সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৩:৩১ পূর্বাহ্ন

অনুভব-মারুফ হোসেন মাহাবুব

অনুভব-মারুফ হোসেন মাহাবুব

#এক
এক ধরনের ভালোলাগা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি গত দুইদিন ধরে। এক ধরনের অনুভব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বুক পকেটে একটা খাম। খামের ভেতর একহাজার টাকার একটা নোট।
একহাজার টাকার একটা নোট তেমন বড় কোন সংখ্যা নয়। অথচ কি এক অলৌকিক অনুভব, অবর্ণনীয় আনন্দ অনুভূতি আমার মনের ভেতর খেলা করছে। চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যাচ্ছি। কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে হলে কাজ থামিয়ে ভাবছি কী মিরাকল। কী যোগসূত্র।!

মা আমার গ্রামের বাড়িতে থাকেন। প্রতিমাসে বাজার খরচা পাঠাই। নির্দিষ্ট সময়ে ঈদে পার্বণে বাড়িতে পড়ার জন্য প্রিন্টের ছাপা শাড়ি কিনে নিয়ে যাই। কখনো একটু ভালো শাড়ি কিনলে জোরাজুরি করতে হয় পড়ানোর জন্য। ফোন দেই মাঝে মাঝে, কখনো নিয়মিত।
মাসে দু-তিন মাসে বাড়ি গেলে ফলমূল কিনি,
টোস্ট বিস্কুট-চিনি কিনি, চানাচুর কিনি। কলা, আম বা তরমুজ কিনি। আব্বার হাতে হাত খরচা,
চুপকরে মার হাতে আরো কিছু টাকা- কেবল মার জন্যে- নিদেন কালে। এরপর রংপুরে ফিরে এসে ভাবি, মা ভালো আছেন, ভালো থাকেন।
কিন্তু যখন শেষ পর্যন্ত ফোনে শুনি, মা অসুস্থ
ভালো লাগেনা, ভালো লাগেনা- খারাপ লাগে, অসহায় লাগে।

অসুখ হলে মা খবর দেন না। আব্বাও গোপন রাখেন সে খবর পারতপক্ষে। জানেন, অসুখের খবর শুনলেই মাকে তখন তখনই নিয়ে চলে আসতে বলবো রংপুরে। কেন ভালো ডাক্তার দেখানো হয় নি তাই নিয়ে চেঁচামেচি করবো। কেন দেরিতে আমি জানতে পারলাম তাই নিয়ে কৈফিয়ত চাইবো। একারণে আব্বা-মা অসুখ বিসুখের খবর সহজে জানাতে চান না।
গত সপ্তাহে গ্রামের এক ডিসপেনসারিতে গিয়ে মা ব্লাড প্রেসার মেপে এসেছে।
মা’র ব্লাড প্রেসার একেবারে কমে গিয়েছিলো। কতটা কমে গিয়েছিলো মা বলতে পারে নি। মার শরীর অনেক দূর্বল হয়ে গেছে। খেতে পারে না। মাথা ঘোরে। শরীর যেন বাতাস লাগলেই পড়ে যাবে উঠোনে। এতটাই দূর্বল যেন উঠোন থেকে দখিন দুয়ারী টিনের ঘরের খোলা বারান্দায় উঠতেই টাল খেয়ে ঢলে পড়বে মা।
আব্বার চিরকালের অভ্যাস। জ্বর হলে ওষুধের দোকান থেকে প্যারাসিটামল বা নাপা এনে খাইয়ে দেবেন। কৃমি হলে বছরে ছয়মাসে এ্যালমেক্স চুষে খাওয়াবেন। নিজেরা গ্রাম্য ডিসপেনসারি বা গ্রাম্য ডাক্তারের সহজ পরামর্শে ওষুধ কিনে খাবেন।

মার বাতের ব্যথা হাঁটুতে। শীত এলে ব্যথা বাড়ে। জোড় করে এনে বড় ডাক্তার দেখিয়ে দিই। সব ওষুধ একবারে কিনে প্লাস্টিকের চৌকো বাক্স ভরে দিয়ে দিই বাড়ি যাবার দিন। ভাবি অর্ধেক ডোজ ওষুধ কিনে দেয়ার পর শেষ হয়ে গেলে যদি ওষুধ কিনে আনতে আনতে দেরি হয়, যদি গ্রামের ওষুধের দোকানে ওষুধ না পাওয়া যায়।

সংসারের এত খরচ। হয়তো মায়ের মন পোড়ে অনেক খরচ করতে দেখে। তাই অসুখ হলে জানাতে চায় না। বোনের কাছে খবরটা জেনেছি এক সপ্তাহ পর। মার ব্লাড প্রেসার খুব নেমে গেছে। এতটাই যে, ডিসপেনসারির পল্লীচিকিৎসক বলেছেন, মা যেন প্রতিদিন ডিম, দুধ খান।
মা এতসব পুঙ্খানুপুঙ্খ কথা বলে না। মা এত সহজ জীবন যাপন করে যে অসুখ-বিসুখ, শরীর খারাপ লাগা খুবই যেন স্বাভাবিক ব্যাপার তার কাছে।
ছোটভাইটি অনেকরাতে বাড়ি ফেরে। সারাদিন বাজারের এক দর্জির সহকারী হিসেবে কাজ করে রাত নয়টা দশটা অব্দি।
বাড়িতে ফেরার সময় দেখে সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে।
আমি ফোন দিই। বলি, তোর মোবাইল নম্বরটাতে বিকাশ এ্যাকাউন্ট খুলবি। আমি তোকে মাঝেসাঝে কয়টা করে টাকা পাঠাতে পারি হাতখরচাপাতির।
বলি, মার প্রেসার কমে গেছে শুনলাম। এক কাজ কর, বাজারে বাসস্টান্ডে ডিম সেদ্ধ বিক্রি করে। দুটি কিনে কাগজে মুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে মাকে খেতে দে। এতরাতে মা নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে গেছে। তবু ডেকে তুলে খাওয়াবি। দেখবি কাল সকালে মা ভালো বোধ করবে।
কাল তোকে টাকা পাঠাবো। কয়টা আপেল আর কমলা কিনবি। মার দিকে খেয়াল রাখবি বুঝলি।
ছোটভাই বলে, মা কেক খেতে চেয়েছে।
আমি বলি, কিনে নিয়ে যা কোন বেকারির দোকান থেকে।
সকালে মা কেক খান। আব্বাকে খেতে দেন। ছেলে কমলা, আপেল আনছে রাতে বাড়ি ফেরার সময়। কেক, আঙুর আনছে বাপ-মায়ের জন্যে। আব্বা এসব দেখে কাঁদেন। আবেগে কাঁদেন। সচরাচর এমনটা করা হয় না পরিবারে। এতটুকু যত্ন কয়দিন থেকে পেয়ে আনন্দে, সুখে আব্বার গলা ঠেলে সুখের কান্না উঠে আসে। আমি শুনতে পাই ছোটভাইয়ের কাছে। বলি, দেখ, একটু যত্ন করছিস। তাতেই কতটা খুশি বাবা-মা।

#দুই
মার শরীর কিছুটা ভালো হয়েছে। কিছুটা ডিসপেনসারি থেকে আব্বার এনে দেয়া অসুধে। কিছুটা ছেলের ফলমূল এনে দেয়ার সুুখে। আমি বুঝি, দূর থেকে।

অনেক ব্যস্ততা যাচ্ছে। এই শহরে বউ-সন্তান নিয়ে আমার সংসার বাড়ছে, বয়স বাড়ছে। বাড়ি যাওয়া হয় না। তবু মনে মনে ভাবি, সুযোগ পেলে একদিন বাড়ি যাবো। আব্বা গরুর মাংস খেতে ভালোবাসেন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাড়ি গিয়ে কিছু বাজার খরচ করে দিয়ে আসবো।

এরই মধ্যে ছোটবোন জামাই খোকন ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে আমার বাসায় এসে ওঠে। সকালে নাইটকোচ থেকে নেমে আমার বাসায় আসে। সকালের নাস্তা একসাথে খেয়ে আমি অফিসের জন্য রেডি হই। খোকনও বাড়িতে যাবার জন্য বের হয়ে আসে আমার সাথে। এখান থেকে আরো একশো কিলোমিটার ওকে যেতে হবে ওর গ্রামের বাড়ি পৌঁছতে। ওর বাড়ি আমাদের গ্রামের পরের গ্রামে।
আমি একহাজার টাকার একটা নোট ওর হাতে দিয়ে বলি, শোন, পাঁচশো টাকা দিয়ে এক কেজি মাংস কিনে দিও বাড়িতে। আর পাঁচশো টাকা দিয়ে ফলমূল। টাকাটা হাতে দিওনা। তুমি নিজে মাংস ও ফলমূল কিনে দেবে।
ও না না করে অস্বীকৃতি জানায় টাকাটা না নেয়ার। বলে, আপনার টাকা নেয়া লাগবে না, ভাইজান। আমিই কিনে দেবো। অনেকদিন পর বাড়ি যাচ্ছি।
আমি জোর করে পকেটে টাকাটা গুঁজে দিই।

#তিন
বিকেলে আমার একটা লেকচার দেয়ার কথা পাকা হয়ে আছে গত সপ্তাহ থেকে। ক্যাডেট কোচিং সেন্টারের এক পরিচালক বন্ধু বেশ কয়েকদিন ধরে অনুরোধ করছেন, তাঁর কোচিং সেন্টারের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী লিখিত পরীক্ষায় টিকে ভাইভার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি যেন ভাইভার বিষয়ে তাদের সাথে একটা সেশন কথা বলি। ওদের মোটিভেট করি।

কেন তাঁর মনে হয়েছে যে আমি তাঁর ছাত্রছাত্রীদেরকে ভাইভা পরীক্ষার বিষয়ে মোটিভেট করার উপযুক্ত ব্যক্তি- আমি জানি না। তবে আমি নানান বিষয়ে পড়াশোনা করি এটা পরিচালক বন্ধুটি জানেন। আচারে ও বেশে চেষ্টা করি সময়যোপযোগী থাকতে।

বিকেলে দের ঘন্টারও বেশি সময় ধরে কথা বললাম ছেলেমেয়েগুলোর সাথে। একেবারে প্রফেশনাল ট্রেইনারের মত। ক্লাস শেষে অফিসরুমে বসে চা খেলাম। ওঁরা ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা জানালেন।
চলে আসার সময় একটা খাম জোর করে পকেটে গুঁজে দিলেন আমার কেবল রিক্সাভাড়াটা দেয়ার অনুরোধ উপেক্ষা করে।

#চার
সন্ধ্যায় আরেকটি প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের পর বাসায় ফিরে বউয়ের সাথে চা খেতে বসি।
পকেট থেকে খামটা বের করে খুলে দেখি একহাজার টাকার একটা নোট।
এক হাজার টাকা। কমও নয়, বেশিও নয়।

চায়ের কাপে চুমুক দেয়া আমার থেমে গেল।
বউয়ের চোখের দিকে তাকালাম। চোখে আমার টলমল করছে পানি। আমি চেয়ে আছি গভীর আবেগে টাকাসমেত খামটির দিকে। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে বউ।
একহাজার টাকার সাথে আমার কী এমন হলো যে এতটা আবেগ আক্রান্ত করলো আমাকে। ও চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো। কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, হঠাৎ এমন করছো কেন?
ওকে বললাম ঘটনা। সকালে খোকনের হাতে একহাজার টাকা মার জন্য পাঠিয়েছি। যেন ও মাংস আর ফলমূল কিনে নিয়ে মাকে দেয়। মার জন্য এতটুকু করলাম আর দেখ,
দিন না ফুরাতেই আল্লাহ সে টাকা কিভাবে আমার পকেটে ভরিয়ে দিলেন।
বউ তাকিয়ে আছে আমার চোখে। আমি তাকিয়ে আছি টাকাসমেত খামটির দিকে। আমার চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে। টপটপ করে কয়েক ফোঁটা চোখের পানি টাকা ও খামের ওপর পড়ছে।

#পাঁচ
এক ধরনের গভীর ভালোলাগায় মনটা ডুবে আছে। বুকপকেটে খামসমেত এক হাজার টাকার একটা নোট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি দুই দিন ধরে। মাঝেমাঝে ডানহাত বুকপকেটের ওপর রাখি।
এক গভীরতর অলৌকিক যোগসূত্র অনুভব করি তখন।আমার চলা থেমে যায়। আমার কাজ থেমে যায় হঠাৎ।
আমার মার মুখ ভাসে মনে। আমি আকাশের দিকে তাকাই। এক মহানুভব স্রষ্টার করুণার কথা ভেবে আমার মাথা নত হয়ে আসে। আমার দুইহাত উপরে উঠে আসে করুণাময়ের প্রতি।
আমার চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসে।
অস্ফুটে বলি, আল্লাহ, বাবা মায়ের অবহেলা আমি করবো না। তোমার আদেশ আমি বুঝতে পেরেছি।
বলতে যেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করি, যেন এখনি আমি উড়ে গিয়ে মার পায়ের কাছে বসি। মা কপালে গালে হাত বুলিয়ে দেন। আঁচলে মুখের ঘাম মুছে দেন।ছোটমাছের ঝোল দিয়ে ছেলেবেলার মত ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে খাওয়ান। মার চোখে-মুখে প্রশ্ন, এত শুকিয়েছিস, বাবা। শরীরের অযত্ন কেন করিস?

আমি তো পাখি নই। পাখি হলে, এখনি উড়ে যেতাম মায়ের কাছে। উড়ে গিয়ে বসে থাকতাম মায়ের পায়ের কাছে। মা নিশ্চয় প্রতিদিন দখিন দুয়ারী টিনের ঘরের বারান্দায় বসে তাঁর সন্তানদের মুখ মনে করে করে কাটিয়ে দেন বিকেল থেকে সন্ধ্যা।
আমি তো পাখি নই। পাখি হলে উড়ে গিয়ে বসে থাকতাম মায়ের পায়ের কাছে। মায়ের আটপৌরে কাপড়ের গন্ধ নিতাম বুকভরে।
আমি তো পাখি নই।

শেয়ার করুন ..

Comments are closed.




© All rights reserved © পাতা প্রকাশ
Developed by : IT incharge