল সারাবিশ্ব যেন শীতল হয়ে যাচ্ছে। আমি জানলাটা খোলা রাখতে চাইছিলাম কিন্তু বাতাসে অন্য যাত্রীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে তা বন্ধ করে দিলাম। কত বছর পর মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া এসে মুখে লাগল। জেলে থেকে অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়নি, বরং না পাওয়া শান্তিগুলো অনেক সূক্ষভাবে অনুভব করা যাচ্ছে। তবে আমার মাথা পুরোপুরি ঠিক নেই নিশ্চিত।
গ্রামে পৌঁছে প্রথমে কবরস্থানে গেলাম। মায়ের কবর জিয়ারত করব। ঘুরে ঘুরে কবরের নামকরণগুলো দেখলাম। কোথাও পেলাম না। কবরস্থানটা বেশি বড় না। আমাদের পরিবারের অন্যদের কবরও এখানে রয়েছে। বয়ষ্ক একজন গোরখোদককে জিজ্ঞেস করলাম মায়ের নাম, ঠিকানা বলে। তিনি কিছু বলতে পারলেন না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বোধহয় কিছুটা সংশয়ে পড়ে গেলেন। কোনো নির্দিষ্ট সমাধির কথা না জেনে কেউ সম্ভবত আমার মত এলোমেলোভাবে কবর খুঁজতে আসে না। তিনি কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি আমার সামনে থেকে চলে গেলেন। আমার কেন যেন হাসি পেয়ে গেল। একজন গোরখোদক আমার মত একজন সাধারণ লোককে দেখে ভয় পেয়েছে—বিষয়টা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। আমি খুনের মামলায় জেল খেটে এসেছি জানলে লোকটার অবস্থা কি হত?
এখন কয়টা বাজে জানি না। রাত ৮টা হবে। গ্রামের খোলা প্রান্তরের কুয়াশাও পড়েছে খুব। মাঠ পার হয়ে ধান ক্ষেত, তার পাশে বাঁশঝাড়ে ঘেরা ঝিল। এই ঝিল পার হলেই আমার বাসা। আমি হেঁটে হেঁটে ঘরের উঠানের কাছে গেলাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম ঘরের দরজা খোলা। ঘরের ভেতর কমলা রঙের আবছা আলো জ্বলছে। কয়েক পা আগাতেই দেখতে পেলাম—কুপির আলোতে মায়ের খয়েরি রঙের ছায়া দেয়ালে গিয়ে পড়েছে! আমার মা বেঁচে আছে! মা অপেক্ষা করে বসে আছে আমার জন্য! ঝাপসা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হল—বিন্দু বিন্দু তারারা কত লক্ষ কোটি মাইল থেকে আমাদের দেখছে। আমরা কতই না ক্ষুদ্র তাদের চোখে।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge