সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৫৪ অপরাহ্ন

আল-আমীন আপেল এর গল্প “কোপ”

আল-আমীন আপেল এর গল্প “কোপ”

আল-আমীন আপেল এর গল্প “কোপ

‘ও..তলে তলে সোগ চলে, খালি হামার বেলায় শালা লকডাউন! ‘
রৌদ্রমুখর জ্যৈষ্ঠের দিনে রিকশাওয়ালার রাগমাখা কটমট চোখে অাগুনঝরা অস্থিরতা, গলার স্বরে ক্ষোভের মিছিল। মাস্কমুখো পুলিশ বেচারা থতমত খেয়েছে রিকশাওয়ালার কথায়। আজ সে নতুন ডিউটি করছে না এই এরিয়ায়। ‘তলে তলে সোগ চলে’ কথাটা দিয়ে রিকশাওয়ালা কি বোঝাতে চেয়েছে সে সেটা আর বুঝতে বাকি নাই পুলিশের। কারণ, রিকশাওয়ালার ক্ষোভমাখা কথাটা ভাবতে ভাবতে দুইটা ইজিবাইক নির্ভয়ে তাদের ডান দিয়ে চলে গেল। পুলিশ বোকার মতন সেদিকে চোখ রাখতে রাখতেই রিকশাওয়ালা রিকশার হাতলে হাত রাখে, প্যাডেলে পা দিয়ে বাড়ির পথে চোখ দেয়। মুখে কোনো মাস্ক নাই তার।
খানিক দূরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ আমি সাক্ষী-গোপালের ভূমিকা পালন করছিলাম। মুতের চাপ দিয়েছে জন্য এ ভূমিকায় আমার আর থাকা চলছে না! কাজটা কোথায় সেরে নেবো তা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে খুব। চোখেরা সামনে তাকাতেই দেখি- প্রবাসী কাবিলা ভাইয়ের বউ হাতির মতন শরীরটা নিয়ে বেঢপ পায়ে এদিকে আসছে। মুখে মাস্ক আর হাতে বাজারের ব্যাগও দেখা যাচ্ছে, বাজার হতে ফিরছে। বাদিকে তাকালাম, স্কুলঘর; ডানে তাকালাম, মুদি দোকানের সারি। আশাহত হয়ে পেছনে তাকালাম, দেখি- অদূরে একটা বাঁশঝাড়, তারই ছায়ায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে আছে দুটি নেড়ি কুকুর। সন্তর্পণে এগিয়ে ওদের থেকে একটু দূরে আড়াল হয়ে বসে কাজটা সেরে ফেললাম। প্যান্টের জিপার ঠিক করতে করতে খেয়াল করলাম কাবিলা ভাইয়ের বউ চলে গেছে।
সেদিক হতে মনযোগ সরে এসে দৃষ্টি স্থির হয় কুকুর দুটির ওপর। আহা রে! সামাজিক দূরত্ব জিনিসটা এরাও বোঝে! অথচ আমরা শালা মানুষ হয়ে বুঝতেছি না এখনো! এসব নিয়ে ফেসবুকে দু-চারটা কথা লিখেও শান্তি পাবার উপায়ও নাই, কঠোর নজরদারি ফেসবুক জুড়ে। ডিজিটাল আইসিটি আইন আপডেট করা হয়েছে, যাতে এই ‘কোভিড নাইন্টিন’ মারীর ব্যাপারে কেউ গুজব রটতে না পারে।
কিছু রটুক আর নাই রটুক, ফেসবুকে আমার লেখা একটা কবিতা কিভাবে জানি রটে গেল। কবিতাটা ছিল এ রকম:
জানিস পরী, রোজ তোর নামে
কিচিরমিচির করে প্রার্থনারত একটা পাখি…
বুঝতে কি পা’স, কতখানি মনে রাখি?
মজার ব্যাপার এ নামে আমি কাউকে চিনি না। তবে আমাদের গ্রামে খুব সম্ভবত একটা সতের বছরের মেয়ে আছে। বহুত সুন্দর, ভরা যৌবন দেহে; মনেও হয়তো, সে খবর জানা নাই আমার। সে খবর না জানলেও চলবে আমার, তবে সে মেয়ের নামও যে পরী সেটা অজানা থাকাটা চলে না। বিপত্তিটা এখানেই বাধে।
এরচে’ বড় বিপত্তির ব্যাপার হচ্ছে আমার ‘শ্রদ্ধেয় আব্বিজান’। সে বিপত্তির বিশ্লেষণ কি করব ভাবতে ভাবতেই দেখি মুয়াজ্জিনের সুমধুর স্বরে ভেসে আসছে-
হাইয়্যা আলাছ ছালাহ্,
হাইয়্যা আলাছ ছালাহ্..
ঠিক মাথা বরাবর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সূর্যটা। গোসল সেরে খেয়ে নিলাম। এবার ভাতঘুম দেবার পালা। ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গত দু’মাস বাড়িতে থেকে দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যাসটা হয়েছে। তা না হলে এই সময়ে আমি টিউশনী করাতে বেরিয়ে পড়তাম। এর মানে এই নয় যে আমি কৃপণ কিংবা গরীব ঘরের সন্তান। টাকা-পয়সা-ব্যাংক ব্যালেন্সের কমতি নেই আমার ‘শ্রদ্ধেয় আব্বিজান’এর। তবে সে টাকায় চলতে কেন জানি মন চায় না আমার।
যেমন মন নাই চাইলেও এখন একটু ফেসবুকে ঢু মারা চাই। কারণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিন লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। আজকের করোনা আপডেটটা দেখার জন্যই ডাটা কানেকশন অন করলাম।
‘গত ২৪ ঘন্টায় দেশে নতুন করে কোভিড নাইন্টিনে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ৪৫জন!’ -এ খবর শুনে তো ভড়কে গেলাম! এটা দেশে একদিনে মৃত্যুবরণের বিগত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেল। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হচ্ছে! ভাবা যায়!
অনেকক্ষণ এসব ভাবছি। হঠাৎ ভাবান্তর হলো। ভাবনাজালে ধরা পড়লো একটা চিন্তা। গভীরতর চিন্তা। চিন্তার বিষয়টা ক্লিয়ার করা দরকার এখন। এতক্ষণ ধরে আমি দু’বার ‘শ্রদ্ধেয় আব্বিজান’ বলছিলাম, নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন? খেয়াল না করলেও সমস্যা নাই। পৃথিবীতে সবচে’ বড় সমস্যাটাই হচ্ছে মানুষ! -একথা যেমন সত্যিই, পাশাপাশি এটাও সত্যি: করোনার চে’ বড় ভাইরাস হচ্ছে মানুষ।
আর সে ভাইরাস মানুষের একটা জ্বলজ্বলে উদাহরণ আমার আব্বিজান। শ্রদ্ধেয় আব্বিজান!
তিনি এ গ্রামের মেম্বার। অন্যান্য দূর্যোগের সময়ে বাকি মেম্বার-চেয়ারম্যানের মতন ত্রাণের টিন, চাল, ডাল, নুন, তেল- যা আসে উপরমহল হতে, তার অধিকাংশই মেরে দেন এই ভদ্রলোক। ব্যাংকের একাউন্টে সেসব বেচে টাকা জমান, দিনে দিনে বাচ্চা দেয় সেসব টাকা; একাউন্টের পেট ফুলে পোয়াতি হয়ে যায়। সে টাকায় চলে সংসার। বহুদিন সহ্য করেছে আমার মমতাময়ী মা, কখনো প্রতিবাদ করেছে, বিনিময়ে জুটেছে অশ্রাব্য গালিগালাজ, তালাকের মঞ্চে তোলার হুমকি।
আমি একমাত্র সন্তান। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই আমি আব্বিজানকে ঘেন্না করি। সে খবর এলাকার সব লোক থেকে শুরু করে বাড়ির কুকুরটাও জানে। জানে না শুধু আমার এই ভদ্রলোক পিতা!
মারীর এই সন্দিগ্ধ সময়েও তার এসব হাতটানের অভ্যাস গেল না। এবারের ঈদে দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত দুই টন চালের দেড় টনেই মেরে দিয়েছেন তিনি। অবশ্য দোষটা আমার বাপের একার নয়। এটা নাকি এই নিদানকালে একটা অনুকরণীয় কাজ ছিল। দেশব্যাপী চালচোরদের যে লিস্ট করা হয়েছিল, সেখানে আমার জোচ্চোর বাপের নামও ছিল। এ খবরে আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। আহা! চিহ্নিত চালচোরের একমাত্র উত্তরাধিকারী আমি। এমন সুখের সংবাদে আমার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেবার কথা থাকলেও দেয়া হয় নি।
এ সংবাদ তো আমার বেচারি মা কিছুতেই কানে তুলতে চায় না। আহা রে! এখনও স্বামীকে কি সম্মান করতে জানে আমার দেশের মেয়েরা! সেটা যে অন্ধভক্তিতে গড়ায় টেরই পায় না অনেকে। আমার মায়ের ব্যাপারটাও এমন। দাসী, কাজের মেয়ে আছে যারা বাড়ির সব কাজ-কম্ম করে, মা শুধু তদারকি করে মাঝেসাঝে। স্বামীকে নিজ হাতে ভাত বেড়ে দেয় সে। নামাজ, রোয়া, তসবিহ-তাহলীল নিয়েই থাকে সে। দুনিয়াটা যেন তার কাছে জেলখানা। আসলেই তো দুনিয়াটা জেলখানা। যার মুক্তি মরণের পর, ওপারে। অথচ আমরা সে জেলখানাতেই মেতে থাকি; মুক্তির পথ খুঁজি। আমার বাপের প্রতি মায়ের এ সম্মানবোধকে আমি সম্মান করি- রিয়ালি আই লাভ দিস উইম্যান। কিন্তু, বাপের এ অপকর্ম তো সহ্য করার মতন নয়।
যেহেতু সহ্য করার মতন নয়, সেহেতু বাপের অন্যায়ের সাজা না হওয়াটা সমীচীন নয়। ভালো মতন ঘাট বেধেই তাই নিজের বাপের বিরুদ্ধে থানায় মামলাটা ঠুকে এসেছিলাম, এলাকাবাসীর পক্ষ নিয়ে। ভাবছেন কাজটা করতে গিয়ে কষ্ট হয় নি? জানের ভয় হয় নি? মোটেও না। কারণ, ওপারে ফিরে যেতে হবে- এ চিরন্তন শর্তে রাজি হয়েই তো পৃথিবীতে আসি আমরা। আর যে ছোটলোক গরীবের হক মেরে খায়, তার বিপক্ষে কাজ করতে আমার বুকে বিন্দুমাত্র দুঃখবোধ হওয়া অনুচিত।
আজকে বাপের জেলবাসের সপ্তম দিনে এসব মনে উঠছে আমার। কিছুটা হলেও আরামসে ছিলাম, এ কয়েকটা দিন। তবে সাপের নাকি পাঁচ পা থাকে, আমার বাপেরও আছে; সেসব সাপরূপী ছোকড়া-চ্যালারা হুমকি-ধামকি দিয়েছে কেউ কেউ। তার সাথে মায়ের আবার স্বামীর জন্য কান্নাকাটি! বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছে মাঝেসাঝে। টিউশনীর জমানো কিছু টাকা হাতে ছিল। তাই দিয়ে বাজার-সদাই করেছি এ কয়েকদিন। যা আছে তাতে আরো দিন দশেক যাবে।
এসব চিন্তা করতে করতে চোখের পাতারা লেগে আসছে।
ঘুমে ঘুমে আছরের ওয়াক্ত হয়ে আসে। শুয়ে থাকাটা চলে না আর। নামাজ পড়বো কি পড়বো না- ভাবতে গিয়ে শেষে পড়াই হলো না। জপিদ ভাইয়ের ছোট ছেলেটা ডাকতে এসেছে, ঘুড়ি ওড়াতে যাবে বলে। এই মারীর লকডাউনে নিদেনপক্ষে দশ রকমের ঘুড়ি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। বক্সঘুড়ি, ঝাপঘুড়ি, চিলঘুড়ি- আরো কত নাম! ওসব নাম মনে করে কাজ নেই। তবে এলাকার সতের বছর বয়সী পরীর চেহারা মনে করে সুখ আমি পেতেই পারি। আহা কি ভরপুর শরীর মাইরি! মনে কয়: এই জ্যৈষ্ঠে একটা পাকা কাঠালের সুঘ্রাণ যেমন নাকে এসে লাগে, তেমনি যৌবনগন্ধীর মতন আমার দৃষ্টি ঘ্রাণ খুঁজে যায় পরীর আপাদমস্তক। নাকি পরীই সে ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিয়েছিল মাস খানেক আগে!
বোশেখের তৃতীয় দিন ছিল সেটা। মা দুপুরে খেয়ে একটু ভাতঘুম দিয়েছেন। আর আমি বই পড়তেছিলাম, বাড়ির পাশে পুকুরপারের টঙে বসে। টঙের ছায়া পড়েছে পুকুর জলে, আমার ছায়াও পড়েছে। আমার দৃষ্টি স্রেফ সেদিকে ডুবে আছে কিছুক্ষণ ধরে। হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলি পুকুরের অপরপারে গোসলে নামা একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে। আমি এপারে টঙে বসে আছি, সেটা বোধ করি খেয়াল করে নি অথবা, খেয়াল করেই গোসলে নেমেছে। তবে আমি অল্প কিছু সময়ে যেটা খেয়াল করেছি- ভেজা শরীরে লেপ্টে গেছে শাড়ি। নিটোল পাছা, আর নজরকাড়া আধখোলা বুক। আহা বুক তো নয়! দুই দুইটা আবেদনময়ী টিলা যেন পাশাপাশি জেগে আছে।
এরচে’ বেশি কিছু খেয়াল করার আগে মেয়েটা সরে যায়। কিন্তু, আমার মন থেকে তো সরে যেতে পারে নাই, হুটহাট চোখে ভাসে পরীর ভরাট শহরটা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সে আমাদের গ্রামে ঠিক শেষ মাথায় যে বাড়িটা, সেখানে বিধবা মায়ের সাথে থাকে। তার চলাফেরা দেখে চরিত্র নিয়ে সন্দেহ হয় মাঝেমধ্যে, রোজ রোজ এত দামী জামা কই পায় সে? সেদিনের পর থেকে যেদিনেই দেখেছি, নতুন কাপড় পড়তে দেখেছি। এপাড়া-ওপাড়া বেড়ায়। পাকা সড়ক ধরে বৈকালভ্রমণে বেরুলে মাঝেমাঝে পাশ কাটাকাটি হয় আমাদের। কখনো আমি তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে যাই, আবার কখনো সে আমাকে তার ডানে রেখে পাশ কাটিয়ে যায়। তার মাথা থেকে প্যারাসুট নারিকেল তেলের ঘ্রাণ নাকে আসে।
আমাদের এই একটা সমস্যা: একটা মানুষের সব না জেনে হুট করেই একটা মন্তব্য করে বসি! এমনও তো হতে পারে তাকে স্নেহের চোখে দেখে কেউ সওয়াবের আশায় অসহায় মেয়ে ভেবে দান করেছে। আবার এমনও হতে পারে সে নিজে টিউশনী করিয়ে টাকা জমিয়ে কিনেছে। পজিটিভ ভাবাই যায়। তবে বুকের স্বাস্থ্য দেখে নেগেটিভ না ভেবেও শান্ত থাকা যায় না! হতেও পারে চরিত্রবান বিত্তবানদের চাহিদার রাতের উপযোগ সে।
সেটা হোক বিপত্নীক বানিচ চেয়ারম্যান, নগদ টাকাওয়ালা কসিম ব্যাপারী কিংবা আমার গুণধর বাপ! চাহিদা, ক্ষমতা আর টাকার কাছে বড় অসহায় মানুষ। পরীও হয়তো সে পথের যাত্রী। মুসাফির বেশে কখনো সে একজনের দিকে ছুটে যায়, কখনো আরেকজন তার দিক ছুটে আসে।
আসলে পৃথিবীতে একটা জিনিসেরই মরণ হয় না। সেটা- খিদে, পেটের খিদে! এটার জন্যই তো আমার বাপ গরীরের হকটাও মারতে তোয়াক্কা করে না। পরীর চরিত্র নিয়ে আপাতত কোনো প্রশ্ন মনে আসছে না। তবে পরীর চলন-বলন দেখে কিছুদিন আগে ভাইরাল হওয়া একটা গানের লাইন মনে আসে-
‘বড়লোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল,
এমন মাথায় বেঁধে দেবো লাল গেন্দাফুল।’
এসব হিজিবিজি ভাবনার সাগরে ডুবতে ডুবতে সন্ধ্যা নাবতে শুরু করলো আমাদের গ্রামে। বিস্তীর্ণ সবুজের মাঠ পড়ে আছে ধান কাটার পর। গোধূলীর রঙ ছুঁয়ে যাচ্ছে সেই সবুজে।
মাগরিবের ওয়াক্ত পেরিয়েছে। আকাশটা হঠাৎ কেমন গুমোট হয়ে আছে। বাতাস বন্ধ হয়ে আসছে। ভ্যাপসা গরম! বিরক্তকর এ সময়ে দূর্যোগ-দেবীর আবির্ভাব হলো। বাড়ির কাজের মহিলাটা সংবাদ দিল: ভাইজান, চাচা মিয়া ছাড়া পাইছে। তোমরা পালান। এবার তোমাক জানে মারবে!
অতি আকস্মিক এ খবরে আমি হতবিহ্বল হয়ে যাচ্ছি যেন! মা বাড়িতে নেই, নানাবাড়ির দিক গেছে। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে সে। আসলে কি বেঁচে গেল! আমার তো মনে হচ্ছে সে মরণফাঁদে পড়লো। নাড়িছেড়া ধন নাকি পতিধনের জন্য কাঁদবে?
কোন শোক দীর্ঘস্থায়ী হবে? এসব প্রশ্নের জটলা কুণ্ডলী পাকাচ্ছে মনে। ভাবছি, আমার কি হবে? এমন একটা দেশদ্রোহী, জোচ্চোরের হাতে মরবো? আবার এটাও ভাবছি জোচ্চোর হলেও তো আমার জন্মদাতা তাকে শেষ করতে আমার হাত কাঁপবে না? কার মুখটা প্রিয়- মায়ের নাকি দুঃস্থ মানুষগুলোর?
যারা এই লকডাউনে একমুঠো ভাতের জন্য চেয়েচিন্তে বেড়াচ্ছে, কাজ পাচ্ছে না! মেয়েরা ভাত না পেয়ে নিজের শরীরটাকে করেছে অন্যের চাহিদা-রাতের উপযোগ! যারা সেটাও পাচ্ছে না, তাদের সাথে নিঃশ্বাসটা বেঈমানী করছে, মরণদূত যাদের দুয়ারে আসন্ন!
এসব ভাবতে গিয়ে আতকে উঠছি বারবার! ঘামবৃষ্টি ছুটছে শরীর চুয়ে। স্বচ্ছ বাতির আলোতেও ঘোলাটে দেখছি। দরজার পেছনে রাখা সান দেয়া ‘রামদা’টা আলোতে চকচকিয়ে উঠছে। কতক্ষণ সেদিন তাকিয়ে আছি জানি না।
ঘামবৃষ্টিতে যেন আষাঢ় নামছে! কাঁপা-কাঁপা হাতে, ভয়-ভয় চোখে দা-টা হাতে নিলাম। অদূরে একটা অচেনা পাখি ডাকছে অনেকক্ষণ ধরে। চকচক করছে রামদা-টা।
ধাতস্থ হওয়া যাচ্ছে না, স্থির হয়ে লাভও নেই। একটা ফয়সালা আজ হয়েই যাক!
ঠিক মতন কোপটা দিতে পারবো তো? আমি না পারলেও তিনি নিশ্চিত পারবেন। ভালো মতই পারবেন! তাঁর মুখোশ খুলে দেবার অপরাধে নিজের বড়ছেলের গলায় ছুরি চালাতে যার হাত কাঁপে নি, ছোটছেলের বেলাতেও তাঁর হাত ঠিক মতন কাজ করবে।
বিশ্বাসে বাঁধছে আমার! তিনি বড় ভালোবাসেন আমাকে! যদি কাজটা ঠিক মতন করতে না পারেন? তাহলে কি করব! কি করব? কিছুই করব না?
না! নিজের গলায় দা-টা ঠিকমতন চালাতেই হবে!

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge