মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন

আঞ্চলিক ভাষা # প্রসঙ্গ: আঞ্চলিক ভাষা-মো: শওকত আলী

আঞ্চলিক ভাষা # প্রসঙ্গ: আঞ্চলিক ভাষা-মো: শওকত আলী

মানবজাতির সভ্য হয়ে উঠার পিছনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো ভাষা। বাগযন্ত্রের মাধ্যমে অর্থবোধক ধ্বণির সাহায্যে মানুষ মনের যেভাব প্রকাশ করে তাই ভাষা। আবার, যে ভাষা একটি দেশের অঞ্চলবিশেষের কথ্যভাষা তাকে আঞ্চলিকভাষা বলা হয়। প্রত্যেক দেশেই বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিকভাষার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এই পার্থক্য কথার টানে, উচ্চারণে, বানান এনং শব্দের রূপে দেখা যায়। আঞ্চলিকভাষা গড়ে ওঠে অঞ্চলবিশেষের জলবায়ু, আবহাওয়া, অঞ্চলের মানুষের জিহবার জড়তা, বিশেষভঙ্গিতে ধ্বণি ও শব্দের উচ্চারণ ইত্যাদি নানা কারণে। এভাবে আঞ্চলিকভাষা দেশের অন্যান্য অঞ্চল বা একই ভাষা ব্যবহারকারী দেশের বাইরের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের ভাষা থেকে কিছুটা পৃথক হয়ে যায়। অনেক শব্দ, বাক্য ভিন্নরূপে ব্যবহৃত হয়। আঞ্চলিকভাষাকে উপভাষাও বলা হয়। আঞ্চলিকভাষার কতগুলি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন:
১. আঞ্চলিকভাষা সাধারণত মৌখিক রূপ। তবে এর যে ব্যতিক্রম নেই তা নয়, এর লিখিত রূপও পাওয়া যায়।
২. আঞ্চলিক ভাষাস্ব-স্বঅঞ্চলের উচ্চারণ ও বাক্য গঠন রীতি নির্ভর।
৩. আঞ্চলিক ভাষা যে কোনো দেশের বাসে অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত।
৪. আঞ্চলিক ভাষার কোন কোন শব্দ সাধুরীতি বা চলতিরীতিতে ও গৃহীত হয়ে থাকে।
বাংলা ভাষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ নিয়ে প্রথম গবেষণা ধর্মী কাজ করেন গ্রিয়ারসন তাঁর ঞযব ষরহমঁরংঃরপ ঝঁৎাবু ড়ভ ওহফরধ নামক গ্রন্থেও প্রথমখন্ডে। ১৯০৩ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে এটি সম্পন্ন করা হয়। ভাষাবিদ সুকুমার সেন বাংলা উপভাষার শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলাভাষা উচ্চারণ ভিত্তিতে আলাদা। সে হিসেবে বাংলা উপভাষা পাঁচ প্রকার:
১.রাঢ়ী উপভাষা: পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চল অর্থাৎ নদিয়া, কলকাতা উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া ও পূর্ববর্ধমান জেলার বাংলাভাষী মানুষদেও কথ্যভাষা রীতি এটি। এই উপভাষার পরিমার্জিত বাংলারূপকেই বাংলা ভাষার প্রমিত লিখনরূপ হিসেবে গণ্য করা হয়।
২.বাঙ্গালীউপভাষা: ভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলার সব থেকে বড় উপভাষা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এই উপভাষায় কথা বলে। ঢাকা বিভাগ, খুলনা বিভাগ, বরিশাল বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ, কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল এবং ত্রিপুরা অঞ্চলের লোকজনের মুখের ভাষা এই শ্রেণির অন্তর্গত।
৩.বরেন্দ্রীউপভাষা: বাংলাদেশ এবং ভারতের পদ্মা ও মহানন্দা উপত্যকা অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙ্গালিদের ব্যবহৃত বাংলা ভাষা।
৪.ঝাড়খন্ডীউপভাষা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশে, ঝড়খন্ড এবং ওড়িশার কিছু জেলায় প্রচলিত বাংলা ভাষার একটি উপভাষা।
৫.রাজবংশী বা রংপুরী ভাষায় বাংলাদেশের রাজবংশী সম্প্রদায়, রংপুর বিভাগ, ভারত এবং নেপাল এর রাজবংশী, তাজপুরিয়ানস্য শেখ, নাথযোগী, খেন সম্প্রদায়ের লোকজন কথা বলে।
[ *সূত্র – উইকিপিডিয়া ]
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার পার্থক্য লক্ষণীয়। এখানে প্রায় শতাধিক আঞ্চলিক ভাষার প্রকার ভেদ রয়েছে। এই প্রকারভেদ শব্দের উচ্চারণে এবং অর্থ ভেদে দৃশ্যমান। যেমন বৃহত্তর অঞ্চল হিসেবে বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রাম সহ বৃহত্তর জেলা গুলির মানুষের কথা বলার ব্যবহৃত শব্দগুলির অর্থ এবং উচ্চারণগত বিষয়ে অমিলটা লক্ষণীয়। আবার প্রতিটি জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও আঞ্চলিক কথ্য ভাষার অভ্যন্তরীণ ভিন্নতা রয়েছে। এসব কারণে আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্রে বাংলাদেশ বেশ সমৃদ্ধ। উদাহরণ হিসেবে যদি বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের ভাষা ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী – এ পাঁচ জেলার মানুষ অনেক শব্দ ব্যবহার কওে যেগুলার অর্থ এবং উচ্চারণগত পার্থক্য রয়েছে অঞ্চল থেকে অঞ্চল ভেদে। উদাহরণ হিসেবে একটি বাক্য আমরানিতে পারি। প্রমিতবাংলায় ‘আমাকে যেতে হবে।’ বৃহত্তর রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় এটি হলো, ‘মোক যাওয়া নাগবে।’ কিন্তু কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট জেলায় এটি, ‘মোর যাওয়া খায়।’ এখানে ‘খায়’ শব্দটি একে বাওে অন্যরকম। রংপুর অঞ্চলের সম্বোধন সূচক ‘বাহে’ শব্দটি এতোটাই জনপ্রিয় যে ঐ অঞ্চলের লোকজন ‘বাহের দ্যাশের মানুষ’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে স্থানীয় লোকজন কার্যকর যোগাযোগে সক্ষম হয়, তাদেও সামাজিক সংহতি এবং অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পায়। আঞ্চলিক ভাষা সেই অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্য কে ধারণ কওে বর্তমান সংস্কৃতির প্রবাহমান ধারাকে বেগবান করে।
ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বাংলা আঞ্চলিক ভাষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ ছিল। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার শক্তি অনেক এবং এগুলি সংকলিত হওয়া প্রয়োজন। তাই বাংলা একাডেমির আঞ্চলিক ভাষার অভিধান সম্পাদনার কাজে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন ড. মুহম্মদ এনামুল হক, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. কাজী দীন মুহাম্মদ প্রমুখ। আঞ্চলিক ভাষা যে বাংলাভাষা-সাহিত্য এবং বাঙালি জীবনের স্বকীয় চরিত্রও বৈশিষ্ট্য প্রকাশে বলিষ্ঠ একটি মাধ্যম বাংলা আঞ্চলিক ভাষার অভিধান বা সংকলিতরূপ তারই নিদর্শন। মোট প্রায় পচাত্তর হাজার শব্দ এ অভিধানে স্থান পেয়েছে। বর্তমানে যে ব্যবহারিক বাংলা ভাষার অভিধান রয়েছে তার ভিত্তি হলো এ আঞ্চলিক বাংলা অভিধান।
সংস্কৃতি চর্চার নানান বিষয় যেমন – গান, কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষার শব্দ ব্যবহার পাঠক-শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়। সঠিকভাবে সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ করতে পারলে তা যেমন পাঠক প্রিয়তা পায় তেমনি ভাষাএবংসাহিত্য অনেক সমৃদ্ধ হয়। উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটি উপন্যাসের নাম উল্লেখ করা যায়। যেমন – ইমদাদুল হক মিলনের ‘নূরজাহান’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’, ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসগুলো আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় লিখিত। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটি ঢাকাইয়া ভাষায় এবং ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসটি বগুড়া অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত।
এ উপন্যাসগুলি শুধু জনপ্রিয় নয়, বাংলা সাহিত্যেও এক একটি উল্লেখ যোগ্য সাহিত্যকর্ম। তেমনি সৈয়দ শামসুল হকের ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’ বৃহত্তর রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত ইতিহাস নির্ভও একটি জনপ্রিয় নাটক। উল্লেখিত উপন্যাস, নাটকের চরিত্র গুলোকে জীবন্ত কওে তোলার জন্য তাদেও সামাজিক শ্রেণী, সাংস্কৃতিক পটভূমি বিবেচনা করে উচ্চারণসহ আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে।
কবি-সাহিত্যিকগণ তাদের সৃষ্টিশীল কাজে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য কিংবা আঞ্চলিক আবহ তৈরি করার জন্য আঞ্চলিক শব্দ কিংবা বাক্য ব্যবহার করেন। কারণ সাহিত্যে কী প্রকাশ করা হলো সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে প্রকাশ করা হলো সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে পাঠকদেও ইন্দ্রিয় বা চেতনাকে জাগিয়ে তোলা লেখকের কাজ। উপওে উল্লিখিত লেখকগণ ছাড়াও কবি আল মাহমুদ, জীবনানন্দদাশ, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমানের কিছু কিছু কবিতায় তার প্রমাণ আমরা পাই।
কবি শামসুর রাহমানের ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ ঢাকাইয়া ভাষায় এবং সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরাণের গহীন ভিতর’ রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত অনবদ্য কবিতা।
সব লেখনী আঞ্চলিক ভাষা নির্ভও হলে সেগুলি সর্বাঞ্চলের পাঠক গ্রাহ্য হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়াএকথা মানতে হবে যে আঞ্চলিক ভাষায় শব্দের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঞ্চলিক ভাষা অঞ্চল বিশেষের দৈনন্দিন জীবনাচার, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তুলে ধরলেও দর্শন, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এসব ক্ষেত্রে ব্যবহার যোগ্য শব্দভাÐার আঞ্চলিক ভাষায় নেই।এসব বিষয়ে আঞ্চলিক ভাষার কোন পরিভাষাও নেই। তবে আঞ্চলিক ভাষাকে খাটো করে দেখবার কোন অবকাশ নেই। কারণ প্রমিত ভাষা নিজেও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তাকে প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক ও বিদেশী ভাষার শব্দভান্ডার থেকে শব্দ যোগ করতে হয়। তাই প্রমিত ভাষাও আঞ্চলিক ভাষা কখনই পরষ্পর বিরোধী নয়।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge