বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১০:০০ অপরাহ্ন

ইন দ্য পিনাল কলোনি – মূলগল্প : ফ্রানজ কাফকা – চিত্রনাট্যরূপ : কাজী সালমান শীশ

ইন দ্য পিনাল কলোনি – মূলগল্প : ফ্রানজ কাফকা – চিত্রনাট্যরূপ : কাজী সালমান শীশ

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা:
৩ জুলাই ১৮৮৩। বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক ফ্রানজ কাফকা (১৮৮৩-১৯২৪) এইদিনে জন্মগ্রহণ করেন বর্তমান চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগ শহরে। প্রচারবিমুখ এই মহান লেখক তাঁর জীবদ্দশায় খুব কম লেখাই প্রকাশ করেন। জার্মান ভাষায় রচিত কাফকার বেশিরভাগ রচনাসমূহ বেরিয়ে আসে তাঁর মৃত্যুর পর। সংখ্যায় কম, অসমাপ্ত ও যৌক্তিক চিন্তায় মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজের চরিত্রকে বিশ্লেষণের নিজস্ব ক্ষমতায় অদ্বিতীয় কাফকা। ৪১ বছরের ক্ষুদ্র জীবনে কাফকা যা কিছু লিখে গেছেন, সমস্ত লেখা তাঁর মৃত্যুর পর পুড়িয়ে ফেলার নিষ্ঠুর দায়িত্ব দিয়ে যান বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে। কিন্তু ম্যাক্স ব্রড বন্ধুকে দেয়া এই প্রতিশ্রুতি রাখেননি। বিশ্ববাসীর কাছে খুলে দিয়েছেন কাফকার সাহিত্যের ঐশ্বর্যময় ভাণ্ডার।
ফ্রানজ কাফকার ‘ইন দ্য পেনাল কলোনি’ (১৯১৯) রচনাটি চিত্রনাট্যরূপ দিতে ইয়ান জনস্টোনের ইংরেজি ও প্রলয় সেনের বঙ্গানুবাদ আমাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। চিত্রনাট্যে স্থান, কাল, চরিত্র ও অন্যান্য বিষয়গুলো সরাসরি উল্লেখ নেই, মূলগল্পেও ছিল না। যারা গল্পটি পড়েছেন বা চিত্রনাট্যটি পড়বেন, তারা বুঝতে পারবেন যে কাফকার এই বড়গল্প কোনো গতানুগতিক বা প্রচলিত ধারার গল্প না। একজন আসামীকে অমানুষিক কষ্ট দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে মেশিনের মাধ্যমে। দুর্নিতীগ্রস্ত সামরিক অফিসারের পেশী শক্তির প্রয়োগ ও মেশিনের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান সম্পর্কে কাফকা লিখে গেছেন একশ বছর আগে।
উত্তর-আধুনিক চিন্তার এই গল্পটি সকল পাঠকের জন্য না, কারণ কাহিনির অনেকাংশ জুড়েই রয়েছে নৃশংসতা ও বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ।
-কাজী সালমান শীশ
২৫ আগস্ট ২০২৩
ইন দ্য পিনাল কলোনি
মূলগল্প : ফ্রানজ কাফকা
চিত্রনাট্যরূপ : কাজী সালমান শীশ
সারসংক্ষেপ-
দেশ, কাল, চরিত্রের নাম উল্লেখ নেই এই গল্পে। উপত্যকায় মৃত্যুদণ্ড দেয়ার উদ্ভট মেশিন গল্পের প্রতিপাদ্য। চূড়ান্ত বর্বরতার দৃষ্টান্ত এই স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র। মেশিনে শাস্তি শুরু হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আসামীকে ১২ ঘণ্টা ধারাল কাঁটার চাপের অত্যাচার ভোগ করতে হয়। মেশিনের আবিষ্কারক বিশ্বাস করে- ‘মৃত্যু সকল যন্ত্রণার অবসান, মৃত্যুকে সামনে রেখে জীবিত অবস্থায় অপরাধীকে যন্ত্রণা দেয়াই কাম্য’
আর্মি অফিসারের তত্ত্বাবধানে জনমানবহীন, নির্জন উপত্যকায় আসামীর শাস্তি হবে। বাইরে থেকে পরীক্ষক আনা হয়েছে শাস্তি পদ্ধতি পর্যবেক্ষণের জন্য। অনেকটা সময় নষ্ট হয় যন্ত্রটি যথাযথভাবে চালু করতে। শেষ পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বেঁচে যায় মেশিনের গোলযোগ ও পরীক্ষকের অমতের কারণে। স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী তখন উল্টো আর্মি অফিসারের সাজা হওয়ার কথা। এদিকে পরীক্ষকের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বিভিষীকাময় দ্বীপের শাস্তিদান পদ্ধতি। মারণাস্ত্রের প্রতি ক্ষমতাশীলদের আস্থা ও এর অপব্যবহারের মর্মান্তিক চিত্র প্রতীকী-রূপে ভেসে ওঠে কাফকার ‘ইন দ্য পিনাল কলোনি’ (১৯১৯) গল্পতে।
চিত্রনাট্য :
ইন দ্য পিনাল কলোনি
মূলগল্প : ফ্রানজ কাফকা
চিত্রনাট্যরূপ : কাজী সালমান শীশ
দৃশ্য-১
সময় : দুপুর ২টা
স্থান : নির্জন উপত্যকা
চরিত্র : আর্মি অফিসার, সিপাহী, দণ্ডিত ব্যক্তি ও আমি (পরীক্ষক)
জনৈক ব্যক্তির শাস্তির আয়োজন করা হয়েছে। একটি মেকানিকাল যন্ত্রের সাথে আসামীকে শুইয়ে শিকল দিয়ে আটকে রাখা
হয়েছে। শাস্তি প্রদানের যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয় কিন্তু পুরানো প্রযুক্তিতে তৈরি। ১০০% নিশ্চয়তার সাথে এটা যে কোনো উচ্চতার
মানুষের জীবন অবসান করতে সক্ষম।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও উৎসাহ ও উত্তেজনার সাথে আর্মি অফিসার নিজে যন্ত্রটির ভেতরে ঢুকেছেন, সব ঠিকঠাক আছে কিনা
দেখতে। একটু দূরে কাঁধে বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সিপাহী। আমি নির্বিকারভাবে তাকিয়ে আছি আর্মি অফিসারের দিকে।
অফিসার ঘেমে হাঁপিয়ে যন্ত্রের ভেতর থেকে বের হলেন। তার নিঃশ্বাস ভারী, তবে মুখে পরিতুষ্টির হাসি।
অফিসার: নাহ্। কোনো সমস্যা নেই এক্সামিনার। সব ঠিক আছে।
আমি: এই গরমের মধ্যে আপনি… মানে আপনার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়েছে?
অফিসার ভুরু কুঁচকে তাকায়। তারপর বলে-
অফিসার: ও… আপনার তাই মনে হচ্ছে? এক্সামিনার হিসেবে আপনি প্রথমে যন্ত্রের টেকনিক্যাল দিক জানতে চাইবেন আশা করেছিলাম। আমার গরম লাগলো কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। হা হা হা। বসুন প্লিজ।
আমি চুপ করে চেয়ারে বসলাম। অফিসার এক গ্লাস পানি খেয়ে একটা চুরুট ধরালেন।
অফিসার : এক্সামিনার?
আমি : জ্বি?
অফিসার : আপনি কি এই ধরণের মেশিন আগে দেখেছেন?
আমি : জ্বি না। আমার এই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম।
অফিসার : অভিজ্ঞতা বেশি থাকলেও এমন চমৎকার মেশিন আর কোথাও পাবেন না। আমার কাজ শুধু যন্ত্রটার টেকনিক্যাল
দিকটা নিশ্চিত করা। বাকি সব কাজ যন্ত্র নিজেই সুন্দরভাবে করবে। সে এক দেখার মত দৃশ্য!
আমি : আমি তাহলে একটু এক্সামিন করে আসি।
অফিসার : Please go ahead. I’m sure you will be amazed.
মেশিন পরীক্ষা করার ইচ্ছা আমার একেবারেই নেই। শুধু দায়িত্ব পালন করতে কিছু কাজ দেখতে হয় এবং দেখাতে হয়। ওরা আমাকে অগ্রিম পারিশ্রমিক দিয়ে এখানে এনেছে। কিন্তু এই লোকটার সাথে বসে গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও ইচ্ছা করছিল না। তাই আমি যন্ত্রের মধ্যে র্টচ নিয়ে ঢুকলাম এবং একটু পরে বের হয়ে আসলাম।
অফিসার : কেমন দেখলেন?
আমি : সবকিছু তো ঠিক আছে মনে হচ্ছে। এর আগে যখন এটা ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই রিপোর্টটা কি আছে?
অফিসার : কী আশ্চর্য ব্যাপার! এরা দেখছি আপনাকে কিছুই ইনফর্ম না করে পাঠিয়েছে! আমাকে ক্ষমা করবেন এক্সামিনার…
কিন্তু ফাইলপত্র আমার পক্ষে দেখানো সম্ভব না। একমাত্র মহামান্য সেনাপতির নির্দেশ ছাড়া কোনো নথিপত্র প্রকাশ করা নিষেধ।
আমি : না ঠিক আছে। আমার মনে হয় না রিপোর্ট দেখার তেমন কোনো প্রয়োজন আছে।
অফিসার : এক্সামিনার… আমি জানি আপনার সময়ের মূল্য অনেক। আপনি কোনো কিছু বলবেন আর আমি তা পাশ কাটিয়ে যাব, এটা ভাবতেও… তবু আপনাকে মুখে বলতে পারি, আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর ৮ বার এটা ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকবারই যন্ত্র সফল হয়েছে।
আমি : বাহ্। তাহলে তো চিন্তার কিছুই নেই।
অফিসার একটু চুপ করে ভ্রু কুঁচকে বলেন-
অফিসার : একটু ভাবনার বিষয় আছে। গতবার যন্ত্র চালানোর সময় ভেতরের সার্প কিছু দাঁতাল পিন ভেঙ্গে গেছে, যার কারণে পাথর ঘষলে যেমন শব্দ হয়, তেমন একটা বিরুক্তিক শব্দ পাবেন। এতে কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না। তবুও অ্যালার্ট থাকা ভালো। আর যেভাবেই হোক কাল ভোরে সূর্য ওঠার আগে কাজ শেষ করতে হবে…
অফিসার রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন।
অফিসার : সূর্য ওটার পর হত্যা করাকে আমরা অশুভ করে ধরে নেই। এটা একধরণের সংস্কার। যদি কোনো কারণে আলো থাকতে থাকতে কাজ শেষ না হয়, তখন পরের দিন আমার বিচার শুরু হবে, আর একে ছেড়ে দেয়া হবে।
আমি : হাতে তো যথেষ্ট সময় রয়েছে।
অফিসার : জ্বি তা ঠিক। আপনাকে ধন্যবাদ আমার পাশে থাকার জন্য। লাঞ্চের সময় হয়েছে। চলুন তাঁবুর ভেতর থেকে লাঞ্চ করে আসি, এরপর মেশিনের কর্মক্ষমতা দেখবেন। বিশ্বাস করুন এই মেশিনটাকে আমার একমাত্র ছেলের থেকেও বেশি ভালোবাসি। চলুন।
আমার একটুও ক্ষুধা বোধ হচ্ছে না, তবু গেলাম অফিসারের পেছন পেছন তাঁবুর ভেতরে। আসামী ও সেপাহী যার যার
অবস্থানে মূর্তির মত স্থির রইল।
দৃশ্য-২
সময় : দুপুর ২:৩০ মিনিট
স্থান : বড় তাঁবুর ভেতর
চরিত্র : আর্মি অফিসার ও আমি
তাঁবুর ভেতর সারিবদ্ধভাবে রাখা প্রচুর খাবার ও পানীয়ের আয়োজন। লাল রঙের ন্যাপকিন। ধবধবে সাদা পরিষ্কার প্লেট, বাটার
নাইফ, কাঁটাচামুচ ইত্যাদি। গরম স্যুপ-টোস্ট। আমি একটু অবাক হলাম যে- এতসব আয়োজন করলো কে এই রুক্ষ ভূমিতে?
আমরা চারজন ছাড়া আর কোনো প্রাণীকে ত্রি-সীমানায় দেখিনি। একটু পরেই নৃশংস ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তাও কেন যেন
খাবারের আয়োজন দেখে ক্ষুধা লেগে গেল। অফিসার সামান্য একটু স্যুপ, স্ট্রবেরি আর ক্রিম নিল। আমি হ্যাম-স্যান্ডউইচ,
সালাদ, ম্যাশপটেটো আর রেড ওয়াইন নিলাম।
অফিসার : বুঝলেন এক্সামিনার… আমার বাংলো এখান থেকে প্রায় ১২ মাইল দূরে। এমনিতে আমি এখন কম খাই আর
আমার বউয়ের রান্না ছাড়া অন্যকিছু খেতে রুচি হয় না।
আমি : কিন্তু এখানে খাবার তো দেখছি উন্নতমানের। সত্যিকথা বলতে আমি বেশ অবাক হয়েছি এত খাবারের আয়োজন
দেখে।
অফিসার : হু। আমি ভেজিটেরিয়ান… এদের কমন কিছু আইটেম আছে, কিন্তু বেশিরভাগ খাবারই আমিষ। আর আমি আমার
বউয়ের তৈরি আঙ্গুরের পাতলা ওয়াইন খুব পছন্দ করি। চলুন না আজকে আমার বাড়িতে রাতে থাকবেন, গল্পগুজব
করা যাবে।
আমি : না আজকে থাক… আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি ?
অফিসার : জ্বি অবশ্যই।
আমি : আপনি কি জন্ম থেকেই নিরামিষাসী ?
অফিসার : হা হা… না। নিরামিষাসী হওয়ার কারণটা আপনাকে বলি। আমার মধ্য-আফ্রিকায় একসময় পোস্টিং ছিল। আমার
ছেলেটা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে ম্যালেরিয়ার। প্রায় মারা যাবে এমন অবস্থা। একেবারে রিমোট এরিয়া সেখানে
ডাক্তার বলতে তেমন কেউ ছিল না। এক ওঝা তাকে কিছু ভেষজ ওষুধ দেয়। আমার এইসবে একেবারেই বিশ্বাস
নেই, কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম- যাদি আমার বাচ্চা সেরে উঠে আমি আর
কোনোদিন মাছ, মাংস ছোঁব না। সাতদিনের মাথায় সে সুস্থ হয়ে উঠল… আমিও আমিষ খাওয়া ছেড়ে দিলাম।
প্রাণীদের প্রতি আমি অত্যন্ত দয়াশীল এক্সামিনার।
আমি : তাহলে আপনি এই আসামীকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিতে পারতেন…
অফিসার খুবই অবাক হয়। উত্তেজিত হয়ে বলে-
অফিসার : কি বললেন? ওই অবাধ্য শয়তানকে ছেড়ে দিব?
আমি : না… তা বলছি না। যেহেতু আপনি প্রাণীর প্রতি দয়াশীল…
অফিসার : আমি প্রাণীর প্রতি দয়াশীল, কিন্তু ওতো কোনো প্রাণী না। ও তো শয়তান ! গতকাল রাত ২টার দিকে ক্যাপ্টেন ওকে
তিনবার ডাক দেয়। সে কোনো সাড়া দেয় না। এরপর উনি নিজে এগিয়ে গিয়ে দেখেন-নাইট ডিউটি বাদ দিয়ে
মেশিনগান হাতে হা করে এই হারামজাদা ঘুমাচ্ছে! ক্যাপ্টেন রেগে গিয়ে এই হারামীটাকে বেল্ট খুলে মারতে
থাকেন। ক্যাপ্টেনের হাত ব্যথা হয়ে যায়, এর কর্তব্যে অবহেলার জন্য। আপনি চিন্তা করতে পারেন এক্সামিনার!
ক্যাপ্টেন কত উচ্চপদের একজন মানুষ আর এই বদমাইশ কিনা তাকে অবহেলা করে! তাছাড়াও আমি তো নিজে
ওকে মারতে যাব না। ওকে মারবে যন্ত্র। চলুন না দেখবেন কি হয়! আপনার সময় খারাপ কাটবে না। সত্যি খুব
ইন্টারেস্টিং।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃত্রিম হাসি হাসলাম।
দৃশ্য-৩
সময় : দুপুর ৩টা
স্থান : নির্জন উপত্যকা
চরিত্র : আর্মি অফিসার, সিপাহী, দণ্ডিত ব্যক্তি ও আমি
শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির জিহ্বা বেরিয়ে আসে পিপাসায়। আড় চোখে আমার দিকে তাকায়, যদি কোনো দয়া পাওয়া যায় এই আশায়। অফিসারের দৃষ্টি যন্ত্রটার দিকে।
অফিসার : One thing you must know- this wonderful machine is invented by only one person. He was our previous major. He was the chemist, designer, engineer and physicist. He was all in all.
আমি :Such a genius!
অফিসার : Obviously. ঈশ্বরের পর আমি সেই মেজরকে সম্মান করি।
আমি : অফিসার… ঐ লোকের মনে হয় একটু পানি খাওয়া দরকার। যদি মেশিন চালানোর আগেই মারা যায়?
অফিসার : এত সহজে কেউ মরে না। আর যদি মরে তাহলে তার মরাই উচিৎ। যাই হোক… অ্যাই সেপাহী ওর মুখে এক মগ পানি ঢেলে দে।
সেপাহী বন্দীর মুখে পানি ঢালতে থাকল। আসামী যতটুকু পারল খেল। আমি বেশ বিব্রত, সেকারণে নিজে থেকেই প্রশ্ন করলাম।
আমি : তা কি যেন বলছিলেন? All in all…
অফিসার : তা তো বটেই, তিনি ছিলেন সর্বেসর্বা। মেশিনটার আসলে দুইটা পার্ট- একটা পার্টে সাবজেক্টকে শোয়ানো হবে, শুধু মাথাটা দেখা যাবে। পুরোপুরি শরীর আটকানো থাকবে ফোমের সাথে। মুখের ওপর একটা রাবার এসে বসবে যার ফলে কোনো রকম আওয়াজ বা চিৎকার সে করতে পারবে না। আর সেকেন্ড পার্টে আছে আয়রন পিন সেট ও হিট কন্ট্রোলার। আয়রন পিন সুঁচের মত আঁচড়ে কাজ করে আর হিট-কন্ট্রোলারের কাজ হচ্ছে গ্যাস প্রোডিউস করা।
শুনলে অবাক হবেন, প্রয়োজনে এতে ৯০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস টেম্পারেচার উঠানো সম্ভব। আর ওপরের এই পাইপ
দিয়ে বাষ্প হয়ে পানি বের হয়ে যায়, তাই কোনোরকম পরিবেশ দূষণ হয় না।
অফিসারের কথা শুনে গরমের মধ্যে আমার মাথা ঘুরাতে থাকে। তবু বলি-
আমি : ও আচ্ছা… ইন্টেরেস্টিং তো!
অফিসার : আর লাশ যখন বের হবে তার বুকের বাম দিকে একটা অংশে লেখা থাকবে…
আমি : কি লেখা থাকবে?
অফিসার : এটা ডিপেন্ড করে কে কি অপরাধ করেছে তার ওপর। যেমন এই আসামীর বুকে লেখা থাকবে-
“সম্মান করতে শেখো” কারণ এই লোক তার ক্যাপ্টেনকে অসম্মান করেছিল।
অফিসার আসামীর দিকে এগিয়ে যায়। ভয়ে লোকটার চোখের পাপড়ি আর ঠোঁট হালকা কাঁপছে।
আমি : ওর কি শাস্তি হয়েছে তা কি সে জানে ?
অফিসার : এখনো জানে না। তবে মেশিন চালু হলেই টের পাবে।
আমি : মারা যাবার ব্যাপারটা…
অফিসার : নাহ… কিছুই জানে না।
আমি : তাহলে তো তার আত্মপক্ষ সমর্থন বা ডিফেন্ড করার কোনো সুযোগ থাকল না।
অফিসার : এসব কি বলছেন আপনি! ওর যে সুপেরিয়র তার কথার ওপর ভিত্তি করেই তো সবকিছু করা হয়েছে। ডেথ
ট্রায়ালে কোনো বন্দী যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে, সেটা হবে এক হাস্যকর নাটক, আর বিচার
ব্যবস্থার প্রতি অসম্মান।
আমি : হু। তবু ধরেন হঠাৎ কারো ভুল জাজমেন্ট হল… হতে পারে না?
অফিসার : তা তো হতেই পারে। ভুল কোন পেশায় হয় না বলেন! এসব খুবই নগণ্য বিষয় এক্সামিনার। আমরা তো আর কবি না যে এইসব নিয়ে ভেবে ভেবে জানালার পাশে বসে দিন কাটাব। We work for the state, for the country.
আমি : বন্দীর শাস্তি চলার সময় কি হাই অর্থোরিটির কেউ আসবেন? সেনাধ্যক্ষ বা অন্য কেউ?
অফিসার মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেন। শান্তভাবে বললেন-
অফিসার : দেখুন বিচার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ, প্রায় ১২ ঘণ্টার মত সময় লেগে যায়। এরমধ্যে কেউ আসতেই পারেন। তবে সম্ভাবনা কম। তারা সবাই যথেষ্ট ব্যস্ত মানুষ এক্সামিনার। যাই হোক, আমরা আর বেশি সময় নষ্ট করব না। সংক্ষেপে বলে রাখি এই মেশিন একদম পারফেক্ট কন্ডিশনে নেই। ছোটখাটো কিছু ত্রুটি আছে। সে সব সারিয়ে নেবার মত সময় আমাদের হাতে নেই। প্রয়োজনও নেই। মেশিন চালু হবার পর তুলার গদি বেশ কিছুক্ষণ কাঁপবে, এতে সাবজেক্টের চামড়া নরম হবে। প্রায় আধঘণ্টা আরামের পর প্রথমবারের মত আয়রন পিন হালকা করে চাপ দিবে। ফিতা দিয়ে বাঁধা পিনগুলো তাকে আঁকড়ে ধরবে, সে এক ইঞ্চিও নড়তে পারবে না।
আমি : অফিসার আমি কি এক গ্লাস পানি পেতে পারি?
অফিসার সাথে সাথে সেপাহীকে অর্ডার করে।
অফিসার : নিশ্চয়ই। সেপাহী গেস্টকে পানি দাও।
সেপাহী দৌড়ে পানি আনতে গেল। এক বোতল ঠাণ্ডা পানি ও একটা ঝকঝকে কাচের গ্লাস নিয়ে উপস্থিত হল।
অফিসার : আমি বুঝতে পারছি গরমে আপনার কষ্ট হচ্ছে… একটু ধৈর্য ধরুন এক্সামিনার। কিছুক্ষণ পরেই সূর্যের তাপ কমে যাবে আর মেশিনটা চলা শুরু করলেই আপনার ভালো লাগবে। ভোরে যখন দেখবেন সব পরিষ্কার টিপটপ তখন দেখবেন কি অপূর্ব লাগে। মেশিনে বাঁধা অবস্থায় আসামীকে শুইয়ে আটকে রাখা হয়েছে। অফিসার মেশিনের লাল সুইচ টিপে দিয়ে সজোরে গিয়ার টান দিল। মেশিনের কাঁটাগুলো আসামীর পিঠের কাছে এসে শরীরে চাপ দেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে হঠাৎ মেশিন থেকে একটা চেইন খুলে এসে সেপাহীর ঘাড়ে লাগল! ক্লান্ত সিপাহী ঝিমাচ্ছিল, সে লোহার চেইনের আঘাতে ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে। সেপাহীর ঘাড় দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়তে থাকে। যন্ত্রটা বন্ধ হয়ে যায়। সেই অবস্থাতেই সেপাহী দৌড়ে চেইনটা জায়গা মত বসিয়ে তা চালানোর চেষ্টা করে। অফিসার প্রচণ্ড রেগে গিয়ে সিপাহীর ওপর চড়াও হয়।
অফিসার : হারামী! নরকের কীট! চেইন এইভাবে লাগায়! সারাদিন কোনো কাজ নাই, শুধু ঝিম ধরে বসে থাকিস। তোকে আজকে আমি মেরেই ফেলব বাস্টার্ড…
অফিসার চাবুকটা হাতে নিয়ে সিপাহী কয়েক ঘা বসিয়ে দেয়। আমি তখন বলি-
আমি : কি করছেন অফিসার!
অফিসার মারা বন্ধ করে। রাগে ফুঁসতে থাকলেও আমার দিকে কোমল দৃষ্টিতে তাকায়।
অফিসার : আমি অত্যন্ত দুঃখিত স্যার যে আপনার সামনে এমন একটি কাণ্ড ঘটল।আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে এমনভাবে মেশিনটা… আসলে চেইনটা জ্যাম হয়ে গেছে। একটু লুব্রিকেন্ট লাগিয়ে দিলেই আর সমস্যা থাকবে না। চেইনে জ্যাম ছুটে যাবে। ঠিকভাবে মেশিন কাজ করবে।
অফিসার সেপাহীর দিকে ফিরে তাকায়।
অফিসার : হা করে তাকিয়ে না থেকে লুব্রিকেন্ট এনে চেইনে লাগা গর্ধব… আর আসামীকে ফিতা দিয়ে টাইট করে বাঁধ, যেন চুল পরিমাণ নড়তে না পারে। এবার কোনো প্রবলেম হলে আমি তোকে মেশিনে ঢুকিয়ে মারব।
আমি পরিস্থিতি কিছুটা ঠাণ্ডা করার জন্য বলি-
আমি : এতক্ষণে মেশিনের বিষয়টা অনেকটা বুঝতে পারছি মনে হচ্ছে।
অফিসার খুশি হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
অফিসার : অনেকটা… কিন্তু সবটা না। চলুন আমরা একটু তাঁবুতে গিয়ে বসি। ও মেশিনটা ভালো করে সেট করুক।
দৃশ্য-৪
সময় : দুপুর ৩:৩০ মিনিট
স্থান : বড় তাঁবুর ভেতর
চরিত্র : আর্মি অফিসার ও আমি
অফিসার তার নিজের চেয়ারে বসল, আমিবসলাম টেবিলের অপর পাশে। অফিসার নীচে ঝুঁকে হুইস্কির সবুজ বোতল আর একটা কৌটা বের করে।
অফিসার :দেখুন এক্সামিনার আপনাকে বলতে বাধা নেই- আমি একটু টেনশনে আছি।
আমি : টেনশন করার মত কোনো কারণ তো দেখছি না।
অফিসার : তা ঠিক। আসলে যন্ত্রটা পুরোপুরি ঠিক থাকলে কোনো টেনশন ছিল না। তবে ভরসা রাখা যায়। আমরা যদি কোনো কারণে তাকে মেশিনের মাধ্যমে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হই… তাহলে অন্য কোনোভাবে তাকে হত্যা করতে পারব না। নিয়ম নেই। নেন প্লিজ। অফিসার দুইটা গ্লাসে বেশ বড় করে হুইস্কি ঢেলেছে। একটা গ্লাস আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি নিলাম।
অফিসার : এটা আমাদের স্থানীয় একটা হুইস্কি। খুব স্ট্রং আর খুব কাজের। কিন্তু পানি বা সোডা কিছু মেশানো যায় না।
আমি একটু চুমুক দিলাম।
অফিসার : আর ক্যাপসুলগুলো যে দেখছেন এগুলো লোকাল ভেষজ এক প্রকার ওষুধ। খেলে নার্ভ ঠাণ্ডা হয় নিমিষের মধ্যে। একটু যদি টেস্ট করতেন…
আমি : ধন্যবাদ অফিসার। আপনার পানীয়টা বেশ ভালো লাগছে। ওষুধ খাব না।
অফিসার : ধন্যবাদ। আমাদের এখানে খুব বেশি কিছু পাওয়া যায় না, তবে যা পাওয়া যায় সবই খাঁটি। তাই আমার খুব ইচ্ছা আপনি আজকের রাতটা আমার বাসায় যদি কাটিয়ে যেতেন…
আমি : আবারো আপনাকে ধন্যবাদ, কিন্তু আজকে সত্যিই পারব না।
অফিসার : ভালো কথা মেশিনটা ২ ঘণ্টা চলার পর আসামীকে খাওয়ানোর জন্য একটা সরু চ্যাপ্টা নল নেমে আসবে, ঠিক তার মুখ বরাবর। ভুট্টার তৈরি এক ধরনের মণ্ড দেয়া হয়। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে সব দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীই খুব আগ্রহ নিয়ে খাবারটা চেটে চেটে খায়। এমন কাউকে দেখিনি যে কিনা জিহ্বা বাড়ায় না। ঠিক তার ৫ মিনিটের মধ্যে সে তার মুখ সরিয়ে ফেলে আর থুুতু ফেলার চেষ্টা করে। কি অদ্ভুত ইনভেনশন চিন্তা করতে পারেন! আসামী মরে গেলে তো মরেই গেল… তার আগের টরচারই তো ইম্পোর্টেন্ট, যেন সে নিজেই নিজের মৃত্যু কামনা করতে থাকে। আসলেই…
এই মেশিন আমাদের রাষ্ট্র আবিষ্কার করেছে, তাই আমি গর্ববোধ করি।
আমার মেজাজ খারাপ হতে থাকল, অফিসারের যন্ত্রের গুণগানে। আমি বললাম-
আমি : আচ্ছা মৃত্যুর পর আসামীকে কি করা হয়?
অফিসার গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলল-
অফিসার : পাশেই গর্ত রেডি করা থাকে। মেশিন স্বয়ং সাবজেক্টকে গর্তে নিক্ষেপ করে আর দুইটা আংটা লাগানো প্লেট আছে
গর্তের দুইপাশে। সেগুলো মাটি ফেলে লেপ্টে গর্তটা ভরাট করে দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি মেশিন নিজেই করে।
সাংঘাতিক ইন্টেরেস্টিং।
দৃশ্য-৫
সময় : বিকাল ৪টা
স্থান : নির্জন উপত্যকা
চরিত্র : অফিসার, সিপাহী, দণ্ডিত ব্যক্তি ও আমি
আসামী হতাশ, আধমরার মত একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সিপাহী। অফিসার আর আমি আসলাম। গোলযোগের পর মেশিন থেকে আসামীকে বের করে আনা হয়েছিল। অফিসার চোখ দিয়ে সিপাহীকে ইঙ্গিত করল। সিপাহী সাথে সাথে একটা ছুরি দিয়ে বন্দীর সমস্ত কাপড় কেটে ছিঁড়ে তাকে কয়েদীর পোষাক পরিয়ে দিল। তারপর সিপাহী বন্দীর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে মেশিনটার কাছে এনে ঝাটকা টান দিয়ে বন্দীকে শুইয়ে দিল শয্যায়। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ফিতাগুলো দিয়ে তার হাত-পা আটকে মেশিনটা চালু করে দিল। অফিসারের চেহারায় খুশির আভা।
অফিসার : ভেরি গুড। ছেলেটা আসলে কাজের। দোষটা আমাদের প্রশাসনের। এই যন্ত্রে কমপক্ষে ১০০ জনের প্রাণদণ্ড দেয়া হয়েছে, অথচ সেই অনুযায়ী এর কিছুই ঠিকভাবে মেইনটেন বা মেরামত করা হয়নি। আমি ছাড়া অন্য কেউই এই যন্ত্রটাকে ভালোবাসতে পারেনি। আমি জানি অনেক ভালো প্রযুক্তিওয়ালা মেশিন এখন এসে গেছে কিন্তু এই মেশিনটা সম্পূর্ণ আলাদা… একদম আত্মার সাথে সম্পর্কিত। যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে মারা। প্রাচীন পদ্ধতির এত সুন্দর ব্যবহার… অন্যরকম।
আমি : হু।
অফিসার : আপনি বাইরের মানুষ, আমাদের অতিথি, তাও বলি- এই উপনিবেশের অন্যরা এই শাস্তি পদ্ধতির বিরুদ্ধে। যুদ্ধের পর অনেক নতুন লোক রিক্রুট হয়েছে। এইসব জুনিয়ার ছেলেগুলোর প্রাচীন, খাঁটি বিষয়গুলোর প্রতি কোনোই সম্মান নেই।
বিরুক্তিতে ভ্রু কুচকে অফিসার থুতু ফেলল। তারপর আবার কথা শুরু করবে ঠিক সেসময়ই যন্ত্রে আবার গোলযোগ দেখা দিল। ভেতর থেকে একটা বড় স্প্রিং বাইরে খুলে আসল। আসামীর শরীর দুইবার পাক খেয়ে যন্ত্রটা থেকে ছিটকে বাইরে এসে পড়ল। অফিসারের চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল। সে মুহূর্তের মধ্যে পিস্তল বের করে মাটিতে পড়ে থাকা আসামীর মাথার পাশে পর পর দুইবার গুলি করল। এরপর সিপাহীর দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মুখের ভেতর পিস্তল ঢুকিয়ে দিল। সিপাহীকে বলল-
অফিসার : শোন হারামী। এই আসামী কুকুরটাকে গুলি করে মারতে আমার অসুবিধা আছে, কিন্তু তোকে মারতে বাধা নাই। তুই কেন তোর পুরা গুষ্টিকে আমি শেষ করে দিতে পারি ২ মিনিটে। তোকে শেষ ৫ মিনিট সময় দিচ্ছি। এরমধ্যে মেশিনটাকে পারফেক্ট দেখতে চাই। এর ১ সেকেন্ড বেশি সময় লাগলে গুলি করে তোর মাথা ঝাঁঝরা করে দিব ঈশ্বরের নামে। Hurry up!
সিপাহী বন্দীকে মাটি থেকে তুলে টেনে হিঁচড়ে তাড়াতাড়ি মেশিনে উঠিয়ে মেশিনের পেছন দিকে গের। অফিসার চুরুট ধরিয়ে হাত ঘড়িতে সময় দেখল- বিকাল ৪টা ৩৫ বাজে।
অফিসার : আমি খুবই দুঃখিত এক্সামিনার। চলুন কয়েক মিনিট হেঁটে আসা যাক।
আমি : চলুন।
দৃশ্য-৬
সময় : বিকাল ৪:৪৫ মিনিট
স্থান : নির্জন উপত্যকা
চরিত্র : অফিসার, সিপাহী, দণ্ডিত ব্যক্তি ও আমি
মেশিন চালু করা হয়েছে। ওপরের সারফেস আস্তে করে নেমে এসে হালকা করে বন্দীর শরীরে কয়েকবার চাপ দেয়।
মিটার রিডিং-এ নাম্বার উঠতে থাকে। ধারালো পিনগুলো আসামীকে চাপ দেয়ার কিছু পরেই হঠাৎ সে বমি করে দেয়।
অফিসার : Stop! Stop!
সেপাহী দ্রুত গিয়ার টেনে মেশিনটা বন্ধ করে। অফিসার উত্তেজিত হয়ে সিপাহীর গালে কষে একটা চড় দেয়।
অফিসার : হাজারবার বলেছি, শাস্তির আগে পেট খালি রাখতে অথচ…
সেপাহী : স্যার আমি তো কিছুই খেতে দেই নাই…
অফিসার : আবার মুখে মুখে কথা বলিস! ব্লাডি বাস্টার্ড! ফাইজলামী করিস আমার সাথে? ওর শাস্তি শেষ হোক তারপর তোকে
আমি মারতে মারতে… হারামজাদা এক্ষুনি সবকিছু পরিষ্কার করে মেশিনটা ফের চালা। Quick. I want it up to the level within a minute.
সেপাহী দিশেহারা হয়ে কাজে নেমে পরল। অফিসার গলা নামিয়ে আস্তে করে আমাকে বলল-
অফিসার : আসলে এক্সামিনার দোষটা সেপাহীর না। অনেকদিন হয়ে গেছে যন্ত্রটা ঠিক করে চালানো হয়নি। স্প্রিংগুলো চেইঞ্জ তো দূরের কথা, সামান্য মেরামত পর্যন্ত হয়নি।
আমি : তাহলে ওকে এভাবে ধমক দিলেন যে?
অফিসার : আপনি একজন সিভিলিয়ান, তাই আপনার কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছে। আমাদের এই জায়গার রীতিনীতি, নিয়ম সম্পূর্ণ নিজস্ব। তাছাড়া এদের কীভাবে কন্ট্রোল করতে হয় আপনি ভাবতেও পারবেন না। একটু নরম হলে একেবারে মাথায় উঠে বসবে। তারপর ঘরের বউয়ের মত মাথা চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে।
অফিসার একটু থামে। কিছু একটা চিন্তা করে, একটু ইতস্তত করে বলে-
অফিসার : আপনাকে একটা কথা বলতে চাই, একটা অনুরোধ বলতে পারেন…
আমি : জ্বি বলুন না।
অফিসার : আমাদের মেশিনে শাস্তি দেয়ার কাজ সময়মত শেষ হয়ে যাবে আমার বিশ্বাস। আর যদি নাও হয়, তাও আমরা আসামীকে মেরে ফেলে মেশিনে শুইয়ে দেব। কেউ সন্দেহ করবে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- এই উপনিবেশের কিছু  সেনাকর্মকর্তাবিষয়টি জানতে চাইতে পারে। আগের সেনাপ্রধান বেঁচে থাকলে কোনো চিন্তাই ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর বলতে গেলে আমি একাই এই যন্ত্রের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। কোনো বাজেট দিচ্ছে না, তাই পিনগুলো সার্প করতে পারছি না। স্প্রিং, লিভার, পাম্পিং মেশিন এসব রিপেয়ার করা তো দূরের কথা, শুনে দুঃখ পাবেন, আসামীর শরীরে তার অপরাধের যে মনোগ্রাম বসানো হয় সেটা ক্লিয়ারলি ফুটিয়ে তুলতে এসিড লাগে… তার বদলে আমাদের ব্যবহার করতে হচ্ছে পানি! এসিডের জায়গায় পানি… চিন্তা করতে পারেন অবস্থা?
অফিসার রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলেন।
অফিসার : আমি বাচ্চাদের খুব স্নেহ করি এক্সামিনার। আগে যখন শাস্তি দেয়া হত তখন উপত্যকার দূর-দূরান্ত থেকে বাচ্চারা তাদের মায়ের হাত ধরে চলে আসত। হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভীরে বাচ্চারা সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি পেত। তারা সামনের সারিতে দাঁড়াত। কিছুক্ষণ শাস্তি দেখে মায়েরা চিৎকার করত, বমি করত, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আছে… কিন্তু বাচ্চাদের নার্ভ অনেক শক্ত, তারা এনজয় করত। নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো… কি অপূর্ব ছিল
দিনগুলো!
অফিসার রুমাল দিয়ে আবার মুখ মুছল। এটা বোধহয় তার মুদ্রাদোষ। আমি জিজ্ঞেস করলাম-
আমি : আচ্ছা অফিসার! আপনার নিজের ছেলেকে কখনো এনেছেন এইসব দেখানোর জন্য?
অফিসার : হঠাৎ এই প্রশ্ন?
আমি : না, এমনি জিজ্ঞেস করছি।
অফিসার : ওকে দেখানো ইচ্ছা আমার ছিল… কিন্তু আমার স্ত্রী চায় না সে শাস্তির আয়োজনটা দেখুক। তাই কখনো আনা হয় নাই।
আমি : আমি জীবনে বিভিন্ন ধরণের শাস্তির ব্যবস্থা দেখেছি, কিন্তু এরকম দেখিনি।
অফিসার : এটাই তো স্পেশালিটি। আমাদের আগের সেনাপ্রধান মনে করতেন- মৃত্যু সকল যন্ত্রণার অবসান। কিন্তু মৃত্যুকে সামনে দাঁড় করিয়ে যতক্ষণ শাস্তি দেয়া হবে, ততক্ষণ অপরাধী বেস্ট যন্ত্রণা ভোগ করতে পারবে। একারণেই
প্রক্রিয়াটি ধীর গতির। কি অসাধারণ দূরদর্শী ভাবনা ছিল তাঁর! ভাবালেও গায়ে কাঁটা দেয়।
সিপাহী সোজা হয়ে সেলুট দেয়ার ভঙ্গি করে অফিসারকে জানায়-
সিপাহী : Sir, all the things are ready to work.
অফিসার : এতক্ষণ সময় লাগল!
সেপাহী : Sir, I did it in less than a five minutes.
অফিসার কোমড় থেকে বেল্ট খুলতে খুলতে বলে-
অফিসার : হারামজাদা আবারো বেশি কথা বলিস! বেয়াদবের বাচ্চা… তোকে আজকে আমি মেরেই ফেলব।
বলেই অফিসার বেল্ট দিয়ে সিপাহীকে মারতে থাকে। সারাদিন না খেয়ে থাকা দুর্বল সিপাহী আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায়।
অফিসার : ওঠ! তাড়াতাড়ি অন কর।
সিপাহী গিয়ে মেশিন চালু করল।
অফিসার হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে এসে দেখল সব ঠিকঠাক চলছে কিনা।
একটু শান্ত হয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল-
অফিসার : চলতে থাকুক। আসলে এক্সামিনার আপনার সাথে আমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা আলাপ ছিল… আগামীকাল সেনাপতির সাথে আপনার মিটিং আছে- আজকের শাস্তির ব্যাপার নিয়ে।
আমি : হু। কালকে সন্ধ্যায় উনি পার্টিতে ডেকেছেন চিঠি দিয়ে। উল্লেখ করেছেন যে বিচার নিয়ে আলোচনা করা হবে।
অফিসার : পার্টিই তো ডাকবে। দেখবেন সবসময় চার পাঁচটা মেয়ে তাকে ঘিরে থাকবে। সে একজন চরিত্রহীন মানুষ। মেয়েমানুষ হচ্ছে তার নেশা। মেয়েদের সাথে মিশতে মিশতে তার ব্রেন অ্যাবনরমাল হয়ে গেছে। তাই সে
আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং এখানে পাঠিয়েছে। আমার সাথে সরাসরি কথা বলতে সে ভয় পায়।
আমি : তাই নাকি?
অফিসার : হু। যাই হোক, আগামীকালের পার্টিতে সে শাস্তির ব্যাপারে জানতে চাইবে খুব ক্যাজুয়ালি। আপনাকে কোনো রিপোর্ট জমা দিতে নিষেধ করবে। কিন্তু একটা ব্যাপার মনে রাখবেন- তার আশেপাশে থাকা  রক্ষিতাদের মধ্যেই স্পাই আছে। যে আপনার সকল কথা খুব মন দিয়ে শুনবে এবং অবিকল নোট করে পরে রিপোর্ট দিবে। নতুন সেনাপতি অমনযোগী ভান দেখিয়ে এমন কিছু কথা বলবে- যাতে আপনি নেগেটিভ কিছু বলেন। আমাকে অমানুষ, বর্বর, জাতহীন এমন কথা বলাও বিচিত্র না… আপনার প্রত্যক্ষ সমর্থন যদি তার পছন্দ অনুযায়ী যায়, তাহলে উনি বিশিষ্ট সকল মানুষের সামনে হঠাৎ একটা ঘোষণা দিবেন যার সারমর্ম- “উপত্যকায় প্রচলিত হত্যাযজ্ঞ মধ্যযুগীয়। এই হিংস্র যন্ত্রনির্ভর রীতি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এক বছরের জন্য। আশা করছি এতে আপনাদের সকলের মত আছে।”
তখনই পার্টি জুড়ে একটা বিশাল হৈচৈ রোল উঠবে এবং সবাই হাতের গøাস উঁচু করে বলবে-“ঈযববৎং”। তারপর
আর কোনো রাস্তাই থাকবে না…
অফিসার আবার ঘাম মুছতে থাকেন।
আমি : বলেন কি ! আমি ভেবেছিলাম যে আমাকে এখানে আনা হয়েছে জাস্ট আই ওয়াশ করার জন্য। আমার হাতে কোনো কিছুই করার নেই। কিন্তু এখন আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে- বিপদজনক কিছু হতে যাচ্ছে।
অফিসার : অবশ্যই বিপদজনক! ষড়যন্ত্র করে আমাকে হটাবে… তারপর চেষ্টা করবে আমাকে মৃত্যুদÐ দেয়ার পাকাপাকি ব্যবস্থা করতে। তাই আপনাকে প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে হবে। একবার “ঈযববৎং”বলা মানেই আমার মৃত্যু।
এটা অনেকটা সাংকেতিক ল্যাংগুয়েজের মত। আপনি যদি মেশিনটার অভিনব কায়দা ও শাস্তির ব্যাপারে পজেটিভ
কথা বলেন, তাহলে কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না… আমার মারা যেতে আপত্তি নেই, কিন্তু এই মেশিনের
সম্মানহানীতে আপত্তি আছে এক্সামিনার।
আমি : আমার মনে হয় আপনি বেশি টেনশন করছেন। ট্রায়ালের টেকনিক্যাল বিষয়ে আমি বিশেষজ্ঞ না। আমার কথার ওপর এত গুরুত্ব তারা দিবে, এমন মনে হয় না…
অফিসার : ভুল! আপনার ধারণা নেই যে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। আপনি যদি পজেটিভ রিপোর্ট করেন তাহলে একমাত্র মহামান্য রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া কারো ক্ষমতা নেই এর বাইরে কিছু করার। আর আমি নিশ্চিত যে বিভিন্ন ধরণের ট্রায়াল আপনি এক্সামিন করেছেন এবং এই বিষয়ে আপনার জ্ঞান অনেক। এই আসামী ধরলাম একটা নেড়ী কুকুর। ওর মরা-বাঁচা, শাস্তি কোনটিতেই কিছু যায় আসে না। কিন্তু আপনিই বলুন সত্যিকারের কাউকে শাস্তি দেয়ার জন্য এই যন্ত্রটা কি অভিনব নয়?
আমি :অবশ্যই অভিনব। আসামীকে বাঁচিয়ে রেখে শাস্তির ব্যবস্থাটা আমাকে সত্যিই অবাক করেছে।
অফিসারের মুখ থেকে কালো মেঘ সরে গেল। তার চোখে মুখে এখন পরিতৃপ্তির ছায়া। সে অভিভূত হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
অফিসার : Thank you friend… Thank you so much. আমি জানতাম এক্সামিনার আপনি পুরো প্রক্রিয়াটির মর্ম বুঝবেন। ভালো একটা রিপোর্ট জমা দিবেন।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেই।
আমি : না। আমি আপনার কথা মত রিপোর্ট করব না।
অফিসার অবাক হয়ে-
অফিসার : মানে? কি বলছেন এসব?
আমি : মানে খুবই সহজ। আপনার এই যন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা আর আপনার ফ্যাসিনেশন- সবকিছুই খুব বর্বর, অমানবিক ও ঘৃণ্য। সম্মান থাকা তো দূরের কথা, এই যন্ত্র যে বানিয়েছে সে একটি নরপিশাচ। একজন বিকৃত রুচির পুরুষ।
আগামীকাল সেনাপতি দপ্তরে আমি তাই রিপোর্ট করে যাব। কোনো পার্টি ফার্টিতে গিয়ে তামাশা দেখার বিন্দুমাত্র
ইচ্ছা আমার নেই।
অফিসার : আপনাকে আমি হয়ত বুঝাতে পারিনি। ঐ পার্টিতে আমিও তো থাকব, আপনিও থাকবেন। কেন থাকবেন না!
আপনাকে বেশি কিছু ব্যাখ্যাও করতে হবে না স্যার। শুধু নেগেটিভ ব্যাপার যেমন- ঠিক সময় মত বিচার শুরু হয়নি,
অনেক লোকজন আসলে ছিল না, শাস্তি দেয়ার সময় যন্ত্রটা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি- এইসব ব্যাপার শুধু
এড়িয়ে যাবেন। যান্ত্রিক কোনো প্রবলেম নিয়ে কথা বললে আমি বলব। এর থেকে বেশি তো আর কিছু না।
আমি : অসম্ভব অফিসার। আপনার এইসব কোনো কথাই আমি বলব না। বরং আমি বলব যে…
অফিসার : আপনি চাইলে আমি পুরো ব্যাপারটা আরেকবার ব্যাখ্যা করতে পারি। আর দেখুন, এখন মেশিনে কোনো প্রবলেম দিচ্ছে না…
আমি হাত দেখিয়ে অফিসারকে চুপ করতে বললাম।
আমি : থামুন। আপনারকথা শুনতে শুনতে আমার মাথার রগ ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমি দপ্তরে এও রিপোর্ট করে যাবো যে- এই ধরণের শাস্তি পদ্ধতি অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ, যা মধ্যযুগের শাস্তি ব্যবস্থা এমন কি গিলোটিনের থেকেও বিকৃত। লাইফে কোনোদিন এর চাইতে জঘণ্য শাস্তি পদ্ধতি আমি দেখি নাই। আমি কাল সকালেই এই দ্বীপ ছেড়ে যাব। বাড়ি ফেরার আগে রিপোর্ট জমা দিয়ে তারপর যাব। কাল রাতের পার্টি বা বিশেষ আনন্দময় সভায় উপস্থিত থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
অফিসার আরেকদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে আপন মনে কি যেন বলল। লাজুক মেয়েদের মত ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে যন্ত্রটার দিকে তাকাল।
অফিসার : তাহলে এই শাস্তি পদ্ধতিতে আপনার কোনো রকম সমর্থন নেই? এই আপনার শেষ কথা?
উত্তরে আমি কিছু বললাম না।অফিসার একটু চুপ করে থেকে মেশিনটার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজ হাতে মেশিনের লিভার টান দিয়ে ওটা বন্ধ করল। অফিসার আমাকে কিছুটা সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিয়ে বলল-
অফিসার : তাহলে আমি সেই ভয়ংকর সময়ের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছি।
আমি : কিসের সময়?
উত্তর না দিয়ে অফিসার মেশিনে আটকানো বন্দীর কানের কাছে গিয়ে বলল-
অফিসার : যা। এখন থেকে তুই মুক্ত। আমি তোকে কোনো শর্ত ছাড়াই মুক্তি দিচ্ছি। এখনই।
বন্দী অবাক হয়ে চোখ খুলল। সে যেন আরো ঘাবড়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারছে না কিছুই। আসলেই কি সে বেঁচে গেল?
নাকি এটাও একটা খেলার অংশ? ধীরে ধীরে তার ফ্যাকাশে মুখ লাল হয়ে উঠল। সে কিছুটা স্বাভাবিক হল। বন্দী নিজেই উত্তেজিত হয়ে নড়ে ওঠার চেষ্টা করল। অফিসার হুংকার দিয়ে উঠল।
অফিসার : হচ্ছেটা কি! একটুও নড়াচড়া করিস না। মেশিনের ফিতাগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। একদম চুপ করে শুয়ে থাক। যা করার আমরাই করব। সিপাহী, ওকে সুন্দর করে মেশিন থেকে বের করে আন।
সিপাহীর মুখে এই প্রথম হাসি দেখা গেল। সে খুশি।
সিপাহী : নিশ্চয়ই স্যার, নিশ্চয়ই।
সিপাহী আনন্দিত, বন্দী হতবাক। অফিসার বন্দীর বাম দিকে দাঁড়ানো। এরপর অফিসার আমার দিকে হেঁটে এসে তার চামড়ার ব্যাগ থেকে ছোট্ট এক টুকরা কাগজ বের করে দিল।
অফিসার : একটু পড়ে দেখুন পেপারটা।
আমি : আমি তো আগেই বলেছি। আপনাদের ভাষা, সংকেত আমার জানা নেই।
অফিসার : তবুও একটু চেষ্টা করুন প্লিজ।
আমি কাগজটা হাতে নিলাম এবং যথারীতি কিছুই বুঝলাম না। বৃথা চেষ্টা। লিপিগুলোর দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকলাম।
আমি : ধরুন… আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
অফিসার কাগজটি নিয়ে বলল-
অফিসার : এইখানে লেখা আছে, “ন্যায়ের পথ তিক্ত”। এইটাই লেখা আছে। বুঝতে পেরেছেন?
আমি : হতে পারে। অন্তত আপনি তাই বলছেন।
অফিসার কাগজটি আমার হাত থেকে নিয়ে তার ব্যাগে ভরে রাখলেন।
অফিসার : সেপাহী, প্রাক্তন আসামীকে আমার তাঁবুতে নিয়ে পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পরা, আর ভালো খাবার এনে দে।
সেপাহী : জ্বি স্যার। অবশ্যই।
সেপাহী আসামীকে নিয়ে তাঁবুর ভেতর গেল। অফিসার মই বেয়ে মেশিনের ওপর উঠে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। অফিসার মই দিয়ে নেমে আসল।
অফিসার : সবকিছু পারফেক্ট কন্ডিশনে আছে।
তারপর সে নিজের সকল পোষাক, ব্যাজ একে একে খুলে পাশে করে রাখা গর্তে ছুঁড়ে ফেলল। এরপর জেলের কয়েদীদের পোষাক পরে নিল।
অফিসার : আমি রেডি স্যার। আপনি যেহেতু সন্তুষ্ট নন, তাই বিধান অনুযায়ী এই শাস্তি আমার প্রাপ্য। আমি শাস্তির জন্য প্রস্তুত। শুধু রুমালটা রেখে দিন। এটা আগের মহামান্য সেনাপতির রক্ষিতা তাঁকে দিয়েছিল।
আমি বাধ্য হয়ে রুমালটা হাতে নিলাম। এদিকে আসামী আর সেপাহী তাঁবু থেকে বের হয়ে এসেছে। চুপ করে থাকলেও আসামী যে প্রচণ্ড খুশি তা বোঝা যাচ্ছে। অফিসার সিপাহীকে ত্ইু না বলে তুমি বলে সম্বোধন করল।
অফিসার : সিপাহী, আমি যন্ত্রটায় ঢোকার পর তুমি ফিতাগুলো বেঁধে সুইচ অন করে লিভার টেনে দিবে। এরপর কি কি করতে হয় তোমার জানা আছে। সেই অনুযায়ী কাজগুলো ধাপে ধাপে করে যাবে। আর এক্সামিনার আমাদের সম্মানিত অতিথি। উনি যখন চলে যাবেন তাঁর আগের ভালো করে খাইয়ে, তুমি সাথে গিয়ে তাঁকে জাহাজে তুলে দিয়ে
আসবে। ঠিক আছে?
ডসপাহী : নিশ্চয়ই স্যার। আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না।
অফিসার : তাহলে সম্মানিত এক্সামিনার। বিদায়। আপনার অনেক কষ্ট হল।
অফিসার দ্রুত মেশিনের শয্যায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। সিপাহী তার নির্দেশনুযায়ী কাজ করে দিল। আমি নীরবে বসে থাকলাম। যন্ত্র চলতে থাকল। ভেবেছিলাম পুরো ব্যাপারটা দেখে যাব, কিন্তু পূর্বের আসামী আর সেপাহীর উৎসাহ দেখে অসহ্য লাগছিল। একটা পর্যায়ে আমি হুকুম দিলাম।
আমি : সেপাহী?
সেপাহী : জ্বি স্যার ?
আমি : এই যন্ত্র এখন তো এভাবেই চলতে থাকবে? নাকি আরো কিছু করা বাকি আছে?
সেপাহী : জ্বি না স্যার। সকল কাজ শেষ। এখন এভাবেই চলতে থাকবে। আর মাত্র তিন ঘণ্টা তারপরই সব শেষ। হা হা হা।
সিপাহীর সাথে সাথে আসামীও হাসতে থাকল।
আমি : হাসছ কেন তোমরা! আমি তোমাদের দুইজনকেই আদেশ দিচ্ছি যার যার ডেরায় ফিরে যাও।
সিপাহীর মুখ শুকিয়ে গেল। আসামীও হতাশ। মজা দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায়।
সিপাহী : কিন্তু… কিছু মনে করবেন না স্যার। অফিসার সাহেবের মৃত্যুর পরও বেশ কিছু ফরমালিটিস আছে। আপনি তো দেখেছেন যে আমাদের সাহায্যে করার জন্য কোনো লোক এখানে নেই। তাই আমরা দুইজন মিলেই অফিসারের
সৎকার কাজ শেষ করব ঠিক করেছি।
আমি : তারমানে আমার কথা শুনবে না! যদি আমি তোমাদের নামে রিপোর্ট করি তো কি অবস্থা হবে?
সিপাহী : স্যার, আপনি একজন সিভিলিয়ান। তারপরও এখানে আপনিই সুপেরিয়্যর, তাই চেইন অফ কমাÐ মানতে আমি বাধ্য। আপনি বললে আমাদের চলে যেতে হবে…
হঠাৎ সিপাহী নাটকীয়ভাবে আমার পায়ে ধরল। কান্না কান্না গলায় অনুরোধ করল-
সিপাহী : স্যার এইরকম আদেশ আপনি দেবেন না… আপনি জানেন না এই অফিসারের জন্য আমার পরিবারের কত মানুষ মরেছে। আমার কাছে ওর মৃত্যু দেখার মত আনন্দের আর কিছু নাই। আমাকে একটা চান্স দিন?
আমি : তুমি ডিউটি পালনের জন্যে কখনো কাউকে খুন করো নাই?
সিপাহী : কেন করব না স্যার! অবশ্যই করেছি।
আমি : যাদের মেরেছ তাদেরও হয়ত ফ্যামিলি ছিল? ছিল না?
সিপাহী কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেলল।
আমি : আমি আর কোন কথা শুনতে চাই না। তোমরা দুইজনই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও।
ঠিক সেই সময় মেশিনটা ঘটঘট করে তীব্র শব্দ করতে থাকল। যন্ত্রের পিছনের দিকের একটা বিশাল চাকা খুলে গেছে। সিপাহী দৌড়ে গেছে কিন্তু হাত দেয়ার কোন উপায় নেই, কারণ ধারাল পিনসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ চলছিল। ভেতরে আটকানো অফিসার একেবারে পিষ্ট হয়ে গেছে মনে হয়।
আমি : মেশিন বন্ধ কর! কুইক। পাওয়ার সুইচ খুলে দাও।
সিপাহী সাথে সাথে পাওয়ার কেবল টেনে খুলে ফেলল। যন্ত্রটা বন্ধ হয়ে, স্যান্ডউইচের মত খুলে গেল। ভেতর থেকে অফিসারের বিদ্ধস্ত দেহ বের হয়ে ছিটকে গিয়ে পড়ল খোঁড়া সমাধির ভেতর। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম মৃতদেহটা। সারা শরীর বিক্ষত কিন্তু চেহারা যেন একটুও পরিবর্তন হয়নি! অবিকল জীবন্ত চেহারা! অফিসারের সেই কাগজের লেখাটা বুকের যথাস্থানে না বসলেও অস্পষ্টভাবে লেখা বুঝা যাচ্ছে- “ন্যায়ের পথ তিক্ত”। বুকের মাঝে লেখা জায়গাটা থেকে বিন্দু বিন্দু রক্ত বের হতে থাকল, রেখাচিত্রের মত।
আমি অফিসারের মরদেহটা ঠিকভাবে কবর দিতে ওদের ডাক দিলাম।
আমি : এই তোমরা আমাকে সাহায্য করো। মাটি ফেল…
সিপাহী ও আসামী একটুও এগিয়ে আসল না।
আমি একাই পারতাম সমাধিস্থ করতে কিন্তু হঠাৎ মনে হলো- কি দরকার এসবের? যেখানে আমি পুরো প্রক্রিয়ারই বিরুদ্ধে।
দৃশ্য-৭
সময় : সন্ধ্যা
স্থান : নদীর কাছে চা বাগান
চরিত্র : সিপাহী, আসামী ও আমি
আমি চা বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে ঘাটের দিকে যাচ্ছি। আমার পেছন নিঃশব্দে সিপাহী ও আসামী আসছে। জায়গাটা খুবই নির্জন ও ঘন সবুজ। চা বাগানের মধ্যে বিশাল একটা বাংলো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে বাড়ির একপাশ ধসে গেছে। সিপাহী হঠাৎ কথা বলে উঠল।
সিপাহী : ঐ যে বাংলো বাড়ি। যুদ্ধের আগে কি যে সুন্দর ছিল বাড়িটা! এখন নষ্ট হয়ে গেছে। প্রত্যেকটা বাগানের বাংলো বাড়িগুলার একই অবস্থা স্যার।
আমি বাড়িটার দিকে অগ্রসর হলাম। ওরাও আমার পেছন পেছন আসতে থাকল। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর বাড়িটার সামনে এসে থামলাম।দরজায় বিশাল একটা তালা ঝুলছে। সিপাহী হরবর করে আমাকে তথ্য দিতে থাকল।
সিপাহী : স্যার, এই বাড়ির মধ্যে আগের সেনাপতির লাশ পোঁতা আছে। আমাদের পাদ্রী ঐ ব্যাটার লাশ গোরস্থানে ঢুকতে দেয় নাই। হি হি হি। তাই সেনাপতির চেলাচামুণ্ডরা এই বাড়িতেই ওকে গর্ত খুঁড়ে কবর দিয়েছে। আপনাকে অফিসার এইসব প্যাঁচাল পারে নাই। আসলে ব্যাপারটা খুবই লজ্জার… তাছাড়া শয়তান অফিসার দলবল নিয়ে দুইবার এই বাড়িতে হামলা চালায় লাশটাকে বের করার জন্য, কিন্তু দুইবারই কেউ না কেউ টের পাওয়ায় ওরা লেজ গুটিয়ে পালায়। হি হি…
আমি : শুধু শুধু হাসছ কেন?
সেপাহী চুপ করে যায়।
আমি : আমাকে একটু কবরটা দেখাতে পারবে?
সেপাহী : অবশ্যই পারব স্যার। কিন্তু আপনাকে কষ্ট করে এইদিক দিয়ে ঢুকতে হবে।
মহা-উৎসাহে সিপাহী আর আসামী বাড়িটির পেছনে বাম পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল। আমি ওদের অনুসরণ করলাম। একটা ভাঙ্গা জানলার সামনে এসে ওরা দুইজন দাঁড়াল।
সেপাহী : স্যার কষ্ট করে এই জানলা দিয়ে ঢুকতে হবে।
জানলাটা বেশি উঁচু না। আমি প্রথমে এক পা উঠিয়ে সহজেই ভেতরে ঢুকে গেলাম।
দৃশ্য-৮
সময় : সন্ধ্যা
স্থান : ধসে পড়া বাংলোর ভেতর
চরিত্র : সিপাহী, পূর্বের আসামী, কয়েকজন লোক ও আমি
ভেতরে ঢুকে আমি হতভম্ব! দেখি-ঠাণ্ডা স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে কয়েকজন বিভিন্ন দেশের, গোত্রের, বর্ণের পুরুষ শ্রমিক ও কয়েদীরা বসে বসে কিসের যেন নাম জপছে ছন্দে ছন্দে। লোকগুলোকে দেখে মনে হল- খুব সাধারণ, সরল, নিরীহ কিন্তু সম্মোহিত। আমাকে আচমকা দেখে ওরা অবাক হয়ে তাকাল। ঐ কয়েদীদের মধ্যেই একজন বাকি সতীর্থদের বলল-
কয়েদী : উনি একজন ভিনদেশী আগন্তুক। নিশ্চয়ই এখানে এসেছেন কবরটা দেখতে।
বাকিরা সরে জায়গা ফাঁকা করে দিল। লোকটা নিজ হাতে সমাধির ওর রাখা সাদা পরিচ্ছন্ন কাপড় সরিয়ে দিল। আমি সমাধিটার সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসলাম। একটা চ্যাপ্টা পাথরের ফলকে লেখা-
“মহামান্য সেনাধ্যক্ষ এখানে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
বিশ্রাম শেষে তিনি উঠে এসে এই উপনিবেশ
ও উপত্যকাকে উদ্ধার করবেন।”
পড়া শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই আমার কাছে মনে হল আশেপাশের কেউ কেউ হাসছে। এরকম অযৌক্তিক কথা আমি এত মন দিয়ে পড়লাম এটাই কি হাসির কারণ? আমি ঘুরে তাকাতেই সবাই চুপ করে গেল।
এইখানে পরীক্ষক হিসেবে আসার জন্য ওরা আমাকে অগ্রিম যেই সম্মানী দিয়েছিল, আমি সেই মুদ্রাগুলো বের করে প্রত্যেককে সমান সংখ্যক মুদ্রা ভাগ করে দিলাম। শুধু সেপাহী আর আসামীকে ছাড়া। তাদের লোভী দৃষ্টি বলে দিচ্ছে- তারা আরো বড় কিছু আশা করে।
লোকটা কাপড় দিয়ে সমাধিটা ঢেকে দিল। আমি দ্রুত ঘরের দরজা দিয়ে বের হলাম। বাইরে অন্ধকার হয়ে এসেছে।
দৃশ্য-৯
সময় : সন্ধ্যা
স্থান : নদীর ঘাটের পারে
চরিত্র : সিপাহী, আসামী ও আমি
নদীর তীরে দাঁড়ানো দুইটা নৌকা। একটু দূরে জাহাজটা দেখা যাচ্ছে। নৌকাগুলো সম্ভবত জাহাজের নিজস্ব, তবে লোকজন কেউ নেই। বৈঠা নিজেরই টানতে হবে। আমি একটাতে উঠতে যাচ্ছি, সেসময় সেপাহী বলল-
সিপাহী : স্যার আমাদের দুইজনকে আপনার সাথে নিয়ে যান। এই উপনিবেশ আমরা ছেড়ে যেতে চাই।
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে নৌকায় বসে পাটাতন সরিয়ে ফেললাম। ওদেরকে নৌকায় আমার সাথে আসার কোনো সুযোগ দিলাম না। ৩-৪ মিনিট পরে জাহাজে ওঠার আগে কৌতুহলের কারণেই বোধহয় তীরের দিকে ফিরে তাকালাম। সেপাহী আর আসামী এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে।
।। এই অসম্ভব বর্বর দ্বীপ থেকে তারা মুক্তি চায়। কিন্তু কাউকে মুক্ত করার ক্ষমতা আমার নেই।
 সত্যিকারের মুক্তির পথ দেখানোর ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই থাকে।।
সমাপ্ত

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge