সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১৫ অপরাহ্ন

আন্তর্শূন্য মিটিং-অভীককুমার দে

আন্তর্শূন্য মিটিং-অভীককুমার দে

আন্তর্শূন্য মিটিং
অভীককুমার দে

আমার রুমটা ছোট হওয়ায় লেখাপড়ার জন্য আলাদা টেবিল বসাতে পারি না। বই খাতা বিছানায় রেখেই লেখাপড়া করতে হয়। বসতে হয় কুসুম টেবিলে। একটা কিছু লিখছিলাম তখন। রাত প্রায় দুটো। হঠাৎ দেখি রবিদা এসে হাজির ! আমার কাঁধের উপর ভর দিয়ে বিছানার এক কোণে বসলেন। একগাল দাড়ির ভেতর মুচকি হাসলে বোঝাই যায় না। চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, মুখ থেকে হাসির ঢেউ চোখ পর্যন্ত গেছে। দুচোখের খাদে আছড়ে পড়ে কুঁচকে আছে চোখ। আমি বোকার মত শুধু দেখছিলাম। সামান্য এগিয়ে চুলে বিলি কেটে দিয়ে বললেন, ‘কি-রে, বোকার মত কী দেখছিস ?’
আপনি এত রাতে…
— ‘কেন, আসতে পারি না?’
না… মানে…
— ‘মানে আবার কী?’
আপনি তো…
— ‘আমি কী ! মরে গেছি? আশ্চর্য ! তুই জানিস না, রবি মরে না ? একথা বলতে পারিস যে, সময় বদলে গেছে। সাধু থেকে চলিত হতে পারে, চলিত থেকে সাংকেতিক হতে পারে, কিন্তু বেচাকেনা যা কিছু রবি’র বাজারেই। কিরে, ভুল বললাম কিছু ?’
না… মানে… মানে…
— ‘আচ্ছা, এত কাচুমাচুর দরকার নেই। কিছু বলার থাকলে খুলে বল। এখানে আমার বেশিক্ষণ থাকার সুযোগ নেই। জগদীশ, সুকান্ত, নজরুল, আর নতুন ছেলেটা… ওর নাম যেন কী… কি কালাম যেন… ও… আব্দুল কালাম, ওদের আগে পৌঁছতে হবে। নাহলে, বুড়োটুড়ো মানবে না। বকাবকি করলে সহ্য করতে পারবো না। তাছাড়া, আমরা গেলে বিনয়, ক্ষুদিরাম ওরাও আসবে।’
— কেন?
‘এ আবার কেমন প্রশ্ন ! আসবে না ? দেশটা কি তোদের মত গরু ছাগলদের কাছে এভাবে ছেড়ে দেবে ? তোদের তো কাণ্ডজ্ঞানই হয়নি। তোরা সামান্য সুখের জন্য সব ভুলে বসে থাকিস। তোদের মাথায় থাকে না, এই দেশের ইতিহাস। মিথ্যে ঘটনা বানিয়ে রটিয়ে দিতে পারলেই হয়ে গেছে। দুর্যোগ, দুর্দশায়ও নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ভাবে। সব ধ্বংস হয়ে গেলেও কারও কিছু যায় আসে না। আর তুই বলছিস, আমরা কেন এলাম বা ওরা কেন আসবে ?’

চোখ থেকে চোখ সরে গেল আমার। তাকাতে পারছি না তাঁর দিকে। কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। আমি চুপ । আমার অবস্থা দেখে বিকট শব্দে হেসে উঠলেন তিনি। সেই শব্দে হারিয়ে যাচ্ছিল পুলিস গাড়ির সাইরেন। হাসি থামিয়ে চিবুক ধরে টেনে তুললেন। চোখের তারায় আলো ফেলেছি চোখের। মাঝে সাঁকোর মতই দৃষ্টিপথ। দৃশ্য কিছু, এলোমেলো হাঁটছে। আমি নির্বাক শ্রোতা, মুখোমুখি।
–‘জানিস, দেশে নেমেই কলকাতা গেলাম। সব কেমন থমথমে, অচেনা মনে হলো। আমার পর যারা দায়িত্ব নিয়েছে, ওদের বোঝা কঠিন। শঙ্খটা বুড়ো হয়ে গেছে। সুবোধ তো দেখতেই যা হিরোর মতো। বাকিদের কথা বলে লাভ নেই। মমতা মেয়েটা লিখবে না রাজ্য চালাবে ! এখন কি আর বহিঃশত্রুর ব্যাপার আছে ? নিজেরাই তো নিজেদের শত্রু। কার কথা, কাকে লিখবে, আর কার জন্যই বা লিখবে ? অবস্থা দেখে রাগ উঠছিল খুব। বাকিদের ওখানে রেখে বেরিয়ে পড়লাম। বাংলাদেশ, আসাম হয়ে সোজা চলে এলাম ত্রিপুরায়। জানিস তো, এ রাজ্যে অনেকবার এসেছি। রাজবাড়ির পুরনো দালান বাড়িগুলো দেখে ভেতরটা হুহু করে উঠলো। প্রদ্যোতটা কেমন যেন ! ওদের মত হয়নি। সবকিছু দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। রেজিস্টারে কি লিখবো ভাবছি।’
রেজিস্টারে লিখবেন মানে ?
— ‘তুই এতো বোকা কেন ? আমি কাজ ছাড়া এসেছি নাকি ? আমরা কেউই কাজ ছাড়া আসিনি। যার যার কাজ করছে। আমিও কাজ সেরেই সোজা তোর কাছে এসেছি। ফিরে গিয়ে লিখবো। এই যে তোকে রেজিস্টারে লিখবো বললাম, তার মানে– আমি চলে যাবার পর, বাংলা বিভাগের দায়িত্বটা আমাকে দিয়েছে। বিশ্বকবি হবার সুবাদে এই দায়িত্ব পেয়েছি। তাই তো আসতে হয়েছে। এসেও তেমন ভালো লাগছে না। পশ্চিমবঙ্গের কথা তো বললাম, শুনলি। বাংলায় গিয়ে দেখি, সেলিনা মেয়েটারও মন খারাপ। দেশের অবস্থা ভালো নয়। নির্মলেন্দুর কথা কি বলবো, আমার মতো মুখভরা দাড়ি নিয়ে দিন গুনছে। কাগজটা পেলেই আমার অফিসে গিয়ে হানা দেবে। বাকিরা যার যার সাধ্যমত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে আসাম এসেও তেমন কিছু ভালো অভিজ্ঞতা হয়নি। তপোধীর নিজে ঝুঁকি নিয়ে যা একটু মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, অথচ পারলে তাকেই মেরে ফেলার অবস্থা। আর তোদের রাজ্যের কথা বলে তো কোনও লাভ নেই। নকশাল লেখকগুলো কলকাতার বাতাসে নাক ঢুকিয়ে রেখেছিল বহুদিন। শ্বাসপ্রশ্বাসও ভালোই চলছিল। সময় কি আর একরকম থাকে ? কলকাতার বাতাসে যখন অক্সিজেন কমে গেছে, ওদেরও পথ নেই। ফাঁকিবাজেরদল ভোল পাল্টে গর্তে ঢুকে গেছে। এখন সুযোগ পেলে গর্ত থেকে ছোবল মারার চেষ্টা।
রেজিস্টারে এসব অভিজ্ঞতা লিখে রাখলে আন্তর্শূন্য মিটিং এ আমার নিজের মাথাই কাটা পড়বে। যদিও একটা আশার আলো দেখতে পেলাম। নতুন প্রজন্মের কাছে কিছু সময়ধরা অনুভব আছে ঠিকই, এই বিষয়টা বিশেষ দ্রষ্টব্যে লিখে রাখতে হবে। তারপর, তুই তোর কথা বল। আমি… ‘

কথা চলছিল। অনেক কথার পরও কথা শেষ হতে চায় না। রবিদা আর আমি, আমি আর রবিদা, দুজন একটি রাতের শেষ সময়; আমাকে গান গাইতে বললেন। আমিও শুরু করলাম–
“আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে,
এ জীবন…”
রবিদা হাসতে হাসতে বেড়িয়ে গেলেন। একটু পরে উঠোনে এসে দেখি– পূর্ব আকাশে তিনি অফিস খুলে বসেছেন।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge