শনিবার, ২২ Jun ২০২৪, ০৫:৫৮ পূর্বাহ্ন

ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের জীবনবোধ ও শিল্পচেতনা: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা-ড. এ. আই. এম. মুসা

ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের জীবনবোধ ও শিল্পচেতনা: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা-ড. এ. আই. এম. মুসা

ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের জীবনবোধ ও শিল্পচেতনা: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
ড. এ. আই. এম. মুসা

যে কয়জন ঔপন্যাসিকের নিরন্তর শ্রম আর নিরলস সাধনায় বাংলাদেশের উপন্যাস ঋদ্ধি লাভ করেছে সেলিনা হোসেন (জ. ১২ জুন, ১৯৪৭ ) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিষয়ের অভিনবত্ব ও বৈচিত্র্যে, জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্যে, প্রকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সেলিনা হোসেন বাংলাদেশের উপন্যাসে আপন প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। বিচিত্র বিষয় ও ভাবকে আশ্রয় করে সেলিনা হোসেন উপন্যাস রচনা করেছেন। তবে তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তু যাই হউক না কেন, বক্তব্য ও জীবন-চেতনার অন্তর্প্রবাহে সর্বদাই সক্রিয় থেকেছে বিরুদ্ধ প্রতিবেশে সংগ্রামরত মানুষের মুক্তির অন্বেষা এবং বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব অনুসন্ধান।
সেলিনা হোসেন ছিলেন উদার মানবাতাবাদী শিল্পী। মানুষকে তিনি শুধু মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। মানুষকে কোনো ধর্ম, নীতি, আদর্শের মানদণ্ডে বিচার করতে চাননি। তাই তাঁর উপন্যাসে পাপী অপরাধী নিকৃষ্ট মানুষ পাওয়া যায় না। তাঁর উপন্যাসের বেশির ভাগ মানুষই শুদ্ধ মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ আর বাকীরা মানবিকতা বিচ্যুৎ রক্তমাংসের স্বাভাবিক মানুষ। ফলে তাঁর উপন্যাসে অনুরণিত হয়েছে সকল প্রকার বিরুদ্ধ পরিবেশ-প্রতিবেশ আর বন্ধন থেকে মানব মুক্তির অন্বেষা।
আর এ জন্যই তার উপন্যাসের মানুষ হয়েছে স্বাভাবিক অভিজ্ঞতায় প্রাপ্ত সাধারণ মানুষ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
বেশির ভাগই তাদের কথা- যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, উদয়াস্ত পরিশ্রমের পরও পেট ভরে না, পেটের চামড়া পিঠের চামড়া এক হয়ে থাকে এবং যাদের মুখ দিয়ে গাঁজলা ওঠে। এছাড়া আমাদের চারপাশে আরও মানুষ রয়েছে যারা মধ্যবিত্তের নিগড়ে বাঁধা- বিশাল কিছু করতে দিয়ে অলীক স্বপ্নে হারিয়ে যায়, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে দ্রুত নষ্ট হয় এবং নিজেদের অবস্থান কোথায় জানে না। এরা সুবিধাবাদী এবং পলায়নপর। শিক্ষার বড়াই করে অথচ রুচিহীনতায় ভোগে, সংস্কার ভাঙতে গিয়ে সংস্কারের জালে জড়িয়ে থাকে, যাদের জীবনে এখনও কোনো নাগরিক বোধ প্রবেশ করেনি। এরাই তো আমার চারপাশের মানুষÑ আমি এদের কথাই বলতে চাই।
ইতিহাস সেলিনা হোসেনের সৃজনপ্রেরণার প্রধান উৎস। ধাবমানকাল থেকে সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসও তাঁর সৃষ্টিতে স্থান পেয়েছে। এই ইতিহাস সংলগ্নতার মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালি জাতির অস্তিত্বের উৎস-বিন্দুকেই অনুসন্ধান করার প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন তাঁর সৃজন কর্মের এই ইতিহাস ঘনিষ্ঠতাই পাঠককে বিশেষভাবে আকর্ষণ করবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
সাহিত্য একজন মানুষের আত্ম-আবিষ্কার, সেজন্যই পাঠক তাঁর কাছে যাবেন। সাহিত্য ব্যক্তির দর্পণ- সেখানে তিনি নিজেকে দেখতে পান সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়। সেজন্যই যাবেন। পাঠক যাবেন তাঁর প্রয়োজনে, তাঁর অন্তরের টানে। আমার গল্প উপন্যাসের কাছে কেন যাবেন? ভাবার বিষয়। এ পর্যন্ত ধ্রুপদী কিছু তৈরি করেছি এ ধরনের প্রত্যাশার ধৃষ্টতা নেই। আদৌ কিছু হয় কি না সে বিচারও সময় করবে। শুধু এটুকু বলতে পারি যে নিজের মাটি এবং ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে দেশীয় চেতনায় আত্মস্থ করি বলেই পাঠক আমার রচনার কাছে আসবেন।
শুধু ইতিহাস নয়, বাঙালি জাতির হাজার বছরের মিথিক ঐতিহ্যও সেলিনা হোসেনের শিল্পীসত্তার অন্যতম প্রাণবায়ু। বাঙালি জাতির মিথিক ঐতিহ্যের মধ্যে তিনি বাঙালি জাতিসত্তার শক্তি ও সম্ভাবনার দিককেই অনুসন্ধান করার প্রয়াস পেয়েছে। তবে বাঙালির সাহসী ও সংগ্রমী সত্তাকে অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি কখনই উদ্দেশ্য তাড়িত হননি। অবশ্য সমালোচক এ প্রসঙ্গে বলেন:
বাঙালি জাতির কৃতি ও কীর্তি সবটাই সেলিনা মোটামুটিভাবে তাঁর সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন। আমি দেখেছি, সামাজিক গুরুত্ব নেই এমন জিনিস নিয়ে সেলিনা হোসেন লেখেন-ই নি। বরং তাৎক্ষণিকভাবে লেখার জন্য কিছু কিছু লেখার মানটা হয়তো অনেকটাই নেমে গেছে। তেমন ভালো হয়নি। কিন্তু সাড়া তিনি দিয়েছেন।
এক্ষেত্রে শৈল্পিক নিরাসক্তিও বিস্মৃত হননি। তাই তিনি উচ্চারণ করেন:
তবে লিখে বিশাল দিক-বদল ঘটাবো, এমন প্রত্যাশ কখনো করি না।… নেহাত অন্তরের তাগিদ থেকে। এই টান নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো চেনা সড়কে উঠিয়ে দেয়। তারপর এগোই ঘাস-লতা-পাতা, ফুল, পাখি, মাটি-মানুষ সম্বলিত জনপদের মধ্য দিয়ে নিজস্ব কলা কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলের জগতে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে। তাই লিখতে হয়। লিখি মনেপ্রাণে একজন বাঙালি থাকার বাসনায়।
তবে সেলিনা হোসেন বিশ্বাস করেন একজন শিল্পীকে শুধু ইতিহাস ঐতিহ্য নির্ভর হলেই চলে না। এই ইতিহাস ঐতিহ্য অবলোকনে একজন শিল্পীর থাকতে হয় প্রাজ্ঞ-অন্তর-দৃষ্টি। থাকতে হয় দেশীয় কৃষ্টি-কালচারকে আত্মস্থ করার বিশেষ শক্তি। এই প্রসঙ্গে সেলিনা হোসেনের অভিমত প্রণিধানযোগ্য:
একজন লেখক তাঁর সাহিত্য-ভাবনাকে রাষ্ট্র, সমাজ, মানুষ এবং দেশজ প্রকৃতির মধ্যে চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। সে শেকড় চলে যায় গভীর থেকে গভীরে। তিনি অনবরত সেখান থেকে রস শোষেণ। এই শোষার মধ্যে লেখক থেকে লেখকে পার্থক্য আছে। যিনি যতো গভীর করে আত্মস্থ করেন, তিনি ততো বড়ো শিল্পী। সাহিত্যের অনেকগুলো বিষয় আছে যা চিরকালীন। যেমন প্রেম, মানবতা ইত্যাদি। কিন্তু লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং রচনার কৌশলের গুণে তার স্বাদ আলাদা হয়ে যায়। তাই একজন লেখকের সাহিত্য-ভাবনায় আত্মস্থ এবং প্রকাশ- এ শব্দ দুটো অনবরত ক্রিয়াশীল। প্রথম শর্ত বক্তব্যের গভীরতা। নিজস্ব অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং বৈদগ্ধ্যের জারক রসে আত্মস্থ করা। দ্বিতীয় শর্ত নির্মাণ-কৌশল। নির্মাণের মাধ্যমে শিল্পের কারুকাজ প্রস্ফুট করে তোলা। এই দুইয়ের সাযুজ্য এবং সম্মেলনের প্রগাড় বিন্যাস আমার সাহিত্য-ভাবনার প্রাথমিক পদক্ষেপ।
অনেক সমালোচক সেলিনা হোসেনের উপন্যাসকে ‘থিম’ নির্ভর উপন্যাস বলে থাকেন। এটি অভিযোগ হোক কিংবা মূল্যায়ন হোক সেলিনা হোসেন একে অস্বীকার করেন না। এক্ষেত্রে তাঁর উপন্যাসের বিষয়বৈচিত্র্যও কম নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
আমি বিষয় নির্বাচন করে উপন্যাসের পটভূমি নির্মাণ করি। যেমন ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ। ‘যাপিত জীবন’ বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত। ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ চর্যাপদের পটভূমিতে রচিত হয়েও বাংলাদেশের জন্ম লগ্নের সঙ্গে প্যারালাল । ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাসের নায়ক সোমেন চন্দ ও মুনীর চৌধুরী দুজনেই ফ্যাসিবাদী শক্তির শিকার হয়েছেন। সোমেন চন্দকে রাজপথে মিছিলে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো আর মুনীর চৌধুরীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ধরে নিয়ে গেলো আলবদর বাহিনীÑ যাঁর লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ টেকনাফ – সেন্টমার্টিন দ্বীপের পটভূমিতে সংগ্রামী মানুষের গল্প, যারা উত্তাল সমুদ্রে জীবনপণ লড়াই করে জোগাড় করে নুন-ভাত। ‘চাঁদ বেনে’ উপন্যাসের নায়ক জোতদারের মাথাটাই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফুটবলের মতো লাথি দিয়ে ফেলে দেয় পদ্মার জলে। তার অবয়বে মনসামঙ্গলের চাঁদ সওদাগরের অমিত শক্তি। তাই শুকিয়ে যাওয়া খরাতাড়িত জনপদে টিকে থাকার জন্য সে পিছু হটে না। ‘কাঁটাতারের প্রজাপতি’ নাচোলের কৃষক বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত। ইলা মিত্রের মতো সংগ্রামী চরিত্রের পাশাপাশি আছে অসংখ্য সাধারণ মানুষ, যারা বিদ্রোহকে গতিদান করে। যারা বেঁচে যায় তারা নতুন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নেয়। এছাড়া ‘মগ্ন চৈতন্যে শিস’, ‘পদশব্দ’, ‘ক্ষরণ’ উপন্যাস মধ্যবিত্তের জীবনের পটভূমিতে রচিত। কেউ কেউ মূল্যবোধের অবক্ষয়ে তলিয়ে যায়- ভীষণ নিঃসঙ্গতা কাউকে কুরে খেলে সে মৃত্যু কামনা করে। তবুই এইসব নিয়েই মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখের জীবনযাপন।
সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের বিষয়বৈচিত্র্য যতই থাকুক না কেন, সবকিছুর অন্তরমূলে সক্রিয় থেকেছে মানুষ এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ, যাতনা-যন্ত্রণা, লোভ-হিংসা-ঘৃণা, হাসি-কান্না ইত্যাদি চিরায়ত মানবিকবোধ। আর এসবকিছুই তাঁর সৃষ্টির নিরন্তর প্রেরণার উৎস। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিব্যক্তি:
লেখালেখি যখন শুরু করি তখন বিশ্বাবিদ্যালয়ে পড়ি। পেরিয়ে এসছি শৈশব-কৈশোরের সোনালি সময়। এর মধ্যে অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে জমতে শুরু করেছে অনেক রঙিন নুড়ি-এগুলো বুকের ভেতর টুং টুং বাজে। সে শব্দ শুনি আর দেখি, চারদিক দেখি, দেখা আর ফুরোয় না। অন্তহীন বিস্ময় নিয়ে আমার সামনে দুয়ার খুলে দেয় মানুষ আর প্রকৃতি। তখন আমার চারিদিকে জীবনের কোলাহলÑ দেখছি মানুষ, তার লোভ, হিংসা, ঘৃণাÑ দেখছি হৃদয়ের জটিলতা, বিচিত্র স্বভাবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের অদ্ভূত সম্পর্ক। আপন সন্তান, মা-বাবা, ভাই-বোন প্রতিবেশী, চেনাজানা লোকেরা সব এক অস্থির জটিল আবর্তে ঘুরপাক খায়। অর্থের সম্পর্ক ভেঙেচুরে তছনছ করে প্রচলিত মূল্যবোধকে- বদলে দেয় জীবনযাপনের অনেকটা। দেখেছি আপন সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কী নির্মম আচরণ।
সেলিনা হোসেন নারীকেও এই প্রবহমান বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবেই দেখেছেন। নারীকে তিনি বৃহত্তর সমাজ থেকে আলাদা করে দেখার পক্ষপাতি নন। তাই তিনি বলেন:
আমার সাহিত্যে নারী শুধু নারী বলে আসে না, তারা মানুষÑ সুখে দুঃখে, আনন্দ বেদনায়, সংগ্রামে, জীবনযাপনের লড়াইয়ে পুরষের সঙ্গী। সমাজের বৃহৎ পটভূমিতে তাদের অবস্থান, আমি সেভাবে তাদের চিত্রিত করি।
সেলিনা হোসেনে নারী বিষয়ক উপন্যাস দীপান্বিতা, মোহিনীর বিয়ে, লারা কিংবা আণবিক আঁধার উপন্যাসে এই বক্তব্যেরই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সেলিনা হোসেনের নারী বিষয় উল্লিখিত বক্তব্যেও প্রমাণ পাওয়া যাবে তঁর নিম্নরূপ মন্তব্যে:
আমি কট্টর নারীবাদী নই। সমাজ নারী-পুরুষের যৌথ সৃষ্টি। পাঁচ জন পাঁচশো জন পুরুষের কারণে গোটা পুরুষ সমাজকে আমি দোষারোপ করতে চাই না। উদার, সহনশীল, সহানুভূতিশীল পুরুষ মানুষের উদাহরণ আমার শৈশব পরবর্তী জীবন থেকে আজ পর্যন্ত অজস্র আছে, যাদের ছাড়া এই আমি হয়তো আমি হতে পারতাম না। সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ে নির্যাতিত হয়, তবে পুরুষদের চেয়ে মেয়েরা খানিকটা বেশি নির্যাতিত হয় তাদের শরীরের প্রাকৃতিক গঠনের কারণে এবং সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে। দুটোই অত্যন্ত মৌল সমস্যা। তৃতীয় বিশ্বের একজন লেখক হিসেবে নারীমুক্তির জোয়ারকে আমি ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখি- খানিকটা নাড়া দিয়ে যদি এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায় – সেই সব কতিপয় মানুষে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন যদি হয়, যারা পথরোধ করে- সেইটুকুই লাভ। নইলে আর্থসামাজিক পরিবর্তন ছাড়া ব্যাপক কোনো পরিবর্তন অসম্ভব।
তবে তিনি বিশ্বাস করেন এবং প্রত্যাশা করেন নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবে, শিক্ষায়-দীক্ষায় অগ্রগামী হবে। আর নারী যদি এই শিক্ষিত স্বাবলম্বী হয়ে যায় নারী সংক্রান্ত অনেক সমস্যাই সমাজে নির্মূল হয়ে যাবে। তাই তিনি বলেন:
কর্মজীবী মহিলা আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্রী। ঘরে বাইরে তাদের শ্রম অনেক বেশি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি। আমি চাই প্রতিটি মেয়েই- বিশেষ করে মুসলিম সমাজের মেয়েরা তো বটেইÑ কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসুক। নয়তো আমাদের অগ্রগতি বিশেষভাবে ব্যাহত হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরুষের ওপর নির্ভর করা গৃহকোণ যেন তাদের কাক্সিক্ষত না হয়। নইলে যে নারী-প্রগতির কথা আমরা বলি- তা শুধুই হবে মুখের বুলি, যার থাকবে না কোনো বাস্তব ভিত্তি।
্১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল- এই ত্রয়ী কালখণ্ড বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ সময়। উল্লিখিত কাল পরিসরেই সেলিনা হোসেনের জন্ম নেয়া, বেড়ে ওঠা এবং একজন কথাশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। এই ত্রয়ী সময়ের অভিঘাতেই তৈরি হয়েছে সেলিনা হোসেনের শিল্পীমানস। তাই সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে সময়চিত্রই মুখ্য হয়ে ফুটে উঠেছে। এই সময় পরিসরে বাঙালি জাতি দুঃখ-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেমন অগ্রসর হয়েছে তেমনি করেছে দ্রোহ-বিদ্রোহও। তাই বাঙালি জাতিসত্তার দ্রোহ-ও সংগ্রামের অবিনাশী বাণীই চিত্রিত হয়েছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে।
১৯৭০ সাল থেকে সেলিনা হোসেনের শিল্পসাধনার সূচনা এবং এখন পর্যন্ত তিনি এই সাধনায় নিবিষ্ট। প্রায় অর্ধ-শতাব্দীর কাল পরিসরে তিনি বাঙালিকে চিনিয়েছেন আপন সত্তা, আপন পরিচয়। প্রথম পর্বে তিনি মার্কসীয় জীবনদর্শন রূপায়ণের মধ্য দিয়ে বাঙালির মুক্তি ও বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছেন উত্তর সারথি ও জ্যোস্নায় সূর্যজ্বালা উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। পরে তিনি বুঝতে পারেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ও জাগরণের মধ্য দিয়ে ঘটবে বাঙালি জাতির মুক্তি। তাই তিনি নিবিষ্ট হন বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সন্ধানে। ইতিহাস অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব অন্বেষণ করেছেন। এই ধারায় তিনি লিখলেন যাপিত জীবন, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, কাঁটাতারে প্রজাপতি, ভালবাসা প্রীতিলতা এবং ত্রয়ী উপন্যাস গায়ত্রী সন্ধ্যা। স্বাতন্ত্র্যকামী বাঙালির সংগ্রামী মহিমা কীর্তনই আলোচ্য উপন্যাসসমূহে প্রাণ পেয়েছে। শুধু ইতিহাস নয়, মিথিক ঐতিহ্য নিয়েও তিনি উপন্যাস রচনা করেছেন। এই পর্বে তাঁর সৃষ্টি নীল ময়ূরের যৌবন, চাঁদবেনে এবং কালকেতু ও ফুল্লরা। প্রথম উপন্যাসে স্বাতন্ত্র্যকামী বাঙালির স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন উন্মোচিত হয়েছে, দ্বিতীয় উপন্যাসে মনসামঙ্গলের দ্রোহী প্রাণ পুরুষ চাঁদ সওদাগরের সংগ্রামী অপরাজেয় সত্তাকে ক্ষেতমজুর চাঁদের সাথে সমান্তরাল করে সমকালীন শ্রেণি সংগ্রামের ইতিবৃত্তকে শব্দরূপ দেয়া হয়েছে। তৃতীয় উপন্যাসে সমকালীন স্বৈর শাসকের শোষণ-লুটপাট কালকেতু ও ফুল্লরা চরিত্রে বাণীরূপ লাভ করেছে। আর এ সবকিছুর মধ্যে বাঙালির সংগ্রামী অবিনাশী শক্তিই মূর্ত হয়ে ওঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি রচনা করেছেন দুটি উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস হাঙর নদী গ্রেনেডে একটি গ্রামের মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালির সাহস, ত্যাগ আর জনযুদ্ধের স্বরূপকেই তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় উপন্যাস যুদ্ধের মধ্যে বাঙালির প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ইতিবৃত্ত প্রাণ পেয়েছে। তবে উভয় উপন্যাসে বাঙালি জাতিসত্তার সংগ্রামী ঐতিহ্যকেই আলোকিত করা হয়েছে।
আঞ্চলিক জীবন নিয়ে রচিত হয়েছে জলোচ্ছ্বাস ও পোকামাকড়ের ঘরবসতি শীর্ষক দুটি উপন্যাস। এই দুটি উপন্যাসে আঞ্চলিক জীবনকে কেন্দ্র করেই সর্বজাতির মুক্তির সংগ্রাম প্রতীকায়িত হয়েছে। পোকামাকড়ের ঘরবসতির মালেক চরিত্রের মধ্য দিয়ে সেলিনা হোসেন বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের প্রাণ পুরুষ বঙ্গবন্ধুর জীবন সংগ্রামকেই প্রতীকী তাৎপর্যে বিশিষ্ট করে তুলেছেন।
নাগরিক মধ্যবিত্তের ক্ষরণ, যাতনা, হতাশা ও নিঃসঙ্গতাকেও তিনি তাঁর উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন। মগ্নচৈতন্যে শিস, পদশব্দ, ক্ষরণ উপন্যাসে এই সুরই মুখ্য হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
নারীর সংকট এবং সংগ্রামকেও তিনি তাঁর উপন্যাসে ভিন্ন দৃষ্টি এবং স্বাতন্ত্র্যচেতনায় উন্মোচন করেছেন। তবে এই ক্ষেত্রে তাঁর অবলোকন শুধু সমসাময়িক সময় ও সমাজে কেন্দ্রীভূত থাকেনি। অতীত সময় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই তিনি নারীর সংকটকে চিত্রিত করেছেন।
ভিন্নতর মানবিক স্বভাববৈশিষ্ট্য ও চেতনার ছবি অঙ্কিত হয়েছে তার কতিপয় উপন্যাসে। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায় টানাপোড়েন, কাঠকয়লার ছবি, ঘুমকাতুরে ঈশ্বর ও মর্গের নীল পাখি উপন্যাসের কথা। যেখানে মানুষই মুখ্য এবং মানুষের চিরায়ত স্বভাববৈশিষ্ট্য প্রধান। মানুষের মানবিকগুণ অবলোকনে এখানে কোনো নীতি আদর্শকে সেলিনা হোসেন আশ্রয় করেননি বরং উদার মানবিক দৃষ্টি দিয়েই তিনি মানুষকে দেখেছেন।
মোটকথা উদার মানবতাবাদী কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বাঙালি-জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য ও সংগ্রামী ঐতিহ্যকেই তাঁর উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন। ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন অবিভক্ত বাংলার এবং সমগ্র বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মুক্তিচেতনার রূপকার। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাঙালি ও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর অন্তরে সেলিনা হোসেনের সৃষ্টিকর্ম বহুকাল ধরে অনুরণিত হবে।

তথ্যনির্দেশ ও টীকা
সেলিনা হোসেন, নির্ভয় করো হে, অনন্যা, ঢাকা, জানুয়ারি ২০১০, পৃ. ২৮৩
প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৭
হাসান আজিজুল হক, ‘সেলিনার বাংলাদেশ’, চন্দন আনোয়ার সম্পাদিত, গল্পকথা, ৫ম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃ. ৪৭
সেলিনা হোসেন, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৭৭
সেলিনা হোসেন, স্বদেশে পরবাসী, জনতা প্রকাশ, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃ. ১৬-১৭
সেলিনা হোসেন, নির্ভয় করো হে, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৮৪
সেলিনা হোসেন, প্রাগুক্ত, ২৮৫-২৮৬
প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৯
প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৯
প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮৪

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge