শনিবার, ২২ Jun ২০২৪, ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন

একটি সাধারণ প্রেমের গল্প-কাজী সালমান শীশ

একটি সাধারণ প্রেমের গল্প-কাজী সালমান শীশ

ছোটবেলায় নানা কারণে আমার মনে বিদেশের প্রতি একধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল, আরো অনেকের মত। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিমণ্ডলে জন্মানো বহুসংখক শিশু, কিশোর, যুবক, এমনকি বৃদ্ধদের মনে বিদেশের প্রতি আলাদা ফ্যাসিনেশন কাজ করে। বিদেশ বলতে আসলে কী বোঝায় সেটাও একটা প্রশ্ন, তবে সাধারণত এই অঞ্চলের লোকরা বিদেশ বলতে সাদা চামড়াদের দখলকৃত দেশ বুঝে থাকে, নির্দিষ্ট করে না বলা থাকলে। বিদেশ বলতে বুঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোকে। অবচেতন মনে কাজ করে- বিদেশে অনেক টাকা উড়ছে, ওদের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মার্কেট, পাহাড়, জঙ্গল সকল কিছু খুব সুন্দর, গাছগুলো সবুজে ঘেরা আর রাস্তা সাদা তুষারে ঢাকা। বিদেশীরা দামী দামী গাড়ি চালিয়ে দূর-দুরান্তে বেড়াতে যায়, চোর নেই, ভিক্ষুক নেই, অনেক মজার মজার খাবার পাওয়া যায় সেখানে ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসমস্ত ধারণার অধিকাংশই ভুল বা আংশিক সত্য কারণ পশ্চিমা বিশ্ব স্বর্গ নয়। সেখানে অনেক কিছুই নিয়মত্রান্ত্রিকভাবে চলে ঠিকই, কিন্তু তার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। ড্রাগস নেয়া, গৃহহীন মানুষের চলাফেরা, গাড়ি দুর্ঘটনা, মাতাল হয়ে মারামারি বেশিরভাগ পশ্চিমা দেশেরই প্রতিদিনের ঘটনা। যে পাহাড় দেখতে সবুজ, যে রাস্তা কার্পেটের মত, যে মানুষগুলো দেখতে সাদা, তা সকলের জন্য সুন্দর ও সহজ নাও হতে পারে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন সকল জায়গায় রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে রাশি রাশি নিষ্ঠুর ঘটনা। সহজকথায় ভালো ও মন্দ দুইটি বিষয়ই রয়েছে দেশে, বিদেশে ও সারাবিশ্বে।
আমি বায়েজিদ রেজা, থাকি আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার একটা গ্রামে প্রায় দশ বছর ধরে। এরা ক্যারোলিনাকে বলে ‘ক্যারোলাইনা’।চল্লিশ পেরুনোর পর আমি এদেশে আসি। অনেকগুলো স্টেট ঘুরে শেষ পর্যন্ত থিতু হই নর্থ ক্যারোলিনায়। ছবির থেকেও বহুগুণ সুন্দর, পরিষ্কার, নির্মল চারদিক। নীলচে পাহাড়ের মধ্যে ছোট্ট একটি গ্রামে আমার বসবাস। গ্রীষ্মকালের রাতে আকাশে তারা আর চাঁদের আলো ভরে থাকে, আর শীতকালে তুষার। ভালো ঠাণ্ডা পড়ে তবে এদেশের উত্তরের অনেক প্রদেশের তুলনায় ঠাণ্ডা কম। আমি কাজ করি এখানের একটা পোস্ট অফিসে। চিঠি ও পার্সেলগুলোতে ট্যাগ লাগিয়ে স্টোর থেকে রিলিজ করাই আমার কাজ। একা মানুষ দিন চলে যায় ভালোই। উইন এন্ডে মাছ ধরতে যাই, গাড়ি নিয়ে এখানে ওখানে ঘুরে আসি, মাঝে মধ্যে বারে বসে সময় কাটাই। এখানের বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষদের সাথে আমার সম্পর্ক নেই বললেই চলে। পঞ্চাশোর্ধ ব্যাচেলার দেখে আমাকে এরা অনেকেই কিছুটা অনিরাপদ মনে করে! ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর। আমিও সকলের সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি না, তাই সচেতন ভাবেই দূরত্ব বজায় রাখি। এর মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটে গেল। সেই গল্পটাই বলতে যাচ্ছি।
অফিসে আমাদের মোটামুটি সবসময়ই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশে যেমন লোকে বসে থেকে, হেঁটে ও মুখ গম্ভীর করে কাজ করে, এরা কাজ করে দাঁড়িয়ে, দৌড়ে ও হাসিমুখে। একদিন সেপ্টেম্বর মাসের সকালে একটা মেয়ে আসলো পার্সেল পাঠানোর জন্য। মেয়েটার বয়স ২০-২১ এর বেশি হবে না। আমি হাসিমুখে তার বাক্সটা নিয়ে প্যাকেট করে জিজ্ঞেস করলাম,
-এক্সপ্রেস অর নরমাল ডেলিভারি?
-নরমাল ডেলিভারি।
বুঝতে পারলাম মেয়েটা বাংলাদেশ থেকে এসেছে।
-বাংলাদেশী?
-জি। আপনিও বাংলাদেশী?
-হুঁ। তোমার পার্সেলটা নিউ ইয়র্ক পৌঁছাবে তিনদিন পর অর্থাৎ বুধবারের মধ্যে।
-ঠিক আছে। থ্যাংক্স।
-তুমি বলায় মাইন্ড করোনি তো?
-না না… আপনি আমার বাবার বয়সী। তুমি করেই তো বলবেন।
-মাস্টার্স করতে এখানে?
-জি না। অনার্স। আমি অ্যান্থ্রোপলজি পড়তে এসেছি।
-বাহ… খুব ভালো। এখানে অনেক বাঙ্গালী স্টুডেন্ট আছে, তবে বেশির ভাগই সায়েন্সের সাবজেক্টে পড়তে আসে। অ্যান্থ্রোপলজি পড়তে এসেছে বাংলাদেশ থেকে এই প্রথম শুনলাম।
-আমিও কাউকে পায়নি আমার কোর্সে। একজন আছে কলকাতার। মাত্র এক সপ্তাহ হলো এসেছি আমেরিকায়, কাউকে তেমন চিনি না।
– ভালো লাগছে?
-একদম না। মনে হচ্ছে কালকেই ফ্লাইট ধরে ঢাকায় ফিরে যাই।
-কয়েক মাস টাইম লাগবে মন বসতে। হোমসিকনেস কেটে গেলে দেখবে ধীরে ধীরে ভালো লাগছে। চিন্তার কিছু নেই।
পেছনে আরেকজন মধ্যবয়ষ্ক লোক এসে দাঁড়াল পার্সেল হাতে। আমি আর কথা বাড়ালাম না।
-ওকে তানিয়া কথা হবে। তুমি কি ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনায়?
-জি আঙ্কেল। কিন্তু আমার নাম জানলেন কীভাবে?
আমি একটু হেসে বললাম,
-তোমার পার্সেলে লেখা ছিল।
-ওহ তাই তো! ঠিক আছে, গুড বাই।
-গুড বাই।
সপ্তাহখানেক পরের কথা। আজকে আমার ছুটি। বেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম। রান্না করতে বা ঘর গুছাতে আলসেমী লাগছে যথারীতি, তাই রাইস কুকারে ভাত করে, ফ্রিজে থাকা মুরগী, সবজি, ডাল গরম করে খেয়ে নিলাম। বিকালে হাঁটতে বের হয়ে মনে হল ঘরে বাজার নেই। কিছুক্ষণ হেঁটে চলে গেলাম গ্রোসারিতে। ট্রলি নিয়ে কিনতে থাকলাম- রুটি, মাখন, দুধ, ফল, সবজি, টুনা মাছ, বাদাম ইত্যাদি। বিল দিতে লাইনে দাঁড়াব, তখন তানিয়ার সাথে দেখা। সেও ট্রলি নিয়ে ঘুরে বাজার করছে। আমি বিল না দিয়ে আবার গ্রোসারিতে ঢুকে গেলাম। মেয়েটা কেমন আছে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হল।
-কী খবর তানিয়া? কেমন আছো তুমি?
-জি আঙ্কেল ভালো আছি। আপনি ভালো?
-হুঁ। ভালো আছি। আবার দেখা হয়ে গেল।
-জি গ্রোসারি করতে আসলাম।
-বড় গ্রোসারি শপ এখানে এই একটাই। বাকি সবগুলো মাইল তিনেক দূরে। তাছাড়া এই শপটায় সব ধরনের মাংস পাওয়া যায়। বাংলাদেশী, পাকিস্তানী ও মিডিল ইস্টের বেশিরভাগ লোকেরই এই গ্রোসারিতে ভীড় বেশি।
-কেন?
-হালাল মাংসের জন্য। যাদের হালাল-হারাম নিয়ে রিজার্ভেশন আছে তারা সবসময় এখানে আসে। দাম বেশি দিয়ে গোশত কেনে।
-ও আচ্ছা।
-এইরকম আরো অনেক ব্যাপার আছে। কয়েকদিন পরেই বুঝতে পারবে।
-এইখানের বাংলাদেশীরা কি আমাদের দেশের থেকে বেশি কনজার্ভেটিভ?
-ঠিক তা না… বেশি কনজার্ভেটিভ হলে তো সাদাদের দেশে টিকতে পারবে না। এনিওয়ে তোমার গ্রোসারি কি শেষ?
-জি শেষ।
-চলো আমরা কোথাও বসে কফি খাই।
-ঠিক আছে… চলেন যাই। বিল দিয়ে বের হই।
এরপর সময় এগিয়ে চলল। মাসের পর মাস যেতে যেতে ছয় মাসের মাথায় ঘটনাটা ঘটল।
বলতে সংকোচ লাগছে… তানিয়ার সাথে আমার সখ্যতা ক্রমেই বাড়তে থাকল। মেয়েটা চুপচাপ একা একা সময় কাটাতে অভ্যস্ত। বেশি লোকজনের সাথে মিশে না, পার্টি, লং ড্রাইভ, হৈচৈ পছন্দ করে না। পড়াশোনা করে আর কখনো ইউনিভার্সিটির ট্রিপে অন্য স্টেটে ঘুরতে যায়। আমি তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। বুড়া বয়সে এইরকম ছোট একটা মেয়ের প্রতি আকর্ষন বোধ করায় নিজেকে মাঝে মাঝে অপরাধী মনে হত। রাতে ভালো ঘুম হত না। কোনো কিছুতেই মন বসত না। সারাদিন অন্যমনষ্কতায় দিন কাটত। মনটা পঁচিশ বছরের তরুণের মত আবেগী হয়ে উঠেছিল। যে আবেগ কোনো যুক্তি মানে না। মানে না অন্যকে আহত করার বাধা। তবুও তো অভিজ্ঞ মস্তিষ্ক… তাই একদিন ঠিক করলাম মেয়েটাকে সব বলে ফেলব। তারপর যা হবার হবে। সিনেমার গল্পের নায়কের মত আমি মেয়েটাকে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনারে ইনভাইট করলাম। আমি সিনেমা দেখতে পছন্দ করি না, তবুও ফিল্মের দুইটা টিকিট কেটে ফেললাম। পুরানো ক্লাসিক ছবি ‘রোমান হলিডে’। সিনেমা দেখে ডিনারে যাওয়ার প্ল্যান। মনে সংশয় কাজ করতে থাকল কাজটা ঠিক করছি, নাকি না?
সকল নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে নির্জন রেস্টুরেন্টে বসে তানিয়াকে মনের কথা খুলে বললাম। সে খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনল। শোনার পর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গীতে আমার প্রস্তাবটাকে পজেটিভলি নিল। বলল যে সেও আমার প্রতি দুর্বলতা অনুভব করছিল, কিন্তু সাহসের অভাবে বলতে পারছিল না।
-তানিয়া, আমার মন এখন কত খুশি তুমি ভাবতে পারবে না। অনেকদিন ধরে যেন বুকের ভেতর একটা পাথর আটকে ছিল। জীবনে আমি বহু কিছু পেয়েছি, বহু কিছু হারিয়েছি… কিন্তু এত রিলিফ কখনো বোধ করিনি।
তানিয়া কিছু না বলে চুপ করে থাকে। লজ্জায় তার ফর্সা গাল দুইটি লাল হয়ে গেছে। চশমার কাচও তার চোখ দুটিকে আড়াল করে রাখতে পারছে না। দীঘির পানির মত টলটলে চোখ মেয়েটার। এই প্রথম তাকে লজ্জা পেতে দেখলাম। নারীসুলভ সেনসিটিভ বিষয়গুলো তার মধ্যে থাকলেও কখনো লজ্জা পেতে দেখিনি। লজ্জা পেলে কাউকে এত সুন্দর লাগতে পারে, তাও আমার কল্পনার বাইরে।
-তানিয়া?
-জি?
-আমার বয়স পঞ্চান্ন। এত বয়স পর্যন্ত বিয়ে করিনি, তাই বুঝতেই পারছো বিয়ে করার কোনো চিন্তা আমার মাথায় ছিল না।
-আপনি কখনো কারো প্রেমে পড়েননি?
-পড়েছিলাম… সেই কলেজ লাইফে। আমারই ব্যাচমেট। আমি মনে মনে ভালোবাসতাম, কখনো তাকে বলার সাহস করে উঠতে পারিনি। যখন বলব ঠিক করেছি, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের সময় মেয়েদের বিয়ে আগে আগে হয়ে যেত।
-বুঝতে পেরেছি।
-এরপর গভীরভাবে কারো প্রেমে পড়িনি। তোমার ক্ষেত্রে কেন এমন হল, তাও বুঝতে পারছি না।
-আপনি চিন্তা করবেন না সব ঠিক হয়ে যাবে।
-ঠিক হয়ে যাবে মানে?
-মানে আপনি যেরকম চান, সেরকমই হবে।
-আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
তানিয়া মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল। ঠাণ্ডার মধ্যেও আমি ঘামতে থাকলাম। এর পরের কথাটা কি বলব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অল্প একটু নীরবতার পর আমি বললাম।
-বিষয়টা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। জানি সিদ্ধান্তটা কঠিন। আমাদের বয়সের গ্যাপ অনেক। তোমার বয়সী কোনো ছেলের সাথে যেরকম উচ্ছ্বাসের সাথে, ঘুরেফিরে আনন্দে সময় কাটবে, আমার সাথে তা অনেকটাই বাধা পড়বে। যতই বলি এই বয়সে নতুন জব নিয়ে, নতুন নতুন জায়গায় মুভ করে যেতে আমার ইচ্ছা করবে না।
-এইসব ব্যাপারে আমার প্রবলেম নেই।
-আমেরিকান মানুষদের লাইফ স্টাইলের মধ্যে সবচেয়ে কমন ব্যাপার হল- বহুদূর ড্রাইভ করে যাওয়া, প্রায় প্রত্যেক বছর নতুন জায়গায় কাজ নিয়ে মুভ করা। এরা সারাজীবন ছুটাছুটির মধ্যে থেকেই জীবনটাকে উপভোগ করে। আমি এদের কালচারে থেকেও নিজেকে চেইঞ্জ করতে পারিনি। অলস সময়ে একটা বই আর এক কাপ কফি নিয়ে দিন কাটিয়ে দিতে পারি।
-আপনি আপনার মতই থাকবেন। আমেরিকানদের মত অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ আমিও পছন্দ করি না।
-তানিয়া?
-জি?
-তুমি কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবে?
-জি করব।
-তোমার বাবা-মা বিষয়টা মেনে নেবেন?
-প্রথমে একটু ঝামেলা হয়ত করবে, পরে মেনে নিবে।
ওর কথায় আমরা দুইজনই হেসে উঠলাম। সবকিছু খুব সহজ মনে হতে লাগল।
আমরা বের হয়ে পড়লাম। গাড়ি চালিয়ে তানিয়াকে নামিয়ে ঘরের দিকে ফিরছি, হঠাৎ ভিন্নধরনের এক অনুভূতি কাজ করতে লাগল। রাতের আকাশকে মনে হল নীলচে। গাঢ় নীল আকাশে হাজার হাজার তারা ফুটে রয়েছে। পৃথিবীটা যেন একটা বিশাল বাগান, যার ভেতর দিয়ে ক্ষুদ্র আমি গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চলছি পোকার মত। চারপাশের পাহাড়গুলো আলাদা করে রেখেছে আমার চলার বাগানটাকে। নিশ্চয়ই আকাশের ওপার থেকে কেউ একজন সবকিছু দেখছেন! পাহাড়, জল, আকাশের এই সৌন্দর্যের থেকেও কি স্বর্গ বেশি সুন্দর?

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge