সোমবার, ১৭ Jun ২০২৪, ০৩:২০ অপরাহ্ন

অমলকান্তি চন্দ’র একগুচ্ছ কবিতা

অমলকান্তি চন্দ’র একগুচ্ছ কবিতা

অমলকান্তি চন্দ’র একগুচ্ছ কবিতা

আমিও আবাক হই
মুখোশটা দু -কান কামড়ে ধরল
হাত দুটো ভয়ে ভয়ে সামনের দিকে এগুলো
তোমার রক্ত চাপের গতিবিধি
পরখ করতে করতে কোন ভিন গ্রহী মানুষ
মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মুখোশটা গতকালও তেমন প্রয়োজন ছিল না
আমার নিজের কাছে খুব অদ্ভুত লাগত,
কিন্তু আজ এতো এতো ভিন গ্রহীদের বাস
এই পৃথিবীকে আবাক করে।
মেদ জমে থাকা রক্ত নালীগুলো ভয়ে সংকুচিত হতে হতে
আচমকা ফেটে যায় আকাশ,
মানুষ বলাবলি করে, আজকাল চাঁদের অসুখ করেছে।
এই অসুখ সারাতে দিনরাত খেটে চলছে যারা
তাদেরওতো সন্তান আছে
পরিবার আছে
দায়িত্ব পালন করতে করতে সুস্থ ভাবে বাঁচার অধিকার আছে, তোমাদের কঠিন নীরবতায়
আমিও আবাক হই, ঠিক পৃথিবীর মত।

কিছু অন্য কথা
মনদা কানে শুনে না
মনদা চোখে দেখে না
মনদা যা শুনে কিংবা দেখে বিলাস তা শুনেও না, দেখেও না।
কিছু অন্য কথা, কিছু অন্য সুর
মনদা জানে কত দূর ? বিলাস জানে না।
বিলাস গরু চড়ায়
ক্ষেতে হাল মারে
মই -এ চড়ে, হাটে যায়, ভরা পেটে মদ খায়
গতর খাটে, গতর পুড়ায়, মানদা কিছু জানে না।
মানদা রান্না করতে জানে
মনদা বাসন মাজতে জানে
মনদা জন্ম দিতে জানে
এত কিছু যে এক জীবনে, বিলাস জানে না।
বিলাস যা জানে মনদা জানে না !
মনদা যা জানে বিলাস জানে না!
কেবল ভাগ হওয়া আকাশ ভালোবাসায় জুড়তে জানে দুজন ।

মন ভালো নেই
প্রতিবেশীর উঠোনে ছোঁয়াছে আকাশ
ছোঁয়া লাগবে বলে আড়ালে থাকি
আড়ালে কেবল শূন্যতা
পাখী আর মানুষের ভেতর
কিছু লঘু অভিলাষ ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে যায়
যেমন করে আঁধারের বুকে ঘাম দেওয়া আলো
ফেরি করে আদিম ….
বাস টার্মিনাল থেকে খেয়া ঘাট, যত দূর চোখ যায়
পর্ণমোচী বৃক্ষের মত শত শত বাবর ,দীঘল আকাশ ছোঁয়ে দেখে একবার।
এসময়ে আকাশেরও বড় অসুখ
মন ভালো নেই
নামতার ঘরে সহজ পাটীগণিত
কেবল
হাই তুলে, হাচি দেয় ,চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ ।

গোরস্থান
গলি পথ, পথের পাশে বট ছায়া
ছায়াতে ভবঘুরে দুপুর ,শিকড়ে
মাথা রাখে কেউ , অনন্ত আকাশ
আকারণে ভীষণ ভালবাসে আমায় ।
গণ্ডির চারিদিকে নরম রোদের প্রলেপ
ঠোঁটে মাখে তোমার কিশোরী বেলা
স্নান ঘাট । কিচিরমিচির পাখী গান ।
ভারী বাতাস। ঘোড়া ফড়িং-এর নৃত্য
দেব উঠোনে শালিকের খোয়াড়
শুকনো বট পাতার নীচে গোরস্থান
মণির আলির অভাবী সংসার।

পতাকা
মজনু পতাকার পাশেই বসেছিল
তার ঘোলাটে চোখে রং বদলের বেলা, রামধনু ছুঁতে ছুঁতে
নদীতে পা রাখল যখন
পতাকা উড়তে থাকল মাঝ গগনে ।
আলো আর জল কণাদের ভীড়ে অদৃশ্য আকাশ
ঝুলে রইল বালকের ঘুড়ির সুতোয়।
আজ দূরত্বে থাকার কথা বলে সবাই
ঘুড়ি আর বালকের মাঝে
স্নানঘর আর বিছানার মাঝে
বেদী আর পতাকার মাঝে
কিংবা
রেশনের লাইনে
এল পি জির লাইনে
মুদি দোকান ,মাংস বা সব্জির হাটে
এক একটা ঘুরন্ত বলয়ে চক্কর খেতে খেতে ঘরে ফিরে আসা।
ঘর আর পতাকার মাঝে দারুণ মিল খুঁজে পাই
কেবল স্বাধীনতা
বুক বোতামের ঘরে ফুরফুরে হাওয়া
আমার স্বাধীনতা, আমার ঘরের স্বাধীনতা
আমার দেশের স্বাধীনতা
আমি আর পতাকা
পতাকা আর মজনু
সবাই অধিকারের কথা বলি ।
মজনু কোন রং মাখে না মুখে
তাদের ভন ভন করার অধিকার নেই
তাদের বক বক করার অধিকার নেই
কার্যত তাদের বাঁচার অধিকার নেই
তারা সারা জীবন পতাকা বহন করে
আন্দোলন গড়ে, হরতাল করে
শুধু ঘুড়ির কথা বললেই বালকের মত কেঁদে ফেলে…

ঘাস শিশিরের পা
ঘাস শিশিরের পা গুলো ছুটে গিয়েছিল নগরে
, তাদের দু চোখে সন্ধ্যার কাজল, বেড়াল নাক, কালচে ঠোঁটেদের ভীড়ে বদ্ধ শস্যভূমি,ডানা মেলা বকের মত , চতুর মাছরাঙা কিংবা শালিকের মত বেবাক ঝুলন্ত উদর ,পলকে নিমজ্জিত গোটা পৃথিবী।
পৃথিবীর ওপাশে আমাজন, ফণায় তুলে রাখে সিংহ তাজ, ডোরাকাটা গাছগুলো কালো সাপেদের মত বেঁকে গেলে কেবল নড়ে উঠে ভারত ।
শ্রেণী মানুষের আড়ত ঘুরে চোখ বাঁধা শকুনেরা পৃথিবী চক্কর কাটে, নিজ প্রজাতির মাংস খায়, উল্লাস করে! সারা রাত উল্লাস করে।
রাজপথ জেগে থাকে , কীটেদের মারণ স্প্রেতে শিশিরের স্বাদ, কেবল ক্ষুধার কথা ভুলে যায় বেবাক মানুষ…

চল্লিশ পেরিয়ে আমি
চল্লিশ পেরিয়ে আমি
কাশের শীর্ণ পেটে রুপই তরজার গাঁট বাঁধি
এপাশে ওপাশে বেতের পূরণে ঠোকা ঠোকা আওয়াজ
মাঝ রাতে দরজা খুলে দেই, ঘাস ফুল দেখব বলে।
দুপায়ে ভর করে,এখনও আকাশ দেখি
অমাবস্যা রাত, বাদুড়ের বিষ্ঠার মত নকল অন্ধকার তেলাকুচির পাতায় কেবল মধুমেহ বিলাপ।
রক্ত চাপে ভোগি, পিপাসায় কাতরাতে থাকি
বিদেশী শুয়োরের মত নাক ডেকে ঘুমোই
মাঝে মাঝে মদ খাই,আমি শালা মগজ পুড়াই।
মহামারী দেখি, ভোগা মানুষের পায়ে হাঁটা পথ
বিরল মিছিল, শুকনো জিহ্বায় চেটে খাওয়া ভাইরাস
কুকুরের মত লালা ঝরাই, আমি প্রতিদিন বিষ খাই ।
ঘাটে যাই, হাটে যাই, মাঠে যাই
নদীর মত বেঁকে যাই, সাপের মত বেঁকে যাই
পথের মত বেঁকে যাই ,
লাথি খাই, চড় খাই, ঘুষি খাই
মাটিতে পড়ি আবার উঠি ,মাটিতে পড়ি আবার ছুটি।
চল্লিশ পেরিয়ে আমি
অতি সরল, পাখীর মত দানা খাই
আকাশে পাখা উড়াই ,মেঘের ভেতর !মেঘের ভেতর ।

কোন এক নির্জনে
দু-হাতে অন্ধকার ঠেলতে ঠেলতে কোন এক নির্জনে
গোটা কয়েক পাখী চোখ অতি নিরিবিলি প্রহর গুণে
তারা জানে না কিভাবে ফিরে আসে প্রতিটি আহ্নিক সন্ধ্যা ।
প্রতি সন্ধ্যায় পাখী পথ বেঁকে যায়, ভেজা পালকে নালি শাক …
কালো বধূটি মুঠো মুঠো করে, দু নখে কেটে আনে ঘরে ।
দূরের আকাশে গলা কাটা চাঁদ, ফিনকি আলোয় রক্ত ঝরে ।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge