সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ন

আবু হেনা মোস্তফা কামাল এর ৪টি কবিতা

আবু হেনা মোস্তফা কামাল এর ৪টি কবিতা

১. শীতে ভালোবাসা জমে যায়

সূর্য ওঠে নাই সারাদিন, দক্ষিনে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উত্তরে যে হিমবাহ শুরু হয়েছে তাতেই নাকি সব জমে বরফ হতে শুরু করেছে। সেই বরফে জমে গেছে ভালোবাসাও। শীতে জমে যায় ভালোবাসা !
এমনও দিন আসে যখন গরমের তাপদাহে সব জল উড়ে যায় মেঘের ঘরে। তখন কি ভালোবাসাও উদ্বায়ী হয় ?

বসন্তে কি ভালোবাসা গলে গলে চু’য়ে চু’য়ে ঝরে যায় ? তা যেমনই হোক ভালোবাসা তো ভালোবাসাই। আমাদের অনির্বচনীয় ভালোবাসা হোক জলের মতো। না বরফ , না বাষ্প , না উদ্বায়ী।
জল খলখল ছলছল নদীর মতো বয়ে চলুক। না থামুক বরফ হয়ে কিংবা হারিয়ে না যাক বাষ্পের ছলনায়।

সূর্য উঠে নাই বলে যে ভালোবাসা জমে যায় বরফের মতো তাকে চুলোয় তুলে গলিয়ে নিও। মিশিয়ে দিও যমুনেশ্বরীর জলের ভালোবাসায়!

২. সন্ধ্যা তাঁরা

সূর্য তখনো সন্ধ্যার আকাশে হেলে পড়ে নাই,
দুই জোড়া পা হেঁটে চলেছিল ধুলো উড়া পথে।
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তির একটা আস্তরণ ভর করে আসছিলো ধীরে ধীরে, যেমন করে উঁইপোকায় মাটির ঢিবি তৈরি করে বাঁশের বেড়ায়।

আমাদের এই পথের শুরু সকালের সূর্য দেখে দেখে, ধুলোর উপরে ঘাস, তাকে ঘিরে শিশির জমে জমে যে জলের ফোঁটা তৈরি হয় তারাও যেন এক একটা সূর্য হয়ে আমাদের চোখের ভিতর আলোর রঙ ছড়িয়ে পথের দিশা দেখিয়ে দিত।

মহিপুরের তিস্তা পেড়িয়ে আমরা যখন শুকনো তপ্ত বালুতে গা শুকাচ্ছিলাম তখন শিক্ষিত শয়তান রাস্তা পেড়িয়ে রমজান মাস চলে এসেছিল। আমাদের গল্পের শুরুটা এমন করেই। এরপর আমরা হেঁটেছি, শুধু হেঁটেছি উঁইপোকায় ভরে যাওয়া পায়ের উপর ভর করে।

হাঁটতে হাঁটতে পথের পাশে সন্ধ্যার আবীর মাখা সূর্যকে হারিয়ে যেতে দেখেছি অন্ধকারের ভিতর। তোমার চোখে তখন আকাশের নয়নতারার জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের জনসভার ছবি। আমার চোখ আটকে ছিল চাঁদের পাশে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা সন্ধ্যা তাঁরায়।

মানুষ মরে গেলে তাঁরা হয়ে ভেসে বেড়ায় অন্ধকারের নদীর উপর। আমি চুপটি মেরে বসে থাকি চাঁদের পাশের ঐ তাঁরাটি হয়ে। তাঁরারাও তো একদিন মরে যায়। মানুষ মরে গেলে তাঁরা হয়, তাঁরা মরে গেলে কি হয় ? আমার জানা নেই। কখনও যদি তুমি জানতে পারো তাঁরার পূনর্জন্মের নাম ও অবস্থান আমাকে জানিয়ে দিও ঘুড়ির লেজে চিঠি উড়িয়ে।

আকাশ থেকে এখনও মহিপুর দেখি, দেখি শিক্ষিত শয়তান রাস্তা। সেই রাস্তায় শুধু তোমাকে আমাকে খুঁজে পাই না আর। উঁইপোঁকায় মাটির ঢিবি বানায় রাস্তায় মরে যাওয়া গাছের গুঁড়িটায় এখন। আমি স্থির হয়ে মিটমিট করে জ্বলছি শুধু চাঁদের পাশের ঐ সন্ধ্যা তাঁরাটা হয়ে!

৩. স্বপ্ন সমুদ্র

কল্পনা করে কি আর সমুদ্রের সৌন্দর্য মাপা যায়?
কত কিছুই তো ভাবি এক রকম আর বাস্তবে দেখি পুরোটাই তার উল্টো মতো।

মহিপুরের বাঁধে দাঁড়িয়ে অস্তাচলের আলোয় কাঁধে হাত রেখে বলেছিলে, “এ আর কতটুকু পানি, এ আর কতটুকু ঢেউ? তোমাকে একদিন সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাবো, যাবে আমার সাথে? ”

তোমার সাথে পথ হেটেছি সমুদ্র দেখার আশায়।
এক বুক স্বপ্নে বেঁধেছি কত শত সমুদ্রের ঢেউ
জোয়ার ভাঁটায় মিশিয়ে দিয়েছি নোনাস্বপ্নের রং
হাতের মুঠোয় বন্দী করছি লাল সূর্য – প্রতাপ ।
ষোলো বছর হলো সমুদ্র এখনো অধরাই থেকে গেল!

হঠাৎ সেদিন তোমার সাথে দেখা হতেই সমুদ্রের কথা মনে পড়ে গেল।
পথ চলতে চলতে সমুদ্র নিয়েই শুধু কথা হলো আমাদের।
খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলে কেন এখনো সমুদ্র দেখতে যাই নি আমি? আগের মতোই নিরুত্তর নিরুত্তাপ নিশ্চুপ ছিলাম আমি।
কথায় কথায় বললে শুধু ” নিয়ে যাবো না – তা তো বলি নি। সুযোগ হলে নিশ্চয় একদিন যাবো আমরা!
তোমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটবো, ঢেউয়ের মাথায় ভাসিয়ে দিবো রং বেরঙের স্বপ্ন,
জোয়ার ভাঁটায় মিশিয়ে দিবো কষ্ট অতীত, লাল আঁধারের সূর্যটাকে মুক্তি দিবো।”

আমি শুধু মুঁচকি হেসে মনে মনে বলেই দিলাম “আশায় আশায় কান পেতেছি, সুযোগ হলে বলবে যেদিন সেদিন যাবো।”

৪. নিঃসঙ্গ নীরবতা

শীতের এমন সোনালি বিকেলের রোদে ঘাসের ব্রেঞ্চে বসে তোমাকে ভেবে ভেবে কখন যে হুট করে মরে যাবো টেরও পাবো না।
লোকজন ধরে ধরে আমাকে টানাটানি করে বাড়িতে পৌঁছে দিবে বলে আমাকে জাগানোর চেষ্টা করবে। মরা মানুষ কি কখনো জেগে ওঠে?
যখন সবাই বুঝতে পারবে এই ক্লান্ত দেহ আর জাগবে না কখনো, তখন আমার ঠিকানা খোঁজার বিরম্বনায় হতভম্ব হয়ে যাবে সবাই। আমি যে তাদের কাছে পুরোপুরি অচেনা কেউ।
ওখানকার লোকজন শুধু দিন দশেক থেকে আমাকে জানবে। জানবে বলতে ঠিক জানার মতোও নয়। আমাকে ঐ ব্রেঞ্চটাতে বসে থাকতে দেখা যাবে নাকি গত দিন দশেক থেকে।
একজনকে দেখলাম পুলিশে খবর দিলো। থানা থেকে একটা পিকআপ এসে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। পকেট, পকেটে থাকা ওয়ালেট ঘেঁটে যে ঠিকানা পাওয়া যাবে সেটা মূলত একটা ছাত্র হোস্টেল। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আমাকে নোটেড করা হবে।
শুনলাম পরেরদিন আমার পোস্ট মর্টেম অটোপসি করা হবে। চুলছেঁড়া বিশ্লেষণে বেড় হয়ে আসবে মৃত্যুর আসল কারণ। আমি নিশ্চিত কোনো কারণ খুঁজে পাবে না ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট, তুমি বা অন্যকেউ । আমি জানবো শুধু।
তোমার জন্য হৃদয়ের অলিন্দ নিলয়ে যে যে শূন্যতা ক্ষত হয়ে আছে তা কি খালি চোখে ধরা পড়ে কখনো?
বেওয়ারিশ দেহ কোনোরকমে জায়গা পাবে সরকারি কোনো গোরস্থানে।
আচ্ছা, আমার মৃত্যুর সংবাদ যদি কখনো পৌঁছে যায় তোমার মগজ অবধি তখন কি কান্না করবা তুমি? কাঁদো আর নাইবা কাঁদো শুধু আফসোস করোনা কখনও!
তবে যেহেতু কোনো খবরই বেওয়ারিশ হয়না, সেহেতু আমি নিশ্চিত তুমিও জানতে পারবা আমার মৃত্যুর দিন ক্ষণ।
শুধু একটা চাওয়া আছে তোমার কাছে –

আমার মৃত্যুর ঊনত্রিশতম দিনে এসে দেখা করে যেও।
অনেক কথা জমা আছে
অনেক গল্প বলার আছে!
বলবো সেদিন
নিঃশব্দ নীরবতায়।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge