সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন

কানাডার টরন্টো থেকে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক জসিম মল্লিক এর কলাম পরিযায়ী করোনা দিনের ডাইরি : পর্ব-৬

কানাডার টরন্টো থেকে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক জসিম মল্লিক এর কলাম পরিযায়ী করোনা দিনের ডাইরি : পর্ব-৬

কানাডার টরন্টো থেকে
বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক জসিম মল্লিক এর কলাম পরিযায়ী
করোনা দিনের ডাইরি : পর্ব-৬

এইভাবে বেঁচে থাকা
যার সাথেই কথা বলি সেই বলে ভাল নাই। আমরা কেউ ভাল নাই। ভাল থাকার কথাও না। আমরা কেউ কাউকে ভাল রাখতে পারছি না। সবার এক ও অভিন্ন সমস্যা। যদিও সবাইকে বলি ভাল থাক, সাবধান মতো থাক। আসলে আমি নিজেই কি ভাল আছি! এখনও যে বেঁচে আছি এটাই আসলে ভাল থাকা। এটাই আর্শীবাদ, এটাই বোনাস লাইফ। কারো সাথে কারো দেখা হয় না, স্পর্শ হয় না। ঘর থেকে বের হওয়া যায় না, বের হলেও দ‚রত্ব বাজায় রাখতে হয়, মুখে মাস্ক, হাতে গভস। বিরাট ঝক্কি। বাইরে বের হওয়ার ইচ্ছাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আবার ঘরে অর্হনিশি বসে থাকাও যন্ত্রণাদায়ক। পথ চলতে মানুষ দেখলে দ্বিধাভরে দ‚রত্ব রচনা করি। গ্রোসারি করতে যাওয়া যেনো এক আতংক! যতই সোশ্যাল ডিসটান্সিং থাক কাছাকাছি হতেই হয়। আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি পরস্পরের কাছে থাকতে, সান্নিধ্যে পেতে, আলিঙ্গনাবদ্ধ হতে। এভাবে কি মানুষ বেশিদিন বাঁচবে! একঘরে থেকেও পরস্পরের কাছ থেকে দ‚রত্ব রচিত হয়। আত্মীয়, বন্ধু এমনকি সন্তানরা পর্যন্ত কাছে আসতে পারে না, পাশে থাকতে পারে না।
কিন্তু তারপরও জীবন থেমে নেই। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, হাজারো মানুষের মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু মানুষের লড়াই থেমে নেই। লড়াই করছে বিজ্ঞানীরা একটি কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য। মানবতাকে বাঁচানোর জন্য লড়াই। দেশে দেশে সরকারগুলো তার জনগনকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। নানা ভাবে সাহায্য করছে, প্রণোদনা দিচ্ছে। লড়াই করে বাঁচার নামই জীবন, এটাই সভ্যতা। দেশে দেশে লকডাউন উঠে যাচ্ছে। এর মধ্যেই বাঁচতে হবে। অভ্যস্ত হতে হবে এই জীবনে। অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল করতে হবে। তাই জীবনের ঝুঁকি থাকলেও পথে নামতেই হচ্ছে মানুষকে। অনেকেই এসবের মধ্যেও কাজ চালিয়ে গেছেন। পৃথিবী জুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা শ্রদ্ধার আসনে জায়গা করে নিয়েছেন।
টরন্টো ১ জুন ২০২০
ফেসবুক নিয়ে কথা, ফেসবুক আসলে কেমন!
আমার ফেসবুক বন্ধুদের ব্যাপারে আমি খুবই প্যাশোনেট। অনেকের সাথে বন্ধুত্বের বয়স দশ বছর হয়ে গেছে। আমরা যেনো পরস্পরের আত্মীয় হয়ে গেছি। দেখা সাক্ষাৎ না হলেও যেনো চিনি একে অপরকে। ভাব বিনিময় হয়। চেনা হয়ে যায় লেখায়, ছবিতে। আমার এমন কয়েকজন বন্ধু আছে যারা আমি যাই পোষ্ট দেই, লাইক দেয়, কমেন্টস করে। একজনকে পেয়েছি ২০১৪ থেকে যাই লিখেছি তাতেই লাইক দিয়েছে। আমি কারো ভাই, কারো পিতৃসম, কারো আঙ্কেল, কারো বন্ধু হয়ে উঠেছি। আমার ভাললাগে এসব! অনেক পিচ্চি বন্ধুও আছে। পনেরো বিশ বছরের কিন্তু বন্ধু হতে আটকায়নি। অনেকের সাথে চেনা পরিচয়ও হয়েছে। যখন বইমেলায় যাই আমার নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে পরিচয় হয়। বই কিনে অটোগ্রাফ নেয়। আমার যারা ফলোয়ার তারাও। এরচেয়ে সুন্দর আর কি হতে পারে!
ফেসবুক একটা অসাধারণ মাধ্যম। মানুষের কাছে যাওয়ার মাধ্যম। মানুষকে ভালবাসার বিরাট সুযোগ। করোনাকালের এই অবরুদ্ধ জীবনে ফেসবুক এক মহা আর্শীবাদ। না হলে জীবন হতো আরো দুঃসহ। ফেসবুক থাকার কারণে দ্রæত তথ্য আদান প্রদানই নয়, আত্মীয় বন্ধুদের সাথে কমিনিউকেশন সহজ হয়েছে। আবার মনের উপর চাপও বেড়েছে। খারাপ সংবাদগুলো দ্রæত ছড়িয়ে পড়ছে। তা সত্বেও ফেসবুক উপকারীও বটে। নানা গ্রুপ হচ্ছে, লেখালেখির গ্রুপ, কবিতার গ্রুপ, সাহিত্যের গ্রুপ, বিজনেস গ্রুপ। ফেসবুক এক বিশাল সমুদ্রের মতো। ফেসবুক থাকায় অনেকে পত্র পত্রিকায় লেখাই ছেড়ে দিয়েছে। যারা আগে কখনো লেখালেখি করেননি তারাও লিখে হাত পাকিয়েছেন। লেখক তৈরী হয়েছে। পাঠক সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ এখনও পড়ে। ভাল লেখা অবশ্যই পড়ে।
আমার একজন বন্ধু আছে। বয়স বাইশ তেইশ হবে। দুবাই থাকে। সুদর্শন দেখতে। একবার আমার সাথে দেখা হয়েছে। ফেসবুকে তার প্রায় পঞ্চাশ হাজার ফলোয়ার! ভাবা যায়! হ্যাঁ ভাল যেমন আছে মন্দ দিকও আছে কিছু। ফেসবুকের কারণে অনেকের সাথে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে। আবার অনেক মধুর সম্পর্ক গড়েছে। অচেনা চেনা হয়েছে। অধরা ধরা দিয়েছে। প্রেম, প্রণয়, হয়েছে। ভাঙ্গনও হয়েছে। ফেসবুকের কারণে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে উঠেছে, অন্যায়ের প্রতিকার হয়েছে আবার মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে সমাজ ও ব্যাক্তির ক্ষতি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কারনে দেশে দেশে আইন পর্যন্ত হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। অনেকে সরকারের রোষানলে পড়েছে। ফেসবুকের কল্যানে কে সত্যিকার আদর্শবান, কে চামচা সেসব চেনাও সহজ হয়েছে। লুটেরাদের সম্পর্কে জানতে পারছে মানুষ। অনেকে আছে মাত্র এক লাইন দু’লাইন পোষ্ট দিয়েই সেলিব্রেটি! কয়েক হাজার লাইক আর কমেন্টস থাকে। কেউ কেউ শুধু ছবি পোষ্ট করেই সেলিব্রেটি! বিশেষকরে মেয়েরা। নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন একটা আর্ট বটে। অনেক গ্রুপে দেখা যায় সস্তা আর আধা অশীল টাইপ লেখায় হাজার হাজার লাইক কমেন্টস থাকে। তবে ফেসবুকে মানুষ সবসময় ভাল লেখা, সত্যবাদিতা আর সহজ সরল ভাষা পছন্দ করে।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই দেখি ম্যাসেজে ভরে আছে ইনবক্স। অনেকে বিরক্ত হন। আমি হইনা। এসব থেকেও অনেক কিছু জানার থাকে। আমি সহজে আনফ্রেন্ড বা বক করি না কাউকে, তাই অনেক রিকোয়েষ্ট অপেক্ষমান আছে, তাদের সুযোগ দিতে পারি না বলে খারাপ লাগে। আবার একেবারেই যে আনফ্রেন্ড করি না তা না, বকও করি। অনেকে দীর্ঘদিন থেকে নিথর হয়ে আছে। হয়ত সে আর এক্টিভ নাই। অনেকে যন্ত্রণায় অতিষ্ট করে ফেলে তাদের বাদ দেই। ঘোষনা দিয়ে বাদ দেওয়ার পক্ষে আমি নই। বাদ দিতে গিয়ে অনেক সময় ভুল হয়। আমাকেও অনেকে বাদ দেয় নিশ্চয়ই। অনেকে প্রোফাইল লক করে ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট পাঠায়, তাদেরও আমি সুযোগ থাকলে একসেপ্ট করি। অনেক ফেক আইডি থাকে সেগুলো জানতে পারলে সরিয়ে দেই।
বন্ধু তালিকায় একমুখো এবং দলকানা আছে অনেক। সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন খারাপ ঘটনাগুলো ঘটে তখন তারা নিশ্চুপ থাকেন। তাদের সুযোগ সুবিধা নষ্ট হতে পারে এই ভয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না। বরং ঘটনা অন্য দিকে প্রবাহিত করার জন্য তখন ফুল পাখী লতা পাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সমাজের চেনা মানুষরাই এটা করেন। ফেসবুকের কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের সরকার অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটাও বিরাট প্রাপ্তি। সর্বশেষ উদাহৱণ জর্জ ফ্লয়েড।
অনেকে ধর্মীয় ব্যাপার নিয়ে খুব সোচ্চার। যে কোন ছোট খাট ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এইসব ক্ষেত্রে আমি নিরব থাকার চেষ্টা করি। কাউকে সমর্থন করি না। ধর্মের চেয়েও মানুষ বড়। মনুষত্ব বড়।
আমাকে যারা একদমই পাত্তা দেয় না, কখনো কোনো লেখা বা পোষ্টে লাইক কমেন্টস করেনা তেমন বন্ধুও আছে ভুড়ি ভুড়ি। কিন্তু তাদের পোষ্টে আমি সাড়া দেই। এটা তাদের প্রাপ্য বলে তারা মনে করে, আমারও তাতে সম্মতি আছে। অনেকে আছে লেখা পড়ে ঠিকই কিন্তু লাইক কমেন্টস করে না। তাদের কিছু হিসাব নিকাশ আছে। লাইক দিয়ে অন্যের বিরাগভাজন হতে চায় না এমনও আছে। আবার অনেক হেভিওয়েট যারা তারা মনে করে কোনো একজনকে লাইক দেওয়া মানেই তাকে উপরে তুলে দেওয়া বা অন্যে কি ভাববে! অনেকে আছে বন্ধু হয় কিছু পাওয়ার জন্য। কেউ কেউ শুরুতেই টাকা পয়সা চেয়ে বসে। বিভিন্ন জনের বিভিন্ন ধরণের দাবী থাকে। অনেকের সত্যি সাহায্যের প্রয়োজন। কিছু বন্ধু আছে অলঙ্কার হিসাবে। নিজের ফেসবুকের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য।
ফেসবুক মানুষের মনোজগত চিনতে সাহায্য করে। কেনো যেনো মনে হয় পরষ্পরের প্রতি বিশ্বাস আর আস্থার সঙ্কটে ভুগছি আমরা। অনেকে বিশ্বাসের অমার্যদা করে বলেই এমনটা হচ্ছে। মেয়েরা বেশি যন্ত্রণাগ্রস্থ হয়, পুরুষও হয়। তাই আস্থার জায়গাটা ফিরিয়ে আনতে হবে। সবকিছুরই ভাল মন্দ থাকে। তাই আমাদের সবসময় ভালর অন্বেশন করতে হবে। ফেসবুকের কারনে দ্রæতই বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের রকমফের। অনেকে সামান্য কারণে ভুল বোঝে, অভিযোগ করে। আমার সম্পর্কেও অভিযোগ আছে। যে কেনো সম্পর্কই হচ্ছে রেসিপ্রোকাল। গিভ এন্ড টেক। আমি যে কারো বন্ধু হতে পারি। আমার কোনো সমস্যা নাই। সেদিন দেখলাম একজন লিখেছে, তার বন্ধু হতে হলে রেফারেন্স লাগবে। আমার এসব মনে হয় না।
কিছু সম্পর্ক আছে পাথরের মতো ভারি। বহন করা যায় না। যন্ত্রণাদায়ক। কিছু আছে তোষামোদির সম্পর্ক। বস আর কর্মচারি যেমন তেমন। কিছু আছে লেনাদেনার। যেখানে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা আছে সেখানে তোষামোদি আছে। ক্ষমতায় থাকা লোকরা জানে কিছু লোক তার সবকিছুতে লাইক দেবে। অনেকে আবার মনে করে সেই বেষ্ট। তাকে কেয়ার করতে হবে। বিচিত্র এই দুনিয়া, বিচিত্র মানুষের মন। আমি নিয়মিত বন্ধুদের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাই। মৃত্যু, অসুস্থতা, সাফল্য, আনন্দ বেদনার ঘটনাগুলোতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি সাধ্যমতো। আমাকে অপছন্দ করে এমন মানুষেরও অনেক কিছু আমার পছন্দ হয়।
আমার নিজেরও অনেক ক্রুটি আছে। আমি তোষামোদি করতে পারি না। কিছু পাওয়ার আশায় বসে নেই। জীবনে অনেক কিছু পাব না, তাই বলে জীবন বৃথা হয়ে যাবে না। আমি যে কেনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। এমন কোনো অন্যায় ঘটনা নাই যার আমি প্রতিবাদ করিনি। দ্রæত রিএক্ট করি। এটা আমার স্বভাব। এজন্য কিছু বন্ধু আমাকে পছন্দ করে না। অনেকে আমাকে খারিজ করে দেয়। আমার বন্ধুরা প্রায়ই বলে প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নাই। তোমার কাজ লেখালেখি সেটা করো। বিপবী হওয়ার দরকার নাই। কে কাকে লাইক, কমেন্টস করল এটাও অনেক বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সমালোচনাম‚লক কমেন্টস সহজভাবে নিতে পারি না। মতামত দেওয়ার অধিকার সবার আছে কিন্তু আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে আনফ্রেন্ড করি বা আক্রমন করি। বন্ধুদের সবার লেখা আমি মন দিয়ে পড়তে চেষ্টা করি। মন্তব্য করতে গিয়ে আমি অনেক ফান করি, এটা আমার স্বভাব। আবার অন্যায়গুলোর বিরুদ্ধে কড়া মন্তব্য করতে দ্বিধা করি না। কখনো কখনো কৌশলীও হই।
সুস্থ্য বিতর্ক অবশ্যই কাম্য। একজনের লেখা থেকেই মানুষটির ব্যাক্তিত্ব বোঝা যায়। রুচি, সংস্কৃতি বোঝা যায়। লেখা মনের আয়না। অনেকে আছেন তিনি যে অনেক বড়, তার যে অনেক যোগাযোগ এটা প্রমানেই ব্যস্ত থাকেন। অনেকে ঘরবাড়ি, শাড়ি, গয়না, বাগান, রান্না, বান্না, বন্ধু আত্মীয়, স্ত্রী, সন্তানের ছবি পোষ্ট করতে, সন্তানের গল্প করতে ভালবাসে। এটাই ফেসবুক। আমিও এসব করি। মোটকথা পরিমিতিবোধটাই আসল। সবচেয়ে বেদনার কথা হচ্ছে আমার অনেক বন্ধু এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। করোনাকালে জীবন আরো অনিশ্চিত। যে যায় সে আর ফেরে না। অনেকের খবর জানতেও পারি না। একদিন আমিও চলে যাব। অনেকেই জানবে না। পজেটিভ মনোভাব সবসময় সমাজ এবং সম্পর্কের জন্য ভাল। সবাই ভাল থাকুন। সুন্দর থাকুন। ফেসবুক নিয়ে আপনাৱ অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করতে পারেন।
টরন্টো ১১ জুন ২০২০

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge